Friday, May 1, 2026


 

মুক্তগদ্য 


আটপৌরে এক মেয়ের গল্প

অনিতা নাগ 

এই তো হেথায়, কুঞ্জ ছায়ায় স্বপ্ন মধুর মোহে
এই জীবনে যে’কটা দিন পাব……
আপন মনে গুণগুণ করছে কমলিকা। ঘরের জানলা দিয়ে যে এক চিলতে আকাশ দেখা যায় সে'দিকে তাকিয়ে থাকলেও বেশ টের পাওয়া যায় তার মন এখন সুদূরের পিয়াসী। সর্ন্তপনে ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দেয় কমলেশ। সে জানে এই সময়টা একা থাকতে ভালোবাসে তার কমল। সেই চঞ্চল মেয়েটাতো কবেই হারিয়ে গেছে। বাড়ীতে থাকলে সারাক্ষণ উপর আর নীচ। আর কলকলানি কথার ঝুরি। সেই মেয়েটা তো হারিয়ে গেছে কোন তেপান্তরে। এখনের এই মেয়েটাকে তার মা বাবাও বোধহয় চিনতে পারতেন না। দীর্ঘ দিন ধরে একা থাকতে থাকতে ওটাই কেমন অভ্যেস হয়ে গেছে কমলের। 

জীবনে কম সংঘর্ষ তো ছিলো না। নিজের জীবন সাথী পছন্দ নিয়েই প্রথম তাল কাটে পরিবারে। তারপর তো একটা ইতিহাস। হাজার বাঁধা পার হয়ে তবে বিয়ে। তারপর প্রবাসে পাড়ি। কিন্তু এই পোড়া মনকে বোঝে কার সাধ্যি। ট্রেনের ফার্ষ্টক্লাস কূপে তারা দু'জন। উথাল পাতাল ঢেউ পেরিয়ে পেরিয়ে তবে তো তাদের স্বপ্ন পূরণ। সেই সব স্বপ্ন বুকে নিয়ে তাদের সংসার সাজাতে চলেছে। কিন্তু এতো কষ্ট হচ্ছে কেনো! দু’ চোখ ভরা জলে বাবা, মা, দাদাদের মুখগুলো কেমন ঝাপসা লাগছে। কতোবার চোখ পরিস্কার করছে। তবু সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। তার ঘর, বইয়ের আলমারী, হারমোনিয়াম, ঘুঙুর, খেলনার আলমারী, পাতকুয়ো তলা, ছাদের গাছগুলো সব তো পড়ে রইলো। পড়ে রইলো বন্ধুরা, আড্ডা, ফুচকার গন্ধ, আরো অনেক কিছু! সেই শুরু ছেড়ে আসার, ছেড়ে থাকার। আজ এই পরিণত বয়সে কমল বোঝে যা তোমার ছিলো তাকে ছেড়ে দিতে হয়। কমলের মনে পড়ে বিয়ের কিছুদিন পরে বাড়ী এসেছিলো। ফাইনাল ইয়ার অনার্সের পরীক্ষা দিতে। ছোড়দা নিয়ে এসেছিলো। কতো আদর যত্ন। বাবা বাজার থেকে পছন্দের মাছ নিয়ে আসতেন। মা রান্না করতেন থোড় ঘন্ট, বড়ার ডানলা। বিকেলে বাবা নিয়ে আসতেন গরম চপ। কি মজায় দিন কাটতে। এখন বোঝে কমল, নিজের বাড়ীতে সে তখন অতিথি ছিলো। তাই আপ্যায়ন। এমনটাই হয়। জীবনের নতুন নতুন পর্বে নতুন নতুন ভূমিকা। কন্যা থেকে মেয়েবেলা, স্ত্রী, মা,শাশুড়ি, দিদা। প্রতিটা নতুন পর্বে নতুন চরিত্রায়ন। নতুন পারিপার্শ্বিক, নতুন চরিত্রের সংযোজন আবার হারানোও বটে। এতো চরিত্রে অভিনয় করতে করতে কোনটা যে সেরা, সেটা বড়ো জানার সাধ হয় কমলিকার। সে’ সাধ আর এ'জীবনে মিটবে না জানে। যতোই নিঁখুত চরিত্রায়ন করো, ফাঁক কিছু থেকেই যায়। সকলের মন পাওয়া যায় না।

 বাইশের কমলিকা আর আজকের কমলিকার মধ্যে বিস্তর ফারাক। মাঝে দীর্ঘ ব্যবধান। কর্তার ছিলো বদলীর চাকরী। কতো জায়গায় যে সংসার নিয়ে ঘুরেছে তার ঠিক নেই। এক একবার বদলীর খবর আসতো আর সংসার বাক্সবন্দি করে ঠাঁই বদল। নতুন জায়গায় নতুন করে সাজানো। কিন্তু যে জিনিষটা প্রতিবার সবার অলক্ষ্যে ক্ষতবিক্ষত হতো সে কমলের মন। একটা টব থেকে যেমন চারাগাছকে তুলে অন্য টবে লাগানো হয়, তেমন আর কি! প্রথম ক'দিন মন খারাপ লাগতো। খুঁজে বেড়াতো চেনা আকাশ, চেনা পাখির ডাক, উত্তুরে হাওয়া, পুব আকাশের সূর্যোদয়। পুরোনোকে খুঁজতে খুঁজতে একদিন নতুন আকাশ হাতছানি দিয়ে ডাকতো। দখিনা বাতাস এসে সই পাতাতো। এমন করেই দীর্ঘ পথচলা। কমলিকা যখন দীর্ঘ সময় পর কলকাতা ফিরলো, তখন আপনি আর কোপনি। মেয়ে আর ছেলে দু'জনেই প্রবাসে। একজন কর্মসূত্রে, একজন পড়াশোনার জন্য। আবার নতুন করে শুরু। ছেড়ে এসেছে প্রিয় সমুদ্র শহর, অনেক কাছের জনকে। ফ্ল্যাটবাড়ীর ঘেরাটোপে দম বন্ধ হয়ে আসতো। এখানে মন খুলে কথা বলা যায় না। চেনা মানুষ গুলো বেশীরভাগ সুদূরে চলে গেছে। যারা আছে, তাদের কেমন অচেনা লাগে। আমূল পাল্টে গেছে সেই চেনা শহরটা। দম বন্ধ হয়ে আসতো কমলিকার। কিচ্ছু ভালো লাগতো না। মন খুঁজে বেড়াতো চেনা শহরটাকে, প্রিয়জনদের। কলকাতা আসার বছর খানেকের মধ্যে মা চলে গেলেন। বাঁধণ আরো আলগা হলো। কর্তার কাজের জায়গায় শান্তি নেই। সব সময়ে ভয়ে ভয়ে থাকা। মনের মাঝে সবসময় একটা কান্না দলা পাকিয়ে উঠতো। সব ছেড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করতো। সে’ উপায়ও তো নেই। কোথায় যাবে! সংসার গড়তে গড়তে নিজের জীবনের সময়টুকু হাত থেকে বেড়িয়ে গেছে। জীবনের নানান চড়াই উতরাই পার হতে হতে কিছু করার ইচ্ছে টাও হারিয়ে ফেলেছে। ততোদিনে একটা কথা কমলিকা বুঝেছে, নিজের ভালো থাকাটা নিজেকে তৈরী করে নিতে হবে। বুঝেছে যে পথ পেরিয়ে এসেছে সেখানে ফেরা আর হয় না। ক্রমশঃ ওই চিলতে আকাশ বন্ধু হয়ে উঠলো। ওই চিলতে আকাশে ভাসিয়ে দিলো নিজেকে। ওই চিলতে আকাশের রঙ তাকে একটু একটু করে আপন করে নিলো। শরতের শিউলি, বসন্তের শিমূল,রুদ্রপলাশ, কৃষ্ণচূড়া, গ্রীষ্মে বেল, জুঁই, টগর,এরা পালা করে রঙ ভ'রে রাঙিয়ে দিলো কমলকে। এমন করেই বদলে যাওয়া জীবনটাকে মেনে আর মানিয়ে নিলো কমল। এই মানিয়ে নেওয়ার কঠিন কাজটাই জীবনকে সহজ করে তোলে, ছন্দে বেঁধে রাখে। ততোদিনে কর্তা নিজেকে মুক্ত করেছে কাজের জগত থেকে। চাপমুক্ত জীবন। ক্রমশঃ কলকাতার জীবনে নিজেকে মানিয়ে নিলো কমলিকা। মন খারাপকে আগলে রাখলো আপন অন্তরে। ছোটবেলা থেকে খুব বই পড়ার নেশা। প্রবাসে বইয়ের অভাবে পড়ার অভ্যেসটা কমে গেলেও আবার চেষ্টা করতে দোষ কি! আর ছোট থেকে যাকে নিয়ে পথচলা, সেই প্রাণের ঠাকুরকে খুঁজে পেলো গানে গানে। বহু বছরের দূরত্ব সরিয়ে তাঁর সুরকে সঙ্গী করলো। কমলিকার মা যখন চিতার আগুনে পঞ্চভূতে বিলীন হচ্ছেন, সে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো পুণ্যসলিলা গঙ্গার সামনে। এই মানুষটির জন্যই ভালো স্কুলে পড়া, নাচ শেখা, গান শেখা। নিজে যা পারেন নি, তার সমস্তটা তিনি কমলকে দিতে চেষ্টা করেছিলেন। সে'দিন কমল অনুভব করেছিলো নিজের মধ্যেই মা থাকবেন। মা’ কে সে আগলে রাখবে। সব হাহাকার বুকে নিয়ে মা’ কে সে মুক্তি দিয়েছিলো অনন্ত পারাবারে। যেখানে বাবা মা’র অপেক্ষায় রয়েছেন। 

একেবারে নিঃস্ব হয়ে বাড়ী ফিরেছিলো। সেই শূন্যতার হদিস কেউ পায়নি। সেই শূন্যতা আজো বুকে বাজে। তবু চলা থামানো যায় না। এখন তো জীবনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। বেশ জানে, যেকোন সময়, যেকোনো কারুর চলা থেমে যাবে। মান -অভিমান ভাসিয়ে দেয়। মনখারাপ হয়। কিন্তু সামলে নেয়। শুধু আলো ছড়াতে ইচ্ছে করে। আর ইচ্ছে করে রঙে রঙে ভ'রে থাকতে। সময় সুযোগ পেলেই কর্তাগিন্নি বেড়িয়ে পড়ে। চারদিকে কতো রূপ, কতো রস, কতো রঙ। সবটা আগলে রাখতে চেষ্টা করে। এখনতো মুঠোফোনের ক্লিকে মুহুর্তেরা রয়ে যায়। ইচ্ছে হলেই ফিরে দেখা যায় প্রিয় মুহুর্তগুলোকে। এ’ এক বিরাট পাওয়া। জীবন বড্ড দ্রুত ছুটে চলেছে। মুঠোফোনে ক্রমশঃ বাধা পড়ে যাচ্ছে জীবন। পাশাপাশি থেকেও সারাদিনে ক'টাই বা কথা হয় কর্তার সাথে ! কমল কিন্তু আজো সেই বাইশের মনটা'কে মুছে ফেলতে পারে নি। আসলে মোছা যায় না। যতোই চেষ্টা করো, দাগ থেকে যায়। বাইরের দুনিয়াটা বড্ড দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্চে টেকনোলজি, বদলে যাচ্ছে জীবনবোধ। বদলে যাওয়া দুনিয়ায় যতোই তাল মেলাতে চেষ্টা করুক, বেশ বোঝে পিছিয়ে পড়ছে। আগে ছিলো গুগুল। এখন A। এসেছে। জীবনের সবকিছুর উত্তর নাকি তার কাছে পাওয়া যায়। সত্যিই কি এতো সোজা! তাহলে অনুভূতি, জীবনবোধ কিছুই তো আর থাকবে না। তৃষাতুর তপ্ত দুপুরের উদাস মনের উথাল-পাতাল, ভরা বর্ষার শ্রাবণ মেঘের আড়ালে আর হয়তো মন হারাবে না কারুর। কমলিকা ভাবে এই বেশ আছে। অমন অনুভূতিহীন দিন সে দেখতে চায় না। সুখ দুখের চাদর জড়িয়ে, অভিমানের মেঘ সরিয়ে সে বেশ আছে। আজকাল সবসময় নিজের কানে কানে সবসময় বলে আছে, আছে, সব আছে। জীবন জুড়ে এতো গান আছে, এতো প্রাণ আছে, এতো আলো আছে, সব জড়িয়ে সে ভালো থাকবে, আলোয় থাকবে। হুঁস ফেরে মুঠোফোনের মিষ্টি সুরে। দুপুর গড়িয়ে গেছে। আকাশে তখন অস্তগামী সুর্যের আলো। নিজের মনটাকে সেই আলোয় জড়িয়ে রাখে স্বযত্নে। এসে দাঁড়ায় রোজকার যাপনের আঙিনায়। যেখানে তার জীবনদেবতা আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই আলোর খোঁজে নিত্য পথ চলা। কমলিকা মনে মনে প্রণতি জানায় তার জীবন দেবতাকে। 

প্রভু আমার প্রিয় আমার, 
‘সকলি আজ বেজে উঠুক সুরে, প্রভু তোমার গানে, তোমার গানে, তোমার গানে’।।

No comments:

Post a Comment