গল্প
দোলের দিন
লীনা রায়
‘হোলি খেলে রঘুবীরা অবধ মে
হোলি খেলে রঘুবীরা’
ঘুম ভেঙে বুবলি বুঝতে পারে বাড়ির সামনের মাঠ থেকে গান ভেসে আসছে। কাল অনেক রাতে ঘুমিয়েছে। পিসিনের এনগেজমেন্ট পার্টি শেষ করে বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়েছিল। ঘরে এসে ফ্রেশ হয়ে তারপর ঘুমিয়েছে। সকালে বিছানা ছাড়তে একটুও ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু বাবার ডাকাডাকিতে শেষ পর্যন্ত উঠতেই হল।
আজ দোল। কৃষ্ণচুড়া গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে কোকিলটা ডেকেই চলেছে কু…..কুউ… কু..কুউ…কুউউ। ঝকঝকে রোদে ভেসে যাচ্ছে চারদিক। কোকিলের ডাক, সোনালি রোদ, দোলের রং –সব মিলিয়ে মন কেমন করা পরিবেশ। আকাশে সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে। ব্যালকনির দিকের পর্দাটা হাওয়াতে উড়ছে। মাঠে বসন্ত উৎসবের প্যান্ডেল থেকে গান ভেসে আসছে। উৎসবের আবহাওয়াতেও বুবলির মন খারাপ। আজ বাবা চলে যাবে। তার জন্য কি? নাকি- যে কারণটা ও একদম ভুলে যেতে চায় সেজন্য?
কিন্তু আজ যে দোল। এই একটা দিন আর রিভু – ওর সঙ্গে এঁটুলির মত লেপ্টে থাকে। ভুলতে চাইলেও ভুলতে দেয় না। জানালার পর্দাটা হাওয়ায় উড়ছে। আর তার ফাঁক দিয়ে চোখ চলে যায় ব্যালকনি ছাড়িয়ে রাস্তার ওপারে। সামনেই সেই কৃষ্ণচুড়া গাছ। সেদিনও তো এই গাছের নিচেই ওরা সবাই ছিল। সামনে পরীক্ষা, তবুও ও গিয়েছিল। পরীক্ষার সময় বুবলি কোথাও যায় না। সেদিন এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল। কেন রাজি হয়েছিল? সেদিন কেন মানা করেনি?
ভাবনায় ছেদ পড়ে। বাবা এসে ওর চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বলে,
–হ্যাঁ রে, মাঝে তো আর ক’টা দিন। দেখতে দেখতে কেটে যাবে। তাই না?
বুবলি বাবার দিকে তাকিয়ে হাসে। বাবা এসে ওর পাশে বসে। হাতটা মুঠোয় নেয়। বুবলি বাবার কাঁধে মাথা রাখে। আর কিছুক্ষন। তারপর আবার অপেক্ষা। তবে এবার মাঝে মাত্র কিছুদিন। পিসিনের বিয়ের সময় তো বাবা আসছেই। খানিকক্ষন বসে থেকে বাবা উঠে পড়ে। এয়ারপোর্টে যাবার সময় হয়ে এলো। তৈরি হতে হবে।
মাত্র পাঁচ দিন আগেই তো বাবা এসেছিল। পিসিনের এনগেজমেন্টের জন্য। এসে থেকেই ছুটোছুটি লেগেই ছিল। নেমন্তন্ন, কেনাকাটা – সব একা হাতে সামলেছে। কাল রাতে বেশ জমজমাট অনুষ্ঠান হয়েছে। আত্মীয় স্বজন, পিসিনের বন্ধু, বাবার বন্ধু, পাড়া পড়শী অনেকেই এসেছিল। বুবলির বন্ধুরাও এসেছিল। খাওয়া দাওয়ার পর্ব মিটে যাবার পর গান, গল্প, নাচে জমে গিয়েছিল পার্টি। বুবলি ওখানে থেকেও বার বার হারিয়ে যাচ্ছিল। প্রতিদিন ভালো থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে বুবলি। ওই দিনটি যদি ক্যালেন্ডারে না থাকত বুবলির জীবনটা কি অন্যরকম হত?
সেই দিন থেকে বুবলির বন্ধুরা ওকে আগলে রেখেছে। বুবলি ওদের সঙ্গে থেকেও থাকে না। ওরা হয়ত বোঝে। তবুও আসে। গতকাল নীল আর অনি ডান্স করেছে। সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ওদের দেখছিল। বুবলি কিন্তু রিভুকে মিস করছে খুব। রিভুও তো ওদের সব অনুষ্ঠান একাই মাতিয়ে রাখত। খুব অভিমান হয় বুবলির। কেন যে এভাবে সব বদলে যায়!
বাবা কিছুক্ষনের মধ্যে তৈরি হয়ে বুবলির ঘরে আসে। ওকে আদর করে। তারপর দুজনে ঠাম্মামের ঘরে আসে। ঠাম্মমকে প্রণাম করে বাবা বেরিয়ে যায়।
সাড়ে এগারোটায় ফ্লাইট। বাবা চলে যাবার পর বুবলি ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। নরম নরম সাদা মেঘ – ভারি সুন্দর। হাত বাড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। পাড়ার সবাই একে একে মাঠে আসছে। প্রতিবারের মত এবারও বসন্ত উৎসব হবে। নাচ, গানের সঙ্গে জমিয়ে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা। আর সঙ্গে দেদার হোলি খেলা।
পিসিন কিন্তু এখানে থাকবে না। রাহুল আঙ্কেল নিতে এসেছে। বন্ধুদের সঙ্গে ডায়মন্ড হারবার যাচ্ছে ওরা। ওখানেই ওদের হোলি পার্টি। ফিরতে রাত হবে। এনগেজমেন্টের পর পিসিনকে যেন আরো বেশি সুন্দরী লাগছে। আজ ওরা দুজনেই সাদা টি -শার্ট পরেছে। সাদা আউটফিটে দুজনকে বেশ মানিয়েছে।
আজকাল হোলিতে সাদা ড্রেস পরার চল। কিন্তু সেবার ওরা সব বন্ধুরা কালো টি শার্ট পরেছিল। সেটাও রিভুর প্ল্যান ছিল। বুবলি শুনেছে কালো রং নাকি অশুভ। আচ্ছা, কালো না পরলে কি সব অন্য রকম হত সেদিন? বুবলি তো জানত। তবুও কেন পরেছিল?
ঠাম্মাম ডাকছে। ঘরে এসে দেখে নারকেল তেল, বডি লোশন নিয়ে বসে আছে ঠাম্মাম। প্রতিবার দোলের দিন বুবলির চুলে তেল আর গায়ে লোশন লাগিয়ে দেয় ঠাম্মাম। বুবলির চুলে তেল লাগাতে একটুও ভালো লাগে না। কিন্তু ঠাম্মামকে মানা করতে পারে না। তেল, লোশনের পর্ব চুকলে বুবলি নিজের ঘরে আসে। আলমারি থেকে সেই কালো টি শার্টটা বের করে। একদম সেদিনের মতো করে সাজে।বাবার এনে দেয়া আবিরের প্যাকেটগুলো ব্যাগে ভরে নেয়। শুধু লাল আবিরের প্যাকেটটাকে ড্রেসিং টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখে।
আবার এসে ব্যালকনিতে দাঁড়ায়। এবার বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা। ওরা এলে সবাই মিলে মাঠে যাবে। সবাই তিতলির বাড়িতে জড়ো হবে। তিতলিদের বিশাল বাড়ি। ওদের বাড়িতেই স্কুটি , বাইক রেখে তারপর একসঙ্গে মাঠে আসবে। তার আগে বুবলিকে ডেকে নেবে।
সেদিনও ও অপেক্ষা করছিল। একই রকম ভাবে, এখানে দাঁড়িয়ে। বার বার সময় দেখছিল। ফোন করছিল রিভুকে। সেটাই যে রিভুর সঙ্গে ওর প্রথম হোলি। তর সইছিল না বুবলির। আসতে একটু দেরি হয়েছিল বলে রাগ করে কথা বলেনি অনেকক্ষন।
সেদিন যদি বুবলি রাগ না করত, সাবধানে রাস্তা পার হত, তাহলে কি সব কিছু অন্যরকম হত? অথচ আজ বুবলি অপেক্ষা করছে– কোন তাড়া নেই, বিরক্তি নেই। হাতে ফোন অব্দি নেই। বন্ধুরা আসবে তাই ওকে যেতে হবে। ব্যস, এটুকুই।
ঠাম্মামের হাঁটুতে ব্যথা। কষ্ট হয় হাঁটতে। তবুও ব্যালকনিতে আসে। হাতে আবির। বুবলির কপালে আবির ছুঁইয়ে দেয়। তারপর বুবলিকে ঘরে নিয়ে যেতে যেতে বলে,
–শুধু শুধু বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ঘরে এসে বস। ওরা এলে ঠিক ডেকে নেবে। তোকে ফেলে কিছুতেই যাবে না।
ঠাম্মাম খাটে বসে। বুবলিকে বসতে ইশারা করে। ঠাম্মামের গা ঘেঁষে বসে বুবলি। ঠিক ছেলেবেলার মতো। ঠাম্মাম বুবলির পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কত কথা বলে। আগে দোলের দিনে কী রান্না হত, বুবলি ছেলেবেলায় রং দেখে কেমন ভয় পেত –সেসব গল্প। অনেকবার শুনেছে যদিও , তবুও বড় ভাল লাগছে শুনতে। বুবলি ভাবে সেদিন যদি ও এমনি করে ঠাম্মামের কাছে বসে থাকত, তাহলে সব কিছু সত্যিই অন্য রকম হত।
প্রতিবার দোলের রঙের সঙ্গে বুবলির মন খারাপ জড়িয়ে যায়। আজ পাড়ায় সব্বাই কত মজা করবে। অথচ বাবা আজই চলে গেল। একদিন বেশি ছুটি নিলে কী এমন ক্ষতি হত! অফিসের কাজের চাপ, বাবার ছুটির অভাব –– এত কিছু বুবলি বোঝে না। বুঝতেও চায় না। শুধু এটা বোঝে বাবা কাছে থাকলে মন খারাপটা খানিকটা হলেও দূরে থাকে। কাছে খুব একটা ঘেঁষতে পারে না।
সেই দোলের দিনের কথা। হাসপাতালে জ্ঞান ফিরে আসার পর বেডের পাশে বাবাকে দেখেছিল বুবলি। উস্কো খুশকো চুল, লাল চোখ। বাবাকে এমন অগোছালো আগে কোনদিন দেখেনি বুবলি। ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
––কী হয়েছে বাবা?
বাবা কোন কথা বলেনি। শুধু ওকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল। ঠাম্মাম, পিসিন, ওর বন্ধুরা সবাই ওকে দেখতে এসেছিল। আসেনি শুধু রিভু। বন্ধুদের কাছে রিভু কোথায় জানতে চেয়েছিল। কিন্তু ওরা এড়িয়ে গেছে। এরপর বাবা, ঠাম্মাম, পিসিন সব্বাইকে জিজ্ঞেস করেছে। বন্ধুদের মতোই ওরা সবাই এড়িয়ে গেছে। অথচ কেবিনের কাঁচের দরজার ওপারে মাঝে মাঝে রিভুর মুখ ও দেখেছে। এ কথা যখনই বলেছে সবাই অদ্ভুত চোখে ওকে দেখেছে। সেটা ভয়, না অবিশ্বাস সেটা অবশ্য বুবলি বোঝেনি।
তারপর একদিন ডক্টর আঙ্কেল ওর কাছে সেই দোলের দিনের গল্প শুনতে চায়। কৃষ্ণচুড়া গাছের নিচে ওদের জমায়েত অব্দি বুবলি বলেছিল। ডক্টর আঙ্কেল তারপর কী হয়েছিল জানতে চেয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে বাকি আর কিছু মনে পড়েনি বুবলির। ডক্টর-এর কাছেই জেনেছিল চলন্ত গাড়ির সামনে থেকে রিভু ওকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিল। হিরোর মতো ওকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু নিজেকে বাঁচাতে পারেনি রিভু।
বুবলি বিশ্বাস করেনি। এরপর সবাই বলেছে। রিভুর মা, বাবা হাসপাতালে ওকে দেখতে এসে একই কথা বলেছে। আচ্ছা, কারো বাবা, মা ছেলেকে নিয়ে এত বড় মিথ্যে বলতে পারে? বোধহয় না।
কিন্তু বুবলি যে মাঝে মাঝেই রিভুকে দেখে। আর এটা কেউ বিশ্বাস করে না। সেজন্য ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছে বাড়ির লোকেরা। ঠাম্মাম ওর হাতে লাল সুতোয় তাবিজ বেঁধে দিয়েছে। আরও কত কিছু। শেষ পর্যন্ত বুবলি এটা বুঝেছে ওকে চুপ থাকতে হবে। রিভুর কথা ও আর কাউকে বলবে না। রিভু আছে সেটা প্রমান করার দায়িত্ব ওর নয়।
বুবলি রিভুকে নিয়ে আর কিছু বলে না। রিভু ওর সঙ্গে কথা বলে না। কিন্তু ওকে দেখতে পায় বুবলি। রিভুর জন্য পড়াশুনোটা আর এগোল না ওর। পড়তে বসার পরেই রিভুকে মনে পড়ে। জানালার বাইরে ওকে খোঁজে। বই খোলা থাকে, পড়া আর হয়ে ওঠে না। কিন্তু ও যখন ছবি আঁকে, রিভু লক্ষ্মী ছেলে হয়ে পাশে বসে থাকে। কিন্তু লাল রং দেখলেই ওর গা গুলোয়। সেজন্য শুধু পেন্সিল স্কেচ করে। সেদিন যদি বুবলি ঘরের বাইরে পা না রাখত তাহলেও কি রিভু এভাবে লুকিয়ে থাকত?
কিছুক্ষনের মধ্যেই দল বেঁধে সবাই চলে এলো। এর মধ্যেই রং মেখে সব ভুত! বুবলি নিচে নামতেই হই হই করে ওকেও সবাই রং মাখিয়ে দেয়। বুবলি ব্যালকনির দিকে তাকায়। দেখে ঠাম্মাম ওদের দেখে হাসছে। বুবলিও হাসে।
রাস্তা পেরিয়ে মাঠে আসে। মাঠের ঘাসে পা দিয়েই বাড়ির দিকে তাকায় বুবলি। ঠাম্মাম ঘরে চলে গেছে। রাস্তা দিয়ে একদল ছেলে প্রচন্ড গতিতে পর পর বাইক নিয়ে আসছে। বুবলি স্পষ্ট দেখে রিভু মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। এক ঝটকায় সেই দোলের দিনের সব কথা মনে পড়ে যায় বুবলির। আবারও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। তফাৎ শুধু সেদিন ও রাস্তায় ছিল। আর রিভু ছিল রাস্তার এ পাশে। বুবলি আর কিছু ভাবতে পারে না।
ও ছুটে গিয়ে রিভুকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চায়। ঠিক যেমন তিন বছর আগে রিভু ওকে সরিয়ে দিয়েছিল।
এবার রিভুর মতোই বুবলিও নিজেকে সরাতে পারে না। বাইকের ধাক্কায় ছিটকে মাটিতে পড়ে যেতে যেতে বন্ধুদের চিৎকার কানে আসে। উঠতে চেষ্টা করে। পারে না। মাথা থেকে গরম জলের মত কিছু গড়িয়ে পড়ছে। ভিজিয়ে দিচ্ছে ওর সারা শরীর। চোখ খুলতে চেষ্টা করে। সেটাও পারে না। চারদিকে বড্ড চিৎকার, চেঁচামেচি। ওর নাম ধরে কেউ কি ডাকছে?
ধীরে ধীরে সব শব্দগুলো হারিয়ে যায়। বসন্ত উৎসবের গান, বন্ধুদের চিৎকার – সব কিছু। আর কী আশ্চর্য, তিন বছর ধরে জমে থাকা কষ্টটা হঠাৎ করেই ভ্যানিশ হয়ে যায়। পালকের মত হালকা লাগছে নিজেকে। বুবলির চোখ ঘুমে ভারি হয়ে আসে। গাঢ় ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে স্পষ্ট দেখতে পায় রিভুকে। এলোমেলো চুল, কালো টি শার্ট গায়ে। রিভু হাসছে। ওর দুধ সাদা দাঁতে সোনালি রোদ পিছলে যাচ্ছে। হাসতে হাসতে বুবলির দিকে এগিয়ে আসছে রিভু।
No comments:
Post a Comment