Friday, May 1, 2026


 

ভ্রমণ 

ব্যাঙ্গালোরে কয়েক দিন 

চন্দ্রানী চৌধুরী 

ব্যাঙ্গালোরের ঘোরার জায়গা বলতে বেশির ভাগই পার্ক। কিন্তু আমার প্রিয় বিষয় যেহেতু ইতিহাস, সেজন্য আমি ঐতিহাসিক স্থান খুঁজে বের করার  চেষ্টা করেছি। 

আমরা প্রথম দিন গেলাম ব্যাঙ্গালোর প্যালেস দেখতে। ও হ্যাঁ আগেই জানিয়ে রাখি আমরা যেখানে ছিলাম সেই জায়গাটির নাম কেম্পাগৌরা রোড, মাইসোর ব্যাঙ্ক সার্কেল; ভূমিকা থিয়েটারের একদমই কাছে। এই জায়গাটি সেন্ট্রাল ব্যাঙ্গালোরে। ওখান থেকে ব্যাঙ্গালোর প্যালেস মাত্র ৩ কিলোমিটার। 

ওখানে পৌঁছে দেখি লোকে লোকারণ্য। শুনলাম এখন প্যালেসের একটি অংশ বিয়ে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। সেদিন বিয়ের বিশাল আয়োজন চলছিল। আমরা টিকিট কেটে পাশের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। 
বেঙ্গালুরু প্যালেস বেঙ্গালুরু শহরের প্রধান আকর্ষণ। ভারতের কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতে ইংল্যান্ডের উইন্ডসর প্রাসাদের অনুকরণে নির্মিত এই রাজপ্রাসাদ। প্রবেশদ্বার থেকে এক সুবিশাল লন পেরিয়ে মূল প্রাসাদে পৌঁছালাম। প্রথম দেখাতেই উঁচু টাওয়ার আর রঙিন কাঁচের খোলা অংশগুলো দেখে মনে হচ্ছিল আমি উইন্ডসর দুর্গের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। প্রাসাদটি টিউডর এবং স্কটিশ গথিক স্থাপত্যের একটি মিশ্রণ। এটি ১৮৭৪ সাল থেকে ১৮৭৮ সালের মধ্যে মহীশূরের তরুণ মহারাজা চামরাজেন্দ্র ওয়াদিয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল। এটি মূলত ওয়াদিয়ার রাজবংশের বসবাসের জন্য বেঙ্গালুরুর সেন্ট্রাল হাই স্কুলের প্রথম অধ্যক্ষ রেভারেন্ড জন গ্যারেটের মালিকানাধীন একটি এলাকায় তৈরি করা হয়েছিল । 
ওয়াদিয়াররা কাগজে কলমে কেবল মহীশুরের শাসক ছিলেন। প্রকৃত প্রশাসন ব্রিটিশদের হাতেই ছিল।  প্রকৃতপক্ষে, তারা ছিলেন নাবালক রাজার জন্য নিযুক্ত অভিভাবক এবং তাঁর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন।

প্রাসাদটিতে মোট ৩৫টি ঘর আছে। এটি কাঠ ও গ্রানাইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। প্রাসাদটিতে দরবার হল, বলরুম, এবং থ্রোন রুম সহ বিভিন্ন কক্ষ রয়েছে, যা রাজকীয় অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহার করা হতো।রাজবংশের লোকেদের ব্যবহৃত জিনিস এখানে রাখা হয়েছে। প্রাসাদে রাজ পরিবারের সদস্যদের কয়েক হাজার ছবি রয়েছে। মহীশূরের মহারাজা একটি প্রতীকী অস্ত্র দিয়েছিলেন। প্রতীকটিতে ওয়াদিয়ারদের প্রতীক রয়েছে যা গন্ডা ভেরুন্ডা নামে পরিচিত। এটি কেন্দ্রে দুই মাথাওয়ালা পাখি। এছাড়া আছে হাতির মাথা এবং সিংহের দেহ ইত্যাদি মহারাজার শিকার করা নানা প্রানী।

বেঙ্গালুরু প্রাসাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল এর বলরুম। এর কাঠের সিলিং এ রয়েছে সুন্দর ঝাড়বাতি । বলরুমটি তার রঙ এবং আলোর মিশেলে বেশ চিত্তাকর্ষক।ওপরে যাবার জন্য আছে একটি সাধারণ কাঠের সর্পিল সিঁড়ি। তবে এর ওপরে সুন্দর জিনিসপত্র রয়েছে। এককোণে রাখা হয়েছে সুন্দর ল্যাম্প এবং প্রাচীন ফুলদানি। প্রাসাদের বিশেষ আকর্ষণ হল দরবার হল। এটি সত্যিই খুব সুন্দর। এর অসাধারণ ঝাড়বাতি, হলুদ ও সোনালী কাজ, রঙিন কাচ এবং রাজকীয় আসবাবপত্র সব মিলিয়ে অপূর্ব লাগছিলো। তবে এটিকে পাশ থেকে দেখতে হবে। কারণ এখানে ঢুকতে দেওয়া হয় না। এখানেই রঙিন কাচের জানালাগুলো দেখা যায়। দরবার হলে মহিলাদের জন্য পর্দা দিয়ে ঢাকা একটি বিভাজন ছিল।

প্রাসাদের করিডোরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবারের রঙিন বা সাদা কালো ছবি আছে। সেই সাথে আছে মহারাজদের আঁকা নানা ছবি। এর মধ্যে রয়েছে রাজা রবি বর্মার আঁকা মূল্যবান ছবি। নানারকম সাইড টেবিল, ড্রেসিং টেবিল,  মহারাজার কয়েকটি লেখার ডেস্ক সেখানে রয়েছে। প্রশস্ত খোলা গথিক এবং টিউডর স্টাইলে খোদাই করা করিডোর গুলো দৃষ্টিনন্দন। প্রাসাদের মহারানীর মহলে উঠোনের মাঝখানে একটি ঝর্ণা আছে । তবে বর্তমানে সেটা শুকিয়ে গেছে। করিডোরে ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে রাজ পরিবারকে দেওয়া নানা উপহার রাখা আছে। এছাড়া ওয়াদিয়ার বেঙ্গালুরু প্রাসাদে অনেকগুলো রঙিন ঝাড়বাতি রাখা আছে। এই ঝাড়বাতিগুলো বেঙ্গালুরু প্রাসাদের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এছাড়াও মহারাজার অফিস, রাজপরিবারের পোশাক, তাদের নানা রকম উৎসবের পোশাক,  প্রাসাদের সামনের মনোরম বাগান ঘুরে ঘুরে দেখতে পাওয়া যায়। ঘরগুলি সরকারি এবং বেসরকারি দুই ভাগে বিভক্ত। বাঁ দিকের প্রবেশদ্বার দিয়ে জনসাধারণ টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশ করতে পারে। ডানদিকের অংশটি মহারাজা এবং তাঁর পরিবারের বসবাসের জন্য। তবে এটি ভিতর থেকে প্রাসাদের জনসাধারণের এলাকার সাথে যুক্ত। চিত্তাকর্ষক এই প্রাসাদটি ২০০৫ সাল থেকেই  জনসাধারণের জন্য  খুলে দেওয়া হয়েছে। তার আগে এখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। এখন এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে।

ব্যাঙ্গালোর প্রাসাদ শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি বেঙ্গালুরুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক এবং দক্ষিণ ভারতের রাজকীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি প্রতীক। বেঙ্গালুরু প্যালেস গ্রাউন্ডে বেশ কয়েকটি বিখ্যাত কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে।বেঙ্গালুরুতে ওয়াদিয়ার প্যালেসে অনেক জনপ্রিয় সিনেমার শুটিংও  হয়েছে।

ব্যাঙ্গালোর প্রাসাদের বর্তমান মালিক হলেন ওয়াদিয়ার রাজবংশের বংশধর শ্রী যদুবীর কৃষ্ণদত্ত চামরাজ ওয়াদিয়ার। তবে প্রাসাদের তত্ত্বাবধান এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন প্রমোদ দেবী ওয়াদিয়ার যিনি মহীশূরের বিখ্যাত রাজপরিবারের বংশধর। প্রাসাদের মালিকানা নিয়ে কিছু আইনি বিতর্ক রয়েছে, তবে বর্তমানে এটি ওয়াদিয়ার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। 

পরদিন আমরা সকালেই বেড়িয়ে গেলাম টিপু সুলতানের সামার প্যালেসের উদ্দেশ্যে। ব্যাঙ্গালোরের স্থাপত্য গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বেঙ্গালুরু মেডিকেল কলেজের কাছে কৃষ্ণ রাজেন্দ্র মার্কেট মেট্রো স্টেশনের একদম কাছেই অবস্থিত 'টিপু সুলতানের সামার প্যালেস' বা "গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ"। আমরা যেখানে আছি সেখান থেকে টিপু সুলতান সামার প্যালেসের দূরত্ব ৪ কিলোমিটার। 

এটি ইন্দো ইসলামিক স্থাপত্যের এক অসাধারণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। এটি গ্রীষ্মকালে মহীশূরের শাসক টিপু সুলতানের জন্য শীতল আরামদায়ক বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করা হত। টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর এই প্রাসাদটিকে ইংরেজরা তাদের সচিবালয় হিসেবে ব্যবহার করে। বর্তমানে এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।  টিপু সুলতানের সামার প্যালেসের ইতিহাস খুবই উল্লেখযোগ্য। টিপু সুলতানের বাবা হায়দার আলি ওয়াদিয়ারদের থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার পর প্রশাসনিক কাজকর্ম দেখাশোনা করার জন্য বেঙ্গালুরু চলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাই ১৭৭৮  খ্রীষ্টাব্দে  তিনি বেঙ্গালুরু দুর্গের দেওয়ালের ভেতরে প্রাসাদের নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন।  কিন্তু প্রাসাদের নির্মাণ কাজ শেষ হবার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

পরবর্তী কালে ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে টিপু সুলতান এর নির্মাণ কাজ শেষ করেন এবং এখানে রাজ্যের সমস্ত প্রশাসনিক কাজকর্ম হত। আবার অনেকের মতে টিপু সুলতান এটিকে গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। প্রাসাদের চারপাশে একটি মনোরম বাগান রয়েছে। সামনের বিশাল লন পেরিয়ে আমরা মূল প্রাসাদে পৌঁছালাম।  প্রাসাদের সামনের অংশটি কর্নাটক সরকারের উদ্যান পালন বিভাগ রক্ষনাবেক্ষণ করে।

দোতলা আয়তাকার প্রাসাদটি সম্পূর্ণ সেগুন কাঠের তৈরি। এটি একটি নীচু পাথরের প্ল্যাটফর্মের ওপরে নির্মিত প্রাসাদ। এখানে সুন্দর খিলান, স্তম্ভ, বারান্দায় খোদাই করা নানা ছবি রয়েছে যা সে যুগের স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন। প্রাসাদের ছাদে ও দেয়ালগুলিতে কাঠের খোদাই করা সুন্দর ফুলের নকশা ঐতিহাসিক ঘটনা এবং যুদ্ধের ছবি দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়েছে।  তবে এখন সেগুলো অনেকটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উপরের তলায়  পূর্ব ও পশ্চিম দিকে খোলা বারান্দা আছে যেখানে টিপু সুলতান দরবার পরিচালনা করতেন। নীচ তলায় চারটি ছোট ছোট ঘর সম্ভবতঃ সেগুলো মহিলাদের জন্য আর একটি বড় হলঘর রয়েছে। রয়েছে বিশাল সিঁড়ি যা মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের বিশেষ নিদর্শন। প্রাসাদে মোট ১৬০ টি কক্ষ রয়েছে । টিপু সুলতানের তৈরি একটি বিশাল সিংহাসনের ছবি রয়েছে। সোনার চাদর ও  মূল্যবান পান্নায় মোড়া এই সিংহাসন রাজা টিপু ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করেই  ব্যবহার করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর, ইংরেজরা সিংহাসনটি ভেঙে ফেলে এবং এর অংশগুলি নিলামে বিক্রি করে। এই প্রাসাদটি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে টিপু সুলতানের জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। 

সামার প্যালেসে নীচতলায় একটি জাদুঘর আছে যেখানে টিপু সুলতান হায়দার আলি এবং তার পরিবারের ব্যবহৃত পোশাক, মুদ্রা, অস্ত্র, রূপার পাত্র, মুকুট রয়েছে। এছাড়াও আছে দুশো বছরের পুরোনো তৈলচিত্র, বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের চিত্র যা টিপু সুলতানের রাজকীয় জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে। রাজাকে দেওয়া বিভিন্ন উপহার সামগ্রী ও সেখানে রাখা হয়েছে। এখানে রাখা ফ্রেস্কো গুলো ইংরেজদের বিরুদ্ধে টিপু সুলতান এবং হায়দার আলির  যুদ্ধের বর্ননা দেয়। টিপু সুলতানের ডিজাইন করা একটি বাদ্যযন্ত্র আছে । এটাতে বাঘের নাম লেখা আছে যা একজন ব্রিটিশ সৈন্য কে হত্যা করে। এটাতে ফুঁ দিলে বাঘের গর্জন আর ইংরেজ সৈন্যর কাতর কন্ঠস্বর ভেসে আসে।  অবশ্য এখানে অরিজিনাল বাদ্যযন্ত্র টি নেই। অরিজিনাল বাদ্যযন্ত্র টি লন্ডনের জাদুঘরে রাখা আছে। 

টিপু সুলতানের সামার প্যালেস থেকে বেরিয়েই দেখি পাশেই বিশাল বালাজি মন্দির। কিন্তু মন্দিরের গেট সন্ধ্যেবেলায় খুলবে। কিন্তু আমরাও সন্ধ্যে পর্যন্ত থাকতে পারবো না। তাই এদিক ওদিক হাঁটতে লাগলাম। কিছুটা গিয়েই দেখলাম ব্যাঙ্গালোর মেডিকেল কলেজ। ছবি তুলে রাখলাম। মোবাইল খুলে খুঁজতে গিয়ে দেখলাম কাছেই ব্যাঙ্গালোর ফোর্ট। ব্যস গুগল ম্যাপ খুলে রওনা দিলাম। টিপু সুলতান সামার প্যালেসের থেকে ফোর্টের দূরত্ব মাত্র ৫০০ মিটার। আমরা সহজেই পৌঁছে গেলাম।

ষোড়শ শতকে নির্মিত ব্যাঙ্গালোর ফোর্ট বেশ কয়েকটি সাম্রাজ্যের উত্থান পতনের সাক্ষী। ১৫৩৭ সালে ব্যাঙ্গালোর ফোর্টটি মাটির দুর্গ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। এটি নির্মাণ করেছিলেন আধুনিক ব্যাঙ্গালোরের প্রতিষ্ঠাতা কেম্পে গৌড়া প্রথম। মাটির দুর্গটির চারপাশে একটি পরিখা এবং নয়টি বড় দরজা ছিল। কেম্পে গৌড়ার শাসন কালে এই দুর্গটি খুবই সমৃদ্ধ ছিল। এই দুর্গের চারপাশের এলাকাকে বেঙ্গালুরু পিট হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন যা তার রাজধানী  ছিল।

১৭৬১ সালে রাজা হায়দার আলি মাটির দুর্গকে পাথরের দুর্গ হিসেবে গড়ে তোলেন। এবং ১৮ শতকে তার ছেলে টিপু সুলতান এটির আরও উন্নতি করেন।  টিপু সুলতানের আমলে ইংরেজরা এই দুর্গের কিছু অংশ নষ্ট করে দিয়েছিল। পরবর্তীতে টিপু সুলতান দুর্গ টি পুনর্নিমান করেন। পরবর্তী কালে তৃতীয় মহীশূর যুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা আবার বেঙ্গালুরু দুর্গ অবরোধ করে। তখন এই দুর্গ ছিল টিপু সুলতানের একটি শক্ত ঘাঁটি। মহীশূর সেনাবাহিনীর প্রতিরোধ সত্ত্বেও প্রায় ২০০০ মহীশূর সৈন্যের মৃত্যু হয়। এমনকি এই যুদ্ধে টিপু সুলতানের ও মৃত্যু হয়।  ব্রিটিশরা দিল্লী গেটের কাছে এসে দেয়াল ভেঙ্গে এটি দখল করে এটিকে সামরিক ঘাঁটি ও কারাগার হিসেবে ব্যবহার করে। 

আজ আছে শুধু দুর্গের দিল্লী গেট আর দুর্গের একটি অংশমাত্র। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর যেখানে ব্রিটিশরা দুর্গের দেওয়াল ভেঙ্গেছিল তার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে আছে একটি মার্বেল পাথরের ফলক। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত  দুর্গটি ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। স্বাধীনতার পর এই দুর্গটিকে স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
ব্যাঙ্গালোর ফোর্ট প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এটি একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ যা ঘুরে দেখে আমরা সুদূর অতীতে ফিরে গেলাম। 

দুর্গটি ডিম্বাকৃতির আর এটি মোট ১৮ একর এলাকাজুড়ে পুরু দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত। এর দুটি প্রধান গেট রয়েছে। একটি দিল্লী গেট আরেকটি মহীশূর গেট। দিল্লী গেট হল মেইন গেট যেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হবে। এর গায়ে লোহার কাঁটাযুক্ত একটি কাঠের দরজা রয়েছে। মহীশূর গেটটি ছোট। এই দরজা দিয়ে প্রধানতঃ রাজপরিবারের সদস্য ও সেনাবাহিনীরা যাতায়াত করতেন। দুর্গটিতে ২৬ টি ঘাঁটি রয়েছে যেগুলো প্রতিরক্ষা ও নজরদারির জন্য ব্যবহৃত হত। এখানে কতগুলো ওয়াচ টাওয়ারও রয়েছে যেখান থেকে পুরো শহর দেখা যায়।

আমরা দুর্গে প্রায় আধ ঘন্টা ছিলাম। ঐতিহাসিক স্থাপত্য কলার প্রতি আমার আকর্ষণ সবসময়ই। তাই ওখানে গিয়ে ভেতরের শান্ত পরিবেশ উপভোগ করার সাথে সাথে এই দুর্গের ইতিহাস নানা জনের কাছে জানার চেষ্টা করছিলাম। দুর্গের ভেতরে একটি গনেশ মন্দির আছে যা কেম্পেগৌড়া প্রথম নির্মাণ করেছিলেন। এই মন্দির টি শহরের পুরোনো মন্দির গুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শোয়ের আয়োজন করা হয় যেখানে একটুকরো অতীত ইতিহাস মনকে নাড়া দিয়ে যায়। ফোর্ট থেকে বেড়িয়ে পাশেই কৃষ্ণ রাজেন্দ্র মার্কেট মেট্রো স্টেশন। ব্যস এবার মেট্রোতে উঠে পরের স্টেশন চিকপেট মেট্রো স্টেশনে নেমে গেলাম। ওখান থেকে বিশাল সিল্ক মার্কেট ঘুরে হোটেলে ফিরে এলাম।

পরের দিন আমরা প্রথমেই গেলাম লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেনে। আমাদের হোটেল থেকে দূরত্ব ৫.৫ কিলোমিটার। এখান থেকে সবচেয়ে কাছের মেট্রো স্টেশন নাদাপ্রভু কেম্পেগৌড়া স্টেশন (ম্যাজেস্টিক) আমরা মেট্রোতে করে পৌঁছে গেলাম লালবাগ। মেট্রো স্টেশনের একদম পাশেই বোটানিক্যাল গার্ডেন। একটু হেঁটেই পৌঁছে গেলাম ওখানে। পৃথিবীর বৃহত্তম বোটানিক্যাল গার্ডেনগুলোর মধ্যে একটি হলো "লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেন"। এটি ৪.৫ কিলোমিটার লম্বা দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এটি দক্ষিণ ভারতের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি। লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেন হল দক্ষিণ বেঙ্গালুরুর ২৪০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত একটি বাগান যা প্রায় ২৫০ বছরের পুরোনো। ১৭৬০ সালে এটি মহীশূরের রাজা হায়দার আলী ৪০ একর জমি নিয়ে একটি প্রাইভেট রাজকীয় বাগান তৈরি করেছিলেন। পরবর্তী কালে টিপু সুলতান এই বাগান তৈরি করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ১৮৫৬ সালে ইংরেজরা এটিকে আরো বড় করে ১২০ একর জমির ওপরে বোটানিক্যাল গার্ডেন করেন।  তবে টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর এটি তৈরি করার কাজ শেষ করেন ব্যাঙ্গালোরের প্রতিষ্ঠাতা কেম্পে গৌড়া। ষোড়শ শতকে বেঙ্গালুরুর প্রতিষ্ঠাতা কেম্পে গৌড়া একটি ওয়াচ টাওয়ারের পাশে এটি তৈরি করেছিলেন। ডঃ এম এইচ মারিগৌরার সময় থেকে এটি ২৪০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে। 

বাগানটি তৈরি করতে ২২ বছর সময় লেগেছিল। বাগানটি এখনোও যত্ন সহকারে রক্ষনাবেক্ষণ করা হয়। এই বাগানটি মুঘল রীতিতে নকশা করা হয়েছিল। লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেনে চারটি প্রবেশদ্বার। আমরা ৪নং গেট দিয়ে বাগানে ঢুকেছিলাম। পরে বুঝতে পারলাম ১ নং বা ২ নং গেট দিয়ে বাগানে ঢুকলে ঘুরতে সুবিধে হয়। ওখানে পুরো বাগান ঘুরে দেখার জন্য ব্যাটারি চালিত গাড়ি থাকে। আরাম করে পুরো বাগান ঘুরে দেখা যায়। বাগানে এক হাজারেরও বেশি নানা রকম গাছ, বনসাই গাছ, নানা প্রজাতির পাখি রয়েছে। এখানে নানা ধরনের মশলা ও রেশমের গাছ রয়েছে, ওখানে একটি উঁচু টিলা আছে যার ওপরে একটি মন্দির রয়েছে।  খুব বেশি উঁচুতে নয় বলে হেঁটেই মন্দিরে পৌঁছোনো যায়। টিলার উল্টোদিকে রয়েছে বনসাইয়ের বাগান। সেখানে অজস্র বনসাইয়ের গাছ রয়েছে। আমরা সেখানে অনেকক্ষণ ধরে ঘুরে এলাম।

এই বাগানের সবচেয়ে সুন্দর এবং দর্শনীয় স্থান হল গ্লাস হাউস। অনেক দিন আগে একবার দক্ষিণ ভারত ঘুরতে এসে অল্প সময়ের জন্য ব্যাঙ্গালোরের শুধু গ্লাস হাউস দেখেছিলাম। এবার ভালো করে ঘুরে ঘুরে দেখলাম, ফটো তুললাম। এটি লন্ডনের ক্রিস্টাল প্যালেসের অনুকরণে তৈরি। ছবি তোলার জন্য সেখানে ভিড় জমে উঠেছিল।  এর কাছেই রয়েছে বাসস্ট্যান্ড। আরেকটু এগিয়ে গেলেই দেখা যায় লোহার ফ্রেমের ওপরে গাছে মোড়ানো নানা পশু, পাখি। রয়েছে লালবাগ লেক, অনেক পুরোনো গাছ। এখানে কাঠবেড়ালিরা  এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছুটে বেড়াচ্ছে, লেকের পাশের রাস্তায় ধারে কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়া গাছ ফুলে ভরে আছে; সেখানে সুদৃশ্য বসার জায়গা রয়েছে। আমরা পুরো বাগান টা হেঁটে হেঁটেই ঘুরে ছিলাম। মনমুগ্ধকর এই বাগানে হেঁটে ঘুরলে ভালো মতো উপভোগ করা যায়।

লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে বের হয়ে আমরা মেট্রোতে চলে গেলাম কুব্বন পার্ক। "গার্ডেন সিটি" ব্যাঙ্গালোরের একটি জনপ্রিয় পার্ক হল কুব্বন পার্ক। একে চামারাজেন্দ্র পার্ক ও বলা হয়। এটি ব্যাঙ্গালোরের একটি বিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক। প্রায় ৩০০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে সবুজের সমারোহে সাজিয়ে তোলা এই প্রাকৃতিক পার্ক। এটি শহরের একদম কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। পুরো পার্কটি ঝর্ণা, মূর্তি, ফুলের গাছ এবং সবুজে ভরা।  কুব্বন পার্ক ব্যাঙ্গালোরের একটি ঐতিহাসিক পার্ক। বিধান সৌধ, হাইকোর্ট ও বেঙ্গালুরু গল্ফ ক্লাবের কাছেই এটি অবস্থিত। এই পার্কটি সরকারের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকার মধ্যে অবস্থিত যার মধ্যে রয়েছে বিধান সৌধ , কুব্বন পার্ক, কুইন্স পার্ক, ছোটদের জন্য পার্ক, বাঁশবাগান আর আইনসভার হোম গার্ডেন। এখানে স্টেট লাইব্রেরি আছে যা সুন্দর লাল গথিক কাঠামোয় তৈরি শেষাদ্রি আইয়ার মেমোরিয়াল হলের ভেতরে রয়েছে।

১৮৭০ সালে মহীশূর রাজ্যের কমিশনার স্যার জন মিডের সময়ে ১০০ একর এলাকাজুড়ে এই পার্কটি তৈরি করা হয়েছিল। তাই তার নামে এই পার্কটির নাম রাখা হয়েছিল মিডস পার্ক। পরবর্তীকালে এর আয়তন প্রায় ৩০০ একর করা হয়। ১৮৭৩ সালে তখনকার  কমিশনার স্যার মার্ক কিউবনের নামে পার্কটির নাম রাখা হয় কুবন পার্ক। কিন্তু পরবর্তীকালে ১৯৪৮ সালে, ২৬শে জুলাই প্রয়াত মহারাজা শ্রী চামরাজরেন্দ্র ওয়াদেয়ারের সম্মানে পার্কটির নামকরণ করা হয় "শ্রী চামরাজেন্দ্র পার্ক", কিন্তু এটি কুব্বন পার্ক নামেই বিশেষ ভাবে পরিচিত। কুব্বন পার্ক একটি পাবলিক পার্ক। এখানে  খোলা লন, হাঁটার জন্য পরিচ্ছন্ন রাস্তা এবং খেলার মাঠ রয়েছে। শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে এবং প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাবার জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান যা মর্নিং ওয়াকারদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এখানে পাথরের সুন্দর স্ট্যাচু, ঢাল, ঐতিহাসিক স্থাপত্য কলার নিদর্শন দেখা যায়। শেষাদ্রি আইয়ার মেমোরিয়াল হলের মধ্যে অবস্থিত একটি লাল গথিক কাঠামোর গ্রন্থাগার। 

ছোটদের জন্য আছে একটি পার্ক যেখানে বিভিন্ন রাইড এবং টয় ট্রেনে চড়া যায়। এখানে আছে টয় মিউজিয়াম, আছে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা। আমরা ওখানে না ঢুকলেও পাশ দিয়ে যাবার সময় বাবা মায়ের সাথে আসা কচিকাঁচাদের ভিড় দেখতে পেলাম। পার্কের মাঝখানে একটি ব্যান্ড স্ট্যান্ড রয়েছে। একসময় ব্রিটিশরা তাদের সামরিক ও পুলিশ ব্যান্ড প্রদর্শনের জন্য এই ব্যান্ড স্ট্যান্ডটি তৈরি করেছিল। এখানকার স্থানীয় মানুষের কাছে শুনলাম মাঝে অনেক দিন বন্ধ থাকার পর এখন আবার এখানে প্রতি রবিবার সকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। আমরা রবিবারে যায়নি। তাই এই অনুষ্ঠান মিস করে গেলাম।

কুব্বন পার্কের ভেতরের শর্ট রুট দিয়ে জিজ্ঞেস করতে করতেই আমরা চলে এলাম বিধান সৌধে।
কর্ণাটক রাজ্যের শক্তির প্রতীক বিধান সৌধ একটি বিখ্যাত স্থাপত্য। এটি ব্যাঙ্গালোরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। বিধান সৌধ কথাটির অর্থ হলো আইনসভার ঘর। এটি বেঙ্গালুরু শহরের দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে অন্যতম এবং সমগ্র দেশের বৃহত্তম আইনসভা ভবন।এই ভবনটি বেঙ্গালুরুর সাম্পাঙ্গি রামানগরের কাছে আম্বেদকর বিধিতে অবস্থিত। এর উল্টোদিকেই কর্ণাটক হাইকোর্ট। ৬০ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত গ্রানাইট পাথরে তৈরি গম্বুজাকৃতি বিধান সৌধ রাজস্থানী, দ্রাবিড় আর ইন্দো ইসলামিক স্থাপত্যের এক অত্যাশ্চর্য নিদর্শন। 

বেঙ্গালুরুর সমস্ত ভবনগুলো ইউরোপীয় ভবন। তাই ১৯৫২ সালে মহীশূরের মুখ্যমন্ত্রী কেঙ্গাল হনুমানথিয়া বিধান সৌধ ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন। যদিও ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জহরলাল নেহেরু এই ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন যখন মহীশূরের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কে সি রেড্ডি। পরবর্তী কালে মুখ্যমন্ত্রী কেঙ্গাল হনুমানথিয়া ১৯৫২ থেকে ১৯৫৭ সালের মধ্যে বিধান সৌধের নির্মাণ করেছিলেন। বিধান সৌধে যাবার পথটি খুব সুন্দর।  এর মাটির উপরে ৪ টি তলা আর মাটির নীচে একটি তলা রয়েছে।  ভেতরে ঢোকার জন্য ৪৫টি ধাপ উঠতে হবে। ঢোকার পথে ৪০ ফুট উঁচু ১২টি গ্রানাইট স্তম্ভসহ লম্বা বারান্দা রয়েছে। আর সেই বারান্দায় পৌঁছোনোর জন্য রয়েছে রাষ্ট্রপতি ভবনের অনুকরণে তৈরি চওড়া সিঁড়ি।  সামনের দিকে জাতীয় পতাকা উড়ছে। ভবনের সামনে গ্রানাইট স্তম্ভের চূড়ায় মেটালের তৈরি চারটি সিংহ মূর্তি রয়েছে। বিশাল গম্বুজের উপরে সোনালী  রঙের জাতীয় প্রতীক রয়েছে। সেখানে  "Government work is Gods work" লেখা আছে। আইনসভার বেশিরভাগ দরজাই চন্দন কাঠের তৈরি। ভবনটি সারি সারি গম্বুজের মতো ল্যাম্পপোস্ট দিয়ে সাজানো। রাতের বেলায় ভবনটি আলোয় ঝলমলে হয়ে ওঠে। একদিকে কেনেগাল হনুমন্তিয়ার মূর্তি আর অন্যদিকে ডঃ আম্বেদকর এবং জওহরলাল নেহেরুর মূর্তি ভবনের বিশেষ আকর্ষণ। ভবনটি একটি সুদৃশ্য পার্ক দিয়ে ঘেরা যা সামনের ডবল রোড পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।

এখানে মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় এবং অন্য কয়েকটি সরকারি সংস্থা রয়েছে। এটি একটি পর্যটন কেন্দ্র। দেশ বিদেশ থেকে পর্যটকরা এর অপূর্ব স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য দেখার জন্য এখানে আসে। তবে ভেতরে প্রবেশ করার জন্য পাস প্রয়োজন।  সাধারণ মানুষেরা এর ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। ভেতরে প্রবেশ করতে না পারলেও বিধান সৌধের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য ভারতীয় গণতন্ত্রের মহিমার এক ঝলক দেখার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলির মধ্যে একটি। অনেক ঘুরেছি আর ফটো তুলেছি। তাই আমরা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম।  এবারে ফেরার পালা। এখানকার মেট্রো স্টেশনের নাম ডক্টর বি আর আম্বেদকর স্টেশন। আমরা মেট্রোতে উঠে  নাদাপ্রভু কেম্পেগৌড়া স্টেশনে ফিরে এলাম।‌ এবারে হোটেলে পৌঁছে বিশ্রাম। 

আরও  অনেক জায়গা ঘোরা বাকী রইলো। সেসব পরের বারের জন্য তোলা থাক।

No comments:

Post a Comment