Friday, May 1, 2026


 

বিশেষ বাছাই ভ্রমণ 

রাখিগোড়ি: এক ঐতিহাসিক স্থান

               চিত্রা পাল 


রাখিগোড়ি হরিয়ানার হিসার জেলার এক নাম না জানা গ্রাম যাকে দুদশক আগেও কেউ চিনতো না।ঊসর মরুভূমির মতো এ জায়গা পড়েছিলো শতকের পর শতক। কিছু বছর আগে  খোঁজ পাওয়া যায় এখানে মাটির নীচে লুকিয়ে আছে আস্ত একখানা শহর।সে খোঁজ পাওয়া গিয়েছিলো বটে কিন্তু আমি তখনও জানতাম না,আমার কর্ণোগোচর হয়নি। গতবছরে শুনেছিলাম একবার, তাও যাওয়া হয়ে ওঠেনি।এবার সুযোগ হলে আর হাত ছাড়া না করে এক সকালে বেরিয়েপড়লাম, সঙ্গে আমার ইতিহাস পাঠরতা নাতনী কাজেই একেবারে সোনায় সোহাগা।

সকাল সকাল বেরিয়েও পৌঁছতে আমাদের এগারো সাড়ে-এগারোটা হয়ে গেলো। সূর্য প্রায় মাথার ওপরে,অন্য সময় হলে তার বিভায় আমাদের করে শেষ করে দিতো,এদিন কি কারণে জানিনা,তার বিভা থাকা সত্ত্বেও, হাওয়া ছিলো ঠান্ডা,মনোরম, তাই ওই দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমি প্রায় প্রান্তরে  আমাদের ঘুরে ঘুরে দেখতে খুব একটা অসুবিধে হয়নি।

রাখিগড়ি বা রাখিগড়াই ভারতের হরিয়াণা রাজ্যের হিসার জেলার একটা গ্রাম। দিল্লী থেকে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার বা আরেকটু বেশি হয়তো দূরে উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত। এটি সিন্ধু সভ্যতার সময়কার এক বসতি স্থান যা প্রায় ৬,৫০০খৃষ্টপূর্বাব্দে গড়ে উঠেছিলো।

এ জায়গাটায় খনন কার্য চলেছে বলে এখানে সবই অস্থায়ী। একটা মিউজিয়াম আছে।,শুনলাম আগে ছিলো না এখন হয়েছে সেটাও অস্থায়ী, সেখানেই আগে গেলাম।এখানকার প্রত্নত্তাত্বিক খননের থেকে পাওয়া সব জিনিসের একটা প্রদর্শনী কক্ষ।এখানে পোড়া মাটির জিনিস পত্রই বেশি।  পোড়ামাটির কি নেই, সব আছে। সংসারের ব্যবহার্য তৈজসপত্র থেকে ঘর সাজানোর জিনিস পত্র গহনাগাঁটি সব। একটা মানুষের কঙ্কালও দেখলাম।পাঁচ ছয়হাজার বছর আগে সে হয়তো এ চত্বরেই ঘুরে বেড়াতো।   

রাখিগড়িতে সাতটি ঢিবির এক চত্বর রয়েছে।আরও আশেপাশে অনেকগুলো ঢিবি আছে। সব একসঙ্গে নির্মিত নয়। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে আরও কিছু আবিষ্কারের ফলে এটি সিন্ধুসভ্যতার  সবচেয়ে বড় স্থান হয়ে উঠলো। আমরা দেখলাম কি ভাবে মাটি খুঁড়ে বসত বের করেছে। জায়গাটা খুবই অসমতল। আমার পক্ষে হেঁটে ঘোরা অসুবিধেজনক। তবুও দেখার চেষ্টা করলাম।  একটা যন্ত্রের সাহায্যে আগে ভূপৃষ্ট থেকে বোঝার চেষ্টা করা হয় নীচে কিছু আছে কিনা। তার সংকেত থেকে ক্রমে ক্রমে ভূ গর্ভে এগিয়ে যাওয়া। একটা প্রশ্বস্ত চত্বরে আয়তাকার জায়গা জুড়ে সাদা দড়ির সীমানা করা।সেই জায়গাটা আর একটা দড়ি দিয়ে দাবা খেলার ঘরের মতো খোপ কাটা, আর তাতে এক দুই করে পরপর সংখ্যা লেখা।সেই সংখ্যার তলায় একটা নাম লেখা। আমি জিজ্ঞেস করাতে জানতে পারলাম,এই যে শ্রমিকরা কাজ করছে,তাদের প্রত্যেকের কাছে নাম্বার আর নাম লেখা চাকতি আছে। ওরা অনেকেই নিজেদের লেখা নাম পড়তে পারে না। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে কেউ যদি কিছু পায়,তাহলে তার নম্বর তো চেনে,সেই নম্বর লেখা খোপে রেখে দেবে।তাহলে কে কোথায় এই জিনিস পেয়েছে তা সহজেই বোঝা যাবে।এখানে চারদিকে পোড়ামাটির জিনিস্ পত্রের টুকরো ছড়ানো।সেখান থেকে আমি গোটা কয়েক তুলে আমার কুক্ষিগত করে নিই। 

ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় এসে থমকে গেলাম। এখানে  বড় আকারের খনন কার্য হয়েছে।এর মাথায় বেশ বড় করে ছড়ানো টিনের আচ্ছাদন কাঠের খুঁটির ওপরে করা। সেখানে দেখা গেলো সেই কত হাজার বছর আগেকার ঘর। গাইড আমাদের বুঝিয়ে দিলেন, এইটা খুব সম্ভব একটা দোকান ঘর ছিল।এই উঁচু জায়গাটায় বেচা কেনা চলতো। পাশে লম্বা মত বসবার জায়গা। সেখানে লোকজন এসে বসতো। আমরা কল্পনা করে নিলাম হাজার হাজার বছর আগে এখানে কেমন লোক জন এসে আড্ডা দিতো। এখানে  জলের পাইপ বা লাইন সব পোড়া মাটির পাওয়া গ্যাছে। তখন তো ধাতুর ব্যবহার ছিলো না। সাধারণ সব কাজে পোড়া মাটির ব্যবহার খুব ছিলো। 

রাখিগড়ি জায়গাটা  প্রাগৈতিহাসিক দৃষদ্বতী নদীর উপত্যকায় অবস্থিত, যার উত্‌পত্তি শিবালিক পাহাড়ে। এর আকার ও অনন্যতাকে বিশ্বজুড়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা গুরুত্ব দিয়েছে।.২০১২ সালের মে মাসে  গ্লোবাল হেরিটেজ ফান্ড একে এক ঐতিহ্যবাহী স্থান বলে ঘোষণা করে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের কথা, এই জায়গাটায় ঠিক মতো পাহারাদারি নেই। খনন থেকে বের করে আনা জিনিসপত্র স্থানান্তরিত হয়ে যাচ্ছে সহজে। 

দিনের আলো নেভার আগে হাজার হাজার বছরের পুরোনো শহর থেকে বেরিয়ে এলাম আমার বর্তমান জগতে। তবে কল্পনা পাক খেতে লাগলো সেইসময় জুড়ে।।     





No comments:

Post a Comment