বিশেষ বাছাই মুক্তগদ্য
বৈশাখ যেমন ছিল
জয়িতা সরকার
কালবৈশাখীর বিকেল নাকি নববর্ষের কার্ড গ্রীষ্ম এলে কড়া নাড়ে কে? 'দারুণ অগ্নি বাণে রে,' নাকি 'ওই মহামানব আসে,' রবীন্দ্রনাথ জয়ন্তী নাকি শুধুই বর্ষবরণ, দুটোকে একমঞ্চে দ্রবীভূত করে নতুন কিছু করা নিয়ে জোর তর্ক। সদ্য নতুন ক্লাসে ওঠা, বাংলা বইয়ের পাতায় রবি- নজরুল- জীবনানন্দ-তে চোখ বুলিয়ে ভাবছি এখান থেকেই কিছু একটা ঝেঁপে দিলে এবারের বর্ষবরণটা উদ্ধার হয়। কিন্তু দলের মাতব্বরদের মানের দায় বড়, যা কিছু সিলেবাসের বাইরে তাতেই তাদের আগ্রহ। অগত্যা বয়সের হিসেবনিকেশে কাঁচা অবস্থাতেই রবীন্দ্র রচনাবলীর পাতা উল্টে দেখার তোড়জোড় শুরু হত, গান-কবিতা-নাটক বাছাইয়ের লিটমাস টেস্টে উত্তীর্ণ হওয়া কবিতাগুচ্ছ মুখে মুখে ঘুরে ফিরে বেড়াত বেশ কয়েকদিন। যখন 'এসো হে বৈশাখ' তার নিজস্বতা নিয়ে স্বমহিমায় বৈশাখী আড্ডায় গ্রীষ্মের প্রথম প্রহরে বিরাজমান, এ গল্প সেই তপ্ত দুপুরের।
মাঝ জীবনে দাঁড়িয়ে স্মৃতির ঝাঁপি খোলা যেন একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন বছর থেকে দোল বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মত আমার ঘটনার ঝুলিও হাজারও কাহিনীতে ভরা। ঋতুরঙের মত প্রতি ঋতুর আলাদা গল্প আছে ছেলেবেলা জুড়ে। প্রথমেই বলি নববর্ষের সকালে কোন ঝুট ঝামেলা নয়, লক্ষ্মীমন্ত হয়ে সুতির ফুলপাতা কারুকার্য করা টেপজামা গায়ে চাপিয়ে বাড়ি বাড়ি কার্ডবিলি। কিন্তু আমার মত চরম জেদি মেয়ের নববর্ষের সকাল এখনকার ভাষায় কুল হবে, এমনটা যে হতে পারে না, তা জানতে কারোর বাকি নেই। আগের দিন রাত অবধি কাকে কোন কার্ড দেব তা নিয়ে মায়ের সঙ্গে অগ্নিবাণ ছোড়াছুড়ি হয়েছে একপ্রস্থ। সকাল থেকে রোদের পারদের সঙ্গে সমানুপাতিক হারে বাড়ির তাপমাত্রা চড়ছে। আমি নিজের সমস্ত জোর দিয়ে প্রতিরোধ চালিয়ে গেলেও যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মিনমিনে মুখ করে কার্ড বিলিয়ে রসগোল্লা গালে পুড়ে বাড়ি এসে মাংস ভাত খেয়ে প্রথম পর্বের ইতি টানলাম। বিকেলে নতুন জামা পরে চললাম হালখাতা করতে, যদিও এটা নিয়ে খুব বেশি যে আগ্রহ ছিল তেমনটা নয়, প্যাকেটে থাকা লাড্ডু, কচুরি এসব না পসন্দের তালিকায়। তবে কতগুলো প্যাকেট পেলাম তা নিয়ে উত্তেজনা থাকত, ছেলেবেলার সহজ সরল মনে প্যাকেট কম হলেই বাবা মা-কে বলে উঠতাম, 'ওমুক দোকানে বাকি রাখলে না কেন? তবে একটা মিষ্টির প্যাকেট পেতাম।' কদমতলার গণেশ পুজো দেখে যোগমায়া কালীবাড়ি ঘুরে ঘেমে-নেয়ে বাড়ি ফেরা।
নববর্ষ যেতে না যেতেই ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট, প্রকৃতির কালবৈশাখীর আগে মনে ঝড় বয়ে চলেছে, দুরুদুরু শব্দটা এতটা প্রকট তারজন্য আলাদা করে কানকে কষ্ট করতে হচ্ছে না। রেজাল্ট নিয়ে তখন যতটা ভয় চিন্তা আরও কতশত অনুভূতির আনাগোনা ছিল, আজ সেসব যেন হেলায় সামলে নেওয়া যায় বলে মনে হয়, কী জানি এতটা ভয়ের সত্যি কোন বাস্তবতা আছে কি না? আমার মত ব্যর্থ মানুষকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর হবে, না। সেদিন যেমন ছিলাম, আর আজকের আমিটার জন্য পরীক্ষার রেজাল্ট পরিহাস ছাড়া কিছু নয়। যাক পুরাতন স্মৃতি, বৎসরের আবর্জনাকে দূরে ফেলে ফিরি আমার পাশের গলির বৈশাখের অনুষ্ঠান পর্বে। বৈশাখ আর কবিগুরু সমনাম, আগেই বলেছি নাটক -নাচ - গান সবই রবির ছায়ায় রবির মায়ায় কাটিয়ে দেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোন ভাবনা নেই। অনুষ্ঠানে মহড়া থেকে ফাইনাল ডে এই সময়ের স্মৃতিগুলো আজকের তপ্ত দহনে প্রথম বৃষ্টির মত মনকে শান্ত করে।
গ্রীষ্মের দ্বিতীয় পর্ব 'সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি' ছাড়া অন্য কিছু মনে পড়ছে না এই বৈশাখে। গ্রীষ্মের সঙ্গে কাঠফাটা রোদের যে সম্পর্ক তা নিয়ে আমার কোন অভিযোগ নেই, বরং স্কুলে গরমের ছুটি, টেলিভিশনে ছুটি ছুটি। খুব যে গল্পের বই পড়ার নেশা তখন ছিল তেমনটা নয়, পড়া বলতে আনন্দমেলার একরাশ আনন্দ নিয়ে বইয়ের টেবিলে জমা থাকা, আর তার পরিপাটি গোছগাছ, কিছু কমিকস, গরমের ছুটি কেটে যেত অবলীলায়। ওহো, গরমের দুপুরে নির্জন শান্তপাড়ার নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করতে হাজির হতেন এক বরফওয়ালা। আমাদের ছোট গলিখানায় ঢুকতেই তার নানা ছন্দের কবিতা, হাতে ডুগডুগির শব্দে একে একে জড়ো হচ্ছি আমরা। সাদা-নীল বাক্স তবে সেটা সরকারের দেওয়া নয়, বরফের ফ্যাক্টরি থেকেই হয়ত দেওয়া হত তাদের। দুধ সাদা বরফ, কমলা বরফ, নারকেল ছড়ানো বরফ আরও কত কী, একটাকা, দু'টাকার বিনিময়ে এক ঠান্ডা অনুভূতি। কিন্তু এমন দিনও ছিল, ঠান্ডার পর মায়ের ডান্ডা পড়েছে পিঠে।
বৈশাখের তৃতীয় পর্ব, যাকে ছাড়া গ্রীষ্মের সংজ্ঞা লেখা যায় না, অর্থাৎ গরম এলেই লোডশেডিং সঙ্গী। সন্ধ্যে হতেই সারা পাড়া নিয়মিত অন্ধকারে ডুবে যাবে এটাই দস্তুর। তখনও ইনভার্টারের চল নেই শহরে, লন্ঠন, হ্যারিকেন খুব বড়জোর ইমার্জেন্সি লাইট। তবে এই অন্ধকারে আলোররেখাটি ছিল, সবাই যখন ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে হাতপাখা নিয়ে সমবয়সী সমমনস্কদের সঙ্গে কাটিয়ে দিতাম এক-দেড়ঘন্টা। এ যেন মানুষের সঙ্গে নিবিড়তা গড়ার সময়। শহরটা বদলে গেল, হারিয়ে যাওয়া তালপাখা কিংবা বরফকাকুর হাঁকডাকে একজোট হওয়ার টানটা, স্মৃতির আঁচড় ছাড়া আজ তার কোন অস্তিত্ব নেই।
চতুর্থ পর্ব নিয়ে আর কী বলি, প্রতিটি সময়ের নিজস্ব গন্ধ আছে, তবে আমার ছোট মনে অতসব অনুভূতিরা বাসা বাঁধেনি কোনদিনই,কিন্তু যে গন্ধগুলো নাকে প্রবেশ করতেই মাথা গরমের অনুঘটক হিসেবে কাজ করত তারমধ্যে শীর্ষ স্থানে ফলের রাজা আম। চারদিক আমময়, এমন আম ঘেরাটোপে সকাল সন্ধ্যে কাটানো আমার মত সরস মানুষের নীরসতা ছাড়া কিছু নয়। ওই আম-দুধের একাত্তীকরণে আমার আঁটি হয়ে গড়াগড়ি করাটাই বেশি পছন্দের ছিল। কোনদিনই ল্যাংড়া, হিমসাগরের স্বাদের যাদুতে আমার স্বাদকোরক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেনি। গোটা শহর জুড়ে আমেদের দাপট, পথচলতি প্রায় প্রত্যেকের হাতে আম ভর্তি থলে, আর এই স্বাদগন্ধে মাতোয়ারা গরমে আমার নাভিশ্বাস উঠছে। কাঁচা আমে অরুচি নেই, কিন্তু পাকা আম আর আমার সম্পর্ক দশ বছর আগে পর্যন্ত সাপে-নেউলের। তবে লিচুর জায়গা ছিল হৃদয়ে, কাঁঠালও জায়গা পেয়েছিল বেশ কিছু বছর।
গরমের ছুটি, আম-জাম- লিচু ছাড়িয়ে গ্রীষ্মের পঞ্চম পর্বে যে স্মৃতি আজও বাস্তব তা হল ভোট বাজারের উত্তাপ। গরম এলে ভোট আসে, জল শহরের প্রাণকেন্দ্র কদমতলায় বক্তৃতার সুর চড়াচ্ছেন নেতারা। রাস্তা দিয়ে যেতে বাবা মা দাঁড়িয়ে পড়তেই আমিও মনোনিবেশ করছি। শহরের তাবড় নেতাদের মুখগুলোর সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি। রাজনৈতিক দলের উর্ধ্বে উঠে তাদের ব্যক্তিত্বকে চাক্ষুষ করার সুযোগটাই ছিল পরম প্রাপ্তি। গরমের এই দৃশ্য বর্তমান, তবে ভোট নিয়ে উত্তেজনা আজ ছন্নছাড়া, শৃঙ্খলাহীন। ভোট নিয়ে চিরকালের আক্ষেপ, সেসময় বয়স না হওয়া আর এখন শহর থেকে দূরে থাকা এই অন্তরায়ের বদান্যতায় ভোট দিয়েছে হাতে গুনে তিন থেকে চারবার। তাই আজকাল আর নিজেকে রাজনৈতিক সচেতন মানুষ বলি না আমি। তবুও বৈশাখ এলে এক একটি গ্রীষ্মে জন্ম নেওয়া হাজারও গল্পের স্মৃতিরা ফিরে ফিরে আসে। ফিরে আসে কাঁচা আমের টক, জামমাখা, বৈশাখী মেলার মাঠে নাগরদোলা, বরফকাকুর হাঁক, গলির মোড়ে জমজমাটি আড্ডা, তীব্র দহনে পুড়তে থাকা দুপুর শেষে কালো মেঘ ভেঙে বিকেলের শান্ত বারিধারা।
No comments:
Post a Comment