গল্প
স্বীকারোক্তি
অমলকৃষ্ণ রায়
বন্ধ ঘর। আলো নেই। ঘরটাও অচেনা। কোনওদিন এখানে এসেছি বলে মনে পড়ছে না। একা আমি। আলোহীন আবছায়ায় আন্দাজ করতে পারছি, ঘরে খাবার-দাবার রয়েছে। পানীয় জলও আছে। টয়লেটও দেখতে পাচ্ছি। এরকম একটা বিচ্ছিন্ন ঘরে কবে থেকে আছি। কিছুইতো মনে পড়ছে না। ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ বাইরের কিছু মানুষের গলা শুনে জেগেই এসব দেখছি। এরকম অবস্থায় আটকে রয়েছি বুঝতে পেরে ভয়ে গলা শুকিয়ে এল। কোনওরকমে হাতড়ে জলের জগটা নাগালে নিয়ে ঢকঢক করে খানিকটা জল খেয়ে নিলাম। তাতে ঘুমচোখের তন্দ্রাভাব অনেকটাই কেটে গেল। মনে করার চেষ্টা করলাম, আমি ঠিক কোথায়? কী করে এলাম এখানে? কে বা কারা আমায় ধরে এনে এখানে আটকে রাখলো?’ যদিও একা থাকতে আমার মন্দ লাগে না। আমার মতে একা থাকার অনেক সুবিধে। নিজের সঙ্গে একান্তে কথা বলা যায়। নিজেকে নিজের মতো করে আবিষ্কার করতে পারি। বাইরের জগতে সারাদিন কাটালে দিনের বেশির ভাগ সময় লোকজনের সঙ্গে কথা বলতেই তো কেটে যায়। নিজের কথা ভাবার মতো তেমন ফুরসত পাই না। তাছাড়া একা থাকা অবস্থায় আমায় কবিতা লেখা, গল্পের প্লটের ভাবনা বেশ পেয়ে বসে। তখন কলম চালিয়ে অনায়াসেই কিছু না কিছু লিখে ফেলতে পারি। ভাবছি, এই অবস্থায় যদি সাহিত্যের কোনও ভাবজগতে ঢুকে পড়ি, তাহলে সেটা লিখব কী করে। একে তো ঘরটা অন্ধকার। তারমধ্যে খাতা-কলম-ল্যাপটপ, এই সব তো কিচ্ছু নেই মনে হচ্ছে। মনে লেখার ভাব আসার পর লিখতে না পারলে তখন আরও বেশি কষ্ট হয়। রাস্তায় একা চলতে চলতে যখন কিছু লেখার ভাব মাথায় চলে আসে, তখন চিন্তায় পড়ে যাই, এইরে! এতগুলো লাইন মনে পড়ে গেল। এখন এসব লিখব কী করে? বাড়ি ফিরে লিখতে বসতে বসতে তো সবই প্রায় হারিয়ে যাবে।
বাইরে থেকে আবারও কিছু মানুষের গলা কানে এল। মনে হচ্ছে কাছেপিঠেই তারা রয়েছে। কী নিয়ে তারা আলোচনা করছে। নিশ্চয়ই আমায় নিয়ে নয়। আমায় নিয়ে কেনইবা আলোচনা করবে? চুলোয় যাক, এই অবস্থায় কেন এলাম, অযথা তার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে এই সুন্দর একটা একাকিত্ব উপভোগ করাটাকে নষ্ট করব কেন। আমি বরং আমাতেই ডুবে যাই না, যেমন আর পাঁচটা দিন একা থাকার সময় নিজেকে নিজের মধ্যে হারিয়ে ফেলি। তারপর ভাবনা আকাশে পাখনা মেলে কিছুক্ষণ উড়ে বেরিয়ে গাঙচিলের মতো যদি কিছু তুলে নিতে পারি তো ভাল, না পারলেও হারানোর তো কিছু নেই। তাই বন্ধ ঘরের একাকিত্ব ব্যাপারটাকে বেশ উপভোগ করতে লাগলাম। ভুলেই যাচ্ছি, কখন দিনশেষে রাত আসে, কখন আবার রাত শেষে ভোর আসে। আমার কাছে কোনও ঘড়ি নেই, মোবাইল ফোন নেই বলে সময়টাও জানতে পাচ্ছি না। ঘরটা রাতের মতো অন্ধকার বলে কখন রাতদিন আসছে কখন দিন আসছে বুঝতেও পাচ্ছি না। তবে পুরোপুরিভাব বুঝতে না পারলেও কিছুটা আন্দাজ করতে পারি যে দিন ফুরিয়ে সন্ধে নেমে রাত আসছে। রাত ক্রমশ গভীর হতে হতে চারিদিকের লোকালয়ে নিস্তব্ধতা নেমে আসে সেটাও বুঝতে পারি। তারপর আবার নিশুতি রাতের আবেশ কেটে গিয়ে কাকভোরের পাখির ডাকও কানে আসছে। এরইমধ্যে বেশ আছি আমি; খিদে পেলে খেয়ে নিচ্ছি। পিপাসা পেলে জলপান করছি। ঘুমের ক্লান্তি এলে চোখ বন্ধ করে নিথর হয়ে পড়ে থাকছি। সাহিত্যে কখনও পেয়ে বসলে মন থেকে ঝেড়ে মুছে ফেলে মনে মনে বলছি, এখন নয়, অন্য সময় এসো। ঘুমের মাঝেও নানারকম স্বপ্নাচ্ছন্নে ডুবে যাচ্ছি। এক অন্য জগতে একপাক ঘুরে অবচেতনতার মেঘ কাটিয়ে জেগে ওঠার পর আবার সজ্ঞানে ফিরে বুঝতে পারছি, এখনও সেই বন্ধ ঘরটাতেই বন্দি রয়েছি।
এসবের মাঝে একবার মনে হলো, আমি বোধহয় কোনও জেলখানায় রয়েছি। হয়তো কোনও সামাজিক অপরাধ করে ফেলেছিলাম। সেজন্যই আমার এ শাস্তি। আর বাইরে যাদের গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি, তারা হয়তো পুলিশ। আমায় নিয়েই দরবার করছে, কেসের ঘুঁটিটা কী করে সাজাবে তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে। পরক্ষণেই ভাবি, আমার মতো একটা নির্লোভ, সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত মানুষ কেনইবা অপরাধ করবে, থানা-পুলিশের খপ্পরে কেন পড়বে, সেটা নিয়ে কোর্ট-কাছারির পর বন্দি জীবন আসবে। হুট করে তো একটা লোককে ধরে জেলে আটকে রাখতে পারে না। সমাজের চোখে সত্যিই যদি কোনও অপরাধ করে থাকি, তার তো কতগুলো ধাপ রয়েছে। সেসব পেরোবার পর খালাস কিংবা হাজতবাস হবে। এতকিছু হলে আমি কিছুই জানব না, কিছুই মনে থাকবে না, সেটা কখনও হয় নাকি। নাকি কেউ আমায় এমন ঘুমের ওষুধ খাইয়ে বেহুঁশ করে রেখেছিল যে কয়েকদিন ধরে সে ঘুমের রেশই কাটছে না। এই যে আমি এখন জেগে রয়েছি, এখনও তো খানিকটা ঘুমের আবেশ চোখে রয়েছে। মনে হচ্ছে চোখ বুজলেই ঘুমিয়ে পড়ব। নিজেকে নিয়ে মনে অনেক প্রশ্ন জাগলেও কোনওটারই নিশ্চিত কোনও উত্তর খুঁজে পেলাম না।
এরইমধ্যে আমার বন্দিজীবনে মানসপটে একটা পরিবর্তন দেখা দিল। নিজের মধ্যেই দ্বৈত সত্তার সৃষ্টি হল। আমি বনাম আমি; এ দুয়ের মাঝে মত-বিনিময়, তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়াঝাটির তুমুল ঝড় বয়ে যেতে লাগলো। অন্তর্মুখী আমি বনাম বহির্মুখী আমি। আমি জানি আমার একটা অন্তর্মুখী আমি আছে। যে কিনা ভীষণ মুখচোরা। সেই আমিটা নিজেকে যুক্তিতর্কে কখনও জিতে আসতে পারে না। আত্মপক্ষ সমর্থন করে অকাট্য কোনও যুক্তি খাড়া করতে পারে না। তারজন্য অকারণে ভিতরে ভিতরে কষ্ট পায়, হেরে গিয়ে লজ্জায় ভিতরে ভিতে কেঁদে ওঠে, কখনও নিজের প্রতি নিজেরই ঘেন্নায় রাগ হয়, অভিমানী হয়ে কষ্ট পায়। আর যে বহির্মুখী আমি, সে দোষ করুক গুণ করুক, সবেতে গলাবাজি করে ঠিক জিতে বেরিয়ে আসে। সেই দ্বৈত সত্তা মিলে কখনও দ্বিমত পোষণ, কখনও সহমত পোষণের প্রক্রিয়া চলতে থাকলো। এসবের মাঝে এক নিরপেক্ষ আমি জেগে উঠে কোনও খেলার রেফারির মতো মাঝে ফোড়ন কেটে বলি, আমরা কি কোনও বোর্ড মিটিং ডেকে জীবনের নানারকম সমস্যার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চলেছি।
এসবের মাঝে কখনও মনে হয়, সত্যিই কি আমি এখানে একা, নাকি আমায় ঘিরে কিছু ভূতুড়ে মানুষ রয়েছে। তাদের হয়তো দেখা যাচ্ছে না ঠিকই, তবে তারা নির্ঘাত ঘরটার দেয়াল, ছাদ, মেঝে সর্বত্র আত্মগোপন করে রয়েছে। সম্বিত ফিরে পেলে আমার মধ্যে যে এসব উদ্ভট ভাবনাগুলো চলছিল, বিশ্বাসই করতে পারি না। তখন মনে হয়, পাগলের মতো সব ভুলভাল ভেবে চলেছিলাম। দেওয়াল, ছাদ, মেঝের আড়ালে আবার কখনও কেউ থাকতে পারে নাকি! এসব অবাস্তব, অবান্তর কিছু ভাবনার একটাই কারণ হতে পারে। হয়তো এই একাকিত্ব আমার মগজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে।
এভাবে কটা দিন কেটে যাবার পর ধীরে ধীরে আমার খাবারের প্রতি অনীহা আসতে শুরু হল। ঘরের অন্ধকারে রাখা খাবারগুলো স্বাস্থ্যকর খাবার কিনা সে নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠলাম। মনে হতে লাগল, এভাবে কবে থেকে এসব পড়ে রয়েছে, সেটা কি এখনও খাবারের উপযুক্ত রয়েছে নাকি এতদিনে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন খেলেই শরীর খারাপ হতে পারে। তাতে প্রাণহানির আশঙ্কার প্রবল। তাই অকারণে অস্বাস্থ্যকর খাবারগুলো খেয়ে নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেব না। তার চেয়ে অভুক্ত থাকাই শ্রেয়।
এভাবেই অন্ধকার কুঠুরিতে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতে কাটতে একবার এক অভিনব উপলব্ধি শুরু হল। ঘরের দেওয়ালে অদ্ভুতরকম কিছু চিহ্ন ভেসে উঠছে। মনে হচ্ছে কোনও লিপি, যা আগে কোনওদিন দেখিনি। যার অর্থ আদৌ জানা নেই। লিপির মতো দেখতে আঁকিবুঁকিগুলো দেয়ালের একপ্রান্ত থেকে চোখের সামনে এসে অন্যপ্রান্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। এসব অক্ষর আমার পরিচিত নয়। একবার মনে হলো এসব কি তাহলে এলিয়েনদের ভাষা। কিংবা পৃথিবীর বাইরের অন্য কোনও জগতের প্রাণীকূলের লেখ্য ভাষা। বোবা সব এলিয়েনরা এসবের মাধ্যমে এ জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছে। তাই বেতার তরঙ্গের মতো ভাষাগুলো আকাশগঙ্গা পেরিয়ে এই অন্ধকার কুঠুরিতে চলে এসেছে। অক্ষরগুলো আমায় কিছু বলতে চায়।
একদিন আমার মনে সম্দেহ জাগলো আমি কি বেঁচে আছি। নাকি প্রাণের সত্তা হারিয়ে এলিয়েন হয়ে উঠেছি। তাই তারা আমায় স্বাগত জানাতে ছুটে এসেছে। এসব নানারকম পরাবাস্তবতার আঁধারে ডুবে যেতে যেতে একদিন মনে হল, ক্রমশ যেন ভাববার মতো শক্তিও হারিয়ে ফেলছি। ওসব এলিয়েনকেন্দ্রিক ভাবনাও আর মনে আসছে না। দিনেদিনে ক্রমশ শক্তিহীন হয়ে পড়ছি। হাত-পা শরীরের কোনও অংশ নড়ানোর মতো শক্তি হারিয়ে ফেলছি। শুধু তাই নয়, সেইসঙ্গে নিজের আমিত্বকেও হারিয়ে ফেলছি। সোজা কথা যে অবস্থায় এসে পড়েছি, সেটা মনে হচ্ছে বাঁচা-মরার মাঝামাঝি কিছু। কিংবা জীবন-মৃত্যুর মাঝে দোলাচলে দোল খাচ্ছি; এই আছি, এই নেই অবস্থা আমার। বিদ্যুতের জমকের মতো আমার মধ্যে কখনও জীবন তার অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। পরক্ষণেই হঠাৎ এক দমকা হাওয়ায় মোমবাতি নিভে যাবার মতোই সে জীবনের আলো নিভিয়ে দিচ্ছে; এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। এই অবস্থায় কখনও মনে হল সজোরে আর্তনাদ করে কেঁদে উঠি, কখনও মনে হয় ঘরদোর কাঁপিয়ে কাঁদার চাইতে বরং পৈশাচিক হাসি হেসে উঠি। হাসির শক্তি কান্নার চাইতে অনেক জোড়ালো। কারণ আমি জানি, হাসি শরীরের দুঃখ-কষ্টের কেমিক্যাল কর্টিসল নিঃসরণ কমিয়ে সুখের কেমিক্যাল ডোপামিনের ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়। যাকিনা জীবনকে সহজেই স্বাভাবিক করে তুলতে পারে। এসব ভাবতে গিয়ে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, আমি কী করব, কাঁদব নাকি হাসব। অবশেষে যা হলো, বহু চেষ্টা করেও গলা থেকে কোনও রা বের করতে পারলাম না। পাথরের মতো নিশ্চুপ, নির্জীব অচল হয়ে পড়ে রইলাম। তারপর আর কিছু জানি না।
যখন সম্বিত ফিরলো, দেখলাম, ঘরভরতি আলো। নানারকম যন্ত্রপাতির মাঝের একটা বেডে আমি শুয়ে আছি। পাশে এক ডাক্তারবাবু আমার পালস ধরে বসে মনিটর স্ক্রিণের দিকে অপলকদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন। একসময় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন, চিন্তার কোনও কারণ নেই। সব প্যারামিটারই ধীরে ধীরে নর্মাল হয়ে আসছে। ভাগ্যিস, সময়মতো আইসিইউতে আনা হয়েছিল। ডাক্তারবাবুর বন্ধু জানতে চাইলেন, ‘তাহলে কী সিদ্ধান্তে আসা গেল? একজন সুস্থ মানুষ না ঘুমিয়ে কতদিন বেঁচে থাকতে পারে?’ গম্ভীর ভারী গলায় ডাক্তারবাবু বললেন, ‘এগারোদিন। এরচেয়ে বেশিদিন নির্ঘুম কাটালেই নির্ঘাত মৃত্যু।’ ডাক্তারবাবুর কথায় বুঝলাম, আমি বর্তমানে একটা মেডিক্যাল কলেজে ঘুম নিয়ে গবেষণারত কিছু ডাক্তারি গবেষকদের পাল্লায় পড়েছি। একজন মানুষ কতদিন না ঘুমিয়ে কাটাতে পারে সেটা জানতেই তারা আমায় ব্যবহার করেছে।
ডাক্তারবাবুরা চলে যাবার পর একজন নার্স এসে আমায় বললেন, আপনার আজ ছুটি। বাড়ির লোক এলেই ছেড়ে দেওয়া হবে। তখনও বুঝে উঠতে পারছি না, কোথায় আমার বাড়ি, কেইবা আমার আপনজন। ভাবলাম, সে যাই হোক, সবচাইতে স্বস্তির কথা হল, তারা তো তাদের গবেষণার গিনিপিগ-শিকারটিকে জীবিত অবস্থায় মুক্তি দিচ্ছে। মানসপটের নির্জীবতার ঘোর ক্রমশ কেটে যেতে লাগলো। ধীরে ধীরে আমার পরিবার, স্বজন, বাড়ির কথা মনে পড়ে গেল। বিমলা আমার স্ত্রী। সদ্য বিয়ে করে একটা পর্যটকের দলের সঙ্গে পাহাড়ে ঘুরতে বেরিয়ে দলছুট হয়ে কোনও খাদে বসে বিমলা—বিমলা-- বলে ডাকাডাকি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই।
‘কেমন আছো?’ বিমলা এসে হাজির। তার কথার উত্তর দেবার আগেই একজন ক্যামেরাম্যান এসে আমার একটা ছবি ক্লিক করলো। পরিচয় জানতে চাইলে বললেন, তিনি একজন মেডিক্যাল জার্নালিষ্ট। আগামী মাসে তাদের পত্রিকায় আমার ছবিসহ একটি গবেষণা পেপার্স প্রকাশিত হবে।
No comments:
Post a Comment