বিশেষ বাছাই অণুগল্প
শুধু তোরই জন্য
সুমনা ঘোষ দস্তিদার
হাঁড়ি উপচে পড়া ভাত, সঙ্গে পাট শাকের প্যালকা। একটা মাত্র সিদ্ধ ডিম। পাঁচ ভাই পরম তৃপ্তিতে খাচ্ছে। খোশমেজাজে দাওয়ায় বসে বাবা। রোদ ভেঙে ঘামে ভিজে, অনুপস্থিত ছাত্রদের খোঁজে এসেছেন শিক্ষিকা। 'এই সময়ে দাঁড়িয়ে পাঁচটি সন্তান? কী ভাবে মানুষ করবেন? মায়ের শরীরের কথাও তো ভাবতে হয়!'
আনত মুখ, ঘোমটাটা আরও একটু টেনে নেন মা। দীঘল চোখের শ্যামলাপানা মুখ, পানের রসে লাল টুকটুকে ঠোঁট। উত্তর এড়িয়ে বাবা কিছু দেখবার জন্য বারবার ঘরে ঢুকছেন, বেরিয়ে আসছেন। বিরক্ত শিক্ষিকা আবার বলেন,
'দু সপ্তাহ থেকে স্কুলে যায়নি একজনও। সামনে পরীক্ষা। আপনার এই নিশ্চিন্ত ভাব দেখে অবাক হচ্ছি!'
নির্বিকার মুখে বাবা বলেন,
'ওরা লেখাপড়ায় বেশ ভালো। বাড়িতে রোজ পড়ে ম্যাডাম। অশৌচ উঠলেই যাবে।'
'পড়াশুনোয় ভালো বলেই খোঁজ নিতে
এসেছি।' বিরক্তি বাড়ে, 'অশৌচ আবার কীসের?'
মা ঝকঝকে কাঁসার বাটিতে পায়েস এনে সামনে দিলেন। বাবা হেসে বলেন, 'দিদিমণি ক্ষমা করবেন আমাদের। দয়াকরে পায়েসটা খান। প্রথম থেকেই কেবল মেয়ে সন্তান চেয়েছি। মেয়ে সন্তান ছাড়া কি সংসার মনে হয়? প্রতিবারের প্রার্থনা, এবার ঈশ্বর শুনেছেন।' ছোট্ট ভাই হাতের আঙুল ধরে টানতে থাকে, 'দেখবে এসো আমাদের বোনকে।' কাজলের বড় টিপ কপালে, তুলতুলে একরত্তি শিশু ঘুমিয়ে। মেয়ের জন্য এই কাঙালপনা, এই আকুল প্রার্থনা! কেবল মেয়ের জন্যই বাবার এই হাত পেতে থাকায় মন কেমনের অনুভূতি তাকে ভাসিয়ে নেয়। দিদিমণির বুক জুড়ে তখন সুখের চিনচিনে ব্যথা।
No comments:
Post a Comment