গল্প
চৈত্রের শেষে
পর্ণা চক্রবর্তী
নীলু এসে ডাকল, “ও মা ..মা..”
দুপুর গড়িয়ে গেছে। পায়রাগুলো সকাল থেকে ডেকে ডেকে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। নীলু আকাশটা দেখে নিল একঝলক। রবিন ব্লু রঙের ওপর টুকরো সাদা মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওর মন খারাপ হলে একবার আকাশটা দেখে নেয়। ছোটোকাকা বলতো আকাশ দেখলে নাকি বুকের ভেতর সে ঢুকে পড়ে দুঃখ কষ্টগুলো শুষে নেয়। “আমার কি মন খারাপ?,ভাবতে ভাবতে নীলু আবার ডাকল , “মা কি গো…”
পূরবী দুপুরের ভাত ঘুম দিচ্ছিলেন আরাম করে। নীলুর চিৎকারে কাঁচা ঘুমটা ভাঙল।
নীলু চেয়ার টেনে পূরবীর সামনে বসল, “ছোড়দি আসছে সামনের সপ্তাহে ,একটু আগে ফোন করেছিল।” ঘুম থেকে ওঠার পর পূরবীর সব গুলিয়ে যায়।
ছোড়দিটা কে, মনে করতে টাইম লাগল।
“কি গো, বুঝলে ?”
“অ মনু আসবে ? সে তো বাইরে কোথায় যেন থাকে।”
“আগে থাকত বেলজিয়াম। বললাম না সেদিন, এখন কিছু মাস হলো দিল্লিতে থাকছে।” পূরবী খুশি হলো। ছোটো ভাসুরের ওই একটাই মেয়ে মনু। পূরবীকে ভালোবাসত খুব। বাপ মা মারা যেতে অনেক বছর হলো কলকাতায় আসেনা।
নীলু বেরোচ্ছিল। “
“ তুই যাচ্ছিস কোথায়?”
“যাই একটি ঘুরে আসি। কালী বলেছিল আজকে টাকা দেবে।”
কোভিডের সময় চাকরি যাওয়া ইস্তক নীলু আর কোনো কাজই ঠিক করে করল না।এখন বাড়ির দালালি করে। কলকাতার উত্তরে এখন অনেক বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট হয়ে যাচ্ছে। সে সব ফ্ল্যাট বিক্রি, ভাড়া থেকে কিছু রোজগার হয়। পৈতৃক যা আছে তাতে চলে যায় দুজনের। নীলু বিয়ে করতে চায় না। বলে, “রোজগারের ঠিক নেই বিয়ে করে শেষে আরেক ঝামেলা।” রায় বাড়ির অবস্থা আগের মতো আর নেই।কর্তারাও কেউ বেঁচে নেই কিন্তু ছেলেপুলে নাতি নাতনিরা বছরে একবার সব আসে।সবাই মিলে টাকা খরচ করে বাড়িটাকেও মোটামুটি ভালোই রেখেছে। ওপরতলার ঘরগুলো বন্ধ থাকে। নিচের তলায় থাকেন পূরবী আর নীলু। পেছনের দিকে একটা ভাড়া রেখেছেন সবার সম্মতিতে। ভাড়ার টাকাটা পূরবী জমিয়ে রাখেন। কোনো পুজো পার্বণে, কারুর বিয়ে,পৈতে এসব কাজে দিতে লাগে।
পূরবী ভেতরের দালানে এসে বসলেন। সামনের বিশাল উঠানটা একলা পড়ে আছে। আজকের মতো রোদ ছোটো হয়ে বাড়ির কোণে ঘুপচিতে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। আগে হলে কত লোকজন
হাঁকাহাঁকিতে জায়গাটা ভরে থাকত। দোতলার বারান্দা জুড়ে পায়রাদের ডানার ঝাপটে একটা বিষন্ন সন্ধ্যা চুপিচুপি রায়দের তিনতলার বিশাল বাড়িটাতে ঢুকতে লাগল।ভাড়াটের ঘরে শাঁখ বাজল। রাতের রুটি কটা করে পূরবী সিরিয়াল দেখতে বসবেন। খানিকক্ষণ ভুলে থাকবেন রোজের বেঁচে থাকার যন্ত্রণা।
পয়লা বৈশাখের তিনদিন আগে মনু চলে এলো। পূরবী লোক ডেকে দোতলার ঘর,বারান্দা সব পরিষ্কার করিয়ে রেখেছিলেন আগে থেকে।
মনু উবার থেকে নেমেই পূরবীকে জড়িয়ে ধরল।
“ছোটমা তুমি কতো রোগা হয়ে গেছ” নীলু বলল “আর তুই মোটা।”
পূরবী হাসলেন , “বয়স হচ্ছে রোগাই ভালো।” মনু এসেই সারাবাড়িটা ঘুরে দেখতে লাগল। কতদিন পর যেন প্রিয়জনের সাথে দেখা হলো।খালি পুরোনো কথা বলে।
“তোর মনে আছে নীলু, ছাদে আমরা সবাই চড়ুইভাতি করলাম? তোর পড়ে গিয়ে দাঁত ভাঙল আর মা এসে আমাকে পেটালো। তোকে খুব ভালোবাসত রে।” মনুর চোখ ছলছল করে। “সেই মা মারা যাওয়ার পর আর আসাই হলো না।”
“কেন হলো না ছোড়দি? নীলু মনুর পাশে এসে বসল।
“অত দূর থেকে আসা… ওদের স্কুল আমার কলেজ আর…”
“তোর বর পারমিশন দেয়নি সেটাই বল।”
মনু ফিকে হাসলো,”সে ছাড়।
তুই কবে বিয়ে করবি ?সেই যে অখিল কাকুর মেয়েটা কি যেন নাম?” “আমার জন্য বসে থাকবে? কবে বিয়ে হয়ে গেছে।” মনু একটু অবাক হলো, তাই? যাকগে ,ভালো থাকুক।”
মনু খানিক আনমনা। নীলু শব্দ করে হাসল। “সে আর সম্ভব নয়,বেঁচে থাকলে না হয়…. যাকগে তুই বল,কি কি মাছ খাবি, চট করে একবার বাজারটা ঘুরে আসি।”
নীলু একঘর শূন্যতা ছড়িয়ে চলে গেল। পূরবী বলল, “কোভিডের সময় মারা গেল। নীলু যে কতদিন ভালো করে ঘুমোতে পারেনি ।”
মনু চোখ মুছল, “সব যেন কেমন বদলে যাচ্ছে,তাই না ছোটোমা?”
রাতে মনু পূরবীর সাথেই শুলো। বলল, “কত বছর পর এলাম।দোতলায় একা একা শোবোনা।”একবার ছাদে গেল। তিনতলা, দোতলার ঘরগুলো খুলে খুলে দেখল। কোনটা রাঙ্গাকাকার ঘর, বড়জ্যেঠু , ফুলঠাকুমা , ওর পড়ার ঘর,সব যেন মনুকে দেখবে বলে এতদিন বসেছিল। দক্ষিণের বারান্দাটার চারপাশ ঘিরে দিয়েছিল ছোটোকাকা। মনুদের পুতুল ঘর। বারান্দার দেওয়ালে পলেস্তরা খসে পড়ে কতগুলো মুখ তৈরি হয়েছে। তাদের আবছা গালে, ঠোঁটের রেখায় কত বছরের দুঃখ যেন আলগা লেগে আছে। মনু আলতো হাত রাখতেই কতগুলো বাচ্চার সতেজ হইচই উঠে এলো যেন চারপাশ থেকে, “ও কুমির তোর জলকে নেমেছি…” মনু বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে রইল চুপ করে । ছাদের ওপর ভীড় করেছে ছেলের দঙ্গল। আকাশে লাল, নীল ঘুড়ি উড়ছে পতপত করে।
ভো কাট্টা….সমবেত চিৎকার ছাদ থেকে বেরিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নিচে নেমে গেল। নিঝুম দালান । মনুর চারপাশে স্মৃতিরা সাঁতার কাটে। পায়রাগুলো কথা বলে ওর সাথে,
“মনু, মনু কতদিন পর এলে …” .
ওদের বকবকম শব্দটা একটা
ঘুমপাড়ানি গান গাইতে থাকে। কারা যেন ছায়া হয়ে ওর চারপাশে ভিড় করে। কে পাশে বসল , চুড়ি বেজে উঠল। বাতাসে জবাকুসুমের গন্ধ। “কে ,বড়মা ?” চুরুটের গন্ধ মেখে বাবা এসে দাঁড়ায়।
“ফুলঠাকুমা কি দিচ্ছ?” রাধামাধবের প্রসাদের জন্য হাত পাতে মনু।
মা রান্নাঘর থেকে ডাকছে,
“এবার খেতে আয় মনু। পূরবী,
বাচ্চাগুলোকে ডাক।”
মনু ঘুমের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে। বাইরের অলস দুপুরে পাড়া জুড়ে হাঁক ওঠে, বাবা তারকনাথের চরণের সেবা লাগে, মহাদেএ এ.. ব..
ছোট্ট মনুর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফুটফুটে এক কিশোর।
“গাজনের সং বেরিয়েছে,দেখবি না?”হাত ধরে টানে মনুর।
“রাঙ্গাদা তুই তো বেঁচে নেই।” মনু ডুকরে কেঁদে উঠতে গিয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে বসে দেখে নীলু ওর পাশে বসে হাত ধরে টানছে।
“কি রে ছোড়দি বারান্দায় বসে ঘুমোচ্ছিস,আর আমি খুঁজে খুঁজে হদ্দ হলাম,চল,খেতে চল।”
খেতে বসে মনু কাঁদছিল।সারাজীবন ধরে শুধু সবার সাথে মানাতে গিয়ে কতকিছু যে হারিয়ে ফেলেছে ,টেরই পায়নি।। নীলু বলল “কাঁদবি না। আমরা তো আছি। প্রতিবছর ওই একটা দিন তোর কথা সবাই বলে। ভাবি এইবার তুই ঠিক আসবি,আসিসনা। ফোনও ধরিস না তখন। বড়দা আর ফুলদি বলবে পরেরবার ঠিক আসবে। সেই পরেরবার আর আসে না।”
মনু চুপ করে রইল। কি বলবে? ভাস্কর ,ওর ছেলে মেয়ে, যে যার বৃত্তে নিজের মতো থাকে।মনুকে ওদের আর কোনো প্রয়োজন নেই সে কথা কি কাউকে বলা যায়?
গোটা পাড়াটাই যেন বদলে গেছে। নতুন ফ্ল্যাটে নতুন মুখ। পুরোনো লোকজন নেই প্রায়। যারা আছে, তাদের বাড়ির মতো তারাও কেমন বদলে গেছে। বেরং, স্মৃতির ভারে জরজর। শেঠদের মাঠে ক্রিকেট খেলা,শীতের রাতে ব্যাডমিন্টন। সেই ছোটবেলার মাঠটাকে লম্বা একটা বাড়ি কবেই গিলে খেয়ে নিয়েছে। সন্ধ্যাবেলায় চড়কের মেলায় গেল নীলুকে নিয়ে। “মাটির রাজাপুতুল ,রানিপুতুল কোথায় রে নীলু ? আর ওই বেতের ঝুড়ি ?”
খুঁজে পেলোনা মনু। নীলু হাসছে,
“তুই আর বড় হলিনা ছোড়দি, তিরিশ বছর আগেকার জিনিস খুঁজছিস?” মনুর সব কেমন অচেনা লাগে।
নেতাজীর তেলেভাজা কিনে বাড়ি ফেরার সময় এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক একগাল হেসে সামনে দাঁড়ালেন, “কেমন আছিস রে ছুটকি ? বড়দার বন্ধু বাদলদা।”
ছুটকি….. বড়দা ডাকত।কত বছর হলো যেন বড়দাকে দেখেনি ?
রাতে নীলু পনিরের কোফতা আর বাসন্তী পোলাউ করে মনুকে একদম চমকে দিল।
“তুই এত ভালো রান্না করিস কবে থেকে রে?”নীলু লজ্জা পেয়ে হাসে।
“তাহলে একটা খুলেই ফেলি রেস্তোরাঁ কি বলিস।”মনুর মুখ ঝলমল করে। “মনেই ছিলনা, তুই তো আমাদের বাড়ির ফুড টেস্টার ছিলি ,ভালোমন্দ রান্না হলেই তোর ডাক পড়ত।”
“বাড়ির সামনের জায়গাটা নিয়ে শুরু করব, বুঝলি।প্রথমে ইন্ডিয়ান ক্যুজিন থাকবে,তারপর….”
সারারাত ধরে আলোচনা চলে।
“ টাকা কত লাগবে ?”
“সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে।জমানো কিছু আছে, বড়দা,ফুলদি সবাই বলেছে টাকার চিন্তা না করতে।”
ভোর হয়ে আসছে…. মনু বলে “ছাদে যাবি?"
পূবের আকাশটাতে হালকা আলো লেগেছে। গোটা পাড়াটা গভীর ঘুমে। একটা রিক্সা গেল ঠনঠন করে। একটা লোক হনহনিয়ে হেঁটে গেল। “চিনতে পারছিস? বিলটুর ছোটো কাকা।”
মনু বলল, “এত সকালে ?”
“গঙ্গাস্নানে।”
“সেকি রে,এখনো ?”
“সানি মারা যাওয়ার পর থেকে মাথাটা একটু .. যখন তখন গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বসে থাকে।”
“ সানি…”,মনু আর্তনাদ করে উঠল, “জন্মাতে দেখলাম।” নীলু মাথা নাড়ল “ওদের গোটা বাড়ি গাভাস্কারের অন্ধ ভক্ত ছিল, মনে আছে? বাবা- ই তো দিয়েছিল ‘সানি’ নামটা।”
ছাদের কোণে পুরোনো সিমেন্টের বেদীটার ওপর মনু ধপ করে বসে পড়ল । মনু ভাবে কত মানুষের কত দুঃখ তবুও তারা বেঁচে আছে।
“তুই দিল্লিতে না থেকে কলকাতায় চলে আয় না। এখানে এখন অনেক প্রাইভেট কলেজ খুলেছে। একটা না একটা ঠিক পেয়ে যাবি।”
মনু হাসে, ইতস্তত করে।
“ছোড়দি সকলের কিছু না কিছু দুঃখ আছে। দুঃখ কি তোর একার ? আমার নেই ? তুই খালি লুকোস। আমরা তোর আপন জন ছোড়দি,” নীলু মনুর মাথায় হাত রাখে,
“তুই ফিরে আয়। এবার একটু নিজের মতো করে বাঁচ। ওদের জন্য নিজের কেরিয়ার বিসর্জন দিলি।কি লাভ হলো ?”
মনু ডুকরে ওঠে, “তোরা জানিস?” “বড়দা দু,একবার ভাস্করদাকে ফোন করেছিল। তখন খানিকটা আন্দাজ করেছিলাম আমরা।”
মনু বলল, “জানিস না, কিচ্ছু জানিসনা। রাকা কানাডায় একটি নরেজিয়ান ছেলের সাথে লিভিংএ থাকে,ছেলেটা ড্রাগ অ্যাডিক্ট ছিল। রনি জার্মানিতে, তার পার্টনার একটি জার্মান ছেলে। ভাস্কর হঠাৎ করে বেলজিয়ামে চলে গেল,সেখানে কি কি যে করে বেড়ায়…”মনু যন্ত্রণায় ছটফট করে। “আমি বেলজিয়ামে গিয়ে থাকতে পারিনি। বেশ ছিলাম শিকাগোতে । ডিভোর্সও দেবেনা,টাকা দিতে হবে বলে।”
নীলু মনুর সামনে গিয়ে ওর হাত দুটো ধরল। “তুই এত ভালো ছাত্রী ছিলিস আবার শুরু কর। ছোটো জ্যেঠু তোর জন্য যা রেখে গেছে যথেষ্ট । তুই যদি এখানে প্রাইভেটেও ইকোনমিকস পড়াস ,প্রচুর স্টুডেন্ট পাবি কিন্তু।”
মনু একটু হাঁপায়,“হ্যাঁরে সব্বাই জানে?” নীলু ভারি কোমল হাসে । মনু যেন একটা ছোট্ট মেয়ে।
“সবাই তোকে খুব ভালোবাসে ছোড়দি। তোর জন্য আমাদের চিন্তা হতো,কষ্ট হতো।”
নীলু আকাশ দেখে। আকাশে রং লাগতে শুরু করেছে।
মনু ফিসফিস করে বলে, “তোর রেস্তোরাঁর বিজনেসে আমাকে নিবি নীলু? অনেক রকমের রান্না জানি, কন্টিনেন্টাল রান্নাও।”
নীলু হাঁ করে তাকিয়ে রইল খানিক,
তারপর নরম গলায় বলল, “তোকে এটাই বলতে চাইছিলাম.. তুই থাকবি আমার সাথে? তাহলে আরো অনেক ভালো করে…”নীলুর গলা বুঁজে আসে।
মনু হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে।
“মন ভরে কাঁদ। তোর ভেতরের সব কষ্ট দুঃখগুলো ধুয়ে যাক। নতুন বছরে নতুন জীবনের শুরু, তোর আমার জয়েন্ট ভেঞ্চার।” একটা সিগারেট ধরিয়ে টান দিল নীলু। লাল রং মেখে সূর্য উঠছে, আলো ছড়িয়ে গেল বিডনস্ট্রীটের আকাশ জুড়ে। রায়বাড়ির আনাচ,কানাচ ছুঁয়ে বছরের নতুন রোদ, টানা বারান্দাগুলোতে আলপনা এঁকে নিচে নেমে পুরোনো কালো ছাপধরা উঠোনটাকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
নীলু বলল, “ছোড়দি আকাশটা দেখ, ছোটকাকা বলতো মনে আছে?”
নীলু আর মনু ঘাড় হেলিয়ে হাঁ করে আকাশ দেখতে লাগল ছোটবেলার মতো।
No comments:
Post a Comment