ভ্রমণ
সুইডেনে
মিত্রা রায়চৌধুরী
প্রথমবার বিদেশ ছেলে থাকার কারনে আমার কয়েকবার সুইডেন যাবার সৌভাগ্য হয়েছে। প্রথমবার বিদেশে যখন যাই, দুরুদুরু বক্ষে গিয়েছিলাম। নিয়ম-শৃঙ্খলার বাঁধনে পড়ে যাতে পথে কোন অসুবিধায় না পড়তে হয়, সে ব্যাপারে আমরা স্বামী-স্ত্রী এবং আমার ছেলেও খুব চিন্তিত ছিলাম। সেই সময় ভিসার জন্য আমাদের দিল্লী গিয়ে ইন্টারভিউ দিতে হয়েছিল। পক্স হওয়ার কারণে ভিসা বাতিলের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। যাইহোক সব প্রস্তুতি শেষ করে আমরা দমদম থেকে দুবাই হয়ে সুইডেনের একটি শহর "উপশালা"-তে পৌঁছাই। তখন ছেলে ওখানেই থাকতো।
উপসালা সুইডেনের একটি বড় শহর ও শিক্ষা কেন্দ্র বহু ছাত্র-ছাত্রী ওখানে পিএইচডি এবং পোষ্টডক করতে যায়। খুব ভালো লেগেছিল দেখে কলকাতার এক বাঙালি দম্পতির তত্ত্বাবধানে বহু ছাত্র-ছাত্রী ওখানে পোস্ট ডক করছে।। অনেক গল্প হয়েছিল তাদের সাথে এবং আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিলাম ওনাদের কাছ থেকে। সব প্রশ্নই ছিল ওই দেশ ওখানকার অধিবাসীদের সম্বন্ধে।
প্রথমেই বলি ওই দেশটি সম্পর্কে কয়েকটি কথা। প্রকৃতির মধ্যে বসবাস করে ওখানকার মানুষেরা, শহরের কোলাহল থেকে দূরে গাছপালা বেষ্টিত স্থানে এদের বসতবাটি। সুইডিসরা খুব নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলে। প্রকৃতিকে এরা সযত্নে রক্ষা করে। ঘাসকেও ওরা পদদলিত করে না। যেসব গাছপালাকে আমরা আগাছা বলে কেটে ফেলি সেগুলি দিয়েই তারা বাড়ির বাউন্ডারি তৈরি করে। নিয়মিত বাগানের ঘাস কাটা বাধ্যতামূলক। যন্ত্রপাতির সাহায্যে সব কাজ এরা নিজেরাই করে। এরা পশু প্রেমিক। এক এক জনের বাড়িতে দুই তিনটি করে বিড়াল কুকুর থাকে। এদেরকে এরা নিজেদের সন্তানের মত মানুষ করে ও যত্ন ভালোবাসায় লালন-পালন করে। কোথাও বেড়াতে গেলে এদের হয় নিয়ে যায় সাথে, অথবা ক্রেসে রেখে যায়। প্রত্যেকের বাড়িতে গাড়ি থাকলেও এরা সাইকেল চড়তে খুব ভালোবাসে এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে।
উপশালা থেকে আমরা ডেনমার্ক ভ্রমনে গিয়েছিলাম দ্রুত গতি সম্পন্ন বুলেট ট্রেনে। সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছিলাম ওই পথে ট্রেনটি বেশ কিছুটা পথ সমুদ্রের তল দিয়ে গিয়েছিল। ডেনমার্কের জাতীয় বাহন সাইকেল। স্টেশনে একটি বিরাট সাইকেল দেওয়ালে রাখা আছে ওর নিদর্শন হিসাবে। সুইডেন এবং ডেনমার্কের অধিবাসীরা খুবই ভদ্র। ওদের থেকে জেনে নিয়ে আমরা অনেক পথ হেঁটে ঘুরে বেড়িয়েছি এবং দেশটাকে দেখেছি কখনোই ওরা আমাদের ভুল পথনির্দেশ দিয়ে হয়রান করেনি। সিঙ্গেল ফেয়ার ডবল জার্নি এই বিষয়টা ডেনমার্কের চালু আছে আমরা সেটা জানতামই না কিন্তু যতবার আমরা বাসে যাতায়াত করেছি ড্রাইভার আমাদের এটা মনে করিয়ে দিয়েছে, ভিনদেশী বলে আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছে এবং ঠিক জায়গায় নামিয়ে দিয়েছে।
এরপর টাইটানিক-এর মত একটি বড় জাহাজে করে আমরা গিয়েছিলাম ফিনল্যান্ড। ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকি ছিল আমাদের গন্তব্য। সারা দিন ওখানকার দর্শনীয় সব দেখে এবং কিছু কেনা কাটা করে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম-এ ফিরে আসি পরের দিন। জাহাজে প্রচুর আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা ছিল। আমরা শুধু মাত্র দর্শক ছিলাম। অবাক বিস্ময়ে দেখেছি কেবল। কিছুতেই অংশগ্রহন করিনি।
শীতের তীব্রতা সহ্য করতে কষ্ট হবে বলে প্রতিবারই গরমকালে আমরা গেছি সুইডেনে। দেখেছি অপূর্ব ফুলের সমারহ। বাড়ি,রাস্তার ধারে, স্টেশন চত্বরে সব জায়গায় বর্ণময় ফুলের সমারহ। সাজানো গোছানো ছবির মতন সব শহরগুলি। লোক সংখ্যা কম বলে কোথাও যানজট নেই। রাস্তা পার হওয়ার নিয়ম খুবই সুন্দর। যারা হেটে যায় তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। সবই গৃহপালিত পশু তাই রাস্তা কখনো নোংরা হয় না। ইউরোপের অনেক জায়গা দেখে আমার মনে হয়েছে পৃথিবীর তিন ভাগ জল ও এক ভাগ স্থল কথাটা খুব সত্যি। অনেক নদী রয়েছে সেখানে। বাল্টিক সমুদ্র সেখানে শান্ত স্থির। বিশাল সমুদ্র নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে।
এবার আসি সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম শহরে বেড়াতে যাওয়ার প্রসঙ্গে। প্রথমবার গেলাম উপসালা থেকে যেতে এক ঘন্টা লাগে।তখন আমার ছেলের গাড়ি ছিল না। নতুন গেছে বিদেশে। আমাদের বাসের টিকিট কেটে দিয়েছিল আর বলেছিল কি কি দেখে আমরা ফিরে আসব। র্পৌছালাম স্টকহোম।ইতস্ততভাবে এদিক ওদিক ঘুরে রাজবাড়ী আর মিউজিয়াম দেখলাম কিন্তু বুঝলাম ঠিক মতো দেখা হচ্ছে না। তখন টিকিট কেটে উঠে বসলাম একটি টুরিস্ট বাসে। যার নাম "হপ অন হপ অফ "মাথা খোলা বাসটিতে বসে খুবই আনন্দ পেলাম। সব দর্শনীয় স্থান দেখে যেখান থেকে উঠেছিলাম সেখানেই আবার নামলাম। কিন্তু সেদিন আসল স্থানটি দেখা হয়নি। পরে আসছি সেই বিষয়ে। মজা হল ফেরার সময় বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখি উপশালার বাস নেই সেখানে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম চার তলায় যেতে হবে। ওখান থেকেই টিকিট দেবে এবং উপশালার বাস ছাড়বে। ভাবতেই পারিনি যে বাস স্ট্যান্ড আবার চারতলা হয়।উপরে উঠলাম দেখলাম লোকটা সঠিক তথ্য দিয়েছে যাক নিশ্চিন্ত হলাম।
এইভ্রমণ কাহিনীর একবারে শেষ পর্যায়ে এসে গেছি। এবার লিখব আমার অসাধারণ অনুভূতির কথা যেখানে গিয়ে আমি সবচাইতে বেশি আনন্দ পেয়েছি। এবার ছেলে আমাকে নিয়ে গেল রাজধানী স্টকহোম-এর নোবেল মিউজিয়াম দেখাতে। মিউজিয়ামে ঢুকতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। রবীন্দ্র সংগীত বাজছে কণিকা ও সুচিত্রা মিত্রের কন্ঠে, সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিশাল ছবি। গাইড নেওয়া হলো। গাইড আমাদের পুরো মিউজিয়াম ঘুরে দেখালেন। কোথায় নোবেল প্রাইজ দেয়, কোন কোন বিষয়ের উপর দেওয়া হয়, কার নামে দেওয়া হয় সবকিছু বিস্তারিত বললেন। নোবেল প্রাইজ দেওয়ার দিন যে কক্ষে গ্র্যান্ড ডিনার হয় সেটাও দেখলাম। মহা মূল্যবান ধাতুতে তৈরি ডিনার সেটে খাবার পরিবেশন করা হয় সেই সেটগুলো দেখার মত। এখন পর্যন্ত যারা নোবেল পেয়েছেন তাঁদের ছবি পর্দায় ভেসে উঠছে। এক এক করে নিচে মেঝেতেও সমস্ত নোবেল লরিয়েটদের ছবি খোদাই করা আছে। আমাদের প্রিয় কবির প্রতিকৃতি দেখে আর তার লেখা গান শুনে চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। পরের বারও গিয়ে ছেলেকে বললাম ওখানে আবার যাব। ওটা আমার তীর্থক্ষেত্র।
No comments:
Post a Comment