Friday, May 1, 2026


 

প্রবন্ধ 

বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও আমাদের দেশ

                         অভিজিৎ সেন 
                 

সুপ্রাচীন সভ্যতার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বহনকারী বহুত্ববাদের এক ও অদ্বিতীয় পরাকাষ্ঠা আমাদের দেশ ভারতবর্ষ। মানবিক সম্পদ ও প্রাকৃতিক ভূ-বৈচিত্র্যের অপূর্ব সমন্বয়ে  সমৃদ্ধ ভারতবর্ষ। পৃথিবী গ্রহে এমন দেশ বিরল। দেশ শুধু মাত্র একখণ্ড মাটি হয় না। ভারতবর্ষ নির্দিষ্ট ধর্মের নয়, বর্ণের নয়, জাতির নয়। এ দেশে সকলকে ধর্ম, ভাষা, পেশা, শিক্ষা ও আইনী অধিকার সমান প্রদান করা হয়েছে।
 
           একদা ইংরেজ শক্তির হাত থেকে যেদিন জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি ভারতবাসী কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালে পুনরায় স্বাধীনতা অর্জন কর, সংবিধান গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা হল এদেশে গণতন্ত্র। সংবিধানের পাতায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলো প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের কথা। অর্থাৎ ভারতীয় সংবিধানের প্রভৃতি ধারায় এদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাই ব্যক্ত এলো। এখানে দেখা গেল সংবিধান গুরুত্ব দিলো এদেশের বৈচিত্র্যময় সমাজ ব্যবস্থার আদিরূপকে। অর্থাৎ বহুত্ববাদী দর্শনকে। ভারতবর্ষ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখেছে এভাবে। কোন নির্দিষ্ট জাতির,কোন নির্দিষ্ট ধর্মের,কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মৌরসীপাট্টা নয় আমাদের সুপ্রাচীন দেশ ভারতবর্ষ। বিবিধের মিলন বা  বহুত্ববাদী দর্শন এদেশে মানুষে মানুষে মহামিলনের পটভূমি তৈরি করে এসেছে ঐতিহাসিক কাল পর্ব থেকে ধারাবাহিকভাবে। এবং সেই ধারা আজও বহমান। ভারতের  সাংস্কৃতিক মৌল গুণকে কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি, কোন সংকীর্ণ গন্ডিবদ্ধ রুগ্ন চিন্তার ঘন কালো কূটিল মেঘপুঞ্জ গ্রাস করতে পারবে না আমাদের এতোদিনের সৌভ্রাতৃত্বের দৃঢ় বন্ধনকে। ভারতবাসী যুগ যুগ ধরে একটি মন্ত্র তাদের হৃদয়ে,মননে গেঁথে রেখেছে সেই মন্ত্র হলোসহিষ্ণুতা, সেই মন্ত্র হলো সহযোগিতা, সেই মন্ত্র হলো অহিংসা।  
     
ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ করলে যে চিত্রটি আমাদের সামনে দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিশ্ববাসীকে যা বিস্মৃত করে তাহলো এত ভাষা, এত আচার-আচরণ, এত ধর্মীয় বৈচিত্র্য, বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস এবং প্রাকৃতিক ভূ-বৈচিত্র্যের এক অপূর্ব সমন্বয় । এত যে বৈচিত্র্য তবু কোথাও সমন্বয়ের অভাব নেই। ভারতবাসী খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভিন্ন সংস্কৃতির জগতের মানুষকে আপন করে নিতে পারে। অপরদিকে ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষও সহজেই ভারতবর্ষের সমন্বয়ের মন্ত্রকে,সহিষ্ণুতার মন্ত্রকে,অখণ্ডতার মন্ত্রকে আত্মীকরণ করতে কোন অসুবিধা বোধ করেনা। এখানেই ভারতবাসীর জয়। এখানেই বহুত্ববাদী দর্শনের জয়। এদেশ বরাবর সমন্বয় ও সহিষ্ণুতায় বিশ্বাসী । খন্ডে নয় অখন্ডে বিশ্বাসী। হিংসায় নয় অহিংসায় বিশ্বাসী। যুদ্ধে নয় বুদ্ধে বিশ্বাসী । যুগ যুগ ধরে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলে সকলের সংস্কৃতিকে, ভাষাকে, ধর্মকে, আচার-আচরণকে, খাদ্যাভ্যাসকে, পোশাক পরিচ্ছদকে অন্তর থেকে গ্রহণ করেছে। ফলে সমৃদ্ধ হয়েছে ভাষা, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্প। প্রসারিত হয়েছে এ দেশের মানুষের মন ও মনন । 
         
          সীমিত ভৌগোলিক গণ্ডি বা আঞ্চলিকতার বৃত্ত ভেঙে বিশ্বজনীনতা লাভ করেছে ভারতের দর্শন,মনন এবং বহুত্ববাদ । এই পথে হেঁটেই সুপ্রাচীন ভারতবর্ষের সভ্যতা হয়েছে সমৃদ্ধ।। তাই পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে বর্তমানে অস্তিত্ব ধরে রেখেছে ভারতীয় সভ্যতা অপরটি চৈনিক সভ্যতা। 
ভারতীয় সভ্যতা প্রবল ধারায় সমৃদ্ধ হয়ে আজও বহমান হয়ে চলেছে, বহুত্ববাদী দর্শনের ঐতিহ্যকে বহন করে। তুচ্ছতা, সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি পরিবারের মত নানা জাতির, নানা ভাষার, নানা ধর্মের মানুষ পাশাপাশি একসঙ্গে  বসবাস করে চলেছি কারণ ভারতবাসী জন্মগতভাবেই এই বহুত্ববাদকেই মনে প্রাণে গ্রহণ করে এসেছে । ভারতবাসী কখনোই মনে করেনা এটা বিশেষের দেশ বরং  মনে করে এটা নির্বিশেষের দেশ । তাই দেখা যায় যুগ যুগ ধরে অনার্য, আর্য,শক,হূণ,পাঠান,মোগল প্রভৃতি জাতি 
লুট,হত্যা এবং শাসনের উদ্দেশ্যে এদেশে এলেও শেষ পর্যন্ত এই বৈচিত্র্যময় দেশ, এদেশের মানুষের সহিষ্ণুতাগুণ,সহাবস্থানের হৃদ্যতা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যের অফুরন্ত ভান্ডার বিদেশি জাতিদের মনের হিংসা, বিদ্বেষও দূর করে দিয়েছে। তারাও ধীরে ধীরে এদেশের অগণিত জনসমুদ্রে মিশে গেছে। এবং একমাত্র পরিচয় বহন করে চলেছে ভারতবাসী হিসেবে । এই মহান দেশ প্রতিটি মানুষকে দিয়েছে স্বাধীনতা সর্বক্ষেত্রে । ভারতের সংবিধানে সেই অধিকারকেই করা হয়েছে বিধিবদ্ধ 
এদেশে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিকের জন্য।

               প্রাচীন,মধ্য এবং আধুনিক যুগে ভারতের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন এমন কিছু উচ্চ গুণ সম্পন্ন, মানব-প্রেমিক, যাঁরা যুগে যুগে সমাজের কুপ্রথাকে, কুসংস্কারকে, অশিক্ষাকে, সংকীর্ণতাকে, বিদ্বেষকে, জাতিভেদকে দূর করবার জন্য ধারাবাহিক ভাবে আজীবন সেবাধর্ম পালন করে গেছেন। এই মানবতাবাদীগণ প্রচার করে গেছেন অহিংসার মন্ত্র, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে দেখিয়ে গেছেন সত্যের পথ। এঁরা ভারতীয় বহুত্ববাদী দর্শনকে অত্যন্ত সহজভাবে সাধারণের মাঝে তুলে ধরেছেন তাঁদের উপদেশে, কবিতায়, গানে, দোঁহায় এবং বাণীতে। ভারতে ভক্তিবাদী আন্দোলনের সময় এমন কিছু সাধক ও কবিগনের আবির্ভাব হয়েছিল যেমন কবীর,নানক, চৈতন্যদেব, শংকরাচার্য, রহিম, তুলসীদাস, মীরাবাঈ ইত্যাদি। পরবর্তীকালে আমরা পেয়েছি আমির খসরু, মির্জা গালিব, স্বাধীনতা উত্তর পেয়েছি বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, চারণ কবি মুকুন্দ দাস, উর্দু কবি ইকবাল ইত্যাদি কবি, লেখক,যাঁরা তাঁদের কবিতায়, গানে, নাটকে,প্রবন্ধে, ছড়ায়, চিত্রে, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক কর্মকান্ডে ঐক্যবদ্ধভাবে একে অপরের সঙ্গে বেঁধে রেঁধে থেকে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষার কথাই বলেছেন। সংকীর্ণ গন্ডির বাইরে এসে মানবতার,সহিষ্ণুতার,অহিংসার পথই নির্দেশ করেছেন। কবীর তাঁর দোঁহায় বলেছেন,"জব তু আয়া জগৎ মে, লোগ হাঁসে তু রোয়/করনী না করী পাছে হাঁসে সব কোয় ।"অর্থাৎ যখন আমরা জন্মগ্রহণ করি সবাই হাসে আমরা কাঁদি। তোমার জীবদ্দশায় ভাল কাজ কর। এমন কাজ করো না যে তুমি চলে গেলে তারা  তোমার পিছনে হাসবে । ভারতবাসীও যেন ঐতিহাসিক কাল পর্ব ধরে এমন কোন কর্ম করেনি যার জন্য ভারতের ইতিহাস কলঙ্কিত হয়ে আছে। এ কথা ঠিক যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন জাতির মানুষ ভারতবাসীকে শোষণ করেছে,অত্যাচার করেছে ভারত ভূখণ্ডকে দখল করেছে। কিন্তু ভারতবাসী কখনোই সহিষ্ণুতাকে,অহিংসাকে ত্যাগ করেনি। ভারতবাসী 
কখনোই কারো ভূখণ্ড দখল করেনি। ভারতবাসী সারা বিশ্বে অহিংসার বাণী ও প্রেমধর্ম প্রচার করেছে। আমরা সম্রাট অশোককে এই কাজ প্রথম করতে দেখি খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে। এ এক অপূর্ব বিস্ময়, কোন রাজা অহিংসার পথ গ্রহণ করে হিংসাকে সম্পূর্ণ বর্জন করেছেন, বিশ্ব-ইতিহাসে‌ বিরল ঘটনা । দেশে দেশে প্রচার করছেন বৌদ্ধ - দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অহিংসার ধর্মকে। বিশ্ববাসীর কাছে তাই ভারতের সভ্যতা চিরকাল আদর্শ ও অনুসরণীয় হয়ে এসছে। আমরা ভারতবাসী এই অহিংসার নীতিকেই দৈনন্দিন জীবনের পাথেয় করে নিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন তাঁর ''ভারততীর্থ" কবিতায় "দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে/ এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে"--এই পারস্পরিক সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ভারত ভূমিকে বৈচিত্র্যের মধ্যে অখন্ডতার স্বাদ এনে দিয়েছে ।

ভারতবর্ষে যখনই যখনই বিদেশী জাতি আক্রমণ করতে এসেছে তাদের সঙ্গে কোনো না কোনো পন্ডিত ব্যক্তি ও এসেছেন। তাঁরা সেসময়ের ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁদের বিবরণীতে । সেই বিবরণী-ইতিহাস গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তাঁরাও সেখানে ভারতবর্ষের সর্ব ধর্মের সহাবস্থানের কথাই উল্লেখ করেছেন ,প্রশংসার করেছেন। যেমন মেগাস্থিনিসের 'ইন্ডিকা', আল বিরুনী তাঁর ভারত বিবরণীতে,ফাহিয়েন,হিউয়েন সাং -এর ভ্রমণ বিবরণী সাক্ষ্য দিচ্ছে যে সুপ্রাচীন কাল থেকেই ভারতবাসী 
অহিংস-নীতি এবং বহুত্ববাদী দর্শনেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। আর্য পূর্ববর্তী সিন্ধু সভ্যতার তথা অনার্য সভ্যতার যতখানি তথ্য আমাদের সামনে এখনো পর্যন্ত উঠে এসেছে সেখানেও দেখা যায় সহিষ্ণুতা ও সমন্বয়ের বিষয়টিকে। পরবর্তী আর্য যুগে  রচিত বেদের আদি-ঋক বৈদিক পর্বে আমাদের সমাজে নারী পুরুষের সমান অধিকার লক্ষ্যনীয় । বিদুষী মহিলা হিসেবে গার্গী,মৈত্রী,অপালা,লোপামুদ্রা ইত্যাদির নাম উঠে আসছে। আর্য পরবর্তী প্রতিবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা বৌদ্ধ,জৈন,আজীবিক,চার্বাক প্রভৃতি দর্শন ভারতের বিভিন্ন দর্শনের সমন্বয়কেই ইঙ্গিত করে। ভারতীয় ভাববাদী দর্শন,প্রকৃতীবাদী দর্শন,ষড়দর্শন, বৈদান্তিক দর্শন সমন্বয়কেই সমর্থন করে ।পরবর্তীকালে ভারতবর্ষে এসেছে ইসলাম ধর্ম। তাদের প্রভাব ভারতীয় জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত হয়ে আছে কি ভাষা,কি পোশাক-পরিচ্ছদ,কি ধর্মীয় বিবর্তন,কি শাসন ব্যবস্থা,কি শিক্ষা কি আচার-আচরণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে । আমাদের বাংলা ভাষায় মধ্যে বহুল পরিমাণে আরবি,ফার্সি শব্দ ব্যবহার করে চলেছি। এগুলোকে কোনভাবেই জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কারণ এগুলো আমাদের মনের ভাবকে সহজভাবে, প্রাণবন্ত ভাবে প্রকাশ করে থাকে । আমাদের বহু খাদ্যাভ্যাস ইসলামীয় ও অন্য জাতির দ্বারা প্রভাবিত। নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে নব নব রূপ ধারণ করেছে। ভারতবাসী এভাবেই মিশ্র  সংস্কৃতিকে মনে প্রাণে যুগে যুগে গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হয়েছে এবং ভারত ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে তার উত্তরপুরুষগণ ।
               
               স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সমগ্র ভারতবর্ষ যে সংবিধানকে গ্ৰহণ করেছে সেও ইংলন্ড ,আমেরিকা, আয়ারল্যান্ড প্রভৃতি দেশের থেকে প্রয়োজনীয় অংশ নেওয়া হয়েছে। ভারতের সংবিধানে ভারতীয় সকল জনগণের অধিকার প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ৩য় খন্ডে ১২ নং থেকে ৩৫ নং ধারায় জনগণের মৌলিক অধিকার বর্ণিত হয়েছে।১৪ থেকে ১৮ নং ধারায় সমতার অধিকার আছে। এখানে বলা হয়েছে ধর্ম,বর্ণ,লিঙ্গ,জন্মস্থান অনুযায়ী সমানঅধিকারের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা যাবে না। ১৯ থেকে ২২ নং ধারায়প্রদান করা হয়েছে স্বাধীনতার অধিকার। শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, সমিতি ও সংঘ গঠনের অধিকার,অবাধে চলাফেরা ও বসবাসের অধিকার এবং যে কোন পেশা নির্বাচনের অধিকার। ২৩ ও ২৪ নং ধারা শোষণের বিরোধিতা করে রচিত। মানব পাচার, জোরপূর্বক শ্রম, ১৪ বছরের কম বয়সীদের কারখানায় ও বিপজ্জনক কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ।২৫ ও ২৮ নং ধারায় দেওয়া আছে সকলকেই নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার। দেওয়া আছে বিবেকের স্বাধীনতা,প্রচারের ও প্রসারের স্বাধীনতা।২৯ ও ৩০ নং ধারায় দেওয়া আছে সংস্কৃতি ও শিক্ষার অধিকার। সংখ্যালঘুদের নিজস্ব ভাষা, লিপি ও সংস্কৃতি সুরক্ষার অধিকার।৩২ ও ৩৫ নং ধারায় আছে সাংবিধানিক প্রতিকারের অধিকার। কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান যদিকারো মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে  তখন আদালতের আশ্রয় নিতে পারে। সুপ্রিম  কোর্ট রিট জারি 
করতে পারে। অর্থাৎ বহুত্ববাদী দর্শনের অনুসারী ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি আধুনিক যুগে জাতি,ধর্ম,বর্ণে,জন্মস্থান নির্বিশেষে সকলকে সমান অধিকারের মধ্যদিয়ে গণতান্ত্রিক, প্রজাতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে বিশ্বের দরবারে হাজির করেছে নিজেকে। সঙ্গে রেখেছে অহিংসা,অখন্ডতা, সহিষ্ণুতা ও সমন্বয়ের ঐক্যতানকে । এ শতক যুদ্ধের নয়, পারস্পরিক সহযোগিতার ও‌ সমন্বয়ের। গ্লোবালাইজেসন প্রকৃত অর্থে তখনই সম্ভব। বিশ্ব দু-দুটো বিধ্বংসী বিশ্বযুদ্ধের লেলিহান আগুনে পুড়েছে, মানবতাকে ধুলোয় মিশে যেতে দেখেছে । ভারতীয় সভ্যতা কখনই যুদ্ধের পক্ষে নিজের অভিমত ব্যক্ত করেনি বরং বারে বারে অহিংসা ও  আলোচনার মধ্যদিয়ে বিভেদকে, বিদ্বেষকে দূর করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করেছে।যে কোন সমস্যার সমাধান সম্ভব গঠনমূলক শান্তিপূর্ণ আলোচনার মধ্যদিয়ে। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক মহলে ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রক্ষা করতে গঠিত জাতিসংঘেও সেই কথাই বলে চলেছে ভারত বারে বারে।There is not a single problem in our world that will not be solved by peaceful discussion. ভারত সে পথের পথিক। আমাদের আদর্শ তাই বুদ্ধ, অশোক, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ । আমরা মনে করি সর্বধর্মসমন্বয়ের মধ্য দিয়েই সহজে প্রকৃত সত্যে পৌঁছানো সম্ভব। বেদান্ত দর্শন সকল মানুষের মধ্যে অভেদ সম্পর্ক খোঁজে । বাউল জাত ধর্মের সংকীর্ণ গন্ডি অতিক্রম করে তার মনের মানুষকে খুঁজে বেড়ায়। স্বামী বিবেকানন্দ  আমেরিকার শিকাগোতে ধর্মীয় মহাসম্মেলনে যোগদান করেন এবং ভারতবর্ষ যে বহুত্ববাদী দর্শনের আকরঘর বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সমন্বয় ও সহাবস্থানের মিলনক্ষেত্র, বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন সহজ সরল সাবলীল ভাষায়। রামকৃষ্ণ তাই অনায়াসেই বলেন "যতো মত ততো পথ" । বুদ্ধের "অষ্টাঙ্গিক মার্গ" মানুষকে সত্যের পথেই চালিত করে । সে পথে চালিত হয়েছেন সম্রাট অশোক । আমাদের অশোকস্তম্ভ এই সত্যের প্রতীক। উপনিষদ বলে, "সত্যমেব জয়তে" এই নীতির কারণেই আমরা ভারতবাসী সমস্ত পৃথিবীর মানুষকে নিজেদের আত্মীয় ভেবে আপন করে নিতে পারি‌,"বসুন্ধরম্কু টুম্বকম" ।
                 
       পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব হয়েছে আফ্রিকা মহাদেশ। তারপর বহু পথ পরিক্রমা করে মানুষ এসেছে ভারতবর্ষে। নিগ্রোটো, প্রোটো অষ্টোলয়েড, অস্ট্রিক [কোল, ভিল , সাঁওতাল, মুন্ডা,ওরাও প্রভৃতি আদিবাসী] মঙ্গলয়েড, দ্রাবিড়, আর্য, শক হূণ, মোগল,পাঠান আরো কত বিদেশি জাতি সব মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে ভারতের অগণিত জনস্রোতে, এদের উৎসের সন্ধান করা সম্ভব নয়। একে অপরের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে আছে সকলে। ফলে বৈচিত্র্য, বহুমাত্রিকতা ভারতের জনবিন্যাসে স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। নানা কারণে অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে কত জাতি হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ভাষা। হারিয়ে যাচ্ছে তাদের বহুদিনের সাংস্কৃতি। তবুও বিবর্তনের পথ ধরে অজস্র শ্রেণীভুক্ত সমাজে বহু ভাষা ও সংস্কৃতি কোন না কোনভাবে টিকে আছে। এই বৈচিত্র্যেই ভারতের শক্তি,ভারতের সৌন্দর্য, ভারতের নিজস্ব পরিচয় । বহুত্ববাদী দর্শন শুধুমাত্র ভারতের একতাকে, অখণ্ড- তাকে, রক্ষা করে চলেছে তাই নয় এই দর্শনের আলো ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর অন্যান্য ভূখণ্ডেও। এখানেই ভারতের সার্থকতা ।

           ভারতের সংবিধানে ২২টি ভাষাকে প্রধান ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে । ভারতে ৪00র বেশি ভাষা ও উপভাষা আছে । ভারতে হাজার হাজার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিদ্যমান ।ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির মূল কথা হলো--ভালো আচরণ ভদ্রতা, অন্যদের সম্মান ও একসাথে অগ্রগতি । এটাই আমাদের বহুত্ববাদী দর্শন । ভারতীয় খাবার, রন্ধন পদ্ধতি, বিভিন্ন নৃত্যশৈলী যেমন কথাকলি, কত্থক, মোহিনীঅট্টম, কুচিপুড়ি, ওডিসি, মণিপুরী ও সতত্রিয়া । বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন ঈদ, বড়দিন, বৈশাখী, দীপাবলি, হোলি,  মকর সংক্রান্তি, মহাবীর জয়ন্তী, বুদ্ধ পূর্ণিমা । হিন্দু ধর্ম, ইসলাম ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম, শিখ ধর্মের পাশাপাশি ভারতে আছে ইহুদি ধর্ম, জরাষ্ট্রবাদ, বাহাই ধর্ম, ইয়েজিদি বাদ, খ্রিস্টান ধর্ম । এছাড়াও আছে নাস্তিকবাদ, সংশয়বাদ, ধর্মনিরপেক্ষ, আহমদীয়া মুসলিম জামাত প্রকৃতির সহাবস্থান, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যকেই সগৌরবে তুলে ধরে ।যা ভারতের বহুত্ববাদী দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গির সাক্ষী বহন করে চলেছে ভারত ভূখণ্ডের অস্তিত্বের সূচনা থেকে ।

No comments:

Post a Comment