Friday, May 1, 2026


 

গল্প 

খিদে

অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী


বেবি ওয়ার্ডে ঢুকে নিজের অজান্তেই চোখটা চলে গেল সেই বাচ্চাটার দিকে। কদিন ধরে ভর্তি আছে এখানে। দিন দশেক আগে যেদিন নাইট ডিউটি ছিল, সবকিছু সেরে গভীর রাতে রেস্ট রুমে যেতে না যেতেই নারী কন্ঠের তীব্র কান্নার আওয়াজে চারিদিকের স্তব্ধতা কেঁপে উঠেছিল যেন। ওরা তিনজনই ছুটে এসেছিল এমার্জেন্সিতে।

রাতে সরকারি এই হাসপাতালের ছবি দিনের চাইতে পুরোটাই আলাদা। চেনা জায়গাগুলো, চেনা মানুষগুলো সবই কেমন অচেনা হয়ে পড়ে হঠাৎ করে। দিনে যে ডাক্তার স্নেহময়, যে ওয়ার্ড বয়ের 'দিদি' সম্বোধনে যথেষ্ট সমীহ থাকে, পেশেন্ট পার্টির লোকজন ভদ্রতা টুকু বজায় রেখে কথা বলে বেশিরভাগ সময়ই, তাদের সবকিছু অদলবদল হয়ে যায় কেমন রাত বাড়তে থাকলে। কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও ডাক্তার, ওয়ার্ড বয়, পেশেন্টের সঙ্গে আসা পুরুষ মানুষ সকলেরই চোখের দৃষ্টি তখন এক। অকারণেই যখন তখন ডেকে নেন ডাক্তার, ভদ্রতার নির্দিষ্ট সীমানা পেরিয়ে অকারণ কথা বলতে বলতে গায়ে গা ঠেকায় রোগীর সঙ্গে আসা লোকগুলো।শিক্ষিত, অশিক্ষিত সকলের চোখেই সর্বগ্রাসী খিদে। তারমধ্যে পেটে তরল চালান হলে তো কথাই নেই।

                                  যাদের সঙ্গে ডিউটি পড়ে আলোর,  সেই পঁচিশ ছাব্বিশ বয়সী ওরা বেশিটাই একসঙ্গে থাকার চেষ্টা করে  সবাই মিলে। এমনকি টয়লেটে তিনজন একসঙ্গে ঢোকে বড় কোনো বিপদ এড়াতে। আধো আলো আধো অন্ধকার প্যাসেজগুলো হাত ধরে নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ করে পার হয়।
বাবার চোখে এক অন্য খিদে দেখেছিল। মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করার খিদে, নিজের পায়ে দাঁড় করানোর খিদে। সারাজীবন নিজের স্কুলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ভালো মানুষ বাবার এটুকুই তো চাওয়া। বিশেষ করে এর দাম দিতেই সায়েন্সের ভালো বিষয়ে মাস্টার্সের পরেও শিক্ষাক্ষেত্রের চাকরির দরজাগুলো যখন মুখের সামনে বন্ধ হয়ে যেতে বসল, তখনই নার্সিং  প্রফেশনকে বেছে নেওয়া আলোর।

মাত্রা ছাড়ানো জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়েছিল সেদিন এই ছোট ছেলেটা। চার পাঁচ বছরের ক্ষীণ শরীরটায় মুখটাই কেবল টুলটুলে। অত রাতে রাস্তার কোনো একটা মালবাহী গাড়ির ড্রাইভারকে কোনমতে দাঁড় করিয়ে ডুয়ার্সের প্রত্যন্ত একটি চা- বাগানের রাস্তা থেকে জেলা সদরের হাসপাতালে পৌঁছেছিল ওরা কোনমতে। জন্ম থেকে থ্যালাসেমিয়ার শিকার শিশুটি আর বন্ধ চা বাগানে দারিদ্র্য, অনাহারের শিকার তার বাবা- মা তাকে জন্মাবধি অপুষ্টি,অসুখবিসুখ আর খিদের যাতনা ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি। এ'কদিনের মধ্যে যখন যেভাবে ডিউটি পড়েছে, বাচ্চাটার প্রাথমিক সংকট কেটে যাবার পর ওকে  দুর্বল হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলার চেষ্টা করতে দেখেছে আলো। ডাক্তার বাবুদের হাতে পায়ে ধরে ওর বাবা মায়ের আকুতি দেখেছে।

সহকর্মী সোমা বলছিল ডাক্তার বসু নাকি বলেছেন বাচ্চাটার বাঁচার আশা খুব কম। কাছে গিয়ে আলো দেখল ওর বাবা- মা মনমরা হয়ে বসে আছে নির্জীব শিশুটির সামনে। ছোট্ট বুকটা তিরতির করে ওঠানামা করছে ছেলেটার। কপালে হাত দিয়ে দেখল বেশ জ্বর আছে এ মুহূর্তে। শুনল,খানিক আগেই ডাক্তার দেখে গেছেন।

প্রতিদিনের মতোই এরপর নানারকম কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হলো আলোকে। রোগীদের দুপুরের খাবার নিয়ে ট্রলিগুলো তখন ওঠানামা করছে এ তলা -ও তলা জুড়ে। প্যাসেজ ধরে এগিয়ে আসতে আসতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হলো। আরো কিছু রোগী ও অন্যান্য মানুষদের ভিড়ে সেই বাচ্চাটা। মেঝেতে বিছোনো কম্বলে ওর প্রাণ বেরিয়ে যাওয়া নিথর শরীর। কিছু মাছি ভনভন করছে ছোট্ট সেই শরীর ঘিরে। পাশে ওর বাবা-মা হাসপাতালের দেওয়া খাবার গোগ্রাসে খেয়ে চলেছে নিজেদের মধ্যে প্রায় কাড়াকাড়ি করে। যেন জীবনে শেষ বারের মতো পেট ভরে খেয়ে নিতে চাইছে এখান থেকে ফিরে যাবার আগে। ওদের কালশিটে পড়া চোখের কোলে ছেলে হারানোর অশ্রুবিন্দু আর ঘোলাটে চোখের তারার খিদে মেটার স্বস্তি একসঙ্গে জ্বলজ্বল করছে যেন। মৃতের শরীর ছেড়ে মাছিরা তখন উৎসাহী সেই মনোযোগী খাবারের থালার ওপর।

অনেকগুলো মুখ, অনেকরকম খিদে একসঙ্গে উঁকি দিয়ে গেল নিমেষেই। চেনা কিছু স্বার্থপর মানুষজনের লোক ঠকিয়ে সর্বস্ব আত্মস্থ করার খিদে, আলোর সত্যিকারের ভালো বাবা মাকে প্রতিনিয়ত ছোট প্রতিপন্ন করে পরিবারের কিছু চালাক লোকজনের সকলের চোখে ভালো সাজার খিদে, মেসেঞ্জারে, হোয়াটসঅ্যাপে স্কুল কলেজের কোনো স্যার ও বাবা কাকার বয়সী লোকগুলোর মিষ্টি মিষ্টি কথার ফাঁদে ফেলে শরীরের কদর্য, বিকৃত খিদে মেটানোর প্রস্তাব....  সারা শরীর গুলিয়ে বমি উঠে এলো ......

সামনের এই দৃশ্যটার কাছে, চরম অনটন, পেটের খিদের জ্বালা যা সন্তানের মৃত্যুকেও হার মানে, তার সামনে দাঁড়িয়ে সবটাই বড় শূন্য লাগছিল আলোর। অসহায় লাগছিল। জায়গাটা ঘিরে ভিড় বাড়ছিল ক্রমশ। সেই সুযোগেও গায়ে গা ঘষে নিতে এগিয়ে আসছিল নোংরা কিছু লোক ভনভন করা ওই মাছি গুলোর মতোই। নিজের নরমসরম খোলস ভেদ করে রুখাসুখা  এক সিস্টার দিদি বেরিয়ে পড়ল হঠাৎ। বাধ ভাঙা ব্যর্থ চোখের জলগুলোকে ফেরত পাঠিয়ে লাল টকটকে চোখ পাকিয়ে নার্সের স্বভাবসিদ্ধ কঠিন গলায় চিৎকার করে উঠল, 'তফাৎ যাও.... '

No comments:

Post a Comment