Friday, May 1, 2026


 

গল্প 

ঝামা

মৌসুমী চৌধুরী


_টিং টং... টিং টং...
এত সকালবেলায় আবার কে রে বাবা!
এই সময়ে দুই ছেলেই অফিসে থাকে, বাড়িতে তিনি একা। এই সময় বিশেষ কেউ এ বাড়িতে আসে না। কলিং বেল শুনে ধীরে ধীরে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন বিভাবতী। গত রাত থেকে বাতের ব্যথাটা আবার বেড়েছে। তাই তাড়াতাড়ি হাঁটতে চলতে পারছেন না। আবার _ টি টং...টিংটং...
_ " আসতাছি রে বাবা। আসি...কে অত 
 ঘুড়ায় জিন দিয়া আইচ ... খাড়াও ..."
    দরজা খুলে বিভাবতী দেখলেন কিছু উঠতি বয়সের ছোকরা, তাঁদের পাড়ারই ছেলে। মুখগুলো চেনা। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘোরে ফেরা করে। কিন্তু কোন্ দল এই মুহুর্তে ঠিক মনে করতে পারলেন না তিনি। 
   ছেলেগুলোর মধ্যে একজন বেশ ধোপদুরস্ত পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা। হাত জোর করে মুখে বিনয়ের হাসি ফুটিয়ে তুলে বলতে শুরু করল,
_ " মাসীমা, আমাকে চিনেছেন তো? আমিই এই ওয়ার্ডের পৌরপিতা।"
এবার ছেলেটাকে ঠাওর করতে পারলেন বিভাবতী। গতবারও ভোট চাইতেই এসেছিল, জোড়া ঘুঘু চিহ্নের প্রার্থী হয়ে। 
_" মাসীমা, আমর কথা তো সব জানেনই। আমি আপনাদের ড্রেন সংস্কার করেছি মানে আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেন তৈরি করে দিয়েছি, বিশুদ্ধ পানীয় জল ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছি, প্রতি সপ্তাহে এই এলাকার প্রতিটি বাড়ির আনাচে কানাচে, ড্রেনে ড্রেনে মশা মারার ঔষধ দেবার ব্যবস্থা করেছি। ডেঙ্গুদমনে আমিই সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছি বলতে পারেন। 
 _ ' তা তো বুঝলাম। কিন্তু... "
বিভাবতীকে শেষে করতে না,দিয়ে ছেলেটি আবার বলা শুরু করে, 
-- "তারপর এই তো আপনাদের মতো প্রবীণ নাগরিকদের কাছে বার্ধক্য ভাতা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ইত্যাদি সরকারের সমস্ত জনকল্যাণমূলক পরিষেবা তো আমিই পাঁচ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন ও সুষ্ঠুভাবে পৌঁছে চলেছি। ঠিক কিনা, বলুন? হে হে ... একেবারে একশ শতাংশ কাজ আমি করে দিয়েছি ... হে হে... সবাই তো জানেন এসব, মাসীমা নতুন কিছু নয়।"
 এক নাগাড়ে নিজের কাজের খতিয়ান দিয়ে একটা কিনলের বোতল খুলে গলায় জল ঢালল ছেলেটি।

       এবার তার সঙ্গের এক ছোঁরা বিভাবতীর হাতে চারটি ছোট ছোট ছাপান চিরকুট এগিয়ে দিয়ে বলল,
_" নিন মাসীমা, আপনার বাড়ির চারটে ভোটই কিন্তু আমাদের। আবদার জানিয়ে গেলুম ...আর কিছু দরকার হলে আমাদের ডাকবেন, পাবেন পাঁচ বছরভর।"
   ওদের হাত থেকে কাগজগুলো নিয়ে
নজর বুলিয়ে বিভাবতী তো থ'। এতে কই ঘু ঘু চিহ্ন? নেই তো ! তার বদলে বড় একটা সম্পূর্ণ ফোটা গোলাপফুল আঁকা!
_ " একি? ঘুঘুর ছবি নাই ক্যান? গতবারে তো..."
_ " গতবারের কথা ভুলে যান মাসীমা।
    আবার মুখ খুলল সেই প্রার্থী ছেলেটি।
_ " ক্যান? ক্যান ভুইল্যা যাইতে হইব ? "
  অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন বিভাবতী।

_ " না মানে মাসীমা, ওদের সঙ্গে আর কাজ করতে পারছিলাম না আমি। দলে আমার কোন গুরুত্বই ছিল না। মানে..."
স্মার্ট ভঙ্গিতে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল ছেলেটি।
 তার আগেই সঙ্গের এক চ্যালা কীর্তনের দোহারের মতো কতা ধরে,
  _" দাদা এখন আমাদের দলে যোগদান করেছেন, মাসীমা। দাদা আর ওদের দলে নেই, ওরা ওঁকে যোগ্য মর্যাদা দিতে পারেনি। দাদাকে এবার টিকিট দেওয়া হয়নি। তাই এবার তিনি আমাদের হাত শক্ত করেছেন। এই গোলাপ-ই এখন দাদার চিহ্ন...এতেই বোতাম টিপবেন, কেমন?"

_ " অ... বুজলাম। তা অগো লগে কাম করতে পারতাছিলা না কইলা, কিন্তু এই
যে এতক্ষণ ধইরা যে এত এত এত কামের খতিয়ান শুনাইলা! শয় শতাংশ কাম কইরা ফেলাইছ কইলা। তয় এই কামগুলান কিভাবে করলা?"
 " নাহ্... মানে, মাসীমা, শুনুন...মানে..."
_" আরে মানে মানে করতাছ ক্যান? শুননের কি আছে আর? অহন তুমরা আসো। আমার ম্যালা কাম পইড়া আছে। তুমি দল বদলাইছ। তয় নতুন বছরে আমিও এইবার আমার পছন্দ বদলামু... বুঝলা কিনা।"
 _ " না মানে মাসীমা... একটা কথা শুনুন...."
   দড়াম করে মুখের ওপর দরজাটা বন্ধ করে দেন বিভাবতী।
_ "যইত্তসব!!! আবোধা ছাতা!"

No comments:

Post a Comment