Friday, May 1, 2026


 

গল্প 


আচারের কৌটো

তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য্য

পাকদন্ডী পথ ধরে সকালের প্রথম গাড়িটা এসে থামলো ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটার ওই তিন-চারটে দোকান নিয়ে গড়ে ওঠা বাজারটায়। সেই চালসা থেকে কালিম্পং জেলার প্রত্যন্ত এই গ্রামটিতে হাতে গোনা কয়েকটি গাড়িই আসে সেগুলোই পরিবহনের ভরসা এখানকার মানুষদের।আর আসে পর্যটকদের গাড়ি,তবে খুব কম। এই নির্জন পাহাড়ী গ্রামটা এখনো সেভাবে পর্যটকমহলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।তবু ওই যে কজন আসে,তারাই হয়ে ওঠে এই বাজারটিতে খাবারের দোকান চালানো নিমা দিদির হাসিমুখের কারণ। স্থানীয়রা তো খায়,তবে পর্যটক এলে রোজগারটা একটু ভালো হয়। 

নিমা দোর্জে। স্বামীর চাবাগানের কাজটা চলে যাওয়ার পর সংসারে দায়িত্ব সামলেছেন এই দোকানটা চালিয়েই। কয়েক বছর হল স্বামী গত হয়েছে, এখন তিনি একাই এই দোকান নিয়েই হাসিমুখে থাকেন বোধিসত্ত্বের আশীর্বাদে। নিজের বাগানে ডাল্লে, টুকটাক সবজি করেন আর সেগুলোই ব্যবহার করেন তার তৈরি মোমো কিংবা থুপ্পাতে আবার নিজের হাতেই আচার বানিয়ে বিক্রি করেন। কতো পর্যটক নিয়ে গেছে নিমা দিদির ডাল্লের আচার। আর দ্বিতীয়বার এলে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন নিমা দিদিকে। আর সে আনন্দ নিমা দোর্জে ভুলে থাকেন তার সকল দুঃখ।

আজ চালসার গাড়িটায় শহর থেকে ফেরা গ্রামবাসীদের পাশাপাশি নেমে এলো এক অর্বাচীন ছেলে।নিমা তাকেই লক্ষ্য করছিল। কলেজে পড়ে হয়তো,দিব্যি একটা ব্যাগ কাঁধে একা বেড়িয়ে পরেছে। সে গাড়ি থেকে নেমেই গ্রামের কয়েকজনের সঙ্গে নিমার দোকানেই এসে বসলো। নিমা যত্নসহকারে সকলকে পছন্দের খাবার পরিবেশন করার তোরজোড় শুরু করে দিল।মোমো খাওয়া শেষ হতেই ছেলেটি একমুখ হাসি নিয়ে নিমার সঙ্গে আলাপচারিতা শুরু করলো। অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্নে সে নিমাকে বিদ্ধ করে চলেছিল। তার বাগান নিয়ে,তাদের সংস্কৃতি নিয়ে, জীবনচর্চা নিয়ে আরো কতো কী নিয়ে। এটাই নাকি ছেলেটার পড়াশোনা। পাহাড়ের প্রত্যন্ত একটা গ্রাম,হাতে গোনা কয়েকটা মানুষের বাস, পর্যটন আর চাবাগানের কাজ যাদের নুনের জোগান, তাদের নিয়ে পড়াশোনা।নিমার ভারী অদ্ভুত লাগছিল আর সঙ্গে একটু বিরক্তিও। তবু নিমা হাসিমুখে ছেলেটির সাক্ষাৎকারের অংশী হল।ছেলেটির চোখের মধ্যে যে একটা অদ্ভুত মায়া আছে,সে মায়ার সামনে নিমার বিরক্তি উবে যাচ্ছিল। এরপর সে ছেলে বেড়িয়ে পড়লো গ্রামের পথে, বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে চললো প্রশ্ন দিস্তি হাতে আর নিমা বিস্ময় চোখে দোকান পড়ে রইল।

দূরের পাহাড় যখন মেঘে ঢেকে বেলাশেষের ছায়া পড়ে আসছিল বাজারটা,তখন সে ছেলে তার অনুসন্ধান সেড়ে আঁকাবাঁকা গ্রামের পথ ধরে নিমার দোকানে হাজির হল।তার কাজ অনেকটাই হয়ে গেছে, এবার তার ফেরার পালা। সে নিমাকে একটা মিষ্টি করে ধন্যবাদ দিয়ে, মোড়টায় অপেক্ষা দাঁড়ালো চালসা ফিরতি গাড়ির। সে অপেক্ষায় বিকেলে গড়ালো,গাড়ির দেখা নেই। এদিকে নিমার দোকান গুটিয়ে ফেলার পালা।নিমা লক্ষ্য করলো সে ছেলের মায়ার চোখে অন্ধকার নেমেছে,আর নিমাই বা কিভাবে এই মায়ার চোখ দুটিকে অন্ধকারে ফেলে ঘরে ফেরে। বোধিসত্ত্বের অনুসারী নিমা,এই নিরাশ্রয়কে ঠাঁই না দিয়ে পাড়ে।সে ছেলেকে নিমা নিয়ে গেল তার ঘরে। আজ নিমার নিজের ছেলেটা বেঁচে থাকলেও তো এর বয়সী বা একটু বড় হয়তো।নিমার ডাল্লের বাগান আর আঁচার নিয়ে সে ছেলের কৌতুহল আর প্রশ্নে রাত পার হয়ে চলেছিল নিমার ঘরে।আর নিমার মনে ধাক্কা দিয়ে চলেছিল তার নিজের ছেলেটার মুখটা।এই কয়েক ঘন্টা আগে পরিচিত ছোট্ট ছেলেটি পঞ্চাশ উর্ধ্বে নিমা দোর্জের মনে অনুরণিত করেছিল তার ছেলে-স্বামী নিয়ে সংসারের দিনগুলোকে,যে দিনগুলো হারিয়ে গেছে ভাগ্যচক্রে।

পরদিন সকালে সেই মায়ার চোখের ছেলেকে বিদায় জানাতে গিয়ে নিমার চোখে নেমে এসেছিল ঝরনাধারা। কিন্তু সে ছেলেকে তো ফিরতেই হবে নিজের ঘরে আর নিমা থেকে যাবে এই পাকদন্ডীর পথের ধারে দোকান নিয়ে। চালসার গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়ার আগে নিমা ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল তার নিজের হাতে তৈরি একটা ডাল্লের আচারের কৌটো। সে ছেলে মিষ্টি হেসে বলেছিল, তুমি আমায় হাতে হাতে লঙ্কা দিলে, লঙ্কা দিলে তো সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।আর নিমা বলেছিল, কিচ্ছু হবে না,এই লঙ্কার আচারের কৌটোটাই তোকে মনে করিয়ে দেবে পাহাড়ের ছোট্ট গ্রামটার মায়ের সম্পর্কে। সেদিন ছেলে-মায়ের চোখের জল প্রবাহে দূরের পথে ভেসে গিয়েছিল গাড়িটা।

নিমা দোর্জের সে কথাই সত্যি হয়েছে। আচারের কৌটোটা এতবছর পরেও মনে করায় তার কথা সেই ছেলেটাকে। তাই তো সে লিখতে বসে আচারের কৌটো নিয়ে, নিমা দোর্জেকে নিয়ে।

No comments:

Post a Comment