প্রবন্ধ
নারী জীবনের সেকাল, একাল
রুমা দেব মজুমদার
"বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণ কর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।"
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই লেখনীতে নারীজাতির অবদানকে বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যুগে যুগে সমাজে, সংসারে নারী জাতি যেভাবে গৃহীত ও পরিচালিত হয়েছে, তার করুণ চিত্র আমরা ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই দেখতে পাই।
শতাব্দির পর শতাব্দি কেটে গেছে নারী জাতির অবদানের স্বীকৃতি বা অস্তিত্বের মূল্য পেতে। পাথর চাপা ঘাসের মতো মেয়েদের জীবন ছিল বিবর্ণ, মলিন। তার অস্তিত্ব, ইচ্ছা, চাওয়া-পাওয়া, বুদ্ধি, বিবেচনা কোন কিছুর গুরুত্ব এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দেয়নি। কিন্তু এই অর্ধেক আকাশ অন্ধকার তো চিরদিন চলতে পারে না—এ কথা রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগরের মতো মহান ব্যক্তিত্বরা উপলব্ধি করেছিলেন। নির্যাতন, নিষ্পেষণ, অবদমন কোন ক্ষেত্রেই কোন দিন চিরস্থায়িত্ব পায়নি সমাজের বুকে। ঠিক সেভাবেই ঈশ্বর প্রদত্ত যাবতীয় ধী-শক্তি সম্পন্ন এই নারী সমাজও আস্তে আস্তে নিজেদের জায়গা আপন প্রভাবে কেড়ে নিতে শিখেছে। আজ যেন এক মুক্ত আকাশের খোঁজ পেয়েছে নারী সমাজ। পদে পদে বন্ধনের বেড়াজালে আটকে রাখতে চেয়েছিল যে সমাজ, ধীরে ধীরে সেসব বন্ধন ছিন্ন করে মেয়েরা আত্মপ্রকাশে মগ্ন হতে পেরেছে। সাথে অভিভাবকদের ভূমিকাও আজ বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। আজকের অভিভাবকরা কন্যা সন্তানকে শুধুমাত্র পাত্রস্থ করে দায়িত্ব এড়াতে চান না। তারা মেয়েদের জীবন, ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তিত এবং সময় ব্যয়ে আগ্রহীও। এভাবেই হয়তো নারীর জীবনের অন্ধকার দূর হয়ে অনেকাংশে আলোর ঠিকানা মিলছে।
কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে কন্যা সন্তানকে অধিকাংশ বাড়িতে আজও কাঙ্ক্ষিত পাওয়া হিসেবে নিতে পারে না। উন্নত চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৌলতে জন্মের সূচনায় লিঙ্গ নির্ধারণ করে কন্যাভ্রূণ হত্যা করা হয়। সমাজে প্রচলিত কিছু কিছু আচার অনুষ্ঠানে ছেলের মায়ের অগ্রাধিকার—এসব প্রমাণ করে এখনও আমরা সমাজের ঘুণধরা মূল শিকড়কে উপড়ে ফেলতে পারিনি। আরও পথ চলতে হবে এই লড়াই নিয়ে।
আজ থেকে একশ বছর আগে যদি ফিরে যাই, আমাদের দিদিমা, ঠাকুমা বা তাদের মায়েদের জীবন যদি ঘুরে দেখি, শুধুমাত্র প্রাকশৈশব অতিক্রম করা পাঁচ-সাত কি নয়, দশ বছর বয়সের একটি মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দশের আগেই সে তার জন্মবৃত্তান্ত, পিতৃকূলের রক্তের সম্পর্কিত আপনজনদের জেনে বুঝে উঠতে পারেনি। এমতাবস্থায় তার গোত্রান্তর, বংশান্তর হয়ে গেল। আর শ্বশুরকুল তো বসেই আছে এক ঘোষিত 'দাসী' পাবার আশায়। কারণ আমাদের বৈবাহিক আচারে আছে ছেলে বিয়ে করতে রওনা হবার সময় মা'কে বলে আসবে— 'মা, তোমার জন্য দাসী আনতে যাচ্ছি।' সমাজ কেমন বেঁধে বেঁধে নিয়ম বিধি তৈরী করেছে মেয়েদের পায়ে শিকল পরাতে। আর মেয়েরা সেই যাঁতাকলে চলতে চলতে নিজেদের ইচ্ছা, আকাঙ্খা বা অস্তিত্বের মূল্য দেওয়ার কথা আলাদা করে ভাবতেই পারতো না। সমাজের সেই নিষ্ঠুর চিত্রগুলি আমরা আরও পরিষ্কারভাবে জানতে ও বুঝতে পেরেছি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ মহান লেখকদের লেখনীর ভিতর দিয়ে।
কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পে তৎকালীন মেয়েদের যে জীবনলিপি বর্ণিত আছে তার করুণ চিত্র আমাদের শুধু মর্মাহত নয়, অবাকও করে। সেই সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হতে হতো বিস্তর ফারাকের এক অসম বয়সী পুরুষের জীবন সঙ্গী। অবধারিত সত্য হিসেবে অল্প দিনেই সিঁথির সিঁদুর মুছে, পূর্ণ যৌবনে এক বিবর্ণ বৈধব্য জীবন কাটাতে হতো মেয়েদের। 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের নায়িকাকে মাথার চুল ছেঁটে, সাদা থান পরে, শাক পাতা চিবিয়ে জীবনধারণ করতে হয়েছিল পূর্ণ যৌবনে। চোখের সামনে বাবাকে মাছের মাথা চিবিয়ে খেতে দেখে নিজের সমস্ত লোভ লালসাকে সংবরণ করে থাকতে হয়েছে। আর সমাজ চেটেপুটে পুরুষের সেই ভোগ আর নারীর ওই ত্যাগকে প্রবল প্রশ্রয়ে উপভোগ করতে ব্যস্ত থাকতো। তবুও মন্দের ভালো 'অভাগীর স্বর্গ' যখন লেখা হয়েছে তার অনেক আগেই সতীদাহ প্রথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, রাজা রামমোহন রায়ের মতো ঈশ্বরের দূতসম ব্যক্তিত্বের উদয় হয়েছিল বলে। পরবর্তী কালে মেয়েরা আর সতী সাধ্বী হতে পারেনি। তা না হলে কী পরম উৎসাহে ঢাক ঢোল বাজিয়ে একজন বৃদ্ধাবস্থায় মৃত ব্যক্তির চিতায় সদ্য যৌবন প্রাপ্ত বৃদ্ধের স্ত্রীকে জ্যান্ত পুড়িয়ে সতী বানানো হতো! ভাবতে গা শিউরে ওঠে যে সতী হবার এই বিধান তো এই সমাজেরই মস্তিষ্ক প্রসূত। কত হীন, বাসনাপূর্ণ রক্তে মাংসের গড়া নারী শরীরটির স্থায়িত্বকাল সেইসব বিধানদাতাদের হাতের মুঠোয় ন্যস্ত ছিল। যা হোক নারী জীবনের সেই অন্ধকারময় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছিলেন ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিং-এর সহায়তায় রাজা রামমোহন রায়। সে কথা আমরা ইতিহাসের পাতা থেকেই জানি।
এর পরবর্তী সময়ে মেয়েরা হলো পণ প্রথার বলী। তার প্রমাণ পাই আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'দেনা-পাওনা' গল্পে। যেখানে গল্পের নায়িকা নিরুপমা পণের জন্য কী অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করেছিল দিনের পর দিন। একমাত্র মেয়ে নিরুকে উচ্চ বংশে বিয়ে দেওয়ার বাসনায় বাবা রামসুন্দর বাবুকে ভিটে মাটিটুকু বিক্রি করে পরিবারের সকলকে পথে বসাতে হয়েছিল। কিন্তু শ্বশুরকুলের ওই পৈশাচিক পণতৃষ্ণা মেয়েটির বাবার স্বপ্নের বাসনাকে বাস্তবায়িত হতে দেয়নি। ভিটে মাটি বিক্রি করে পণের টাকা যোগাড় করে যেদিন রামসুন্দর বাবু জামাই বাড়ি এলেন ততক্ষণে মেয়ে অত্যাচারের বলী হয়ে পরলোকগতা হয়েছে। গল্পের শেষের লাইনটি আরও ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরেছে। বৌমার দাহকাজ শেষ করে, বাইরে কর্মরত ছেলেকে মা চিঠি লিখছেন— 'এবারের সম্বন্ধটিতে নগদ বিশ হাজার টাকা আর হাতে হাতে আদায়।'
সমাজ, সংসার কতখানি তাচ্ছিল্যের চোখে নারী জীবনের মূল্যায়ন করেছে তাঁর চালচিত্র আমরা এই সমস্ত গল্পের বর্ণনাতেই পেয়ে যাই। আমরা জানি এই মহান লেখকদের প্রত্যেকটি গল্পই প্রকৃতপক্ষে সমাজের দর্পণ। এ হেন সমাজে মেয়েদের মেধা, বুদ্ধি, সক্ষমতা, পরাঙ্গমতা নিয়ে ভেবে জায়গা ছেড়ে দিতে দশকের পর দশক লেগে গেছে। লাটাইয়ের সুতো একটু ছেড়ে দু-প্যাঁচ গুটিয়ে নেয় পাছে সমাজে, সংসারে পুরুষ প্রাধান্য লঙ্ঘিত হয়। সিংহ রূপী হুকুমজারী করা পুরুষকে যদি জানা বোঝা নারীর কাছে হার মানতে হয় । যা হোক ঘরমুখো, সংসারী মেয়েরা এক সময়ে বিদ্যাশিক্ষার অঙ্গনে আসলেও তাদের শিক্ষার দৌড় ওই অক্ষরজ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হতো। বলা হতো মেয়েদের 'কিঞ্চিৎ পঠন বিবাহে কারণ', শুধু লক্ষ্মীর পাঁচালী টুকু যেন তারা পড়তে পারে। এই প্রসঙ্গে 'হীরক রাজার দেশে' সিনেমার সেই সংলাপটি মনে আসছে— 'ওরা যত বেশি জানে তত কম মানে।'
তবুও তা সর্ব সাধারণের মধ্যে ছড়ায়নি, শুধুমাত্র সমাজের উচ্চবিত্ত ও উচ্চবর্ণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তী কালে উনবিংশ শতাব্দিতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রাজা রামমোহন রায় নারী শিক্ষার প্রচার এবং প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন জায়গায় মেয়েদের জন্য বিদ্যালয়। সমাজ অনুভব করেছিল স্ত্রী জাতি শিক্ষিত না হলে দেশের উন্নতি, অগ্রগতি সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলার মূল কাণ্ডারী একজন মা। তাই জাতির উন্নতিকল্পে দরকার নারী শিক্ষা। আমরা তো জানি শিক্ষা আনে চেতনা আর চেতনা আনে বিপ্লব। তাই শিক্ষার আলোয় আলোকিত নারী নিজের জায়গা চিনে নেবেই। সমাজে আজকের নারীর অবস্থান সেই আত্মচেতনার প্রকাশ, যদিও সেই পথ একটুও মসৃণ ছিল না, ছিল যথেষ্ট কণ্টকময়।
আমরা দেখেছি সেই সময় উনবিংশ শতাব্দির শেষের দিকে কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ছিলেন একজন বিলেত ফেরত ডাক্তার। তবে তিনি বিলেত থেকে ফিরে আসবার পর ভারতীয় সমাজে অনেক কটু উক্তি, অনেক অবজ্ঞা এমন কি এক ঘরে করে রাখবার বিধান শুনতে হয়েছিল। কিন্তু সে সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁর স্বামী ছিলেন অনেক মুক্তমনা ও উন্নত মনস্ক। তাই ধীরে ধীরে সব প্রতিকূলতা এড়িয়ে তিনি আপন কাজে অর্থাৎ চিকিৎসা কার্যে মনোনিবেশ করে সমাজের সহায় হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। কিন্তু সংস্কারগ্রস্থ তখনের সমাজ সমুদ্র পার করে সাহেবদের দেশ থেকে ফিরে এসেছে বলে তাকে অচ্ছুৎ করে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার ধার সংস্কারের চাইতে অনেক শানদার। তিনি তাঁর আচরণেই প্রমাণ করতে পেরেছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক। উনবিংশ শতক থেকে নারী জীবন যে নতুন খাতে বইতে শুরু করেছিল, বিংশ শতকে তা পত্রে পল্লবিত হয় বলা যায়। এই সময়ে নারী সমাজের অনেকে সরাসরি শিক্ষা, সমাজ সংস্কার, সাহিত্য, রাজনীতি ইত্যাদি বিভিন্ন ধারায় নিজেদের মুক্ত করে সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। দীর্ঘ দিন ধরে অবহেলিত, অবদমিত নারী সমাজ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং সমাজ পরিবর্তনের পথে অগ্রসর হয়। বিংশ শতকে নারী দেশের পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের তাগিদে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়ে। আমরা পাই সরোজিনী নাইডু, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, মাতঙ্গিনী হাজরা এবং আরও অনেক মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামীকে। পরবর্তী কালে পাই ইন্দিরা গান্ধীর মতো রাজনীতিবিদ, যিনি ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। এবং সরোজিনী নাইডুকে পেয়েছিলাম প্রথম মহিলা রাজ্যপাল হিসেবে।
প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দু-দফায় প্রায় পনের বছরের রাজত্বকালে ইন্দিরা গান্ধী যে দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন তা ভারতের মতো এতো বড় দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের মনে আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। দেশবাসী এমন যোগ্য মহিলা প্রধানমন্ত্রী পেয়ে মহিলাদের সম্পর্কে এক ভরসার জায়গা পায় বলা যায়। এছাড়া তৎকালীন সময়ে দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষার বিস্তার, মেয়েদের শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলা ছাড়াও পরিবার পরিকল্পনার মতো কিছু সুচিন্তিত নীতি নির্ধারণ মেয়েদের জীবনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। সমাজ অনুভব করতে শিখেছিল যে নারী শরীর শুধু একটি সন্তান জন্ম দেওয়ার কারখানা নয়।
শিক্ষার সাথে সাথে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি হয়। এই স্বনির্ভরতার স্বাদ তাদের আরও শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলে।তবে আমাদের দেশের মতো জনবহুল দেশে সবার জন্য কাজের সুযোগ না আসলেও, সমাজ অন্তত নারী শিক্ষার সুফল টুকু অনুভব করতে শিখেছে। একজন শিক্ষিত মা যে সঠিক তত্ত্বাবধানে তাঁর সন্তান প্রতিপালন করতে পারবে এবং ফলশ্রুতিতে দেশ ও সমাজ সু-নাগরিক পাবে—এই বোধ টুকু প্রত্যেক পরিবারের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। স্ত্রী-শিক্ষা বিস্তারের শুরুতে শুধুমাত্র প্রাথমিক স্তর পর্যন্তই অধিকাংশ নারীর শিক্ষার দৌড় ছিল। তাতেও সে সময়ে রামায়ণ, মহাভারতের মতো মহাকাব্য গুলো পড়ে, ছেলেমেয়েদের মধ্যে সেই সমস্ত মহাকাব্যের বিষয় গল্প করে তাদেরকে পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে বেশ সমৃদ্ধ করে তুলতে পেরেছিল। সাথে নিজেদের অবসর সময় টুকু সুন্দর ভাবে কাটত। বাস্তব জীবন নিয়ে তাদের মধ্যে একটা মূল্যবোধ গড়ে উঠেছিল। পরবর্তী প্রজন্মে দেখা যায় সেই শিক্ষার গ্রাফ বেশ ঊর্ধ্বমুখী। ধীরে ধীরে মেয়েরা পুরুষের পায়ে পা মিলিয়ে প্রতিযোগিতার নিরিখে নিজেদের প্রমাণ করে অনেক উঁচু পদে আসীন হয়েছে।
আমরা দেখতে পাই কিরণ বেদীকে—ভারতের প্রথম মহিলা আইপিএস (IPS) হিসেবে ইতিহাস গড়তে। প্রশাসন, সমাজসেবা, রাজনীতি ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। শুধু মেধার বিচারে নারীর ভূমিকা যে বিশেষ উল্লেখ্য তা নয়, সাহসিকতার ক্ষেত্রেও যে মহিলারা কোন অংশে কম নয় তার জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে দুর্বা ব্যানার্জির নাম উল্লেখ করা যায়। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা বাণিজ্যিক পাইলট। যে সময়ে একজন মহিলা পাইলট যাত্রী বোঝাই বিমান নিয়ে আকাশ পথে পাড়ি দেবে ভাবতে শেখেনি দেশ, সে সময়ে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সে বসে প্রথম মহিলা পাইলট হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তিনি।
পরবর্তী কালে আমরা পেয়েছি কল্পনা চাওলার মতো মহাকাশচারী। অদম্য সাহস আর অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে তিনি মহাকাশে দু-দফায় এক মাস সময় কাটিয়ে ছিলেন।কিন্তু দেশ ও জাতির দুর্ভাগ্য যে দ্বিতীয় দফায় স্পেস শাটল কলাম্বিয়ার সফল অবতরণ সম্ভব হলো না। আমরা হারালাম অনেক সম্ভাবনাময়, মেধাবী ও সাহসী এক মহীয়সীকে বহিরদেশের দিকে তাকালে আমরা সুনীতা উইলিয়ামসের মতো সাহসী নারীকে দেখতে পাই, যিনি প্রায় দশ মাস মহাকাশে কাটিয়ে ছিলেন দু দফায়, এবং অভাবনীয় সাহসিকতার নজির স্থাপন করেছেন। শুধু তাই নয়, খেলাধুলার জগতেও নারীর অবদান বিশেষ উল্লেখ্য।
বিশ্বের বিভিন্ন দুঃসাহসিক অভিযানের অন্যতম দুই অভিযাত্রী হলেন আরতি সাহা ও বুলা চৌধুরী। আরতি সাহা প্রথম ভারতীয় মহিলা যিনি ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে পার হন। কী প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যে তিনি এই দুঃসাধ্য অভিযানটি সফল করতে পেরেছিলেন! যেখানে জলের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রির অনেক নিচে, যে জলে দীর্ঘ সময় কাটালে শরীর অবশ হয়ে যায়, তেমন পরিস্থিতিতে সাঁতরে পার হওয়ার সাথে সামুদ্রিক ঝড়, বিভিন্ন ভয়ংকর সব সামুদ্রিক প্রাণীর আক্রমণ—সব বাধা টপকে তিনি এই সাফল্যে নজির তৈরি করে 'পদ্মশ্রী' উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে বুলা চৌধুরী একইভাবে বিশ্বের সাতটি সামুদ্রিক চ্যানেল পার হয়ে ইতিহাস গড়েছেন এবং 'পদ্মশ্রী' উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।
এই সমস্ত উচ্চ পর্যায়ের সাফল্য মেয়েদের সক্ষমতার দলিল হিসেবে দিনে দিনে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে আজ তাদের বাধার গন্ডি প্রায় সরে গিয়েছে । একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রত্যেক পরিবারের মেয়েরা শিক্ষা গ্রহণের অবাধ সুযোগ পাচ্ছে । ক্ষেত্র বিশেষে দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে মেয়েরা নির্দিধায়। অধিকাংশ মেয়েরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, ফলে অর্ধেক অন্ধকার আকাশে যে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ছে, তার সুফলটুকু আমরা প্রত্যেকেই ভোগ করতে পারছি।
কিছু দিন আগে লাদাখ থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত যে বিখ্যাত চেনার রেল সেতু তৈরী হয় তার মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন মহিলা ইঞ্জিনিয়ার। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, চেনার নদীর স্রোত, গভীর খাদ, প্রতিকূল আবহাওয়া ইত্যাদি বহু প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও বিশ্বের সর্বোচ্চ এই রেল সেতুটি এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তৈরী হয়েছে। এই ব্রিজের উচ্চতা, ইস্পাত দিয়ে তৈরী আর্চ, ভূমিকম্প ও বিস্ফোরণ পতিরোধ কারী গঠন এক বিস্ময়কারী সৃষ্টির নজির যা দেশের ও দশের গর্ব।
সমাজের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই মেয়েদের সাফল্য আজ বিশেষ ভাবে নজর কাড়ে আমাদের। যেমন আমরা বলতে পারি অরুন্ধতী ভট্টাচার্যের কথা ভারতীয় স্টেট ব্যাংকের প্রথম মহিলা চেয়ার পারসন ছিলেন। তার নেতৃত্বে অনেক ডিজিটাল ও আর্থিক পরিবর্তন আসে ব্যাংকে। এছাড়া ভারতী স্টেট ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে পেয়েছি সংঘমিত্রা ব্যানার্জীকে। ব্যাংকিং ও ফিনান্স ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা উল্লেখ করার মতো। এই একই নামে অর্থাৎ সংঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায় নামে আমরা পাই একজন প্রখ্যাত কম্পিউটার বিজ্ঞানীকেও, যিনি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট (ISI) এর ডিরেক্টর ছিলেন। তিনি অনেক আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্র প্রকাশ করেছেন, যা আগামী দিনের গবেষকদের উদ্বুদ্ধ করবে। তবে গুটি কতক নাম উল্লেখ করে মেয়েদের সাফল্যের পরিসংখ্যান দেওয়া সম্ভব নয়। প্রতি ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতার সাক্ষী সমাজ। নিত্য নতুন নিয়মের শৃঙ্খলে বেঁধে যাদের একদিন গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল, আজ তারা বিধানদাতাদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের ডানা ভর করে উড়তে শিখেছে।
তবে প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো এখনও মেয়েদের জীবনে কিছু অন্ধকার অধ্যায় রয়েই গেছে। আজও প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পাতায় নারী নিগ্রহের বিভিন্ন রূপ দেখে শিউরে উঠতে হয়। গত ৮ই এপ্রিল ২০২৬ আনন্দবাজারের পাতায় উত্তর প্রদেশের কানপুরের এক ঘটনার কথাই বলছি— দুটো কিডনি ড্যামেজ হওয়া এক অসুস্থ ছেলেকে মেয়ের বাড়িতে না জানিয়ে বিয়ে দিয়েছে পাত্রপক্ষ ।, এরপর নববধূকে বলা হচ্ছে— "তুমি একটি কিডনি দাও অথবা বাড়ি থেকে ৩০ লক্ষ টাকা চেয়ে আনো।" ছেলের পরিবারের প্রত্যেক সদস্য সুস্থ স্বাভাবিক হলেও নববধূকে অনিবার্য দাতা হিসেবে বেছে নিয়েছে।
সমাজের গোড়ায় যে বিষ প্রোথিত আছে তার প্রভাব থেকে এখনও পরিপূর্ণ মুক্ত আমরা বলা যায় না। এখন ও বিবাহ যোগ্যতা মেয়েদের পাত্রপক্ষের কাছে পণ্য কেনা-বেচার মতো করে সাজিয়ে, গুছিয়ে প্রদর্শন করাতে হয়। তারপর তাদের চুলচেরা বিশ্লেষণে যোগ্য হলে তবেই বিয়ের সানাই বেজে ওঠে।
এখনও খবরের কাগজ খুললেই নারী ধর্ষণ, নারী নির্যাতন নিয়ে খবর প্রতিদিন চোখে পড়ে। পুরুষের সেই কামুক দৃষ্টির শিকার শিশু থেকে বৃদ্ধা সকলেই কতক্ষেত্রে পুরুষের সাময়িক লালসার বলী হয়ে অবাঞ্ছিত, অকাল মাতৃত্বকে বরণ করে নিতে হচ্ছে কিশোরী মেয়েকে । আর সমাজের চোখে অপাঙতেয় সেই মেয়ে চরম অনিশ্চয়তা আর অবজ্ঞায় এক অন্ধকারময় জীবনে ডুব দেয় । তখন নারী জাতির উন্নতির সমস্ত নজির এক লহমায় মুছে গিয়ে মনে হয় দেহ সর্বস্ব নারী ছাড়া সমাজের বুকে আর কোন পরিচয় নেই তার।
সরকার ঘোষিত 'বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও' স্লোগান যেমন মেয়েদের এক উন্নত জীবনের পথ দেখায় তেমন বর্তমান সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা কন্যা সন্তানকে নিয়ে চলার পথে এক চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জানি না এর সুরাহা কোন পথে মিলবে। তবে প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েই নারী জীবনের ইতিহাস বহমান ।
বাইরের কর্মজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও সংসার, ধর্ম পালনে নারীর ভূমিকা কোন অংশে খাটো হয়নি আজও । সমাজের বিভিন্ন স্তরের মহিলারা ঘরের পরিচারিকা থেকে অফিসের পরিচালিকা, প্রত্যেকেই দিন শুরু করেন সংসার গুটিয়ে গুছিয়ে নিয়ে। আবার দিন শেষেও সংসারের ডাকই তার কাছে বড় ডাক হয়ে দাঁড়ায় । সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত সংসার আবর্তিত হয় একজন নারীকে ঘিরেই । সকলের পরিচর্যার শেষে নিজের ব্যক্তিগত চাওয়া আজও তুচ্ছ হয়ে ওঠে একজন স্ত্রী বা মায়ের কাছে । মেয়েদের এই দশডূজা রূপ নিয়ে কবিদের কলমে উঠে এসেছে কত কবিতা ৷
কিন্ত এই সাংসারিক দায়বদ্ধতার তার মধ্যে থেকেও একজন নারী যে কিভাবে আপনার সত্তার বিকাশ ও প্রকাশ ঘটাতে পারেন তার এক জ্বাজল্যমান উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি আশাপূর্ণা দেবীর কথা, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে সচেতনতা তেমন ভাবে তৈরী হয়নি । সেই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রথাগত স্কুল শিক্ষা ছাড়া বাড়িতে পড়াশোনা করে নিজেকে তৈরী করেছিলেন । পরবর্তীকালে সংসার সামলে রাত জেগে নিজের লেখালিখি চালিয়েছিলেন। আমরা পেয়েছিলাম ' জ্ঞানপীঠ' পুরস্কার প্রাপ্ত স্বনামধন্যা এক সাহিত্যিককে। নিজের জীবনের উপলব্ধি থেকেই তিনি তাঁর লেখনীর মধ্যে স্থান দিয়েছিলেন নারী জীবনের বিভিন্ন দিক ও এদের আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের কথা।
প্রত্যেক প্রজন্মের ব্যবধানে মেয়েদের চলার পথের আলাদা ধরন আমরা দেখে এসেছি। সমাজে চর্চিত অনেক তুচ্ছ বিশয়কে নিজের গায়ে নিয়ে নিজেদের চলার পথকে রুদ্ধ করতে চায়না আজকের মেয়েরা। শিক্ষার আলো তাদের যুক্তির পথ খুঁজে নিতে শিখিয়েছে। অন্ধ বিশ্বাস আর নিয়মের বেড়াজালে ঈশ্বর প্রদত্ত এই সুন্দর জীবনকে মেয়েরা আটকে রাখতে চায়না । তবে তাদের এই চাওয়া এবং পাওয়া অবশ্যই যেন এক সুন্দর সভ্যতা গড়ার সহায়ক হয় । আর আমরা ভাবতেই পারি কন্যা হবে যে রত্ন, রেখে বিশ্বাস, দিয়ে আশ্বাস, করে সঠিক যত্ন। এই প্রসঙ্গে শ্যামা সংগীতের সেই লাইনগুলি বলা যায় - "মন রে কৃষি কাজ জান না, এমন মানব জমিন রইল পতিত আবাদ করলে ফলত সোনা।" - সঠিক আবাদের অভাবে অনেক জমি নষ্ট হয়েছে, আজও হচ্ছে, তাই আমরা চাইব যে পার্থিব সমগ্র মানব জমিন বা মানব সম্পদ ব্যবহৃত হোক মানব সভ্যতার উন্নতি কল্পে। সেখানে সকলের একটাই পরিচয় হোক।
No comments:
Post a Comment