Saturday, July 2, 2022



সম্পাদকের কথা 

গ্রীষ্মপ্রধান দেশে বর্ষা মানে অন্য আনন্দ। ঘন কালো মেঘ, বিদ্যুতের ঝলকানি, মেঘের প্রবল গর্জন, দিনরাত বৃষ্টি ইত্যাদি মিলে বর্ষার রূপ সবসময়ই অনন্য। তবে বর্ষার মূল গুরুত্ব কৃষিতে। যে দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল সে দেশে বর্ষার তাৎপর্য বুঝতে অসুবিধা হয় না। তবে এবারে বর্ষার শুরুতেই যেভাবে অসম থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বর্ষা তান্ডব শুরু করেছে তা অবশ্যই চিন্তার। ধস, বন্যা, হড়কা বান, ভূমিক্ষয় ইত্যাদির ফলে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক। আমাদের রাজ্যের উত্তর অংশও ইতিমধ্যে বিপদের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। তবু সবকিছু মিলে বর্ষাকে আহ্বান জানাতেই হয়। কেননা বর্ষা ছাড়া কোনোভাবেই আমরা ভাবতে পারি না। প্রার্থনা, বর্ষা হোক, বৃষ্টি ঝরুক আর সেই বৃষ্টি নিয়ে আসুক সৃজনের ধারা।     


মুজনাই অনলাইন আষাঢ়  সংখ্যা ১৪২৯

মুজনাই সাহিত্য সংস্থা 

রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com (মাসিক অনলাইন)

- mujnaiweekly@gmail.com (সাপ্তাহিক)

প্রচ্ছদ: বাবুল মল্লিক 

প্রকাশক- রীনা সাহা 

সম্পাদনা,  অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায়  

মুজনাই অনলাইন আষাঢ়  সংখ্যা ১৪২৯



আছেন যাঁরা 

বিনয় বর্মন, শ্রাবণী সেনগুপ্ত, বটু কৃষ্ণ হালদার, চিত্রা পাল, শ্রাবণী সেন, 

মনিরুজ্জামান প্রম‌উখ, চন্দন কুমার দাস, রূপক রায়, প্রনবরুদ্র কুণ্ডু, 

রমজান সরকার, মৌসুমী চৌধুরী, কাকলি ব্যানার্জী মোদক, সৈকত দাম, 

রীতা মোদক, অলকানন্দা দে, ঋতুপর্ণা রায় বর্মা, দেবার্ঘ সেন, সারণ ভাদুড়ী, 

রীনা মজুমদার, মজনু মিয়া, সুভাষ চন্দ্র রায়, বিজন বেপারী, অঞ্জলি দে নন্দী, 

অদ্রিজা বোস, অনুস্মিতা বিশ্বাস, সুজল সূত্রধর, সৌরিক রায়





বর্ষা 



বর্ষা যাপন 


আমার বর্ষা

বিনয় বর্মন


বর্ষা এলে মেঘের মতো এলোমেলো ভাবনাগুলোও আসা যাওয়া করতে থাকে মনের মধ্যে l ডুয়ার্সের বাসিন্দা হওয়ায় বর্ষা দেখে অভ্যস্ত l মনে পড়ে যায় , ছোটবেলার কথা l কামাখ্যাগুড়িতে একটা টিপিক্যাল ডুয়ার্সের কাঠের দোতলা বাড়িতে ভাড়া থাকতামl টিনের চাল l বৃষ্টি নামলে টিনের চালে বৃষ্টি পড়ে প্রচন্ড জোরে ঝমঝম করে জল তরঙ্গ বেজে উঠত l কখনো কখনো এত জোরে শব্দ হতো , যে ঘরের ভেতরে নিজেদের কথাও চাপা পড়ে যেত ! কাঠের বারান্দায় জলের ছাট এসে ভিজে যেত l তখন বারান্দার ঘরে ঢুকে যেতাম l আমাদের পাহাড়ি কুকুর 'ব্ল্যাকি'ও দৌড়ে ঘরে ঢুকে যেত l ঘরে বসে টানা বৃষ্টি দেখতে দেখতে মন উদাস হয়ে যেত l আমার পড়ার ঘরের পাশেই ছিল একটা বিলিতি গাব গাছ l বর্ষাতেই ফল ধরত l পাকা গাবের গন্ধে ম ম করতো সারা বাড়ি l এখন কাঠের দোতলা বাড়ি আর সেরকম চোখে পড়ে না l সর্বত্র কংক্রিটের জঙ্গল গড়ে উঠেছে ডুয়ার্স জুড়ে l বাড়ির একটু দূরেই ছিল মরা রায়ডাক নদী l বর্ষায় ফুলে উঠতো l কাঠের একটা সেতু ছিল l সেখানে দাঁড়িয়ে নদীর জল দেখতাম l সেই নদী আজ চুরি গেছে l নদী দখল হয়ে গড়ে উঠেছে বাড়িঘর , দোকানপাট , কংক্রিটের জঙ্গল ! 

বর্ষার মেঘের মতো ভেসে আসে নানান স্মৃতি l দ্বাদশে পড়ার শেষ দিনে যারা শপথ নিয়েছিলাম , কেউ কাউকে ভুলবো না , সময়ের স্রোতে তারা আজ কে কোথায় ? মনে পড়ে সেই সহপাঠিনীটির কথা l টিউশন ফেরত প্রবল বৃষ্টির দিনে , যার সঙ্গে এক ছাতার নিচে ফিরছিলাম l হঠাৎ প্রবল বজ্রপাত l আর সে আমাকে ভয়ে জড়িয়ে ধরে সেকি চিৎকার ! তার সাথেও তো আর কোন যোগাযোগ নেই !

      কলেজে ( কোচবিহারের এ বি এন শীল ) হোস্টেলের পাশে ছিল বড় দিঘী l বেশি বৃষ্টি হলে তার জল উপচে ঢুকে যেত হোস্টেলের বারান্দায় l উঠে আসতো কৈ মাছ , কাঁকড়া , এমনকি সাপ ! হোস্টেলে জুনিয়ার ছিল মদন সিং তামাং l মনিপুরী l সাপ মেরে রান্না করতো ! সে খাইয়েছিল তোরসা থেকে ধরে আনা ঝিনুকের রেসিপি l

         বন্ধু সন্দীপ আসতো নিগমনগর থেকে l উচ্চমাধ্যমিকে বাংলায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় উপহার পেয়েছিল চমৎকার মিউজিক সিস্টেম l দারুন দারুন বই আর ক্যাসেটের সংগ্রহ ছিল ওর l এক বর্ষার দিনে ওর বাড়িতে গেছি l গাছপালা দিয়ে ঘেরা ছোট্ট সুন্দর বাড়ি l রঙ্গন , রজনীগন্ধা , পাতাবাহারে চমৎকার লাগছিলো l বর্ষার দিনে ওর ছোট্ট ঘরে সারাদিন কাটানো , গল্প , আড্ডা আর বৃষ্টি l এখনো মনে পড়ে l আজ কর্মসূত্রে অন্য মহাদেশবাসী l যোগাযোগ রয়ে গেছে l 

প্রায় দু'দশক আগে যখন শ্রীনাথপুর চা বাগানের পাশে কর্মস্থলে যোগ দেই , তখনকারও বর্ষার স্মৃতি ভেসে আসে l স্কুল বাড়ি ছিল কাঠ , বাঁশের চাটাই , টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা l টিনের চাল l বৃষ্টি এলে চালে এত ঝমঝমিয়ে শব্দ হতো , যে , কারো কথা শোনা যেত না l অতএব , "রেনি ডে " ! স্কুলের পাশে বয়ে যেত গদাধর l পাহাড়ে বৃষ্টি হলে নদী ফুলে উঠতো l নদীর কুল ছাপিয়ে সে জল স্কুলের মাঠে উঠে আসতো l দশ জন স্টাফ l টিফিন টাইমে , খবরের কাগজ পেতে মুড়ি মাখা হত l আশেপাশে দু একটা মাত্র দোকান ছিল l 

       বর্ষা আর বর্ষাবন --- দুটোই ডুয়ার্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত l বর্ষাবনে বসে বর্ষা দেখা l সেও এক অভিজ্ঞতা l বর্ষার দিনে রায়মাটাং l লালিগুরাস হোমস্টর কাঠের বারান্দায় বসে দেখেছি বর্ষার অপরূপ সৌন্দর্য l সকাল থেকে বৃষ্টি l খবর পেলাম রায়মাটাং নদী ফুলে উঠেছে l অতএব বহির্জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সারাদিন দেখতে থাকি বর্ষাবনের বর্ষা l খিচুড়ি সবজিতে স্মরণীয় হয়ে থাকে রায়মাটাং এর রাত l 



দেখেছি বর্ষার রুদ্র রূপও ! এক বর্ষার দিনে শিলিগুড়ি থেকে ফিরছি l ৩১ নং জাতীয় সড়ক ধরে l হাসিমারার আগে হঠাৎ ব্রীজের এক পাশের রাস্তা উধাও l চা বাগানের মধ্য দিয়ে পায়ে চলা হাঁটাপথে ঘুরপথে পৌঁছাই হাসিমারা l দেখেছি ৯৩-এর বন্যার পর আলিপুরদুয়ার ও সংলগ্ন অঞ্চলের বিধ্বস্ত দশা l মনে পড়ে যায় নাগাড়ে বৃষ্টিতে দিনহাটার লাউচাপড়া, খামার বক্সী গ্রামগুলোর অবিচারী , সাপখাওয়া ( অধুনা মৃতপ্রায় ) নদীর উপচে পড়া জলে দুকুল ছাপানো বিস্তীর্ণ কৃষিভূমি l

    আমার বর্ষা মনে পড়ায় সেই অকালে চলে যাওয়া নিষ্পাপ ছাত্রটির কথা , যে এমনি বর্ষার দিনে , মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছিল l বর্ষায় মনে ভাসে , সেই শিশু পরিবহন শ্রমিক যে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ছোট গাড়ির পিছনে ঝুলতে ঝুলতে যাত্রী তুলতে তুলতে যেত l বর্ষায় মনে পড়ে , সেই ফিরিয়ে দেওয়া কিশোরীটির কথা , যে আমার সঙ্গে ছিপরার অরণ্যে জংলি কুল তুলতে যেতে চেয়েছিল! বর্ষার দিনে মনে পড়ে তাকে , যার সঙ্গে তুমুল বৃষ্টিতে রিকশয় যেতে যেতে অনেকদিনের ভাবনার কথাটা কখনোই বলে ওঠা হয়নি !

     এখন বয়স বেড়ে অনেক সাবধানী l বৃষ্টিতে আর ভিজিনা l জলে নামি না l কিন্তু বর্ষা এলে , ঘরে থাকতে মন চায় না l বেরিয়ে পড়ি সবুজ ডুয়ার্সের এদিক সেদিক l খুঁজি ছোটবেলার ডুয়ার্সকে l আমার ডুয়ার্সকে l খুঁজি সেই শিশুদের , তুমুল বৃষ্টিতে যারা মাঠে কাদায় ফুটবল খেলছে , যারা অকারনে জল ছিটিয়ে হুল্লোড় করছে , মাছ ভেবে গামছা দিয়ে ব্যাঙাচি ধরছে' ! তাদের আর পাইনা l অনেক কমে গেলেও মাঠ-ঘাট উন্মুক্ত প্রান্তর অনেকই আছে আমাদের ডুয়ার্সে l সেখানে শিশুদের দেখিনা l শিশুরা থাকে তারই পাশে কোন যাত্রী প্রতীক্ষালয়ে , বন্ধ ঘরের বারান্দায় , কোন " চৌতারায় " l তাদের চোখ বৃষ্টিতে নয় , মাঠে নয় , স্মার্টফোনে !

      আসলে কৃষি , পর্যটন , আর চা নির্ভর ডুয়ার্সের জনজীবনে বর্ষা যেন রান্নায় লবণের মতো l থাকাটা স্বাভাবিক l কিন্তু পরিমিত l কম বা বেশি হলেই সমস্যা l পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার কারণে ডুয়ার্সের বর্ষাও আজ খামখেয়ালী l কখনো কম , কখনো বেশি l বর্ষা হলেই মনে সংশয় হয় l এইযে প্রকৃতির অশেষ আশীর্বাদ , ডুয়ার্সে বসে উপভোগ করছি , তা আর কতদিন ? যে হারে বৃক্ষনিধন , চোরাশিকার , জলা দখল চলছে , তাতে এই বর্ষা আর কতদিন থাকবে ? পরের প্রজন্ম কি শুধু গল্প কথাতেই শুনবে কেমন ছিল ডুয়ার্সের বর্ষা ? তারা কি সুযোগ পাবে এমন বর্ষা যাপনের ?

(ছবি- শৌভিক রায়)



বর্ষা উৎসব 

ঝাঁপান
শ্রাবণী সেনগুপ্ত 

এই ঝাঁপান লোক উৎসবটি সাপ সম্পর্কিত একটি বিশেষ অনুষঠান। ভারতবর্ষের সর্বত্র সাপ দেবতারূপে পূজিত। মনসার সঙ্গে সাপের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক থাকায় কখনো সাপ মনসার বাহন বা আলঙ্কার রূপে ভূষিত। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, বীরভূম,মেদিনীপুর,মুর্শিদাবাদ 'মনসার ঝাঁপানে' তিনি জীবন্ত সাপ।বিষ্ণুপুরের ঝাঁপান অনুষ্ঠানটি  একটি ঐতিহ্যপূর্ণ জীবন্ত সর্প বিষয়ক অনুষ্ঠান।

                           ঝাঁপান হয় ভরা বর্ষায়, শ্রাবণ সংক্রান্তিতে। ভরা বর্ষায় বসুন্ধরা শস্য উৎপাদনে রত-এই সময়ে  ঝাঁপনের মূল উপাদান সাপ নবজন্মের প্রতীকরূপে দেখা দিয়েছে কৃষিনির্ভর লোকমানসে।সাপ কোন কোন জন গোষঠীর 'টোটেম'। কোন বিশেষ দিনক্ষণে তাঁদের সর্প দর্শনের রীতি আছে।বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজারা নাগ বংশীয়। তাঁরা সর্প দর্শন করেন শ্রাবণ সংক্রান্তিতে,ঝাঁপান উৎসবের সূচনালগ্নে।ঝাঁপান অনুষঠিত হয় মল্ল রাজবাড়ির সামনের প্রাঙ্গণে। এই ঝাঁপান উত্সবের বর্ণনা মূলত মল্ল রাজধানী বিষ্ণুপুরের ঝাঁপান উৎসবের  বর্ণনা। সমগ্র রাঢ় অঞ্চলের মধ্যে বিষ্ণুপুরের ঝাঁপান শ্রেষ্ঠ।

        ঝাঁপান যেহেতু সর্বসমক্ষে,অনেক দর্শকের মাঝখানে হয়,তাই এর নেপথ্যে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি।সবার আগে হয় 'খইধারা'।শ্রাবণ মাসের শেষ নাগাদ মাঠের কাজ,ধান রোঁয়ার কাজ, শেষ হয়ে যায়,তাই 'খইধারা"।ঐ দিন নতুন হাঁড়ি কড়ায় রান্না হবে নিরামিষ,আর ভাজা,পোড়া এবং ফলার খাওয়া হবে।তারপর শ্রাবণ সংক্রান্তির আগেরদিন হবে 'বার পালন 'বা 'বার কমানো'। দাড়ি,নখ কেটে শুদ্ধ হয়ে স্নান করতে হয় এবং উপোস করতে হয়।শ্রাবণ সংক্রান্তির দিন 'মাখাল দিন'। ঐ দিন সকাল থেকে সর্প গুনী নেরা পুজো দেন মনসা মন্দিরে।সর্বসাধারণের পুজো শেষ হলে প্রধান গুনীন অনেকগুলি সাপের ঝাঁপি এবং শিষ্যদের নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করেন।দরজা বন্ধ করে মা মনসাকে সাপ খেলা দেখান। গানে গানে চাপা স্বরে বর্ণনা করেন অতীতে কোন সময়ে বনের সব রাখালদের মা মনসাকে পুজো করার কাহিনী।তার সঙ্গে বাজে 'বিষম ঢাকি '। আগের দিন থেকে করা উপবাস তাঁরা মা মনসার আশীর্বাদ প্রার্থনা অনুমতি লাভের পর ভঙ্গ করেন। এরপর স্নান খাওয়া সেরে প্রস্তুত হন ঝাঁপান উৎসবের জন্য।

                     খুব রোদে সাপ ফণা তুলে দাঁড়াবে না ,তাই গুনীনেরা একটু দেরীতেই আসেন।ততক্ষণে লোকেলোকারণ্য উৎসব প্রাঙ্গণ। বসে মেলা। সাজানো মনসা মূর্তি আসে গাড়ীর পিঠে ।গরুর গাড়িতে বা ছোট মোটরচালিত গাড়ীতে আসেন গুনীনের দল।কোনো কোনো মাচানের উপর থাকে বাঘের মূর্তি।তবে এই বাঘ ঝাঁপান বড়ো গুনীন ছাড়া কেউ পারেননা-খুব কঠিন। বাঘের পিঠে সেই দলের প্রধান গুনীন গুরু বসে থাকেন।পুরুষ গুনীনদের সঙ্গে মহিলা গুনীনরাও মাচায় ওঠেন, সাপ খেলা দেখান,মন্ত্র পড়েন,বান মারেন।অন্য দলের সাপকে বান মেরে,ধুলো পড়া ছুঁড়ে নিস্তেজ করে দেওয়া হয়।জোড় ঢাক, নানারকম বাজ্না বাজে,সঙ্গে মাচানের গুনীনদের হাতে হাতে বাজে 'বিষম ঢাকি'।মল্লরাজ বংশতিলক ঝাঁপান তলায় এসে দাঁড়ান। তিনি ঝাঁপি খোলা ফণা তোলা সাপ দূর থেকে দেখে রাজবাড়ির ভিতরে চলে যান। রাজার সর্প দর্শন শেষ হলে চলতে থাকে ঝাঁপান। গোখরো, কেউটে খরিস, শিয়রচাঁদা- এইসব তেজী, ফণা তুলে দাঁড়ানো সাপই আনা হয়। তার সঙ্গে আরো অন্যান্য সাপও আসে।একদল ঝাঁপির ঢাকনা খুলে সাপগুলিকে দাঁড় করায় মাচানের উপর। সাপগুলি ফণা তুলে দুলতে থাকে।অন্য দলেরাও মাচানের উপর দাঁড়িয়ে খেলা দেখাত থাকে। প্রতিযোগিতা শুরু হয়।নীচু গলায় আন্তরিক আবেগে কাঁপা গলায় গান চলে-"এসো এসো গো মা জয় বিষহরি।' এক রুদ্ধশ্বাস বাতাবরণর সৃষ্টি হয়।এই আকুল প্রার্থনা গীতের সঙ্গে ধুয়া ধরেন দলের গুনীনেরা-"নমো নমো নমো মাগো,নমো নারায়ণী।"গানের সঙ্গে চলে গালিগালাজও। যাঁদের সাপ ফণা তুলে দাঁড়াতে পারে না,অন্য দল ব্যঙ্গ করেন তাঁদের।মন্ত্র পড়া ধূলি মুঠি ছুঁড়ে মারেন এক দলের গুনীন অন্য দলের গুনীনের দিকে,সাপের দিকে।'বাণ 'মারেন।কেউ কেউ মন্ত্র বাণের ফলে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। কোনো মাচান থেকে গুনীন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন অন্য মাচানের দিকে গানের মাধ্যমে- "শুন শুন গুনী ভাই,ইতিহাস বল, কোথায় গরুড়ের দর্প চূর্ণ হয়েছিল।" আবার এই গানের মধ্যে দিয়েই চলে তাঁদের নিজেদের পরিচয় দেবার পালা। যে দল সাপ খেলায়,সাপের সৌন্দর্যে ও বৈচিত্রে শ্রেষঠ বলে বিবেচিত হন, সেই দলকে রাজা পুরস্কৃত করেন।মেলা শেষে একেক দল রাজ অন্তঃপুরে ঢুকে খেলা দেখান।



বর্ষা প্রেম 

প্রিয় বর্ষা ঋতু আমার চোখের তারায় ভাসে
বটু কৃষ্ণ হালদার

নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে /ওগো আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে ।বর্ষা ঋতুর আগমনই কবি সুনির্মল বসু এঁকেছেন প্রকৃতির মায়াবী রূপের ছবি। বর্ষা সবচেয়ে আদরের ঋতু। সজল মেঘ মেদুরের অপরূপ বর্ষার সঙ্গে রয়েছে বাঙালি জাতির আজন্ম কাল হৃদয়ের বন্ধন ।কৃষিপ্রধান ভাইদের জীবনে এনে দেয় অর্থনৈতিক সচ্ছলতা । বজ্রবিদ্যুৎ ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে রুক্ষ অবক্ষয় শুষ্ক মরু প্রান্তরে এনে দেয় সবুজ সতেজ প্রাণের সঞ্চার । রৌদ্র জলের মাখামাখি তে প্রকৃতি রানী সেজে ওঠে নবরূপে। শস্য শিশুর কল কল উচ্ছ্বাসে তার চোখে লাগে অনাগত দিনের বিভোর স্বপ্নের নেশা ।প্রকৃতি রানীর আঁচলভরে ওঠে নতুন দিনের স্বপ্ন বিভোর হয়ে । বর্ষাকাল শস্য-শ্যামলা আনন্দঘন নবান্ন উৎসব এর নেপথ্য মঞ্চ । আবার তারই অপ্রসন্ন অভিমানী দৃষ্টিতে ঘরে ঘরে অন্তহীন সংহার রূপে মানুষ আতঙ্কিত ভীতসন্ত্রস্ত । শ্যাম ঘন বরষা একদিকে যেমন গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে আশীর্বাদ, অন্যদিকে আবার দরিদ্র পল্লীবাসী অনাহারী ফুটপাতবাসী দের কাছে দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায় ।তবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ জীবন প্রবাহের এক অপরিহার্য কল্যাণী ঋতু।

কবিগুরু লিখেছেন "এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়"কবির দৃষ্টিতে বর্ষা গভীর অর্থ ব্যঞ্জনাময় বিস্তৃত । বর্ষাকাল হলো অবকাশের নিষ্প্রয়োজন ঋতু। ঋতু শুধু অর্থনৈতিক জীবনে নয় সাংস্কৃতিক ভাগবত জীবনের ও বর্ষা ঋতু রয়েছে এক অনন্য ভূমিকায় । বর্ষার সরস সজল স্পর্শ শুধু রুক্ষ ধূসর প্রান্তকে অসীম কানে স্পন্দিত করে নি প্রেমিক মনকে দুর্বল করে তোলে। প্রেমিকার নিঠুর ঠোঁটের ভাজে উর্বর ভাষা য় উন্মাদনার চেতনা সঞ্চারিত হয় ক্ষণে ক্ষণে । বর্ষা উৎসব আনন্দে রচিত হয়েছে কাব্য, গান ,উপন্যাস ও অজস্র প্রেমের কবিতা  আলো আঁধারের খেলা অনুষ্ঠিত হয়  বিমোহিত করে প্রকৃতি রানী কে। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের ৮০ ভাগের অধিক বর্ষাকাল সংঘটিত হয়। নদী নালা খাল বিল পুকুর ডোবা কানায় কানায় ভরে ওঠে। বিলে বিলে হেলেঞ্চা, কলমি লতা, শাপলাদের সমাবেশে সেজে ওঠে প্রকৃতি কন্যা।

বর্তমানে আমাদের দেশে ঋতুচক্র আবর্তিত হয়। ছয়টি ঋতুর সমাহার। দ্বিতীয় এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঋতু হলো বর্ষাকাল। গ্রীষ্মের দাবদাহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চাতক পাখির মতো এক পশলা বৃষ্টির জন্য তাকিয়ে থাকে ঐ দূর আকাশের দিকে ।বর্ষার আগমনী গান "আমি বর্ষা অমলিন গ্রীস্মের প্রদাহ শেষ করি, মায়ার কাজল চোখে, মমতার বর্ম পুট ভরি"।প্রকৃতি যেন নিজের তিস্নার্ত বুক ভরানোর জন্য বর্ষাকে আহবান করে।জেলেদের মাতান উল্লাসে জাল ফেলে নদীতে । জল ভরে উঠে আসে রুপালি মাছ । জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, কলা গাছ কেটে ভেলা বানায় ছোট্ট শিশুর। কলার ভেলায় চড়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে শৈশব। ডুব দিয়ে হার মানায় পানকৌড়িকে। এই বর্ষা প্রকৃতিকে নতুন রূপে সাজিয়ে তোলে বৃষ্টির । ফলে সতেজ হয়ে ওঠে গাছপালা। এ সময় নানা ধরনের ফুলের ফুল ও ফলের সমারোহ সেজে ওঠে প্রকৃতি রানীর প্রাণের ডালা। কদম ,রজনীগন্ধা ,কেয়া ,জুই ,গন্ধরাজ, হাসনুহানার গন্ধে প্রকৃতিকে বিমোহিত করে তোলে। আম, জাম ,কাঁঠাল পেয়ারা সহ বিভিন্ন হলে সম্মোহিত হয় প্রকৃতি।বাংলা মাস অনুযায়ী আষাঢ় শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল। 
 
যতদূর দৃষ্টি যায় পাংশুটে আকাশে মেঘের জাল বোনা ।প্রকৃতির নিথর নিস্তব্ধ তৃণভূমিতে জেগে ওঠে প্রাণের হিল্লোল।আকাশ দিগন্ত বিস্তার ধূসর মেঘ পুঞ্জিতে।সজল দিগন্ত ভেসে চলে বলাকার সারি ।কুলায় কাঁপিছে কাতর কপোত। আসন্ন বৃষ্টির আশঙ্কায় জনহীন পথঘাট ক্ষুদ্র পবনের মত্ততা ভবনে ভবনে রুদ্ধ দুয়ার।থেকে থেকে দীপ্ত দামিনীর চমক উদ্ভাস কাঁপিছে কানন ঝিল্লির রবে চারিদিক গতিময় আর্তিকার মহা উল্লাস। বর্ষাকাল রূপ-বৈচিত্র্যে তুলনাহীন মানুষের মনে সঞ্চয় করে অনন্ত বিরাজময় বেদনা । বর্ষার এক হাতে বরাভয় অন্য হাতে ধ্বংসের প্রলয় ডমরু। এক পদপাতে সৃজনের প্রাচুর্য অন্য পাতে ধ্বংসের তাণ্ডব। এক চোখে অশ্রু অন্য চোখে হাসি । বর্ষা আমাদের কাছে অতি আদরের ও অনন্ত বেদনার ঋতু রূপে পরিচিত। তাইতো বর্ষা হলো প্রেম কবিতা, কবির ভাষায় বলা যায়- 
ওরে বন্ধু জীবন সাথী,আয় ফিরে আয় ঘরে
তুই যে আমার বৃষ্টি রানী,রাঙা মাটির পরে"
মুখখানি তোর লুকিয়ে রাখিস,কিসের অভিমান? 
তুই না এলে তুলবে চাষী,গোলায় পোড়া ধান"
একে একে যাচ্ছে ফিরে,যাদের আয়ু অল্প 
খাপরার চাল হচ্ছে খালি,শুনে যা সেই গল্প "
জল জোয়ারে শূণ্য উনূন,শিশুর শুকনো মুখ 
অশ্রুধারায় চলছে ভিজে,শূন্য মায়ের বুক " 
পথের পথিক যায়নি হাটে,ফিরছে অভিমানে 
উষ্ণ বায়ুর ভীষণ দাপট,ক্লান্তি মনও প্রাণে"
ওই পাহাড়েরে চূড়ায় খেলিস, লুকোচুরি খেলা
মাঠ ঘাট সব ভরিয়ে দে,যেথা ভাসবে রঙিন ভেলা "



বর্ষা ভাবনা 

উতল ধারা বাদল ঝরে
চিত্রা পাল

আজ কদিন হলো, মেঘেদের কাজের যেন  শেষ নেই। সারাদিন সারাবেলা সে ঝরঝর শব্দে বৃষ্টি দিয়েই চলেছে। ঘন মেঘের আবরণে বৃষ্টি দিয়ে  দিনের শুরু।তারপরে কখন যে বেলা গড়িয়ে যায় বোঝা যায় না। আকাশ ঘেরা কাজলমেঘে বিদ্যুতের ঝলক জেগে ওঠে, তারপরে শোনা যায় সেই বজ্র নির্ঘোষ। তার আলোর আভার কাঁপন দেখা যায়, ওই আমগাছের মাথায়, কাঁঠাল গাছের ছায়ায়। আকাশ থেকে আকাশে শোনা যায় গুরু গুরু ধ্বনি। নারকেল গাছেরা সুপুরি গাছেরা অবিরত মাথা দোলায়।  এখন সমস্ত আকাশ বাতাস জুড়ে  জল স্থল অন্তরীক্ষে  শুধু মেঘ বৃষ্টির খেলা। এরই মাঝে আমাদের চমকে দিয়ে হঠাত্‌ পাওয়ার মতো রোদ জেগে  ওঠে।তখন আমরাও জেগে উঠি। মনে হয় এইতো আমরা আছি। এতদিন মেঘবৃষ্টির মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। কোন কল্পলোকের ছায়া ছবিতে। এখন শুধু খবর আসে বাণভাসির। অবাধ্য দুরন্ত বাঁধনহারা নদী নিজের সীমা পেরিয়ে ঢুকে পড়ছে হাটে বাজারে,ঘরের উঠোনে। উতলধারা বাদল ধারার সঙ্গে  এদের সম্পর্কও যে  বাঁধা।

এখন সমস্ত আকাশ বাতাস জুড়ে যে মেঘবৃষ্টির খেলা, সে খেলা কিন্তু সামান্য নয়। প্রবহমান জীবনেও চলেছে তারই প্রতিচ্ছবি। কত হাসি কান্নার যে জীবনব্যাপী সুখ দুঃখের জাল বোনা  চলেছে এই মেঘ বৃষ্টির মধ্যে সেও তুচ্ছ নয়। কত অকারণ অভিমান, কত ব্যথা বেদনা,কত স্নেহ কত কল্পনা এই বর্ষণের  বারিধারায়  অঙ্কুরিত হচ্ছে, তার লেখা জোকা নেই। তবু এই উতল ধারা বাদলে আমরা চলে যেতে পারি সেই কল্পজগতে,যার ছায়াপ্রলেপে আমরা চলে যেতে পারি তেপান্তরের পাথার পেরিয়ে রুপকথার জগতে তার আকর্ষণও বা কম কি।                 



বর্ষা কবিতা 

বৃষ্টি আসে
শ্রাবণী সেন

বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি নামে শালের বনে ঝড়
বৃষ্টি স্রোতে ভাঙছে দেওয়াল, কাঁপছে থরোথর।

বৃষ্টি নামে আষাঢ় মাসের সন্ধ্যা ঘনায় কালো
অন্ধকারের আড়াল টেনে জোনাকজ্বলা আলো!

 আলোয় কালোয় মিলেমিশে রাত ঘনিয়ে আসে
চোখের তারায় বার্তা চলে মধুর হাসির ভাষে।

গাছের পাতায় লুটিয়ে পড়ে বৃষ্টি অবিরল
ঘুমের আবেশ পরম প্রিয় স্বপ্ন দেখার ছল!



বরিষণ 
মনিরুজ্জামান প্রমউখ 

দুনিয়ার সোরগোল সুমন্তর করে হাওয়ার শরীরে পড়িয়ে দেয় 
বরিষণ, বছরঘূর্ণি বর্ষা তার একমাত্র লালিত্য নুপুর নিক্কণ। 
প্রবর্তীত ঝংকার ব্যতীত নির্জনতার সাথে মানুষের যুথসন্ধি 
মিলন, ঘর খোঁজে তখন সকল প্রাণ গাঁও নগর বন্দর সব থান। 




 অভিমানিনী মেঘপর্নার কথা
               চন্দন কুমার দাস 

পাহাড়ে বৃষ্টি হলে ----গাছেরা সবুজ হয়
 স্রোতস্বিনীর বুক ভরে ওঠে আনন্দে।
 সবুজ পাহাড় মেঘের আড়ালে থাকা সূর্যকে ডাকলে, 
সূর্য একগাল হাসি দিয়ে ঝিকমিক করে ওঠে।

 কিন্তু এখানে বৃষ্টি নেই ;
বর্ষা আসে,মেঘ-পর্ণাকে ডাকে__" তুমি ঘুমিয়ে আছো?"
 মেঘ পর্না নিশ্চুপ ।
মেঘপর্ণার আসলে বৃষ্টি হবার কথা ছিল।
 বৃষ্টি হলে হয়তো গাছেরা সবুজ হয়ে উঠত, বাগানে ফুল ফুটত ; 
জমে উঠত প্রজাপতিদের ভিড় ।
অভিমানিনী মেয়ে মেঘপর্ণা ;আসলে তার বৃষ্টি হবার কথা ছিল।


তিলোত্তমা 
রূপক রায়

কালো মেঘের বৃষ্টি নামে রৌদ্র ওঠে বনে
তখন থেকেই হিসেবে গুলো তোলা ছিল মনে
যাওয়ার বেলা শর্ত গুলো জড়িয়ে যদি ধরে
স্বপ্নগুলি চেঁচিয়ে ওঠে নন্দন চত্ত্বরে
ঘাসের গন্ধ ভিজে মাটির 
ক্লান্তি থেকে ছুটি
হাত ধরে শুয়ে আছে
দু'টি-প্রাণ, এই আকাশের নীচে 
উষ্ণ অন্ধকার রাতগুলি 
ভোর হয় ট্রামের শব্দে, স্টেশনে
এই সময়ে বৃষ্টি নামুক 
তোমার ভিক্টোরিয়া ময়দানে
শরীর জুড়িয়ে 
নেমে আসুক তোমার শীতলতা
ভরে যাক সমস্ত চিঠির পাতা
যা কিছু শূন্য-সীমাহীন ।


বর্ষা ও মেঘদূত
প্রনবরুদ্র কুন্ডু

কাজল নীরবতা ভেঙে পথ নামে স্মৃতি
গোপন চিঠি
কান্নার চেয়ে প্রিয়তর অপেক্ষা-
আনন্দ ও ব্যথা তুমি:
নীল আঁধার আবেগী আবদার;
মন কেমনের চাঁদ দূরবর্তী নদী পাঠ

নেমে এসো মাটির ভিতর
প্রতিদিন যক্ষের ধন ভিখারি জীবন, এসো 
প্রেমস্রোতে নিত্য ভালোবাসা শিখি।
নানা গল্প ধরে বিরহ ও অন্ধকার
পরস্পর মেশে মেঘলা আকুলতা; ও মেয়ে 
একাকী ঘুম এপাশ ওপাশ, জাগে বাঁশিওয়ালা…

সুর তুলে মেঘও হয় জলবতী আনমনা
আকাশের বুকে বারোমাস নদীর আনাগোনা 



বর্ষা যাপন
      রমজান সরকার 

আমি যতবার তোমায়
রবীন্দ্র সংগীতে খুঁজে নিই
তুমি ততবার শহর পরিবর্তন করো

হয়ত ভুলে যাও প্রথম সকাল
বাজারের মোড়ের বৃষ্টিভেজা অদেখা
পাশাপাশি না বসা -
ইশারায় দুচোখের কৌমার্য ভাঙা
ঘাসের মেঝেতে হাটা
একটু বিশ্রাম; আঙুলে আঙুল রাখা
হাতে হাত, প্রতিজ্ঞা প্রথম দিনেই...

তুমি বর্ষা; জাল বুনতে সক্ষম মাকড়সা
বর্ষপঞ্জি পরিবর্তনে ব্যাপৃত ভেজা ঋতু
যাকে আমি যাপন করি প্রতি রাতে




বর্ষা  গল্প 

ডেলিভারি বয়
মৌসুমী চৌধুরী 


আজ একটু তাড়াতাড়িই কোর্ট থেকে ফিরে এসেছে রাই। খুব ইম্পর্টেন্ট একটা কেসের হিয়ারিং ছিল ফার্স্ট আওয়ারে। সকাল দশটা থেকে বেলা প্রায় একটা পর্যন্ত হিয়ারিং চলেছে। শেষ হয়ে যেতেই বেশ টায়ার্ড লাগছিল রাইয়ের। কেসটা নিয়ে একমাস ধরে খুব পড়াশোনা করতে হয়েছে। খাটতে হয়েছে।  মাথাটা বেশ ধরেছিল। বলাইদাকে এককাপ কফি দিতে বলে ফাইলপত্র গোটানো শুরু করেছিল সে। সকাল থেকেই গাঢ় ছাইরঙা আঁচলে মুখ ঢেকে ছিল আকাশটা। আর মাঝে মাঝে টিপ টিপ সুরও সাধছিল সে গোমড়া- মুখী। তাই আলিপুর কোর্ট চত্তর থেকে গাড়িটাকে বের করবার আগেই ঝমঝম করে তুমুল বৃষ্টি নেমে যায়। গাড়িটা লালবাতি হয়ে এগিয়ে গিয়ে মাঝের হাট ব্রিজ ক্রস করে বেহালার দিকে আসতেই চোখে পড়ে মিনিট চল্লিশের তুমুল বৃষ্টিতেই ততক্ষণে চারদিকে জল জমতে শুরু করেছে। তাদের আবাসনের সামনেও বেশ জল জমেছে। গাড়িটা গ্যারেজে রেখে আসতে আসতে বেশ খানিকটা ভিজে গিয়েছিল রাই। ঘরে ঢুকেই সোজা বাথরুমে। হালকা উষ্ণ জলে স্নান করবার পর খিদেটা চাগাড় দিয়ে ওঠে। আর তখনই মনেপড়ে আজ ঘরে কোন রান্না নেই। সকালে কাজে আসেনি মালতীদি। দুপুরে বলাইদাকে দিয়ে একটা ধোসা আনিয়ে কোর্টেই লাঞ্চ সেরেছে। আর এখন তো এই বৃষ্টিঝরা বিকেলে মালতীদি আসবার কোন সম্ভাবনাই নেই। অগত্যা এক কাপ কফি বানিয়ে, চানাচুর আর আচারের তেল দিয়ে এক বাটি মুড়ি মেখে নিয়ে জানালার ধরে এসে বসে রাই।  
     " আওগে যব তুম ও সাজনা /আঙ্গনা ফুল খিলেঙ্গে ..." — মিউজিক সিস্টেমে খুব লো ভলিউমে প্রিয় গানটা চালিয়েছে। সেই কলেজ জীবন থেকে এটা রাইয়ের প্রিয় গান। বাইরে এখনও তুমুল বৃষ্টি চলছে। যেন আকাশ একেবারে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে। জালানা -র কাঁচে চলছে বৃষ্টির উদ্দাম নাচন। সামনের রাস্তা-ঘাট-দোকানপাট সব ঘোলাটে লাগছে। ঠিকমতো ঠাওর হচ্ছে না কিছু। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রাই দেখল ঘড়িতে বিকেল তিনটে বাজে। তিনটেতেই  চারদিকে যেন রাত ঘনিয়ে এসেছে। জ্বলে উঠেছে স্ট্রীট -লাইট। খুব কাছেই কোথাও বোধহয় কড়াৎ কড়াৎ করে বাজ পড়ল। দু'ঘন্টার তুমুল বৃষ্টিতে ড্রেন উপচে চারদিক একেবারে জলে ডুবে গেছে। আজ খুব খিঁচুড়ি আর মাছভাজা খেতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে রাইয়ের। মা চলে যাওয়ার পর বৃষ্টি দিনের এই মেনু প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে। ছোটবেলায় জলপাইগুড়িতে বৃষ্টি  মানেই ছিল অন্তত টানা সাতদিনের প্রোগ্রাম। তাদের টিনের চালে বৃষ্টির ঝম ঝমাঝম আওয়াজ উঠত। আর বৃষ্টি হলেই মা মুসুর ডালের খিঁচু্রি রাঁধতেন, সঙ্গে থাকত কড়কড়ে আলু ভাজা, পাঁপড় ভাজা, পিঁয়াজি ইতাদি। কখনও-সখনও থাকত মাছভাজা বা ডিমভাজা। ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ির থালা ঘিরে হাপুসহুপুস আনন্দ করে খেত তারা ভাইবোনেরা। 
   ধীরে ধীরে খুঁজে জোমাটোতে অর্ডার করল রাই । "ষোলোআনা বাঙালিয়ানা"-র সবজি- খিঁচুড়ি, আলুভাজা, পাঁপড় ভাজা, রুইমাছ- ভাজা। কিছুক্ষণ পর "ষোলআনা বাঙালিয়ানা" থেকে ফোন এল,
— " ম্যাডাম, এই বৃষ্টিতে আপনার ওয়ার্ডের সব রাস্তাঘাট তো জলে ডুবে গেছে। ডেলিভারি হবে কিনা এখুনি বলা যাচ্ছে না। স্টাফ কম। আর ডেলিভারি চার্জ কিন্তু অন্যদিনের চেয়ে বেশি লাগবে।" 
ওদের সম্মতি জানিয়ে কফির কাপে চুমুক দিল রাই। আর মনে মনে ভাবল জোম্যাটো অর্ডারটা ক্যানসেল করলেও আজ নিজেই যেমন পারে খিঁচুড়ি রান্না করে খাবে।  
   "...বরষেগা শাওয়ান, বরষেগা শাওয়ান / ঝুম ঝুম কে/ দো দিল এ্যায়সে মিলেঙ্গে..." 
বড় গভীরে ছুঁয়ে ছুঁয়ে মিউজিক সিস্টেমে বেজে চলেছে গানটি। আষাঢ়ে বৃষ্টির এই গভীর বিকেল, এই উতল বর্ষা, গানের কলির এই জল আঁচড় রাইকে কেমন যেন বিহ্বল করে তুলছে!  
— "রূপমায়াতে 'যব উই মেট' এসেছে।  যাবি দেখতে?"
— "এই বৃষ্টিতে সিনেমায়? মাথা খারাপ! "
— " চল না আজ তো ক্লাসও তেমন হবে না। সকাল থেকেই যা নেমেছে। আকাশ যেন ফুটো হয়ে গেছে। 
বিমর্ষ গলায় বলেছিল রাই। রাইয়ের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল জিষ্ণু, প্রিয়া, স্বপন, রুমকিরাও।
     জলপাইগুড়ি ল-কলেজে পড়তে গিয়ে প্রথমদিন থেকেই মুখচোরা অমলের সঙ্গেই কেন যে তার বন্ধুত্ব হয়েছিল, তা জানে না রাই। আশেপাশের কোন একটা চা-বাগান থেকে পড়তে এসেছিল সে। তার বাবা ছিলেন চা বাগানের ফ্যাক্ট্রির লেবার। খুব কষ্ট করেই তাকে পড়াতেন তার বাবা। তাদের বাগানের শ্রমিক বস্তির কেউ পড়াশোনা তেমন চালিয়ে যেতে পারত না। অমল পড়ায় খুব মনোযোগী ছিল বলে চেয়েচিন্তে টাকা পয়সা জোগাড় করে তার বাবা তাকে জলপাইগুড়ি ল কলেজে ভর্তি করেছিলেন। আর পড়াশোনায় ভালো ছিল বলেই রাইয়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে তার ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিল। রাই কলেজে না গেলে অমল তাকে নোট লিখে দিত। তার মুক্তোর মতো ঝকঝকে হাতের লেখা আজও চোখে ভাসে রাইয়ের। 
— " আমার পয়সা নেই রে। তোরা যা।"
সরল গলায় উত্তর দিয়েছিল অমল।
— " তোর টিকিটের দাম আমিই দেব। তুই চল তো।"
গাঢ় স্বরে বলেছিল প্রিয়া। হৈ হৈ করে উঠেছিল 
অন্যেরাও,
— " যেতেই হবে তোকে..."
    সেদিন সিনেমা হলে লোক খুব কমই ছিল। দু'টো-রো জুড়ে একসঙ্গে বসেছিল রাইদের বন্ধুদলটা। রাই লক্ষ করল তার ঠিক পাশেই এসে বসেছে অমল। বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি নেমেছিল। সিনেমা হলের টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম আওয়াজ, সিনেমার পর্দায় রোমান্টিক দৃশ্য সেদিন যেন যেন চারিয়ে গিয়েছিল দুই কিশোর-কিশোরীর মনেও৷ কখন যে অমলের হাত উঠে এসেছিল রাইয়ের হাতের উপর দু'জনের কারও খেয়াল নেই। ইন্টারভেলে লাইট জ্বলে উঠলে লজ্জা পেয়ে হাত সরিয়ে নেয় দু'জনেই। সেদিন ফেরার পথে বৃষ্টিটা একটু ধরেছিল। নিঃশব্দে রাইয়ের পাশে হাঁটতে হাঁটতে পাড়ার গলির মুখ পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিয়েছিল অমল।

        রাইয়ের ফোনটি হঠাৎ সুরেলা ঝংকারে জানান দিলে বর্তমানে আছড়ে পড়ল সে।
— " হ্যালো ম্যাডাম। আপনার খিঁচুড়ি ডেলিভারি হয়ে যাবে আটটার মধ্যে। কিন্তু  ডেলিভারি চার্জ কিন্তু একটু বেশিই লাগবে। এই দুর্যোগে ডেলিভারি বয়রা কেউ যেতেই চাইছিল না। বহু কষ্টে আমাদের হোটেলের  একজন স্টাফ রাজি হয়েছেন।"
— " ঠিক আছে। পাঠান। আমি এক্সট্রা ডেলিভারি চার্জটা পে করে দিচ্ছি।"

ফোন রেখে  জানালার বাইরে তাকিয়ে রাই দেখে পথ-ঘাট, বাড়ি-ঘর, দোকানপাট সব কেমন বাঁধনহারা বৃষ্টির সাদা আদর মেখে যেন গলে গলে জল হয়ে ঝরে যাচ্ছে ! রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো অকাতরে মাথা নীচু করে ভিজছে অপরাধীর মতো। এই রূপোরঙা বৃষ্টির সঙ্গে কোনভাবে তাদের ছোটবেলাকার  জলপাইগুড়ির সেই  বৃষ্টির কি কোন আত্মীয়তা আছে? হারিয়ে যাওয়া মুখেরা জলপাইগুড়ি থেকে ভেসে ভেসে কেন এসে মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে? 
       তারা নিজেরা পরস্পরকে মুখ ফুটে কোনদিন কিছু বলেনি। কিন্তু রাই জানত Somebody is there — ঝকঝকে হাতের লেখায় নোট লিখে দিতে। কঠিন বিষয়গুলো বুঝিয়ে দিতে। লক্ষ্য করত অমলের নীরব চোখের পাতায় জেগে আছে  হাজার কথার সুনামী ঢেউ আর বিষন্ন মেঘ। 
      সময়টা ছিল কলেজের সেকেন্ড ইয়ারের মাঝামাঝি। প্রায় সপ্তাহ খানেক অমলের কোন দেখা নেই। ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে উঠেছিল রাই। তার মেসে খোঁজ নিয়ে  জানতে পারল  বাড়িতে গেছে সে। বাড়ি থেকে যেদিন  ফিরে এল অমলের চুল উসকো খুসকো, চোখ লাল, মুখে না কামানো খোঁচ খোঁচা দাড়ি,
— " আমি আর পড়াটা চালাতে পারব না রে, রাই। কলেজ ছেড়ে দিচ্ছি। আমাদের বাগান লক-আউট হয়ে গেছে। বাবার চাকরিটা আর নেই। বাবা আমাকে আর পড়াতে পারবেন না। আমি কালই চলে যাব ব্যাঙ্গালোরে।  একটা হোটেলে কাজ পেয়েছি। ভাইবোনেরা সব ছোট ছোট সংসারের হালটা আমাকেই ধরতে হবে রে।"
      স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে রাই। গাল বেয়ে জল নামতে থাকে। তারপর আর কখনও, আর কোনদিনও অমলের সঙ্গে দেখা হয়নি তার। ল পাশ  করবার পর জলপাইগুড়ি কোর্টে সে প্রাকটিস করত কিছুদিন। অরিণের সঙ্গে বিয়ে হতে  কলকাতায় চলে এসেছিল। আলিপুর কোর্টে প্রাকটিস শুরু করেছিল তখন থেকেই। কিন্তু তার নিজের জীবনের গতিটাও ঠিকঠাক খাতে বইল না। বিয়ের পর পরই একদিন রাই জানতে পারে অরিণ বহুদিন থেকে অন্য একটি সম্পর্কে জড়িত। তার প্রেমিকা ডিভোর্স না পাওয়ায় বিয়ে করতে পারেনি তারা। বিয়ের পরও সেই সম্পর্কে থাকতে চায় সে। অরিণের নিজের মুখে এ রকম স্বীকারোক্তি শুনে একদিনও আর সে বাড়িতে থাকেনি রাই, মায়ের কাছে ফিরে এসেছিল। বাবা চলে যাওয়ার পর মাও ততদিনে জলপাইগুড়ি ছেড়ে কলকাতায়। গত বছর তো মাও চলে গেলেন। এখন কলকাতায় মায়ের এই ফ্ল্যাটে রাই একাই থাকে। 
          ফোনের রিংটোনে চমক ভাঙে রাইয়ের। ডেলিভারি বয়ের কল। কল রিসিভ করে রাই বলে,
— " আসুন। থার্ড ফ্লোর, অ্যাপার্টমেন্ট  ৪/২।"

   কলিং বেল টিপতেই দরজা খুলে দেয় রাই। দেখে ছেলেটি একদম কাকভেজা ভিজে গেছে। পরনে নীল জীনসের প্যান্ট আর হলদে টি-শার্ট। ইস! তাকে খাওয়ানোর জন্য একজন লোক এই ভারী বৃষ্টির মধ্যে এত কষ্ট করে খাবার নিয়ে এসেছে! ভাবতেই নিজেকে বড় অপরাধী লাগে। মনটা একটু খারাপ হয়ে যায়।

   খাবারটা নিতে গিয়ে এক লহমায় ডেলিভারি বয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই চমকে ওঠে রাই! চিনতে একটুও ভুল হয় না ... অমল!!!
  বাইরে তখন নিচ্ছিদ্র ধারাপাত!  মিউজিক সিস্টেমে বাজছে — "...বরষেগা শাওয়ান, বরষেগা শাওয়ান / ঝুম ঝুম কে/ দো দিল এ্যায়সে মিলেঙ্গে..."। ঘরের মধ্যে খেলে যেতে থাকে  "রূপমায়া " সিনেমাহলের সেই আধো অন্ধকার! 

     বহুদিন পরে বিহ্বল চোখে পরস্পরকে দেখতে থাকে অমল আর রাই! 



ঈশ্বরের বিচার

কাকলি ব্যানার্জী মোদক 


কথা ছিল ভালো থাকবো.......
        কথা ছিলো ভালো রাখবো......
                   কথা ছিল ভালোবাসবো......

‌নন্দনের চত্বরে দাঁড়িয়ে আমি, শ্রাবনের ধারা আজ বাঁধ মানছে না,ছাতা থেকে উপচে পড়া জলধারা বেনী স্পর্শ করে, আঁচল ছুঁয়ে মাটিতে মিশছে।  ঝড়ের গতিতে  চলে যাচ্ছে বাধা না মানা গাড়ি গুলো, তাদের তীব্র আলো আর  চারিদিক অন্ধকার মিলেমিশেএকটা অদ্ভুতপরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে,পাশে কেউ দাঁড়ালে বোঝা মুশকিল, এই আলো আঁধারিতে। দাঁড়িয়ে থাকতে, থাকতে  অন্য জগতে ভেসে যাচ্ছি আমি, অবশ্য এটা আমার একটা রোগ,  মাঝে মাঝে পুরোনো স্মৃতি কে হাতরাই।  আজ শনিবার একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে পড়েছি বৃষ্টির দিন বলে, ব্যাগটাকে  বুকের কাছে জড়িয়ে  ধরে আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে।

হঠাৎ একটা পুরুষ কন্ঠস্বর এসকিউসমি  একটু রাস্তাটা পা করে দেবেন, বুকের মধ্যে হাতুড়ির মতন যেন কে একঘা দিলো, মনে হলো কন্ঠস্বর যেন খুব পরিচিত, নিজের মনেই হেসে উঠলাম।সবসময় হাতড়ে বেড়াই আমার উজান কে, ছাতাটা হেলিয়ে দিলাম যতটা সম্ভব। মুখ ঢাকা দেয়া আমার একটা অভ্যেস। বাসে, ট্রামে উঠলে আমাকে সবাই করুনার চোখে দেখে, ছোট ছেলে ,মেয়েরা ভয়ে মায়ের আঁচলে মুখ ঢাকে,  আজকাল কেউ করুনার চোখে দেখালে মনে মনে খুব রাগ হয়, এটা তো হবার কথা ছিল না, তবে কেন? কেন প্রশ্ন জাগে বারবার?  
     
সেদিন ও ছিল এমন ই বর্ষার রাত, গাঁয়ের মেঠো পথ, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, পথ সংকুল ঝোড়ো হাওয়ায় দুধারের গাছ মাটি স্পর্শ করছে,আমার বুকে ধরা রবীন্দ্রনাথ, আর কাঁধে ঝোলা ব্যাগ, আলো আঁধারির  রাস্তা ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। ভয়ে -আতঙ্কে দ্রুত গতিতে  চলছিলাম। হঠাৎ অনুভব করলাম তরল পদার্থ মুখ স্পর্শ করে শরীর ছুঁয়ে নেমে যাচ্ছে ফুটন্ত লাভার মতন। আমার চিৎকারে পাশের লতাপাতা,বাঁশবন কেঁপে উঠছিল। গগনভেদি চিৎকারে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম, পরিচিত একটি কন্ঠস্বর কানে এলো "খুব অহংকার তোর, এবার সারাজীবন ভোগ কর।" 

যখন জ্ঞান এলো কোলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে অ্যসিডে ঝলসে গেছে আমার মুখের ডান অংশ। ধীরে ধীরে সুস্থ হলাম বুঝতে পারলাম কিশোরীর স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। দ্বীপের-শিখাটা নিজের অজান্তেই নিভে গেলো। প্রশ্ন জেগেছিল মনে বারবার কেন কেন উজান
এই কাজ করলো?

              ইদানিং বাউন্ডুলে উজানের আমার রূপ নিয়ে ওর সন্দেহের দানা দিনে, দিনে  ক্রোধে   পরিনত হতে থাকে। নামি কলেজে র ছাত্রী দ্বীপশিখা ওর কাছে ঈর্ষার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।  মেনে নিতে পারিনি আমার অবাধ বিচরণ।  হয়তো তাই এই পরিনতি। আবার ওই ভদ্রলোকের কন্ঠস্বরে তাকালাম এবার আর চিন্তে দেরি হলোনা, এই সেই উজান যে আমার জীবনটা এক লহমায়  অন্ধকার জগতে ঠেলে দিয়েছিল, রাগে প্রতি হিংসায় সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল ,মনে হচ্ছিল চলন্ত বাসের সামনে ঠেলে দি, এই আলো আঁধারিতে কেউ, কেউ আমাকে চিন্তে পারবেনা প্রতিশোধ নেয়ার  এই সুবর্ণ সুযোগ।  হাত বাড়াতে গিয়ে দৃষ্টি পড়ল তার চোখের উপর-- এই আলো, আঁধারিতে ঘন সন্ধ্যায় কালো কাঁচ ঢাকা  তার দুটি চোখ  ,হাতে অন্ধ লাঠি।  শুনেছিলাম ছোঁড়া অ্যসিডে দুই এক ফোঁটা তার চোখেতে  পড়েছিল। ঠাকুর কে  জানালাম, ঈশ্বর তুমি করুণাময়ী, ডান হাতটা  চেপে ধরে  নিশ্চিহ্ন পৌঁছে দিলাম  উজানের গন্তব্যস্থলে।। বাস ধরার জন্য।




বর্ষা কবিতা 

বৃষ্টি ছায়ার ভেতর 
সৈকত দাম

একটু একটু করে সরে যাচ্ছে মৌসুমী ....
ভেতরের বৃষ্টি টা ধরে আসছে ক্রমশ .....
শুকোতে দেওয়া অনুভূতি গুলো ,
আরও খানিকটা শুকিয়ে এলো .....
আমিও তুলে রাখলাম ঘরের এক কোণে ,
তারপর আমার বৃষ্টি শরীর এলিয়ে দেই ভেজা কাঠের মতো ....
যেন জীবিত নেই আর .....
একদিন যে বৃষ্টি নেমে এসেছিলো হিরন্যগর্ভের দেওয়াল বেঁয়ে ....
একদিন যে বৃষ্টির নাম দিয়েছিলাম নিরুপমা ....
একদিন যে বৃষ্টি নায়িকার মতো নেমে এসেছিলো বুকের লোকেশনে .....
আজ সে আলোর গন্ধ পেলে প্রহর গোনে .....
আমার সাথে শুয়ে আছে শেষ বৃষ্টি কণা ....
তার মধ্যে শুয়ে আছে ক্ষণজন্মা পৃথিবী .....
আষাঢ়ের পরে শ্রাবণের শেষে 
এমন করেই পৃথিবী ক্ষণ জন্মা হয় ,
হয়তো সবার নয় .....
কে কতো বৃষ্টি মেখেছিলো সেদিন ,
তা সন্নিবিষ্ট ধোয়াশাই বলে দেয় .....
আর তারপর সমস্ত অনাদি দৃশ্য ডুবে যায় 
বৃষ্টি ছায়ার ভেতর .....




বর্ষালী গান
রীতা মোদক

একটা খোলা ছাদ
আর
একটা আকাশ ।
দুটোই মুক্ত
মাঝখানে বিশাল ব্যবধান ----

হঠাৎ আকাশের বুকে জমে ওঠে
বিষণ্ণতার কালো মেঘ।

মেঘের পাহাড় জমতে জমতে---
একসময় গর্জে ওঠে 
আগুন জ্বলে গহীন আকাশে ।
অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামে ---
ভিজে যায় ছাদ বাগান,
ভিজে যায় রুক্ষ মাটি ।
বৃষ্টি নামের মেয়েটি---
খোলা ছাদ আর আকাশের মাঝে
এখন বর্ষালি গান গায় ।


বৈতালিক সুর
অলকানন্দা দে 

তখন আমার ছেঁড়া ঘুমের ভোর
পাহাড় আড়ে প্রেমিক মেঘের বাসা
বৃষ্টি এলো ভিতর ঘরে ছুটে
পাইন বনে ভিজছে ভালোবাসা!

নদীর মুখে নতুন বুলি ফোটে
পাতায় পাতায় কথা বলে জল
মেঘে মেঘে আত্মদানের কর্ম
ভোর-বরণে ফোঁটাই সম্বল!

মনের ভিতর আদরগুলো কাঁপে
বুকের উনুন দিচ্ছে সরল তাপ
উড়ে যাওয়া অসংযমী হাওয়া
বলে গেল প্রেমের দৈর্ঘ্য মাপ!

মাপতে গেলে বহর বাড়ে শুধু
ইচ্ছে ভেজে মেঘবৃষ্টির ভাঁজে
দিব্যি করে বলছি আমি শ্রাবণ
আবেশ ঋণে ঋণী তোমার কাছে!

লক্ষ লক্ষ দরাজ বারি বিন্দু
চা বাগানে তীর্থযাত্রী সব
প্রেম সাধনা দেখছি জানলা জুড়ে
আকাশ ভাঙা জলের বিপ্লব!



সে ও কবিতা
ঋতুপর্ণা রায় বর্মা

শেষ বিকেলের ছড়ানো রোদ চলে যায় যেই,
নিভু নিভু হয়ে আসে সন্ধ্যালোকের আলো যেই, 
অতর্কিতে নেমে আসে বিষাদ মাখানো রাত।
বিরস দিনগুলিতে কাজে ও অকাজে
যেহেতু মুহূর্তের ফুরসত থাকেনা,
তাই রাতে বিশ্রাম নিতে চায় মগজের পাঠশালা।
অথচ তক্ষুণি উধাও হয়ে যায় রাজ্যের ঘুম, 
আর তিমির রাতের গভীর মায়া!
অসাবধানতায় স্মৃতির ভয়াল অরণ্যে___
দু'চোখ চলে যায় যেই,
মানসিক দ্বন্দে,প্রহারের চিহ্নে
শুরু হয়ে যায় নির্নিমিখ প্রহরের ক্রন্দন। 
আর স্তিমিত অবয়বে নেমে আসে 
অশান্ত বিষণ্ণতার ছায়া!

এলোমেলো দীর্ঘশ্বাস আর অস্বস্তিতে__
অতীত সরণীর যাবতীয় ভিড় ঠেলে 
দেয়ালে দেয়ালে নিজের নতুন রূপের ছায়া আঁকে,
শব্দে-ছন্দে নীরবতা ভাঙার স্পর্ধা দেখিয়ে 
ভোরের রক্তিম আশা নিয়ে,
সুখের ডংকা বাজায় সে।
এভাবেই পীড়িত আকাশে 
তারারা যত অস্পষ্ট হয়ে আসে__
অলস ব্যথাদের বুকে নিয়ে, 
ভালোবাসাহীনতার নাছোড় জ্বরে 
কবিতার কোলে নেতিয়ে পড়ে সে। 


মেঘ বনেদি
দেবার্ঘ সেন

বিতানে আজ, কান্না মেঘে
ভরা আষাঢ়,  টেনে নেবে
সহস্রতার, গুরু বায়না।

জুঁইয়ের গন্ধে, নি মন ধুয়ে
দেখাটুকু, আলগা হলে
ভালো থাকতে, মন চায়না।

আষাঢ় ভালো, এ জমকালো
মনের মধ্যে, জল ছেটালো
ভরসা পেলে, বর্ষা ভেদি।

ভুলবশত, মনের ক্ষত
বন্দী থেকে, শুকনো যত
তাদেরকে আজ, ছড়িয়ে দিই। 


এক অন্য বর্ষা 
সারণ ভাদুড়ী

আমি চাই বৃষ্টি পড়ুক,
আমি চাই এই বৃষ্টি মুছে দিক,
মানবিকতার ওপর সেই বর্বর অমানবিকতার চাদর।
নিঝুম শহরে নেমে আসুক এক অন্য বর্ষা,
যে বর্ষা নিয়ে আসে মানবিকতা,
নিয়ে আসে মানুষে মানুষে ভালোবাসা।
বৃষ্টির জল সেই সব গর্ত গুলো ভরে দিক,
সহানুভূতির জলে,
মুছে দিক সকল বিদ্বেষ।
আবার এই শহরেই নেমে আসুক
সেই বর্ষা,
যেখানে থাকবে শুধুই সারল্য।
টর্নেডোর ওই ঘূর্ণনের মত
থাকবে না কোনো জটিলতা।।



বর্ষা ছড়া 

বর্ষাদিনে 
রীনা মজুমদার

বর্ষাদিনে বর্ষা ছিল সবুজ পাতায়
সুখ দুঃখের ছেলেবেলার খাতায়

নিভছে আগুন উনুনে ভেজা খড়ি
মায়ের ওমে ফুটছে ভাতের হাঁড়ি

এ ঘর ওঘর যেতে কোথায় ছিল ছাতা?
ছিল মাথায় মায়ের  আঁচল পাতা

বর্ষা এলে যখন গ্রামের ছবি আঁকি
ইচ্ছেগুলো বুকের মাঝে  রাখি 

মেঘ বাতাসের কত কথা হয়  যে বর্ষায়
কোন এক ছলে চাঁদের হাসি পড়ে আঙিনায়

তখন আমি মানস চোখে জলছবি আঁকি!
মায়ের হাতের প্রদীপখানির সেই যে ছায়া দেখি।


মেঘের খেয়ায় ভাসি
মজনু মিয়া 

আজকে আকাশ মেঘলা অতি দারুণ লাগে দেখে
চলো না যাই রঙ লাগিয়ে সাথে কাদা মেখে
তুমুল বেগে বৃষ্টি ঝরছে জল থইথই যে করে
অমুক সুখে খুশি খুশি মন বসে না ঘরে।

ঐ যে দূরে নদীর জলে খেয়া নায়ে চড়ে
ভাসি দুজন ভিজি দুজন আলিঙ্গনের ঘরে
মেঘের খেয়া সাজাই দেবে বৃষ্টি রানি এসে
পাশাপাশি বসবো দুজন আলতো একটু হেসে।

এই জনমে সাধ পূরবে না পূরবে বলো কবে?
আর জনম পেলে তখন ভাববো নতুন তবে
পড়ুক জলের ধারা মুষলধারে থেকো পাশে
বাঁচা মরা একসাথে যেন্ রবো তেমন আশে।


বৃষ্টির দিনে
সুভাষ চন্দ্র রায়

আষাঢ় শ্রাবণ বর্ষাকালে,
ভিজছে পাখি গাছের ডালে।
ঝম ঝমা ঝম বৃষ্টি ধারা,
আয় না ভিজি পাগল পারা।
জল জমেছে ডোবায় মাঠে,
মাছ ধরতে বেলা কাটে।
সোনাব্যাঙ ফুলিয়ে গলা,
গানের গুঁতোয় কানে তালা!
বিদ্যালয়ে যাবার বেলা,
জল ছিটিয়ে করি খেলা।
ভেজা প্যান্ট ভেজা জামায়,
গুরুমশায় ধমক লাগায়।
ধমক খেয়ে বসে থাকি,
বাদলধারার ছবি আঁকি।
ফেরার পথে ক্ষেতের জলে,
জল ছিটানো আবার চলে।
দৌড়ে তাড়াই সোনাব্যাঙ,
লাফিয়ে পালায় লম্বা ঠ্যাং।


বান এলো বৃষ্টি এলো
 বিজন বেপারী

বান যে এলো বৃষ্টি নিয়ে
আকাশ কাঁপিয়ে,
বর্ষা জলে ভরলো নদী
দু'কূল ছাপিয়ে।

ট‌ইটম্বুরে নদী-খালে
কত মাছের খেলা!
দলে দলে ভেসে চলে
যত হাঁসের মেলা।

পূর্ণ গাঙের ঘোলা জলে
গ্রাম্য শিশুর দল,
কতনা খেলায় মেতে ওঠে
ফুর্তির কোলাহল।

ভরা জলে নাও ভাসিয়ে
চলে আলাপন,
সঙ্গী থাকে গরম গরম
সিংগারা লবণ।


বুবুন ও ব্যাঙ
অঞ্জলি দে নন্দী

মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে।
মাছগুলো নাচানাচি করছে।
গান ধরেছে ব্যাঙ।
গ্যাঙর গ্যাঙর গ্যাঙ।
মান পাতা দিয়ে মাথায় বুবুন চলে ঐ।
রাস্তায় যত বালিকা করছে হৈ হৈ হৈ।
হাঁস আর হাঁসির দল
জলে বড় চঞ্চল।
পথের এদিক থেকে ওদিকে ছুটছে ব্যাঙ কত।
বুবুন ওদের পিছে পিছে দৌড়োচ্ছে সাবধানে,
কাদায় পিচ্ছিল যে পথ ও।
শিহরণ জেগেছে জমির গাছের ধানে।
নারকোল পাতায় বসে ভেজে পাখি যত।
নড়াচড়াহীন পাথরের মূর্তির মত।



বর্ষা ছবি 

অদ্রিজা বোস




















অনুস্মিতা বিশ্বাস



















সুজল সূত্রধর



















সৌরিক রায়







Tuesday, June 7, 2022


 

সম্পাদকের কথা 

প্রবল দাবদাহ শেষে বাতাসে এখন বৃষ্টির গন্ধ। অবশ্য রাজ্যের সর্বত্রই যে এরকম তা বলা যাচ্ছে না। এখনও দগ্ধ্ হচ্ছে  অনেক অঞ্চল। তবে উত্তর বরাবরের মতো স্নিগ্ধ ও সবুজ। তবে আপাত স্নিগ্ধতার আড়ালে আবার গাঢ় হচ্ছে সমস্যার মেঘ। উঠছে নানা আওয়াজ যার সঙ্গে হয়ত অনেকে সহমত, অনেকে নন। যেটাই হোক না কেন, আমরা কখনই চাই না সুস্থিত বাতাবরণ নষ্ট হোক। এই গ্রীষ্মে তাই কামনা, বিচ্ছিন্নতার-হিংসার-অশান্তির আগুন নিভে যাক, ভালবাসার বৃষ্টি ঝরে পড়ুক।    



মুজনাই অনলাইন জ্যৈষ্ঠ  সংখ্যা ১৪২৮

মুজনাই সাহিত্য সংস্থা 

রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com (মাসিক অনলাইন)

- mujnaiweekly@gmail.com (সাপ্তাহিক)

প্রকাশক- রীনা সাহা 

সম্পাদনা, প্রচ্ছদ, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায়  

মুজনাই অনলাইন জ্যৈষ্ঠ    সংখ্যা ১৪২৮


সূচি 

আবদুস সালাম, চিত্রা পাল,  মাথুর দাস, অলকানন্দা দে, দেবাশিস ভট্টাচার্য,  শ্রাবণী সেনগুপ্ত, বটু কৃষ্ণ হালদার, কবিতা বণিক, রীনা মজুমদার, সারণ ভাদুড়ী, 

মনোমিতা চক্রবর্তী, প্রনব রুদ্র কুণ্ডু, পক্ষিরাজ,   আকাশলীনা ঢোল, সৈকত দাম, কাকলি ব্যানার্জি মোদক, মজনু মিয়া  


জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯



বিষয়: মুজনাই 


দুটি ছড়া 

দেবাশিস ভট্টাচার্য 



অবাক মুজনাই 


নদীই মাঝি নদীই বৈঠা 
নৌকা নদীর বসে 
মুজনাই হয় উথাল পাথাল 
ভাটিয়ালীর রসে 

ভাওয়াইয়া গায় সুনীল মাঝি 
ওই সে নদীর পাড়ে 
সুজন বন্ধু যায় রে চইলা 
মন তো মানে নারে...

বেড়ার ওপার ভাটির দেশে 
স্বজন থাকেন যাঁরা 
তাঁদের কাছে খবর পাঠায় 
মুজনাই জল ধারা 

মুজনাই এক অবাক নদী 
উজান ভাটির দেশে 
বৈঠা চালায় ঢেউয়ের তালে
নিত্য মাঝির বেশে 




মুজনাই গান 


মুজনাই গান গায় আয় সহচরী 
ছুটে আসে নদীয়ালী যত জলপরী 

ভাটিয়ালি, বাইচ গান উজানের নায় 
 প্রাণের গীতিকা হয়ে সূদুরে মিলায় 

মুজনাই মিসে থাকে জীবনের ছন্দে 
উজান ভাটির স্রোতে ভাল আর মন্দে 

মুজনাই মন কাড়ে মনের অজান্তে 
সীমানা ছাড়িয়ে সেই নদীদেশ প্রান্তের

গানভাসি মুজনাই সুদূরের পাথারে 
চলে যায় গান হয়ে এক ডুব সাঁতারে



বিষয়: নিবন্ধ 

“সত্যজিতের ছবি”
 অলকানন্দা দে


পথের পাঁচালীর সাথে বিদগ্ধ সত্যজিতের সম্পর্ক আবেগে টগবগ করে! লেবু পাতার গন্ধের মত কি যেন এক অলৌকিক মায়া-জড়িত পরস্পর! বুকের পাশে জায়গা দিয়েছিলেন এই উপন্যাসের ব্যাকুলতাকে! ছায়াছবির পর্দায় প্রতিটি চরিত্রকে এঁকেছিলেন হুবহু। পড়তে গেলে চরিত্রগুলির উপর এই চেহারাগুলিই যেন জলছবির মতো ভেসে ওঠে। দু-চোখ চেটেপুটে নেয় যাবতীয় সুষমা, বারবার! পথের পাঁচালীকে চিনতে শিখেছি অনেকাংশে তাঁর ছবির হাত ধরে। আষাঢ় ভাদ্র বসন্তবাহারে এই গল্পের হৃদয়কাঁপা পটভূমিতে ঘোরাফেরা ক’রে ভালোবাসি তাদেরই কথা বলতে তাই! ইন্দির পিসি হরিহর সর্বজয়া দুর্গা অপুর জীবনের স্তরে স্তরে রূপান্তর মনের খুব চেনা! চরিত্রগুলির হাসিমুখে সয়ে যাওয়া দুঃখ জোয়ার এবং সে সত্ত্বেও রাঙা আশার মুখ চেয়ে জীবনকে পূর্ণিমা অভিমুখী করার একাগ্রতাকে এক শিক্ষা বলেই মনে করি। তাই ব্যথার রোয়াকে বসে সুখের তপস্যারত সর্বজয়া আমাকে কাঁদায়, ভাবায় শেখায় কাঁকর পথে নিরালা পায়চারি কিভাবে করা যায়! প্রচণ্ড সন্তাপেও একফালি নীলকে সে খোদাই করে নিয়েছিল মনে চিরতরে! ভাগ্য একদিন উদার প্রসাদ বিলোবেই জীবন বাঁকে এই ছিল প্রত্যয়! আগামীর সুখ-মর্মর সে যেন তখনও শুনতে পেত যখন রান্নাশালে তার তপ্ত কড়াই কলমিশাকের মুখ ছাড়া দেখত না আর কিছুই! দুঃখ তাপ কেটে যাবে অনুকূল সুযোগের বাতাসে, মৃদুস্বরে বলে যায় তার মন! এ কথাই যেন সে কানে কানে শোনে আর গুনে যায় দিন! সেই সাধের উপত্যকায় পৌঁছতে আজ সে চড়াইয়ের ভার নিতে প্রস্তুত। সর্বজয়া নামটি সব দুঃখকে মাৎ দিয়ে সার্থক হয়ে উঠতে চেয়েছে চিরকাল। ভাগ্যের তুলোধনা কম তো সইতে হয় নি তাকে! প্রাণোচ্ছল মেয়ের নিথর দেহের ভার সে তুলেছে একলা, কালবৈশাখী রাত্তিরের ঝড়ের খেলায়। সয়েছে বাজের ডাক ঘন রাত্রির প্রাঙ্গণে। ভেঙে পড়া সংসার অস্বাস্থ্যের কোলাহল কন্যাহীন কোল অনাহারের অবসাদ ছেঁড়া বস্ত্রের মলিনতা এই এত শত প্রতিকূলতা টলাতে পারে নি তাকে আশার অভ্যাস থেকে। এরকমই হতে হয় হয়তো জীবনযাত্রা-নীতি। হাহাকারে নয়, সম্ভাবনাতেই আছে যত জীবনধর্ম শেখায় সর্বজয়া! ছবিতে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বজয়া করে তুলেছেন সত্যজিৎ চিরকালের মতো! তাঁর প্রখর অনুভবের কথা পৌঁছে দিয়েছেন কি নিপুণভাবে আরেকটি মানুষের স্নায়ুতে যেখানে সে প্রস্তুত সম্পূর্ণ ফুটে ওঠার জন্যে! একেই হয়তো বলে প্রতিভার মুষলধার!

পথের-পাঁচালীর শত ব্যথার দৃশ্যের মধ্যেও আছে জীবন-পাগল মুহূর্তরা! তাদেরকে একত্র করলে যে তোড়া হয় তাতে সূর্য জাগে মুখর সোনায়! আছে প্রকৃতিকে চিনে নেওয়ার গায়ত্রী-মন্ত্র! এবং এত সব অনুভূতিকে চোখের সামনে হাজির করেছেন যে মানুষটি তিনি আমাদের উদ্বেল আবেগের জায়গা! তিনি বাঙালির, তিনি বিশ্বের! পার্থিব মানবের মন জয় করার যাদুকরের নাম সত্যজিৎ রায়! ‘সাত রাজার ধন এক মানিক’ আমাদের! আমরা প্রকৃতই ধনী! চলচ্চিত্র জগতে তাবড়দের প্রসঙ্গ উঠলে আমাদের পায়াভারি অবশ্যই! নববিশ্বের সাধ্য হবে না এই বনেদী মানুষটির অমরকান্ডকে এড়িয়ে যাওয়ার। তাঁর শিল্পের তীক্ষ্ন জেল্লায় জড়িয়ে ত্রিকাল সর্বদা! তিনি অমৃতপুত্র সংস্কৃতির প্রশস্ত সংসারে! আমাদের অভিমানের আপনারজন!


মেছেনী নাচ

শ্রাবণী সেনগুপ্ত


ভারতীয় নৃত্যের ক্রমবিকাশের মধ্যে দিয়েই  লোকনৃত্যর উদ্ভব,ও নানা শাখায় বিস্তৃতি। অন্যান্য প্রচলিত নৃত্যের সঙ্গে লোকনৃত্য ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ভারতীয় নৃত্যের রূপরেখায় জাতি ও প্রজাতিতে মূলত তিনটি সমাজব্যবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে। যেমন-১)আদিবাসী নৃত্যে-আদিবাসী ও উপজাতীয় সমাজ, ২)লোকনৃত্য-গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক গণসমাজ, ৩)উচ্চাঙ্গ নৃত্যে-নগরকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজের চিন্তা-চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে। এই প্রতিফলনের ফলে এই নৃত্যধারাগুলির শ্রেণীবিন্যাস ,সংজ্ঞা,বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণগুলি নিয়ে নৃত্য বিচারের জন্য কতগুলি সূত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই অনুসন্ধানে জানা গেছে,ভারতীয় নৃত্যের জগতে লোকনৃত্যের স্থান কত গুরুত্বপূর্ন এবং এর পরিধি কত ব্যাপক। মানুষ যখন ক্রমবিকাশের পথে শিকারজীবী থেকে পশুপালক এবং সেখান থেকে কৃষিজীবীতে রূপান্তরিত হল,সেই সমাজের মধ্যেই জন্ম হল লোকনৃত্যের। অরণ্য ছেড়ে মানুষ যখন চাষ আবাদ করে স্থায়ী আস্তানা করে বসবাস শুরু করল,তখন থেকেই সে 'লোক' পর্যায়ভুক্ত হল। তাই বলা যায়,গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজ দ্বারা চর্চিত নৃত্যই হল ',লোকনৃত্য'। লোকনৃত্য মাঝখানে থেকে একদিকে আদিবাসী নৃত্য ও অন্যদিকে নব্য-উচ্চাঙ্গ নৃত্যের দিকে তার দুটি হাত প্রসারিত করে রেখেছে। তাই লোকনৃত্যকে অতীত ও বর্তমানের যোগসূত্র বলা যায়।

এই  মেছেনী নৃত্যটি  উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সম্প্রদায়ের মহিলাদের মধ্যে প্রচলিত। এটি একটি বিশেষ লোকাচারকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হলেও ধর্মীয় বিশ্বাসও এর সঙ্গে জড়িত। প্রাকৃতিক বিপর্যয় মাঝেমাঝেই মাথাচাড়া দেয় উত্তরবঙ্গের জনজীবনে। প্রবল বর্ষণে পাহাড়ি নদীগুলো জনপদ বিধ্বস্ত করে দেয় প্রায়শই।আবার কখনো কখনো দেখা দেয় খরা। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার কাছে অসহায় সাধারণ কৃষিজীবি মানুষ তখন তুষ্ট করতে চায় প্রকৃতিকে। এই লোকবিশ্বাস চলে আসছে আদিমকাল থেকে,যা আজও এই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরাজমান।

                  উত্তরবঙ্গের প্রধান নদী তিস্তা একদিকে যেমন মাতৃরূপে, অন্যদিকে ত্রাসরূপে বিরাজমান।তাকে সন্তুষ্ট করতে এখানে প্রচলিত তিস্তা বুড়ির পূজা। লোকবিশ্বাসে জাগ্রত তিস্তা বুড়িকে তুষ্ট করতে পারলেই তারা পরিত্রাণ পাবে খরা,বন্যার হাত থেকে,পরিবেশ হবে অনুকূল। তাই বছরের শুরুতে সারা বছরের শুভকামনায় গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত তিস্তা বুড়ির পুজো। এই পুজোয় অনুষ্ঠিত নৃত্যগীত মেছেনী খেল বা মেছেনী নাচ। মেয়েরা সেজেগুজে দলবদ্ধ হয়ে বছরের প্রথম দিন থেকে গ্রামে গ্রামে গিয়ে সব বাড়িতে বাড়িতে নাচ গান করে সবাইকে আহ্বান জানায় তিস্তাবুড়ির পুজো দেবার জন্য। এইসময় তাদের সঙ্গে থাকে একটি ছাতা যেটি সাজান থাকে শোলার অলঙ্কারে। হয়তো বর্ষার আগমনের প্রতীক হিসেবে এর ব্যবহার।এই উৎসবটির সঙ্গে গ্রামের প্রতিটি পরিবারের মহিলারা কোনো না কোনোভাবে জড়িত হয়ে পড়েন। একমাস পরে মূল অনুষ্ঠানের দিন কলার  খোলা দিয়ে ভেলা তৈরি করে তাকে নানারকম ফুল দিয়ে সাজানো হয় ও লৌকিক পদ্ধতিতে নানা আকারে ও রূপে দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হয়। ধূপ, দীপ, কলা,ঘি বা তেলে ভেজানো কিছু তুলো বা কাপড়ের সলতে(ভোগা),আতপ চাল ইত্যাদি।তারপর ভেলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয় জলে।মেয়েরা সাবাইমিলে গান ধরেন-

               আজি কেনে ভুরার বাইজ মোর উঠেরে।
                না জানি তিস্তা বুড়ি কোন ঘাটে সাজেরে।
                আজি কেনে ধূপের বাইজ মোর উঠেরে।
                 না জানি তিস্তা বুড়ি কোন ঘাটে সাজেরে।
                আজি কেনে কলার বাইজ মোর উঠেরে।
                 না জানি তিস্তা বুড়ি কোন ঘাটে সাজেরে।

প্রাচীনকাল থেকেই লোকসমাজে প্রাকৃতিক দেবতারা পূজা পেয়ে আসছেন। আধুনিক সময়ে অনেকক্ষেত্রে লৌকিক আঙ্গিকের বিলুপ্তি ঘটলেও কৃষি দেবতা,বরুণ দেবতা এখনো গ্রামীণ কৃষিজীবি মানুষের লোকবিশ্বাসের আশ্রয়ে বেঁচে আছেন।তিস্তাবুড়ির পূজায় সবাই সমানভাবে অংশ নিয়ে থাকেন, যদিও মহিলাদেরই এই অনুষ্ঠান।



বিষয়: কবি প্রণাম 


রবি করোজ্জ্বল দিনে মংপুতে
                কবিতা বণিক

আজ সকাল থেকেই মনে হচ্ছে রবির হাসির বাঁধ ভেঙেছে উছলে পড়ে আলো। নীল আকাশ আর আলোছায়া মাখা সবুজ পাহাড়ি অরণ্য সত্যিই লাগছে বড় ভালো। অরণ্যঘেরা  পাহাড়ি রাস্তায়  গাড়ি চলেছে এঁকেবেঁকে  মংপুর পথে।  এই বাঁকগুলো নেওয়ার সময় গাড়ির যাত্রীরা সবাই একটু ঝুঁকে পড়ে।  এমনই বাঁক  নেওয়ার সময় আমি হঠাৎই বলে উঠলাম I beg your pardon madam!  সহযাত্রীরা বললে  'একি কথা?' একটু হেসে বলি -আমি যে রবি ঠাকুরে তন্ময়  হয়ে গিয়েছিলাম! মংপুতে এইরকম বাঁক নেওয়ার সময় রসিক রবি ঠাকুর বলেছিলেন I beg your pardon madam!  এই সেই রাস্তা যে পথে রবি ঠাকুর , মৈত্রেয়ীদেবী গেছেন এসেছেন বারবার। রবিঠাকুর কখনো ডুলিতে কখনো পালকিতে  পৌঁছতেন  মৈত্রেয়ী দেবীর মংপুর বাংলোতে। মংপুতে থাকাকালীন রবি ঠাকুরের কিছু ঘটনা একে একে চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। এ পথেই পাহাড়ের পাদদেশে রিয়াং স্টেশনে বিশ্বকবি টয়ট্রেনের উঠতেন  বা নামবার সময়  রিয়াং রেলস্টেশন থেকে গাড়িতে উঠতেন।  এখন যদিও  এই রাস্তাটা খুব সুন্দর হয়েছে গাড়ি নিয়ে সোজা মংপু যাওয়া  যায়। এছাড়া পাহাড় জঙ্গল সব একই আছে। 
রিয়াং স্টেশনে রবি ঠাকুর এসে বসতেন গাড়ির অপেক্ষায়। তাঁকে দেখতে ভিড় করতো স্টেশনের কর্মচারীদের পরিবারের সদস্যরা ও আশেপাশের দু, এক ঘর বাঙালিরা । মৈত্রেয়ী দেবী  লিখছেন -এক প্রান্তে এই নগন্য জনবিরল গ্রামের অতিক্ষুদ্র স্টেশনের প্লাটফর্মের উপর জরাজীর্ণ চৌকিতে  বিশ্ব আদৃত মনীষী বসে আছেন । এ একটা দেখবার মতো ঘটনা।
সেই রিয়াং স্টেশন, গেলিখোলা  স্টেশন  সব আজ নিশ্চিহ্ন। 1950 সালের 15 আগস্ট তিস্তার বিধ্বংসী বন্যায় রেল স্টেশন, রাস্তা,  লাইন সব ধ্বংস হয়ে যায়।  ফলে এই রুটে টয়ট্রেনে যাওয়ার সুযোগ চিরদিনের মতো পুরোপুরি হারিয়ে যায়।
মোটর পথে চলার সময় মনে শিহরণ জাগে, মনে হয় ওই তো ! পালকিতে চলেছেন আমাদের বিশ্বকবি । সেই সাক্ষ্য দিচ্ছে এই পাহাড়ি অরণ্য ঘেরা পথ। সবই আগের মতন আছে।  মংপুর কাছাকাছি  পৌঁছে মনে হল মাথায় কালো টুপি ও গায়ে চাদর দিয়ে মৈত্রী দেবীর সঙ্গে হেঁটে চলেছেন ঐতো বিশ্ব বরেণ্য কবি! কিন্তু কি আশ্চর্য দুজনের কেউই আজ ইহজগতে নেই । দুজনেই নামিদামি ব্যক্তিত্ব। মৈত্রেয়ী দেবী কে রবীন্দ্রনাথ খুব স্নেহ করতেন । কত না নামে তাকে ডাকতেন। কমলিনী ,সীমন্তিনী,  মাংপবী, মিত্রা, সুমিত্রা , আরো কত কি। বাংলোয় পৌঁছে দেখলাম প্রথমেই গেটের পাশে রবীন্দ্রনাথের একটা আবক্ষ মূর্তি আছে। বাংলোর চারপাশে যেদিকে তাকাই সবই যেনো রবি ময় হয়ে আছে।  এখানেই মৈত্রেয়ী দেবীর বাড়িতে বসে মংপুর সৌন্দর্যে মুগ্ধ কবি বলেছিলেন, সামনের ঢালু পাহাড় টার দিকে তাকিয়ে 'আকাশের কোল থেকে সবুজ বন্যা নেমে এসেছে' । এমন পাহাড় দেখলেই মনে পড়ে যায় সত্যিই সবুজের বন্যা নেমে এসেছে । সবুজের বন্যা শব্দ দুটি খুব আকৃষ্ট করে ।  সবুজের বন্যা সর্বত্রই চাই।




সামনের এক ফালি মাঠটিও  কবির খুব পছন্দের ।আর খুব পছন্দের ছিল কাঁচের ঘরটি। তিনি রোজ সকালে রৌদ্র স্নানের আনন্দটা এই ঘরে বসেই খুব আনন্দের সাথে উপভোগ করতেন। এই বাড়ির সামনে একটা প্রকাণ্ড সেগো পাম গাছ ঝুড়ি নামিয়ে দিয়েছে। তাকে দেখে কবি লিখলেন- 
 ওই গাছ চিরদিন যেন শিশু মস্ত।
সূর্য উদয় দেখে দেখে তার অস্ত।
মৈত্রেয়ী দেবীর বাগানের হলুদ ফুলের সারি দেখে খুব আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন । মৈত্রেয়ী  দেবী বলেছিলেন মার্চ, এপ্রিলে ফুল ফোটে এখন তেমন কিছু নেই।  কবি বলেছিলেন 'এ কিন্তু ফুলের রাজ্য ,ফুলের দেশ ।'এখন তো মংপুতে কবির কথা রাখতেই বোধকরি নানারকম অর্কিড ফুলের বাগান বা খামারবাড়ি দর্শনীয় স্থান হয়েছে । এছাড়াও চারিদিকে ফুলের বাহার তো আছেই। আগে মংপু মানেই ছিল সিঙ্কোনা চাষের ক্ষেত্র। এখন মংপু মানে রবীন্দ্র স্মৃতি বিজড়িত মৈত্রেয়ী দেবীর এই  বাড়ি। বাড়ির ভিতরে সেই টেবিল খাট কবির বসার চেয়ার ওষুধপত্র রং-এর প্যালেট আরও কিছু জিনিস। তিনি ছবি আঁকতেন এই টেবিলে বসেই। এখানে বসে কত কবিতা লিখেছেন, কত গল্প শুনিয়েছেন সবাইকে। এখানে কবি লিখেছিলেন জন্মদিন, নবজাতক,  আকাশ প্রদীপ, ক্যামেলিয়া এমনি আরও কিছু কিছু কবিতা। কবির বসার চেয়ার টা কে দেখলে আজও শূন্য মনে হয়না।  মনে হয় ধ্যানগম্ভীর হয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে স্থির বসে আছেন কবি। তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা এইভাবে স্থির বসে থাকতেন। নড়বার কোন চিহ্নই থাকত না। একরাশ বিস্ময় নিয়ে স্পর্শ করি বিশ্ববরেণ্য মহান মনীষীর ব্যবহৃত জিনিস। এই খানেই তিনি ছিলেন। মনে হয় আজও আছেন। এখনো আছেন। 



                  

এইবাড়ির স্নান ঘরটা কবির খুব পছন্দ হয়েছিল।  এই বাড়ির কেয়ারটেকার শিশির রাউত এর মুখে রবীন্দ্র সংগীত শুনে মনে হয় তিনি সত্যিই গুরুদেবের আশীর্বাদ ধন্য এক সন্তান। বাংলাভাষী না হলেও বাংলায় রবীন্দ্র সংগীত শুনে মুগ্ধ হয়েছি। কত যত্ন করে আগলে রাখেন কবির ব্যাবহৃত স্পর্শ ধন্য সব জিনিস।  এ ভালোবাসা তো ঐশ্বরিক ভালোবাসা, যা শুধু বাড়তে থাকে। এই বাড়িটায় এলে তারি স্পর্শ পাই। শুধু বাড়িতে নয় মংপুর বাতাসে, ঘাসে, গাছে  সবখানে ছড়িয়ে রয়েছে রবি ঠাকুরের সুগন্ধিত স্পর্শ। আমরা মৈত্রেয়ী দেবীর কাছে কৃতজ্ঞ। মৈত্রেয়ী দেবীর আমন্ত্রণ রবি ঠাকুর ফেলতে পারেননি দেখে চারবার এসেছিলেন  এই বাংলোয়।তাই আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। ধন্য আমরা এমন বিশ্ববরেণ্য মহান মানুষকে কাছে পেয়ে। বাংলোর পাশে ওই যে সপ্তপর্ণী গাছ ! সেও যেন রবি ঠাকুরের কিছু কথা বলতে চায়। এখানে অবস্থানকালে রবি ঠাকুরের এক জন্মদিনে অতি সাধারন তিব্বতী, পাহাড়ী মানুষদের নিয়ে যে অনুষ্ঠান তা মনে রাখার মতো বেশ। বিশ্ববরেণ্য নামিদামি কবির জন্মদিন পালন  হচ্ছে অতি সাধারণ পাহাড়ি গ্রামের মানুষদের নিয়ে। তাদের মধ্যে নিজেদের এমন বিশ্ববরেণ্য কবির পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব মৈত্রেয়ী দেবী ও তার স্বামী ডঃ মনোমোহন সেনের। কবি সেদিন দশটার সময় স্নান করে কালো জামা কালো রঙের জুতো পড়ে বাইরে এসে বসলেন কাঠের বুদ্ধ মূর্তির সামনে বসে একজন বৌদ্ধ স্তোত্র পাঠ করল কবি ঈশোপনিষদ থেকে অনেকটা পড়লেন।  বিকেলবেলা পাহাড়ি দরিদ্র প্রতিবেশীরা সানাই বাজাতে লাগলো। গেরুয়া রঙের জামার উপর মাল্যো- চন্দন ভূষিত আশ্চর্য স্বর্গীয়  সেই রূপ সৌন্দর্য সবাই স্তব্ধ হয়ে দেখতে লাগলো।  দলে দলে পাহাড়িরা ফুল দিয়ে প্রণাম করছিল। ছোট বড় সবাই ফুল এনে পায়ে দিয়েছিল তাঁর। তিব্বতীরা পরালো 'খরদা' গাছের সুতোয় বোনা স্কার্ফ। যা ওরা লামাদের পরায়। ফুলে  ফুলে সেদিন আবৃত হয়ে গিয়েছিলেন কবি। শঙ্খ ধ্বনির মধ্যে ' শিলাতলে 'এসে বসলেন। তিব্বতীরা শুরু করলে তাদের জংলি তান্ডব নাচ।  তারপর হয়েছিল খাওয়া-দাওয়া।  
সেদিন দুপুরবেলায় দুটো কবিতা লিখেছিলেন কবি। একটা কবিতার কিছু অংশ-

"কাল প্রাতে মোর জন্মদিনে
এ শৈল আতিথ্যবাসে
বুদ্ধের নেপালি ভক্ত এসেছিল মোর বার্তা শুনে।
ভূতলে আসন পাতি
বুদ্ধের বন্দনা মন্ত্র শুনাইলো আমার কল্যাণে
গ্রহণ করিনু সেই বাণী।..."
মংপুতে অনুষ্ঠিত জন্মদিনের স্মৃতি রয়ে গেল কবিতার মধ্যে। রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত মংপু চিরস্থায়ী হোক।



এবং নজরুল 
সারণ ভাদুড়ী

"যেদিন আমি হারিয়ে যাব বুঝবে সেদিন বুঝবে, অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে,
 বুঝবে সেদিন বুঝবে।"



বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব বাংলার স্যাঁতস্যাঁতে মাটি , জলো বাতাস, ছায়াঘন নিকুঞ্জে দোয়েল শ্যামার কলতানের মধ্যে দৃপ্ত সিংহের ন্যায় গর্জন ও মদগর্বিত গজেন্দ্রর মতো বিচরণ ,অপ্রত্যাশিত ও বিস্ময়কর। রবীন্দ্র যুগের শক্তিমান কবির সংখ্যা কম নয় ,প্রকৃত প্রতিভার কবিও রয়েছেন অনেকে, কিন্তু নজরুল তাদের জাতেরই কবি নন। শীতলতার চেয়ে গ্রীষ্মের প্রখরতার দিকেই তাঁর ঝোঁক বেশি।
 নজরুল জীবন চিন্তার মূলেই আছে মানবপ্রীতি , মানুষের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা। সকল মানবপ্রীতি সমস্ত বিশ্বকে কেন্দ্র করে । তিনি যেমন অজস্র প্রথম শ্রেণীর কবিতা লিখেছেন, তেমনি রচনাগত ত্রুটির পরিচয়ও রেখেছেন অনেক কবিতায়। আসলে এক অসংযত আবেগ জীবনের প্রথম থেকেই তাঁর শিল্পকে পরিচালিত করেছে। এই আবেগের দ্বারা চালিত হয়ে সাহিত্য রচনার ফলে তিনি অনেক লিখেছেন, কিন্তু কবিতা গুলি সর্বক্ষেত্রেই সংযত মাত্রার রচনা হয়নি।
 আবেগের অতিরেক নজরুলের কবিতায় প্রায়শই উচ্চাঙ্গের শিল্পসৃষ্টির স্বপক্ষে বাধাস্বরূপ হয়েছে। এ নিয়ে তিনি নিজেই বলেছেন -
"বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে,
দেখিয়া শুনিয়া খেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।"

তাই তাঁর সম্পর্কে বলা যেতে পারে তার প্রতিভা ধনী, কিন্তু গৃহিণী নয়।

 প্রত্যেক কবি তাঁর যুগের প্রভাবাধীন আবার কিছু কবি তাঁর যুগকেও অনেক সময় অতিক্রম করে যান। কোনো কবির মধ্যে যুগের প্রভাব স্পষ্ট, আবার কারুর মধ্যে সংমিশ্রিত । দীর্ঘকাল পর্যন্ত আমাদের এই কাব্যাংশে প্রচলিত আছে যে কাব্য সংসারে কবিরাই প্রজাপতি ,অর্থাৎ জগত স্রষ্টা।

তবে স্রষ্টা নজরুল কাব্যকে শুধু সুন্দরের দ্বারা প্রকাশ করতে চাননি, বরং সুন্দর এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা বেদনার করুন সুর কেও তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাঁর কথায় -
" তবু বলছি ,আমি সুন্দরের হাতে বীণা পায়ে পদ্মফুলই দেখিনি তার চোখে চোখ ভরা জলও দেখেছি।।"

 বিদ্রোহী বলে নজরুলকে জানলেও তাঁর কিছু কিছু কবিতাতে প্রেমের অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে ।তাঁর কবিতায় আমরা সুন্দর ও ভৈরবের সহাবস্থান লক্ষ্য করি ।রোমান্টিসিজমের মধ্যেও আছে এক জাতীয় বিদ্রোহ, এই বিদ্রোহ চারপাশে সমস্ত গতানুগতিক তার বিরুদ্ধচারণ করে । প্রকৃতপক্ষে "বিদ্রোহী" কবিতাটির মধ্যেই নজরুলের এই মানসিকতার সমস্ত স্বরূপ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে-
" মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য।"
এই পংক্তির মধ্যে নজরুলের রোমান্টিক স্বরূপ প্রকৃতপক্ষে বিধ্বংসী রূপককেই আত্মপ্রকাশ করেছে।
নজরুল মনের ধর্মের দিক থেকে সম্পূর্ণ বিদ্রোহী হওয়া সত্ত্বেও ,শিল্পকলার অহেতুক আনন্দ প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি অনেক পরিমাণে ছিলেন রোমান্টিক ।অসত্য ও অসাম্যের বিরুদ্ধে তিনি সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু যেখানে তিনি সৌন্দর্য মুগ্ধ কবি ,জীবন অথবা প্রেমের সৌন্দর্যে অভিভূত সেখানে তিনি রবীন্দ্রনাথের দ্বারা প্রভাবিত ।তিনি নিজেই বলেছেন -
"নতুন করে গড়তে চাই বলেই তো ভাঙ্গি-শুধু ভাঙ্গার জন্যই ভাঙার গান আমার নয়।"
কিন্তু পরোক্ষভাবে তাঁর সব বিদ্রোহী ভঙ্গির মধ্যে তারুন্যের বর্ণনা রয়েছে ,তাই তার সমস্ত কবিতায় তরুণদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছেন-
"ওরে ও ভোরের পাখি!
 আমি চলিলাম তোদের কন্ঠে আমার কন্ঠ রাখি।।"

 সত্যিই জন্মের ১২৩ বছর পরও এপার বাংলা, ওপার বাংলা দুই বাঙালির কাছেই নজরুল সমানভাবে সমাদৃত ।। তাই তো - 
"ভুল হয়ে গেছে বিলকুল,
 আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে 
ভাগ হয়নিকো নজরুল।।"



বিষয়: ফিচার 


থমাস কাপ জিতে ভারতীয় ব্যাডমিন্টন দল বিশ্ব চালকের আসনে
বটু কৃষ্ণ হালদার

চারিদিকে রক্ত,চিৎকার আর হাহাকার,তার মাঝে ও সমগ্র বিশ্ব তথা ভারতবর্ষের মানুষ থমাস কাপ  জ্বরে ভুগছে।থমাস কাপ পুরুষ ব্যাডমিন্টন দুনিয়ায় বিশ্বকাপের সমতুল্য আর মোস্ট প্রেস্টিজিয়াস ট্রফি। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইংল্যান্ডের কিংবদন্তী ব্যডমিন্টন প্লেয়ার স্যার জর্জ এলান থমাস ফুটবল বিশ্বকাপ আর টেনিসের ডেভিস কাপের অনুপ্রেরণায় শুরু করেন ৪০ হাজার ডলারের প্রাইজ মূল্যের ইন্টারন্যাশনাল ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপ চ্যালেঞ্জ।যা পরবর্তীতে পরিচিত হয় থমাস কাপ নামে। 
কিন্তু মজার কথা হলো ইউরোপে শুরু হলেও এই খেলাটা যেনো ক্রমশ এশিয়ান দেশ গুলো যেমন চীন, জাপান, কোরিয়া,  মালেশিয়া, ইন্দোনেশীয়া প্রভৃতি দেশগুলোর একাধিপত্যে পরিনত হয়। ভারত পাকিস্তানের ক্রিকেট প্রতিযোগিতার মতনই জনপ্রিয় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ইন্দোনেশী আর মালেশিয়ার (অতীতের মলয়) ব্যডমিন্টন ম্যাচগুলো। সাদা চামড়ার দেশগুলোর মধ্যে থেকে একমাত্র ডেনমার্ক ছাড়া বাকি দেশ গুলো ক্রমশ হারিয়ে গেছে। আমেরিকাতেও ব্যাডমিন্টন ১৯৫০ এর দশকের পর থেকে জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। আর ১৯৮২ তে চীনের ব্যডমিন্টন ফেডারেশনে যোগদানের পর এটা পরিনত হয় চীনের একাধিপত্যে। তারপর থেকে প্রতি দুবছর ছাড়া হওয়া টুর্নামেন্টের ১০ টাই জিতে নিয়েছে চীন। আর ইন্দোনেশিয়া - চ্যাম্পিয়ন ১৪ বার। রানার আপ ৭ বার।

অতি মারি করোনা মোকাবিলা থেকে শুরু করে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে এই মুহূর্তে ভারতবর্ষের ভাবমূর্তি বেশ উজ্জ্বল। যেখানে শ্রীলংকার মত দেশ জরুরি অবস্থার মধ্যে দিয়ে হাঁটছে সেই মুহূর্তে বিশ্বের বহু দেশ ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। সমগ্র বিশ্ব জানে ভারতবর্ষে এই মুহূর্তে, বহু দেশের জনগণের মুখে খাবার তুলে দিতে সক্ষম হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে নিভৃতে মাইলস্টোন ছুঁলেন ভারতীয় ব্যাডমিন্টন তারকারা। তিয়াত্তর বছরে এইপ্রথম থমাস কাপ  ব্যাডমিন্টন  আসরে স্বর্ণ পদক  নিশ্চিত করলেন কিদাম্বি শ্রীকান্ত, এইচ এস প্রণয়রা। থমাস কাপ জিতে অবশ্যই ভারতবর্ষ এই মুহূর্তে বিশ্ব চালকের আসনে। ভারতের স্বর্ণ মুকুটে আরও একটা নতুন পালক সংযোজন হলো।যা সমগ্র ভারতবাসীর কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের সাক্ষী হয়ে রইলো সমগ্র বিশ্ববাসী।এই দিনটি ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে থাকলো।

ভারতবর্ষ তখন ব্রিটিশদের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে সবেমাত্র স্বাধীনতা লাভ করেছে। ১৯৪৮ সালে ভারতীয় ফুটবল দল লন্ডন অলিম্পিকে খেলার অনুমতি পেয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সেই খেলায় খেলোয়াড়দের খালিপায়ে খেলতে হয়েছিল। সেই খেলায় ভারত বর্ষ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে খেললে ও শেষ পর্যন্ত হেরে যায়। স্টেডিয়ামের সমগ্র দর্শক উঠে দাড়িয়ে হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানিয়ে ছিলেন। এর পর পুনরায় সুযোগ পেয়েছিল ব্রাজিল ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপে। ভারতবর্ষের বিশ্বকাপ খেলায় কোয়ালিফাই করেছিল। কিন্তু ভারত সরকার কি খেলায় অংশগ্রহণ করেনি। সরকারের তরফ থেকে জনগণকে বলা হয়েছিল ফিফা এই বিশ্বকাপে খালি পায়ের খেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আজ থেকে বলা হয়েছিল ভারতবর্ষ গরিব দেশ তাই তাতে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। ভারতবর্ষের মত এত দক্ষ টিমকে খেলাতে অংশগ্রহণ করার জন্য ফিফা থাকা-খাওয়া যাতায়াত খরচ বহন করা সত্ত্বেও ভারত সরকার তাদের পাঠায়নি এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে। একশ তিরিশ কোটির দেশে বিশ্বকাপে দরজা ভারতবর্ষের জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। এমন এক স্বর্গরথের সুযোগ পেয়েও,ভারত বর্ষ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে পারল না, অথচ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রোজকার পোশাক প্যারিস থেকে ড্রাই ক্লিন হয়ে আসতো। শুধু তাই নয় প্রধানমন্ত্রী প্রেমিকাকে লেখা চিঠি এয়ার ইন্ডিয়া বিমানে করা যেত।তবে ১৯৪৯ সালে শুরু হওয়া একটি বিশ্ব ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় ৭৩ বছরে প্রথমবারে সেমিফাইনালে উঠে রুপালি রঙের ট্রফি জিতে নিল। আর তাতে খোদাই করা ২০২২ সালে থমাস কাপ জয়ী দল ভারতের নাম। গলায় পদক, উত্তরীয়,হাতে স্মারক, আর ঠোঁটে জাতীয় সঙ্গীত, গায়ে জড়ানো ছিল তেরঙ্গা পতাকা, চোখে ছিল বৃষ্টি ভেজা অশ্রু, মুহূর্তটা ছিল অত্যন্ত আবেগ ও বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসের।ব্রিটিশদের কবল থেকে প্রায় দুইশ বছরের দাসত্ব থেকে মুক্তির স্বাদ যেমন ছিল, এই মুহুর্তটা তার থেকে কিছু কম ছিল না। যেখানে ইন্দোনেশিয়ার মতো ছোট্ট একটা জাতীয়তাবাদী দেশ বরাবর এই খেলায় আধিপত্য বজায় রেখে ১৪ বার এই কাপ জিতেছে সেখানে ভারতবর্ষের মত একটা ১৩০ কোটির দেশ থমাস কাপ জয়  করতে লম্বা পথ অতিক্রম করতে হয়েছে,তাতে কি এ যেন দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো ছাড়া আর কিছুই নয়। ৭৩ বছর পর হলেও ভারতবাসী হিসেবে অত্যন্ত গৌরবের।

আজকে আমার দেশ ব্যাডমিন্টনে যে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন তার জন্য সবচেয়ে বেশী কৃতিত্ব প্রাপক এই একজনই তিনি হলেন পুলেল্লা গোপিচাঁদ। আর অবশ্যই আরেকজন আছেন, তিনি হলেন এনার মা। নব্বইয়ের দশকে ভদ্রমহিলা নিজে ফোন করে করে নিউজ পেপার হাউসে ছেলের খেলার ফলাফল জানাতেন যদি নিউস পেপারের খেলার পাতায় এক কলম লেখা হয়। অল ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরেও খুব একটা ব্যতিক্রম হয় নি। খেলোয়াড় পরবর্তী জীবনে একাডেমি গড়ে তোলাতেও সমান ভাবে ছিলেন ছেলের পাশে। আর হায়দ্রাবাদের সেই একাডেমিই আজ অনেক নিউস আর্টিকেলের মতে বার্সেলোনার ফুটবলার তৈরীর আঁতুড়ঘর "লা মাসিয়ার" সমতুল্য।  

একের পর এক উঠে এসেছেন এখান থেকে সাইনা নেওহাল, সিন্ধু, প্রনয়, শ্রীকান্ত, কাশ্যপেরা। নিঃশব্দে পালটে দিয়েছে ব্যাডমিন্টন আন্তর্জাতিক মানচিত্র। ব্যাডমিন্টনের ৭৩ বছরের মঙ্গলয়েড দাপট অতিক্রম করে আজ ভারতীয় পদধ্বনির মূল কারিগর কিন্তু ওই একজনই। নিরলস সাধক - দ্রোনাচার্য পুল্লেলা গোপীচাঁদ। এই মুহূর্তে দেশ দুর্নীতিতে জেরবার,কোটি কোটি টাকা অপচয়,নেতা মন্ত্রীরা উন্নয়নের কথা শুনিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প অর্থগুলো নিজেদের একাউন্টে টাকার পাহাড় তৈরি করছে। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত অন্যান্য খাতে টাকা যেমন ব্যয় করছে,ঠিক তেমনি ক্রীড়া বিভাগের পরিকাঠামো যাতে উন্নত থেকে উন্নত তর হয় সেদিকে বিশেষ নজর দিলে দেশে এমন অনেক বিশ্ব শ্রেষ্ট পুরস্কার আসবে।আর তাতে দেশের ভাবমূর্তি অনেক বেশি উজ্জ্বল হবে বিশ্বের দরবারে।





বিষয়: রম্য রচনা 

গাছে কাঁঠাল

  চিত্রা পাল

                 

কাঁঠাল বললেই প্রথমে মনে পড়ে গাছে কাঁঠাল কথাটা। আসলে এটা একেবারে চলতি প্রবচন ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল’ এর অংশ। পাকা কাঁঠালের যা চট্‌চটে আঠা, তা যদি গোঁফে লেগে যায়  তাহলে আর দেখতে হবে না, ওই গোঁফটাকেই তাহলে বিসর্জন দিতে হবে, তাই সহজ সাবধানতা পাকা কাঁঠাল খাবার আগেই গোঁফে তেল  দিয়ে রাখা যাতে খেতে গেলে আঠা লাগবে না। কেননা কাঁঠালের আঠার নিন্দেও তো  কিছু কম নয়। ও আঠা যে এমনই লাগলে পরে ছাড়ে না।সেটা আবার সবাই সেই সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে,যেখানেই লেগে থাকার ব্যাপার থাকে। লেগে আছে দেখো, যেন কাঁঠালের আঠা।   

 এতো গেলো আঠার কথা। আরে কাঁঠালটাই বা কম কি। কতো দোষ তার। ছেলেপুলে অল্প বয়সে যদি একটু দুষ্টুমি করে বড়দের মতকিছু করে যা তাদের করার নয়, তাহলেই গার্জেন শ্রেণীর কাছ থেকে শুনতে হয়, সব হয়েছে এঁচোড়ে পাকার দল।। অর্থাত্‌ কচি কাঁঠালেরও ছাড় নেই। অথচ এঁচোড় কম সুস্বাদু নয়। এঁচোড় কে বলা হয় গাছপাঁঠা। তেমন করে রান্না করা হলে পাঁঠার মাংসকেও টেক্কা দেয়।ওদিকে রাগ প্রকাশের  ক্ষেত্রেও কম যায় না। সে রকম সে রকম সময়ে বেশ জোরদার সাহসের সঙ্গে বলতে শোনা যায় আসুক না, একেবারে কিলিয়ে কাঁঠাল পাকিয়ে দেবো। কিল দিয়ে কাঁঠাল পাকানো যায় কিনা জানি না, তবে এক্ষেত্রে ব্যাপারট যে কি হবে তা সহজেই অনুমেয়।

 তবে কাঁঠাল ফল থেকে শুরু করে গাছ অবধি সবটাই আমরা যে কতভাবে ব্যবহার করি তা একটু খেয়াল করলেই দেখাযায়। প্রথমে গাছ দিয়েই শুরু করি।আগেকার দিনের বাড়িতে ছড়ানো ছিটোনো চৌহদ্দিতে গৃহস্থ একখানা কাঁঠাল গাছ লাগিয়ে দিতো। সে গাছ কালক্রমে বৃহৎ্‌ মহীরুহে পরিণত হতো। সে গাছ গরমে ছায়া দিতো, ফল দিতো। আবার সে গাছের যত বয়স হতো তত তার দাম হতো, কারণ তার কাঠ খুবই পোক্ত মজবুত। তখনকার দিনে বহু বাড়িতেই ব্যবহার হতো কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি, তক্তপোষ। পাকা কাঁঠালও কম সুস্বাদু নয়। ফল হিসেবেও খুব উপকারী। এতগুণ থাকা সত্ত্বেও ওই যে কাঁঠালের আঠা লাগলে পরে ছাড়ে না, এই কথাটাই সবাই যেন বেশি বলে। তবে যে যাই বলুক, গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল কথাটা কিন্তু বেশ আশাবাদী। যতই আশায় মরে চাষা লোকে বলুক না, আবার আশা নিয়েইযে আমরা বাঁচি তাই না।    



বিষয়: গল্প     

   

 আনন্দধারা

মনোমিতা চক্রবর্তী 


মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আনন্দবাবু,ধারাদেবী। দুজনের চোখেই জল। 
ধারাদেবী -"বাবার সম্মান রক্ষার্থে বিয়েটা করতে বাধ্য হয়েছিলাম। কোনদিনই ধনবান স্বামীর থেকে সামান্য সম্মানটুকু পাইনি ।স্বামী গত হতেই সন্তানদের কাছেও গলার কাঁটাহয়েছি। তাইতো আমার ঠাঁই হয়েছে তোমার আনন্দধারা বৃদ্ধাশ্রমে।"
আনন্দবাবু -"তুমি কথা দিয়েছিলে হস্টেলথেকে বাড়িগিয়ে চিঠি লিখবে। সেই চিঠির অপেক্ষায় কাটিয়েছি চল্লিশটি বছর।স্বপ্ন দেখেছিলাম প্রতিষ্ঠিতহয়ে তোমার সাথে ঘর বাঁধবো; মনেআছে তোমার ? যার নাম ঠিক করেছিলাম আমরা আনন্দধারা।
দেখো আজ আমরা সেই আনন্দধারাতেই!আমরা কি পারিনা বাকি জীবনটা একসাথে আমাদের স্বপ্নের আনন্দধারাতে কাটাতে?"



বিষয়: কবিতা ও ছড়া 


দুটি কবিতা 
আবদুস সালাম 


শূন্যতার গা ঘেঁষে


বিশ্বাসের দরজায় বিড়ম্বনা তুলছে মাথা
আটপৌরে জীবন
নেমে আসে দ্বিধা দ্বন্দের নিত্যসমাস
শূন্যতার ভিতর লেপ্টে  যায় নিষ্ঠুরতার সন্যাসী অভিযান

প্রাত্যহিক জীবনে দল বেঁধে অভাবেদের  যাওয়া আসা মন্দ লাগে না
মৃত্যু এখন সহজ লভ্য অহংকার
ঘরে ঘরে জ্বলে  দুঃখের উনুন
বিবর্তনের গা ঘেঁষে  পুড়ে যায় চিতা ভর্তি শ্বাসকষ্ট
অগ্নিস্রাব হয় বিশ্বাসী রমণীদের
অপরিণত বোকা কাহিনীর মতো প্রেম  গর্ভবতী হয়
আটপৌরে সংসারে নাড়ীর যোগ বলে কিছু হয়না

শূন্যতার আগমনে আক্রান্ত হয় ভালোবাসা
ধূলোর আস্তরণ জুড়ে  বিচ্ছেদের বিস্তীর্ণ মাঠ
অসফল ধূসর স্বপ্নেরা  চৈত্রের ঝড়ে ঠুংরী গায়
এভাবেই বিশ্বাসের দরজায় হানা দেয় অপরিচয়
আমরা আধুনিক হই
প্রেমের রাস্তায় খেলা করে  খোলাম কুচির নিষ্ঠুর আহ্বান


নষ্ট

নষ্ট পাড়ায় ঘর বাঁধতে মানা নেই

এখানে অন্ততঃ  কেউ খুঁত ধরতে বিলাপ করে না
নষ্ট মানুষের দলে দিব্যি বিন্দাস দিনযাপনের  সাজায় ঘরবাড়ি
পাঁকের ভিতর পাঁকাল মাছের সংসার 

প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে যায়
আনন্দ বাগানে ঝুলে আছে মাকাল ফল
পূর্ব পুরুষেরা ইতিহাসের মলিন  পৃষ্ঠায় এঁকে রেখেছে রক্তের জলছবি
মরণের যন্ত্রণারা  এখানে রোজ এসে চুমু  খায়

ছেঁড়া নদীর পাশ দিয়ে  হেঁটে  চলেছে  অবিশ্বাস
বিশ্বাস লুন্ঠিত হয় রোজ
ইতিহাসের দলিল গুলো ভেসে গেছে সময়ের নদীতে
নষ্ট পাড়ায়  বিষাদ মেখে দহনেরা বেঁচে থাকার রেওয়াজ করে

রঙিন মানুষেরা শোনায় অধর্মের গান
ধর্ম ব্যাবসায়ীরা   ধর্মের সাথে  অফার করে  বিদ্বেষ
আমরা মেতে উঠি
নষ্ট পাড়ায় নষ্ট প্রজাপতিরা আসে
নষ্ট ফুলে মেখে নেয় নষ্ট প্রেমের মুদ্রিত কলরব



বুড়ো আঙুলে

মাথুর দাস


বুড়ো আঙুলে কলা দেখানো,

বুড়ো আঙুলে রাগ,

বুড়ো আঙুলে টিপসই চাই,

নইলে 'যা তুই ভাগ্' !


বুড়ো আঙুলে কলা,

যায় কি এখন বলা ?

বুড়ো আঙুলেই হই সহমত,

বিপরীতে বীতরাগ ।




   রবি

    রীনা মজুমদার

 আছেই তো দুই রবি!

 রবির কিরণ রেখেছে বাঁচিয়ে
   শীতল পৃথিবীকে
  উত্তাপ ও আলো দিয়ে,
রবির অক্ষর কিরণ রেখেছে
  সুখে দুঃখে আনন্দে শোকে
 শান্তি ও আশ্রয় দিয়ে।

 দেখা হয়নি জানা হয়নি সৃষ্টি কে
  ইতিহাস হয়ে আছে ইতিহাস
 এগিয়ে চলি নিরন্তর গর্বের সঙ্গে
 তাঁর আলো ছায়ায় নিবিড় পরশে,
 আঁধার শেষে মরসুমী রঙিন স্বপ্নে
নিত্য আলোকিত হয় পূব আকাশে।

 আছে শুধু রবি ও রবি কবি 
  বেঁচে থাকার অহংকার..


ব্যাকরণ

প্রনব রুদ্র কুন্ডু

খাতাতে কলম রাখতেই মাংসের পোড়া গন্ধ
কলমের নিব থেকে থোপ থোপ রক্ত
লেখার টেবিলে ধোঁয়া
চেয়ারে লকলকে আগুন 
কী লিখবো?
লোভ উগ্রতায় মানুষই কাটে মনুষ্যত্ব!
শুধু দ্বন্দ্ব অহং দস্যুতা! 

সুকতলায় মেরুদণ্ড
ব্যাকরণ জানে না লিপ্সার চাটু
রামপুরহাট তুমি জেনো- চারদিকে প্রসারিত গদিবাদ!

নিঃসঙ্গতার এ বসন্তে
কোনো প্রশ্ন রেখো না ব্যালটের কাছে
ঈমান বিষণ্ণ ঘাসফুলে আত্মহত্যার কৌশল শিখছে

এবার আঘাতের পাঠশালায় জ্বলে
ভালোবাসা ছিঁড়ে দিন
পাঠক সুধীজন;
প্রিয়জনের মৃত্যু হলে তবে আপনি বুঝবেন-
ঘা-রক্ত-পুঁজে মুখ বুঁজে বাঁচাকে নপুংসক বলে!
উঠুন, পিঠও যে পুড়ে গ্যাছে;
আর কবে ঘুরতে শিখবেন, দাঁড়ানো শিখবেন?
বিবেক শুধু জানে আসল বিবর্তন!
আপনি মানুষ তো?



বৃষ্টি তখনও পড়ছিল
পক্ষিরাজ 

বৃষ্টি এখনও  পড়ছে,
মনের মধ্যে জমে থাকা সব মেঘ,
এবার কেটে যাবে।
মনটা খুব হালকা হয়ে যাবে।।
হয়তো এই মন আবার কাব্যিকও  হয়ে উঠবে,
কাব্যিক মন আবার জন্ম দিতে পারে,
নতুন কাব্যেরও।
হয়তো  সন্ধ্যার সেই রামধনু
আর থাকবে না,
হয়তো পাখিরাও আর গান গাইবে না,
বৃষ্টি তখনও পড়ছিল,
কিন্তু সেই জল ছিল চোখের,
মেঘের নয়........ 



 উত্তাপ

 আকাশলীনা ঢোল


দিন এখন দুপুর পেরিয়ে

বিকেলের পথের যাত্রী,

এগিয়ে চলেছে রাতের দিকে

তাপ বিকিরণ করে।

জড়তা মেশানো ভোর আর

ক্লান্তি মেশানো দগ্ধ

দুপুরের শ্রান্তি নিয়ে সে এখন

নিস্তব্ধ হতে চায়।

দেহের উত্তাপ হঠাৎ বাড়লে

যেমন অসাড় হয় অস্থি-পেশী-ধমনী,

তেমনই অসাড় এই জ্যৈষ্ঠের

দীর্ঘ একটি দগ্ধ দিন।

অমৃতে তার অরুচি, কণ্ঠ তার

বিষাক্ত রকমের তিক্ততায় ভরপুর-

সম্বল বলতে তার আছে কেবল

ঝাঁঝালো রোদ, গলে যাওয়া পিচ,

শুষ্ক লু বাতাস আর

মাপনযন্ত্রের উত্তাপ-

যে উত্তাপ খুঁজে ফেরে আর্দ্রতা,

বাষ্প হয়ে উবে যেতে চায়

কোন মহাশূন্যের ডাকে। 



অসুখ 
সৈকত দাম

যারা চাইতো আমায় ,
তারা ঠুকরে চলে গেছে কাঠের পাঁজর .....
আর আজ আমি এক অসুখ ....
যারা বলেছিলো আমায় রাজা ,
তারা বাড়ি ফিরে গেছে ,
দুর্বৃত্তের মতো আমার বৃত্ত ঘুরে .....
আর আজ .....

না, এবারে মিলবে না ভাবনারা কবিতার সাথে ,
কিছু কিছু দ্বিপদীরাও হোঁচট খেয়েছে ,
একনায়কের মতো বাঁচতে গিয়ে ......

চকচকে গাড়ি, প্রাইভেট সেক্টর ,
মোটা মাইনের চেক ....
তারা ভালো আছে ,
শুধু profile এর মুহুর্ত গুলো fake ......

সুঁচের ডগায় তবু লেগে থাকে অনুশোচনার মাটি ,
রাত্রি বাজছে ২ টো ৪ 
আমার কলমে অন্তরীক্ষ .....
আর অন্তরীক্ষে ব্যাভিচার ......

আমার খামচে ধরা জামায় আজ বড় অসময় ....
যদিও তারা ভালো আছে ,
তবু নোনা জলে ভেসে যায় তাদেরও বেড রুম .....
যারা চাইতো আমায় ,
তাদেরও পর্দার অন্তরালে বাথরুম .....
এখানেও বৃষ্টি বৃষ্টি মরসুম .....

আর আমি তাকিয়ে দেখি ,

কোনো এক সৃষ্টি রত চিত্র পরিচালকের মতো .....



গিরগিটি মুখ ও মুখোশ

কাকলি ব্যানার্জি মোদক 

মুখ ঢেকেছে মুখোশেতে
                         মানুষ সবাই ধন্দে,
বিশ্বভুবন মুখোশধারী
                     মারছে ছুরি অন্তরালে।
অনেক দিনের কষ্ট,বেদন,
                       অনেক দিনের যন্ত্রণা,
ভাসিয়ে দিলে যার কাছেতে
                      বন্ধু ভেবে মনের কথা।
হয়তো তুমি ভাবছো মনে
                        স্বস্তি পেলে কিছুটা ,
ভুল করেছো মারবে ছুরি,
                       মুখোশধারী মানুষটা ।

কোথায় গেলেন হরিশচন্দ্র,
                   দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর,
দেশের মাতা টেরেসা ,
            রামমোহন আর বিবেকানন্দ ।
গোটাকয়েক মুখোশধারী
                    আগেও ছিল বিশ্বতে ,
শকুনি মামা,মন্থরা আর
                          সূর্পনখা লঙ্কাতে।

পাপ ঢুকেছে মনের ঘরে
                          সর্বগ্রাসী মনটাতে ,
আমি হবো বিশ্বসেরা
                 দাসদাসী সব আমার যে ।
বিশ্বভুবন যার হাতেতে
                      তাকেও করো বঞ্চনা ,
মুখোশধারী লুটছে টাকা,
                       প্রসাদী ওই অর্থটা ।।


ফলগুলো

মজনু মিয়া 

ফলগুলো ঐ ঝুলে আছে
গাছের শাখে শাখে,
আধা পাকা পাকা পাকা
ফলগুলো খায় কাকে।

লিচু খাচ্ছে বাদুড় রাতে
বিচি পড়ে আছে,
গাছগুলো সব লাগছে ফাঁকা 
তাড়াও কেউ কি আছে!

কাঁঠাল গাছে মিষ্টি ঘ্রাণে
কাঠবিড়ালি ঘুরে,
খোঁজে খোঁজে পেলে তাতে
খায় যে খুঁড়ে খুঁড়ে। 

পাখপাখালি খাবে ঠিকই 
কিন্তু যাবে রেখে, 
গাছের মালিক যাতে কিছু 
দেখতে পারে চেখে।

শিশু কিশোর যুবা বৃদ্ধ 
সবার কাছে প্রিয়, 
ফল মিলে এই জৈষ্ঠ্যমাসে

মধুমাস জানিও। 

.