Friday, August 2, 2024


 

`প্রথম অভিযান যে পথে.....` 


তাল সুপুরির গলি    

    চিত্রা পাল

তাল সুপুরির গলি এ নামটা আমার দেওয়া। এ রকম নামের গলি বা পথ ভূ ভারতের কোথাও নেই। কোথাও না থাকলেও আমার মনে আছে, আর মন ভালো না থাকলেই সেই পথে যেতে চাই। সেই ছোটবেলার কথা। তখন সবে একা বই খাতা নিয়ে স্কুলে যাচ্ছি।বাড়িতে আমার খেলার সাথী আমার ঠিক পরের ছোট বোন আর ইস্কুলে আমার বন্ধু মীরা। বাড়ির কাছেই ইস্কুল,একটুখানি রাস্তা, সমাজবাড়ির ঘাট পেরোলেই ইস্কুল।তখন আমাদের প্রাথমিক স্তরের ক্লাস হোতো সকালে। যাবার সময়ে বাবা দাঁড়াতো, আর আমি ছুট্টে চলে যেতুম। ফেরার সময় হোত মজা। তখন আমি আর একটা রাস্তা দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বাড়ি যেতুম। একদিন মীরা বললে, এই ওই দিক দিয়ে যাবি? আমার ও উত্‌সাহ। বললুম চল যাই। সেদিন কি কারণে যেন এক পিরিয়ড আগে ছুটি হয়ে গিয়েছিলো। আমি আর মীরা দুজনে চললুম ওই ঘুরপথে। ওই পথে যেতে পড়ে একটা তেলকল, সেখানে সরষে পেষাই হয়ে তেল হয়। সেটা পার হয়ে পুতালী দিদির বাড়ি। পুতালি দিদি এখানকার হাসপাতালের নার্সদিদি। ছোটবড় সবায়ের পুতালি দিদি।  তারপরের কথাটা বড় ভয়ে ভয়ে মনে করতুম, ওটা নিধি পাগলির বাড়ি। যেই তেলকল পার হয়েছি, দেখি, পুতালী দিদি নার্সের সাজ পরে ওদের বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে। তখনই বুঝে গেলুম আমি বোধ হয়, নিধি পাগলির গলিতে এসেছি। ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেলো। এমন সময় শুনতে পেলুম, একটা বিকট বাজখাঁই চীত্‌কার। আর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেলো সাঁই সাঁই করে একটা বেগুনি। আমি খাবনি। দেখি চীত্‌কার করছে আর শিক দেওয়া তালাবন্ধ দরজার ভেতর থেকে ওর সব খাবার এলমুনিয়াম বাটি থেকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। আমি মার মুখে শুনেছিলুম, এখানে একটা ভয়ংকর পাগলি থাকে, তার নাম নিধি পাগলি। তাহলে এই বোধ হয় সেই। দুজনে দুজনকে জাপটে ধরে কোনরকমে চোখ কান বুজে দুর্গা নাম জপতে জপতে পেরিয়ে এলুম জায়গাটা। আমি মীরাকে বললুম, আমি আর যাব না, চল বাড়ী যাই, ও বললো এমা তালসুপুরি খাবি না? এই তো এইটুকুনই পেরোলেই। কোনরকমে ওখানটা পেরিয়ে বড় রাস্তা পেরিয়ে  উঁচু ঢিপিটায় উঠেই দেখতে পেলুম, চারদিকে বনজঙ্গল, ঠিক তার মাঝখানে একটা ছোট পুকুর। পুকুরের চারধার ঘিরে আম জাম কাঁঠাল বেল এসব গাছ আর তার সঙ্গে রয়েছে তিন চারখানা তালসুপুরি গাছ। এমনই তাল গাছের মতো দেখতে, কিন্তু ওর পাতার ডগা কেমন সবুজ শিকলি ঝোলার মতো ঝুলছে। ওই তাল গাছের ফল ছোট ছোট সুপুরির মত পেকে খসে পড়ে গাছের তলায়, সেইগুলো কুড়িয়ে খায়। আমি ও খেলুম। তেমন আহা মরি কিছু নয় ,একটু কষটা কষটা মিষ্টি মিষ্টি। ওই দুপুরেও জায়গাটা কেমন  ঠান্ডা ঠান্ডা। এই আমার প্রথম অভিযান, কিন্তু সব মনে আছে , মনে তো থাকবেই কেননা মনে করে রাখতেই চাই যে।                     




`যে পথ চিনিয়েছে রূপ ও রং....`


চৌপথি: আমার স্মৃতির চারি পথ

সুদীপ দাস


ছোট বেলায় বড়োদের কাছে শুনেছি মানুষের জীবনে একটি পথ বন্ধ হলে নাকি হাজারো পথ খুলে যায়। আমার জীবনেও তাই হলো, জীবনের এই সন্ধিক্ষণে অনেক পথ পেরিয়ে আসতে হলো। হয়তো আরো অনেক পথ চলতে হবে। অনেক ফেলে আসা পথে আর কোনদিন হয়তো যাওয়া হবে না। আবার কখনো নতুন নতুন পথের সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে হবে বহুদূর। জীবনে বহু পথ পাড়ি দিলেও আমার স্মৃতির চারি পথের সন্ধান দিলাম।


(১)

নব্বই এর দশক। উঁচু উঁচু ঢিবি সমগ্র প্যারেড গ্রাউন্ড জুড়ে। সবুজ ঘাসের গালিচায় এবড়ো খেবড়ো পথ। এ পথ এখনকার মতো মাঠের ভেতরকার চারদিকে কংক্রিটের পথ নয়। এই পথ মাঠের মাঝখান দিয়ে এঁকে বেঁকে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন পা মারিয়ে যাতায়াতের ফলে সৃষ্টি হওয়া এক ফালি পথ বলা চলে। এই পথ পেরিয়েই খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাওয়া যেত কলেজহল্টে বা মেইন রোডে। আমরা বন্ধুরা স্কুলেও যেতাম এই একফালি মেঠো পথ পেরিয়ে। এই পথটিকে মানুষের সম্পর্কের গভীরতার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদী পারস্পরিক সম্পর্ক গুলোতে যোগাযোগের মাত্রা কমতে থাকলে সম্পর্কের মসৃণ পথ গুলো যেমন অস্পষ্ট থেকে অস্পষ্ট তর হয়ে ওঠে, তেমনি এই মেঠোপথে মানুষের যাতায়াত কমতে থাকলে ঘাস গজিয়ে ওঠে। পথ বুজে যায়। বহু স্মৃতি বিজড়িত এই মেঠোপথ অনেক দিন হলো বন্ধ হয়ে গেছে।


(২) 

এই পথ আকাশপথ, জলপথ কিংবা পিচের চাদর জড়ানো কোনো কংক্রিটের পথ নয়। এই পথ ছিল বিশ্বাসের। যত বড়ো হতে থাকলাম এই পথে চলতে গিয়ে বারবার শুধু হোঁচট খেতে হলো। যত্ন করে তৈরি হওয়া বিশ্বাসের রাস্তায় কখন যে কারা কাঁটা বিছিয়ে দিয়ে চলে গেছে তা আর বোঝা হয়ে উঠলো না। তাই বলে কী এই পথ বন্ধ হয়ে গেছে! না। এভারেস্ট শিখরে পৌঁছনোর কঠিন পথের ন্যায় মানুষের জীবনে বিশ্বাসের রাস্তাটিও বড্ড কঠিন, সবাই এই পথের পথিক হয় না।


(৩) 

বিষয় যখন প্রিয় পথ তখন একটি পথের কথা বলতে ভীষণ ইচ্ছে করছে। দুই পাশে সবুজ জঙ্গলকে সঙ্গী করে কালো বিছের মতো এঁকে বেঁকে চলেছে রাস্তা। ডুয়ার্স রাণী আলিপুরদুয়ার এর দমনপুর শেষ করে জয়ন্তীর দিকে ধাবমান, যা রাজাভাতখাওয়া স্পর্শ করে ডীমা ব্রীজ যাবার একটি মনোরম পথ। চারিদিক সবুজ আর সবুজ। এই পথকে এসি পথ বললেও ভুল হবে না। গ্রীষ্মকালীন তীব্র গরমে এই পথে গাছের ছায়া তলের আরামের জুড়ি মেলা ভার। হাতির এই করিডোরে রেললাইন বরাবর সান্ধ্যকালীন দুলকি চাল মাঝে মাঝেই চোখে পড়ে। ময়ূরের অবাধ বিচরণ এই পথ প্রিয় হবার আরও একটি কারণ। হরেক পাখির কলতান, ঝিরঝির বাতাস আর ছোট্ট নদীর জলপ্রবাহ এই পথকে আরও মনোরম করে তোলে। এই পথেই প্রেমিক প্রেমিকা মোটরবাইকের ধোঁয়া উড়িয়ে সুর তোলে "এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো"।


(৪) 

পার্ক রোড। তখন ম্যাক উইলিয়াম উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র আমি। বিদ্যালয়ের উল্টো দিকেই পার্ক এবং পার্ক রোড । পার্ক এর কথা বলছি আর পার্ক দাদুর কথা বলব না, তা কী আর হয়! এই রাস্তাই দাদুর সঙ্গে এক অম্ল মধুর সম্পর্ক তৈরি করে দিয়েছিলো। যখন খুশি তখন পার্কে গিয়ে জ্বালাতন কার ভালো লাগে। পার্কের দাদু বকাঝকা করলেও তিনিও যে আমাদের পথ চেয়ে থাকতেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিদিন টিফিনের সময় পার্ক এবং পার্ক রোড থাকত আমাদের দখলে। রাস্তার একধারে ছিল জঙ্গল। কুল, পেয়ারা, আমলকি, জামরুল, পানিয়াল, জলপাই, চালতা, লিচু, বাতাবি লেবুর গাছ ছিল ঐ জঙ্গলে। আর এই সব ফল সংগ্রহের জন্য জন্য পার্ক রোড সংলগ্ন এলাকায় চলত আমাদের বন্ধুদের টহলদারি। আজ এখানে বড়ো বড়ো বিল্ডিং বাড়ি। পার্কে রঙিন ফোয়ারা, অনেক আলোর রোশনাই। দাদুর গত হবার খবরও কোন দিন রাখা হয়নি।


 সত্যি এই পথ গুলো হারিয়ে গেছে, যে পথ গুলো একদিন পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে। চিনিয়েছে জীবনের বহু রূপ ও রং। আজ স্মৃতির পথ ধরে সেই সব পথ খুঁজতে গিয়ে ভীষন ক্লান্তি নেমে আসে। 


 

`.....পথ হয়েছে শ্রীহীন`


প্রিয় পথ

বেলা দে

এমন একদিন গেছে যেদিন পথ সত্যিই বেঁধে দিয়েছিল বন্ধনহীন গ্রন্থি, শৈলরানীর দেশে যখন ইচ্ছে যতটা ইচ্ছে বনবাদাড়ে টইটই। যত্রতত্র রসনা তৃপ্তিসুখ সমতলে যা পাইনি এতদিন অর্থাৎ ষাটের দশকের শেষদিকে ১৯৬৯-এ, মোমো চাউমিনের চাইনিজ রেস্তোরাঁ সেদিন কোথায়? প্রথমটায় ধোয়া ওঠা চাউমিন দেখে কি গা ঘিনঘিন। বন্ধুরা বুঝিয়ে বাজিয়ে খাইয়ে দিয়েছে ফেরিওয়ালার জলবরফ খেয়ে অভ্যেস, সেখানে আইস্ক্রিম পার্লার পিৎজা হাটের মুখরোচক খাবার, আত্মপ্রকাশ করেওনি রকমারি কেক। ছোট্ট এক অঞ্চল শহর থেকে গিয়ে ঠকেছি বারবার, একদিন বিস্কুট আইসক্রিম থেকে আইসক্রিম চেটে খেয়ে বিস্কুটের অংশটুকু ফেলেই দিয়েছি ওদের হো হো হাসিটুকুও খুব অপমানে লেগেছিল।

ফালাকাটায় তখন কলেজ হয়নি বোর্ডের পরীক্ষায় পাশ করে মাত্র পনেরোয় দাদার সঙ্গে যাব শৈলরানীর দেশে দার্জিলিং গভর্নমেন্ট কলেজে পড়তে। সমতলের শীতবেলায় যদি কখনো মেঘ সরলে একটু আধটু পাহাড় চুড়োও দেখা গেছে সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠেছি ওরে দেখ দেখ কাঞ্চনজঙ্ঘা, ভাবতাম কবে দেখবো সেই পাহাড়ি পথ।ভাবতেই পারিনি একদিন আকস্মিকভাবেই চলে যাব শৈলরানীর শহরে, সবেমাত্র আটষট্টির বন্যায় বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গ, সে পথে চলতে চারবার বাসা বদল করে অবশেষে ছুঁয়েছি পাহাড়ি পথ, খাড়াই উতরাই পাকদণ্ডী মৌনি পথকেই তাহলে পাহাড় বলে, যতই উঠছি আর অভিভূত বিহ্বল হয়ে দেখছি চারপাশ। 

দুইধারে সাজানো মনোরম ইচ্ছেফুলের গাছ রঙিন করে রেখেছে পাহাড়, থেকে থেকে ঝর্ণার উত্তাল জলরাশির কলধ্বনি, বাদরের সংসার,খাঁজে খাঁজে ঝুলে থাকা কুটিরের চেকনাই। চাঁদমারিতে দাদা থাকে আর চাঁদনিচক মূল শহর। বন্ধুরা বলতো চল মোমো খেয়ে আসি কাছেই তো সে পথ আমার কাছে লেগেছে অনেকটা। ওদের সাথে কলেজপথে পিছিয়ে পড়েছি প্রতি রোজ হাফ ধরেছে চলতে চলতে, কালভার্টে বসে খানিকটা বিশ্রাম করতে গিয়ে দেখি ওরা নেই আমি তো হারিয়ে ফেলি খেই, মেঘ কুয়াশার আড়াল ঢেকে ফেলেছে ওদের। লেবং মিনিস্ট্রি যাব একদিন।  ওরা বলে চল না এইটুকুই তো পথ ওরেব্বাস শীতের রাজ্যেও আমার রীতিমতো ঘাম ঝরছে ওদের সামান্য আমার কাছে অসামান্য পথ। 

কলেজ ছুটির দিন অথবা ক্লাস না থাকার ফাঁকফোকড়ে চষে নিয়েছি দশে মিলে এ পথ ও পথ, কোনদিন কাকঝোরা সরলদন্ডি গাছের পথ ভেঙে ভেঙে একেবারে উপরে ঝোরার ধারে,কোনদিন বোটানিকাল গার্ডেনে রকমারি অর্কিড আর ফুলের সাম্রাজ্যে আবার আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসুর ইন্সটিটিউটে, সেদিন নির্দিষ্ট কোনো পথ নেই সেখানে যাবার অত্যন্ত খাড়াই পথেই ছুটেছি বয়:সন্ধির নবোদ্যম আবেগে লতাপাতা শেকড়বাকড় ধরে নিয়ে খাঁজ বেয়ে বেয়ে উঠেছি তবুও ছড়ে গিয়ে রক্তাক্ত হয়ে। আবার ম্যাল মহাকালের পথ হেঁটে কোনো সময় মাইলি দিদিদের নৈমিত্তিক শীতসম্ভারের বিপননে। গল্ফ মাঠে, স্টেডিয়ামের পথে, খেলা দেখেছি কলেজ পালিয়ে সাথীরা মিলে। নিয়েছি "চুনি গোস্বামীর " অটোগ্রাফ। ইচ্ছে হলে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিপথে ছুটেছি পাকদণ্ডী ঘিরে। দাদা টুরে গেলে বান্ধবীর বাড়ি ভিক্টরিয়া ফলসের কাছাকাছি সেখান থেকে তিন কি মি পথ কলেজ। খাড়াই পথে উঠতে দম বেরিয়ে গেলেও পথসৌন্দর্যে চলার আনন্দে সে শ্রম ভুলেই গিয়েছি। প্রতিদিনের ছন্দ যেন একেবারে নতুন একেবারে আলাদা, আমার জীবনের অতিপ্রিয় বয়:সন্ধির সে পথ ছেড়ে  যেদিন তল্পিতল্পা গুটিয়ে ফিরে এসেছি সমতলে মনে হয়েছে পিঞ্জরের অর্ধেক অংশ রেখে এলাম সে পথে আবার একবার গেলাম মধ্যবেলায় চিনতে পারছি না আমার প্রিয়তম পথের আঁকাবাঁকা রেখার রাস্তা  সেজেগুজে থাকা সুন্দরী শৈলরানী আজ কোথায়,  কংক্রিট ঢেকে ফেলেছে তার শ্যামলসুন্দর অবয়ব। অট্টালিকা মুড়েছে তার কুয়াশা মাখা জৌলুষ। পথ দাঁড়িয়ে আছে শ্রীহীন, আত্মহননের কাছে। আমার পায়ে হাঁটা প্রিয় পথ কিন্তু তার কেতা নিয়েই আছে।


 

`যদি ফিরে পেতাম  সেই পথ....`



যে পথে আমি গেছি বার বার 

        কবিতা বণিক



 মাবাবার সাথে রিক্সা করে যখন বাড়ি ফিরতাম  তখন   শিলিগুড়ি জংশন স্টেশনের কাছে রিক্সাটা ঢা বেয়ে স্লিপ খাওয়ার মতো নামত খুব  ভয় লাগত পড়ে যাবার।সেখানে  ঢাল বেয়ে দুপাশে সারি সরি নারকেল গাছের নেমে  যাওয়ার দিকে বাবা তাকাতে বলতেন।দেখতেও খু মনোহারি ছিল।  তাই ওই দৃশ্য  উপভোগ করতে গিয়ে  ভুলেই যেতাম ভয়ের  কথা।রিক্সা একেবারে সেই সাজানো বাগানের  মধ্যে রাখা  টয়ট্রেনের কাছে গিয়ে বাঁক নিত।সেই জন্য হিলকার্টরোড  থেকে  শিলিগুড়ি জংশনে ঢোকার  ঢালু রাস্তাটর সৌন্দর্য আমার খুব প্রিয় ছিল কিন্তু পায়ে হেঁটে উপভোগ করলাম যখন , তখন   আমি কলেজ ছাত্রী। ফলে বাসে উঠতাম  নামতাম  হিলকার্ট রোড থেকেই।  ছবির মতো লাগত।খুব ধীরে হাঁটতাম ওই পথটুকু।  বলত , এই পথ যেন না শেষ হয়। খন সে রাস্তাও নেই সে সৌন্দর্য  নেই ,শুধুই দোকানপাট। ঢালটাও সমান হয়ে গেছে। খুব ফিরে পেতে  ইচ্ছে হয় সেই  পথ,  না থাক সাগর তবুও যা মনকে এক লহমায়  কোন  সাগরের  বেলা ভুমিতেই নিয়ে যেত। এখন সেলফির যুগে  আফসোস হয় হারিয়ে গেল সে দিনগুলো। কিন্তু বারও তো সাজানো যায় ! না হোক সে পাহাড়ি ঢালের রূপ। সৌন্দর্যয়ন তো  আমরাই করি। শহরের মধ্যে এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যপট  তো শহরে গৌরব


          শিলিগুড়ি শহরের আরও একটা সুন্দর  লাল কার্পেটের পথ আমাকে আজও  হারিয়ে ফেলার জন্য মনো কষ্ট দেয়।  সে ছিল হাসপাতাল মোড় থেকে কোর্ট মোড় পর্যন্ত। দুধারে  লাল কৃষ্ণচূড়া গাছের সারি।সারা বছর যেমন ঘন সবুজ তেমনি লাল ফুলে যখন ভরে যায়  তখন আরও মোহময় হয়ে ওঠে।বসন্ত কাল এলে শুরু হত ফুল ফোঁটা।  গাছেরমাথাগুলো  ফুলে ফুলে লাল হয়ে  থাকত।রাস্তার দুধারের  এত গাছের  ঝরে পড়া  লাল ফুলে  ফুলে  সমস্ত রাস্তাটা মনেহত লাল কার্পেট পাতা।নিজে যখন হাঁটতাম মনে মনে রেড় কার্পেটে হাঁটার মাধুর্য অনুভব করতাম।আফসোস  হয়একটা ছবিও ধরে রাখতে পারিনি।  সারা বছরই এর সৌন্দর্য  মনকে আকৃষ্ট করত।গ্রীষ্মকালে এত সুন্দর ছায়া ঘের পথবড় শান্তি দায়ক ছিল।আজও কি কোথাও এমন সাজানো রাস্তা তৈরি করা যা না?  হোক না মানুষের ভিড়তবু এমন শান্তির পথ যদি শহরে পাওয়া যায় ক্ষতি কিমানুষ ইচ্ছে করলে করতে পারেকারণ বন্য জিনিস  মানুষের হাতেরছোঁয়ায় স্বর্গীয় সৌন্দর্য লাভ করে। ইচ্ছে হয়আবার যদি ফিরে পেতাম  সেই পথ। সে যেন হবে শহরের প্রাণ ভোমরা। “ কত রকম ছন্দ শোনায় পুষ্প লতাপাতা ; সেইখানেতে সরল হাসি সজল চোখের  কাছে -শরীর মন সুস্হ হতে বাধ্য। প্রার্থনা করি , `হে জীবপালিনী !  — আপনার পত্রপুষ্পপুটে, অনন্ত যৌবনা করি  ( সাজাও ) বসুন্ধরা।` 


 

`শাখাপ্রশাখার মতো পথ সে যে....`

সেই প্রিয় পথ
শুভেন্দু নন্দী 

"মন এখানে রাখাল রাজা বাঁশি বাজায় গোঠে, 
তারি সুরে পুব আকাশে চন্দ্র সূর্য ওঠে"

..সোনালী সেসব দিন। আমাদের নিবাস স্থলের নিকটেই ছিল সে রাস্তা। শহরের এক্কেবারে প্রাণ কেন্দ্রে ।জমজমাট ছিলনা তেমন সে শহর। রাস্তাও ছিলনা পাকা। খোয়া ভাঙ্গা। আর এটাই ছিল প্রধান রাস্তা। যাতায়াতও তার ওপর দিয়েই। রাস্তার একধারে ছিল প্রশস্ত,অবারিত মাঠ। তাতে অনেক উঁচু উঁচু গাছ। বর্ষার সময় জলে জলে থইথই করতো। আর শোনা যেত ব্যাঙদের গানের ঐকতান। স্কুলে যাবার ওটাই ছিল পথ। তখন শৈশবকাল। তাই সংকীর্ন ছিল গন্ডী। বাবা-মায়ের ছত্রছায়ায় ছিলাম তখন।

 পড়াশোনাটাই ছিল একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। স্কুলে যেতে যেতে চোখে পড়ত রাস্তার ধারে সারি সারি বাড়িঘর -কোনওটা একতালা দালান,কোনওটা খড়ের-টিনের ছাউনি, দুর্বল কাঠামো, আর দোকানপাট, চায়ের দোকান, পান-মশলার ঘুমটি ঘর,মুদিখানা, সাইকেল-জুতো সারাইয়ের দোকান,কামারশালা,সেলুন ইত্যাদি। দু-একটা দৃষ্টিনন্দন বাড়িরও দেখা মিলত। স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যেত। বাড়িতে ছিল না বিজলী বাতি। ছিলনা ইলেকট্রিক পাখা। রাতে চলত হ্যারিকেন জ্বালিয়েই পড়া অগত্যা। স্কুলের পড়া শেষ করে আবার কলেজে যাতায়াত একই পথ ধরে । তবে যানবাহনের স্রোত বা জনসংখ্যা বেশী ছিলনা। আস্তে আস্তে সে চিত্র গেল বদলে। রাস্তা হল পিচঢালা। বন্ধু সার্কেল  বৃদ্ধি পেল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বন্ধুবান্ধবদের সাথে learned hobnob. সংস্কতিমনস্ক বলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাওয়া-আসা সবই ঐ একই  রাস্তা অতিক্রম করে। ঐ রাস্তাই তো এঁকেবেঁকে শাখাপ্রশাখার মতো গলি, ছোট গলি,উপগলি,  চোরাগলি ইত্যাদির আকার নিয়েছে। 

কলেজ পড়া শেষ করে অফিস পাড়ায় শুরু হোলো নিয়মিত  যাতায়াত কর্ম সংস্থানের জন্য ঐ চিরচেনা সাধের প্রধান পথ দিয়েই আবার। "থাকবনা আর বদ্ধ ঘরে,দেখব এবার জগৎটাকে।" তাছাড়া, a rolling stone gathers no moss. চাকরী ক্ষেত্রে প্রবেশ করতে করতে আর একটা বড় শহরে settled হোতো হোলো। নিজস্ব পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে এখানকার একটা রাস্তা দারুনভাবে প্রিয় হয়ে উঠলো আমার। দৈনন্দিন বাজার ও অন্যান্য  আরও সাংসারিক প্রয়োজনের টুকিটাকিতে নিয়মিত হোলো শুরু এই পথে যাওয়া-আসা - সেই সঙ্গে অন্যান্য সাংস্কৃতিক চাহিদা পূরণার্থে। এভাবেই আজও চলছে। কিন্তু সেই পুরনো আমলের শহরের চির চেনা ও প্রিয় সেই  রাস্তা -যে রাস্তা পদার্পনের  মধ্য দিয়ে আমার শৈশব, কিশোর ও যৌবনকালেরঅনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে- তা কিছুতেই ভুলতে পারিনি আজও ।


 

`কমলালেবু  রোদ মাখা পথ....`


সেই প্রিয় পথ

পর্ণা চক্রবর্তী


পথটা এখনো স্বপ্নে আসে। প্রায়ই আসে। দু চোখে জুড়ে ঘুম যখন বৃষ্টির মতো নামে ,আমি ভিজতে ভিজতে অতল জলের ভেতর ডুবতে থাকি, ঠিক তখনি পথটা হুস করে সে গহীন থেকে উঠে সামনে এসে দাঁড়ায়।

ঘুমের ভেতরে আমি জেগে উঠি। পথের কাছটিতে গিয়ে দাঁড়াই। সে  ঠিক তেমনি আছে যেমন ছিল তিরিশ বছর আগে। রোদবেলাতে দুপাশ জুড়ে  বড় বড় বৃক্ষরা তেমনি ছায়া ফেলে  রাখে পথ জুড়ে। সেই ছায়ায়  আলগোছে পড়ে থাকে চিকন  লাল,হলুদ ফুলেরা,  কিছু পাতাও থাকে ইতস্তত। অভ্যাস মতো পাতা কুড়াই, ফুল তুলে গন্ধ নিই ।গন্ধহীন ফুলগুলোতে নানা স্মৃতির আলগা সুবাস লেগে থাকে।

পুরনো অভ্যাস মেনে এলোমেলো পায়ে হাঁটতে থাকি। পথ আমার সাথে সাথে নিবিড় হয়ে হাঁটে। দুপাশের গাছের সারি আরও ঘন হয়।দমকা হাওয়ায় চারপাশে ফিসফিস শব্দ জেগে ওঠে। বাতাসে যেন কাদের  কানাকানি। আমি পথ হাঁটি আর পথ হাঁটে আমার সাথে। ছাতিম ফুলের সুবাস পাক খেতে খেতে সাথে চলে।  গাছের ফাঁকে দেখা যায় বিশাল বিশাল বাড়িগুলো। কোনোটা সাদা সোনালী রঙের ঝকঝকে। কোনোটা গায়ে বয়সের শ্যাওলা নিয়ে সবজে মলিন  হয়ে থাকে। কতগুলো বাড়ির বিরাট ছাদ, তাদের  লম্বা টানা  বারান্দার  থামগুলোতে জড়িয়ে থাকে  মাধবীলতার ঝাড়, তাতে সাদা গোলাপী ফুল ফুটে থাকে। বড় বড় জানলা দরজাতে ভারী ভারী সাদা হলুদ পর্দা ঝোলে। বাড়ির ভেতরে গ্রামোফোন বাজে।  তার অস্ফুট এক  সুর  ভেসে   এসে  গাছগুলোতে ধাক্কা খেয়ে  পথময় ছড়িয়ে যায়। আমি চুপ করে শুনি আর মগজে গেঁথে নিই। যখন একা থাকি, তখন ওই সুর গুনগুনিয়ে  মগজ ছাপিয়ে  আমার কানের কাছে এসে বাজতে থাকে নাকি বুকের ভেতর বাজে সে জানি না, কিন্তু নানা কাজে, অকাজে হাজার  ব্যস্ততার মধ্যেও  তখন ওই পথটাকে আমি  দেখতে পাই, মনে হয় আমরা দুজনেই দুজনকে দেখতে পাই স্পষ্ট।

রোজ নির্দিষ্ট  একটা সময় সেই পথ ধরে যেতাম  আবার সেই পথ ধরেই ফিরতাম। ওই একই পথ মাসের পর মাস,বছরের পর বছর ধরে হাঁটি তবুও সে এতটুকুও পুরনো হয় না। কিসের  এক নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে  ওই পথ ধরে চলা, কি যে এক ভালো লাগা ছিল ,একদিন না গেলে মন খারাপ হতো।  সকালে যাওয়ার সময় কমলালেবু  রোদ মেখে পথ আমার সঙ্গ নিত। বাতাসে শীতের আমেজ,  উত্তুরে হাওয়া আমার সবুজ ফুলহাতা সোয়েটারের ফাঁক দিয়ে ঢুকে কনকনে আবেশে জড়িয়ে ধরতো। বেশ লাগে তখন হঠাৎ করে শিহরিত হতে। বড় বাড়িগুলোর জানলা দরজা সব তখন  বন্ধ থাকে। নরম  রোদে ভরে থাকে ওদের  লম্বা টানা বারান্দা। মাঝে মাঝেই দেখি টুপি পরা একজন বৃদ্ধকে। পাঁশুটে রঙের জোব্বার মতো কেমন একটা পোশাক পরে বারান্দায়  দাঁড়িয়ে সাদা পেয়ালা থেকে চা খায়। কোনো কোনো দিন দেখি  নিচের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর  গলায় কাকে ডেকে বলছে , `তপন গাড়ি বের  করেছ?`
 
আমি চলতে চলতে মুখ তুলে দেখি লোকটাকে। সেও চায়ে চুমুক দিয়ে  আমার দিকে  তাকিয়ে মুখ  ভরে হাসে। তার  হাসিতে সকালের রোদ চুঁইয়ে নামে। আমিও হাসি, এমন হাসলে ভেতর ফুরফুরে লাগে। তখন আমি যেন উড়তে থাকি আর পথটাও হাঁটা ছেড়ে আমার সঙ্গ নেয়। আমরা কেউ কারুর নাম জানি না ,চিনি না কিন্তু  হাসিটাকে চিনি। এই পথ না হাঁটলে  হয়তো এমন  হাসি হাসা  যায় না। যদি কোনোদিন পরিচয় হতো তাহলে ওই বৃদ্ধ নিশ্চয় নিজের পরিচয় দিত ,পথের ধারের  হলদে বাড়ির বুড়ো আর আমি বলতাম পথ চলতি একটা মেয়ে।পথটাই ছিল আমাদের এক মাত্র পরিচয়। কিন্তু পথের কোনো নাম দেওয়া যায়নি। কারণ কোনো নামের ভেতর আঁটলোই না, এতটাই সে  অনন্ত ছিল বলে।

সোজা হেঁটে একটু যাওয়ার পর পথটা স্বেচ্ছাচারীর মতো এদিক ওদিক এঁকে বেঁকে গিয়ে ডানদিকে ঘুরেই একটা শ্যাওলা ধরা  পুরনো বাড়ির সামনে গিয়ে থামতো। বাড়িটার মরচে ধরা লোহার গেটের ফাঁক দিয়ে অযত্নে পড়ে থাকা বাগানটাকে  দেখতাম রোজ। ভাঙ্গা চোরা পাথরের পরীগুলো এদিক ওদিক পড়ে থাকে।  লতাপাতায় ঢেকে থাকে তাদের নগ্নতা।  ওদের শ্বেতশুভ্র মর্মর চেহারাগুলো মলিন হয়ে আছে  বহু বছরের অযত্নে। বাগানের মাঝখানে  একটা ফোয়ারা শুকনো বুক নিয়ে দাঁড়িয়ে  আছে একা। তার শরীরের জায়গায় জায়গায় ভাঙন ধরেছে।

খুব ইচ্ছে করে গেটটা খুলে ভেতরে যাই,ফোয়ারাটাকে ছুঁয়ে দেখি, পরীদের সাথে দুটো কথা বলি। কত কথা অবরুদ্ধ হয়ে  ওদের মনে জমে আছে কে জানে! কিন্তু হয় না। গেটে তালা ঝোলে। ভিতরে একটা সাদা ছাপ  কালো কুকুর ঘুরে বেড়ায় দেখি। একদিন  লাল গামছা পরে দড়ি পাকানো একটা চেহারা ঝোপঝাড় থেকে  বেরিয়ে এসে বললো, `কি চাই খুকু?`

লোকটার ভাবটা একদম ভালো লাগল না। পথ ডাকল, `চলো চলো।  এত থামলে পিছিয়ে পড়বে কিন্তু।`
পথ চলে, আমি চলি ওর সাথে।  এমনিতে পথটা নিরিবিলিই  থাকে। ক্বচিৎ  কদাচিৎ একটু বেশি লোক দেখা যায়।  যেমন মাধ্যমিকের পরীক্ষার সময়  দু একটা বাড়ির  রকে বসে থাকে  পরীক্ষার্থীদের বাবা মায়েরা। দুপুরবেলায় তাদের হাতে থাকে একটা  করে ডাব,  সাথে থাকে স্টিলের টিফিন কৌটো। বিকেলে তারাই আবার প্রশ্নপত্র খুলে  দেখে  আর নানান প্রশ্ন করতে করতে পথ চলে,  `সব ঠিক করে লিখেছিস? সাত নম্বরের এই প্রশ্নটার উত্তরটা কি লিখলি ?`
 
অংকের দিন  উদ্বেগ আর উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়।  পথ তখন বেশ সরগরম হয়ে ওঠে। একবার পথটাকে খুব কাতর হতে দেখেছিলাম। কী কারণে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছিলাম । সেদিন মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে। আশেপাশে কয়েকটা লোক গেজেট গেজেট বলে চিৎকার করছে। কাছের ইস্কুলটার সামনে অনেক ভীড়।  আমাকে  দেখে পথ ডাকল। গিয়ে  দেখি কতগুলো ছাত্র হাতে গেজেট নিয়ে রেজাল্ট দেখছে।  মিত্তিরদের রকে বসে আছে সাদা জামা নীল শার্ট পরা একটা ছেলে ।ছেলেটা দু হাতে মুখ ঢেকে ফুলে ফুলে কাঁদছে।  সেদিন পথটা  খুব বেশি স্তব্ধ হয়ে ছিল। আমি তখন একটু বড়ো।  কাস্তে হাতুড়ি আঁকা দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। পথ সাথেই ছিল। বলল, `এবার বাড়ি যাও। আজকে আর কোনো কথা হবে না।`  

গেলাম না ।ছেলেটা তখনও কাঁদছিল। বন্ধুগুলো ওকে ঘিরে রেখেছিল।  খানিক পরে সবাই যখন চলে গেল, হঠাৎ করে  ভয়ঙ্কর একটা শূন্যতা পথটাকে গ্রাস করে নিল। আকাশে মেঘ জমল, গাছগুলো দমকা বাতাসে মরমর শব্দে দুলে উঠল । আমি  নির্জন পথের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে হাঁটলাম  একা একা। ওই নৈঃশব্দের ভেতরে  ফোঁপানীর মতো  একটা শব্দ হালকা জেগে রইল গোটা পথ জুড়ে।   

ফোয়ারা বাড়ির উল্টো দিকের কোণটাতে একটা বিশাল বটগাছের তলার বেদিটি বাঁধানো। সেখানে নানা আকারের পাথর,  দেবতা বলে দুবেলা পুজো পায় আর আমার মতো বালখিল্যরা পায় প্রসাদ। পূজারী লোকটি ভাল ছিল । বটের প্রলম্বিত শাখা প্রশাখার ছায়ায় একটা ছোটো চায়ের দোকান ছিল তার।  পুজো করে তেমন রোজগার হতো না বলে হয়তো বাকি সময়টাতে চা বিস্কুট বেচত। বড় বাড়িগুলোর ড্রাইভার দারোয়ান  থেকে  পথ চলা  কিছু মানুষ ছিল তার খদ্দের। আমাকে সে বাচ্চাকাল থেকে চেনে,তাই বালিকা যখন বাড়ি ফেরার পথ ধরে তখন মাঝে মাঝে নানখাটাই বিস্কুট জুটত পুরনো পরিচয়ের সুবাদে। পথ তখন খুব খুশি হয়ে  নদী হয়ে বইত আর আমাকে উজানে ঠেলে ঠেলে বড় রাস্তার মোড় অব্দি গিয়ে ছেড়ে আসতো। কিশোরী বেলায়   কখনও কখনও  একটু অন্যরকম  কিছু করার মজায়  ফেরার সময় চা বিস্কুট খেয়েছি বাইরে রাখা বেঞ্চিতে বসে নগদ মূল্য দিয়ে, কেউ জানত না। ওই সময় সে একটা রোমাঞ্চ ছিল বটে। দোকান তখন চালায় পূজারীর ছেলে, পূজারী স্বর্গে গেছে।

কোনদিন ফিরতে দেরি হলে দেখতাম বিকেলে রোদ পড়ে এলে পথের গায়ে  গাছেদের ছায়া নিবিড় হয়ে আসে। বাড়িগুলোতে আলো জ্বলে। কাদের রসুই ঘর থেকে খাবারের সুবাস ভাসে বাতাসে। পেটের ভেতর খিদে  মোচড় মারে। পথ ব্যস্ত হয়ে বলে তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও। কোথাও আবার হাঁ করে কিছু দেখতে দাঁড়িয়ে যেও না যেন।  

আমি তাড়াতাড়ি হাঁটি। বড় রাস্তায় পড়ার আগে একবার মুখ ঘুরিয়ে পথটাকে দেখি। সাঁঝবেলায় পথের দুপাশে  লাইটপোস্ট গুলোতে আলো জ্বলে উঠেছে। বাড়িগুলোতেও জ্বেলেছে আলো । তাদের আলোর ছায়া,সন্ধ্যার অন্ধকারের সাথে মিশে আলোআঁধারির পথটাকে অদ্ভুত মায়াময়  করে তুলেছে।  

 বছর ঘোরে, ইস্কুল থেকে  কলেজ যাই। ও পথে আর যাওয়ার দরকার হয় না। তাই সময় পেলেই  কারণ ছাড়াই ওই পথ ধরে একটু  অলস হাঁটি। লম্বা  বারান্দাটায়  হাস্যমুখ কোনো বৃদ্ধকে আর দেখা যায় না।   তপন গাড়ি বের করেছ, বলে কোনো গমগমে গলা  আর কথা বলে ওঠে না। 

একদিন  দেখি খুব ভিড় হয়েছে। গোটা পথ জুড়ে  থিকথিক করছে লোক। ফোয়ারা বাড়িতে সিনেমার  শুটিং হচ্ছে। বিখ্যাত নায়ককে দেখার জন্য  এতো  ভিড় আর  চিৎকার।  আমি সেদিন আর পথ হাঁটি না,পথও  যেন চুপ করে বসে থাকে বিষণ্ন মুখে। এত ভিড় চিৎকার ওর ভালো লাগেনা। অপেক্ষা করে কখন শেষ হবে, কখন আবার  নিস্তব্ধতা ফিরে আসবে। আমার মন খারাপ হয়। এই জায়গাটা ছেড়ে কিছুদিন পর দূরে চলে যেতে হবে। কবে আবার দেখা হবে, আসা হবে কিনা জানি না।  

তারপর  কেটে যায়  অনেকগুলো বছর, পথের কাছে ফেরা আর হয় না। ইচ্ছে করে বড্ড ,একবার তাকে দেখে আসতে । ওই কৃষ্ণচূড়া , রাধাচূড়া,ছাতিম,বকুল ,শিমুলের  গাছগুলোর  গায়ের গন্ধ নিতে।
চায়ের ছোট্ট  দোকানটা ,বারান্দা বাড়ি, ফোয়ারা বাড়ির কাছে একটু গিয়ে দাঁড়াতে। 

শেষে একবার গেলাম অনেক ঝামেলা করে। কিন্তু পেলাম না । সেই পথকে কোথাও খুঁজে পেলাম না। চারপাশে নতুন সব ফ্ল্যাট, কফি শপ ,বুটিক শপ।   ওই বাড়িগুলো,গাছগুলোর কথা জিজ্ঞেস করলাম কতজনকে,  কেউ বলতেই পারল না । এমন কোনো পথ আদপে কোনোদিন ছিল কিনা  তাই নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতে লাগল।

তাহলে সে পথ গেল কোথায়? তবে কি সে সত্যিই ছিল না? ওই বুড়োটা,চায়ের দোকান  সব মিথ্যে ছিল? আর ওই পরীদের বাড়ি, গাছেদের সারি সব  আমার ভ্রম? আমার ওমন  আনন্দময় পথ চলা ,ওই শিহরণ অমূল্য যত অনুভব  সব মিথ্যে,একটা বিরাট ফাঁকি?

নাকি সত্যই সে ছিল শুধু আমার জন্য? আমি খালি দেখতে পেতাম? তবে কি ওই অনন্ত  আমার সাথে লীলা খেলায় মেতেছিলেন আমার শৈশব থেকে কৈশোর অব্দি অমন একটা পথ  সৃষ্টি করে?  

উত্তর আসেনি কিন্তু পথ ফিরে এসেছে উত্তর হয়ে। আমার স্বপ্নে আসে, আমার চেতনায় থাকে আর  কী নিদ্রায় , কী জাগরুক অবস্থায় এক কথাই বলে,  চরৈবেতি, চলতে থাকো। আলোর পথ ,আনন্দের পথ সত্যের পথ চলো। সেই থেকে আমার চলা। গন্তব্য আছে, থাকুক। কিন্তু পথ চলতেই আনন্দ। তাই আমি পথ হাঁটি আর পথ  হাঁটে আমার সাথে ভেতরে।


 

`পথের টানে.....`


সেই প্রিয় পথ 
মঞ্জুশ্রী সাহা

পথের সাথে পরিচয় সেই ছোট্টবেলা থেকে- যখন হাঁটতেও শিখিনি, বলতেও শিখিনি, বুঝতেও শিখিনি। বড়দের কোলে চড়ে পথের সাথে পরিচয়। তারপর ধীরে ধীরে শুরু হয় পথ চলা। হোঁচট খেতে খেতে পথ চলা। দৌড়তে দৌড়তে পথে আছড়ে পড়া। তারপর সাইকেলে সাইকেলে পথ চলা। বাড়ির গলি পথ বিদ্যালয়,  মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথ হয়ে আত্মীয় পরিজন বন্ধু বান্ধবের বাড়ির পথে মিশে যায় । ধীরে ধীরে প্রিয় হয়ে ওঠে সেই সব পথ। । জীবনের গতানুগতিকতাকে ভুলতে আশ্রয় নিতে হয় পথেই। সেই পথ কখনো মন্দির, মসজিদ বা কখনো গির্জায় গিয়ে মেশে।

আবার কারো পথ চলে যায় সূদূর লাটাগুড়ি চিলাপাতা বা গরুমারার জঙ্গলে। কখনো কখনো সেই পথ আবার পাহাড়ের পাকদন্ডি কেটে পৌঁছে যায় চিত্রে মেঘমা হয়ে সান্দাকফুর দিকে। পুরনো শহরের ঘিঞ্জি গলির অমসৃণ পথের মত নতুন শহরের ঝকঝকে তকতকে মসৃণ পথও চলতে চলতে কখন প্রিয় হয়ে ওঠে তার হিসাব রাখা যায় না। গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গামাটির পথ আমাদের মনকে ভুলিয়ে দেয় রবি ঠাকুরের মতো। এভাবেই সারা জীবনে আমরা স্পর্শ করি কত পথ। কত কথা কত হাসি ছড়িয়ে পড়ে পথের দুপাশে। আলতো ছোঁয়া। কত মজা। পথের সাথেই কথা কওয়া। পথের টানেই বেরিয়ে পড়া ।পথের মাঝে হারিয়ে যাওয়া। পথের জন্যই গান যে গাওয়া...............
পথ হারাবো বলেই এবার 
পথে নেমেছি।

এই পথ চলে যায় ভূস্বর্গের চোখ জুড়ানো রূপ ছাড়িয়ে ভারতের বিস্ময় লে লাদাখের মরু প্রান্তরের বুক চিরে। সিয়াচেনে গিয়ে এই পথ ঢেকে যায় বরফের মোটা চাদরে। ধীরে ধীরে হিমালয়ের তুষারাবৃত শুভ্র শৃঙ্গের রূপে মোহিত হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলে পথ। এই প্রিয় পথ কোথা থেকে শুরু হয়ে কোথায় শেষ হয় কেউ জানে না। শুধু চলতে হয় পথের সাথে। পথের সৌন্দর্য অনুভূতি চোখের মুগ্ধতা মনেপ্রাণে সঞ্চিত হয়। পথ চলার আনন্দে হাসিতে প্রাণ ভরপুর হয়ে ওঠে। মনকে পিপাসু থেকে আরো পিপাসু করে তোলে। প্রাণে উচ্ছ্বাস আনে। আনে অনাবিল আনন্দের লহরা। চলতে চলতে প্রিয় হয়ে উঠে এসব পথ। চলার সাথীদের ভালোলাগার বন্ধনে বেঁধে ফেলে। তাইতো আবার গেয়ে উঠি.........
বারে বারে  আমি পথের টানে 
ঘরকে করেছি পথ 
পথের মানুষ আপন হয়েছে
 আপন হয়েছে পর ।


 

`সেই গ্রাম সেই পথ....`


মাটির পথ ছেড়ে এসেছি ২৪ বছর আগে

বটু কৃষ্ণ হালদার


আজ দুজনের দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে/ তোমার ও পথ আলোয় ভরানো জানি/ আমার এ পথ আঁধারেতে আছে ঢেকে।

হ্যাঁ,সে পথ হল আমার সবুজ ঘেরা গাঁয়ের মেঠো পথ। সালটা ২০০০, আমি সবুজে ঘেরা গায়ের মেঠো পথ মাড়িয়ে জেটিঘাটে এসে নৌকায় চাপলাম। মাধ্যমিক দিয়ে চলে এলাম কলকাতায় উচ্চ শিক্ষার জন্য। পিছনে পড়ে থাকল আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব,গাছপালা,পুকুরপাড়, আর মেঠো পথ। ওই মেঠো পথ ধরে আমার প্রিয় বন্ধু সালমার সঙ্গে হেঁটে হেঁটে স্কুলে গিয়েছি। আমার প্রিয় বর্ষাকালে সেই পথ কাদা হয়ে থাকতো। স্কুলে যাওয়ার সময় এক হাতে চটি আর এক হাতে প্লাস্টিক কাগজের মধ্যে ভরা থাকতো স্কুলের বই। অনেক জায়গায় ছোট ছোট নুড়ি কাঁকরে ভরা থাকতো। সুন্দরবনের নদী সংলগ্ন এলাকায় আমার বাড়ির জন্য গ্রামের রাস্তা  বালি ও মেশানো থাকতো। তাই বৃষ্টির হলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় শুকিয়ে যেত। সেই রাস্তার মধ্যে দিয়ে যখন বিকেল বেলা দৌড়ে খেলতে যেতাম  নুড়ি,কাঁকড় খোয়াতে পা কেটে গিয়ে রক্ত ঝরে পড়ত বুঝতে পারতাম না। খাল কেটে যখন সেই রাস্তায় মাঠে ফেলা হতো তখন অন্ধকারে চলতে গিয়ে কাঁদার মধ্যে পা ঢুকে যেত। পা বের করলে চটি কাদার মধ্যে আটকে থাকতো। আবার তাকে ভয়ের করে পুকুরে পা ধোয়ার নাম করে জলে ঝাঁপ দিতাম। 

আমি তখন ক্লাস সেভেনে কিংবা এইটে পড়ি। বাজারের পাশে দিদিমনির বাড়িতে ইংরেজি বিষয়ে টিউশনি পড়তে যেতাম। একদিন সন্ধ্যায় খুব বৃষ্টি হয়েছে। সেদিন ফুল থেকে নিরুর ভিডিও হলে চারটের শো ভিডিও দেখলাম। বাড়িতে না ফেরার জন্য বাবা বকবেন, তাই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম বাড়িতে গিয়ে বলব পরীক্ষা এসে গেছে দিদিমণি স্কুলের পরে পড়তে যেতে বলেছে তাই একেবারে পড়ে ফিরছি। তারপর পড়তে গেলাম। বৃষ্টি হওয়ার জন্য দিদিমণি সন্ধ্যে আটটায় ছেড়ে দিল। তখনকার সময়ে সন্ধ্যে আটটা মানে গ্রামের দিকে অনেক রাত। তার উপর বর্ষাকাল তাই বাজার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগে। গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। রাত জেগে টিভি দেখার কোন প্রশ্নই ওঠেনা। বলতে গেলে গ্রামের সব বাড়িতে কুপি নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে। আমি টিউশনি দিয়ে বের হয়ে বাজারে গিয়ে দেখলাম প্রায় সব দোকান বন্ধ।শুধু আমাদের পাড়ার অনিল কাকা র দোকান তখনও খোলা। একটু ভরসা পেলাম। গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, `কাকা কখন বাড়ি যাবে`। বললো, `ও তুই। একটু দেরি হবে যে। তুই এগোতে থাক আমি তোর পিছনে পিছনে আসছি।` বললাম, `আচ্ছা`। 

আমি নদীর পাড়ে উঠে, এগোতে থাকলাম বাড়ির দিকে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। অন্ধকারে কোথায় পা ফেলছি তার হদিস ছিল না। কখনো কখনো মাটিতে পা ঢুকে জল ছিটকে সারা শরীর ভিজে যাচ্ছে।কিছুটা এগিয়ে সুইস গেট ( আমাদের খালের সঙ্গে নদীর সংযোগস্থল, রাস্তা কেটে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো,তার দুটো মুখ আছে যা লোহার গেট দিয়ে ঢাকা থাকে। জোয়ার ভাটা খেললে খালের জল নদীতে চলে যায়, আবার নদীর জল খালে ঢকে। উপরে দুদিকে লোহার রডের মাঝে গোল চাকতি থাকে, সেটি কে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঢাকনা উপরে তুলতে হয় আবার নিচে নামাতে হয়) পেরোলে খালপাড়ের রাস্তা ধরে বাড়ি পৌঁছতে হবে। গেটের ঢাকনা খোলা হু হু করে জল নদীতে ছাড়া আছে। বিকট আওয়াজ। যেতে যেতে নদীর ত্রিকোণ বাঁধের দিকে তাকালাম, কারণ সেখানে শ্মশান। কোন মরা আসেনি সেদিন, চিতার আগুন জ্বলছে না। মরা এলে কম সে কম আগুন ও লোকজনের হল্লা শুনতে পাওয়া যেত। সুইস গেট পার করে রাস্তায় ঢুকবো। এমন সময় দমকা হাওয়া পিছন থেকে ধাক্কা মারলো। ছিটকে গিয়ে বাঁধ বরাবর পিছনে হড়কে খালের জলে পড়ে গেলাম। মাথায় তখনও প্লাস্টিকে মোড়া বই আর অন্য হাতে জুতো। দুটো হাত তখন গৌরাঙ্গের মতো উপরে তোলা। কোন প্রকারে পাড়ের ঝোপঝাড় হাতড়ে উপরে উঠে ঊর্ধ্বশ্বাসে চলতে লাগলাম। আর মুখে মনে মনে হরে কৃষ্ণ হরে রাম বলতে থাকলাম। 

চলছি তো চলছি, কোথায় পা পড়ছে তা বুঝতে পারছি না। রাস্তার একটা কুকুরও দেখতে পেলাম না তারাও কোথাও নয় কোথায় আশ্রয় নিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। আমি একা হেঁটে চলেছি।দুই একটা বাড়িতে তখনো আলো নেভেনি। বাড়ির কাছাকাছি যেতেই এক দৌড়ে উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তখনো মা বাবা আর ঠাকুমা জেগে আছে আমার জন্য। মা একটু জল গরম করে আমাকে ধুইয়ে দিলো। ভাত খেতে বসতে গিয়ে বুঝতে পারলাম আমার পিছনটা চিরে গেছে। জ্বালা করছে,ব্যথা করছে। তারপর মা আর ঠাকুমাকে সব ঘটনা বলি। বাবা বকাবকি করেনি। ভাত খেয়ে সোজা ঠাকুরমার কাছে ঘুমিয়ে পড়লাম।

যে রাস্তার মাটি নিয়ে চাম গুলতি বানিয়েছি, যে রাস্তায় সাইকেল চালাতে গিয়ে ব্যালেন্স হারিয়ে খালে গিয়ে পড়েছি, যে রাস্তায় পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মার্বেল খেলেছি, যে রাস্তার পাড়ে খেজুর গাছে উঠে খেজুর পারতে গিয়ে পড়ে গেছি, রাস্তার পাড়ে বুনো হাবড়ি গাছের ফল নিয়ে গাড়ি গাড়ি খেলেছি, সেই রাস্তা এখন কেমন আছে জানিনা। রাস্তার পাড়ে খালের জলে সাঁতার কাটতাম বন্ধুবান্ধব মিলে, দিন দুই বেলা মাছ ধরতাম জাল ফেলে, তার জল ছুঁয়ে দেখিনি বহুবছর। 

কর্মসূত্রে কলকাতায় থাকি। সব সময় গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয়ে ওঠেনা। তবে গ্রামের সেই মেঠো পথ এখন কংক্রিটের জঙ্গলে আবদ্ধ। বর্ষায় হাঁটলেও মাটি লাগেনা পায়ে। রাস্তার মাটি ঢাকা পড়ে গেছে আধুনিকতার বিলাসিতায়। বাড়িতে গেলে রাস্তায় বসে পাড়ের মাটিতে পা ছুঁয়ে বসে থাকি। আর দেখি হারিয়ে যাওয়া মাটির সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম গঞ্জের মেলবন্ধন ও আত্মিকতা ও হারিয়ে গেছে সময়ের তালে তালে। গ্রাম থেকে যখন আবার কলকাতায় ফ্রি পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি আমার শৈশব হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পাড়ার সঙ্গী সাথী ভাই বোন মা-বাবারা এই রাস্তায় হেঁটেছে দৌড়িয়েছে খেলেছে। মনে হয় তারাও যেন খেজুর গাছ, বাবলা গাছ, অর্জুন গাছের ফাঁক দিয়ে আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। আর বলছে ফিরে আয় দাদা ফিরে আয়। সময়ের সাথে সাথে জীবন থেকে যেমন হারিয়ে যায় আনন্দ, খুশি, উৎসব তেমনই হারিয়ে গেছে মেঠো, গাছ-গাছালি দাপিয়ে বেড়ানো  শৈশব।