Sunday, September 1, 2024

 



জীবন যেমন 

জনা বন্দ্যোপাধ্যায়

আজ শহরের অডিটোরিয়ামে কবিতা পাঠের আসরে  দীপশিখা সেন কবিতা শুনতে গেছিলেন। সেখানে পরিচয় হয় এনজিও কর্মী হেমন্ত রায়ের সঙ্গে। হেমন্ত কবিতার একজন একনিষ্ঠ ভক্ত। হেমন্ত দীপশিখার ফোন নম্বর নেন। মাঝে মাঝেই গল্প হয় দুজনের। ক্রমশঃ গড়ে ওঠে তাঁদের সম্পর্ক। দীপশিখা নিজের ছেলে টুবলুর কথা হেমন্তকে বলেছেন। হেমন্ত টুবলুকে দেখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। 
           দীপশিখা তাঁর স্বামী সমীরণের ইচ্ছা মতো ঘরোয়া স্ত্রী হতে পারেননি। প্রায় দশ বছরের বিবাহিত জীবন তাঁদের। দীপশিখা শুধু কবিতা শুনতে ভালবাসেন না, একটু আধটু লেখেন। নার্সিং পাশের পর দীপশিখার বৃদ্ধ বাবা চেয়েছিলেন মেয়ের বিয়েটা তাড়াতাড়ি দিতে। সমীরণের ব্যাটারির দোকান, নিজস্ব ব্যবসা। পাড়ায় খবর নিয়ে জানা গেছিল চরিত্র ভালো। সমীরণ পাত্র হিসাবে হয়তো খারাপ নন, কিন্তু দীপশিখার সঙ্গে রুচি ও মানসিকতার খুবই তফাৎ। দীপশিখা পেশায় নার্স। তাই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আছে। একদিন সমীরণকে দীপশিখা সরাসরি বলেন," আমাদের মধ্যে শুধু দূরত্ব বেড়ে চলেছে। তুমি চাইলে আমরা আলাদা হতেই পারি।"
সমীরণ যে এত তাড়াতাড়ি রাজী হয়ে যাবেন ভাবতে পারেননি দীপশিখা। সমীরণের বেঁটে ছোটখাটো চেহারা, সে তুলনায় দীপশিখার ছিপছিপে লম্বা গড়ন। পাশাপাশি দুজনকে মানায় না এ কথা ভেবেই সমীরণ দীপশিখার সঙ্গে কোথাও যেতে চাইতেন না! একটা হীনমন্য ভাব কাজ করতো। তবু পুরুষ ইগো কম নেই!
কিছু মাসের মধ্যে ডিভোর্সের পর হেমন্তের সঙ্গে একই শহরে নতুন সংসার পাতেন দীপশিখা। হেমন্ত রায়ের শৌখিন রুচির পরিচয় দীপশিখা আগেই পেয়েছেন। ব্যালকনিতে নানান ক্যাকটাসের টব। হেমন্তর বয়স বছর পঁয়ত্রিশ, দীপশিখার থেকে দু বছরের ছোটই হবেন হয়তো। সমীরণ যতটা রুক্ষ স্বভাবের ছিলেন, হেমন্ত ততটাই রোমান্টিক স্বভাবের মানুষ! বেশ স্মার্ট, ফিটফাট থাকা পছন্দ করেন।
        দীপশিখার প্রথম পক্ষের ছেলে আট বছরের টুবলুও কবিতা ভালবাসে। কোর্টে টুবলুকে নিজের কাছে রাখার কথা দীপশিখাই বলেছিলেন। সমীরণ আপত্তি করেননি। তবে দীপশিখা টুবলুকে মাঝে মধ্যে সমীরণের কাছে পাঠান। এটা তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে মনে করেন।
      সারা বাংলা আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় টুবলু অংশ নেয় এবং প্রথম হয়। স্টেজে পুরস্কার নিতে উঠে টুবলু হেমন্ত রায়ের উৎসাহ দানের কথা বলে স্টেজে হেমন্তকে ডাকে। দীপশিখার আনন্দাশ্রু বাধ মানে না! দীপশিখা টুবলুকে হেমন্তকে কাকু ডাকতে শিখিয়েছেন।
                 দেখতে দেখতে টুবলুর বয়স ষোল পেরিয়ে সতেরো। সংসারের খরচ বেড়েছে। কিন্তু হেমন্তের কোনও ভাবোদয় নেই। আর একটু বেশী সংসার খরচ দেবার কথা দীপশিখা তাঁকে নিজে মুখে বলতে পারেন না। একতলা বাড়িটা হেমন্ত রায়ের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। তাঁর এক বোন আছে। মুম্বাইতে বিয়ে হয়েছে। হেমন্তর বাবা বাস দুর্ঘটনায় মারা যান। কোর্টে চাকরি করতেন। এর পর মাও বেশী দিন বাঁচেননি। রক্তাল্পতা গ্রাস করেছিল। ব্যালকনির ক্যাকটাসগুলোর দিকে তাকিয়ে দীপশিখা ভাবেন শুরুটা ঠিকঠাক হলেও তার সাজানো সংসার ধীরে ধীরে  আধুনিক কবিতার মতো বিমূর্ত হয়ে যাচ্ছে, স্পন্দন হারাচ্ছে। ব্যালকনি থেকে ধূসর পৃথিবীটা দেখেন দীপশিখা! সত্যি মানুষ কত বদলে যায়! সমীরণকে দীপশিখা বুঝতে পারতেন। সমীরণের হীনমন্যতার কারণ জানতেন। কিন্তু হেমন্তকে দীপশিখা পুরোপুরি বুঝতে পারেন না! হেমন্ত যেন ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকেন। আজকাল কবি সভায় আমন্ত্রণ পেলে কোনও না কোনও অজুহাতে দীপশিখার সঙ্গে যেতে চান না! হেমন্ত টুবলুকেও যেন এড়িয়ে চলেন। ব্যাপারটা টুবলুর চোখে পড়ায় একদিন দীপশিখাকে সরাসরি বলে," কাকু হয়তো আর আমাদের ভালোবাসে না!"
দীপশিখা টুবলুকে বুঝতে দিতে চান না। টুবলুর সুকুমার মুখের দিকে চেয়ে হেসে বলেন," না, না, এরকম কিছু ভাবিস না।"
টুবলুর মায়ের দিকে তাকিয়ে কষ্ট হয়। সারাদিন হাসপাতালে খাটনির পর ক্লান্ত শরীরে ফিরে রান্না ঘরে ঢোকেন দীপশিখা। মাকে একদিন টুবলু লুকিয়ে কাঁদতে দেখেছে। 
            দীপশিখা যে হাসপাতালে চাকরি করেন, সেখানে সমীরণ ভর্তি হন। গলায় ক্যান্সার, লাস্ট স্টেজ। সমীরণ নিজের জমানো কিছু টাকা টুবলুর নামে লিখে দিয়েছেন। দীপশিখা সমীরণকে ক্ষমা করে দেন। নিজের ভাগ্যকেই সব কিছুর জন্য দায়ী করেন। সমীরণের শীর্ণ চেহারা দেখে চেনা যায় না।  দু কামরার ভাড়া বাড়িতে কেউ দেখার নেই। নিজের প্রতি অযত্ন শুরু করেছিলেন। দু সপ্তাহ পর দীপশিখার চোখের সামনেই সমীরণ ইহলোক ত্যাগ করেন। টুবলু মুখাগ্নি করে। 
       কালের নিয়মে কয়েকটা মাস দ্রুত কেটে যায়। দেশে ভোট হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে। উষ্ণায়ন বাড়ে। কিছু কলকারখানায় উন্নত প্রযুক্তির মেশিন বসায় কিছু লোকের চাকরীও যায়। হেমন্তর চাকরীটা থাকলেও এত বছরে মাইনের সেরকম পরিবর্তন হয়নি। দীপশিখার থেকে ডিভোর্স চান হেমন্ত। তিনি দীপশিখার হাত ধরে বলেন,"শিখা,আমাদের মধ্যে সম্পর্কটা মরে গেছে। আমার সীমিত আয়। সংসারে বিশেষ টাকা দিতে পারিনি। তুমি প্রায় পুরো দায়ভার বহন করতে করতে বদলে গেছো। আমাদের কি আর একসঙ্গে থাকা উচিত? টুবলুও কেমন মন মরা হয়ে থাকে। ওর জন্য কিছুই করতে পারলাম না! তোমাকে বিয়ের আগে, তোমার টুবলুর দায়িত্ব নেবার আগে আমার বোঝা উচিত ছিল! সমীরণ আমাকে ক্ষমা করেছে কিনা জানি না!"
             দীপশিখাকে তাঁর বিবাহিত জীবনের দুটো অধ্যায়  হতাশা ছাড়া আর কিছুই দেয়নি! কিন্তু টুবলুর জীবন তো পড়ে আছে। ছেলেকে নিয়ে আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকতে শুরু করেন দীপশিখা। বাহান্ন বছরে এক অদম্য শক্তি নিয়ে চলেছেন তিনি। জীবনের ঢেউ আর কত আলোড়িত হবে জানেন না! তাঁদের ফ্ল্যাট থেকে যে শিরীষ গাছটা দেখা যায়, সেই গাছে প্রতিদিন কত পাখির আনাগোনা, তার পাশের পার্কে কত মানুষের হেঁটে চলা! জীবনের নিয়মে দিন কেটে গেলেও গ্লানি কি কাটে! দীপশিখা হেমন্তকে সহজেই ডিভোর্স দেন। হেমন্তের মতো দুর্বল প্রকৃতির মানুষ দীপশিখা দুটো দেখেননি। আসলে জীবন যে মুহূর্তে যেমন ভাবে ধরা দেয়,মানুষ সেরকম ভাবেই তাকে গ্রহণ করে! চেনা সুর কখন অচেনা হয় তা বোঝা যায় না!


 

শহর

অমিতাভ চক্রবর্ত্তী 

এ শহর, কি দিয়েছো আমায়? 
তীব্র দাবদহে খরার হুংকার,
জ্বলছে গলা, বুক, ভেতরে গ্রীষ্ম 
চামড়া ঝলসায়, পৃথিবী চৌচির।

অপমান, প্রতিশোধ, পাষাণ হৃদয়! 
নির্জনতাহীন পথ, তীব্র কোলাহল 
কারণে অকারণে ছুটে চলা 
অসংখ্য মানুষের ঢল...

শুধুই স্মৃতি ভরা মনে 
শেষের দিনগুলো উদাস কাটছে, 
শরীরে তাই ক্রমশ জমেছে 
ধোঁয়াশা, ব্যাথা, জরা, দুঃখ।


 

অর্ধেক বয়সের নিজের সঙ্গে কথোপকথন:১

লিপিকর

অর্ধেক: শহর ছেড়ে চল্লুম, বুঝলে! সারা সপ্তাহ হোস্টেলের ঘ্যাঁট গিলে একটা গাঁয়ে ক্লাস করা … খুব মিস করি মহানগরের সিনেমা, অনুষ্ঠান, রেস্তোরা, লাইব্রেরিগুলো, কে জানে আবার কবে বইমেলা বা ফিল্ম ফেস্ট-এ আসতে পারবো! এত পড়াশুনো করার কোনো মানে আছে কিনা কে জানে!

আমি: আমিও মিস করি … এই শহর, বা বলা ভালো, এই শহরে বাস করা কিছু প্রিয় মানুষকে। কোনো বিশেষ অনুষ্ঠান বা জায়গা অতটা আর টানে না, যতটা ওই মানুষগুলোর সাহচর্য্য জড়িয়ে থাকে ভাবনাকে।

অর্ধেক: তবে পরীক্ষা না থাকলে প্রতি উইকেন্ডেই আসব, আসতেই হবে। নইলে হাঁপিয়ে মরে যাবো ওই কালচার-হীন গরু চরা ক্যামপাসে। তুমি কতদিন বাদে বাদে আসো?

আমি: গত বছরখানেকে মোটামুটি ২-৩ মাসে একবার এসেছি, কখনো আরও বেশী।

অর্ধেক: বলো কি? তুমি এবছর দুর্গাপুজো বা ক্রিস্টমাসের সময়ে এখানে আসো নি?

আমি: না: দুবারই অফিসে কাজের চাপ মারাত্মক ছিল এমন নয়, ঘোরতরভাবে চাইলে ছুটি ম্যানেজ করা যেত না তাও নয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই দুটো সময়ের কোনোবারই আসা হয় নি।

অর্ধেক: আমিও পুজোর সময়ে এই শহরকে খুব একটা পছন্দ করি না। ভিড়ভাট্টা, মাইকের উপদ্রব, চাঁদার উৎপাত। ম্যাডক্সের মামনিদের আড্ডায় আমার আর ইহজীবনে কলার তোলা হলো না। আচ্ছা, তুমি ফিল্ম ফেস্টের সময়ে এখানে ছিলে?

আমি: ছিলুম, ভেবেওছি, সিনেমা দেখতে বেরোবো, তারপরে কোথা দিয়ে দিনের পরে চলে গিয়েছে দিন, একটাও সিনেমা শেষ অব্দি দেখে ওঠা হয় নি! একজন ছোট্ট মানুষের সঙ্গে অননুযোগে সময় কেটেছে দিব্যি।

অর্ধেক:সেকী! বইমেলার সময়ে তো এখানে ছিলে জানি, তখন নিশ্চয়ই অনেক দিন গিয়েছো?

আমি: না: একদিনই মাত্র গিয়েছিলুম, ঘণ্টা দেড়েক ছিলুম, তার মধ্যেই মনে হচ্ছিলো, এসে আর কীই বা হবে, আর কোথায়ই বা যাবো। বেশ বোরিং আর ক্লান্ত লাগছিলো।

অর্ধেক: ধু-উ-উ-র! ফিল্ম ফেস্টে যাও না, বইমেলায় একদিন, মাথার চুলও তো দেখছি পাকছে, তুমি গুরু বুড়ো হয়ে যাচ্ছো!

আমি: হুঁ , আজকাল মাঝে মাঝে নিজের বা সবার ভ্যালু সিস্টেম নিয়েও চিন্তা ভাবনা করে ফেলি, তারপর নিজেই অবাক হয়ে যাই।

অর্ধেক: পু-উ-রো গোল্লায় গেছো। বুড্ঢা একটা। হোপলেস, জরদগব, বেকার। আমি কক্ষনো তোমার মতো হব না।

আমি: (নিশ্বাস ফেলে) বেকার হতে বেশি বাকী আর নেই। তবে বাকিগুলো পুরোপুরি ঠিক। আমিও কী আর আমার মত হতে চেয়েছিলুম? 


 

শহর জীবনে রবিবারের আড্ডা!
প্রদীপ কুমার দে

ভাবতে পারছেন কি আকর্ষণীয় বিষয়!
যারা আড্ডা মারেন তাদের বোঝানোর চেষ্টা অপ্র‌য়োজন। কিন্তু  যারা ব্যাপারটেকে নিয়ে অহেতুক জটিলতা করেন তাদের উদ্দেশ্যে বলি, সখাদ আড্ডা মানুষের মনকে এক সুন্দর প্রলেপ মাখিয়ে দেয় যা তাকে বেশ অনেকটা সময় ধরে 
উদ্দীপিত করে রাখে। আর কত কি যে জানা যায়, ভাল মন্দ মিশিয়ে তার ইয়ত্তা নেই। আজ সেইরকমই এক আড্ডার গল্প বলছি, যেখানে
ইয়ং জেনারেশন টোট্যালি স্পয়েল্ড।

প্রেক্ষাপট --- 
শহর কোলকাতা, পাড়ার চায়ের দোকান।দোকানদার -আবুল। ইঁটের দেওয়ালে টিনের চাউনি। চারটে বেঞ্চ ,একটা শক্ত চারপেয়ে টেবিল -যার উপরেই চা বানাবার সরঞ্জাম।
সময় - সকাল দশটা, রবিবার।

খরিদ্দার বলতে সাতজন পাড়ার ছেলে। কাঁচের গ্লাসে চা ধরে সময়কে ধরে রেখে আড্ডা, খিস্তিখেউড় আর খবরেরকাগজ নিয়ে টানাটানি।

এরই মধ্যে দূর থেকে আসা বিলাইতবাবুকে দেখেই শিস্ বাজিয়ে দিলো হরা মানে হরেন। শম্ভু চিৎকার করলো -- ওস্তাদ - গুরু আইতাছে - আইতাছে --।

মদন দাঁত কেলিয়ে দৌড়ে গেল। বিকাশ একেবারে জাপটে ধরলো, সমর প্রশ্নের মধ্যে -- কোথা থাকো তুমি গুরু?  এতদিন ?

উত্তর দেওয়ার সময় দিলো না। রাকেশ টেনে চেয়ারে বসালো বিলাইতকে। বাদল একগ্লাস জল এনে দিল তার মুখের কাছে।

বাইরে বাইরে ঘোরার গল্প বলে তাই বিলাইতবাবু।সত্যি মিথ্যা কেউ যাচাই করেনি।সবাই সুযোগ নিতেই ব্যস্ত। আদার ব্যাপারী জাহাজের খোঁজ করে না।

বিলাইত লুঙ্গি খুলে একপ্রস্থ ঝেড়ে, ঘুরিয়ে কোমড়ে বাঁধে, - শালার পোলা আমাগো খসাবার লগে এত বাহানা? ছমাস ছিলাম না এহানে, প্যারিশ ঘুইরা আইসলাম।

-- ওহঃ তাই কন ! আমরা সব চিন্তায় ছিলাম আপনার লগে, বহুদিন দেখি নাই -তাই। আর কিযে কন না? আমরা হোলাম গিয়ে আপনাগো বন্ধু না?  -সমস্বর প্রতিবাদ ওঠে।

হ্যাঁ, হ্যাঁরে হারামখোর, চা খাবি কইলেই হয়, তার আবার ফিরিস্তি মারা -- ও আবুল ভাই আট গ্লাস বানিয়ে ফেল --যত্তসব ফালতু!দিনেদিনে কি সময় আসলো, ইন্ডিয়ারে শেষ কইরা ছাড়লি তোরা সব, ইয়ং জেনারেশন টোট্যালি স্পোয়েলড!

এইতো গুরু এইডা শোনার লগেই না আপনার -এতনাম - বিলাইতবাবু।

চেপে যা  -তোরা খাতির না করলেও চা পাবি, কেন এর আগে পাস নাই ? -- স্বীকার যা।

চা আসে। সবাই গ্লাস ধরে। পাশ দিয়ে এক মহিলা যায়, সবাই হা করে তাকিয়ে থাকে---।

বিলাইত বাবুর নজর এড়ায় না।ভালো করে মেপে নেয় মহিলারে,  ঝারি মারা শেষ করে চিল্লায় -- ওরে  লাথখোর তোদের চোখ যে একেবারে তলানিতে রে । আমরাও ইয়ং ছিলাম রে, এই বদ স্বভাব ছিল না কোনোকালে। দিনেদিনে কি কাল আইসলো, ইন্ডিয়ারে শেষ কইরা ছাড়লি তোরা সব , ইয়ং জেনারেশন টোট্যালি স্পয়েল্ড! 


 

রাষ্ট্র শহর জীবন ও বসরাই গোলাপ
সন্তোষ ভট্টাচার্য


একটা রাষ্ট্রকে পিঠে করে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে নক্ষত্র
শতাব্দী ছাড়িয়ে তার ঘুমের ভিতর অরাজকতা
উটের মুখ থেকে ধ্বনিত হচ্ছে নিচারের নৈরাজ্যবাদ
দেহতত্বের সমুদ্র সুড়ঙ্গে দরজা খুলছে পলাতক পরাজয়
খুব ভোরে কুৎসিত শহর প্রসব করছে পিঙ্গল হরিণী
হত্যার পূর্ব মুহূর্তে মহৎ ভবিষ্যত যার ভাগ্যে লেখা ছিল
জীবন লুকিয়ে আছে বাঘের খাঁচায় স্পর্শ পেলে ফেটে যাবে
এই রাষ্ট্র, শহর, জীবনকে রাইসিন আর নাক্স ভমিকা দাও
বাঁচতে বাঁচতে মরবে অথবা মরতে মরতে বেঁচে যাবে
এখানে একটা সূর্য কোটি কোটি মৃত্যুকে দেখেছে
কিন্তু কোটি কোটি মৃত্যু একটা সূর্যকেও দেখতে পায় নি
অল্প আলোতে ধুলিস্যাৎ কর জীবন যেখানে প্রাণ নেই
ইরেজার দিয়ে মুছে দাও শহর যেখানে জীবন নেই
গুঁড়িয়ে ফেল রাষ্ট্র মধ্যবর্তী দ্রাঘিমা, বসাও বসরাই গোলাপ চারা
শান্ত এক শান্তিতে অল্প পাওয়ারের ব্লু লাইট সারারাত জ্বলবে


 

আমার শহর
রুদ্র 

আকাশ ছিঁড়ে নেওয়া বড়ো দালান
শহরের গা খুবলে দেওয়া বিজ্ঞাপন
কংক্রিট কার্পেটে মোড়া রাস্তা
ক্ষয়ে যাওয়া মূল্যবোধের জীবন!

পুকুর ভরাট; প্রোমোটারের হাসি
গ্রাস করতে করতে উধাও সবুজ!
দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেন; মশার কামড়
কর্তৃপক্ষের লম্বা চওড়া ভাষণ।

খাবার শূন্য পেট; গরীবের কৃৎকলা
দিনে দুপুরে খুন, ডাকাতি, হপ্তা
কাপুরুষ হয়ে বেঁচে থাকার আশা
হাসপাতালে উদাসীন ভুল চিকিৎসা।

ইঁদুরদৌড়ের ছুটন্ত জীবন
প্রকাশ্য রাস্তায় মানুষের মৃত্যু
মায়াহীন প্রস্তরলিপির বুক
নীতি অনীতির ক্লিশে রাজনীতি।

বস্তির নোংরা ঠাসবুনট বাঁচা
মধ্যরাতে নারীর মায়াবী হাসি
প্রমোদ পার্কের ছায়াঘোর
বুদ্ধিজীবীদের বিস্তর দায়িত্বজ্ঞান!

বিদেশে আশ্রিত সন্তানের বাবা-মা
খেটে খাওয়া মুজুরের ঘাম
উচ্চবিত্তের ঠান্ডাঘর ললিতকলা
ঘুণধরা নৈতিকতার ক্লীব স্বাদ!

মাতালের জড়িয়ে যাওয়া পা
পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারসাজি
বৃদ্ধাশ্রমে নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা
ঘুমিয়ে পড়া ঠিকানাবিহীন ফুটপাত।

সব, সব-ই; এ শহরের নানা হার!
আমার শহর সবই দেয় উপহার!


 

তুমিই সেই

গৌতম সমাজদার

তুমি আমার দীর্ঘ কবিতা
বেঁচে থাকার মতোই দীর্ঘ সুন্দর।
তুমি আমার খুব ভোরের শিশির ভেজা পথ,
সকালের তৃপ্তিকর উপোস ভঙ্গ ,
গ্রীষ্মের  তপ্ত দুপুরের  আলোচনা ।
সতর্ক থেকে তর্কের মালা গাঁথা ,
মারিজুয়ানা থেকে মরিচঝাঁপি!
সমস্ত অস্বচ্ছতা থেকে স্বচ্ছ ভারত।
কখনো বা রূপান্তরকামী দের বক্তব্য,
গোধূলির ভাঁজ ফেলা কপালে
ধর্ষণ বিরোধী মিছিলে , পাশাপাশি দুজনায়!
ঘাসে ভেজা চুড়িদার প্রতিবাদে মুখর
কখনো বা হৃৎপিণ্ড উপরে ফেলা মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের শাসানি!
কখনো কাশফুলের আগমনে
উৎসবমুখর তুমি, প্রসন্নতা আনে!
কখনো বা আকাশে ডানামেলা
পাখীর দিকে তাকিয়ে থেকে  হারিয়ে  যাও!
বিষন্ন লগ্নে আমার হাতে তোমার হাত।
বার্তা দাও, জাগো, ওঠো কিছু একটা করো-
এই পচা গলা সমাজ টার হৃৎপিণ্ড উপরাও!
বেঁচে  থাকা কে আরো সুন্দর করো
দুচোখে  তোমার জলের ধারা
আমার এই কবিতার শুরু আছে
কিন্তু অন্তহীনতার খোঁজে, আজ ও।


 

ধূসর শহর
সম্মিলিতা দত্ত

এই শহরে রাত নামে গভীর জলের মতো,
এই শহরে থেকে যায় পুরোনো সব ক্ষত।
ব্যস্ত রাজপথ ও অচেনা মানুষের ভিড়ে,
কিছুতেই পাই না খুঁজে আমার আমিটিরে।

এই শহরে প্রেম নেই, নেই কোনো ভালোবাসা,
নদীর ধারের ঠান্ডা হাওয়ায় স্রোতের মতো ভাসা।
এই শহরে জীবন যেন রুক্ষ মরুভূমি,
এই শহরে সবাই ' আপনি ', কেউ নয়কো ' তুমি '।

বিষন্নতা খেলা করে ধুলোপড়া পাতায়,
স্মৃতিগুলো টোকা মারে মনখারাপের খাতায়।
সন্ধ্যে হলে রাস্তার ধারে ল্যাম্পপোস্টের আলো,
কেউ বলে না তুলসীতলায় প্রদীপটা  জ্বালো।

এই শহরে নেই কোনো কথা বলার মানুষ, 
বাতাসেতে ভেসে বেড়ায় না-বলা কথার ফানুস।
জোৎস্নাময়ী রাতের দৃশ্য ধরা পড়ে না চোখে,
ছাদে উঠে রাতের আকাশে  তারা চেনাবো কাকে?

এই শহরে সর্ষে ক্ষেতে খেলে না তো কেউ আর,
কেউ বলে না হতে তার কবাডি পার্টনার।
সবুজ জীবন পাই না খুঁজে ইটপাথরের স্তুপে,
জীবন এখানে ধরা পড়ে কংক্রিটের রূপে।


 

নবদিগন্ত 
সঞ্জয় সরকার

তাঁরা তারার দেশে,   
রাত পোহায় আমাদের।  
তাঁরা তারায়  জ্বলছে,
আমরা দেখতে  পারছি কই?
ইতিহাসের অন্ধকার কোনে
লুকিয়ে যাবে নাতো?
 আবারও ডিবেট হবে,
বছর পরে; ঘোর চেঁচামেচি হট্টগোলে 
কোনও  সুবিধেলোভী 
কোথাকার ছবি কোথায় ইম্পজে? 
বদলে মত,পাল্টিবাজি কাকা তখন,,, 
হায় হায় একি লজ্জার!!! 
কুলোয় না মানবতার তুলা যন্ত্রে!! 
চাই না,,,,,,,,,,
মানি না,,,,,,,,,,,,
চলতে দেওয়া যায় না,,,,,,, বীভৎস রেওয়াজ। 
ব্যাষ্টির ক্ষণিক লভ্যতায় ভুলো না বন্ধু!  
গর্জে মত্তে উন্মাদনায় 
রুদ্র চন্ড  রুপে অকাল কালবোশেখীর 
 আহ্বানে ব্রতী হও নওজোয়ান! 
রণচন্ডী রূপে  তুমিই পথ দেখাও ব্রতচারিণী!
উল্কাখন্ড নিয়ে আসো হে অতৃপ্ত আত্মা, 
তোমার তড়িৎ স্পর্শে উজ্জীবিত হোক
চেতনার বজ্রমুষ্ঠি,, মুখে ফিরুক ভাষা প্রতিবাদের,,
জাগো জনার্দন 
জাগো ভগ্নী,জননী,,,,,,
ঐ যুগান্তরের ধ্বনি 
শুনি নতুনের বাণী 
"জীবনেরই জয় হবে জানি"


 

শহুরে জীবন

মজনু মিয়া 


অনেক বেশি ব্যস্ত সময় লোহার মতো শক্ত 
জীবনে খুব হিবিজিবি জল হয়ে যায় রক্ত। 
দিন পেরিয়ে রাত হলে নানান রকম চিন্তা 
চাল, আটা,সবজি সহ কত কিছুই কিন্তা। 

মাস পেরোলে বাসা ভাড়া গ্যাস, বিদ্যুৎ বিল
ছেলে-মেয়ের বেতন দিতেই হয়রান হয় দিল।
নয়া জামা নয়া জুতা রঙিন জীবন যাপন চাই
সকাল হলে বেরোতে হয় তা ছাড়া উপায় নাই।


 

শারদ অর্ঘ্য
মনীষিতা নন্দী

শহরটার গলিঘুঁজিতে, রাস্তায় রাস্তায় 
জমে আছে কাদাজল 
পঁচাশি হাজারে, হাজারে হাজারে পুজো হ'বে
ফুচকা আলুকাবলি থেকে মদের ফোয়ারা
ব্যান্ড, ড্রামস, ডিজে, কিছুই যাবেনা ফেলা
সাফাইয়ের কাজ চলছে, 
দু'দিন পর থেকে মনের ঘরে বাঁশ পড়বে
বড় শহরের ঘন প্যান্ডেল, ছোটো শহরে লঘু
বড় বড় শহরের সবটাই বড় বড়
জায়গায় জায়গায় বড় হোর্ডিং, পোস্টার,
কার্নিভালের রিহার্সাল, নাটক লেখা 
মিন্ত্রা, নাঈকা, সেলের ছড়াছড়ি। 
ডিজাইনার ব্লাউজ, সাথে হুডা বিউটি প্ল্যাটার,
মায়ের পুজো, কুমোরটুলি ঘুরে ঘুরে 
মেপে নিচ্ছে কোমর বুক
প্রাক পুজো উদযাপনে 
হাসপাতালে জ্বলছে মেয়ে
এক একটা মৃত্যুতে দশলাখ নিলামে ওঠে
ধর্ষণে বোনাস মেলে কিছু 
ছেষট্টি পল্লীতে মাটির প্রতিমা
নগ্ন ঘুরে বেড়ায় সারারাত 
সুতো থেকে মাটি; সব শাড়ী জলাঞ্জলি 
ডাকের সাজ ছিঁড়ে কেটে 
পোকাদের খাদ্য যোগায় সমাজ পেয়ালা
রাস্তায় বসে তিন যুগ বয়সী মেয়ে
এক হাতে প্ল্যাকার্ড, অন্যতে থালা,
গলা বুজে আসে ঝড়,
নবমী নিশিতে শিশুর আর্তনাদ,
পঁচাশি হাজারে নিরাপত্তা দাও একবুক,
দোহাই, আর এসো না মা!


 

তিলোত্তমার আর্তনাদ 
প্রাণেশ পাল 

এই শহরের ইট,কাঠ,পাথরের ক্লান্ত ডানায়
গোধূলির অস্তরাগে মুছে যায় দিনের দীর্ঘশ্বাস !
নিশি রাতের প্রতি পাতায় পাতায় ঝরে পড়ে
এই জীবনের বোবা কান্নার বেদনা !

এই জীবনের কত গল্প, কত উপন্যাস লেখা ছিল 
শহরের রাজপথে। রাজপথের অনন্ত রাত্রির 
ঝরা পাতার আলপনায় রক্তের তাজা দাগ !
এই শহরের বুকে-ই হল ইতিহাস লেখা 
তিলোত্তমার করুণ আর্তনাদে !
এই জীবনের অব্যক্ত চাওয়া পাওয়ার হিসেব মেটাতে
শত সহস্র তিলোত্তমা রাত জাগে এই শহরের রাজপথে !
বিষাদ-গ্রস্থ এই শহরের আকাশে বাতাসে 
ঝরে পড়ে তিলোত্তমার হৃদয় ভাঙ্গার বেদনা।

এই জীবনের অপূর্ণ ইচ্ছে অনিচ্ছে ভেসে গেল 
সপ্ত সিন্ধুর জলে,গঙ্গা, পদ্মায় ভেসে যায় 
শত বর্ণহীন দূর্গার কাঠামো !
এই জীবনের আবাহনের বিষন্ন সুরের মাঝে
সুর ভাসে ভাসানের মিছিলে --------
এই শহরের শত সহস্র দূর্গার হার না মানা কণ্ঠ 
বিচার চাই , বিচার চাই  , বিচার চাই !!


 

অনুভবে
কেতকী বসু

নতুন শাড়িতে স্বাচ্ছন্দ্য এলো না
আমাকে পুরানো সেই শাড়িটা দাও,
যেখানে অজস্র দাগ আর মলিনতার চিহ্ন লেগে আছে।
আমার গোপন যৌবনের প্রথম প্রেমের বেদনা,
জমা হয়ে আছে স্তরে স্তরে,
সেই কাপড়ে আমাকে জড়িয়ে নাও।


রাতের অন্ধকার যখন গোটা শহরকে নিশ্চুপ করে দেয়
সবাই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ,
আমি তখন পুরানো কাপড়ে নগ্নতা ঢাকি আড়ালে।
সস্তা প্রেমে বাহারি দুনিয়ায় বিজ্ঞাপনের ভিড়ে
জ্বলন্ত ঠোঁটে সিগারেট আর মিথ্যের সাজে,
আমি লজ্জায় মুখ ঢাকি পুরানো পরিধানে।
পুরানো কাপড়ে উত্তাপ খুঁজি ইথারে মিশে যাওয়া প্রেমে।
আমাকে ভালোবাসায় সেই কাপড় এনে দাও।


 

হাতুড়ির খুট খাট
অলকানন্দা দে


তোমাকে শোনাব প্রেমের কবিতা হে তিমির,
তেমন রাত্রি আর আসবে না।
অশান্ত নীহারিকা ক্ষতবিক্ষত অরুন্ধতী হতভাগা আকাশটার গায়ে।
অকরুণ আঁধারে ক্ষয়ে গেছে প্রেম, বলে না একটিও কথা।
হাতুড়ির শব্দে রাত্রিরা মুখ গুঁজে পড়ে থাকে।
বারোমাস চলে মৃত নগরী বোনা।
জোনাকিরা গেছে সহমরণে জোৎস্নার সাথে।
গাছ নেই ছায়া নেই ক্লান্ত হলুদ পাখি কার্নিশে কাঁপে।
বিমনা সে, ভাবে কোথায় পৃথিবী, ক্ষেত মাঠ ঘাস!
দৃশ্যের ক্ষুধায় কেঁদে ভাসে শুধু গরম বাতাসে।
রাতের কোলে নেই রাতচরা।
অনুরাধা রোহিণী যেন গত জন্মের মুহুর্তে ভেসে থাকা আলো।
ধনপতির হাতে গড়া এটা যে শ্মশানের দেশ।
উপরে আকাশ দেখি না। দেখি শুধু কুহকের আলো।
সারি সারি অপ্রেম অনুপ্রেরণার গলা টেপে।
সব শিশুকে প্রবীণ করে কংক্রিট কঙ্কাল।
এ কি পৃথিবী! নিরাশার হিসাব ডিঙিয়ে উঠে যায় ফ্লাইওভার। মিলিত হয় তাদের সমাজে।
আর একটিবার ওড়ার মতো একটুও আকাশ বেঁচে নেই ঘুড়ির জীবনে।১৭
কোনটা পূর্ব ঠিক করে দেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
তিমিরহননে কোরাসে মত্ত হাতুড়ি স্মরণীয় শতক এনেছে।
এখানে জীবন নিতান্ত পরিমেয়, কিচ্ছু করার নেই।


 

এই শহর, এই জীবন
শ্রাবণী সেন

এই শহর, এই জীবন দুজনে হাতে হাত রেখে চলে
ছোট বড় কত জানা অজানার গল্প দুজনে বলে।

আলো ভরা কত দিন এল গেল এই শহরের বুকে
জীবনের কত রাত কেটে গেছে পরম আদরে সুখে।

আবার কত না ঝঞ্ঝা বৃষ্টি দুর্যোগ এল ভারি
দেখেছে শহর মানুষ দাঁড়িয়ে জোট বেঁধে সারিসারি। 

আবার কখন পায়ে পায়ে চলে মিছিল শহর জুড়ে
এই শহরই তো জীবন তখন, থাকতে পারে না দূরে।

ইতিহাস কত কথা রেখে যায় সৌধে, পাথরে, ইঁটে
সযতনে তার কথা মনে রেখ যেন না কাটে তা কীটে।


 

খুলে রাখা খোলস ও নাগরিক জীবন
অঙ্কুরিতা দে

সকালের হাই তুলে, পরে নিই খুলে রাখা খোলস। অভ্যস্ত পায়ে নীল নাগরিক জীবন। জীবন এখানে বিবিধ ভারতী। দর কষে কিনে আনি আস্ত একটা শরীর। মৃত মাছ আমাদের পুষ্টি জোগায়, নিজেকে বিকিয়ে দিয়ে। 
আমরা পুষ্টি জুগিয়ে চলি অফিসের ক্যাশবাক্সে। 
আমরাই সন্তান উৎপাদনের কারখানায় লকডাউন ডাকি আর ব্যস্ত রাস্তায় ভরে থাকে তোমার কালচে দীর্ঘশ্বাসের মতোই মোটরের ধোঁয়া। 
গায়ে কী কালশিটে পড়েছে, অপমান জমে জমে? 
আত্মীয় হাতড়ে বেড়াই। সীমানা বুঝে ফিরে আসি। স্থান অসঙ্কুলান বড়, এ মায়ার শহরে। 
তারপরে এক খাবলা চাঁদ গলায় ঢেলে শোককে ঢেকে রাখি। আর খোলসের ভেতরের আমিত্ব মাখা কঙ্কালটাকে শুইয়ে দিই। যত্নে। বিছানায়।


 

জীবনের শহর
প্রতিভা পাল 

জীবনের কারুকাজ খোদিত 
এক-একটি শহরের শিলালিপি,
লিপিবদ্ধ উপলব্ধি।
রাজপথ, অলিগলি জুড়ে যেসব
ছড়ানো ছিটানো কত স্মৃতির ধুলোয়!
ধুলোর ইতিহাস, 
কত অনুভবের বসত সেখানে!
ঝুরঝুরে সময়ের কাফনে বন্দি অথচ
সেসব অতিন্দ্রীয় অধ্যায়। 
অধ্যাবসায়, আগ্রহ চিনতে শেখায় 
একটি শহরের যাপন,
জীবন্ত যাবতীয় জীবাশ্ম!  
বিস্মৃত বিস্তৃতির অলিন্দে উঁকি দিয়ে দেখি-
কিছু সংস্কার, কিছু সংস্কৃতি
মৃত্যু ছোঁয়নি আজীবন.......


 

বিচারের বাণী 

  নিতাই দে 

   রাত দখলে বজ্র মুঠি 
    একতাই হাতিয়ার,
   পথে নেমে নরনারী 
     বিচার চাই অভয়ার।

    ডাক্তার হোক বা সে ঝাড়ুদার 
     তোমার আমার ঘরে 
    আর অভয়া না হয় যেনো 
     কন্ঠ ছাড়ো জোরে।

    ক্ষোভে ফুঁসছে লক্ষ্মী-দুর্গা--
     সাবধান প্রতিবাদী !
    "ক্ষোভের আঁচে রুটি সেঁকে"
     লক্ষ্য যাদের গদি!

    অভাগী মা বিচার আশায়-- 
     বিচার পাবে সে কই?
    "বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে"
     অনাচারে থই থই।

    বদল আনো চিন্তা চেতন 
     লড়তে হবে খুব জোর,
    দুরাত্মা সব বিনাশ হবে 
     আসবে নতুন এক ভোর।


 

বদল 

মিষ্টু সরকার


এ সময় বড়ো অস্থির
এসময় বড়ো অচেনা 
এই রাত অনেক বড়ো
এ দিন নয়তো চেনা ।

সমাজের ধূলো ঝেড়ে ফেলে 
গড়ি জীবন শুদ্ধ চেতনাতে 
দেখা হোক তোমার আমার
 চেনা ফুটপাতে জনমতে ।।

অচলায়তন ভেঙ্গে ফেলো 
ভাঙ্গো বাস্তু ঘুঘুর পাঁচিল 
পায়ে পায়ে রাজপথে হাঁটে 
Want justice চাওয়া মিছিল ।।

এক আকাশ রক্ত মেখে 
বাতাস হয়েছে ক্লিষ্ট
আমরা জাগলে জাগবে রাষ্ট্র 
অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র ।।

রাষ্ট্র যদি ধর্ষক হয়
তুমিও তার একজনা
ধর্ষিতাদের রক্তে বাড়ছে
রাষ্ট্রের !! পাহাড় সমান দেনা ।।

সুখের চাদরে আর ঘুমিও না
ওঠো জাগো তিন সত্যি 
তোমার ঘরেও বাড়ছে দেখো
ছোট্ট ফুল এক রত্তি ।।

দিন বদলের স্বপ্ন দেখি
আমি অহর্নিশ
শুধু তোমার জিভের আগায়
কাল সর্পের বিষ !!

এ সময় বড়ো ছোঁয়াচে
এ রাত বড়ো গভীর
এ আশা যদি খুবই ক্ষীণ
তবু; উঠছে স্বর নাভির ।।


 


এবার তো জাগ মা

কনক চক্রবর্তী


চোখের জল শুকোক এবার,
আগুন জ্বলুক ত্রি-নয়নে;
বিসর্জনের বাজনা বাজুক,
মহালয়ার আগমনে।

আসবে না আর উমা এবার,
 এ নারকীয় পরিবেশে -
যে অঙ্গনে নরপশু
লালিত হয় ভালোবেসে।।

বিচার ভিক্ষা কোরো না আর,
মিলবে না তা এই জীবনে ,
চুনোপুঁটিরা পড়বে জালে 
তদন্তেরই কূট কৌশলে।।

রাঘব বোয়াল বুক ফুলিয়ে,
গভীর জলে মারবে ঘাই -
ধরবে তাদের? শাস্তি দেবে ?
সে সাহস যে কারো নাই !

তাইতো বলি, মায়েরা সব,
ভাবনা এবার গড়ো 
লজ্জা যদি থাকে তবে -
ভিক্ষার সব দান ছাড়ো !!

" বিচার চাই " বলতে গেলেই -
সন্তানেরা হয় বলি -
তারপরেও থাকবে নীরব ?
চোখতে এঁটে ঠুলি ?

সগর্জনে বলে ওঠো, 
চাই না তোমার সেসব দান 
যে দানেতে বিকিয়ে যায়,
কন্যার আজ মান-সন্মান !!

সিংহাসন তো শোভা নয় !
মায়ের বুকের আগুন থাক 
সেই আগুনে ক্ষমতাসীনের
উন্নয়ন নিপাত যাক !

যার আশ্রয়ে প্রশ্রয় পায় -
নর রূপী শকুনগুলি !
মায়ের রোষের ছুরির ফলা,
খুবলে ফেলুক চোখগুলি !

ভয় পাস না " তিলোত্তমা" -
তুই যে আমার কন্যাসমা ,
দিকে দিকে জ্বালবো আগুন,
জ্বালিয়ে পুড়িয়ে করবো খাক !!

প্রতিজ্ঞা হোক ঘরে ঘরে,
করব না কেউ এদের ক্ষমা,
পশুগুলো নিধন করে,
মৃত্যুতে হই মাতৃসমা ।।