ফোকাস: ভ্রমণ
পাতালপুরীর রাজপ্রাসাদে
সুদীপ মজুমদার
রাজপ্রাসাদই বটে, তবে সেটা আমাদের দেশ থেকে অনেক অনেক দূরে, সুদূর আমেরিকায়। ভার্জিনিয়া রাজ্যের লুরে শহরের পশ্চিমে সেনানদোহা ভ্যালিতে মাটি থেকে প্রায় ১৬৫ ফুট নিচে ৮০ একর জায়গা জুড়ে এই রাজপ্রাসাদ। গত ২৭শে জুলাই,২০২৪ আমাদের সৌভাগ্য হয়েছিল এই জায়গা ঘুরে আসার। ঐ সময় আমেরিকায় ভাইয়ের বাড়ি ছিলাম। ওখান থেকে সবাই মিলে আমরা প্রকৃতির এই আশ্চর্য বিস্ময় লুরে ক্যাভার্নস দেখতে এসেছিলাম।
আসলে লুরে ক্যাভার্নস পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক গুহা। প্রকৃতির অগাধ ঐশ্বর্যে ভরা আমাদের এই পৃথিবী। প্রকৃতির এই সৌন্দর্যৈর কোনো তুলনা হয়না। প্রকৃতির তেমনই এক কীর্তি এই লুরে ক্যাভার্নস। টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে আমরা লাইন করে সুশৃঙ্খল ভাবে প্রায় একশো মিটার হেঁটে ধীরে ধীরে গুহায় প্রবেশ করলাম। মূল গুহায় ঢোকার আগে দুদিকে দেওয়াল জুড়ে এই গুহা সম্পর্কে সবকিছু বিশদে ডিসপ্লে করা আছে।
আবিষ্কারের গল্প - লুরে ক্যাভার্নস আবিষ্কার করেন এন্ড্রু ক্যাম্পবেল, সঙ্গে তাঁর ফটোগ্রাফার বন্ধু বেনটন স্টেবিস ও তেরো বছর বয়সী ভাইপো কুইন্ট। তারা তিনজনই এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা। সেনানদোহা ভ্যালির বিস্তৃত এলাকা জুড়ে চুনাপাথরের উপস্থিতি তাদের আকৃষ্ট করে।১৮৭৮ সালের ১৩ ই আগস্ট গুহার কাছাকাছি এক গর্ত থেকে ঠান্ডা হাওয়া বের হয়ে আসছে দেখে ভেতরে কি আছে দেখার জন্যে এই তিনজন উৎসাহিত হয়ে পড়েন। শুরু হয়ে যায় ওনাদের গুহা রহস্য অভিযান। দেওয়ালে ওনাদের ছবিও রাখা আছে।
আরও যেসব তথ্য দেওয়া আছে তা হল এই গুহার দৈর্ঘ্য ২.৪ কিমি, ঘুরে দেখতে সময় লাগে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘন্টা ইত্যাদি। এন্ড্রু ক্যাম্পবেল সহ তিনজন আরো কিছু মানুষের সাহায্যে ওখানে খনন শুরু করেন। চার ঘণ্টা ধরে গর্ত খোঁড়ার পরে ওনারা একটা সুড়ঙ্গের খোঁজ পান। কিন্তু এই সুড়ঙ্গ দিয়ে ছোটখাটো চেহারার ক্যাম্পবেল ও কুইন্ট ছাড়া আর কারো প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না। দড়ির সাহায্যে কিছুদুর নামতেই ওনারা এক স্বর্গীয় দৃশ্যের সাক্ষী হলেন। গুহার অপার রহস্য দেখে দুজনেই কিছুক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে পড়েন।
নির্বাক হবার দশা আমাদেরও হয়েছিল। প্রকৃতির এই বিষ্ময়কর জগৎ স্বচক্ষে না দেখলে এর সৌন্দর্য অনুভব করা সত্যিই কঠিন। এই পাতালপুরীতে ঢুকে প্রথমেই মনে হয়েছিল প্রকৃতির এক আশ্চর্য সাজঘরে এসে পড়লাম। বিদ্যুতের আলোয় গুহাগুলো যেন ঝলমল করছে। অসাধারণ প্রাকৃতিক কারুকার্য ও রঙের খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে পড়তেই হয়। গুহার তাপমাত্রাও খুব আরামদায়ক। সৌন্দর্য বর্ণনা করার আগে একটু বলি কিভাবে গড়ে উঠেছে প্রকৃতির এই আশ্চর্য বিস্ময়। মাটির নিচে পাহাড়ের চুনাপাথর মেশানো জল গলে গিয়ে অসংখ্য স্টেলেকটাইট ও স্টেলেকমাইটের সাহায্যে এই গুহা গুলো তৈরি হয়েছে। স্টেলেকটাইট হল দানা বাঁধা ক্যালসিয়াম কার্বনেট। হাজার হাজার বছরের বিন্দু বিন্দু জল ও অন্যান্য খনিজ পদার্থ এর সাথে যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে জমাটবদ্ধ ক্যালসিয়াম কার্বনেট। এই জমাটবদ্ধ ক্যালসিয়াম কার্বনেট গুহার ছাঁদ থেকে নানা আকারে নীচের দিকে নেমে এসেছে। স্টেলেকমাইট আর এক প্রকার জমাটবাঁধা ক্যালসিয়াম কার্বনেট যা গুহার মেঝে থেকে ওপরের দিকে বেড়ে ওঠে।
এবার এই চোখধাঁধানো সৌন্দর্যের কথা একটু বলি। এই নীচের দিকে নামা আর উপর দিকে ওঠা এই দুটো পরস্পর মিলে গিয়ে অদ্ভুত আকৃতির স্তম্ভগুলো গঠিত হয়েছে। মনে হয় কারা যেন অপূর্ব কারুকাজ করা অনেকগুলো থাম প্রাচীন কোনো স্থাপনার থামের মত গুহার ভেতরে সাজিয়ে রেখেছে। গুহায় যে কত ধরনের স্ট্যালেকমাইট ও স্ট্যালেকটাইট মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে তার ইয়ত্তা নেই। গুহার কোথাও ছাঁদের কার্নিশ থেকে তোয়ালের আকারে পাতলা পাথর থরে থরে ঝুলে আছে , কোথাও বা তা ঝালরের মত ওপর থেকে ঝোলানো। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রঙের খেলা।
লোহা মেশানো পাথর থেকে এসেছে লাল রঙ, তামা মেশানো পাথর দিয়েছে সবুজ রঙ। এভাবে বিচিত্র রঙের পাথরের স্তম্ভ, জোড়া স্তম্ভ, জলপ্রপাতের মত ঝালরগুচ্ছ, ভৌতিক স্তম্ভ, ভাঁজ করা কাপড়চোপড়ের মত বৈচিত্র্যময় সব সৃষ্টি, কোথাও মন্দিরের চূড়া, কোথাও বাবা লোকনাথ, কোথাও আলখাল্লা পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কোথাও বা পাথরের ডিমের পোঁচ যা নির্বাক হয়ে মুগ্ধ চোখে শুধু দেখে যেতে হয়। তাও রীনা আর আমি মোবাইল ফোনে কিছু ছবিও তুললাম, যদিও জানি ছবি দিয়ে এই সৌন্দর্যের অর্ধেক ও বোঝানো যাবে না।
লুরে ক্যাভার্নস এর আরও একটি আকর্ষণীয় স্থান উইশিং লেক। সবাই তাদের মনের ইচ্ছা এখানে জানান দিয়ে যায়। গুহার এক জায়গায় চুঁইয়ে পড়া জল জমে এক কৃত্রিম সরোবর তৈরি করেছে, এর মধ্যে রঙিন কারুকার্যের যে প্রতিচ্ছবি দেখা যায় তাতে মনে হয় খুব গভীর সরোবর, আসলে এর গভীরতা দু ইঞ্চিরও কম। সত্যিই বিস্ময়কর। এই আলো ঝলমলে গুহার ভেতরে পাথরের অসাধারণ কারুকাজ ও রঙের অফুরন্ত খেলা দেখে কেমন যেন একটা ঘোরলাগা অবস্থায় আমরা ধীরে ধীরে গুহার থেকে মানে এই পাতালপুরীর রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলাম।
উত্তরের দেশ ডেনমার্কে
চিত্রা পাল
উত্তর দিকের দেশ বলতেই ধরে নিই পাহাড় পর্বত তুষারাবৃত পর্বতগাত্র আর তার সঙ্গে হাড় হিম করা শীত। তাই উত্তরবৃত্তের দেশে যাবার কথা উঠতেই বললাম, ‘ওরে বাবা খুব শীত’।আধুনিক নেটওয়ার্কের যুগে ওসব ধারনা টারনা দূরে রেখে যখন বাস্তবে দেখলাম,শীতকালে সত্যিই খুব শীত, কিন্তু বছরের বেশ কয়েক মাস আমাদের সহযোগী আবহাওয়া,মানে আমাদের এই গরমদেশের লোকের পক্ষে আর তা ভ্রমণের অনুকূল তখন যাবার তোড়জোড় শুরু কোরে দিলাম।এই সব শীতের দেশে মোটামুটি এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত থাকে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। এক ট্র্যাভেল কোম্পানির সহযোগিতায় স্ক্যানডিনেভিয়ান দেশগুলোতে ঘোরার ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেল।
ভ্রমণের ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেল মানে আমাদের ফ্লাইটের টিকিট রিজার্ভ হয়ে গেল।আমরা যাবো এমিরেটসের ফ্লাইটে মুম্বই থেকে দুবাই। তারপর দুবাই থেকে ডেনমার্ক। তারিখ চোদ্দই আগস্ট, ভোর সাড়ে চারটে।এদিকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে মহারাষ্ট্ জুড়ে নেমেছে ঘনঘোর বর্ষা। তা একেবারে ঘনীভূত হয়ে উঠলো ৭/৮ তারিখ নাগাদ। মুম্বাই শহর জলমগ্ন, জনজীবন বিপর্যস্ত। এদিকে আমরা উৎকণ্ঠিত,ঠিকঠাক সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছতে পারবে তো? দু একদিন পর থেকেই আবহাওয়ার উন্নতি হতে শুরু হল, আমরা আশায় বুক বেঁধে ১০ই আগষট তিস্তাতোরষায় পাড়ি দিলাম কলকাতা। ১২ তারিখে হাওড়া থেকে দুরন্ত ধরে মুম্বাই । মুম্বাই থেকে দুবাই হয়ে সোজা ডেনমার্ক।
ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেলো।স্থানীয় সময় একটা বেজে তিরিশ মিনিট নাগাদ পৌঁছুলাম। হোটেলের ঘরে লাগেজ রেখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম কোপেনহেগেনের পথে। প্রথমে এলাম টিভোলি গার্ডেনে।এখানকার বিখ্যাত পার্ক টিভোলি গার্ডেন। এই পার্ক ১৮৪৩ সালের ১৫ই আগষ্ট জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়।আমরা আবার সেই দিনেই এসেছি।এক অপূর্ব আলোকমালায় সজ্জিত পার্কে দর্শনার্থীর সংখ্যা ও ছিলো বেশি। এই পার্কে বাচ্ছা থেকে বয়স্ক সবার জন্য আছে নানান খেলার নানান মজার আয়োজন।
দ্বিতীয়দিনে সকালের প্রাতঃরাশ সেরেই শুরু হল ভ্রমণ পর্ব।প্রথমে এলাম রসেলবার্গ ক্যাসেলে।রজেলবার্গ ক্যাসেলের বাগানটাও বৃহত্ পরিসর যুক্ত। রেনেসাঁ স্টাইলে তৈরি এ বাগান তৈরি করেছিলেনChristien 4th সিক্সটিন্থ সেঞ্চুরীতে। এটাই এদেশের সবচেয়ে পুরনো অভিজাত গার্ডেন। আর একটা কথা। ডেনমার্কের রাজাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বেশ প্রাচীন। কলকাতার কাছে শ্রীরামপুরে ড্যানিশ উপনিবেশ ছিলো। ডেনমার্কের রাজা ফ্রেডারিখ 6th শ্রীরামপুর কলেজের থিওলজি বিভাগকে থিওলজিতে ডিগ্রীদানের বিশেষ সুবিধা প্রদান করেছিলেন। তার ফলে সেই ডিগ্রীর মান ছিলো তাঁর দেশের ডিগ্রীর সমমানের। আর সেক্সপীয়রের অমর কাহিনীর হ্যামলেট ছিলেন ডেনমার্কের রাজা। আবার ড্যানিশ লেখক হ্যান্স এনডারসনের রূপকথা (little Marmaid) মত্স্যকন্যার গল্প আমরা সবাই পড়েছি। সেই মত্স্যকন্যার ব্রোঞ্জ স্ট্যাচু দেখলাম সমুদ্রখাঁড়ির জলের ধারে এক প্রস্তর খন্ডের ওপর। এই মত্স্য কন্যার স্ট্যাচু যেন ডেনমার্কের প্রতীক। কোপেন হেগেন আগে ছিলো ভাইকিং মানে জলদস্যুদের মাছধরার কেন্দ্র বা গ্রাম। তারপরে পঞ্চদশ শতাব্দীতে এটি হয় ডেনমার্কের রাজধানী। এরপরে এলাম ক্রিশ্চিয়ানা প্যালেসে। এ ও ওই একই ধরণের। দুপুরে ড্যানিশ পেস্ট্রির ও কফির সাহচর্যে মুগ্ধ হলাম।
এই শহরে এসে একটা ব্যাপার দেখে মুগ্ধ হলাম, তাহলো এদের পরিবেশ সচেতনতা। অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে জীবনের সব পর্বে তার উপস্থিতি। সাইকেল যেহেতু পরিবেশ বান্ধব, পরিবেশ সহায়ক তাই সাইকেলের ব্যবহার বাড়াতে তার জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা সব রাস্তার সঙ্গে। শুধু তাই নয়, সাইকেল আরোহীকে পথচারী সবসময় তার চলার সুবিধা দেবে। সাইকেল আসতে দেখলে পথচারীকেই পথ থেকে নেমে তার চলার সুবিধা দেবে, সাইকেল থামবে না, এটাই নিয়ম। এখানে তাই সাইকেল চলেও তীব্র গতিতে। আর নাগরিকেরাও তা মেনে নেয় দ্বিধাহীনভাবে। এর পরে চলে এলাম জাহাজঘাটায়, জাহাজে করে সাগর পাড়ি দিয়ে আর এক দেশে যাব বলে।
একদা গোদাবরী তীরে
বেনারসের পথে পথে
ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য
বেনারস। আমাদের গতবারের পুজোয় উত্তরপ্রদেশ ভ্রমণের শেষ গন্তব্য। এই বেনারস বা কাশীধাম বাবা বিশ্বনাথের জন্য পরিচিত হলেও বেনারসে এলে বাবা বিশ্বনাথের আগে কাশীধামের রক্ষাকর্তা কালভৈরবের পুজো দেওয়ার রীতি। সেইমতো বেনারসে পৌঁছে প্রথম দিনের সকালেই আমরা গেছিলাম কালভৈরবের মন্দিরে পুজো দিতে যেটি বেনারসের বিশ্বেশ্বরগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত। গোধূলিয়া চৌক থেকে মন্দিরে পৌঁছতে টোটোতে প্রায় মিনিট কুড়ি লাগে। বেনারসে তখন উৎসবের সময়। পিক সিজন। তাই মন্দিরেও ভিড় ছিল যথেষ্ট। তবে ব্যবস্থাপনা বেশ সুষ্ঠু নিয়মমাফিক হওয়ায় দর্শনে সময় বিশেষ লাগেনি। এমনকি এই মন্দিরে দেখেছিলাম পুজো দেওয়ার লাইনে দাঁড়ানো ভক্তদের নিঃশুল্ক সেবাদানও করছেন অনেক স্থানীয় মানুষজন। উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন পুণ্যধামে এই নিঃশুল্ক সেবার মধ্যে নিয়মিত পথ পরিষ্কার ও গরমের কষ্ট দূর করার জন্য হাতপাখার হাওয়া দেওয়ার চল আছে। অযোধ্যার মন্দির ও রামপথে আমরা মূলত পথ পরিষ্কার ও হুইল চেয়ার সেবা দেখেছিলাম, আর, এখানে দেখলাম হাতপাখার ব্যবহার।
কালভৈরবের পুজো শেষে বেনারসের অলি গলি দিয়ে ঘুরে প্রায় আধ ঘন্টাটাক পরে আমরা গিয়ে নেমেছিলাম ব্রহ্মা ঘাটে। বেনারস প্রধানত ধর্মস্থান হিসেবে পরিচিত হলেও ইতিহাসের চেয়েও প্রাচীন এ শহর আসলে নিজেই এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এ শহর যতটা পুণ্যলাভের, ততটাই যেন নিজেকে নতুন করে চিনে নেওয়ারও। এখানে এলে তাই একবার হলেও পুরনো বেনারসকে মাকড়সার জালের মতো ঘিরে থাকা সংকীর্ণ, অপরিসর, এঁকে বেঁকে দূর থেকে দূরে হারিয়ে যাওয়া ঘিঞ্জি ঘিঞ্জি গলি ধরে হেঁটে বেড়ানো বড় জরুরি বলে আমার মনে হয়। একটি কি দুটি মাত্র মানুষের চলাচলের মতো উপযোগী এইসব গলিগুলিতে সাধারণ পথচারী মানুষদের পাশাপাশিই আবার অবলীলায় চলে বেড়াচ্ছে অসংখ্য রিকশা, স্কুটার, বাইক, টোটো, সাইকেল, ঠেলাগাড়িও। একটু পরে পরেই ইতিউতি স্থানীয়দের আড্ডা, জটলা, পুজোপাঠ। গলির দু’ধারের আকাশছোঁয়া পুরনো সব দুর্গসম বাড়ির অনেক ভেতর থেকে ক্ষীণ স্বরে ভেসে আসে তালে তালে পানের তবক তৈরির অদ্ভুত শব্দ, বেনারসের বিখ্যাত সঙ্গীত ঘরানার রেওয়াজি সুর ও নানা প্রকারের চেনা অচেনা বাদ্যের আওয়াজ। প্রতিটি পথের বাঁকেই আবার আছে বেনারসের ভোজনবিলাসী মানুষজনের সারাক্ষণের সঙ্গী বেনারসী পানের ছড়ানো খোলামেলা ধাঁচের অত্যন্ত পুরনো সব দোকান, পথের এখানে সেখানে বিশ্রামরত বা হেলেদুলে বিচরণ করা গোমাতার দল। এই বেনারসেই আবার সার সার বাড়ির দেওয়াল জুড়ে চোখে পড়ে অপূর্ব নিখুঁত হাতে আঁকা রঙবেরঙের ধর্মীয় চিত্রের আশ্চর্য বাহার। অযোধ্যা ও লক্ষ্ণৌতে সাধারণ রাস্তায় এ ধরনের দেওয়াল চিত্র চোখে পড়লেও বেনারসের অলিতে গলিতে বাড়ির পর বাড়ির দেওয়াল জুড়ে চিত্রিত এইসব রঙিন ছবির মান ও বৈচিত্র্য সত্যিই অতুলনীয়।
বেনারসে নদীবক্ষে নৌকোভ্রমণের মাধ্যমে ঘাট পরিদর্শনের ব্যাপারটা আমরা এইদিন সকালেই করেছিলাম। কালভৈরবের মন্দিরে পুজো দিয়ে গলির পর গলি পেরিয়ে হেঁটে এসে রেলব্রীজ লাগোয়া ব্রহ্মা ঘাটে নেমে তার পরের ঘাট দুর্গা ঘাট থেকে ভ্রমণের জন্য নৌকো ভাড়া করি আমরা। বেনারসে ঘাটের সংখ্যা সর্বমোট চুরাশি। তবে সাধারণ আধ ঘন্টা থেকে মিনিট চল্লিশের নৌকোভ্রমণে এদিকে দুর্গাঘাট থেকে ওপাশের হরিশচন্দ্র ঘাট অবধি দেখিয়ে দশাশ্বমেধ বা পর্যটকদের সুবিধামতো অন্য কোনও ঘাটে যাত্রীদের নামিয়ে দেয় এরা। আমরা ভ্রমণশেষে দশাশ্বমেধ ঘাটেই নেমেছিলাম, কারণ, সেখান থেকে আমাদের হোটেলটি ছিল হাঁটাপথের দূরত্বে। বর্তমানে এই পথে মণিকর্ণিকা ঘাটের পরে বেনারসের নতুন ঘাট তৈরির কারণে ঘাটের পর ঘাট হেঁটে গঙ্গার শোভাদর্শন এখন বয়স্কদের পক্ষে বেশ অসুবিধাজনক হয়ে গেছে। ফলে আগে ওইভাবে হেঁটে হেঁটে ঘুরলেও এবারে দলে বয়স্ক সঙ্গী থাকায় নৌকোভ্রমণের মাধ্যমেই ঘাট পরিদর্শন করেছিলাম আমরা। বেনারসের এ অভিজ্ঞতাও অবশ্যকরণীয়। হেঁটে ঘোরার পাশাপাশি নদীবক্ষে ভ্রমণের এ মুহূর্তগুলোও সারাজীবনের অমূল্য স্মৃতি হয়ে থেকে যায়।
বেনারসে আমাদের প্রথমদিনের দ্বিতীয়ার্ধটি কেটেছিল দশাশ্বমেধ ঘাটের গঙ্গা আরতি দর্শন ও বিশ্বনাথ গলিতে কিছু পুরনো পরিচিত দোকানে বসে রাত্তির অবধি দেদার আড্ডা গল্প ও কেনাকাটিতে। আরতি আমি এযাবৎ মোট তিন জায়গায় দেখেছি, অযোধ্যায় সরযূজী আরতি, হরিদ্বারের আরতি এবং বেনারসের গঙ্গা আরতি। পূজাপাঠ ও নিয়মনিষ্ঠার দিক থেকে সবকটি আরতিই একই রকমের হলেও প্রতিটির চরিত্রই কিন্তু একে অন্যের চেয়ে বেশ আলাদা। হরিদ্বারের আরতিতে যেমন পুঙ্খানিপুঙ্খভাবে শাস্ত্রবিধি মেনে মন্ত্র ও শ্লোকপাঠই প্রধান, অযোধ্যার সরযূজী আরতি আবার সেই তুলনায় বেশ অনাড়ম্বর, সহজ এবং ঘরোয়া ধরনের। বেনারসের গঙ্গা আরতি ঐতিহ্য আড়ম্বর ও মাত্রার দিক থেকে এদের মধ্যে সবচেয়ে চোখধাঁধান ও জমজমাট। বেনারসের ভোর ও সন্ধ্যার এই গঙ্গা পূজন এবং আরতি বেনারসের বেশ কয়েকটি ঘাটে আয়োজিত হলেও দশাশ্বমেধ ঘাটের গঙ্গা আরতিটিই সবচেয়ে জনপ্রিয়। দশাশ্বমেধ ঘাটের এই গঙ্গা আরতি আয়োজন করে গঙ্গানিধি সেবা সংস্থা। আরতি সন্ধ্যে সাতটার আগে শুরু না হলেও বিকেল চারটের পর থেকেই আরতি দর্শনের জন্য ঘাটের ধাপে ধাপে লোক জমতে শুরু করে। দশাশ্বমেধ ঘাটের সুবিশাল প্রশস্ত অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আরতি দেখার পাশাপাশি নদীবক্ষে নৌকোতে বসেও এই আরতি দেখা যায়। এবারে আমরা নৌকোতে বসেই আরতি দেখেছিলাম। জনপ্রতি দুশো টাকার বন্দোবস্তে নির্ঝঞ্ঝাট আরতি দর্শন পদ্ধতি। তবে এক্ষেত্রে আরতি শেষ হতে না হতেই নৌকোওয়ালারা উঠে যাওয়ার জন্য তাড়া দিতে থাকে যেটা একেবারেই বাঞ্ছনীয় নয়। তাই আমার মতে একটু কষ্ট করে হলেও বিকেল বিকেল ঘাটে চলে এসে পছন্দমতো জায়গা নিয়ে বসে পড়লেই আরতিটি শুরু থেকে শেষপর্যন্ত নির্বিঘ্নে উপভোগ করা সম্ভব। বেনারসের এই গঙ্গা আরতির মূল আকর্ষণ এর মনোমুগ্ধকর অপূর্ব সুরেলা ভজন সঙ্গীত যার টানেই আমি যে ক’বার বেনারসে এসেছি প্রতিদিন বিকেলে নিয়ম করে ঘাটে এসে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছি আরতির জন্য। গঙ্গা মাইয়ার ভজন, শিব স্তোত্রপাঠ ও শ্রীকৃষ্ণ ভজনের এত মধুর মনোহর সঙ্গীত বৈচিত্র্য অন্য কোনও জায়গার আরতিতেই আমি পাইনি। সমস্ত বাহ্যিক আড়ম্বর বাহুল্য ও চোখধাঁধান ঐশ্বর্যময়তা ছাড়িয়েও এই মনকাড়া সঙ্গীতই দশাশ্বমেধ ঘাটের গঙ্গা আরতির আসল প্রাণভোমরা।
আরতি শেষ হয়ে ঘাট ছেড়ে বেড়োতে বেড়োতে প্রায় আটটা বেজেই যায়। দুর্গাপুজোর সময় গোটা বেনারসেই পর্যটকদের দারুণ ভিড় আর তার মধ্যে বাঙালি পর্যটকই সিংহভাগ। দশাশ্বমেধ ঘাটের আরতিতেও তাই পুজোর এই সময়টায় প্রতিদিনই ভীষণ ভিড় হয়। যাই হোক, আরতি শেষে ঘাট থেকে উঠে এসে কিছুক্ষণের জন্য সেদিন আমরা গেছিলাম বিশ্বনাথ গলিতেও। এই গোটা বিশ্বনাথ গলি জুড়ে বাবা বিশ্বনাথের মন্দিরের মূল ফটক অবধি দু’পাশেই রয়েছে সার সার বেনারসী শাড়ি, বেনারসী পান, বেনারসের বিখ্যাত ঘন দুধ ঘিয়ে তৈরি নানারকমের মনোলোভা সুস্বাদু সব মিষ্টি, পূজনসামগ্রী ও বাসনকোসনের অসংখ্য দোকান ছাড়াও হরেকরকম মণিহারী ও দৈনন্দিনের জরুরি জিনিসপত্রের ছোট বড় অজস্র দোকান। এখানে আগে বেশিরভাগ দোকানই ছিল বাঙালি মালিকানায়, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যবসার রাশ এখন সিংহভাগই চলে গেছে অবাঙালিদের হাতে। তবু এর মধ্যেও দাপটের সঙ্গে আজও টিকে আছে দাশগুপ্তের জর্দা ও আদি মোহিনী মোহন কাঞ্জিলালের শাড়ির দোকানটি। এর প্রধান কারণ হয়তো এনারা এখনও নিজেদের শেকড়ের বনেদী রক্তটাকে ব্যবসার রোজকার পাইপয়সার রূঢ় হিসেবের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেননি। আজও তাই দাশগুপ্তের জর্দার দোকানে গেলে কেনাকাটির চেয়েও নতুন কোনও মশলা চেখে দেখার পর্বটাই হয়ে দাঁড়ায় প্রধান। আজও কেবলমাত্র নির্লজ্জ ব্যবসা নয়, সম্পর্ক তৈরিতেই বিশ্বাসী এই পুরনো মানুষগুলো। এই নিখাদ আবেগের টানেই তো এই মাটিতে বার বার ফিরে আসা। এই তো আমার আসল বেনারস।
বেনারসের মন্দির চত্বর নতুন করে গড়ে ওঠার পর এই আমাদের প্রথম বেনারস ভ্রমণ। আগে যে ক’বার বেনারসে গেছি, বিশ্বনাথ দ্বার দিয়ে ঢুকে গলি দিয়ে এঁকে বেঁকে অনেকটা পথ হেঁটে এসে হয় এক নম্বর কি দু নম্বর গেট দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করেছি। একবার অবশ্য এই দুই গেটে অসম্ভব ভিড়ের জন্যে জ্ঞানবাপী মসজিদ লাগোয়া চতুর্থ গেট দিয়েও মন্দিরে ঢুকতে হয়েছিল। তবে সত্যি বলতে, ওই গেট দিয়ে যাতায়াত ভীষণই অসুবিধাজনক, এবং সেটা কেবলমাত্র পথটির অতিরিক্ত দৈর্ঘ্যের জন্য নয়, গোটা পথে অজস্র বাঁদরের উৎপাতই এর প্রধান অন্তরায়। আজ থেকে ছয় সাত বছর আগেও সেই সময়ের মন্দিরে যাঁরা ওই পুরনো চার নম্বর গেট দিয়ে ঢুকেছেন, কোনও না কোনওভাবে তাঁরা প্রত্যেকেই এ সমস্যায় ভুক্তভোগী। তবে এবারে গিয়ে দেখলাম এই চার নম্বর গেটটিকেই নতুন করে তৈরি করে একদম বড় রাস্তা থেকেই মন্দিরে প্রবেশের উপযোগী করা হয়েছে। এর ফলে প্রধানত বয়স্কদেরই অত্যন্ত সুবিধা হয়েছে, কারণ, আগে পুরনো সময়ের মন্দিরসংলগ্ন অপরিসর ঘিঞ্জি গলিতে একে অন্যের গা ঘেঁষে ঘেঁষে কষ্ট করে দাঁড়িয়ে যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হত মন্দিরে প্রবেশের জন্য, এখন এই নতুন ব্যবস্থায় সে সমস্যা একেবারেই মিটে গেছে। আকাশচুম্বী সুবিশাল চার নম্বর এই ফটক দিয়ে এখন নিয়ম মেনে সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ হয়ে মন্দির চত্বরে প্রবেশের সুব্যবস্থা। মন্দিরের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে এবং গোটা চত্বরেই অসংখ্য পুরুষ ও মহিলা রক্ষীর দল। ফলে নিরাপত্তা ও অন্যান্য সর্বপ্রকার সহায়তাও এখন এখানে সর্বক্ষণ উপলব্ধ। মন্দিরের ভেতরে জুতো বা মোবাইল ফোন কিছুই নিয়ে যাওয়া যায় না এবং এসবই গচ্ছিত রাখতে হয় বাইরে যেখান থেকে পুজোর ডালি নিতে হবে সেই দোকানেই। তবে পরে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখলাম অন্দরেও পুজোর ডালা সংগ্রহের সুবিধা আছে। এছাড়াও এবারই প্রথম মন্দিরসংলগ্ন গোধূলিয়া চৌক ও দশাশ্বমেধ রোড ধরে অসংখ্য হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা দেখলাম, মন্দির দর্শন ও ঘাটের আরতি দর্শনের জন্য যা যথেষ্ট সুলভে উপলব্ধ। অযোধ্যা ও বেনারস, উত্তরপ্রদেশের এই দুই প্রধান পুণ্যধামেই বয়স্ক ভক্তদের জন্য প্রশাসনিক তরফের এইসব সুচিন্তিত ব্যবস্থাপনা সত্যিই ভারী প্রশংসনীয়।
মন্দিরে বাবা বিশ্বনাথ দর্শনের দুইটি প্রকার আছে, স্পর্শ দর্শন এবং দৃশ্য দর্শন। এর মধ্যে স্পর্শ দর্শনের জন্য অনলাইন টিকিটের ব্যবস্থা আছে। তবে সে টিকিট কাটলেও রাত আড়াইটার মধ্যে গিয়ে পুজোর লাইনে দাঁড়াতেই হবে। কারণ, মন্দিরের গেট খোলে প্রতিদিন ভোর চারটেয় এবং স্পর্শ দর্শন বন্ধ হয়ে যায় ঠিক পাঁচটায়। এই এক ঘন্টার মধ্যেই টিকিটসহ এবং টিকিট ছাড়া সকল ভক্তরাই স্পর্শ দর্শন করতে পারেন। তবে টিকিট কাটা থাকলে দর্শন নিশ্চিন্তে ও দ্রুত হয় যা বেনারসের পিক সিজনের ভিড়ের সময়ে খুবই জরুরি।
নবনির্মিত এই বেনারসের বাবা বিশ্বনাথ মন্দিরের ভেতরে ঢুকে এবারে বেশ অবাক হয়ে গেলাম। মূল মন্দিরটিকে ঘিরে অনেকটা প্রশস্ত ছড়ানো খোলামেলা জায়গা তৈরি হয়েছে ভেতরটায়, যার চারপাশ ঘিরে ছোট ছোট অসংখ্য মন্দিরে নিয়মিত পূজিত হচ্ছেন অন্যান্য আরও নানা দেবদেবীও। মূল মন্দিরের পাশেই মা অন্নপূর্ণার মন্দির ও ভোজনালয়। সেখানে দর্শন সেরে সরু গলি ধরে হেঁটে খানিকটা গেলেই মণিকর্ণিকার ঘাট লাগোয়া গঙ্গাতীরস্থিত বেনারসের নতুন ঘাট। অনেকখানি জায়গা নিয়ে বেশ সুপরিকল্পিতভাবে বানানো সুদৃশ্য এই অংশটিতে পুজো ও দর্শন শেষে এসে বসে ভক্তরা বেশ খানিকটা সময় শান্তিতে জিরিয়ে নিতে পারেন। ভোরের নরম আলোয় এই ঘাট থেকে ভরা গঙ্গার ওপরে সূর্যোদয় দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই এক স্বর্গীয় অনুভূতি।
তবে এই এত সব ভালোর মধ্যেও যে দু একটি কাঁটা মনের মধ্যেটায় খচ খচ করতে থাকে তার একটি হল মন্দিরে প্রবেশের মুহুর্তে পূজনসামগ্রী দোকানের দোকানিদের অসম্ভব দুঃসহ ব্যবহার। পূজাসামগ্রীর ডালি কেনা নিয়ে যেরকম নির্লজ্জভাবে ভক্তদের ক্রমাগত বিরক্ত করতে থাকে এরা তাতে কয়েক মুহূর্তেই সাধারণ পুণ্যার্থীদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এ বিষয়টায় প্রশাসনের ভীষণভাবে নজর দেওয়া উচিৎ বলে আমার মনে হয়েছে। এই প্রথমবার বেনারসে এসে পুরীর পাণ্ডাদের অকথ্য বিশ্রি অত্যাচারের কথা মনে পড়ে গেল। আর যে জিনিসটা মনে অদ্ভুতভাবে এবারে ধাক্কা দিল সেটা হল মন্দির ঘিরে এই প্রবল উন্নয়নের জোয়ার। স্বাভাবিকভাবে দেখতে গেলে পুরনো অপরিসর সংকীর্ণ গলিপথ ভেঙেচুরে নতুন করে তৈরি এই প্রশস্ত মন্দির চত্বরে বয়স্ক পুণ্যার্থীদের ভীষণই সুবিধা হয়েছে, কিন্তু, সব দেখেশুনে কেন যেন মনে হল এর ফলে আদি প্রাচীন মন্দিরের সহজ ভক্তির ভাবটুকুই হারিয়ে গেছে চিরতরে। এ জিনিস ঠিক যেন বলে বোঝানোর নয়, যাঁরা সেই সময়ের পুরনো মন্দিরে গেছেন, ইতিহাসের চেয়েও প্রাচীন বেনারসের সেই সহজ আন্তরিক দৈবীভাবের মূল্যটা তাঁরাই বুঝবেন সঠিকভাবে। আসলে একটা ধর্মস্থান তো শুধু সেখানে পূজিত দেবতার মূর্তির উপস্থিতিতেই গড়ে ওঠে না, গড়ে ওঠে তাকে জড়িয়ে থাকা, ঘিরে থাকা, তাতে মিশে থাকা লক্ষ মানুষের অন্তরের বিশ্বাসে, তাদের হৃদয়ের সহজ যোগদানে। আজ পুরনো বেনারসের মন্দির ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা বহুযুগের পুরনো এক একটা গলি বাড়ি দোকানকে বুলডোজারের জোরে গুঁড়িয়ে দিয়ে যে নতুন ঝকঝকে মন্দির চত্বর ও ঘাট গড়ে উঠেছে তাতে অনেক আধুনিক সুবিধা আছে ঠিকই, কিন্তু স্বাভাবিক সেই অন্তরের যোগ, সেই প্রাণ যেন আর নেই। আশেপাশের বহুকালের পুরনো সেসব ফুলের আর পুজোসামগ্রীর ছোট্ট ছোট্ট কুঠুরির মতো এক চিলতে দোকান আর তার সদাহাস্যময় বাচ্চা বুড়ো দোকানী যারা অবলীলায় পেতলের ঘটভর্তি দুধ অচেনা দুঃস্থ ভক্তকে দিয়ে দিত বাবার মাথায় ঢালার জন্যে, কালের গহ্বরে যেন একেবারে নিশ্চিণ্হ হয়ে গেছে! এখনও মন্দির লাগোয়া বাইরের কিছু কিছু অংশে ভাঙাচোরা ক্ষত নিয়ে টিকে থাকা পুরনো কিছু হাভেলির অবশিষ্টাংশ পলকে ফেলে আসা অন্য এক বেনারসের কথা মনে পড়িয়ে দেয় আর চোরা একটা অস্বস্তির কাঁটা ক্রমাগত চিন চিন করে বিঁধেই চলে ভেতরটায়। তাই যত নির্বিঘ্নে, যত সহজেই এবারের বিশ্বনাথ দর্শন হোক না কেন, মন যেন ঠিক ততটা ভরল না। যত সময়োপযোগীই হোক, কিছু পরিবর্তন বোধ হয় সত্যিই কাম্য নয়।
বিশ্বনাথ দর্শন শেষে আমরা সেদিন গেছিলাম কোচবিহার কালীবাড়ি দেখতেও। বিশ্বনাথ মন্দিরের চার নম্বর গেট থেকে মিনিট কুড়ি টোটোতে গেলে সোনারপুরা বাঙালি মহল্লায় বড় রাস্তার ওপরেই অবস্থিত কোচবিহার রাজপরিবার দ্বারা নির্মিত ও পরিচালিত কোচবিহার কালীবাড়ি। অনেকখানি জায়গা নিয়ে তৈরি এই কালীবাড়ির দুটি মন্দিরেই এখনও নিয়মিত পুজো হয়। পাশেই আছে দ্বিতল একটি গেস্ট হাউসও, তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা এখন আর থাকার উপযুক্ত নয়।
আমাদের বেনারস ভ্রমণের শেষ দিনটি নির্ধারিত ছিল শহরের বিশেষ দ্রষ্টব্য কিছু জায়গা দেখার জন্যে যার মধ্যে পড়ে রামনগর ফোর্ট, দুর্গা মন্দির, হনুমান মন্দির, বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি ও ভারতমাতা মন্দির এবং সারনাথ। তবে কিছু অসুবিধার কারণে এগুলির মধ্যে এবারে আমরা শুধুই রামনগর ফোর্টই দেখতে যাই। কাশীরাজের আবাসস্থল এই রামনগর দুর্গটি ব্রীজ পেরিয়ে গঙ্গার অপর পাড়ে অবস্থিত। টিকিট কেটে ঢুকে মহলের পর মহল ঘুরে দেখলাম কাশী রাজপরিবারের সংগৃহীত এবং নির্মিত অসংখ্য মূল্যবান ও অপূর্ব কারুকার্যমণ্ডিত বিভিন্ন দ্রব্যাদি, যেমন, চিনেমাটি ও পোর্সেলিনের আশ্চর্য কারুকাজ করা ফুলদানি, প্লেট, বিভিন্ন আকার ও ভঙ্গিমার ভারী সুন্দর সব পুতুলের বিশাল সম্ভার, দেশবিদেশের দুষ্প্রাপ্য মণিমুক্তখচিত অপূর্ব সব দেওয়াল ঘড়ির সংগ্রহ, সোনার কারুকাজওয়ালা মূল্যবান মণিমুক্তো বসানো হাতির দাঁতের, কাঠের, পিতলের ও রূপোর তৈরি হরেকরকম হাওদা ও পালকি, বিচিত্র সব রকমারি অস্ত্রের বিপুল সম্ভার এবং দারুণ দেখতে বিদেশি সব গাড়ির মেলা। মুগ্ধ হয়ে এই বিপুল ঐশ্বর্য দেখতে দেখতেই একসময় দুর্গের লম্বা ঘোরানো সুরঙ্গপথ দিয়ে পৌঁছে যেতে হয় গঙ্গাতীরস্থিত রাজবাড়ির বাইরের অংশে যেখানে খোলামেলা বাহির বারান্দা ও সবুজে মোড়া প্রশস্ত লম্বাটে একটি অংশের মাঝেই বিরাজ করছে রাজবাড়ির বংশানুক্রমে পূজিত হয়ে আসা শিব মন্দির। লালরঙা পাথরে তৈরি সুদৃশ্য এই মন্দিরটিতে এখনও নিয়মিত পুজো হয়। রাজবাড়ির কিছুটা অংশ পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হলেও ভেতরের কিছু অংশে এখনও বসবাস করেন রাজপরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা। দুর্গের মিউজিয়ামে প্রদর্শিত দুষ্প্রাপ্য বিচিত্র সম্ভারের সাথে সাথে দুর্গের বাইরের গঙ্গার ধারের এই খোলামেলা অংশটির জন্যেও রামনগর ফোর্টে গেলে সত্যিই ভাল লাগে।
বেনারস মূলত ধর্মস্থান হলেও এর অনেকগুলো আলাদা আলাদা রূপ আছে যার খানিকটা খুঁজে পাওয়া যায় বেনারসের মন্দিরে মন্দিরে, খানিকটা দশাশ্বমেধ ঘাটের চোখ ও মনপাগল করা গঙ্গা আরতিতে, খানিকটা এর প্রাচীনস্য প্রাচীন বিশ্বনাথ গলির বিচিত্র সব শব্দে গন্ধে দৃশ্যে, খানিকটা আবার গভীর রাতের বেনারসের আলো আঁধারি পথে পথে বা গঙ্গাপাড়ের ঘাটের পর ঘাট ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে হেঁটে বেড়িয়ে। এবারে যে চারটে দিন বেনারসে ছিলাম তার মধ্যে বেশ ক’দিনই আমরা রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে চলে যেতাম দশাশ্বমেধ ঘাটে হাঁটতে। এখন বেনারসের মন্দির লাগোয়া নতুন ঘাট হওয়ার পরে দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে বাঁয়ে মানমন্দির ঘাট পেরিয়ে হেঁটে মণিকর্ণিকা ছাড়িয়ে ওপারে যাওয়া বেশ দুষ্কর। এর একটি প্রধান কারণ এই দুই ঘাটের মাঝে তৈরি নতুন ঘাটের বিশাল প্রাচীর, এবং, আরেকটি এবারের ভীষণ বন্যায় ঘাটের নীচের অংশগুলোর ভয়ানক ভাঙাচোরা অবস্থা। এমনকি এবারের ভয়াল বর্ষার কারণে নাকি ঘাটসংলগ্ন গঙ্গাপাড়ের বদলে ঘাটের ওপরের উঁচু ছাদেই শব সৎকার প্রক্রিয়া চলেছে দীর্ঘদিন। আমরা তাই রাতে মণিকর্ণিকার দিকে না গিয়ে দশাশ্বমেধ থেকে ডাইনে দ্বারভাঙা ঘাট, রাজা ঘাট আর মুন্সী ঘাট দিয়েই হেঁটে বেড়িয়েছি।
রাতের বেনারস শহরের রূপ সত্যিই আলাদা। এত শান্ত, এত কোলাহলহীন সেই পরিবেশ যে ঘাটের কিনারায় দাঁড়িয়ে গঙ্গার স্রোতেরও শব্দ গোণা যায় অনায়াসে। সারাদিনের কাজ শেষে স্থানীয় বহু লোক এ সময় ঘাটের পর ঘাট হেঁটে ঘরে ফেরে, সাধু সন্ন্যাসীর দল ইতি উতি ছড়িয়ে নিজের নিজের মতো আমেজে থাকে বুঁদ হয়ে, ভিখিরিরা ঘাটের বড় বড় ছাতার তলায় গরু ও কুকুরের পাশে শুয়ে থাকে নিশ্চিন্তে। চারিদিকে এ সময় শুধুই অপার অপার্থিব শান্তি, কোথাও কোনও ছন্দপতন নেই। বেনারস যে কত বিচিত্র ধর্ম জাতি ও চরিত্রের মানুষকে একইসাথে নির্বিরোধে পরম মমতায় আগলে রেখে প্রকৃত অর্থেই এক সর্বধর্ম সর্বমত সমন্বয়ের দুর্লভ উদাহরণ হয়ে উঠেছে, রাতের বেনারস না দেখলে বোঝা যায় না। এবং এই বহুস্তরীয় চরিত্রের জন্যেই বোধহয় এক এক মানুষ একেকরকমভাবে এ শহরকে খুঁজে পায় নিজের মধ্যে, আর তারপর, নিজের নিজের মতোন করে লীন হয়ে নিঃশেষে মিশে যায় এতে। একবার এ শহরের অন্তর্নিহিত এই অমৃত রসের সন্ধান যে পথিক পায়, তার গোটা অস্তিত্বটাই বদলে যায় সারাজীবনের মতো, আর তখন, এই রসের টানেই বার বার সে ফিরে আসে এই মাটিতে, নিজেকে বার বার নতুন করে খুঁজে পেতে। তেরাত্তির শেষে অবশেষে বেনারসের পালা সাঙ্গ করে যখন ঘরে ফেরার সময় হল আমাদেরও, প্রতিবারের মতোই এবারও যেন এ মাটিতে মনের একটুখানি টুকরো গেলাম ফেলে রেখে, যার টানে মনে মনে জানি আবারও আসব ফিরে, এই গঙ্গাতীরে, খুব শীঘ্রই। জয় বাবা বিশ্বনাথ।
প্যারিস
মাথুর দাস
কোন্ দেশটা সুন্দর আর
কোন্ দেশটা কুৎসিত,
কোন্ দেশে গরম বেশি
কোন্ দেশে বা খুব শীত !
তর্ক কথায় হারিস না
পারিস যদি প্যারিস যা,
মন জুড়োবে প্রাণ জুড়োবে
এমন দৃশ্য এবং সঙ্গীত !!
স্যেইন নদীতে প্রমোদ ভ্রমণ
মমার্তে দাও ঠেক,
চার্চ নতেরদেম, ল্যুভর, আর
দামেসনিল লেক ।
আইফেল টাওয়ারে
নাই ফেল যাওয়া রে !
ডিজনিল্যান্ডেও হরেক মজা,
দেখ্ ভাই দেখ্ !!











