Sunday, February 1, 2026


 

রাজমহল

বেলা দে

মেয়ের চাকুরীসূত্রে মালদা জেলার সামসী শহরে থেকেছি সাত বছর, প্রতিবেশীরা এতটাই মানবিক যে কয়েক দিনের মধ্যে আমাদের আপনজন হয়ে উঠেছে, বুঝতেই পারিনি ছোট্ট এক শিশুকে নিয়ে আমি ও মেয়ে বাড়িঘর ছেড়ে ৩০০ কি মি দূরে আছি,বিপদে আপদে সবসময় কাছে পেয়েছি। মেয়েকে সে পাড়ায় "নবোদয় সংঘ" নামে এক সাংস্কৃতিক সংস্থার সদস্য হিসেবে নিয়েছে, ওদের ব্যবস্থাপনায় নাটক নাচ সবেতেই অংশগ্রহন করে ছেলে মেয়ে। ওরা যখন মনস্থ করলেন একদিনের ট্যুরে বেরোবে প্রতিবেশিরা মিলে, বেড়াতে কার না ভালো লাগে, রাজি হয়ে গেলাম। বেরিয়ে পড়লাম ১০ই মার্চ। রবিবার উইক এন্ড সবাই যেতে পারবে, টান টান উত্তেজনা নিয়ে রওনা হলাম সর্বমোট ২০ জন। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গাড়ি উঠে পরলাম, যাব বিভাজিত বিহারের ঝাড়খন্ডের রাজমহল, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ছুটে চলেছে গাড়ি খুব ভোরে, আমাদের গাড়ির সাথে সাথে ছুটছে মুকুলায়িত আম্রকানন। জোরকদমে ঘড়ি আটটা ছুঁই ছুঁই যখন পৌঁছে গেল রতুয়া এরপরই খয়েরতলা, দেখতে দেখতে এসে গেল মানিকচক গঙ্গার ঘাট, ওপারে যাবার লঞ্চ তখনও ঘাটে ভেড়েনি। গঙ্গার পরপারে ঐতিহাসিক নগরী রাজমহল, লঞ্চ ছাড়ার নির্দেশিত সময় ১১ টা.

ঘাটপারের এক রেস্তোরাঁয় বসে চা জলখাবার খেয়ে একটু অপেক্ষা করতে না করতে এসে গেছে এসে গেছে বলে রৈ রৈ কান্ড জনতার, সব এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। ওপরে ওঠার খাড়া লোহার লম্বা সিড়ি, উঠতে গিয়ে প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত, পায়েও প্রচন্ডরকম ব্যাথা। আরেকজন প্রবীণ মহিলার একই অবস্থা, কর্তৃপক্ষ আমাদের দুজনকে নিচের তলায় কোনও মতে জায়গা করে দিয়েছে, বাকিরা সবাই ওপরতলায়। আসলে বহু স্থানীয় লোকেরা ওপারে যায় কর্মসংস্থানে। সর্বনিম্নে লোহার পাটাতনে অজস্র বোল্ডার বোঝাই লরী, যাত্রী বোঝাই ছোট গাড়ি, সেইসাথে আমাদের গাড়িটা। 

ভাবছিলাম কিভাবে এত ভার বহন করে লঞ্চ। যদিও আমাদের লঞ্চখানা বিশালাকায়, সে বয়ে নিয়ে চলেছে লোহার মোটা শেকলে বেঁধে আরও দুটি ছোট ছোট যাত্রীবাহী লঞ্চ। এদিকে গঙ্গা তখন উত্তাল ঢেউয়ের সাথে হেলেদুলে ঢেউ কেটে কেটে এগিয়ে চলেছে। যেতে যেতে এক সহযাত্রীর মুখে শুনলাম জাহাজমালিক বাচ্চু সিং। সে নাকি অগাধ সম্পত্তির মালিক, এমন ১০ খানা লঞ্চ ও জাহাজ আছে, বর্তমানে সে প্রবাসী। তার বাড়িটা দেখে নিলাম বিরাট বড় ঠাকুর দালান, অতিথি শালা, রন্ধনশালা পাথরের তৈরি নানা বিগ্রহ। সর্বংসহা গঙ্গা যেন বুকে করে দোল দিতে দিতে আমাদের বয়ে চলেছে মায়ের মতন করে। এ এক অন্য অনুভূতি, অনন্ত ভাললাগা। এই আনন্দে ভেসে ভেসে কাটিয়ে দিতে পারি কয়েক যুগ।এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট মায়ের নরম বুকে ভাসার পর অবশেষে পা রাখলাম রাজমহলের মাটিতে। ওপারে এক হোটেলে নানা ব্যঞ্জনে দিবাহার সেরে সে গাড়িতেই  রওনা হলাম, যেতে যেতেই দেখে নিলাম বৃটিশদের লালরঙা বহু উপনিবেশ, লাল পোস্ট অফিস,স্টেশন, থানা। স্টেশনের পাশেই চিনে মাটির কাপ প্লেট বাদন তৈরির কারখানা, ওদের শাসন কালে সব সামগ্রী কাঁচিয়ে নিয়ে যেত নিজেদের দেশে এমনটাই শোনা গেল স্থানীয় এক জনের কাছে, অথচ এদেশের শ্রমিকরা ঘাম রক্ত জল করে শ্রম দিয়েছে। নিজেদের কোনো পাওয়া ছিল না।সারাক্ষণ গাড়িতে বসে একঘেয়েমি ব্যাপারটা চলে এসেছে, গোধূলি সম্মুখ সমরে। গাড়ি এবার দৌড়ে চলে হিন্দু ধর্মের পবিত্র তীর্থস্থান বারহারওয়া "বিন্দুবাসিনী মন্দির,"যেখানে সতীমায়ের বিন্দু বিন্দু রক্ত পতিত হয়েছে, একান্ন পিঠের এক পিঠ। বার হারোয়া ঝাড়খন্ডের সাহেবগঞ্জ জেলায় অবস্থিত।  গঙ্গার গুরুত্বপূর্ণ স্থান,এখানে ভাগীরথী নাম নিয়েছে। 

ইতিপূর্বে আমার স্বামীর চাকুরী সূত্রে তিন বছর মালদায় ছিলাম ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সেসময় একবার এই মন্দিরে  এসেছিলাম, বর্তমানে অনেক পরিবর্তিত। পাশেই দেখে নিলাম ইস্কন মন্দির-এর পিছনেই গঙ্গায় নামার ১৫০ খানা সিঁড়ি রয়েছে। আমরা পারবো না ভেবে আর যাইনি। মন্দির লাগোয়া পার্কে খানিকটা সময় বসলাম। অস্তগামী সূর্যের লাল আভা গঙ্গায় বুকে, ঢেউয়ের তালে তালে দুলছে উত্তর বাহিনী গঙ্গা। রাজমহল একসময় সুবা বাংলার রাজধানী ছিল। এদিকে পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে। সবাই একবাক্যে স্বীকার, পেটে কিছু দেওয়ার। সুতরাং খাই খাই করে ফারাক্কা ছেড়ে মালদার এক স্বনামধন্য হোটেলে ডিনার সেরে ওয়ান ডে ট্যুরের ইতি।


 

কবিতা 


যেভাবে বাঁচি 

পরাগ মিত্র 


অতঃপর যজ্ঞবেদী চুরমার করে 
জয়দেব বসু দাঁড়াতেই 
হুড়মুড়িয়ে খসে পড়ল শৌখিন বর্ম 
সুডৌল উচ্চারণ, নিপুন অন্ধকারে 
পজিশন নেওয়া অক্ষরমালা 
অবাধ্য কবিতা হয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে 
আছড়ে পড়ছে বিদগ্ধ রুট মার্চে, 
সভাকবি ছুঁড়ে ফেলছেন অঙ্গবস্ত্র, 
চোখে চোখ রেখে 
বিদূষক সটান, “এ রৌরব কোন আমোদ নয় জাহাঁপনা”

শিরার গহিনে তখন রক্ত মাতাল উলুধ্বনি অবিরল দিগন্তের গাঁয়ে 

হেলায় ত্রিকাল কেনা হে বাঁশিওয়ালা 
এই যে আভুমি প্রণতি, সে শুধু ভান, 
বেঁচে আছি সর্বনাশ হাপরে বিছিয়ে 


 

আমাদেরও  জাগতে হবে
অশোক কুমার ঠাকুর



আমাদেরও জাগতে হবে,
জাগো জাগো জাগো রে ভাই
আর কতকাল, কাল কাটাবে
নাচন কোদন ছাড়ো রে ভাই

সংখ্যালঘু আছেন যারা,
কোন দেশে কে কেমন আছে
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখো
আজকে যারা যেমন আছে।

কাব্য চর্চা অনেক হলো
এবার বুকে আগুন জ্বালা
পুড়ছে নাকি বুকটা তোদের
সেই বুকে নেই  আগুন-জ্বালা!

ওপার বঙ্গে সংখ্যা লঘু
ভয়ে পাথর, বুকে চাপেন
এপার বঙ্গে সংখ্যা লঘু
সংখ্যা গুরুর বুকে চাপেন।

কোথায় গেলো বুদ্ধিজীবী
মহাকবি লেখকেরা
'চাঁদ' না ধরে 'কান্না' ধরুন
জাগুক সমাজ দেখুক এরা ।


 

বিন্যস্ত যাপন
রেবা সরকার


একদিন দুদিন তুমি আমায় বসতে দিলে। 
কিছু দিন চলল হাঁটা
জোরে কখনো ধীরে
যখন তাল মিলিয়ে চলি তুমি মুখ ফেরালে
তোমার মুখ কখনো মুখোশ 
আমি তোমার মুখোশ খুলে দিলাম। 

তারপর
বিন্যস্ত দিন যাপন
আমি আমার মতোন 
চোখের ভেতর বিরূপাক্ষ অমরাবতী।


 

কুলুঙ্গি 
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় 

উঠোনের লাল রঙ্গন এর থোকা গুলোর বয়স বাড়ে না
এবার খুব ইচ্ছে করছিল তুলসীতলার একমুঠো মাটি সাথে করে নিয়ে আসি।
দীপান্বিতা অমাবস্যার মহালক্ষীর আলোয় আলোময় হয়ে ওঠে গোটা উঠোন 
সজনে গাছের ছাঁওয়া পড়া কালো পুকুরের জলে 
বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে পুবের রোদ এসে পড়ে
কাঁচা পাকা এলোচুলে মায়ের হাসি ফুটে ওঠে পূর্ণিমা রাতে
এতটুকু ফিকে হয়নি সেই হাসি
আলোর বয়স বাড়ে না। 
মায়েদের হাসিরও  বয়স বাড়ে না
এখন কুলুঙ্গি ভর্তি শুধুই স্মৃতি।

আমাদের টিনের ঘরে একটা কুলুঙ্গি ছিল 
কত কিছু থাকত সেখানে
একটা চৌকি খাটে ছ'জন
নাঁচ,গান,গল্প,ছবি আঁকা কত কি
মাঝে মাঝেই মা বলতেন 
বুকের ওপর উঠিস না, অম্বল হয়েছে
একজন বলে উঠতো, আমি অম্বল খাবো।

শীততাপনিয়ন্ত্রিত লি মেরিডিয়ানের সাত তলায়
বেয়ারা একবাটি কুলের অম্বল রেখে গেল।
এখন কুলুঙ্গি ভর্তি শুধুই স্মৃতি।


 

গুচ্ছকবিতা
শিশির আজম


রেগে যেয়ো না বস


মেঘেরা ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। তাহিতির কুমারী মেয়েটারে ভিজায়ে পাহাড় নদী সাগর ডিঙায়ে ওরা এখন আমাদের উঠানে।

রেগে যেয়ো না বস। মাঝরাতেই বাক দিতেছে মোরগ। ভোর হইতেছে। আহা ভোর হইতেছে!

মাটিতে শীতের পাতা। অথচ গাছের শরীরে উঁকি মারতেছে কুঁড়ি। আর কি বলবো জন্তুজানোয়ারগুলার কথা, স্বামীসন্তানহীন যুবতী লাউডগার কথা -- ওরা এত্তো ভাল, এত্তো ভাল, পুরনো খবরের কাগজগুলারে পর্যন্ত সমীহ করে!

রোদের ভিত্রে ছায়া না ছায়ার ভিত্রে রোদ? অরা ঘুমায়া রইছে। অদের চোখ স্মৃতিতে রাঙা টকটকা। ঢেউগুলি আর বালুকণাগুলি নিজেদের ভিত্রে একটা কথা, কী কথা যেন আজও বইলা উঠতে পারলো না।

আর কুয়াশা। আর কুকুর, যেন অর ল্যাজ নাই, পাক খাইতেছে হুইস্কির খালি বোতলটারে ঘিইরা।





মাটি ছুঁয়ে


পুরো শীতকাল ভল্লুকের সঙ্গে কাটিয়ে
এই প্রথম আমি দেখলাম
শিকড়
মাটির নিচে

মাটির নিচে ছড়ানো
আর মাটির অনেক গভীরে

কতটা ছড়ানো আর কতটা গভীরে
কেউ
ঠিকঠাক বলতে পারবে না

এমন কি গাছও না
হ্যা স্বয়ং মাটিও না

কিন্তু এ তো ঠিক যে মাটি ছুঁয়ে গাছ
কত উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকে
দেখে মানুষ
মানুষের ভেতরকার রক্ত
রক্তের শিকড়
শিকড়
আঁকড়ে ধরে রেখেছে
নিয়ত অস্থির আর ঘুর্ণায়মান
পৃথিবীকে





ইন্দুবালা


তোমরা কি দেখেছো আমার ইন্দুকে
ও তো কিছুই দেখেনি
কিছুই বোঝেনি
ও কেবল গাইতে জানে

আমি দেখেছি ওর অন্ধকার
ওর কালো
তোমরা বিশ্বাস করবে না
ওই কালো কি কমনীয়
কি লাল
রক্তের মতো লাল





রাস্তায় লোকেরা


'রাস্তা ব্যপারটা ঝুঁকিপূর্ণ, বিরক্তিকর আর স্থিতিশীলতার শত্রু।' --
ভালমানুষেরা বলাবলি করে।

রাস্তায় (যেখানে এখন মৃতদের আনাগোনাও আপত্তিকর পর্যায়ে)
লোকেরা কথা বলছে
তাদের
রোদাঁর তৈরি মুখ।

পাখিদের নাড়িভুড়িভরা ঝুড়ি মাথায় লোকেরা চলে যাবে
বিশাল সব মনুমেন্টের গহ্বরে
থেকে যাবে উদবিড়াল
আর ঘাই হরিণীর কলস

বেশ আত্মবিশ্বাস আর গর্বীত ভঙ্গিতে একজন আইন প্রণেতা
সংসদে বললেন,
(বাংলায় গোলমাল হলেও
ইংরেজি উনি ভাল বলেন)
'রাস্তা আর আগের মতো নেই।'

কেন নেই?
কেন আগের মতো থাকবে?
রাস্তা কী করবে?
রাস্তা কী করবে?

আর যারা প্রতিদিন দেখে এ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম মাখা রাস্তাকে
তারা, বিভৎস কাকেরা?





প্রথমেই জানা দরকার বদলটা কীসের


একেকটা রাস্তার নাম তুমি পারো বদলে দিতে
কিন্তু ওরা বদলায় না
আর ওদের খিদেও কমে না

বরং তুমি গিয়ে বসো
ওদের রাতের অ্যান্টিসোশাল ক্যাফেতে
আর ক্যাফের টেবিলগুলোর মাতলামি
সহ্য করো

হ্যা মাতালদের পাল্লায় পড়ে
তুমি আবার গড়াগড়ি খেয়ো না মেঝেয়
মেঝেয়
জাফরান চাঁদের ফোঁটা
বিয়ারের ফোঁটা
রক্তের ফোঁটা
আর জানো তো এই ফোঁটাগুলোর
রকমসকম
কোনদিনই সুবিধের না



 

এক অজ্ঞাত বিকেল

অর্পিতা রায় আসোয়ার 


দ্বার রুদ্ধ করে দিব‍্যি ছিলেম
আপন খেয়ালী সুরে
একাকী মত্ততায়।

কষ্টসাধ্য জেনেও খুঁজে চলেছিলেম 
আলো
দুটো ঘন সন্নিবিষ্ট
পল্লবের মধ্যিখানে।

সহসা, এমন এক অজ্ঞাত বিকেল
এল দ্বারে
যার ক্রমাগত করাঘাতে 
সম্বিত ফেরে 
পর্বতপ্রমাণ জমে থাকা অভিমানকে 
দূরে ঠেলে 
অগ্রসর হই 
মুখোমুখি হই দুজনায়……..


 

মিরজাফর

উৎপলেন্দু পাল  


আপনার ঘরে ক'জন মিরজাফর, খোঁজ রাখেন জাঁহাপনা? 
পৃথিবীর বাতাসে এখন সন্দেহের পোড়া গন্ধ  
মুখ ও মুখোশ মিশে আছে একসাথে বেমালুম  
পোষা কুকুরও কখন 'ঘেউ' করে ওঠে বোঝা দায় 
সতর্কতার কোনও বিশেষ চরম বিন্দু নেই আজকাল  
সাজানো পুতুলগুলোর ভেতরেও মিরজাফরের খোঁজ করুন। 

আপনার ভেতরেও ক'জন মিরজাফর, জানেন কি জাঁহাপনা? 
ধমনীর রক্তস্রোতেও মিশে থাকে বেইমানির বিষ 
মুখের প্রসাধন সরে গেলে দেখা দেয় রক্তমুখ ক্ষত 
বেইমানির রক্তবীজ কখন যে রক্তে মেশে কে জানে 
চিরুণিতল্লাসীর ফাঁক গলে ঢুকে যায় কে কখন কে জানে 
একবার নিজের অন্দরেও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন নিয়োগ করুন। 



 

পথের পথিক
কেতকী বসু



যথেষ্ট বা পর্যাপ্ত বলে ধরে নেওয়া কথা গুলো
চোখের সামনেই কেমন যেনো ফাঁকা আর অলস মনে হয়
দুর্দিনের ঘরে ব্যথা হয়
পড়ে থাকা রাস্তায় রাশি রাশি ধুলো
ইঁট,পাথরের  কংক্রিটে মিশে গিয়ে
পথ হারালে
বেনামি পরিচয়ে  নতুন করে ভাব হয়

 রাস্তার গতিপথ মাপা হয় দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে

আড়ম্বরের চমকে পিচ্ ঢালা হলে রাস্তার
নূন্যতম হিসেব বদলে যায়
বহু সমাগম আর নতুনের সূচনায় পথ তখন
আপন খেয়ালে বুকে নিয়ে বেড়ায় জমানো আনন্দ
দরকারি সমস্ত কাজ খুঁজে নিয়ে হিসাব মেটায়
সরকারি দপ্তরে
তারপর যথেষ্ট নাম নিয়ে তর্ক চলতে থাকলে
মিথ্যা হয় অজুহাত আর সমস্ত পরিকল্পনা
সন্ধ্যার আলো জ্বলে উঠলে রাস্তার উজ্জ্বলতা বেড়ে যায়
মনে পড়ে অন্ধকার পথের সমস্ত অন্ধ কথা গুলো।


 

শ্রমণের পাঠ

অমিত আভা 


কতটা নত হলে
                         অহং ছাড়ে হাত—
এই প্রশ্নেই শুরু,
                        এই প্রশ্নেই শেষ।

বুদ্ধ সামনে,
                  পেছনে ব্রাহ্মণের ছায়া—
পা এগোয়, সংস্কার টানে।

প্রতিদিন বুকের ভেতর
                      একটুখানি আসে আলো,
নাম নেই, অবতারও নেই।

আলো চলে গেলে
                          আমি আবার যাযাবর—
কাঁধে অনেক প্রশ্ন,
                গায়ে রহস্যের পুরোনো চাদর।



 

সমুদ্র জীবন 
প্রতিভা পাল

অনন্ত সমুদ্র। অগাধ জলরাশি। অযুত ঢেউ।

         পার ভাঙা ঢেউগুলো বারবার গড়ে ওঠে অতল ছুঁয়ে ছুঁয়ে। নতুন রূপে। সমুদ্র কি খবর রাখে সেসব ভাঙা-গড়ার?
         পথ ভোলা নাবিক দিক হারিয়ে ভেসে চলে শুধু। একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত। অন্য দিক। ধৈর্যর পরীক্ষা যেন কোনও। নোঙর বাঁধে হয়তো কোনও দ্বীপে। সে কি ফিরে পায় তার গন্তব্য কখনও? 

         জন্মান্তর-বিস্মৃত জন্ম বেখেয়ালি সেই ঢেউয়ের মতো। পথ ভোলা নাবিকের মতো। ভেসে চলা খড়কুটোর মতো। যার উৎস, গন্তব্য নামহীন। তবু এগিয়ে চলা কেবল নিজের খোঁজে। আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন। সমর্পণ প্রয়োজন সমুদ্রর মতো গহীন জীবনের কাছে। অতল ছুঁয়ে আলো হওয়া প্রয়োজন। তবেই এগিয়ে চলা। তবেই গন্তব্য ছোঁয়া। 

         সমুদ্র খবর রাখে না। ঢেউ জানে ভাঙনের ব্যথা। নাবিক জানে পথ হারানোর অসহায়তা। জীবন জানে শুধু প্রবাহ.....


 

মা

নবনীতা (সরকার)


অজস্র মেয়ে জন্ম পেরিয়ে
উঠে আসে মা
মা নামে
ঈশ্বর এসে দাঁড়ায় শিয়রে
প্রশান্তির নিবিড় ছায়া মেখে নেমে আসে
এক টুকরো স্বর্গ ।

শতাধিক নদী জন্ম পেরিয়ে
উঠে আসে মা
মৃত্যু থেমে যায় দুয়ারে
মুছে যায় বিরহ, অনাদর আর..
বেদনার গভীর কালো দাগ ।

অনেক অনেক বৃক্ষ জন্ম পেরিয়ে
উঠে আসে মা
বিশ্বাসের বাসা বোনে পাখি
চোখে ভাঙা ভাঙা স্বপ্ন
বুকে প্রত্যয় ,থেমে যায় ঝড়

অজস্র মানবী জন্ম পেরিয়ে
থেকে যায় মায়েদের সর্বংসহা ,
অপরাজেয় অস্তিত্ব
আতঙ্কের আগুন ছাই চাপা পড়ে
ভাতের মিষ্টি গন্ধে
আলো হয়ে ওঠে 
কতগুলি চোখ,ঘর আর...
এক টুকরো সরল পৃথিবী ।


 

মানুষ পোড়া গন্ধ 

প্রাণেশ পাল 

পূবের হাওয়ায় মানুষ পোড়া গন্ধ 
হিমেল বাতাসে ধর্মীয় দীর্ঘশ্বাস 
আমাদের চেতনা ভারী হয়ে আসছে....

মানুষ পুড়ছে নাকি উগ্র ধর্মান্ধতা
পুড়ে যাওয়া ধর্মে খুঁজে ফিরি
আমাদের বিবেক, মনুষ্যত্ব, সংস্কৃতি....

আগুনের লেলিহান শিখা
লেখা থাকে না ধর্মের নাম
শুধুই পুড়ে যায় আমাদের অস্তিত্ব....


 

তমোহন হিয়াজ্যোতি

সম্রাট দাস 


পৃথিবী গভীর-ক্লান্ত! ব্যাপক ব্যস্ত! অস্থির!
খাদ্য-সংগ্রহরত পিঁপড়েটি যেমন ব্যস্ত!
উদ্দেশ্যহীন অথচ উদ্দেশ্যযুক্ত ব্যস্ততার অলীক মাথাব্যথা!
ভাবহীন জড়বাদী বৃথা কবিতা রচনা, 
অথবা ভাবনাহীন জড়তাগ্রস্ত নিষ্ফল সংগীত সাধনায়
ব্যস্ত কত শত প্রাণ!
চঞ্চল হৃদয়ে সুমিষ্ট রসপূর্ণ ফলের ছিবড়ে খাওয়ার ব্যস্ততা!
তামসিক ব্যস্ততা! 

এহেন ব্যস্ততা মাঝে কতিপয়ের হৃদয়ে নিভৃতে 
ঈশ্বর এসে অভয় দিয়ে যায়;
অমৃত রেখে যায় বুকের ভেতর! 
তারা শিউলি অথবা গার্ডেনিয়ার দৈব সুগন্ধ আস্বাদন করে 
সকরুণ-অমিয়-প্রফুল্লহৃদয় দিয়ে;
ব্যস্ততাতেও তৃপ্ত থাকে ব্যস্ত রবির মতো। 
তখন নির্গুণ কাব্য সাধনা অথবা সংগীত আরাধনায় মেতে ওঠে প্রাণ। 
তখন নিজেকে মনে হয় অনাবিল সূর্যকিরণ 
অথবা অমলিন সাগরকল্লোল।
তখন তমোহন হিয়াজ্যোতি এসে ঈশ্বরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়!


 

নরকভোগের পরে 

রাজু রায় 


এতসব উন্মাদনা এতসব বোধ বিরোধ
এতসব লালসা এতসব ঘৃণা
একদিন আগুনে আহুতি পাবে
তবে শেষ কি এখানেই
না এরপরেও বাকি থাকে কিছু
শুঁয়োপোকার প্রজাপতি তে বিবর্তনের মতো
পড়ে থাকে কী সুন্দর ,রঙিন মুক্ত গোটাজীবন
পঙ্কিল কদর্যময় জীবনের খোলস চিরে
ফুটবে কী সোনালী পদ্ম
যদি তা না হয় এরপরেও শতগুণে আবার ফিরে পাই নরক ভোগ
ক্ষুদার জ্বালায় পিতার বুক চিরে শুষে খাই রক্ত
তাড়নার বেগে আপন ভগিনীর স্তন যোনি ছিঁড়ে কামড়ে
শান্ত করি নিজপশুত্ব
তবে কী সার দেহের, কী সার চেতনার
দেহহীন চেতনাহীন আমি যেন মিশে থাকি বাইজীর ঘুঙুরের শব্দে বা বধূর সিঁথির অক্ষয় সিঁদুরে।


 

দেশদ্রোহী

শংকর হালদার 


ভদ্রতার সমাবেশ...
ভাষণে বর্বর শব্দ...
হাতে হাতে ওড়ায় দামাল মেঘ 
চোখে চোখে জন্মনেয় লোভীর ষড়যন্ত্র 
সমাজে কম্পজ্বর...

শিরায় শিরায় মৃত্যুর হুমকি
তীব্রনখে আলাপ জমায় ছিন্নস্বপ্ন 
ক্ষুরপায়ে ওড়ায় মিহিন সাদা ধূলো।

বিধির হয়ে ভাগ্য লেখে,
পিপাসায় আঁকে ক্ষতচিহ্ন...
দারুণ বিষণ্ণতায়...

হতাশার ঢেউ তোলে,
স্বজাতির পরিচয় ভোলে কোন মহিমায়?
যার জন্ম ও মৃত্যুর পরিচয় ভারতবাসী।

ওরা নিশান ওড়ায়...
ওদের ছায়া দেখা যায়...
ছায়ায় লেখে আপন নাম...
নামে আশ্রয় খোঁজে আপামরজনতা।

স্বাধীনতার গায়ে আঁকে কলঙ্ক
মৃত্যুর মিছিলে বদলায় রং 
শোকের ছায়ায় কঙ্কাবতীর গল্প...


 

ফেব্রুয়ারি তোমাকে...
আকাশলীনা ঢোল 

তোমাকে কিছু বলতে ইচ্ছে করছে আজ,
অনেককিছু জানাতে ইচ্ছে করছে,
কী জানাব? অভিবাদন? শ্রদ্ধা?
না প্রতিবাদ?
নাকি বরণ করে নেব নতুন বসন্তের 
পলাশ রাঙা ভোরে?
তুমি তো প্রণয়ের মাস, তোমার 
বুকে মাঝেমাঝেই জেগে ওঠে 
গোলাপ - টিউলিপের সৌন্দর্য, সবুজের 
সমারোহ, রঙের উৎসব।
আবার মাঝেমাঝে শুনতে পাই গুলির আওয়াজ -
ফাঁসির মঞ্চের আর্তনাদ কিংবা 
ভাষার লড়াইয়ে সামিল হওয়া বীর 
সন্তানদলের শোণিতের ভেতর থেকে 
উঠে আসা প্রতিবাদী স্লোগানও 
শুনতে পাই মাঝেমাঝে -
প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে তোমাকে তাই,
তুমি কে? তুমি কি পলাশের মাস?
নাকি বিপ্লবের?
তোমার সুকোমল সকালে বেকার প্রেমিকার 
বুকে জেগে ওঠে আগুন,
সন্তানহারা মায়ের চোখের শিশির জমাট 
বেঁধে বরফ হয়ে যায়,
তবু বনে বনে জেগে ওঠে কিশলয়,
পুঞ্জিত নীরবতা ভাঙতে তাকিয়ে থাকে 
শিমূল-পলাশ-মহুয়ার রক্তচক্ষু,
মন কেমনিয়া বিকেল নিয়ে আসে 
ফাল্গুনী হাওয়া -
মনে ধাঁধা লেগে যায়,
ফেব্রুয়ারি! তুমি কে? তুমি কার?
কীই বা বলার আছে তোমাকে? 


 

একটি  অভিমানোত্তর  সংবর্ধনার খসড়া 

আসিফ আলতাফ



আপনাকে সংবর্ধনা দেয়া হবে
অভিমানোত্তর সংবর্ধনা;

এনেছি কাঁচা হলুদ রোদ;
চুলের জন্য কিছু বুনো বাতাস  এনে রাখা হয়েছে
আপনার কেশরাশির উড়বার ইচ্ছে হলে তারা তা পূরণ করবে;

আঙুলের ডগায় জমা রেখেছি মৌন শিশিরের উত্তাপ
আপনাকে চাঙা রাখার জন্য
মূলত এসবের আয়োজন;

সংবর্ধনা হবে অথচ উত্তরীয় হবেনা  তা কি হয় বলুন;

মন খারাপ করবেন না
তারও ব্যবস্থ আছে,
একটি চড়ূইয়ের কাছ থেকে আমি মন ভালো রাখার উত্তরীয়
উইল করে নিয়েছি
ওটাই হবে আপনার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের শ্রেষ্ঠ চমক;

থাকবে আরো অনেক কিছুই
বলতে চাই না
বললে আর সারপ্রাইজ থাকলো কোথায়;

একটু ধৈর্য তো ধরতেই হবে
মাত্র একটা কালোজাম–রাত পার হলেই দেয়া হবে
এই  সংবর্ধনা;

আপনাকে এখন গণিত চর্চা বাদ দিয়ে সাহিত্য চর্চায়
মনোযোগী হবার পরামর্শ দিচ্ছি
কেননা অংক কষার জন্য এখন উপযুক্ত সময় নয়।




 

আফসোস

 মহঃ সা নো য়া র



আমাকে ছেড়ে গিয়ে তুমি যদি সুখী না হও,
তবে তোমার জন্য আমার আফসোস হবে।
কারণ ভালোবাসা ছিল নিঃশর্ত,
বিনিময়ে কিছু চাওয়ার সাহস আমার কখনো ছিল না।
আমি চেয়েছিলাম তোমার হাসি,
তা যদি আমার অনুপস্থিতিতেও না ফোটে—
তবে বুঝবো,
তুমি শুধু আমাকে নয়, নিজেকেও হারালে।
যে পথ তুমি বেছে নিলে মুক্তির নামে,
সেই পথে যদি শান্তি না মেলে,
আমার চোখ ভিজবে না অভিমানে—
ভিজবে শুধুই নীরব দুঃখে।
কারণ কাউকে ছেড়ে যাওয়া সহজ,
কিন্তু সুখকে বয়ে নেওয়া কঠিন।
আমাকে হারিয়ে যদি তুমি সুখী না হও,
তবে সত্যিই—
তোমার জন্য আমার আফসোস হবে।


 

স্মৃতি

মন্দিরা ঘোষ 


স্মৃতি যেন শ্বেত কুঞ্ঝটিকা মতো 
স্বচ্ছ তবুও যেন স্বপ্নের মতো আবছা 
সুন্দর মুহূর্তগুলোকে
 যেন ভালোবেসে আগলে রাখে স্মৃতি.

সময় বদলে যায় 
তবুও বদলায় না স্মৃতি 
স্মৃতি থেকে যায় চিরকাল মনের চোরাকুঠুরিতে
 সদা জাগরণ রূপে 
হয়তো সময়ের সাথে সাথে 
আবছা আলোয় ভরে ওঠে
 কিন্তু মন থেকে তা মুছে যায় কি কখনো?


 

স্বপ্নের চোখ খোলা 
বিজয় বর্মন 

অভাবের তাড়নায় স্বভাব নষ্ট,
জলের অভাবে জীবন,
সারা পৃথিবীটা ধূসর হলে,
দেখতে লাগে কেমন।
শোষন করেছে শোষকের দল,
পরে রয়েছে শুধু কঙ্কাল,
নদী নালা তো ফুঁ দিলেই শেষ,
সাগর হয়েছে বেসামাল।

কথারা হয়েছে চুপ,
কত কায়দা কানুন, সব যেন ফাঁদ,
একে অপরের দিকে শত শত মুখ,
নির্বাক কাটিয়ে দিচ্ছি ,দিন আর রাত।
শীর্ণকায় জোটের শরিক আমিও,
আমার স্বপ্নের চোখে জল,
এভাবেই ঝাপসা আর ধূসর পৃথিবীতে, 
জরিপ করি, ভাগ্যের ফল।

দোহাই বলে একটা শব্দ আছে সবারই তো,
যার যার ব্যক্তিগত,
নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করি আর কি,
ফারাক টা তো অনেক,শোষক আর শোষিত।
সমস্ত পৃথিবীর ভর মাথার ওপর,
বেশি বুঝি, না কি অন্য কিছু,
সংসার আর জগৎ সংসারে,
স্বপ্নেরা সব,দল বেঁধে আছে মাথা নিচু।



 

খবর

মাথুর দাস


ধন্দে পড়ি খবর দেখে,

সন্দ-জাগা মন

ক্যামনে বুঝি কোনটি খবর

কোনটি বিজ্ঞাপন !


কোন খবরটি টাকায় কেনা

কোন খবরটি চাঁচা,

চাপা খবর মাপা খবর

কাঁপায় বুকের খাঁচা ।


খবর যদি হয় ধারাবাহিক

তার আর সারবত্তা নাই,

গল্পে ঠাসা সে-ই সিরিয়াল

দেখে নাটকের মজা-ই পাই ।


 

রাত জাগা পাখি
মজনু মিয়া 

ওগো রাত জাগা পাখি তুমি জান নাকি
অঝোরে কেন গো আমার ঝরে দুই আঁখি।। 

কি বিরহ শোক বুঝে দুই চোখ 
হৃদয় কেন পুড়ে আমার 
ভাঙে পাঁজর বুক
কার বিরহ মলিনতা কারে বা ডাকি।।

কি দহন জ্বালা সয়ে যে একেলা
যন্ত্রণার পাহাড় বুকে ধরে 
গাঁথ শোকের মালা
আঁচল তলে লুকিয়ে যে জল রাখ ঢাকি।।


 

শ্রাবস্তীর কারুকার্য
মলয় চক্রবর্তী

সহস্র পথের ধুলো জমে আছে আমার জুতোর তলায়,
শত নদীর নাম মুছে গেছে পুরোনো খাতায়।
রাজত্ব ভেঙেছে, সভা মুলতুবি, যুদ্ধের ঢাক স্তব্ধ—
তবু পথ জানে, অপেক্ষাই মানুষের দীর্ঘতম অধ্যায়।
অন্ধকার কখনো শুধু শূন্য নয়, সে এক নিভৃত পাঠাগার,
যেখানে হারিয়ে যাওয়া কথারা ফিরে পায় উচ্চারণ।
আমি ক্লান্ত, অথচ ক্লান্তি শেষ কথা নয়—
শেষ বাক্য লেখা হয় শান্ত চোখের যত্নে।
তোমার হাসি কোনো দেশের মানচিত্র নয়,
তবু তুমিই আমার পথের রাজধানী।
দিগন্ত পুড়ে গেলে যখন নামগুলো ছাই,
তখন ভোরের আলোয় স্পষ্ট শুধু শ্রাবস্তীর কারুকার্য।
অপরিমেয় হাঁটার পর যদি কিছু বাকি থাকে,
তাহলে তা—দু’দণ্ড শান্তি, আর তুমি।


 

স্মৃতির আনাগোনা
মনোমিতা চক্রবর্তী

যখন আমি একলা থাকি 
চোখ বুঁঝলেই দেখি 
আমায় ঘিরে ভিড় করেছে 
অনেক অনেক স্মৃতি ।

ধুলো মাখা বারান্দাতে
আলতো রোদের ছোঁয়ায়
ছেলেবেলা নেচে বেড়ায়
ঘরের কোনায় কোনায়

কত প্রিয় মুখেরা আজ
জড়িয়ে আছে আমায় 
ন্যাপথলিনের আলমারি 
আর ছেঁড়া চিঠির পাতায় ।

একলা থেকেও, নইতো একা
জগত  স্মৃতি  ঘেরা 
আমায় ঘিরে থাকে সদাই
 আপন মানুষেরা।


 

অপূর্ণতার নাম প্রেম

চিরঞ্জিত মন্ডল


তুমি চলে যাওয়ার পর
ঘরটা আর ঘর থাকে না,
জানালার ধারে বসে থাকা আলো
আমাকে কিছুই বলতে পারে না।

তোমার ব্যবহৃত কাপটায়
এখনো ঠোঁটের উষ্ণতা খুঁজি,
জানি—এ এক অসম্ভব অভ্যাস,
তবু অভ্যাসগুলোই তো প্রেম।

রাস্তায় হাঁটলে
তোমার ছায়ার মতো কেউ একজন
হঠাৎ সামনে পড়ে যায়,
হৃদয় তখন এক মুহূর্তে
ভুল করে বাঁচতে চায়।

তুমি আর আমি—
এই দুই শব্দের মাঝে
এখন শুধু দীর্ঘশ্বাস,
কিছু না বলা কথা
আর অপেক্ষার কাঁটা।

তবু বলি,
যদি কোনোদিন ফিরে তাকাও—
আমাকে খুঁজো না,
আমার বিরহেই
আমি তোমাকে আজও ভালোবাসি।


 

প্রাণের স্পন্দন 

প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী 


নবারুণের দীপ্তিময়তায়,
  শীতের রঙিন ব্যঞ্জনা, 
   সিক্ত প্রাণের স্পন্দন; 
নতুন ছন্দের জীয়নকাঠিতে, 
 উদ্যমী আবেগের নিঃশ্বাসে,
 সৌন্দর্য বিভূষিত এক চিত্রপট,
                   চিরন্তন প্রবহমানতা- 
                 নানাবিধ বর্ণের ঝঙ্কারে ।।


 

যখন গান গাই

অঙ্কুর মহন্ত


এখন হাতে কিছু নেই তোমার কাঁদা শেষ হলেই আমার পালা,
কতদিন ধরে কাঁদিনা জানো
যখন গান গাই
বুকের ভেতরটা সারিঞ্জা হয়ে যায়।

সারিঞ্জা আসলে আমারই ভেতর বৃদ্ধ কঙ্কাল
তোমাকে মালা বানাতে বানাতে যোগিনী করে তুলি,
এতো জল কবে শেষ হবে!
জলে জল মিশলেই তো কান্না
কতদিন ধরে কাঁদিনা জানো

গানের মতো ফাফর শব্দ উপড়ে আসছে জিভ দিয়ে 
আমার সুর তোমার সুর ফুঁপিয়ে উঠে অশ্রুবাড়ির ভেতর।
সাদা পৃষ্ঠার মতো আর অল্প সহ্য করো
আজ যে আবার জ্বলে গেলাম
এ কান্না আমি কাঁদবো কখন।