Sunday, February 1, 2026


 

রম্য গল্প 


বেঁচে গেছি
প্রদীপ কুমার দে


গরম খুন্তির বারি,পাছায় ফচাং করে বসিয়ে দিল আমার এককালের হৃদয় হরণকারিণী বর্তমানের রণচন্ডী স্ত্রী দুলালি। প্রচন্ড রেগে আমার দিকে ধাবিত হয়ে হাতের খুন্তি আমার পেছনে বসিয়ে দিতেই আমি কঁকিয়ে উঠলাম,
--  ওরে বাপরে! মরেই গেলুম যে রে ... 

লাল চোখে আমার চুলের মুঠো ধরে রামখিস্তি চালাল সে,
--  মেরে মেরে হাড্ডি চুন চুন করে দেবো ....

আমার দোষ এমন কিছুই নয়। পাশের বাড়ির উঠতি কিশোরীর সাথে আমি একটু হেসেখেলে কথা বলেছিলাম। আর একটু  ইচ্ছে হয়েছিল তাই তো...

--  কি করছিলে ওই বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়ে?

--  ছিঃ ছিঃ কি সব বলো? এই সূর্যালোক আর ওই মেয়েটার সাথে কি করব?

--  তোমাকে আমার বিশ্বাস নেই। তুমি মেয়ে পাইলেই হল। আচ্ছা কিছু যখন করোনি তখন ওর বাচ্চার বাপের নামটি বলে ফেলো দেখি?

--  দেখো কান্ড! তুমি আবার কিছু বলে দিও না যেন। ও তো রণাদার মেয়ে। ওই জানে ....

--  বুঝতে পারলাম। ওই যে সুনীর কথা বলছো, কিছুদিন আগে যে বিয়ের আগেই অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিল সেটি কে ছিল?

--  না না, ওটা কিন্তু আমার ছিল না। ওটা সেই সুজনদার ছিল।

--  তবে রে হারামী তুই সব জানিস? তোর ছিল না? তুই কি করে বুঝলি?

--  মাইরি বলছি। আমার নয়। সুনী জানে ওটা ওই সুজনেরই।

ব্যাস হয়ে গেল। সব টেনে বার করে নিল মুখ থেকে। তারপর শুরু হল বেদম মার। কেলিয়ে কেলিয়ে আমায় দফারফা এক করে ছেড়ে দিল। এক সপ্তাহ খাওয়া দাওয়াতেই টাইট দিয়ে দিয়েছিল।

বেঁচে গেলাম শুধু  সুনী আমাকে বাঁচিয়ে দিল তাই। সুনী একটু টাল ছিল। আমারও কাজ ছিল। একটু আধতু ফস্টিনস্টি করেওছিলাম। বাচ্চাটা কার কে জানে?
 
আমি বেঁচে গেছিলাম ওর দাদা ডাকে। আর ওটা ওই সুজনের বাচ্চা বলে স্বীকার করে নেওয়ায়। তবে পরে শুনেছি সুজনের বাড়িতে গিয়ে ওর বউকে আবার আমার বাচ্চা বলেই ওকেও এই একইভা‌বে বাঁচিয়েছিল।

যাকগে আমি বেঁচে গেছি এটাই বড় কথা।
-------------

স্ত্রী নয়তো একেবারে গরম ইস্ত্রি! এই ইস্ত্রিটাই যে আমার বুকের উপর চেপে রয়েছে কিন্তু কাউকে কিচ্ছুটি বলতে পারছিনা,  ভাবতে পারছেন বিবাহের ভবিষ্যৎ কি?

ওরে আমার স্ত্রী দুলালি, 
তুই আমারও জান নিলি ?
প্রাক বিবাহ বা প্রেম খুবই মোলায়েম, মন আর শরীর ছুঁকছুঁক করে। কখন কথা হবে কখন জাপটা   জাপটি হবে, একটু আনন্দ আর অনেকটাই খরচ। আরে তখন কি আর খরচের কথা প্রশয় পায় তখন শুধুই এক অজানা নারীর সুখে ভাসার চিন্তা।

এখন বুঝতে পারি ঈশ্বরের কি দান। নারীর সৃষ্টি পুরুষের মরণ। দগ্ধ হওয়া! নারীর হাতে দগ্ধে দগ্ধে মরা। আমি এখন সুযোগ খুঁজি। কি করে ওরে জব্দ করা যায়? কেবলই এই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়।
চিন্তা করছি এইসব। এমন সময় স্ত্রী দৌড়ে এল, ভাল করে কথা বলল,
--  এই আজ আমায় একবার বাবার কাছে নিয়ে যাবে?

--  তোমার বাবাকে আমার পছন্দ হয় না। বাজে লোক ....

--  ধ্যামনা একটা। বদমাশ। মেরে তক্তা বানিয়ে দেব, যদি আর একবারও আমার বাপের নামে গালি দিবি। এবার শোন মিনসে, আমার বাবা নয় সবার বাবা তারকেশ্বর তারকভোলার কথা বলছি রে ...

ভয়ে সিঁটিয়ে গেলাম। মার খাওয়ার থেকে তারকেশ্বর নিয়ে যাওয়াই ভাল। 
--  ওহঃ তাই বলো, তা চলো,

বেরিয়ে পড়লাম। লোকাল ট্রেনে টিকিট কেটে চড়েই আমার বুদ্ধিমতী স্ত্রী নিজে বসেই ওর রুমাল দিয়ে আমার একটা সিট দখল করল আর আমাকে প্ল্যাটফর্ম থেকে ঝালমুড়ি কিনে আনার নির্দেশ জারি করল, আমি ঝামেলায় পড়লাম আবার ট্রেন থেকে নেমে দৌড়ে স্ত্রীর আদেশ মানতে গেলাম, আদরের দুলালি যে ঝালমুড়ি খেতে চেয়েছে।

ঝালমুড়ি কিনে ট্রেনে চড়ে দেখি ঝামেলা। আমার সিটে ফেলে রাখা রুমাল সরিয়ে এক পাক্কা লোক বসতে চাইছে আর আমার রাগী স্ত্রী তাকে ধমকাচ্ছে এই বলে যে এখানে একজন আছে। আমি উঠেই লোকটাকে ধমকে সরিয়ে দিলাম,
--  আমি রুমাল দিয়ে সিট রিজার্ভ করে রেখেছি যে ....

বলেই আমি ওনাকে অবজ্ঞা করে রুমাল তুলে সিটে বসে পড়লাম। কারোর কিছুই বলার নেই। লোকটি কারোর কোন সাপোর্ট পেল না।
আমার স্ত্রী একগাল হেসে আমাকে কনুইয়ের গোঁতা মেরে জানিয়ে দিল দেখেছো আমার বুদ্ধি?  তোমার ঘঠেতো আর বুদ্ধি নাই।

লোকটি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে কটমট করে চেয়ে রইল। ভয় পেয়ে গেলাম।

আমি চোখ বুঁজে ঘুমানোর ভাণ করলাম। স্ত্রী সারারাস্তা ট্রেনে বসে মোবাইলে ভিডিও দেখল। তারকেশ্বর স্টেশন এসে গেল। স্ত্রী আমায় টান মেরে তুলল। আমি উঠেছি আর দুলালি উঠতে যাবে দাঁড়িয়ে থাকা সেই লোকটি ঠিক সেই মুহূর্তে অকস্মাৎ একটা রুমাল আমার স্ত্রীর গায়ে ফেলে দিল। ব্যাপারখানা কি হল?
স্টেশন এসে গেছে, আমি নামতে চাইলে ওই লোকটি  স্ত্রীকে আটকে দিল,
--  আমি রুমাল ফেলে আপনার স্ত্রীকে রিজার্ভ করে রেখেছি, ও এখন আমার।

প্রথমে রেগে গেলাম। প্রতিবাদে চেঁচামেচি করতে গিয়েও থেমে গেলাম।
আমি চমকে উঠলাম। এবার মিনিটে আমার বুদ্ধি কাজ করে গেল, যাক এবার উচিত ব্যবস্থা হয়েছে। একেবারে হাতেনাতে ফল।

ট্রেনের অন্য প্যাসেঞ্জাররা অবশ্যই সবাই ওই লোকটিকেই সাপোর্ট করে দিল।

লোকটি জানাল,
-- আপনি এখন আমার। আমার সাথেই যাবেন আমার স্ত্রী হয়েই .....

এতদিন পর দেখলাম স্ত্রীর অবস্থা সঙ্গীন। ভয়ে মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। আমি তো এরকমই কিছু একটা চাইছিলাম।  খুব ভাল হল। এনজয় করছি। কিন্তু পারলুম কই?
স্ত্রী আমাকে চেপে ধরে কাঁদো কাঁদো মুখে জানাল,
--  ওগো কিছু একটা করো, আমি ওর সাথে যাব না। 

লোকটি এবার হেসে ফেলল,
--  ভয় পেলেন? না ভয় নেই। মজা করলাম মাত্র।

বুঝলাম। আমার মতো আর কেউই এইরকম বোকা স্বামী হতে চাইবে না।


 

গল্প


তরাই ডরায় না

   চিত্রা পাল 


তরাই,ও তরাসি তরাই,তরী তরণী মায়ের ডাক শুনতে পাচ্ছে ও, তার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর নামের মতো পরপর তার কত নাম। কিন্তু সাড়া দেবার অবস্থায় থাকলে তবে তো সাড়া দেবে। কোনো রকম করেই ওর গলার স্বর এখন একেবারে বেরোবে না। কি করে শব্দ বেরোবে!মায়ের ডাক শুনে ঘর থেকে বেরোতে গিয়েই না দেখতে পেলো দরজায় লম্বা শুঁড় দুটো। আর মুখটা ওর দিকেই ফেরানো। ওর মনে হলো যেন কটমট্‌ করে চেয়ে আছে ওর দিকে।ওরে বাবা, এখন সাড়া দেওয়া যায়? যদি সাড়া শব্দ শুনলেই ওর দিকে ধেয়ে আসে ,গা বেয়ে উঠে পড়ে তাহলে? তাহলে মনে হয় ও অজ্ঞান  হয়ে পড়ে যাবে। 

নাঃ, মেয়েটা আমাকে একেবারে পাগল করে দেবে। কি যে ভীতু হয়েছে,জন্তু জানোয়ারে ভয় খায়,সে তবু একটা কারণ থাকে,এ আরশোলা দেখে ক্যানো যে এতো ভয় পায়,কে জানে বাবা।এতো সব বকবক করতে করতে ভাই সোনাইকে কোলে নিয়ে যেই ওর মা ঘরে ঢুকলো,তরাই এর একছুট্টে মাকে জড়িয়ে ধরে তবে শান্তি। 

কোথায় দেখলি তেনাকে? মায়ের প্রশ্নের উত্তরের জন্যে এখন গলার স্বর বেরোয়, কথা ফোটে মেয়ের, ঐতো, দরজার ফাঁকে।  কই, কোথায়?আমি তো তাকে খুঁজেই পাই না,অথচ তোরই ঠিক চোখে পড়ে।তুই সব সময় খুঁজে খুঁজে বার করিস নাকি ওদের বলতো? বলেছি না,একগাছা ঝাঁটা দিয়ে পিটিয়ে একেবারে নিকেশ করে দিবি।‘বলতে বলতেই ওর মায়ের চোখে পড়লো,আর ঝাঁটার বাড়ি দিয়ে পিটিয়ে দিতেই শেষ। কিন্তু একবার ঘা খেতেই আরশোলা যেই ফরফর করে লাফিয়ে ওড়বার চেষ্টা করেছে,তরাই লাফিয়ে ঊঠেছে তড়াক্‌ করে,সেই ধাক্কায় ওর ভাই মাটিতে পড়ে মাথায় খেলো জোর ধাক্কা। কপাল এ জোর কালশিটে ছোপ। ওর ভাই এর একেবারে হেঁচকি তুলে কান্না। তরাই দৌড়ে  গিয়ে জল এনে ভাই এর মাথায় থাবড়ায়।তারপরে কান্না থামানোর জন্যে কত আদর করে খেলনা এনে দেয়। 

   তরাই এর মা রেগে গেলেও রাগ সামলিয়ে নিয়ে ওকে বোঝায়,তরাই তুই মিথ্যে এতো ভয়  পেলি।দেখলিতো এক বাড়িতেই সব শেষ। সেদিন তুই সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলিস, বেড়ালটা নাবছিলো,আচমকা ওকে দেখে তুই ভয় পেয়েছিলিস।তুই যদি সোজা ওপরে উঠে যেতিস কিছু হতো না, কিন্তু ভয় পেয়ে পিছু হটতে গিয়ে পড়ে যেতিস, আর হাড় গোড় সব ভাঙ্গতো যদি না মান্তুর মা তোকে  ধরে ফেলতো। দ্যাখ, ভয় পেয়ে ও  রকম করবি না। আরে ওরাও আমাদের দেখে ভয় পায়  তা জানিস?

আসলে তরাই যে অনেক ব্যাপারেই খুব সাহসী, সচেতন সেই ব্যাপারটা চাপা পড়ে যায় এই সব খুচরো  ঘটনার তলায়। এই তো সেদিন ওর ক্লাসের মধুঋতা খুব কাঁদছিলো টিফিনেরসময়ে। ও  একটা পেয়ারা এনেছিলো,টিফিনের সময়ে খাবে বলে, এখন দ্যাখে সেটা ওর ব্যাগে নেই। কে যেন কখন ওর ব্যাগ থেকে সেটা হাপিস করে দিয়েছে। তরাই ক্লাস ঘর থেকে বেরিয়ে লক্ষ্য করার চেষ্টা করে কেউ পেয়ারা খাচ্ছে কি না। দ্যাখে, দূরে পাচিঁলের ছায়ায় পল্টন আর রণি কি যেন করছে। দৌড়ে কাছে গিয়ে দ্যাখে,একটা চাকু দিয়ে পেয়ারা কাটার চেষ্টা করছে। খানিকটা কেটে যেই ছিঁড়ে নিতে গেছে,তরাই ও দের মাঝে পড়ে এক্কেবারে চিলের মত ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে দৌড়ে মধুঋতার হাতে দিয়ে বলে শীগগিরি খেয়ে ফ্যাল। মধুঋতা ভয়ে ভয়ে ওর দিকে তাকাতেই তরাই বলে,তুই ওদের ভয় পাচ্ছিস?দাঁড়ানা, আসুক একবার,আমি সোজা ওদের মিসের কাছে নিয়ে যাবো। তারপরে মিস ক্লাসে এলে তরাই সব বলে দিলে ওরা মিসের কাছে খুব বকা খেলো। 

  এবার বার্ষিক পরীক্ষার পরে তরাই ওর মা বাবার সঙ্গে চলেছে শান্তিনিকেতন বেড়াতে, সঙ্গে ওর ভাই ও আছে। তরাই এখন বিশ্বকবির কবিতা পড়েছে, গান শুনেছে ওনার ছবি দেখেছে। ওর একটা ধারণা তৈরি হয়েছে। তাই শান্তিনিকেতন যাবার ব্যাপারে ওর খুব উৎসাহ।     হঠাত্‌ ঠিক করা তো তাই শেষ মেষ কাঞ্চন কন্যাতেই বুকিং হল।  

ট্রেনটা খুব লেট্ করছে। তরাই এর আর অপেক্ষা করতে ভাল লাগছে না। প্ল্যাটফর্মেই এদিক ওদিক দোকানগুলো দেখছে। খেলনার দোকানে একটা খেলনা রিভলবার খুব পছন্দ হল ওর।খুব ইচ্ছে হল ওটা কেনার। বাবার কাছে বায়না করে জোর করে ওই রিভলবারটা কিনলো। ওটার মজা হচ্ছে রিল ক্যাপটা একবার পরিয়ে দিলে পর পর অনেকগুলো ফায়ার করা যায়। ওর মা ওর হাতে বন্দুক দেখে  বলে, তুই এটা কিনলি ক্যানো।তুই যা ভীতু ,ওতো পড়েই থাকবে।ও যে যাই বলুক তরাই এখন  ওটাকে  হাত ছাড়া করছে না। হাতেই রেখে দিয়েছে। 

  এখনও ট্রেন আসছে না। সবাই ছট ফট করছে, পায়চারি করছে। এমন সময়ে ঘোষনা শোনা গেল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন এসে যাচ্ছে। দূরে ট্রেনের আলো দেখা যাচ্ছে। এখন এই গরমে এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস সবাইকে স্বস্তি এনে দিলো। এমন সময়ে ঘোষণা শোনা গেলো, ট্রেন এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ওভার ব্রীজ পেরিয়ে যেতে হবে ওই প্ল্যাটফর্মে। সবাই হুড়মুড় করে বাক্স প্যাঁট্রা নিয়ে ছুট লাগালো ওদিকে।এদিকে সেই মুহুর্তে শুরু হল কাল বৈশাখি ঝড়।ঠান্ডা হাওয়া সেই আগমন বার্তাই দিয়েছিলো ঠিকই, রাত বলে আকাশের অবস্থা বোঝা যায়নি। তুমুল ঝড় সঙ্গে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি। আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে আর এক কান্ড ঘটলো, হঠাত্‌ সব আলো নিভে গেলো। দক্ষ যজ্ঞ বা লংকা কান্ড বোধ হয় এভাবেই হয়েছিলো। যাত্রীদের হৈচৈ চিত্‌কারের ভেতরে সব ছাপিয়ে ভেসে এলো শিশু কন্ঠের গগন বিদারী চিত্‌কার।তার পরক্ষণেই  ধ্বনিত হলো দুম দুম বন্দুকের গুলির  শব্দ। শব্দ মাহাত্ম্যেই ভীড় হালকা।দেখা গেলো ওভারব্রীজের ওঠার সিঁড়িতে দুই শিশুকে জড়িয়ে ধরে তার মায়ের কান্না আর তাদের পাশে তরাই দাঁড়িয়ে তার বন্দুক হাতে। তরাই এর  বাবা উদ্ভ্রান্ত হয়ে  তরাইকে খুঁজছিলো। ওকে দেখতে পেয়েই সব শঙ্কা এক মুহুর্তে রাগে পরিণত হয়ে গেলো। ওর বাবা তার হাত ছেড়ে চলে আসার জন্যে তাকে চড় মারার জন্যে হাত তুলতেই কে যেন খপ করে তার হাত ধরে নামিয়ে দিয়ে  তরাইকে বুকেজড়িয়ে ধরে। সে আর কেউ নয় ওই  শিশুদুটির বাবা। বলে, আজ আপনার মেয়ের সাহসের জন্যে আমার বাচ্ছাদুটোকে ফিরে পেয়েছি। ও যদি ও  সময়ে সাহস করে ফায়ার না করতো, ওরা আর একটু হলে মানুষের পায়ের চাপে থেঁতলে যেতো।  আপনার মেয়ের সাহসের জন্যে অনেক ধন্যবাদ।দাদা, আপনার মেয়ের মতো সন্তান যেন সবার ঘরে হয়। আজ  তরাই এর সাহসের প্রথম পুরষ্কার প্রাপ্তি ঘটলো ওর বাবার আনন্দাশ্রুতে।    


 

হারানো রোদ

লীনা রায়

পর পর তিনবার শাঁখ বাজলো পাশের বাড়িতে। মাধবী তখনও বিছানায়। লেপের বাইরে বেরোতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু সন্ধ্যা দিতে হবে। তাই উঠতেই হলো। খাট থেকে নেমে মেঝেতে পা ছোঁয়াতেই কেঁপে উঠল মাধবী। মনে হলো বরফের চাঁই-এর ওপর পা রেখেছে। সারা শরীরে ছড়িয়ে গেল বরফ ঠান্ডা। শুরু হল কাঁপুনি। কোন রকমে টেনে হিঁচড়ে কাঁপতে থাকা শরীরটাকে বিছানায় তোলে মাধবী। সন্ধ্যা দেওয়া হয় না। লেপের ভেতরেই হাত জোড় করে প্রণাম করে। ভগবানের কাছে অক্ষমতার জন্য মাফ চায়।

মাধবীর বয়স ষাট পেরিয়েছে। কিন্তু এত ঠান্ডা কোন শীতকালে পায়নি। আগে শীতের এত জামা কাপড়ও ছিল না। যদিও বয়স তখন বয়স কম। তাই হয়ত রক্তের জোর ছিল। ঠান্ডায় কোনদিন কাবু হয়নি মাধবী। উল্টে শীত তার বরাবর প্রিয়। কিন্তু এবার সব কিছু অন্যরকম। বড় অসহায় লাগছে।

দু'তলা বাড়ি। ওপর নিচ মিলিয়ে খান দশেক ঘর। বাড়ির সদস্য সংখ্যা পনের। শ্বশুর, শাশুড়ি ছাড়াও সাত অবিবাহিত ননদ, নিঃসন্তান খুড় শ্বশুর, শাশুড়ি। বাড়ির একমাত্র ছেলের বৌ মাধবী। কাজের লোক থাকলেও রান্না বান্না, ঘরদোর গুছোনো সব একা হাতে সামলেছে। একে একে তিন সন্তানের মা হয়েছে। দায়িত্ব বেড়েছে। একসময় শ্বশুর, শাশুড়ি চলে গেলেন। একে একে ননদদের বিয়ে হয়ে গেল। ছেলেরাও পড়াশুনো শেষ করে চাকরি করতে বাইরে গেল। বাড়িতে তখন মাধবী আর ওর কর্তা।

কর্তা অফিসে বেরিয়ে গেলে বাড়ি ঘর, বাগানের দেখভাল করে আর বাকি সময়টা টিভি দেখে দিব্যি কেটে যেত। সময় মতো ছেলেদের বিয়ে দিয়েছে। তারা সংসার, চাকরি নিয়ে ব্যস্ত। বাড়িতে সেভাবে আসতে পারে না। ফোনে কথা হয়। ছুটির দিনে ভিডিও কল। বেশ চলছিল। কিন্তু দু বছর আগে হঠাৎ করে ঘুমের মধ্যেই মানুষটা চলে যায়। আর এরপর থেকেই একটু একটু করে বদলে যেতে থাকে মাধবীর জীবন।

বাবার মৃত্যুর মাস তিনেক পর তিন ছেলে একসঙ্গে বাড়িতে আসে। এত বড় বাড়িতে মায়ের একা থাকা নিয়ে তারা তিন জনেই বেশ চিন্তিত। সেজন্য তারা কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঠিক করেছে বাড়িটিকে বিক্রি করা হবে। তারপর বাড়ির পাশের ফাঁকা জায়গায় একটি দু' কামরার বাড়ি বানানো হবে। তিন ভাই সব ঠিক করেই এসেছিল- বাড়ির খদ্দের থেকে জমির দলিল অব্দি। মাধবী কিছু বলেনি। সই করে দিয়েছিল। তিন মাস লেগেছিল নতুন বাড়ি তৈরী হতে। আর তারপরেই পুরোনো বাড়ি ছেড়ে নতুন বাড়িতে উঠে আসে মাধবী।

অত বড় বাড়ি ছেড়ে এসে প্রথম প্রথম দম বন্ধ হয়ে আসতো। খোলা মেলা একটা পরিবেশ থেকে আচমকা দুটো ঘরে বন্দী জীবন। কষ্ট হত খুব। অভিমানে বুক টনটন করতো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সয়ে আসে।

দু' বছরে কত কিছু বদলে গেল। নতুন বাড়ি, নতুন জীবন। এতে অভ্যস্ত হতে না হতেই শুরু হলো তাদের বিক্রি হওয়া বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট তৈরির কাজ। বাড়ি ভাঙার শব্দে বুক ভেঙে যেত মাধবীর। দরজা, জানালা বন্ধ করে, টিভির আওয়াজ বাড়িয়েও কোন লাভ হত না। তার অমন সুন্দর বাড়ির জায়গায় এখন সাত তলা ফ্ল্যাট উঠছে।

এক পাশে সাত তলা ফ্ল্যাট, অন্য পাশে তিন তলা বাড়ি। মাঝে মাধবীর দু' কামরার বাড়ি। সারাদিন রোদের দেখা পাওয়া যায় না। শেষ বিকেলে সামনের বারান্দার কোন বরাবর এক চিলতে রোদ দয়া করে স্পর্শ করে যায়। হলদে রঙের মরা রোদ। সে রোদের রঙটুকুই সার। তাত নেই। মজা করে মাধবী ওর বাড়িটিকে বলে অসূর্যস্পর্শা। ভেজা ভেজা দেয়াল, বরফ ঠান্ডা মেঝে, ওম হারানো লেপ, তোষক নিয়ে মাধবীর নতুন সংসার।

সারাদিন বিছানায়। সন্ধ্যাটাও দিতে পারেনি। মনটা খচখচ করছে মাধবীর। এক কাপ গরম চা পেলে হয়ত শরীরটা একটু গরম হত। কান্না পায় মাধবীর। বাড়িটার কথা মনে পড়ে। চোখ বন্ধ করেও স্পষ্ট দেখতে পায় রোদে ভেসে যাওয়া সেই বাড়ির ছাদ, উঠোন। ঠিক সেই সময় বালিশের পাশে রাখা ফোনটা বেজে ওঠে। না দেখেও বুঝতে পারে তিন ছেলের কেউ একজন করেছে। লেপের বাইরে হাত বের করে ঠান্ডা ফোনটাকে ছুঁতে একটুও ইচ্ছে হলো না মাধবীর।


 

শিল্পী 

অভিজিৎ সেন


পৈত্রিক সম্পত্তির মধ্যে পেয়েছে এক বিঘা চাষযোগ্য জমি, মাথা গোঁজার মতো ছোট্ট দুটি ঘর, এক ফালি উঠোন এবং তার প্রিয় একতারা। কৃষি কাজে মন নেই জগাই বাউরির। জমি আধি দিয়ে দিয়েছে। আধিয়ার যতটুকু দেয় তাতেই সে সন্তুষ্ট। একা মানুষের চলে যায়। করনায় মা বাবা দুজনেই চিরকালের মতো বিদায় নিয়েছেন জীবন থেকে। জগাই নিজে গান লেখে, সুর দিয়ে একতারা বাজিয়ে মনের আনন্দে গেয়ে ওঠে। কী অসামান্য কন্ঠ তার,সকলের মন কেড়ে নেয় ! আত্মভোলা মানুষটি সারাদিন ঘুরে বেড়ায় নদীর ধারে, ধানক্ষেতে। প্রকৃতিকে সে যে কী ভালোবাসে সে নিজেও‌ জানে না ! তার গ্ৰামের মেঠো পথে কখনো কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, দেবদারু,নিম,আমলকি,কদম গাছের চাড়া এনে পুঁতে দেয়, শিশুর মতো যত্ন করে । এদিকে নিজের প্রতি থাকে সম্পূর্ণ উদাসীন। 'বিশ্ব পরিবেশ দিবসে'র দিন গ্ৰামের ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে বৃক্ষরোপণের আয়োজন করে । পরিবেশ বিষয়ক গান বেঁধে গ্ৰামের ক্ষুদেদের নিয়ে গোটা গ্ৰামে প্রভাতফেরী করে । তার সহজ সরল শিশুর মতো আচরণে শিশুরা যেমন তাকে ভালবাসে, প্রকৃতিও যেন ! গ্ৰামের ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলো তাদেরই একজন ভেবে নামধরে তাকে ডাকে,বলে,'জগাই চল্,খেলবি না,তুই শীতলা মন্দিরের ভেতরে চাঁপা গাছটি লাগিয়েছিলি। গাছটা বড়ো হয়েছ, কতো ফুল ফুটেছে । চল্ না আজ সেখানে যাই । ' জগাই ও সে কথা শুনে হাতে একতারা নিয়ে চললো সেখানে। রান্না করার কথা,ঘরের দরজায় তালা দেওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গেলো । 
             
ছবির মতো সুন্দর, দর্শনীয় তাদের গ্রামটি। এই গ্রামের বুকচিরে মুজনাই নদী বয়ে চলেছে । এই নদী শুধু এ গ্ৰামের একটি নদী মাত্র নয়,নদীটি গ্ৰামের মা । নদীর বুকে আবর্জনা ভরে গেলে,গ্ৰামের সকলে মিলে পরিস্কার করে। নদীর তীরেই হয় শ্যামা পূজা । গানের আসর বসে,বৈঁচি প্রতিযোগিতা হয় । নদী তীরবর্তী জমিগুলি পলি পড়ে পড়ে হয়েছে উর্বরা । শরৎকালের শান্ত নদী, বর্ষায় ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। পাড় ভাঙ্গে। ঘর ভাঙ্গে। চাষের জমি নদীর বুকে মিশে যায়।এ নদীই গ্রামের মানুষদের মাছের যোগান দেয়, হয় জল সেচও । এখানকার মানুষের জীবন,জীবিকা ও সংস্কৃতি আবর্তিত হয়ে চলেছে বছরের পর বছর ধরে এভাবেই মুজনাই নদীকে কেন্দ্র করে । এই নদীর তীরেই জীবনের নানা পর্যায় পার করে অন্তিমে এই নদীর জলেই মিশে যায় মৃতদেহ ছাই আকারে । নদীর পাড়ের এই শ্মশান-কালীমায়ের পূজাটি হয় ঘটাকরে । মুজনাই নদী এ গ্রামের মা। মায়ের মতন স্নেহের ছায়ায় গ্রামটিকে আগলে রেখেছে। নদীপাড়ে ও গ্রামে আছে অজস্র সবুজ গাছপালা,লতা-গুল্ম । জগাই বাউরির বাড়ি মুজনাই নদীর তীরে এই গ্রামে। গ্রামের নাম চাঁপাডাঙ্গা । গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই কৃষক। খুব কম সংখ্যক মানুষই চাকুরীজীবী । নদীর এপার ওপারে দুটি গ্রাম। জগাই এর বাড়িটি নদীর তীর সংলগ্ন। নদীর জলের অজস্র তরঙ্গ ভঙ্গ সে প্রত্যক্ষ করে আর মাছরাঙ্গার মতো এক দৃষ্টিতে নদীর দিকে চেয়ে থাকে। আপন মনে হাসে। হাসতে হাসতে নিজের মধ্যে ডুবে যায়। ভেতরের ভাবনাগুলো কন্ঠ ঠেলে ঠোঁটের পাশে চলে এলে অপূর্ব মধুর গান বেরিয়ে আসে, মন হালকা হয়। প্রাণ খুলে সে গান ধরে। তার গান শুনে পথচারীরা মুহূর্তের জন্য হলেও দাঁড়িয়ে যায়, কেউ কেউ গুনগুন করে তার সঙ্গে গান করে। কী গভীর দরদ দিয়ে সে গানগুলো লিখে আবার দরদ ভরা কন্ঠে গানগুলো গায় ! মুঝনাই নদীর শীতল বাতাস, পাখিদের কলকাকলি এবং জগাই বাউরীর গান এই গ্রামের মানুষের কাছে সমার্থক বোধক । আবার কেজো লোকের কাছে সে একটা অকর্মণ, অপদার্থ। কেউ তাকে ডাকে 'পাগল 'বলে। কেউ বলে 'খ্যাপা'। যে যাই বলুক গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ তাকে ভালবাসে, স্নেহ করে তার শিশুসুলভ সারল্যের জন্য।


                    সূর্যোদয়ের আগেই সে উঠে পড়ে। তারপর একতারাটা সঙ্গে নিয়ে সবুজ মখমলে নরম শিশির ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে আপন মনে হেঁটে চলে যায়। আঁধার কেটে ভোর হওয়ার অলৌকিক দৃশ্যের আবেশে কোথায় যেন হারিয়ে যায় ! কুসুমের মতো লাল সূর্যটা যখন ধীরে ধীরে পূবের আকাশে আলো ছাড়াতে থাকে, তখন তাঁর একতারাটা  বেজে ওঠে। ভোরের নির্মল আকাশে দূর মেঘের বুকে  এক ঝাঁক পাখি উড়ে গেলে তার একতারা বেজে ওঠে। উষা কালের সূর্যের আলো যখন মুজনাই নদীর প্রবাহে ঢেলে দেয় গলিত সোনা, নদীর বুকে ভেসে আসা শাপলা ফুল, সারারাত মাছ ধরে ক্লান্ত ডিঙ্গি-নৌকা এবং তন্দ্রাচ্ছন্ন মাঝি আর মুজনাই-এর স্বচ্ছ টলটলে জলপ্রবাহের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ-- তার মনে কথা ও সুরের সঞ্চার করে, তখন একতারা বেজে ওঠে। প্রাতঃভ্রমণ করে সে নদীর পাড়ের সেই চাঁপা গাছটির নীচে বসে । ডুবে যায় গানে। এই গাছ যেন তার দোসর। এখানে না এলে তার ভালো লাগেনা। গ্রামের সবাই জানে সে এখানেই বসে থাকতে ভালবাসে। কেউ তার খোঁজ নিলে সবাই জানে তাকে কোথায় পাওয়া যাবে। রান্না করতে তার কোন অসুবিধা হয় না। গ্রামের লোকেরা তাকে কষ্ট করে রান্না করতে বারণ করে। তারা বলে সে যেন যেকোন বাড়িতে গিয়ে খেয়ে নেয়। এ গ্রামের সবাই তাকে নিজের ছেলের মতোই ভাবে। কেউ তাকে বিয়ে করে সংসারী হতে বললে,সে কোন উত্তর দেয়না । আপন মনে থাকে। গ্রামের সবাই বুঝে গেছে বিয়েতে তার মন নেই। প্রকৃতি ,নদী,গাছপালা,পাখি গ্রাম,গান এবং তার একতারার সঙ্গেই তার বিয়ে হয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে সে শিশুর মতো খেলা করে। আত্মভোলা হলেও আত্মসম্মানটি তার প্রবল। সে অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে চায় না। নিজের কাজ নিজেই করে। রান্নাটাও সে নিজেই করে। যদিও এক বেলাই রাঁধে। সেটাই রাতে গরম করে খেয়ে নেয়। আর যেদিন গ্রামে কোন বড় পূজো অনুষ্ঠান থাকে, বিয়ের অনুষ্ঠান অথবা গানের আসর,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সেখানে তার উপস্থিতি দেখার মতো। সে শুধু গান করেই চলে আসে না। সেই অনুষ্ঠানকে নিজের অনুষ্ঠান ভেবে যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে । আর সে যেখানে থাকে গ্রামের লোক জানে সে কাজটি কতোটা নিপুণভাব করে । তার নাম ডাক আশেপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে গেছে,সুকণ্ঠের জন্য । ভিন্ন গ্রামে অনুষ্ঠান করতে যায়। তারা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে যতটুক মূল্য দেয় তাতেই সে খুশি। তার এই স্বভাবের জন্য,সরলতার জন্য নির্লোভ-স্বভাবের জন্য তাকে ভিন্ন গ্রামের মানুষও ভালোবাসে ।
 
          নিত্যদিনের মতই প্রাতঃভ্রমণ করেই সে বাড়ির উঠোনে নদীর দিকে মুখ করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি আর মনে মনে কিছু ভাবছে । ঠিক এই সময় তার বাবার খুব ভালো বন্ধু এ গ্রামের বাসিন্দা হরিহর বাউরি এসে তাকে ডাকছে, 'জগাই ও জাগাই অতো কি ভাবছিস ?'। আত্মমগ্ন জগাই হরিহর কাকুর ডাক প্রথমে শুনতেই পাইনি । এতটাই আত্মমগ্ন ছিল। আবার যখন হরিহর কাকু তার কাছে এসে জোরে জোরে ডাকলো তখন সে চমকে উঠলো এবং তাকিয়ে দেখে হরিহর কাকু । সে বলল, 'কাকু কখন এসেছো । আমি তোমার ডাক শুনতে পাইনি প্রথমে । কিছু মনে করোনা । একটা গান নিয়ে ভাবছিলাম'। হরিহর কাকু বললো,  'নারে না কিছু ভাবি নি আমি কি তোকে জানি না ? তোর জন্ম থেকে তোকে দেখছি। তুই হলি জাত শিল্পী । তুই ভাবের ঘোরে থাকবি না তো আমি থাকবো, আমি চাষ করি রস কষ বলে কিছু নেই আমার।  তুই যে কত সুন্দর সুন্দর গান বাঁধিস, গান করিস তাতেই আমার মনটা ভরে যায়। তোর বাবা মা নেই, তাই বলে কি তোকে দেখার লোক নেই? তোর ভালো-মন্দ আমার থেকে কে বেশি দেখবে? তোর বাবা আমার পরম বন্ধু ছিল। তোর বাবা-মা থাকতে এই বাড়িতে কত সময় কাটিয়েছি। তারাও আমাকে কত আদর যত্ন স্নেহ করতো। আজ তারা নেই আমি তো আছি। শোন তোর এভাবে জীবন কাটানো চলবে না। এবার তোকে সংসারী হতেই হবে। আমারও বয়স হচ্ছে আমার ছেলেমেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। তোরা তো প্রায় একই বয়সের । জানি তোর সংসারে মন নেই। জমির দায়িত্ব ভাগচাষীদের উপর ছেড়ে দিয়েছিস । এভাবে হাত পুড়িয়ে  কতদিন চলবে। আর শোন বয়স বাড়বে মনে রাখিস জীবনে একজন সাথীর দরকার। কে বলেছে বিয়ে করলে সংসারী হলে তোর গান তোর জীবন থেকে চলে যাবে ? আমি তোর জন্য এমনই একটি মেয়ের সন্ধান করেছি যে তোকে ভালো রাখবে। তোকে বুঝবে। তোর গান করাও পছন্দ করবে । আমি যা করছি তোর বাবা-মা থাকলে সেটাই করতো '। গ্রামের কাকিমা জেঠিমা এবং বন্ধুরা তাকে কতবার বিয়ের কথা বলেছে। সে কখনো রাজি হয়নি। সে প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। শুনে হেসে বেরিয়ে গেছে সেখান থেকে। কিন্তু হরিহর কাকুর বিষয়টা আলাদা। বাবার পরে তাকেই সে পিতৃস্থানীয় মনে করে। শ্রদ্ধা করে। তাঁর কথা অমান্য সে করার কথা মনেও ভাবে না। এবং নিজের অসুবিধার কথা চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত কাকুর কথাতেই রাজি হয়ে গেলো।
 
          সে বিয়েতে রাজি হয়েছে এই কথা গ্রামে ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামের লোকেদের আনন্দের সীমা নেই। গ্রামে যেন উৎসব লেগে গেলো। কিছু নিন্দুকেরা সবখানেই থাকে তারা আবার বলছে, হরিহর কাজটা ঠিক করলো না। জগাই 'ভবঘুরে' ছেলে । গান,নদী যার জীবন,প্রকৃতিতে পাখির মতন মুক্ত জীবন যাপন করতে যে পছন্দ করে সে আবার সংসারী হবে ? এ সংসার কদিন টেকে দেখো ! হরিহর কাকুর  অভিভাবকত্বে পাশের একটি গ্ৰামে বিয়ে ঠিক হলো। এটা কার্তিক মাস, বিয়ে আশ্বিন মাসে। কাকু তার সম্পর্কে সব কথাই বলেছে । গোপন করেনি । জগাই সেই গ্ৰামে বেশ কয়েক বার গানের অনুষ্ঠানে গান গেয়েছে । তার মধুর ব্যবহার তাদের মনকে ছুঁয়ে গেছে। আজ সে সেই গ্ৰামের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের বাঁধনে বাঁধতে চলেছে। ঐ গ্ৰামের মানুষেরা ভালো ভাবেই নিচ্ছে। আনন্দের কারণ একজন ভালো শিল্পীকে পাচ্ছে। মুজনাই তীরের এই মহেশডাঙ্গা গ্ৰামটির শিল্প-সাংস্কৃতি চর্চার খ্যাতি ছড়িয়ে আছে গোটা উত্তরবঙ্গ জুড়ে।

        তিন বোন। মা ও বাবা । বাবা ধনেশ্বর বাউরী কৃষিজীবী। বিঘা দশেক জমি, একটি বড়ো পুকুর আছে। সারাবছর মাছ সেখান থেকে পেয়ে যায়। কিছু বিক্রি করে। জমির ফসলেই বছর চলে যায়। মুজনাই নদীর পলি সমৃদ্ধ মাটি প্রচুর পরিমাণে ফসলের যোগান দেয়। মুজনাই নদীকে ধনেশ্বর 'মা' বলেই ডাকে । জগাইকে তার শ্বশুর পণ হিসেবে এক লাখ টাকা এবং মূল্যবান সামগ্রী দিতে চেয়েছে । জগাই  পরিষ্কার বলেছে,'জগাই দরিদ্র্য তাই বলে সম্পর্কের মূল্য সে বৈষয়িক মূল্যের দাঁড়িপাল্লায় চড়াতে পারবেনা। মনের দাম অনেক বেশি আমার কাছে। আমি বাণিজ্য করতে আসিনি । মনের দাবি শুধুমাত্র মনের মানুষের কাছেই হতে পারে অন্য  কোথাও নয় । দেনা-পাওনার কথা এলে আমি বিয়েতে মত 
দিতে পারবো না। ' এরপর আর কোন কথা নেই। জগাই যে কতোটা ভালো মনের মানুষ এবং তার আত্মসম্মান কতোটা প্রবল বুঝতে তাদের অসুবিধা হলো না। যার সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে তার নাম তরী। তরী এর আগে জগাইকে গানের আসর দেখেছিল, তার গান শুনেছিল। জগায়ের গান তার ভালো লাগতো, আজ তার কথা,আত্মসম্মান বোধ দেখে তার প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো । এমন মানুষকে জীবনের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে কোনো দ্বিধা থাকলোনা তার । ওদের বিয়ে হয়ে গেলো। শুরু হলো জগাই আর তরীর সংসার জীবন। মুজনায়ের শান্ত প্রাণবন্ত উচ্ছল তরঙ্গের মতো আন্দোলিত হতে হতে ওদের জীবন বয়ে চললো । পূর্ণিমার রাতের স্নিগ্ধ মাদকতার আবেশে মিশে অনুরাগ,গানের সুরে- স্বরে মুজনাই তীরও উঠলো ময়ূর-ময়ূরীর মতো নেচে। বসন্ত ওদের জীবনে এখন বারোমাস । ফুল্লোরার বারোমাস্যা ছুঁতে পারেনা তাদের মধুর মুহূর্তগুলো। তরী,জগায়ের এতদিনের জীবন যাপনের কিছু ক্ষতিকর অভ্যাসে রাশ টানলেও, শিল্পী রং স্বাধীনতায় নয়। বরং তাকে মুক্ত করে দিয়েছে সংসারের দায়িত্ব থেকে। তরী হাসিমুখে কাজ করে। জগাই এখন আরও বেশি করে গান বাঁধে,তরী অবসর‌ সময়ে গান শোনে, সঙ্গে সঙ্গে গুণগুণীয়‌ ওঠে । তরী উচ্চমাধ্যমিক পাশ। সংসারের হাল ধরবার জন্য গ্ৰামের অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের নিজের বাড়িতে টিউশন দিয়ে থাকে । সেলাই মেশিন আছে। মহিলাদের এবং বাচ্চাদের জামাকাপড় শেলাই করে। আর জমি থেকে যা ফসল উঠে আসে তাতে তাদের এখন ভালোই চলে যায়। জগাই,তরীর মধ্যে নিজের মাকে খুঁজে পেয়েছে।আবার বাবাকেও। জগাই উদাসীন,আত্মভোলা। তরীকে তার একতারা আর গানের মতই ভালোবাসে । ওর সব কথা শোনে। তরীও জগায়ের হৃদয়ের সকাল অলিগলির স্পন্দন বুঝতে পারে । ওরা দুজনে দুজনের ভালো মন্দ সব বোঝে । দুজন দুজনের চোখের ভাষা পড়তে পারে। একে অপরের জন্যেই যেন এরা মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ঠিকই বলেছিলেন--'খুঁজিয়া পাইলো যেন হাঁড়ির মতো সড়া' ।

                  জীবন গড়িয়ে গেলো । কেটে গেছে দুবছর। গ্ৰামের একমাত্র মেঠো পথটি পাকা হয়েছে। নদীর পাড় বরাবর এঁকে বেঁকে মিশে গেছে জাতীয় সরকের সঙ্গে । গ্ৰামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে। বাঁকুড়া ও বীরভূমের দুজন শিক্ষক এস.এস.সি পরীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যালয়ে যোগদান করেছেন। দুজনেই কম বয়েসের । অবিবাহিত। জগাই এর কণ্ঠে বাউল গান শুনে দুই শিক্ষকই বিস্মিত। ওনারাও গ্ৰামেরই ছেলে। এ গ্ৰামেই ভাড়া থাকে । জগাই এর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। জগাই কে তাদের প্রকৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্যের কথা,মানুষের জীবন জীবিকার কথা,লাল মাটির কথা, বাউল সম্প্রদায়ের কথা, তাদের বিশেষ জীবনাচরণের কথা, জয়দেবের মেলার কথা, বাঁকুড়া, বীরভূমের প্রাচীন ইতিহাসের গল্প, লোকগাথার কথা বলে-- সে গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনে আর তার থেকে গানের প্রাণের রসদ সংগ্রহ করে। সে নতুন নতুন গান বাঁধে। তরীর প্রেম,বাউল দর্শনের গভীর উপলব্ধি তার গানকে আরও প্রাণবন্ত করে এবং যুক্ত করে সর্বজনীন মাত্রা।
 
              মুজনাই এর তরঙ্গে মিশে বয়ে চলেছে সময়। জগাই আর তরী আর একা নেই । ওদের যমজ সন্তান হয়েছে। একটি ছেলে অন্যটি মেয়ে। বিহান ও বেলা । আত্মভোলা জগাই আজকাল মুজনাই এর সেই বকুল গাছের নীচেই বেশিরভাগ সময় কাটায় । সুন্দর করে বাঁশের মাচা বানিয়ে তার উপরে বাঁশের ছাদ দিয়ে নিয়েছে। মুজনাই এর সবুজ ঘাসের মখমলি পাড়, জলের তরঙ্গ,দুই তীরের জনজীবন, নৌকা,মাঝি,আবাদি জমি, নানান শ্রেণীর বৃক্ষ, পাখির কলকাকলি, শ্মশানের নিস্তব্ধতায় এমনভাবে ডুবে থাকে বাড়ি ফেরার কথা বেমালুম ভুলে যায়। সে আজকাল কী এক গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে দূরে দূরে অনেক দূরে।
                     
প্রকৃতি অপূর্ব সৌন্দর্য্যের পশরা সাজিয়ে মুজনাই নদীর তীরে অবস্থিত গ্ৰামগুলোকে ভরিয়ে তুললেও
বর্ষাকালে কী ভয়াবহ রূপ ধারণ করে, গ্ৰামবাসীরা জানেন। এবার বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে অসহনীয় গরম আর কালবৈশাখীর রুদ্র নৃত্য জীবনকে তছনছ করে রেখেছে। গরমের পরিমাণ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে । অনিয়ন্ত্রিত স্বেচ্ছাচারী জীবন যাপন প্রকৃতির অভিশাপ হিসেবে নেমে আসছে মানুষের জীবনে । তার প্রভাব থেকে মুক্ত নয় কেউই। জ্যৈষ্ঠ মাসের কাঠফাটা গরম পার করে এলো আষাঢ় মাস। মাসের শুরু থেকেই প্রবল বৃষ্টিপাত হয়ে চলেছে। গ্রামের মাঠ পথ সবই জলে একাকার। ঘন কালো মেঘে সারাদিন আকাশ থাকছে ঢাকা। বাইরে বেরোনোর কোন উপায় নেই। বাড়ির মধ্যেই বন্দী হয়ে আছে সবাই। বৃষ্টির সাথে সাথে নেমে আসে বিকট আওয়াজের বজ্রপাত। এ ধরনের বজ্রপাত এর আগে মানুষ শোনেনি। পাহাড়ের জল এই মুজনাই নদীর প্রবাহ ধরে বয়ে যায়, জলের পরিমাণ ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌যায় বেড়ে । গত তিনদিন ধরে টানা বৃষ্টি চলছে। নদীর জল বিপদসীমাকে ছুঁয়ে গেছে নদী বাঁধের একটি দুর্বল অংশ ভেঙে গেছে। সেই দুর্বল ফাটল দিয়েই জল ঢুকে গেছে গ্রামের ভেতর। এমন প্লাবন গ্রামের মানুষ আগে দেখেনি। সবাই বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে উঠে আসছে। বাড়িঘর, গৃহপালিত পশু বন্যার রুদ্র আঘাতে ভেসে চলে যাচ্ছে। মানুষ আশ্রয় নিয়েছি একটি নিকটবর্তী বিদ্যালয়। একদিকে বাস করতে হচ্ছে মানুষকে এবং গৃহপালিত পশুদের । জগাই এর গ্রামের সবাই সেখানেই আশ্রয় নিয়েছে। দুই শিশু সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে তরী তাদের নিয়ে গ্রামের অন্যান্যদের সঙ্গে ছুটে চলেছে । এখানে পৌঁছে একটি নিরাপদ স্থানে কিছুক্ষণ স্থির হওয়ার পর, তার মনে পড়ল তার স্বামী জগাই আসেনি।

গ্রামের লোকেদের কাছে জানতে চাইলো জগাই কোথায় আছে ? তাকে কেউ দেখেছে কি না ? তারাও সে কথা বলতে পারল না। প্রাণ বাঁচানোই যেখানে বড় বিষয়, সেখানে কে কার খোঁজ রাখে ? যে যেমন পেরেছে পরিবার নিয়ে ছুটে এসেছে এখানে । জগাই যেহেতু বেশিরভাগ সময় বাইরেই থাকে ঘুরে বেড়ায় অথবা নদীর ধারে বকুল গাছটার নীচে বসে থাকে তাই তার কথা এমন তান্ডবের সময় কারোই মনে ছিল না। তরী এবার ব্যস্ত হয়ে উঠলো জবাইয়ের জন্য। শিশু দুটোকে রেখে সে আবার গ্রামের উদ্দেশ্যে যাওয়ার উদ্যোগ করলে গ্ৰামের বয়স্ক লোকেরা তাকে বাধা দিল। তাকে যেতে বারণ করলো। শেষে গ্রামের কয়েকটি যুবক ছেলে চলল জগাইকে খুঁজতে। তরীর মনের অবস্থা বুঝে গ্রামের মহিলারা তার বাচ্চা দুটোকে তাদের কাছে রেখে দিল এবং তরীকে স্বামীর খোঁজে যেতে দিল। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি ঝরে চলেছে।

ঘন কালো মেঘ আজ যেন রাক্ষুসে হা করে তাদের গোটা গ্রামকটিকে গিলে ফেলবে। পথ কোথায় ? চতুর্দিকে শুধু জল আর জল। এত জল তরী জীবনে প্রথম দেখছে। বন্যা হয়েছে এর‌ আগে কিন্তু এ যে মহাপ্লাবন। গ্রামের যুবক ছেলেদের দলটি একদিকে খোঁজার চেষ্টা করছে জগাই কে ‌। গ্রামের কাছাকাছি আসতেই তারা দেখতে পেলো বাঁধে যে ফাটলটি তৈরি হয়েছিল তা ভেঙে গেছে এবং গ্রামের একটি অংশ নদীর বুকে তলিয়ে গেছে । তারা গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করতে পারল না, তরীও পারেনি ফিরে এসেছে নিরাপদ আশ্রয়ে। 

                 প্রবল উৎকণ্ঠ নিয়ে তরীর সময় কেটে চলেছে।  সেদিন সন্ধ্যার পর থেকে বৃষ্টি কমতে শুরু করল। ঘন্টাখানেকের মধ্যে বৃষ্টি থেমে গেল। প্রায় অলৌকিকভাবে সে রাতে আর বৃষ্টি হলো না। নদীর জল কমতে শুরু করল। সকাল হতে না হতেই গ্রামের জল নেমে গেল। নদীর জল বিপদসীমা থেকে নীচে নেমে এসেছে । সুন্দর সাজানো গ্রামটি বিভৎস আকার ধারণ করেছে । এবার জগাইকে খুঁজতে তরী সম্ভাব্য সকল স্থানে প্রথম খুঁজে দেখে কিন্তু পায়না। নদীর গ্রাসে গ্রামের যে অংশটি অক্ষত থেকে যায় তার মধ্যে জগাই এর বাড়িটিও পড়ে । তরী বাড়ি ফিরে এলো। ঘরের অবস্থা শোচনীয় । বন্যার জলে সব জিনিস ওলট-পালট হয়ে গেছে। জগাই এর গানের খাতাটি  সম্পূর্ণ ভিজে গেছে এবং ঘরের এক কোণে পড়ে আছে। স্বামীর সব জিনিসের দিকে নজর যাচ্ছে এবং কান্নায় তার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখন তার নজর পড়লো ঘরে একতারাটা নেই । তরীর মনে পড়ল সেদিন যখন আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে, নদীর তীরে এক নৈসর্গিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, সেই দৃশ্য দেখে জগাই আনন্দে একতারাটি সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল তার মা অর্থাৎ মূজনাই নদীর তীরে সেই বকুল গাছটির কাছে । তার মনে এই কালো মেঘ গভীর ভাবের জন্ম দিয়েছে। এবার তার একতারা উঠবে গেয়ে। তরী তাকে বারণ করল, বাইরে যেতে। অন্য সময় কখনোই সে তাকে বারণ করে না, আকাশের ঘন মেঘর ভয়ংকর রূপ তরীকে ভীত করে তুলছিল । যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে। কিন্তু সে তরীকে বুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে পড়ে। এই তাদের শেষ দেখা । তরীর মনে সেখানেই বারে বারে টেনে চলেছে । সূর্য ডুববে ডুববে। তাই শেষ পর্যন্ত সে এবং গ্রামের দু একজন পরিচিত লোককে সঙ্গে নিয়ে ছুটে এল সেই বকুল গাছটির কাছে । প্রবল বন্যায় বকুল গাছের কাছে ফাটল দেখা দিয়েছিল। গাছটি মাটি সহ উপরে পড়ে আছে মুজনাই নদীর স্রোতের ধারায় । নদীর পাড় থেকে গাছটা যেখানে পড়ে আছে তার গভীরতা প্রায় তেরো-চোদ্দ ফুট হবে। এখানে যে বাঁশের মাচাটি ছিল সেটা জলে ভেসে চলে গেছে। আলো আঁধারের ফলে সবই অস্পষ্ট দেখাচ্ছে । তরী এবং বাকিরা জগাই জগাই বলে চিৎকার করছে কিন্তু কারো কোন সাড়া নেই। নদীর তীরে বিষন্ন হয়ে সবাই বসে আছে। মুজনাই প্রবল গতিতে বয়ে চলেছে। পাহাড় ধৌত গৈরিক জল, বড় বড় গাছ, মৃত পশু ভেসে চলেছে নদীর বুকে । কোথাও কোথাও দেখা যাচ্ছে বড় বড় পাক । সেই পাকে মৃত পশু গাছপালা তলিয়ে যাচ্ছে। ওরা বুঝলেও জগাই হয়তো নদীর জলেই তলিয়ে গেছে ।

         ওরা ফিরে আসার জন্য প্রস্তুত হলো একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে । ঠিক এমন সময় ওই বকুল গাছের শেষ মাথায় যা নদীর সঙ্গে মিশে আছে একটি মানুষের হাত দেখা যাচ্ছে। আর সেই হাতে ধরা আছে একটি বাদ্যযন্ত্র। এটা প্রথমে তরীর নজরে পড়ে । সে চিৎকার করে ওঠে। জগাই জগাই বলে। জগাই তরীর ডাক শুনতে পায়। শরীরের শেষ শক্তি জড়ো করে একতারাটার তারে একটা টান দেয়, তার অস্তিত্বত্বের ইঙ্গিত দেয় । সবাই চিৎকার করে ওঠে, 'জগাই বেঁচে আছে জগাই বেঁচে আছে'। জগাই কে বাঁচিয়ে রেখেছে তার মা মুজনাই জগাইকে বাঁচিয়ে রেখেছিল তার প্রিয় বকুল গাছটি জগাই কে বাঁচিয়ে রেখেছিল তার গ্রামের মানুষের ভালোবাসা। জাগায় কে বাঁচিয়ে রেখেছিল একতারার সুর, তরীর প্রেম । জগাই ফিরে এলো । জগায়ের একতারা আবার বেজে উঠলো, তার কন্ডোম উঠলো গেয়ে । মুজনাই নদী ও প্রকৃতি তার স্নেহের আঁচলে বেঁধে রেখেছিল তাকে । প্রকৃতি শাশ্বত শিল্পী তাই আরেক শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখলো শিল্পের খাতিরে।


 

ভৌতিক গল্প 


অলৌকিক 

শুভেন্দু নন্দী 


ক্লান্তিতে অবসন্ন দেহ ও মন। প্রচন্ড ক্ষুধায় কাতর ঐ পরিশ্রান্ত পথিক। সন্ধ্যা নেমেছে। চারিদিক ঘোর কালো ও ঘুপসী আঁধার। অমাবস্যার রাত। কে যেন এদিকেই আসছে ক্ষিপ্র গতিতে। চোখ দুটোও জ্বলছে অন্ধকারে।  যেন শিয়ালের ধূর্ত চোখ এদিক-ওদিক কিছু খুঁজছে। কিছুদূরে একটা জীর্ন,দীর্ন চালাঘর। ঘরের দেওয়াল মাটির। চারিদিক খোলা। ঐ আগন্তুক দাওয়ায় উঠে দরজায় মৃদু টোকা দিতে থাকে। প্রথমটা কোনও সাড়াশব্দ মেলেনা।
- কেউ কী আছেন? পথিক ক্ষীণ স্বরে বলতে থাকে।
কিন্ত কোনও উত্তর মেলেনা।
তারপর হঠাৎ ক্যাঁচ করে একটা আওয়াজ হোলো আর দরজাও খুলে গেলো।
- কে তুমি? একটা নারীকন্ঠের আওয়াজ। 
- এই ঘরে তুমি থাকো? একটু জল খাওয়াতে পারো?
' জল? ঐ যে পুকুর দেখছো- ওখানে যাও- এই নাও
ঘটি।
- ওতো কচুরপানায় ভর্তি-  এঁদো পুকুর!....
- দাঁড়াও । আমি আসছি -
পথিক দেখলো সামনে নারী মূর্তি, সারা দেহ সাদা
কাপড়ে ঢাকা।
-তুমি কে? অন্ধকারে তো মুখ দেখা যাচ্ছেনা। ঘরে প্রদীপ জ্বালাও নি কেন?
- তেল নেই। আমি... কিছুক্ষণ থেমে বললো- অমি রমলা।
- কি হোলো? চিনতে পারলেনা আমাকে? এসো, আমার সঙ্গে।  ঘটিটা আমায় দাও।জল পান করার
পরে পরেই হঠাৎ বাতাসের হাওয়ায় আবরন উন্মোচিত ও 
নারীর রক্তশূণ্য ফ্যাকাসে মুখ আর মাংসহীন কঙ্কাল শরীর দেখে পথিকের মেরুদন্ড দিয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে নামলো। আতঙ্কে মুর্ছা গেলো। অনেকক্ষণ নীচে পড়ে থাকলো। জ্ঞান হতে দেখলো জনা দুই মানুষ তাকে ঘিরে রয়েছে।
- আমি কোথায় ? পথিক ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলো।
ঐ দুজন সমস্বরে বলে উঠলো-" তুমি শ্মশানে পড়েছিলে। আমরা দেহ সৎকার করতে এসেছিলাম এই শ্মশানঘাটে - কিন্তু তুমি আসলে কি করে এখানে?
- আমি অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে একটা ভাঙ্গা চালাঘরের কাছে এসেছিলাম। ওখানে ' রমলা' বলে একজন স্ত্রীলোকের দেখা পেয়েছিলাম। ও আমাকে পুকুর পাড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো।
- পুকুর কোথায় ? ওটাতো একটা শীর্ণকায় নদী- শ্মশানঘাট! আরে! রমলাকে তো আমরাই দাহ করে ফিরছিলাম। আমরা এই দুজন ছাড়া সবাই চলে গ্যাছে। তোমাকে দেখেই তো দাঁড়িয়ে পড়লাম। তা, তুমি কী রমলাকে চিনতে? একজন প্রশ্ন করলো।
- বিলক্ষণ। কিন্তু তোমাদের কথামতো সে তো আর নেই! এ কি করে সম্ভব?  
কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো ঐ আগন্তুক, 
- তাকে তো আমি অন্ধকারে ভয়ংকর অবস্থায় দেখেছি। ভাবতেই পারছিনা
- তুমি কী তাকে আগে থাকতেই চিনতে? তার সাথে কিভাবে তোমার পরিচয় হয়েছিলো ? এই নাও, জল খাও"
জল পান করে পথিক বলতে শুরু করলো।
- সে এক বিরাট কাহিনী। বাবা-মায়ের একমাত্র কন্যা রমলা। ওই গ্রামেই আমি থাকতাম। ওর বাবা দূরারোগ্য ব্যধিতে মারা যান। ওঁর জীবদ্দশায় আমিই তাঁর দেখাশোনা করতাম। সংসারের কাজ সামলাতো মা আর মেয়ে। ফলে রমলার সাথে একটা ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওর বাবা ইতিমধ্যে মারা যান। একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে ওর বাবা কাজ করতেন। বেশ কিছু টাকা কোম্পানী ওদের পরিবারকে সাহায্য করেছিলো, সবটাই আমার উদ্যোগে। যাই হোক, আজ রাজনগর স্টেশন থেকে ফিরতে দেরী হয়ে গেলো। ট্রেনে ট্রেনে ফেরি করি। ট্রেনেই কখন যে আমার পিকপকেট হয়ে গেলো বুঝতে পারিনি। একেবারে কপর্দকশূণ্য হয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়। খিদের জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠি। কোন্ এক অদৃশ্য শক্তি যেন আমাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। আমার বাড়ির কোনও ট্রেস পাচ্ছিলাম না। পাড়াগাঁ থেকে উঠে এসেছিলাম এই আধা-শহর রাজনগরে নতুন বাড়িতে । বাবার ব্যবসায়ে উন্নতির জন্যই তো এখানে আমাদের আগমন। যা বলছিলাম। অদ্ভূত ভাবে একটা চালাঘরের কাছে এসে পড়লাম। পিপাসা পেয়েছিলো প্রচন্ড।  তারপরেই তো সাদা কাপড় পরা একজনের সঙ্গে দেখা, তবে অবগুন্ঠনে ঢাকা। জল চাইতেই তার গলা শুনে ঠাহর হোলো সে একজন নারী। আমাকে চিনতে পেরে বলে উঠলো " আমি তোমার রমলা।" এটুকু ঠিকই ছিলো।  তার দেওয়া ঘটিটা তার কথামতন তাকে দিতেই হাওয়া়য় উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া তার শরীরের সাদা আবরন আর রক্তশূণ্য মাংসহীন কঙ্কাল শরীর দেখেই আমার জ্ঞান হারানো। 

বলে পথিক থামলো। একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলো-
ওর বাবা মারা যাবার পর নিত্য আমার যাওয়া-আসা চলতে লাগলো। আর তার সাথে সাধ্যমত আর্থিক সাহায্য। কিন্তু ওর মা আমাদের এই সম্পর্ককে একদম মেনে নিতে পারেননি। তাই আমিও ও বাড়ি যাওয়া-আসা একসময় ছেড়েও দিলাম। কিন্তু রমলা আমাকে ভালোবাসতো।
- শোনো এবার আমরা তাহলে বাকিটুকু বলি  কেমন। গ্রামের একজন বয়স্ক লোকের সাথে ওর মা বিয়ে ঠিক করেছিলো। টাকা-পয়সাওয়ালা লোক। দেখতে কুৎসিত আর গায়ের রং কালো- সবটাই আমাদের শোনা কথা। এই নিয়ে মা-মেয়ের সাথে প্রচন্ড অশান্তি,ঝগড়াঝাঁটি। তখন মেয়ের বিষপানে আত্মহত্যা। 
- কখন ঘটেছিলো ব্যাপারটা?- আগন্তুকের প্রশ্ন। 
একজন বলে ওঠে, "এই তো আজ ভোরবেলা। আমরাই তো থানায় গিয়ে সব ফর্মালিটি সেরে তার দেহের দাহকার্য সম্পন্ন করে ফিরছি। "
- তা বাবা, তুমিই কী রামদয়াল শর্মা? তোমার নাম ঐ বাড়িতে অহরহ শোনা যেতো। তাই অনুমান করেই বলছি"
- আজ্ঞে হ্যাঁ। আমিই সেই হতভাগ্য রামদয়াল
-তাহলে তার অতৃপ্ত আত্মাই মরণের পরে তোমাকে ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ জল খাওয়াতে নিয়ে গেছিলো।পরিত্যক্ত ভাঙা বাড়ির সন্ধান হয়তো আগেই পেয়েছিলো, একেবারে শ্মশানের নিকটে। হায়রে! কী মর্মান্তিক ঘটনা- একেবারে অলৌকিক।  এখন রাত দশটা। ঐ দোকানটায় বসে চা- বিস্কুট খাওয়া যাক। তারপর না হয় বাড়ি যাবে। সারাদিন তোমার তো খাওয়া হয়নি বাবা।"
- ঠিক আছে। এখানে সারা রাতই দোকান খোলা থাকে, তাই না?
- হ্যাঁ। টোটো রিক্সাও পাবে তুমি। তবে চার্জ একটু
বেশী। এই যা। এই নাও পঞ্চাশটা টাকা। আমি রমলার মামা।"
এর পরে রামদয়াল তাঁকে প্রণাম করলো। তারপর ধীর পায়ে অগ্রসর হোলো।


 

ভয় পাবেনা কেউ

মনোরঞ্জন ঘোষাল


জানালার ধারে আনমনে বসে লিখছি। হটাত কানে ভেসে এল পাতার খসখস শব্দ! কেউ যেন হেঁটে 

চলেছে। ঠিক জানালার পাশ দিয়ে!

জানালা বন্ধ। তাড়াতাড়ি তা খুলে একবার উঁকি মেরে দেখলুম, কেউ কোথাও নেই।

তাজ্জব ব‍্যাপার! দিনের বেলায় এমন ভূতুড়ে কাণ্ড।

ভয় লাগছে না, জাগছে বিস্ময়!

আজকেই পাড়ার একজন মারা গেছে। মাঝে মধ্যে সে এই পথেই বাগানের দিকে যেত। তবে কি……!

ধ্যেত ! কি সব আজে বাজে ভাবছি। ও সব আবার কিছু হয় নাকি?

তা হলে এটা কি? ……

বিজ্ঞান  অপবিজ্ঞান কেমন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। বাস্তব আর অবাস্তব আলাদা করতে পারছি না। দর্শন ইন্দ্রিয় গ্রাহ্যতা কার উপরে আঙুল তুলে প্রশ্ন করব? মনের মধ্যে এমন নানান সতেরো প্রশ্ন এসে হাজির হচ্ছে। কিছুতেই তাদের সমাধান করতে পারছি না।

অনেকটা সময় আমাকে ওই ঘটনা বিচলিত করে রাখল। তার পর আমি ও সব ভুলে আবার নিজের কাজে মনোযোগ দেব ঠিক করেছি।

কানে ভেসে এল ফিসফিসানি আওয়াজ! ভাঙা ভাঙা গলায় কে যেন বলছে-

কি…রে কা…কা লে…খা প…ড়া ক…র…ছি…স?

শব্দ গুলো যেন কোন গভীর গহ্বর থেকে হালকা ঢাকনা খুলে বেরিয়ে এল। যেন বহু কষ্টে সে বেরিয়ে আসছে অন্দর থেকে।

শুনে আমি তো পাথর। হাত পা যেন নড়তে চাইছে না। ভয়ে অস্ফুত স্বরে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা শব্দ- ভূত। ভূত। ভূত।

আমার মনে হল আমি, চিৎকার করে বলছি, কিন্তু কানে কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।

মুখের উপরে কে যেন অদৃশ্য হাত দিয়ে চেপে ধরেছে। শব্দ বের হতে দিচ্ছে না। আমিও প্রাণপণে শব্দ বের করার চেষ্টা করছি। যেন কি অসম্ভব শক্তি , আমি কিছুতেই তার সঙ্গে পেরে উঠতে পারছি না।

দু জনের কি বিশাল ধস্তাধস্তি। তার পরের কিছু আর মনে নেই।

বলল, নাকি লেখার বিছানায় পড়ে গোঁ গোঁ করছিলাম। সবাই ধরে ঘরে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল। ঘণ্টা খানেক পর নাকে গোটা হলুদ পোড়া শোঁকাতে তবে চাঙ্গা হয়ে উঠি।



 

ভ্রমণ 


চরৈবেতি (পর্ব উটি)

রণিতা দত্ত 


উত্তরবঙ্গে থাকি। এমন অভ্যেস নষ্ট করে রেখেছি যে, একটু গরমে হাঁসফাঁস। ঝটপট চলে যাওয়া দার্জিলিং বা কালিংপং বা তৎসংলগ্ন পাহাড়ে। তরতর করে উঠেপড়া স্বস্তি পেতে। একটা উইকএন্ড। ঠান্ডা হওয়া খানিক। আবার এসে কাজে ঝাঁপ। অদম্য এক ইচ্ছে,ভারতের দক্ষিণের পাহাড় দেখার। ইচ্ছেটা মনে মনে পুষে রাখি। বায়না করি পশ্চিমের ঘাটমালা নীলগিরি, আন্নামালাই ঘোরার । আমার সঙ্গীটি বোঝেন না। বলেন, " পাহাড় তো পাহাড়ই! ওর আবার উত্তর দক্ষিণ কি আছে..!" 






আসলে নিজের বিষয় বলে জানি, প্রাচীনতম শিলার কি আদি অকৃত্রিম গঠন,নিরক্ষীয় উষ্ণমন্ডলের স্বাভাবিক উদ্ভিদের ঘন সবুজ বিস্তার, ভিন্ন ধরণের ফল ফলাদির ফলন, মানুষের জীবনযাপনের রস রূপ রঙ সবেতেই কি ভীষণ বণ্য সুগন্ধি। বিচিত্র বৈচিত্র যে আনাচে কানাচে রয়েছে। ওখানে না গেলে ভারি লোকসান হয়ে থাকতো। সত্যি বলতে কি ঘোরা বেড়ানোটা একটা নেশা। ইস্কুলে হলিডে লিস্ট পেয়ে পোগ্রাম করে রেখেছিলাম। হঠাৎ করে দাবদাহ কোথাও একটা বাড়লো। আমার শহরে তখনও হালকা কিছু গায়ে দিতে হয় ভোরের আয়েসী ঘুমে। শিক্ষাবর্ষে নির্দিষ্ট নির্ঘন্টকে নস্যাৎ করে গ্রীষ্মবকাশ ঘোষিত হল। অতয়েব টিকিট কেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়া হলো।

ভোর ভোর বাড়ি ছাড়লাম। বাগডোগরা থেকে। ৭:৪৫ মি এ ফ্লাইট। পৌঁছে গেলাম বেলা ১১:২৫ এ। কেম্পেগৌড়া আন্তৰ্জাতিক বিমানবন্দরে।গাড়ি ঠিক করা ছিল। প্রযুক্তিনগরীকে অতিক্রম করে ছুটে চলল আমাদের "মেক মাই ট্রিপ "সংস্থা থেকে বুক করা চারচাকাটি | মাইসর এক্সপ্রেস হাইওয়ে ধরে চললাম। পথে ইডলি মেদুবড়া খেয়ে জঠরের যজ্ঞাহুতি হলো।আমাদের ক্যাব ড্রাইভার মুরলী এগেলেপ্পা। দক্ষ গাইড, অনর্গল কথা বলতে আলাদা চার্জ করে না।তাই এট্টুও যান্ত্রিক লাগছে না যাত্রা। যেতে হবে কম করে সাত ঘন্টা মত। কিছুটা এগিয়েছি ও আমাদের দেখতে বলল জানলার বাইরে। দেখি পাথুরে ঢালে বড় বড় প্রস্তরচাই ব্যালেন্স করে দাঁড়িয়ে। এগেলেপ্পা বলল, "সাব এয়ে শোলে সিনেমার গব্বরের ডেরা হ্যায় 'রামগড়'হ্যায়।" ভারি ভাল্লাগলো। রোমাঞ্চিত। মনে হচ্ছে এক্ষুনি ভারি গলায় গব্বর সিং বলবে,, "আরে ও.. হঃ শ্যামহা কিতনে আদমি থে...." বলেও ফেললাম সেই ডায়লগ।





একটু এগিয়ে ডানদিকে গেলে সিল্ক সিটি রামাশা। এরপর গাড়ি ঢুকলো বান্দিপুর রিজার্ভ ফরেস্টে। ঢেউ খেলানো টোপগ্রাফির ওপর দিয়ে গাড়িটা ক্রমশ উঠছে, গাছপালার প্রকৃতি বদলে গেছে। কর্নাটকের এই অভয়ারণ্যে বাধ্য ছেলের দলের মত সম্ভর আর চিতল হরিণ দলবেঁধে আমাদের অভ্যার্থনায়। ওদের করুনদিঘল মায়াবী চাউনিতে অদ্ভুত ভালো লাগা। নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ হাতি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ি অবলোকন করে যাচ্ছে।খানিকটা দূরে পাঁচ সাতটি হাতি দলধরে খাওয়ারের খোঁজে। ঝোপে গাছের নাতিউচ্চ ডালে ময়ূর লেজ নামিয়ে বসে। শুনলুম প্রায় দুশোটির মত বাঘ রয়েছে এই জঙ্গলে। ঘন হচ্ছে বনজঙ্গল, সরু হয়ে আসছে রাস্তাঘাট। দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে । আলোছায়ায় মাখামাখি বনানী। ততক্ষনে আমরা বান্দিপুর ছেড়ে তামিলনাড়ুর মধুমালাই জঙ্গলে প্রবেশ করে ফেলেছি। দিনের আলোটুকু নিভে গেছে। ছায়া ঘেরা বিক্ষিপ্ত পশ্চিমঘাটের বিচ্ছিন্ন অংশ একদিকে আর সামনে প্রাগৈতিহাসিক কোন প্রাণীর মতো আধশোয়া অলস নীলগিরি। তারই পিঠবেয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে উঠেছে সরীসৃপের মতো পাকদণ্ডী পথ। এক্কেবারে প্রান্তে কিছু লোকালয়। গ্রাম বুরলিয়রে।এখানে একটু বিরতি।এতক্ষন জঙ্গলে গাড়ি দাঁড়ানোর অনুমতি ছিলনা। তামিলনাড়ুর নীলগিরি জেলার ছোট্ট গ্রাম এটা। সেখান থেকেই শুরু আরও চড়াই শুরু । এরপর ৩৬টি হেয়ার পিন টার্নিং। প্রশ্নাতিত ভাবে চ্যালেঞ্জি।এট্টু পরপর টার্ন, গাড়ি সোজা হওয়ার আগে আবার টার্ন। বাঁক তো নয়,যেন নীলগিরির আদি বাসিন্দা টোডা রমণীর চুলের বিনুনি। এসে পৌঁছানো গেল স্টার্লিং রিসোর্ট। থাকবার জায়গার গাল ভরা নামে আত্মম্ভোরিতার গন্ধ পাবেননা মোটে। গ্যাটের পয়সা দিয়ে থাকিনা সেথায়। আসলে মেয়ে চাকরি পাওয়ার পর এই হসপিটালিটি চেইনের মেম্বারশিপ গিফট করায় বছরে মোটে সাতটা দিন থাকতে দেওয়ার বদন্যতা দেখান এরা। গরম খাওয়ার আর নরম বিছানা, ভোর থেকে লাগাতার ১৪-১৫ঘন্টা জার্নি। তলিয়ে যেতে যেতে কি ভীষণ উত্তেজনা অনুভব করলাম।মন ক্যানভাসে এঁকে নিয়ে ফিরতে হবে হবে পার্বত্য রাজকন্যের রূপের ডালি। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।





পরদিন ঝকঝকে রোদ। কুয়াশা ঘেরা পাহাড়ের মাথায় যেন স্ফটিক মুকুট। পাহাড়ের মাথায় মেঘ লেগে আছে 'তাতা' ফুলের সাদা পাপড়ির মতো। ‘তাতা’ শব্দের অর্থ দাদুর মাথা! শুকিয়ে গেলে গোল তাতা ফুলের পাপড়ি সাদা হয়ে যায়। তাই অমন নামকরণ। চোখ বুঁজে একবুক বাতাস দিয়ে উড়িয়ে দিতে হয় পবিত্র এই ফুলের মিহি পাপড়ি। মনে মনে প্রার্থনা করতে হয় কিছু একটা।   

ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম। পাহাড়ের গায়ে ভেড়ার লোমের মতো ঘন চা বাগান। চা পাতায় নরম রোদ পড়ে চকচক করছে ব্রেজিলিয়ান পান্নার মতো!প্রথম গন্তব্য সিক্সথ মাইল। প্রায় ৩০ মিনিটের পথ। চারিদিকে সবুজ পাহাড় আর নরম ঘাসের গালিচা বেছানো উপত্যকা। বেশ কিছু সময় প্রকৃতির কোলে সময় কাটিয়ে পৌঁছে গেলাম 'নাইনথ মাইল' । প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি এই দুইটি স্থান শুটিং স্পট। 

            এবারে পৌঁছে যাওয়া গেল পয়করা লেক। এক্কেবারে ছবির মত দৃশ্যপট। মনোমুগ্ধকর ।দেখলাম এখানে বোটিং এবং হর্স রাইডিং এর ব্যবস্থা আছে । বয়স বাড়ার সাথে সাথে ওসব হুজ্জুতি মনে হয়। তাই লেককে বা'হাতে রেখে পায়ে পায়ে পঞ্চাশ মিটার মত হেঁটে পৌছালাম পয়করা জলপ্রপাতের সামনে। অদ্ভুত সুন্দর এক চঞ্চল কিশোরীর মত প্রপাতখানা। সুতীব্র জলপ্রপাতের প্রবাহমানতা মনকে জাস্ট ছুঁয়ে গেল। জলধারার সৌন্দর্য্যে বুঁদ হয়ে থাকলাম কিছুক্ষন। তারপর পৌঁছে গেলাম চকলেট ফ্যাক্টরিতে। ঘুরে ফিরে চকলেট ফ্যাক্টরি দেখে সেখান থেকে ভাঙা চোরা ইংরেজিতে হোমমেড চকলেট তৈরীর রেসিপি জেনে নিলাম। এখানকার চকলেটের স্বাদ বাজার চলতি চকলেটগুলির থেকে এক্কেবারে আলাদা । যেহেতু আমি চকলেটপ্রেমী মানুষ। এখান থেকে চকলেট কিনতে তাই ভুললাম না । এবারে খোঁজে ছিল এক 'নো ম্যানস ল্যান্ড' যেখানে পিন পতনের নিঃশব্দতা, একটিও টুরিস্ট সচরাচর নজরে পড়েনা এমন জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার। পায়করা রিজিয়ানে ই আছে এমন কিছু টোডা জনজাতির গ্রাম।প্রাচীন পদ্ধতিতে সেখানে চাষাবাদ হয়। প্রত্যন্ত কৃষি আর পশুপালন আদিবাসীদের জীবিকার ভিত্তি। খ্রিস্ট পূর্বাব্দের টোডে গ্রামে ঘুরে ফিরলাম। 




আজ দ্বিতীয় দিন। সক্কাল সক্কাল উঠে পড়েছি। অনেকটা সময় নিয়ে যেখানে আছি সেই প্রপার্টিটা টহল মারলাম। একটু আউটকার্স হলে নিরিবিলিতে থাকা যায়। এই প্রপার্টিটা নিজেই খুব সুন্দর যে মনেহলো একটু হেঁটে ঘুরে নেওয়া যেতেই পারে। ঘাস জমিতে গাছের গায়ে ঝুলে থাকা আর্কিড মোহিত করে দিচ্ছিলো।ব্যালকনির নীচে ফুটেছে ‘জিমিকি পো’, গ্রামোফোনের মতো দেখতে ‘রেডিও পো’ অর্কিড। এতো স্নিগ্ধ সকাল। ভাল্লাগছিল খুব। বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়। রাস্তার নাম 'রামকৃষ্ণ মার্গ'। দেখি দু পা এগিয়েই এক খন্ড প্রশান্তির আশ্রয়। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ মঠ। আড়ম্বর নেই,ছোট্ট অথচ সমাহিত। মনটা টইটুম্বুর হয়ে গেল। ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম উটির বিখ্যাত দোদাবেত্তা পিক দেখতে। বেস লেভ্যেল থেকে ৮৬৫২ ফিট উচ্চতায় রয়েছে দোদাবেত্তা,নীলগিরি পর্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ । এখানকার টেলিস্কোপ হাউস থেকে দূরের শৃঙ্গকে দেখে মনে হল যেন গিয়ে ছুঁয়ে দিয়ে চলে আসি।! এই স্থানটি থেকে সম্পূর্ণ উটির একটা সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করা গেল ।দোদাবেত্তা থেকে গাড়ি চেপে ১০ মিনিট দূরত্ব অতিক্রম করে পৌঁছে গেলাম টি ফ্যাক্টরি ভিউ পয়েন্ট । এক কথায় বলতে গেলে এটি চা এর মিউজিয়াম । চা বাগানের বিপণি থেকে চা খেয়ে এগিয়ে চললাম বোটানিক্যাল গার্ডেনের দিকে । এই বাগানটি সজ্জিত রং বেরঙের ফুল আর গাছের সমারোহে। এই বাগান দেখার পর মিনিট দশেক দূরত্বে পৌঁছে গেলাম রোজ গার্ডেনে। শোনাগেল এই গোলাপের বাগানে মোট ৪০০০ প্রজাতির গোলাপ গাছ রয়েছে। আমার সিজিন টাইমে এসেছি। নিরাশ করেনি সুন্দরী গোলাপের বাগিচা। যাত্রাপথে চলতি এক রেস্তরাঁতে লাঞ্চটা সেরে ফেললাম ।





'হেরিটেজ টয় ট্রেন'এ ওঠার বায়না করলাম না। দার্জিলিং এর জন্য ওঠা তোলা থাকুক। ট্রেনের ঝিকঝিক এর সাথে ' কস্ত মে লাহি লে লেই মা..'গানটা তো এখানে মিস করতে হবে। খাওয়া দাওয়া সেরে প্রায় আধ ঘন্টার পথ অতিক্রম করে পৌঁছে গেলাম উটি লেকের ধারে। ওখানে অনেকটা সময় কাটিয়ে ফেললাম। এতো মানুষজন দেখেই সময় কেটে যায়। সুভিনিরশপ ঘুরতে কি কম সময় লাগে! এবারে হোটেল ফেরার পালা । শহুরে যানজট বড্ডো বিব্রত করে। উটি দার্জিলিং এগুলো বড্ডো জণাকীর্ণ। একটু আউট কার্স লোকেশন থাকবার জন্য ভালো। ফিরে  তল্পিতল্পা গুটিয়ে রাখলাম। পরদিন একটু আর্লি ব্রেকফাস্ট সেরে রওনা হবো কোদাইকানালের উদ্দেশ্যে। ভোর ভোর চড়ে বসলাম। তখন জেগে ওঠে নি শৈলশহর উটি। শুধু কানঘেঁষে ফিসফিস বাতাসের শুনশান বয়ে যাওয়া। শিরশিরে বাতাস। বয়ে যাওয়া শূন্যতা ধুয়ে দেয় ফেলে আসা কংক্রিট শহর আর তার মলিন ধুলো। ইতিউতি নীল নীল পাহাড়ের সার। আকাশ ছুঁয়ে যাওয়া পাইনের বন। পাইন বনে খোঁজাই যেতে পারে ১২ বছর পর ফুটে ওঠা ফুল নীলাকুরঞ্জি।কি মোহময় মায়া সে একযুগ পর পর ফোঁটা নীলাব্জ ফুলে। কোন দিন দেখা মিললে দেখাবো প্রমিস রইলো।


 

সুনীল সাগরে,  শ্যামল কিনারে

অনিতা নাগ 


সুনীল সাগরকে সামনে থেকে দেখা খুব ছোটবেলায়। বয়স তখন চার। ভুবনেশ্বর ঘুরে পুরী যাওয়া। স্মৃতি বলতে অনন্তধ নীল জল। ঢেউ এর ভাঙা আর গড়া। বালি আর বালি। বালিতে বসে ঘর বানানো আর ঢেউয়ে ঘর ভেঙে যাওয়া। ডেকচিওলা। সিঙারার গন্ধ। নুলিয়া। তারা হাতে একটা বড় কালো টায়ার নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। মা বলতেন, এরা জলের পোকা। জলেই জীবন। সারাদিন এই জল নিয়েই বেঁচে থাকে। দাদারা নুলিয়ার সাথে  ভাসতে ভাসতে সমুদ্রের কতো দূরে চলে যেতো। আমার ভয় করতো। বাবা হাত ধরে আমাকে স্নান করিয়ে দিতেন। সারা গায়ে বালি।  মুখের ভেতর নোনা স্বাদ। এতো সুন্দর দেখতে জল এতো নোনা কেনো! খুব রাগ হতো। তবু ওই ঢেউয়ের ভাঙা গড়া কেমন ভালো লেগে গিয়েছিলো। 

এরপর যাওয়া অনেকটা বড় হয়ে। তখন সমুদ্রকে ভালোবেসে ফেলেছি। নিমেষহারা তাকিয়ে থাকা নীল জলরাশির দিকে। ঢেউয়ের সঙ্গে মন ভাসিয়ে নিজেকে  ভাসিয়ে নিয়ে চলা। ততোদিনে রবিঠাকুরের সাথে নিবিড় সখ্যতা। সুখে, দুখে, আনন্দে তিনিই আশ্রয়। ডিঙি নৌকার মতো ঢেউয়ের সাথে ভেসে চলা,  ‘দূরে কোথায়, দূরে দূরে’। তখন মন বড় অশান্ত। জীবনে নানান টানাপোড়েন চলছে। সব কেমন ফ্যাকাসে, রঙহীন। কিচ্ছু ভালো লাগে না। তবু বয়ে চলতে হয়। সমুদ্রের সামনে এসে দাঁড়ালে এক ম্যাজিকে সব আলো আলো হয়ে যেতো। এই যে অনন্ত জলরাশি বয়ে চলে আপন ছন্দে, কে দেখলো, কে আনন্দ করলো,  তাতে তার বয়েই গেলো। তার  মন খারাপের সময় কোথায়! একদন্ড বিরামের সময় নেই।  চরৈবতি। জীবন  ও তো তেমন। তোমার জন্য সময় অপেক্ষা করবে না। সমুদ্র মানে জীবন, জীবিকা, পর্যটন। দেশের সুরক্ষা।  আরো কতোকিছু। সমুদ্র সৈকতে কতো রূপ, রস, গন্ধ। কেনাবেচা, হৈহৈ। যাকে নিয়ে এতো আয়োজন সে কিন্তু বিরামহীন বয়ে চলেছে। যে’কদিন সমুদ্র শহরে ছিলাম নতুন করে সখ্যতা হলো এই সুনীল জলরাশির সাথে। সে শেখালো মন খারাপ আগলে বসে থাকলে মন ভালো হয় না। দুঃখকে ভাসিয়ে দাও। মনে মনে নত হলাম সেই  সুনীল জলরাশির সামনে। রোজ সকালে সূর্যোদয়ের আলো মেখে হেসে খলখল, গেয়ে কলকল। সকাল থেকেই উৎসব শুরু হতো তাকে ঘিরে। জেলেরা নৌকা বোঝাই করা মাছ নিয়ে বালির চড়ায় এসে দাঁড়াতো। চকচকে রূপোলী মাছ। নিমেষে বিক্রি হয়ে যেতো। খুশীর হাওয়া পালে লাগিয়ে আবার সে নৌকা  ভেসে পড়তো সাগরে।

 তৃতীয় দর্শনে এই সখ্যতা আরো গভীর হলো বিয়ের কয়েক বছর  পর প্রিয় মানুষটির হাত ধরে যখন এসে দাঁড়ালাম এই অনন্ত জলরাশির সামনে তখন অনেকটা পরিণত । মন তখন পূর্ণ। সেই কৃতজ্ঞতা নিয়ে যখন তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম মুহুর্তে এক ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিলো পায়ের পাতা। শিহরিত আমি। এমনও হয়! হয়, হয়। সে সব বোঝে। মনের কথা খানি পড়ে নেয় অনায়াসে। যে'কদিন ছিলাম শুধু  আনন্দ আর আনন্দ। তারপর কতোবার গেলাম। মা বাবা আর মেয়েকে নিয়ে  আনন্দ যাত্রায়।  তখন তার কাছ থেকে  আনন্দ নিয়ে এসেছি দু’ হাত ভরে। ছেলেকে নিয়েও গেছি। সাথে  মা বাবা। মা বাবা’ কে নিয়ে শেষ বেড়ানো সমুদ্র শহরে। সেই  আনন্দ  রাখা আছে স্বযত্নে আপন মনের অলিন্দে। বারবার গেছি তার কাছে। শূন্য ঝুলি পূর্ণ  করে দিয়েছে আপন মাধুরী দিয়ে।

জীবন বয়ে চলে আপন ছন্দে।  সে'দিনের সেই  ছোট্ট মেয়েটা তখন রীতিমতো ঘোর সংসারী। কর্তার কাজের সুবাদে ভারতবর্ষের  বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে ঘুরে  ক্লাম্ত। এক ঘর থেকে অন্য ঘর। চেনা মানুষ  ছেড়ে  অচেনা মানুষ। সংসার, ছেলে মেয়েকে বড় করতে করতে সমুদ্র প্রেম তখন মনের কোন গহীনে কপাট বন্ধ  করেছে কে জানে! হঠাৎ  সুযোগ হলো সমুদ্র শহরে যাওয়ার। যেখানে সে আগে কখনো যায় নি। শরৎচন্দ্রের বইতে পড়া ওয়ালটেয়ার, বর্তমান নাম ভাইজাক। সত্যি বলছো! এটাই ছিলো প্রতিক্রিয়া। সমুদ্র শহরে থাকবো! রোজ তাকে দেখতে পাবো! হ্যাঁ গো হ্যাঁ। রোজ কি,  ইচ্ছে হলেই  দেখতে পাবে। বারান্দায়  বেরুলেই দেখতে পাবে। 

শুধু সমুদ্র  নয়। সেখানে আরেক প্রিয় পাহাড়ও আছে। শুরু হলো অপেক্ষা।  ছেলের ১০ ক্লাসের পরীক্ষা দিয়ে এলাম সমুদ্র শহরে। এ’ তো অবিশ্বাস্য। কি অপূর্ব শহর। সমুদ্র আর পাহাড় প্রহরীর মতো আগলে রেখেছে শহরটাকে। আবার তাদের রূপ, রস, গন্ধ  দিয়ে ঢেলে সাজিয়েছে শহরটাকে। আমার প্রিয় সখীকে সবসময় দেখতে পাওয়া! অবিশ্বাস্য! দীর্ঘ জীবনের সব অপূর্ণতা নিয়ে তার কাছে এলাম। এখানে সে রহস্যময়ী। পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলে। বালুকা বেলা এখানে নেই।  সাজানো শহর।  রাস্তার পাশ ঘেঁষে বাঁধানো জায়গা। সিঁড়ি দিয়ে নামা যায় সমুদ্রের কাছে। তবে পাথর থাকায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। আমার বাড়ী থেকে  বড়জোর ১০০ মিটার। সে তখন জীবনের সাথে  অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে গেছে। সক্কাল হলেই প্রাতঃভ্রমণে বেড়িয়ে পড়া। আঁধার সরিয়ে আলোর পরশে জেগে উঠ। তারপর সুনীল সাগরের অতল হতে সূর্যের আর্বিভাব। নীল সমুদ্রে তখন সোনালী আলোর লুটোপুটি। বীচ রোডে তখন শুধু  প্রাতঃভ্রমণকারীদের চলাফেরা।  সকাল সাড়ে সাতটার পর যানবাহন চলতো। সে’ এক অনির্বচনীয় মুহুর্ত। ঐ মুহুর্তটায় লুকিয়ে থাকতো কতো যে রহস্য। বৃষ্টির দিনে তাই মন খারাপ হতো। তবে তখন তো তার অন্য রূপ। তখন সে উত্তাল। ভয় হতো। অমাবস্যা, পূর্ণিমায় তার রূপ যেতো বদলে। চাঁদের আলোয় সে চির যৌবনা সুন্দরী,  চপলা এক নারী যেনো। তেমনি অমবস্যার নিকষ কালো আঁধারে সে রুদ্ররূপে নৃত্য করতো। 




 বেশ চলছিলো। হঠাৎ  এক অসুস্থতায় হারিয়ে গেলো জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। অনেক ডাক্তার, অনেক ওষুধ।  কিন্তু  কোনো কাজ হয় না। শরীরে জোর নেই।  মনে শক্তি নেই।  কি হবে আমার সংসারের! মেয়ে তখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে।  ছেলে এগারো ক্লাস। আমার জন্য এদের স্বপ্নগুলো যেনো অধরা না থাকে। ঘুরে আমাকে দাঁড়াতেই হবে। বারান্দায়  গিয়ে দাঁড়ালাম।  দূরে ঐ অনন্ত জলরাশি বয়ে চলেছে আপন ছন্দে। তার বয়ে চলাতেই আনন্দ। বাকী সব কিছু থেকে উদাসীন। কর্তাকে বললাম আমাকে তার কাছে নিয়ে চলো। ব্যাস্ত শহরে হাজার কোলাহল। ও'পারে সারি দেওয়া  জাহাজে আলো ঝিকমিক করছে। আমি বসলাম গিয়ে তার কাছে। শক্তি দাও। আলো দাও। তুমি তো হারতে শেখাও নি। পারের কাছে পাথরের বুকে আছড়ে পড়ছে ঢেউ।  আবার নতুন তরঙ্গ তৈরী হচ্ছে।  অনেকক্ষণ বসে রইলাম।  নিজের ভেতরে ডুব দিলাম। নিজেকে ফিরে পাওয়ার যাত্রা শুরু হলো।  এ’ একান্তে আমার লড়াই।  ফিরলাম এক সময়ে। এক নতুন যাত্রা শুরু হলো।  কিন্তু তার কাছে বারবার ছুটে যাওয়ার এই আকূতি বাড়তে লাগলো। কর্তা আর ছেলে বেড়িয়ে গেলে ধীরে ধীরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতাম। সূর্য  তখন মাঝ গগনে। সেই  উজ্জ্বল আলোয় সমুদ্রের জলে মণিমুক্তোর জলকেলি। দূরে দূরে বাণিজ্য জাহাজ চলেছে আপন ছন্দে। ঢেউয়ের মাথায় দোল খেতে খেতে দূর থেকে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে  জেলে নৌকা। কখনো ছাদে গিয়ে দাঁড়াতাম।  একটু একটু করে জোর ফিরে পাচ্ছিলাম। আপন ছন্দে বয়ে চলতে চলতে এমন কতো জনকে সে জীবন শক্তি ফিরিয়ে দিচ্ছে তার হদিস কে রাখে। মাঝে  মাঝে সমুদ্রের সামনে গিয়ে বসতাম। ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যেতো। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যে নামতো। ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠতো। আলোর রোশনাইতে ঝলমলিয়ে উঠতো সমুদ্র শহর। আমি ফিরতাম আপন কুলায়। ততোদিনে তার সাথে  সম্পর্ক আরো গভীর হয়েছে। সে আমার আরো নিবিড় হয়েছে। জীবনযুদ্ধে সে আমার জীবনদাত্রী। এ’ কথা কখনো বলা হয়নি কাউকে। কিন্তু যতোবার কোনো সমুদ্রতটে গেছি  মনে মনে তার কাছে নত হয়েছি। চারদিকের আনন্দ,  হৈচৈ এর মধ্যে  জীবন তাকে অন্য ভাবে চিনতে শিখিয়েছে। সে তখন আমার দৈনন্দিন জীবনের সাথে  আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গেছে। 

কিন্তু এই সুন্দর রূপের যে ভয়াল, মারণ রূপ দেখলাম ২০১৪ তে হুদহুদ সাইক্লোনে তা মনে থাকবে আজীবন। এমন ভয়াল রূপ কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। তিথি অনুযায়ী  সমুদ্র উত্তাল হয়। কিন্তু এমন ভাবে একটা সাজানো শহরকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে ভাবতেই পারিনি। মেয়ে বিদেশে, ছেলে প্রবাসে। একটা সময় এমন হলো আমার দাদা আর বন্ধুকে বললাম আমাদের খবর না পেলে ছেলেমেয়েকে দেখিস। প্রচন্ড গর্জনে সে ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সব। শুধু ঈশ্বরকে স্মরণ। রক্ষা  করো, রক্ষা করো। দু'দিন পর  যখন সে প্রলয় থামলো তখন শহরটা ধ্বংস হয়ে গেছে। যে সমুদ্র  আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিলো, তার এই রুদ্র,  ভয়াল রূপ কল্পনাতীত। কেটে গেছে অনেক বছর। সমুদ্র শহর ভাইজাক আবার নতুন করে সেজে উঠেছে। আমরাও সে শহর ছেড়ে চলে এচেছি। সে’ আসা যন্ত্রণার। মনে হয়েছিলো আমাকে আমার জীবন থেকে উপড়ে নিয়ে এলো। তবু সেটাই সত্যি। আস্তে আস্তে সব সয়ে যায়। আজও যখনই সমুদ্রের সামনে দাঁড়াই তখনই এক অদ্ভুত  ভালোলাগায় মন ভাসিয়ে দিই। আর বলি যতোদিন এ’ জীবন, ততোদিন তুমি আমার সাথেই আছো। চোখের আড়ালে,  তবে মনের আড়ালে নয়।  সম্প্রতি গিয়েছিলাম  ভারতবর্ষের দক্ষিণতম প্রান্তে। সেখানে তিন সাগর এসে মিলেছে। ভারত মহাসাগর,  বঙ্গোপসাগর আর আরব সাগর। তিন ধারাকে তাদের রঙের পার্থক্যে আলাদা করা যায় বটে, কিন্তু  তিন ধারার বিভেদহীন বয়েচলায় সেই   ছন্দ জীবনকে উত্তোরণের পথ দেখায়।  সমাজের চারদিকে যখন নানান বিভেদের বেড়াজাল, সহনশীলতা শূণ্যে গিয়ে ঠেকেছে, আলোর থেকে অন্ধকার যখন সমাজ ব্যবস্থাকে গ্রাস করছে তখন অনন্ত, বিপুল জলরাশি আপন চলার ছন্দে জীবনের চরম পাঠ শিখিয়ে চলেছে।  মনে পড়লো প্রাণের ঠাকুরের কথা ‘দেখেছি পথে যেতে তুলনাহীনারে’। তোমাকে নিয়ে জীবনের এই পথচলা আমার চলবে।  চড়াই- উতরাই,  আলো-আঁধার কাটিয়ে এগিয়ে চলবো।  চরৈবতি চরৈবতি।