Thursday, July 2, 2020

খেয়ালী
জয়তোষ ঘোষ 

ধোঁয়া মেঘের সংসার থেকে 
নিজেকে ছিন্ন করে প্রতিনিয়ত  
ঝড়ে পড়ো গাছেদের শরীর ছুঁয়ে ,
তোমার দলিত স্বপ্নেরা ঝিলকিশোরীর
মন জুড়ে হাওয়ার সাথে লিপ্ত হয় বিনুনির
অনাহুত  আদিম  খেলায় ,  আমি দেখে যাই.. 

তোমাকে কাছে পেয়ে অযত্নের 
ঘাসফুলটি ফোটে,কৃষকের চোখে
কথা ফোটে, সন্ধ্যায় তারারা খেলে
যায়, নদীর  যৌবন প্রাপ্তি ঘটে , অথচ
আমি বসে রই তোমার থেকে অনেক দূরে ...

আজ আষাঢ়ের কোন খেয়ালে 
কিশোরীর শরীর ছুঁয়ে দিলে তুমি?   
তার নাভিতে গড়ে তুললে পদ্মপুকুর 
যেখানে জমা আছে যাবতীয় সুখ স্মৃতি
পরম্পরা  ভেঙে  তার নষ্ট কাহিনীর  সাথে...
বৃষ্টি! পড়লে ঝড়ে আজ আষাঢ়ের কোন খেয়ালে ?



(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা)
কৃষ্ণভ্রমর
সোমা বোস

        জানালা দিয়ে আনমনে আড়চোখে তাকাতেই ভ্রমরের দৃষ্টিতে ধরা পরলো ঈশান কোণে ঈশানী… আকাশের ঈশান কোণে ঘনকৃষ্ণ মেঘের সঞ্চার। আনলক টু'য়ের তিনদিনের অফিসের পরেও আজকে তার ল্যাপটপে "ওয়ার্ক ফ্রম হোম" চলছে। কিন্তু তার মন সেই কাজ থেকে মনোনিবেশ সরিয়ে একছুটে সোজা দোতলার ব্যালকনি কাম অর্ধেক ছাদে তাকে বের করে আনলো। রিমঝিমকে বেশ কয়েকবার ডেকেও সাড়া পাওয়া গেলো না। রুদ্রও আজ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছে। যাক, ওরা যখন আসার তখন আসবে। এদিকে এলোমেলো হাওয়ায় আসতেই তার কুঞ্চিত কেশরাশির দফারফা। ঘাড়ের পাশ দিয়ে, কপালের ওপর দিয়ে মুখের ওপরে চলে আসা চুলের গোছা অসহিষ্ণু হাতের আঙুলের সাহায্যে সামলাতে সামলাতে ভ্রমরের মনে হলো সামলানোরই বা কী দরকার! থাক না যে যেমন খুশী। এখন আর কিসের চুলের মায়া! তাছাড়া এখন তার কোঁকড়া চুল মাত্র ঘাড়-সমান লম্বা। অথচ  তাতেই এতো জট পাকিয়ে যায় রোজ! পাতলা চিরুনীগুলো তো টিঁকতেই পারে না, মট করে দাঁড়গুলো ভেঙে যায়। তাও তো চুলের গোছ আগের থেকে কতো কমে গেছে। অবশ্য তার অসহিষ্ণু হাতের অত্যাচার নিত্য সহ্য করে আর কতোদিনই বা টিঁকবে অসহায় চিরুনীগুলো! মনে পরে যায় ছোটবেলায় ঠাম্মার কথায় বাবা তাই মোটা দাঁড়ের চিরুনী এনে দিতো। খুব যত্ন করে ঠাম্মা তার মাথার তালুতে বেশ করে তেল ঠেসে দিয়ে তারপর গোটা চুলে তেল মাখিয়ে দিতো। তারপর আঙুল দিয়ে দিয়ে কেমন করে যেন আস্তে আস্তে চুলের সমস্ত জট ছাড়িয়ে নিতো। এরপর কাঠের মোটা চিরুনীটা দিয়ে আস্তে আস্তে মাথাটা আঁচড়ে দিতো যাতে একটুও টান লাগতো না তার। তারপর চুলটাকে দুটো ভাগ করে নিয়ে দুপাশে দুটো লম্বা বিনুনি করে মাথার ওপরে তুলে বেড়াবিনুনি বেঁধে দিতো। সেসব কবেকার কথা। ভ্রমর স্কুলেই ভর্তি হয়নি তখনো। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর রাতে তেল মাখলেও সকালে মাথায় শ্যাম্পু করে স্কুলে যাওয়া অভ্যেস হলো। এই ঝামেলা থেকে রেহাই পেতে ঘনঘন ন্যাড়াও করা হতো তাকে। অবশ্য গরম থেকে রেহাই পেতেও ন্যাড়া হওয়া ছিলো এক উত্তম পন্থা। 




       আকাশের অপরূপ শোভা দেখতে বাধা পাওয়ার দরুণ চোখের ওপরে এসে পরা অবাধ্য চুলগুলোকে সরাতে সরাতে এই চুল নিয়েই আরও কতো কথা মনে পরতে থাকলো। আসলে নাকি এই কুঞ্চিত কেশরাশি, কৃষ্ণবর্ণা ভ্রমরের মুখের সাথে বেশ মানিয়েছিলো। আর তাতেই মুগ্ধ হয়ে প্রেমে পরেছিলো রুদ্র। পরে এসব শুনে অত্যন্ত অবাক হয়ে গিয়েছিলো ভ্রমর। প্রেমের বাজারে সাধারণত একঢাল অকুঞ্চিত কেশের অধিকারী গৌরবর্ণাদের জনপ্রিয়তাই সর্বাধিক। আসলে কবিমনের অধিকারী রুদ্রের প্রিয় ঋতু বর্ষা। তাই বর্ষার কালো মেঘের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই তার পাত্রী নির্বাচন ছিলো। সুখে দিনাতিপাত ছিলো সেই দাম্পত্যের। অচিরেই তাদের প্রথম সন্তান... কন্যা রুদ্রাণী এসেছিলো তাদের মাঝে। সময়টা ছিলো আষাঢ়ের এক বজ্র-বিদ্যুৎসহ বর্ষণমুখর সন্ধ্যা। প্রচুর বজ্রপাতে চারিদিকে যেন চমকে চমকে উঠছিলো সবকিছু। তারই মাঝে সময়ের অনেক আগে ভ্রমরের প্রসববেদনা শুরু হয় এবং অচিরেই তা তীব্র হয়। তড়িঘড়ি রুদ্র নিজে গাড়ী ড্রাইভ করে নিয়ে আসে নার্সিংহোমে। মেয়ের মুখ দেখে রুদ্র তখনই নামকরণ করে রুদ্রাণী। এ নিয়ে পরে ভ্রমর আপত্তি জানায়। ছেলের নাম রুদ্র হলে তবু ঠিক আছে, কিন্তু মেয়ের নাম রুদ্রাণী হলে কেমন যেন বিনাশকারী মনে হবে না! মঙ্গল অমঙ্গল বলেও তো একটা কথা আছে! কিন্তু রুদ্রের এক কথা। তাদের মেয়ে নাকি বজ্রের মতো তেজস্বিনী হবে। এ যুগে ওরকম রমণীই প্রয়োজন। নারী হবে শক্তির আধার, ওরকম নরমসরম হলে চলবে না। কবি রুদ্রের মুখে একথাগুলো তখন ভুতের মুখে রামনামের মতোই শোনালো যেন! বিধাতা বোধকরি অলক্ষ্যে হেসেছিলেন সেদিন। মায়ের মতোই রুদ্রাণীর মাথায়ও একঢাল কালো কুঞ্চিত কেশরাশি দেখে স্বভাবতই রুদ্র আপ্লুত। 




         এতো জট পড়তো যে সহজে চুলে চিরুনী দিতে চাইতো না রুদ্রাণী। আসলে চুলে টান লাগতো যে, তাছাড়া ঠাম্মার মতো ভ্রমরের অতো ধৈর্য ছিলো না আস্তে আস্তে সেই জট ছাড়ানোর। অসহিষ্ণু হাতের চিরুনী চালানোতে স্বভাবতই ব্যাথা পেয়ে কঁকিয়ে উঠে ছোট্ট রুদ্রাণী মায়ের কাছ থেকে পালিয়ে যেতো অনেক দূরে। সেবারও ওরকম অনেক দূরে চলে যাওয়াতে তাকে খুঁজতে বেরোয় ভ্রমর। আচমকা আকাশ কালো করে চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসে রাত্রির মতো। সাথে আকাশ চিরে বিদ্যুৎ চমক এবং ঘন ঘন তীক্ষ্ণ আওয়াজযুক্ত বাজ পরা। সকলে ভয় পেয়ে ঘরে ফিরতে থাকে। একটা বাজ তো মনে হলো যেন খুব কাছে কোথাও পরলো। অকস্মাৎ এক তীব্র আর্তকান্নার রোল এলো কানে, তারপর সব চুপ। এদিকে বৃষ্টির মধ্যে ছোট্ট রুদ্রাণীকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে হতাশ ভ্রমর ক্লান্ত হয়ে বসে পরে একজায়গায়। আর ঠিক তারপরই রুদ্রাণীর নিথর দেহ কোলে করে নিয়ে আসে পাড়ার কয়েকজন। বাজ পরে পুরো শরীর কালো হয়ে গিয়েছিলো তার। তারপর আর কিছু মনে নেই ভ্রমরের। শুধু মনে আছে এরপরে নিজের লম্বা কেশরাশিতে এলোমেলো কাঁচি চালিয়ে কেটে ফেলেছিলো সে।                                                     




        চড় চড় চড়াৎ… পূর্ব পশ্চিম বরাবর আকাশের বুক চিরে এক তীব্র আলোর ঝলকানিতে চোখ যেন ধাঁধিয়ে গেলো। তার সাথে তীক্ষ্ণ এক বুক কাঁপানো গুরুগম্ভীর আওয়াজ যেন তাকে শাসিয়ে উঠলো ঘরে ঢোকার জন্যে। ওই আবার, আবার! আবার সেই সবকিছু স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো কি ভয়ানক আওয়াজ! অন্যের কাছে এই আওয়াজ বড়ো ভয়ানক মনে হলেও এই তীক্ষ্ণ আওয়াজ যে তার বড়ো চেনা! মূহুর্তে ছোট্ট রুদ্রাণীর নিথর দেহটা যেন চোখের সামনে ভেসে উঠলো। নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলো না ভ্রমর। তাই এই আওয়াজের সাথে একাত্মবোধ করে সে ছুটে চলে যায় ছাদের একেবারে কিনারে, আহ্বান করে সেই আলোর ঝলকানি ও আওয়াজকে। "নীল অঞ্জন ঘন পুঞ্জ ছায়ায় সম্বৃত অম্বর। হে গম্ভীর, হে গম্ভীর"... এসো হে বজ্রসম প্রাণ আমার, এসে আমায় মিলিয়ে যাও। আমাতে সম্পৃক্ত হও। আমি তোমাকে আহ্বান করছি, এসো আমাকে আলিঙ্গন করো। আবার গগনভেদী চড় চড় চড়াৎ আওয়াজে কেঁপে উঠলো সমগ্র দিক। কোনও ঘর থেকে ভেসে এলো শিশুর আর্তকান্না। ঠিক এসময়েই আকাশ ভেঙে অঝোরধারায় ভারী বর্ষণ নেমে এলো। যেন সমস্ত আর্তনাদের আওয়াজকে ছাপিয়ে, বুকের মাঝের অব্যক্ত অনুভূতির যন্ত্রণায় এক স্নিগ্ধ, করুণ কোমলতার পরশ দিতে ধরায় নেমে এলো বর্ষা। তাপিত হৃদয়কে শান্ত শীতল, ও সমাহিত করাই যেন তার উদ্দেশ্য।  

           বৃষ্টি নামতেই বাজ পড়া থেমে গেলো এবং ভ্রমরের সমস্ত বাঁধ যেন মূহুর্তে ভেঙে গেলো। বৃষ্টিতে ভিজে ছাদের কার্ণিশ শক্ত করে ধরে এক অসহায় বোবাকান্নায় ভেঙে পরলো সে। আরেকবার যেন বরাবরের মতো হারিয়ে গেলো তার রুদ্রাণী! "মা, ও মা… আর কেঁদো না মা তুমি। শান্ত হও, শান্ত হও" বলে এবারে মা'কে জাপটে ধরে আকুল হয় কন্যা রিমঝিম... ভ্রমর ও রুদ্রের দ্বিতীয় সন্তান। তার জন্ম পরের বছর আষাঢ়ে। এবার আর রুদ্রকে কন্যার নামকরণ করতে দেয়নি ভ্রমর। সে নিজেই তার নাম রেখেছিলো। এই রিমঝিম যেন তার নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের জীবনকে সত্যিই বর্ষণমুখর সঙ্গীতে ভরিয়ে দিয়েছে। তবু আজ এতো বছর পরেও আকাশভেদী তীব্র বজ্রপাত যেন আচমকা ভ্রমরের মধ্যে রুদ্রাণীকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তীব্র করে তুলেছিলো। এদিকে আষাঢ়ের প্রবল বৃষ্টি মাথায় করেই রুদ্র এসে যোগ দিয়েছে তাদের সাথে। মা ও মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ভ্রমরের কুঞ্চিত কৃষ্ণকেশে সযত্নে বিলি কাটতে কাটতে গেয়ে ওঠে... "এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে, এসো করো স্নান নবধারাজলে। দাও আকুলিয়া ঘন কালো কেশ, পরো দেহ ঘেরি মেঘনীল বেশ..."।           

(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা)


ঢেউ এর কোলাজ
তৃপ্তি মিত্র


আবার কবে এলোমেলো হবে
প্রেমে ও অপ্রেমে
কৃষ্ণকালার বাঁশিতে মজবে
জোৎস্নামাখা বিশ্রামে

নিয়ম করে আঁকবে কবে
খোঁয়াই এর রংধনু
সংশয়ী মন তুড়ি মেরে কবে
মাখবে ফুলের রেনু

মেঘলা ভোরের অরণ্য চুমে
শঙ্খ চিলেরা যাবে
লুটোপুটি প্রেমে সোনাঝরা রোদ
ধানের শিশির ছোঁবে

পড়ন্ত সূর্য ডুবে যেতে যেতে
ঠোঁট ছোঁবে নদীবাঁকে
নির্বাক নদী আঁকাবাঁকা পথে
ঢেউ এর কোলাজ আঁকে ৷৷ 

(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা)
আদতে আনাড়ি
   পাপিয়া চক্রবর্তী

এক হাতে তালি বাজে না
তাল ঠোকা যায়
আহা জীবন ।সুরেলা -

একজোড়া ঠোঁটেও চুমু হয়
তবে দু'জোড়া ঠোঁটে তালা তালা খেললে
খোলা হাওয়ায় চাবি দিয়ে হয়
আহা জীবন । সরল-

      লক্ মানে তালা
      কী মানে চাবি
      লিপ্ মানে ঠোঁট


শিষ্ট শিশুতোষ --

(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা)
           কড়া ডোজ
           ‎    সুনন্দ মন্ডল

বেপরোয়া যুবকটি ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে নীচে
আষাঢ়ের নবচেতনা মেখে।
একটি মেয়ে ডুবে যাচ্ছে যেখানে জলপ্রপাতে একটি জলের নীচে আরেকটি চাপা পড়ে যায়।
শিলাময় প্রাকৃতিক গঠনে
কঠিন ও কোমলের বিন্যাসে বাধা তখনই।
কলকল সুরে নদীর নৃত্যে
বেজে ওঠে নূপুরের ধ্বনি।
সংগীত সাধনায় মত্ত যেসব লক্ষ্মীছাড়ারা
তাদের হাতের রেখায় মৃত্যুযোগ নিয়ে বাঁচে!
আর শ্রীহীন মানসীরা গিরিখাতে লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে থাকে ব্যাঙের মতোই আষাঢ়ের শীতলতায়।
প্রেমাবিষ্ট জীবনের সরল সংজ্ঞায় হাত মিলিয়ে অভিবাদন জানাতে চেয়ে মাতাল যুবকটি তলিয়ে যায় জলপ্রপাতে।
আর মেয়েটিও নবকিশোরীর গন্ধ ছেড়ে কড়াডোজ গিলে যুবতীর গিঁটে আটকে গেছে।

দিনের শেষে সেই থমকে যাওয়া নদীর অভিমুখে আরেকটি মুখের জন্ম হওয়া অবদি একছড়া রাগিনীতে সুখ সঞ্চারে আলিঙ্গন করে।
যুবক-যুবতীর নব যৌবনের অঙ্গীকার যেন আষাঢ়ের মেঘেও কড়া ডোজ গিলে নিজের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে নেওয়া নক্ষত্রের তেজ।
                 
(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা)
বৃষ্টি...করে একাকী
তানিয়া ইসলাম

আঁধার হয়ে এলো চারিপাশ,
গর্জে ওঠা মেঘ;সামলে রাখে আবেগ।
নিস্তব্দের মাঝে স্পষ্ট শোনা যায় বুকের দুরুদুরু।
কেন?কি জন্যে?নেই কিছুই জানা,
কেবল একটুই সত্য বৃষ্টি;করে একাকী।
কোনো এক শ্রাবণে;সঙ্গে ছিলাম দুজনে।
তারপর বহু মেঘ এলো গেল তবু সে আর এলো না।
মোমবাতির ঝড়ে পড়া মোম,
দোদুল্যমান শিখা,রাতে ফুলের বিষ বাস্পে ধাম
মন কেমন করে ওঠা ঝমঝম,
আরও চঞ্চল,আরও একা,আরও চাপা কান্না।
বৃষ্টি;করেছে একাকী;
মাঝির বুকে উঠেছে ঢেউ,
ঘন জঙ্গলে সোঁদা গন্ধ আর মহীরুহের স্নান,
ব্যাঙের ডাকে টনটনে ব্যথারা ওঠে জেগে।
এমন করে আষাঢ়-শ্রাবণ,
মত্ততা জাগিয়ে,সিক্ত করে প্রাক্তন।।


ছবি- তানিয়া ইসলাম

(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা)
স্মৃতির পাতায় 
 সুব্রত নন্দী


ভুলে গেলে কী বন্ধনহীন হওয়া যায়?
পুড়িয়ে দিলে কী সমাপ্তি ঘোষণা করা যায়?
দহনের দগ্ধতায় উপলব্ধিগুলো স্মৃতির সরণীতে আজও বর্ণিত,
বিষণ্ণতার চিত্রপট আঁকে মানবিক আধারের নির্লিপ্ত কুঠুরিতে।
আত্মসমর্পণ করে গোধূলির লালিমায় অহর্নিশি,
দিশাহীন যাত্রী হয়ে এগিয়ে চলে বৈতরণী পার হওয়ার তাগিদে -
চিতার আগুনে সব কী আর চিতাভস্ম হয়?
কিছু ভস্মীভূত অনুভূতি থেকে যায় সূর্যাস্ত অবগাহন ক'রে....

(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা)




আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে
          কেয়া ভৌমিক


আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে
দীর্ঘ প্রতীক্ষার মেঘের তরণী বেয়ে।
স্বচ্ছ্ আষাঢ় তুমি মেঘের বরণ
গ্রীষ্মের দাবদাহে তোমাকে স্মরণ।
বর্ষার জলে পেলো, প্রকৃতি প্রাণ
আষাঢ় এসেছে নিয়ে মাটির অঘ্রান।
বজ্রের  হুংকার আকাশ ওঠে গেয়ে
আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে।
যৌবন দেবতা তুমি ঋতু বর্ষা
মাঠে মাঠে ফুল ,ফল, সব্জীতে ঠাসা ।
চাষী ভাই, বোনদের মুখে ফোটে হাসি
আষাঢ় তুলেছে মুখ আনন্দের রাশি।
মেঘ আবৃত নভ তারাদের ছুটি
উঁকি দেওয়ার ফাঁক খোঁজে সময় গুটি গুটি।
রবি জানে মেঘের ক্লান্তিতে দেবো আমি উঁকি
আষাঢ়ও রেখেছে নজর নেবে না তো ঝুঁকি।
কঠোর হুংকার মেঘের যাবে না রয়ে
আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে।

(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা) 
আবার এসেছে আষাঢ় 
নীহার রঞ্জন দাস

আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে, এই নিয়ে কতটা আষাঢ় আমরা পেছনে ফেলে এসেছি মনে আছে তোমার ? মনে থাকার কথা নয় জানি , আমার কিন্তু ঠিক মনে আছে , আষাঢ়ের বন্যায় ভেসে গিয়ে আমি বলে দিতে পারি কতটা বৃষ্টি ফোঁটায় ডুবিয়েছিলাম তোমাকে । ভাঁজে আটকে যাওয়া ভিজে শাড়ির উষ্ণতায় মেতেছিল আকাশ , রূপতাপসে মত্ত তখন ভুবন । গড়ে নিচ্ছিলাম নিখাদ ভালোবাসার মূর্তী ।মাটি জল হাওয়া রদ্দোর আর রঙতুলির কল্পনায় । ছিল প্রত্যয় ছিল প্রতিশ্রুতি ।জনবহুলে কোনও বাড়ি নয় শুধু একটা ঘর । যাতে ভোরের আলয় ভরে ওঠে মহার্ঘ জীবন । স্বপ্ন থেকে তুমি আজ হাজার মাইল দূর ।ভুলে গেছ অনেক কিছুই , সৃজন বিলাসি মনে এখন ভাঙনের গান । প্রতিটা সকালের অবগাহন শেষে মন্ত্রপাঠে যে গান মুখরিত হত আকাশ বাতাস মাতাল করে তাতে এখন লাশ কাটা ঘরের পচা মাংস গন্ধ । এখন প্রতিটা রাত মানেই আষাঢ় প্রতিটা সকাল মানেই শ্রাবণ । জলের ভিতরে যে জলের ছায়া তার সাথেই বসবাস ।
পুঃন , চিঠি পড়ে এমনটা ভেবনা আমার শোকের কথা লিখেছি , এ আমার সুখ তোমার চাওয়ায় ।


(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা)
যখন বৃষ্টি নামে
মধুমিতা(সপ্তক)


পাঁচমোড় থেকে চা বাগানের লাস্ট বাস চারটের সময়, এখন তিনটে বেজে গিয়েছে। অথচ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। থার্ড পিরিয়ডের পর থেকে শুরু হয়েছে, আর থামার নাম গন্ধ নেই। বারান্দা ছেড়ে সবাই ক্লাসরুমে ভীড় করেছে। এতক্ষণ  হইহই করে অন্তাক্ষরী চলছিল, এখন ইতস্ততঃ গল্পগুজব চলছে। অন্যদিন হলে মৌতান হয়তো শর্বরীদের বাড়িতে থেকে যেতে পারতো, কিন্তু আজ বাড়িতে ভাই একা; বাবা, মা দুজনেই ছোটকার বাড়িতে গিয়েছে। আজ বাড়ি ফিরতেই হবে। এস কে স্যারের ক্লাসটা করার জন্য আর সঙ্কল্পর থেকে ক্লাসনোটের খাতাটা ফেরত নেবার জন্যই আসা। কিন্তু সঙ্কল্পর  তো খাতা ফেরত দেবার নামই নেই। সেই যে ফার্স্ট পিরিয়ডে একবার দেখা দিয়ে কোথায় উধাও হয়ে গেল। কখনো ঠিকঠাক ক্লাস করবে না, তারপর মৌতানের থেকে খাতা নিয়ে আটকে রাখবে, চাইতে চাইতে যখন মৌতানের মেজাজ গরম হবে তখন ফেরত দেবে।এরপর থেকে আর খাতা দেবে না সে।
  
    অরিজিৎ বসে বসে অনেকগুলো নৌকো বানিয়ে ফেলেছে। মৌতানকে ডাক দিয়ে বলল, "কিরে, প্যাঁচার মত মুখ করে বসে কি ভাবছিস? চল, নৌকো ভাসাবি চল।" মৌতান দুটো নৌকো তুলে নিয়ে বারান্দা থেকে ভাসিয়ে দিল মাঠের জলে। দেখাদেখি অনেকেই ভাসালো। গন্তব্যহীন এলোমেলো ভেসে চলেছে এতগুলো কাগজের নৌকো। দারুন লাগছে দেখতে। অতসী গান ধরলো, " টাপুর টুপুর, বৃষ্টি নুপুর....."। পেছন থেকে সঙ্কল্পর গলা পাওয়া গেল, "  আহা, অতসী থ্যাঙ্কু, এরকম একটা মেজাজ তৈরী করার জন্য।" গান শেষ হবার আগেই কোথা থেকে অনির্বান হইহই করতে করতে এলো, "শোন একটা মজার কথা, পি এম স্যার আর মল্লিকা ম্যাম একেবারে এক ছাতার তলায়, ওইভাবে গাড়িতে উঠতে গিয়ে পুরো আধভেজা।"  সৌরিশ টিপ্পনী কাটল, "তাতে, তোমার এত পুলকের কারন কি চাঁদু, তাতে কি তোমার ঘরে চাঁদের আলোটা আজ একটু বেশী পড়বে?"  সঙ্গে সঙ্গে হাসির ঢেউ উঠলো। সঙ্কল্প মৌতানের কানের কাছে গিয়ে বলল, " এখন যদি তুই ছাতা, বর্ষাতি ছাড়াই মাঠ পেরিয়ে ওই গেট অবধি গিয়ে আবার দৌড়ে আসতে পারিস, তাহলে আমি তোকে বিরিয়ানি খাওয়াবো।"   মৌতান আর রাগ গোপন করতে পারলো না, "বাজে বকা বন্ধ করে আমার খাতা ফেরৎ দে আগে।" মিটি মিটি হেসে দুই কানে হাত দিল সঙ্কল্প, " সরি, খাতাটা আজ নিয়ে আসিনি রে, কাল ঠিক নিয়ে আসবো।"  রাগে গা পিত্তি জ্বলে গেলো মৌতানের, "শোন, এবার তোর নামে ঠিক আমি প্রিন্সিপালের কাছে কমপ্লেন করবো, বলবো, সামনে পরীক্ষা সত্ত্বেও ইচ্ছে করে তুই আমার খাতা আটকে রেখেছিস। তখন বুঝবি।"
"বাব্বা!! পুরো হাজার ভোল্ট হয়ে গেছিস দেখছি!!!" সঙ্কল্প তখনো মিটি মিটি হেসেই চলেছে। আরো মাথা গরম হয়ে গেলো মৌতানের, "আসলে তুই হিংসে করিস আমাকে, চাস যে আমি কম নম্বর পাই আর হায়েস্ট মার্কস সবসময় তোর দখলেই থাকুক।"
"আরে বাবা, কুল ডাউন! কুল ডাউন! এই দ্যাখ নিয়ে এসেছি তোর খাতা, "ব্যাগের থেকে খাতা বের করল সঙ্কল্প। এক ঝটকায় খাতাটা নিয়ে ব্যাগে ঢোকালো মৌতান, "আর আমার থেকে যদি খাতা চেয়েছিস!!!"  ওদিক থেকে শর্বরী ডাক দিল, বৃষ্টি ধরে এসেছে মৌতান, চল বেরিয়ে পড়ি।"  সঙ্কল্প বাধা দিলো, "ক্যান্টিনে হিরুদা গরম গরম চপ ভাজছে; চল, খেয়ে তারপর যাবি।"
"আমি এখন সোজা বাড়ি যাবো," মৌতান আর দাঁড়ালো না। যেতে যেতে শুনলো রিতিকা বলছে, "আমায় খাওয়াবি রে সঙ্কল্প, প্লিজ!" সঙ্কল্পর গদগদ গলা পাওয়া গেলো, "ওয়েলকাম, ওয়েলকাম, ইটস মাই প্লেজার, শিগগির চল।" একবার পেছনে তাকালো মৌতান, বাঃ!!! দিব্যি রিতিকার সাথে ক্যান্টিনের দিকে চলেছে, মৌতানকে দ্বিতীয়বার অনুরোধ করলো না পর্যন্ত!!! রিতিকাসুন্দরীকে দেখে একেবারে গলে গিয়েছে। চাইতে আসুক এরপর খাতা! খাতা দেয়া তো দূর, কথা বলবে না পর্যন্ত। আর রিতিকাকে দ্যাখো!! মনে হয় জীবনে চপ খায়নি।

দুজনে পাঁচমোড়ে পৌঁছে শুনতে পেলো, লাস্ট বাস বেশ কিছুক্ষণ আগে চলে গিয়েছে। পাঁচমোড়েই শর্বরীদের বাড়ি, আগে অনেকবার থেকেছে মৌতান, আজও জোর করলো থেকে যাবার। কিন্তু মৌতান চারপাশে তাকিয়ে দেখল বাগানে যাবার অনেক যাত্রী অপেক্ষা করছে। শর্বরীকে বলল, "দ্যাখ, এরা সবাই নিশ্চয়ই যে যার বাড়িতে ফিরবে, অতএব আমিও ফিরতে পারবো। শর্বরী তাকিয়ে দেখলো, তারপর বললো, "এদের মধ্যে কোনো মেয়ে নেই কিন্তু, তাছাড়া সবাই দেখছি মুটেমজুর, তোর অচেনা, এরা যে কোনোরকম ভাবে ট্রাকে চেপে হোক, ভ্যানে করে হোক, চলে যেতে পারবে, তুই পারবি না মৌতান।"  "আজ যদি আমার জায়গায় একটা ছেলে থাকতো, সে কি এত কিছু ভাবতো? আমিও ভাবতে চাই না। আজ আমি যেভাবেই হোক বাড়ি পৌঁছাবো।" জেদী শোনালো মৌতানের গলা। "অসুবিধে হলে ফোন করিস, "চলে গেলো শর্বরী অগত্যা।

বৃষ্টিটা থেমেছে, কিন্তু আকাশটা  আরো কালো হয়ে থম মেরে আছে। বিকেল পাঁচটার দিকে একটি ট্রেকার এলো। হুড খোলা ট্রেকারে একটা ত্রিপল টাঙানো হয়েছে। তার ভেতরে হাটফেরত সমস্ত লোকজন, মানুষের সঙ্গে সঙ্গে ঝুড়ির ভেতর মুরগিও সদলবলে চলেছে, ট্রেকার আসতেই হুড়মুড় করে লোক ওঠা শুরু করলো। ড্রাইভার চ্যাঁচাচ্ছে, "লাস্ট গাড়ি, লাস্ট গাড়ি, ব্লু হিল চা বাগান।"  কিন্তু এইরকম ভয়াবহভাবে গুঁতোগুঁতি করে যাওয়া মৌতানের অসাধ্য। সে অসহায় ভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। এমনসময় ড্রাইভার সামনে এসে বলল, "মামণি, কোথায় যাবে?" অন্যসময় হলে মামণি ডাক শুনলে হয়তো ক্ষেপে যেতো, কিন্তু এখন বিপদের সময়, সে বললো, "ওই ব্লু হিলেই যাবো।" "তাহলে এদিকে এসো" বলে ড্রাইভারের পাশের সিটে জায়গা করে দিলো মৌতানকে। মৌতান দেখলো ড্রাইভার ছাড়াও আরো একজন  রয়েছে। সে চুপচাপ উঠে বসলো।

বাড়িতে যখন পৌঁছালো, শরীর ভীষন ক্লান্ত। ভাই বেরিয়েছে। অনুমাসিকে চা করতে বলে সে ফ্রেশ হয়ে নিল। এখন শরীরটা অনেক হালকা লাগছে। চা খেতে খেতেই শর্বরীর ফোন এলো, "কিরে, পৌঁছেছিস?" মৌতান সংক্ষেপে জানালো সবটা। শর্বরী শুনে বললো, "তোর জেদেরই জয় হলো বল?"
-"আজ আমি দুটো জিনিস বুঝলাম। এক, যত আমরা পড়াশুনো করে শিক্ষিত হই, ততই আমাদের মধ্যে ক্লাস কনসাসনেস জাঁকিয়ে বসে। আর সেজন্যই ওই লোকগুলোর সঙ্গে একসাথে আসতে আমার অত  অস্বস্তি হচ্ছিল। আর দুই, মেয়েদেরকে এখনও করুনার চোখেই দেখা হয়। আমি মেয়ে বলেই করুণা করে ড্রাইভার জায়গা করে দিয়েছিল। ছেলে হলে দিতো না।" মৌতানের আর কথা বলতে ভালো লাগছিলো না, সে ফোন রেখে দিলো।

রাতে খাওয়া দাওয়ার পর সে বই নিয়ে বসল। সঙ্কল্পর কাছে খাতাটা আটকে ছিলো বলে অনেক নোট তৈরী করা হয়নি। খাতাটা খুলতেই একটা চিরকুট পেলো। তাতে লেখা, "তোর খাতা একটু ইচ্ছে করেই আটকে রাখি, কেন জানিস? মনে হয়, তুই আমার সঙ্গেই আছিস, সারাক্ষণ তোর গন্ধ পাই। আর হ্যাঁ, খাতার পেছন দিকে দ্যাখ, ফিফথ পেপারের দুটো নোট তৈরী করে দিয়েছি।" লেখাটা পড়তে পড়তে যেন মনের সব মেঘ উড়ে যাচ্ছিলো, এক আশ্চর্য ভালোলাগা কখন এসে জুড়ে বসলো মনের ভেতর। সে ফোনটা নিয়ে মেসেজ করলো, "সরি সঙ্কল্প, আজ আমার এইরকম ব্যবহার করা উচিত হয়নি, পারলে ক্ষমা করিস।"

(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা)
বৃষ্টিভেজা মন
 প্রিয়াঙ্কা ভুঁইয়া

মেঘের ডাকে আসছে চিঠি, দিনভর মুখরিত বর্ষণ,
আনকোরা ভাবনা জুড়েই বেহিসেবি জীবন যাপন;
উচাটন মন আনমনা হয় ঝাপসা কাঁচের আলিঙ্গনে,
এই মনের কোণে মেঘ জমেছে, বৃষ্টি কী তা জানে?

বৃষ্টিমাখা আদর ক্ষণে ক্ষণে ছুঁয়ে যায় সিক্ত বাতাসে,
উজান স্রোতের টানে ভেসে চলে মন জলজ উল্লাসে;
মন কেমনের বৃষ্টিরা আজ ঝরতে থাকুক চুপকথায়,
বৃষ্টিভেজা মন স্বপ্ন সাজাক অন্য কোনও রূপকথায়।।

(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা)
আরণ্যকে দ্বিপ্রহর 
অনুপ কুমার সরকার


বিড়বিড় করে বয়ে চলা পশ্চিমা বাতাসে দাপটে জানালার পাল্লা খুলে গেল । তখন অতীন্দ্রের ঘরের টেবিলে রাখা কিছু ব‌ইয়ের পাতা আপনা আপনি উল্টে যাচ্ছে ।u
"আবার রৌদ্রদগ্ধ  নিষ্পত্র গুল্মরাজি, আবার বন কুসুমের মৃদু মধুর গন্ধ, আবার রক্তপলাশের শোভা ।"  বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় 'আরণ্যক' উপন্যাসের এই লাইন পড়তে পড়তে মনোযোগ ঘুরিয়া গেল বইয়ের পৃষ্ঠা ওল্টানো শব্দে। বাইরে চোখ মেলতেই অতীন্দ্র দেখল বিড়বিড় করে বয়ে চলা বাতাসের গতিবেগ খানিকটা বেড়ে‌ গেল । নরম সবুজ ধান গাছ গুলোর মাথা নাড়াচাড়া করছে ঠিকই তবে যেখান দিয়ে বা যে পথ দিয়ে বাতাস বয়ে চলেছে সেই পথেই একটা হালকা রূপরেখা তৈরি হয়ে যাচ্ছে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে । যেন ভরা যৌবনে নদীর বুক দিয়ে স্টিমার চলে গেলে যেরকম তৈরি হয় । অতীন্দ্রের ঘরের জানলা থেকে সবুজ ধানের ক্ষেত সম্পূর্ণই নাগালের মধ্যে । খুব বেশি হলে আধশো মিটার এর বেশি নয়, কমই ব‌ইকি । জানালা খুললেই যাদের সাথে দেখা হয়, আম ,জাম, নারকেল ,কদম তো আছেই সাথে সজিনা পাতার নড়াচড়া সবসময়ই চোখে পড়ার মতো । বেলা গড়ার সময় নারকেল পাতার ফাঁক ফোকর দিয়ে খোলা জানালার ভিতর দিয়ে যেন শেষ বিকেলে যাওয়ার আগে রবিরশ্মি স্নান করিয়া দিয়ে যায় । অন্যদিকে কাঁঠাল গাছকে দেখে অতীন্দ্র যা ছবি আঁকল মনের অন্তরালে তা হল-

     ‌হায় ছায়াবৃতা
     কালো ঘোমটার নীচে
     অপরিচিত ছিল তোমার মানবরুপ
       ‌ উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে ।

           -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা আফ্রিকা কবিতার এই বিখ্যাত লাইনে মনের চিলেকোঠায় দোলা দিয়ে যায় । প্রখর গ্রীষ্মের দাবানলেও আফ্রিকার জঙ্গলের মতো অতীন্দ্রের জানালার পাশে কাঁঠাল তলাকে  মনে হয় যেন কালো ঘোমটার তলদেশ । অন্যদিকে একজোড়া লম্বা কদম গাছ যেন আকাশ ভেদিয়া উপরে উঠে যাবার উপক্রম । 

গতরাতে বৃষ্টির জন্য পরিবেশটা বেশ  নরম মনে হচ্ছিল । অতীন্দ্র সকাল থেকেই একমনে নেশাগ্রস্ত হয়ে গেছে 'আরণ্যক' নিয়ে । আরন্যকেই ডুবে যাচ্ছে বারেবারে,    নেশায় যেন ঘুমন্ত হয়ে উঠছে অতীন্দ্র । টিনের চালে একজোড়া শালিক আর আম্রপলি গাছের ডালে ডালে প্রায় পাঁচ সাতটা সাতভায়রার ঝগড়াতে আবারো মনোযোগ সরিয়া গেল । "নিস্তব্ধ দুপুরে দূরে মহালিখারূপের পাহাড় ও জঙ্গল অপূর্ব রহস্যময় দেখাইতো।" এই লাইনে এসে থেমে গিয়ে আরণ্যককে কিছু সময়ের জন্য বিরতি দিল অতীন্দ্র । সবুজ নরম ধানক্ষেতে যেহেতু 
কোনোরকম আইল চোখে পরছে না মনে হচ্ছে সবুজ চাদর মেলে দেওয়া হয়েছে । অতীন্দ্রের  ঘরে থেকে বাঁশ বাগান টা দেখা যায় না ঠিকই কিন্তু বেলা শেষে আশেপাশের বিভিন্ন গাছ থেকেই কোকিলের কুহু কুহু শব্দ কানে এসে পৌঁছায়। বহু বছর পরে হঠাৎ অতীন্দের চোখে পড়লো গতরাতে নীড় ভাঙা টুনটুনি খুঁজে বেড়াচ্ছে কোথায় বাসা বাঁধা যায়। রবির আলোর উজ্জ্বলতা কখন ম্লান হয়ে গেছে মনেই নাই । সারাদিন আলোকিত সূর্যের তেজস্বী রবিরশ্মি বেলা গড়ার সাথে সাথে একটা লাল বৃত্তের ন্যায় হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে কিছু সময়ের মধ্যে ওই পশ্চিম পাড়ার তাল সারির মাথায় ডুবিয়া গেল । জানালার পাল্লা ভেদিয়া আর দরজার কপাট খুলিয়া ফাঁকা মাঠে এসে একা একাই পশ্চিম আকাশে জ্বলজ্বলে শুকতারাকে দেখে নিজের একাকীত্বের স্বাদ নিতে থাকল । 
 

(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা)


স্মৃতির আষাঢ় প্লেট
প্রনব রুদ্র

কত পুরনো স্মৃতি
আসলে স্মৃতি শব্দটায় বিশ্রাম নেয় অতীত
জমা ফোঁটা ফোঁটা

অরণ্যের বিস্তার থাকে মানুষের চাকার ভিতর
পাহাড় ডিঙানো মৌসুমী বায়ু
ফুরিয়ে দেয় আয়ু

বর্ষার আশার জলে পরিচিত মানুষের
মুখপচা গন্ধের বাড় বাড়ন্ত
আষাঢ়ে কত জল ছেঁচতে হয় বুকে

সময় কাকে কখন কতদূরে রাখে
টুকরো বৃষ্টির কোলাজ পাঁকে

অতৃপ্ত অতীত আর বর্তমান
ভালো থাকতে দেয় না

(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা)


কোনো  এক আষাঢ়ের  দিনে....
         মিঠু   অধিকারী 

কোনো এক আষাঢ়ের  দিনে,
বৃষ্টি  ভেজা চা বাগানের 
নুড়ি পথ ধরে, পৌছেছিলাম
আশ্চর্য  এক ঠিকানায়।

সেখানে  এক কবির বাস
দুটি  পাতা  একটি কুঁড়ির
কাব্য লেখেন। সুর ও বাঁধেন
মাটির গন্ধে, হৃদয় মাঝে।

সেই  ছন্দ , সুরে ভেসে যায়
দূর বনের  সব প্রান্ত,
মনে রয়ে যায় তার অনুরনন
বুনো অর্কিডের সৌন্দর্যের মত।

সেই  চা বাগানে  আজও  জেগে  থাকে  হিয়া।
সবুজ গালিচা  পাতা গাঙ্গুটিয়া.....

(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা)
  
জীবন তরী
         নন্দিনী চৌধুরী      


সকাল সাতটা বাজে। রেডিও থেকে ভেসে আসছিল "বর্তমান সমাজে প্রতিবেশীর সাথে‌ দূরত্ব বাড়ার কারণ" বিষয়ে আলোচনা।ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আমার। সত্যিই তো, ছোটবেলার পাশের বাড়ির দিদার মতো আজ তো আর কেউ বলে না, "চালতার আচাড় বানিয়েছি,খেয়ে দেখিস তো কেমন হয়েছে।"ফেলে আসা দিনের কথা ভাবতে ভাবতে জানলার বাইৱে চোখ রাখতেই দেখলাম,দূর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি আসছে।চারদিক আবছা অন্ধকারে ছেয়ে গেছে।হুড়মুড়িয়ে সেলিমদের কালো ছাগলটার পিছু পিছু তিনটে বাচ্চা চা বাগানের পাকদন্ডি দিয়ে বাড়ির দিকে ছুটছে।আমি উঠে পড়ি। কেবলমাত্র বৃষ্টির কারণে স্কুল বাদ দেওয়া যাবে না। অভাব পীড়িত, জীবনের মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত অনেক গুলো ছোট ছোট বাচ্চা স্কুলের আঙ্গিনায় জমা হবে। ওদের জন্য আমি অনেক কষ্টকে স্বীকার করতে পারি। তৈরি হয়ে বেড়িয়ে পড়ি স্কুলের যাবার জন্য।বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ গম্ভীর মুখ করে জল ঝরিয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে আকাশের শরীর জুড়ে খেলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ-এর সোনালী আলোর আঁকিবুঁকি। আমি দ্রুত পা চালাতে শুরু করি। হাওয়াই চটির জল ছিটছে শরীরে আমার। ছাতা বেঁকে যাচ্ছে। কাঁধ থেকে ব্যাগটা বারবার পড়ে যেতে চাইছে। অাধ-ভেজা শাড়ি নিয়ে আমি যখন স্কুলেৱ বারান্দায় পা রাখলাম ঠিক  তখনই  একসাথে কতগুলো কচি কন্ঠ বলে উঠল "গুড মর্নিং ম্যাম"। যেন একসাথে আনন্দে ছটফট করতে করতে এক ঝঁক পাখী উড়ে গেল আষাঢ়ের বৃষ্টিভেজা গোমড়ামুখো আকাশে। আমার মনে বৃষ্টির সাত সুর ঝনঝনিয়ে বেজে উঠল। দূরে তাকিয়ে দেখলাম চা বাগান, শালবন, নদীর পাড়ের নাম না জানা গুল্মলতাদের ভিজিয়ে দিয়ে বৃষ্টি পড়ছে অঝোর ধারায়। ঝাপসা হয়ে গেছে   চারিদিক। জানলা দিয়ে বৃষ্টির ছাট‌ এসে লাগছে আমার চোখে মুখে। গীর্জায় বাজছে "পাপ ছমা মিলি এ ধরম ডোঙা মে। হায় রে ধরম ডোঙা চলে লাগল ধীরে ধীরে" অর্থাৎ "আমাদের জীবন তরীতে পাপ ক্ষমা দুই ই স্থান পায়। পাপ কে ক্ষমা করে এই জীবন তরী ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।" দূর থেকে ছাতা মাথায় সাদা সুটান পরে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন ফাদার পিটার পাপ্পু।

(মুজনাই অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা)

Tuesday, June 30, 2020



                             পোড়োবাড়ি-২
                             রীনা মজুমদার

                           ধূসর দিগন্ত আকাশ
                           মাথার উপরে
                           সে পাখি
                           আজো ডানা ঝাপটায়
                           পোড়োবাড়িটায়,
                           ছেনি হাতুড়ির
                            শব্দ শুনতে পায়,
                            সে পাখি
                            জায়গা ছেড়ে সরে সরে বসে
                            তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে
                            বটের ঝুরিগুলো ইঁট-পাথরে
                            গুঁড়িয়ে ধুলোয় মিশে আছে
                            একলা পাখি,
                           " জীবন দেখে জীবন খোঁজে"

                           কী জানি কেন- কোন মায়ায়
                            তোমায় আগলে নিয়ে আসি
                            নিবিড় প্রত্যাশায়
   ‌‌                         নিজের উষ্ণ ছায়ায়‌...

Saturday, June 27, 2020

আন্তর্জাতিক কবিতায় বাঁকবদল & বাংলা কবিতায় তার প্রভাব ও সমকালীন সময়ে রবীন্দ্রকাব্য
-------------------------------------------------------------------
মেশিন রচিত কবিতার সাপেক্ষে কবিতার শুরু, কবিতায় প্রযুক্তি (পর্ব - ৪)
:
:
বিগতো পর্বে, দেখা গিয়েছিলো যেকোনো ভাষার নেপথ্যে থাকা প্যাটার্ন প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু আলোচনা।ঠিক এরকম প্যাটার্ন যদি কৃত্তিমভাবে তৈরি করা যায়, তাহলে ভাষা ও ব্যাকরণ : উভয়কেই কৃত্তিমভাবে সৃষ্টি করা যায়।কিন্তু 'মেশিন' প্রসঙ্গতে যাবার আগে, 'প্রযুক্তি' ধারনাটি সম্পর্কে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন

প্রযুক্তি বিষয়টিকে যদি একলাইনে বলতে হয়, তা এভাবে বলা যেতেই পারে : "এমন একটি ব্যবস্থা, যা দুটি বস্তুর ভিতরে নূন্যতমো উপলব্ধ সহজ উপায়ে ও দ্রুততমো যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম"।একটু কি কঠিন লাগলো? তবে আসুন, কথাটিকে একটু সহজ করে বোঝা যাক।উদাঃ-১ : ধরা যাক গুহামানুষের কথা।সে জানতো না ছবি আঁকার কথা / অক্ষর কল্পনা থেকে ভাষার লিখিতো রূপ।সে কেবল অপরের সাথে যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপনের উদ্দেশ্যে, দৃশ্যকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনীয়তা থেকে শিখে নিয়েছিলো স্বরধ্বনির ব্যবহার।ব্যবহৃত হয়েছিলো ধ্বনিভিত্তিক সংকেত।কারন, সংকেত হলো স্বল্পকায় এবং দ্রুতগতির যোগাযোগ বা অবস্থান নিশ্চিত করার প্রামাণ্য ডকুমেন্টেশন।আবার বিভিন্ন ছন্দভিত্তিক ভাবে, সেই স্বরধ্বনির পুনরাবৃত্তি থেকে জন্ম নিলো সুর এবং শ্রুতি।কিন্তু শুধুমাত্র ধ্বনিভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থার সবচেয়ে বড়ো সীমাবদ্ধতা সম্ভবতো, যোগাযোগ করতে চাওয়া চরিত্রগুলির একই সময়কালে অবস্থান এবং নিগর্ত ধ্বনির শ্রুতিসীমানায় চরিত্রগুলির শর্তসাপেক্ষ থাকা।এখোন, এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে গিয়েই হোক / নিজ অস্তিত্বকে বহু ভীড়ে খুঁজে নেবার তাগিদ থেকেই হোক : প্রয়োজন হলো, দৃশ্যকে কিছু চিহ্ন আঁকার মাধ্যমে প্রকাশিত করার প্রয়োজনীয়তা।গভীর পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে খোঁজা হলো, কঠিন মাধ্যমের আধার বা চিত্রধারক (আধূনিকতায় যা ক্যানভাস্)।খুঁজে নেওয়া হলো, উপযোগী ও উপযুক্ত লেখনী ধারকশৈলী অনুযায়ী।তারপর বর্ণ / রঙ।পরবর্তী পর্যায়ে : অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করে তোলার ইচ্ছে নিয়ে কাল্পনিকতার মিশেল সহযোগে ব্রহ্মাণ্ডের বিমূর্ত প্রকৃতির সাথে যোগাযোগ করার প্রথম সার্থক প্রচেষ্টা।এবার আসি 'মেশিন' প্রসঙ্গটিতে।

বিজ্ঞানের বক্তব্য অনুযায়ী "যা বিশেষ কোনো চেতনায় জারিত হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো কাজ করতে সক্ষম, সেটাই মেশিন" এবং সভ্যতায় এর সর্বপ্রথম, আদিম ও উৎকৃষ্টতমো উদাহরণ হলো প্রাণীর শরীর।যেমন উদাহরণরূপে, ছবি আঁকার বিষয়টিতে : শরীরের অঙ্গ / লেখনী মাধ্যম / ইত্যাদি সবই মেশিন।আগে বলা বক্তব্য অনুযায়ী "নূন্যতমো উপলব্ধ সহজ উপায়ে ও দ্রুততমো যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম" কথাটিকে শর্ত হিসেবে মেনে নিলে, প্রযুক্তির ধারনাটিকে যতো উন্নতকরণ করা হয়েছে, মেশিন কথাটিরও বিবর্তন হয়েছে ততো (এখানে, কার্য বা কাজ বিষয়টিকে, বৃহদার্থে যোগাযোগব্যবস্থা বলে উল্লেখ করা হলো)।আমরাও, যতো কবিতার ইতিহাস প্রসঙ্গে প্রবেশ করবো, বিবর্তন বিষয়টির আড়ালে থাকা প্রযুক্তিটিও, ততো স্পষ্ট হবে আমাদের কাছে।এখানেও, শুরুবাদ পর্বে রাখা বক্তব্যনুযায়ী 'শিল্প' কথাটির পরিবর্তে 'কবিতা' কথাটি উল্লেখিতো হলো, বৃহদার্থের উদ্দেশ্যেই।তবে, "প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কবিতায় আপত্তি" কথাটির চেয়েও, অনেকের কাছে প্রকট বিষয়টি হলো : প্রযুক্তি ব্যবহারে নান্দনিকতা ধ্বংসের আপাত প্রবণতা।অর্থাৎ, এই প্রযুক্তির ধারনা কি কবিতাটিকে, কবিতাটির কাব্যধর্মীতা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে।অতএব, কবিতার নান্দনিকতা প্রসঙ্গে কিছু কথা এখানে অবশ্যই উল্লেখ করা প্রয়োজন
:
:
যেকোনো নির্মাণ বিষয়ক ঘটনার পেছনে, কোনো না কোনো প্রযুক্তি কাজ করে।এটাই ব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃতি।সেরকমই শিল্পচিন্তাও, এর বাইরে নয়।এখানে একথাও ঠিক, নিয়ম থাকার অর্থই হলো : নিয়মকে অস্বীকার করে নতুন পথ-সন্ধান।নতুন পথ খোঁজার প্রয়োজনীয়তা তখনোই পড়ে, যখোন সামনের পর্যায়ে সন্ধানটাই মুখ্য হয়ে ওঠে।আসলে, জানা / শেখা / আত্তীকরণ / প্রয়োগ : প্রকৃতি বারবার অধ্যয়ন করতে বলে।আর এখান থেকেই চিন্তাশীল যাকিছু, সকলেই তার চিন্তার রসদ সংগ্রহ করে থাকে।এবার যদি একটি প্রশ্ন রাখা যায় : ধরা যাক, যে মানুষটি দৈনন্দিন লড়াই করে নিজের বেঁচে থাকাকে নিবৃত্ত করেন, অর্থাৎ ~ মানুষটির অবস্থান এমনই, যেখানে পায়ের তলায় মাটি নেই / মাথার ওপর ছাদ নেই / পেটে খাবার নেই ~ এই অবস্থায়, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে না কী পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে ~ তথ্যটি তাকে কিভাবে বেঁচে থাকায় সহায়তা করবে। উত্তরে স্রেফ এটুকুই বলা যেতে পারে, দিনযাপন তাঁর বেঁচে থাকার কর্মক্ষেত্র হলে, রাতযাপন তাঁর কাজের প্রস্তুতিক্ষেত্র।কিন্তু, প্রয়োজনীয় একথা নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো সেইকথাটি : তিনি টিকে আছেন কিভাবে।এখানে, টিকে থাকা' প্রয়োগটি সবচেয়ে অসহায়তমো মাধ্যমের পরিপূরক হিসেবে নূন্যতমো সম্ভাব্য রূপ।একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এখানেও তিনি কিন্তু তাঁর দৈনন্দিন যাপন সাপেক্ষে, প্রকৃতির সাথে যুঝে নেওয়ার মাধ্যমে, শিখে নিচ্ছেন তাঁর সাম্প্রতিকতমো প্রাসঙ্গিক পরিকল্পনা।আর এখানে তাঁর যাপনসঙ্গী হলো গভীর থেকে গভীরতমো পর্যবেক্ষণ।অনেকটাই এরকম যে : সংগৃহীত আহারকে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদে গ্রহন করার জন্য প্রয়োজনীয় ছাদ।আহার সংগৃহীত করার পরিকল্পনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য, প্রয়োজনীয় শিক্ষা।এবং, শিক্ষা প্রয়োগকে সম্পূর্ণ করার তাগিদ থেকে যোগাযোগ, ইত্যাদি।এখানে যেমন, সেই টিকে থাকা মানুষটির জন্য : শিক্ষা / যোগাযোগ / প্রযুক্তি, তিনটি বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ।এবার, প্রযুক্তির ধারনা পাল্টাবার সাথেসাথেই, পাল্টাচ্ছে মানুষটির অবস্থান এবং তার সরাসরি প্রভাবে পারিপার্শ্বিকতা ও দেখার পদ্ধতি।কিভাবে, আসুন একটু বুঝে নিই বিস্তারিত।

প্রকৃতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, আপাতভাবে কোনো শূন্যস্থান তৈরি না হতে পারা।শূন্যস্থান পূরণ হলেই, সেখানে আশেপাশে থাকা পদার্থসমূহ প্রবেশ করে, শূন্যস্থানটিকে ভরাট করবে।একথা বলাই যায়, শূন্যস্থান হলো একটি চূড়ান্ত শক্তিশালী সবচেয়ে ভয়ংকর হাঁ মুখ করে রাখা শিকারি।যার খিদে, ভরাট না হওয়া পর্যন্ত মেটে না।একথা, যাপনপর্বেই প্রযোজ্য।কারন, চিন্তাশীল মস্তিষ্কটি কখনোই শূন্যস্থানে পরিণত হতে পারে না।প্রতিটি বিষয়ের বৈচিত্র্যের মধ্যে, চিন্তাশীল মস্তিষ্ক নতুন কিছু সম্ভাবনা খোঁজে / বপন করে সৃজনের বীজ।একঘেয়েমি থেকে বারংবার নিজেকে মুক্ত করতে, সে আশ্রয় নেয় প্রকৃতির অন্তর্গত গভীর পর্যবেক্ষণ-পাঠকে।সুতরাং, আদিম মানুষের ক্ষেত্রে যেমন নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনাগুলি শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ্যে এসেছিলো, আমাদের স্যাম্পল হিসেবে নেওয়া খেটে খাওয়া মানুষটির ক্ষেত্রেও তাই।অতএব, তাঁর খাদ্যভান্ডার মজুত নিশ্চিত হলেই (তা সে সাময়িক সময়ের জন্য হোক), তার বিষয় বৈচিত্র্যের দিকে ছুটে যাওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিক।এই পর্বে, একথা বোঝাই যায় : প্রাণের খাদ্য শুধুমাত্র শারীরবৃত্তীয় কোষকলাগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার মাধ্যমে নয়, নতুন সম্ভাবনাসমূহের প্রতি আকর্ষিত হওয়াটিও খাদ্য অন্তর্গত উৎসমৌল।অতএব, অভ্যস্ত মাধ্যমটির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হওয়ার সাথেসাথেই, মানুষটি যে মহাজাগতিক বিস্ময় নিয়ে কখনোই ভাববে না বা পূর্বকথিত "সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে না কী পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে" তথ্যটি নিয়ে ভাববে না, একথা নির্দিষ্টভাবে কেউই বলতে পারবে না।আসলে, পিপাসার আয়তন তো আর সর্বক্ষেত্রে একক্ নয় যে তার নিরূপণ বিষয়টি স্থির করা যাবে।পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত হওয়া, সমকালীন সাপেক্ষে উন্নত মানের শিল্পকর্মগুলি যে ভয়ংকর যাপন ক্রাইসিস্ থেকে সৃষ্ট হয়েছে, প্রসঙ্গগত এর উদাহরণ অনেকটাই বেশি।এটাই বোধহয় বক্তব্যটিকে স্পষ্ট করে।অতএব তিনটি বিষয় পরিস্কার : "নান্দনিকতা হলো অনুভূতি উপলব্ধ একটি বিশেষ চিন্তার খাদ্য, যা একটি সরল বিন্দু থেকে শুরু করে জটিল চিত্রে রূপান্তরিত হবার প্রবণতাযুক্ত এবং এটি যাপনকৃত অভ্যস্ত মাধ্যমটির ওপর নির্ভরশীল, অথবা আত্তীকৃত তথ্যসুলভ কোনো আকৃতির ওপর এটির গড়ে ওঠে"।যদিও, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিষয়টিকে আরেকভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়।ধরা যাক কোনো একজনকে সামুদ্রিক গভীরতার চরিত্র ব্যাখ্যা করতে বলা হলো, যে কখনো সমুদ্র দেখে নি।নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এখানে তাঁর একমাত্র সহযোগী আশ্রয় উপাদান হলো কল্পনা, যেটি সে তার নান্দনিক বিষয়টি সম্পর্কিত আত্তীকৃত চেতনা থেকে প্রকাশ করবে।এবার তাকে, কিছু তথ্য দেওয়া হলো সমুদ্র সম্পর্কে।দেখা যাবে, তার তথ্য নির্ভর কল্পনা কিছুটা রূপান্তরিত হয়েছে।এবার তাঁকে দেখানো হলো অডিও এবং তারপর অডিও-ভিস্যুয়াল পর্ব।দেখা রূপান্তরকরণের প্রবণতা আরো ক্রমবর্ধমান।এবার, সবশেষে তাঁকে সরাসরি নিয়ে যাওয়া গভীর সমুদ্রতলে।দেখা যাবে, তাঁর চেতনালব্ধ নন্দনতত্ত্বের চূড়ান্ত রূপান্তর।অর্থাৎ, অভ্যস্ত মাধ্যম ও তা থেকে প্রাপ্ত তথ্যশৈলীর প্যাটার্ন থেকে লব্ধ অনুভূতিসমূহের প্রকাশ (যাকে কিছুটা হলেও কল্পনা বলা যেতে পারে) ~ এসবই পরিবর্তনশীল, অস্থায়ী। 'কাল্পনিকতা' বিষয়টিকে বলতেই পারি : জানা এবং অজানার মধ্যে থাকা পারস্পরিক সম্পর্কের বাহ্যিক প্রকাশ (একটা অচেনা relation)।ভাষা / সংখ্যা / শূন্য / ইত্যাদি : যেকোনো কিছুতেই নান্দনিকতা বিষয়টি, অনেকটাই এরকম নয় কি?যেহেতু, এই বিষয়গুলি কবিতা বিবর্তনের পথে আমাদের সহযোগী হিসেবে হাঁটবে, তাই কিছুটা প্রাথমিক আলোচনা সেরে রাখা হলো।অতএব, প্রসঙ্গ আর দীর্ঘায়ত না করে, পরবর্তী পর্বের জন্য রাখা হলো নতুন বিষয় : "বিশ্বকবিতার শুরু ও সভ্যতার সাপেক্ষে তার মূল পর্যায় এবং কবিতার শুরুর দিনগুলি"


শব্দরূপ : রাহুল গাঙ্গুলী

Friday, June 19, 2020

                               শঙ্কর জানা
                              মাধুর্য বিশ্বাস
                           ধবলেশ্বর সাই

Thursday, June 18, 2020





"বিশ্বকর্মার প্রাসাদ নির্মাণ "
মানস রায় 

দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা র শিল্পকর্মের বিভিন্ন কাহিনী সম্পর্কে এই ত্রিভুবনের প্রায় সকলেই অল্পবিস্তর অবগত। তবে বিশ্বকর্মার শিল্পকর্ম নিয়ে আজ যে গল্পটির উল্লেখ করবো , সেটির বর্ণনা পাওয়া যায় বিখ্যাত "গোসানী মঙ্গল" কাব্যগ্রন্থের একটি অংশে। গোসানীমারি এলাকা তো বটেই এছাড়াও তৎসংলগ্ন এলাকার স্থানীয় লোকেদের মধ্যে ও এই গল্পটি নানা ভাবে, নানা রূপে প্রচলিত ও জনপ্রিয়। তবে শুরু করা যাক গল্পের আসল কাহিনী। 
     বহুকাল আগে কোচবিহার জেলার গোসানিমারি নিকটস্থ গ্রামে কান্তেশ্বর নামের এক রাজা ছিলেন। এক পুরুষের রাজা ছিলেন তিনি, কিন্তু তার রাজা হয়ে ওঠার কাহিনী ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ। সেই এলাকার এক দরিদ্র কৃষক ভক্তিশ্বর ও তার সুলক্ষণা স্ত্রী অঙ্গনার গর্ভে জন্ম হয় রাজা কান্তেশ্বরের। শোনা যায় এই ভক্তিশ্বর দম্পতি ছিলেন প্রবল ভক্তি পরায়ণ ও সদাচারী। দেবী চন্ডীর কৃপা বশত ভক্তিশ্বর পত্নী অঙ্গনা পুত্রবতী হয় ও তার পুত্র পরবর্তীতে সেই রাজ্যের রাজ সিংহাসনে আসীন হয়। কিন্তু যেহুতু তার রাজত্ব প্রাপ্তি ঘটে দেবী চন্ডীর আশীর্বাদে সেই হেতু পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতন তার রাজপ্রাসাদ নির্মাণ থেকে শুরু করে প্রজা পারিষদ নির্মাণ, এই সম্পূর্ণ বিষয়টার পরিচালনার ভার গিয়ে পরে দেবী চন্ডীর উপর। কান্তেশ্বরের রাজ্যাভিষেকের ক্ষণ এগিয়ে আসার আগে ইন্দ্রলোকে একরকম কর্ম তৎপরতা দেখা গেল দেব দেবীদের মধ্যে। দেবী চন্ডী বিশ্বকর্মার  সাথে সাক্ষাৎ লাভের জন্য দূত মারফত বার্তা পাঠালেন। উপযুক্ত সময়ে দেবী চন্ডী ও বিশ্বকর্মার মধ্যেকার আলোচনাও একরকম সমাপ্ত হল। চন্ডী দেবী বিশ্বকর্মাকে কান্তেশ্বরের রাজার হবার ব্যাপারে পুরোটা বললেন, এবং কিভাবে তার রাজ্য ও রাজপ্রাসাদের নকশা তৈরী হবে সে পরিকল্পনার ও প্রায় সবটা শোনালেন। চন্ডীর মুখে গোটা কাহিনীর বৃত্তান্ত শোনার পর, দেবশিল্পী আর একমুহূর্ত ও সময় নষ্ট করতে রাজি হলেন না। তার নির্দেশে সমস্ত কর্মচারীরা একে একে রওনা হলেন সেই গ্রামের দিকে, যেখানে কান্তেশ্বরের রাজ্যপাট গড়ে ওঠার কথা। 
      দেবশিল্পীর নেতৃত্বে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ আরম্ভ হল গোটা এলাকা জুড়ে। কাজ শুরুর ঘন্টা পাঁচেকের মধ্যেই বিশ্বকর্মার কর্মীরা রাজ্য কে সুরক্ষিত রাখতে চারদিকে সুন্দর করে উঁচু উঁচু পাঁচিল বা গড় বাঁধলেন রাজ্যের সীমানা বরাবর। সেই গড়ের চারদিকে সুন্দর সুন্দর দরজারো নকশা করলেন দেবশিল্পী নিজে।  লোহার নকশাকৃত দরজা গুলোর নাম হলো শিলদ্বার, অক্ষয় দ্বার, ধর্মদ্বার ইত্যদি, ইত্যদি। সীমানা তো সাজানো হলো এবারে রাজপ্রাসাদ নির্মাণের পালা, পাহাড় পর্বত থেকে পাথর কেটে আনতে শুরু করলেন সেখানে নিযুক্ত কর্মীরা। পার্শবর্তী এলাকা থেকে মাটি কেটে এনে স্তূপাকৃতি করা হলো এবং পাথর সহযোগে সেখানে স্থাপিত হলো সুন্দর এক  দৃষ্টি নন্দন প্রাসাদ। প্রাসাদ উঁচু হওয়ায় সেখানে হয়তো জলের সমস্যা দেখা দেবে এই ভেবে বিশালাকার কুয়ো ও নির্মিত হলো সেস্থানে। এরপর একে একে দোকান পাট বাজার হাট সবকিছু নির্মিত হতে থাকলো এছাড়াও রাজবিনোদনের জন্য রাজপ্রাসাদের দক্ষিণ পূর্ব দিকে নির্মিত হলো সুন্দর এক বিশালাকার পুকুর। রুপোর রাজসিংহাসন তৈরী হলো এবং সেটির শোভাবর্ধনের জন্য সিংহাসনের মাথায় একটি ফণা ধরা সাপ সদৃশ রুপোর ছাতা ও তাতে যুক্ত করে দিলেন বিশ্বকর্মা স্বয়ং। একে একে তৈরী করলেন রাজকোষাগার, রাজার আরাধ্য দেবী চন্ডীর পাট, মহাদেবের পাট বিভিন্ন মঠ মন্দির ইত্যাদি।  শেষমেষ রাজ্যের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ও কোনো রকম ত্রুটি রাখতে চাইলেন না তিনি, কামান, গোলাবারুদ, সে গুলিকে পরিচালনার লোকজন প্রায় সব কিছুর ই সুবন্দোবস্ত করে এক রাত্রেই রাজার রাজ্য ও রাজপাটকে সুন্দর ভাবে সাজিয়ে দিয়ে সেই স্থান ত্যাগ করে দেবলোকের  উদেশ্যে রওনা হলেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা।

অদ্রিজা মণ্ডল



 বাবুল মল্লিক 















Wednesday, June 17, 2020


সায়ন ব্রহ্ম 
চতুর্থ শ্রেণী
কালিয়াগঞ্জ
উত্তর দিনাজপুর










এ এক অজানা পৃথিবী 

রিম্পা নাহা

শোনা হয় নি -
কতজন এখনো ফেরার বাকি, 
অগোচরে ঐ অজানার দেশ থেকে। 
কত পথিকেরা মানচিত্র খসে পথ হারাবে। 
নিত্য চলেছে এ হেন খেলা, 
কে বা রেখেছে তার হিসেব, 
কেই বা গুনেছে সারাবেলা। 
কত মৃতেরই বা জুটেছে 'শহীদ 'খেতাব 

আমারও যদি আসে ডাক, 
ঐ মৃত্যুর মিছিলে যাওয়ার 
তোমরা কী তখন প্রতীক্ষা করবে 
আমার ফিরে আসার?? 
ফিরবো না, ফিরবো না, 
বড় নিষ্ঠুর যে সে পথ। 
একবারও এ পথে পা দিলে, 
ফেরার উপায় নেই।

যদি দেখো হে প্রিয়রা, 
ফিরছি না আর তোমাদের তরে, 
সেদিন ক্ষমা করে দিও আমাকে ;
তবে দোষ টা  ছিল না আমার। 
এটা ভেবে নিও। 
বলেছি কত কটু কথা, 
হয়তো দিয়েছি মনে অনেক ব্যথা, 
লেখনীর মধ্য দিয়ে 
নয় তো বা, 
অজানা কোনো ব্যবহারে, 
এই অজানা পৃথিবীতে।।।।






আন্তর্জাতিক কবিতায় বাঁকবদল & বাংলা কবিতায় তার প্রভাব ও সমকালীন সময়ে রবীন্দ্রকাব্য 
-------------------------------------------------------------------
ব্রহ্মান্ডের প্রতিটা ঘটনার নিজস্ব ভাষা থাকে।কবিতারও কি স্বতন্ত্র ভাষা সম্ভব? (পর্ব - ৩)
:
:
গতোপর্বে, আমরা দেখেছিলাম 'কম্পিউটার এইডেড্ পোয়েট্রি' বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে, কিভাবে আজকের কমলিকারা কবিতা লিখে ফেলতে পারে?সঙ্গতোভাবেই, প্রশ্ন উঠেছিলো : তাহলে কি ভবিষ্যৎে 'কবি' শব্দটির বিলুপ্তি ঘটতে চলেছে? আসলে, সৃজন বনাম প্রযুক্তির দ্বন্দ্বটা, শুরু থেকেই মূলতঃ যে কারনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে মনে হয়, সৃজনের কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারকে অস্বীকার করা।কিন্তু যদি ভেবে দেখি, প্রযুক্তির সৃষ্টি করা, তার উত্তরণ ঘটানো : এসবই তো বৃহত্তর সৃজনের অংশ।এবং আমরা তো, বিগতো পর্বেই দেখেছি : ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির আইডিয়া কিভাবে, শিল্পিত হয়েছে।যদিও, ভবিষ্যৎ পর্বগুলিতে এসব নিয়ে বিশদ আলোচনা থাকবেই।এখোন, আমরা আমাদের চিন্তাভাবনা প্রধানতো ফোকাস করবো এই 'কম্পিউটার এইডেড্ পোয়েট্রি' বিষয়টির ওপর।
এই computer aided poetry বা CADএর পিছনে রয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা শিরোনামক্ প্রযুক্তিটি।যদিও বাংলা ভাষায় বিষয়টি নিয়ে যৎসামান্য কাজই হয়েছে, আর তা করেছে কিছু নিভৃতে থাকা লিটিল্ ম্যাগাজিনই।যাইহোক, CAD পর্বে ঢোকার আগে, দেখে নেওয়া দরকার : এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়টি ঠিক কী।খুব গোদা বাংলায় বলা যায় : বিষয়টি অনেকটা এরকম, ''মানুষের চিন্তাশক্তির 'বিন্যাস'কে যদি বিভিন্ন 'শর্তাবলীর পরিবেশ এবং স্থানাঙ্ক বা গাণিতিক coordinate' সাপেক্ষে বিশ্লেষণ করে, যদি তার একটি প্রযুক্তি নির্ভর অনুকৃতি বা অনুলিপি এমনভাবে তৈরি করা যায়, যাতে সেই প্রযুক্তি চালনাকারী মেশিন, ঐ একই শর্তাবলীর পরিবেশ এবং স্থানাঙ্ক সাপেক্ষে, মানুষটির মতোন চিন্তাভাবনার উদ্ভাবন ঘটাতে পারে।" আরো সহজ করে বললে, এই প্রযুক্তি হলো ~ মস্তিষ্কের যে অংশগুলি চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটায়, তার একটি সমান্তরাল কার্বন / জেরক্স কপি।আরো সহজ করলে : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হল মেশিন দ্বারা প্রদর্শিত বুদ্ধি।ইন্টারনেটে উইকিপিডিয়া খুললে, যেটি পাওয়া যায় বিষয়টি নিয়ে, তা হলো : (কম্পিউটার বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে, এ.আই. গবেষণার ক্ষেত্রটি "বুদ্ধিমান এজেন্ট" -এর অধ্যয়ন হিসাবে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে: যে কোনও যন্ত্র যা তার পরিবেশকে অনুধাবন করতে পারে এবং এমন কিছু পদক্ষেপ নেয় যা কিছু লক্ষ্য অর্জনে তার সাফল্যকে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে নেয়। "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা" শব্দটি প্রয়োগ করা হয় তখন যখন একটি মেশিন "জ্ঞানীয়" ফাংশনগুলিকে কার্যকর করে যা অন্যান্য মানুষের মনের সাথে মিল থাকে, যেমন "শিক্ষা গ্রহণ" এবং "সমস্যা সমাধানের" সাথে সংযুক্ত। আন্দ্রেয়ার কাপলান এবং মাইকেল হেনলিন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংজ্ঞায় বলেন "এটি একটি সিস্টেমের বহির্ভূত তথ্য সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারার ক্ষমতা, এমন তথ্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং ঐ শিক্ষা ব্যবহার করে নমনীয় অভিযোজনের মাধ্যমে বিশেষ লক্ষ্য করা")। অতএব এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যেকোনো ভাষাকে যেমন আমাদের ভাষায় এনক্রিপ্টেড্ (encrypted) করা যায়, তেমনই মানবসভ্যতায় ব্যবহৃত ভাষাকে অন্য যেকোনো ভাষায় রূপান্তরিত করে যোগাযোগ মাধ্যম তৈরি করাই যায়।প্রসেসটি অবশ্যই এনকোডিং & ডিকোডিং।এবার যদি একটু সাহিত্য মোড়কে রূপকথাশৈলি অনুযায়ী এভাবে বলা যায়, "রবীন্দ্রনাথের কাছে জানতে চাইলাম বিনির্মাণ তত্ত্বের বিন্যাস ব্যাখ্যা, তিনি যা বললেন, স্রেফ বিস্ময়" অথবা "কোয়ান্টাম ফিল্ডে আপেক্ষিকতার আপাতবস্থান সম্পর্কে আইনস্টাইন জানালেন, পুনর্মূল্যায়ন সম্পর্কিত তাঁর নতুন থিসিস" অথবা আরো কয়েকধাপ এগিয়ে, "মস্তিষ্ক পৌঁছে গেছে ৫০০০বছর পূর্বে বা ৫০০০বছর ভবিষ্যৎে।যদিও, অস্তিত্ব নিরাপদ।কারন, শরীরটা তো সেই অতিপরিচিত ঘরের ভিতর বিছানায়" ~ এগুলো কি এখনও মনে হচ্ছে অবাস্তব? অবশ্য ধীরেধীরে, বাস্তব / অবাস্তবের গোটা dictionটাই পাল্টে দিচ্ছে প্রযুক্তির এই সমস্ত নবোতমো উদ্ভাবনী সম্ভাব্যতা।ঠিক অনেকটাই কবিতার গূঢ় রহস্যের মতো।অনেকেই হয়তো বলবেন, এসব প্রযুক্তি প্রকৃতি বিরোধী, যা কেবল ধ্বংসকেই আহ্বান জানায়।তাঁদের এই মতামত, অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে জানাই যে, এটি একটি কৃত্তিম বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করানোর, অত্যন্ত চতুর / মিশেল / দো-আঁশলা জাতীয় মতবাদ, যা কর্পোরেটবাদীদের দ্বারা নিপুণভাবে প্রোথিতো।যার পিছনে রয়েছে, দুটি অত্যন্ত চূড়ান্ত স্বীকৃতির অদৃশ্য মেনে নেওয়া।প্রথমটি হলো, প্রযুক্তির ব্যবহার একচেটিয়া কিছু স্বার্থান্বেষণের জন্য নিবেদিত এবং দ্বিতীয়টি হলো, প্রকৃতিকে একমুখী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতাবানের একচেটিয়া দখোলদারীর নির্ভরযোগ্য বিস্তার।আর, যারাই প্রযুক্তির বিরোধ আজ করছেন, তাঁরাই সবার আগে ওপরিক্তো দুটি স্বীকৃতি মেনে নিচ্ছেন নির্দিধায়।অবশ্য, একথাও সঠিক যে : প্রযুক্তি ব্যবহার জানার সৎ ও প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো ~ তার য্যানো বিশেষ স্বার্থ-উন্মাদনায় প্রয়োগকরণ না ঘটে।অর্থাৎ, একথা উপলব্ধি করা উচিৎ : প্রযুক্তির ব্যাবহারের প্রকৃত কারন কী।আরো সহজকথায়, যারা ব্যবহার করছেন, তাদের জানা উচিৎ কেনো করছেন।অথচো, যাই বলি না কেনো : প্রকৃতি কখনোই বলে নি অমোঘ ক্ষয় বা তার ফলাফলবর্তী শূন্যতার কথা।তার কাছে, শূন্যতা হলো ~ এমন একটি আর্বিটারি জটিল অবস্থান, যা অনন্ত শূন্য অভিমুখী।এটা এমনই এক অবস্থান, যেখানে শূন্যতা অর্থে কিছু নেই নয়, বরং যা আছে অদৃশ্যমান।অর্থাৎ, আদর্শ empty space হলো অসীম অভিমুখী অনন্ত।যে কারনে বিজ্ঞান স্বাভাবিকভাবে কোনো শূন্যস্থানকে ধরে রাখতে পারে না।বাতাসে শূন্যস্থান সৃষ্টি হলে, সেখানে প্রবেশ করে আশেপাশের যাবতীয়।মহাশূন্যের অভ্যন্তরে থাকা যেকোনো বস্তু কৃষ্ণগহ্বরের দিকে আকর্ষিত হতে থাকে, ইত্যাদি।ঠিক যেরকম, বর্তমানে থাকা যাবতীয় যাকিছু, সবই অস্থির।যা আজ অনাবিষ্কৃত, তাই আগামীকাল আবিষ্কারের ইঙ্গিত।যাইহোক, এসব অনেক কথাই উত্তরপর্বে আসতে থাকবে।তবে, বেশী বিষয়ান্তরে না গিয়ে আসুন, আমরা আমাদের মূল জায়গায় ফিরে আসি।
:
কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ নিয়ে কবিতায় প্রবেশের আগে, যে বিষয়টির উপস্থাপনা জরুরি, তা হলো : কৃত্তিমভাবে ভাষা গঠন করা যায় কি না এবং তার ব্যাকরণগতো শৈলী কৃত্তিমভাবে করা যায় কি না।এ বিষয়ে, শুঁয়োপোকা গদ্যটির লেখক পীযূষদাকে প্রশ্ন করায়, তিনি বলেছিলেন 'কেনো সম্ভব নয়।অবতার সিনেমাটির গল্পে একথা দেখো নি।যেকোনো ভাষার কিছু নির্দিষ্ট শৈলী / প্যাটার্ন / বিন্যাস আছে।এরকমই শর্ত / ফ্যাক্টরগুলির ওপর নির্ভর করে সংশ্লেষিত হয়েছে ব্যাকরণ, তৈরি হয়েছে ধ্বনিভিত্তির লিখিতো রূপ।সুতরাং, এই শৈলীগুলিকে যদি বিশ্লেষণ করে, কোনো এক ভিন্ন অনুলিপি তৈরি করা যায় কৃত্তিমভাবে, সেক্ষেত্রে কৃত্তিমভাষ্যের জিনগতো প্যাটার্ন অবশ্যই গড়ে তোলা সম্ভব।শুধু তাই নয়, মেশিন কতৃক (এখানে, কম্পিউটারকে 'মেশিন' গোত্রে ফেলা হলো) সেই কৃত্তিম ভাষার analogy দিয়ে, কবিতাও লিখে ফেলা সম্ভব।যার, একটি প্রাথমিক রূপায়ন হিসেবেই 'শুঁয়োপোকা' গদ্যটি।সম্প্রতি, পীযূষদা একটি ব্লগ খুলেছেন, নাম কমলিকা, ঠিকানা :https://komolikaa.blogspot.com।সেখানে, এই গদ্যটির সম্পূর্ণ অংশটি রয়েছে।যাইহোক, ওভার দ্যি টেলিফোন, মেসেঞ্জার এবং সর্বোপরি এই বছরের শুরুর দিকে হওয়া কলকাতা বইমেলায়, পীযূষদার সাথে সাক্ষাতে বিষয়টি নিয়ে, অনেক কথাই হয়েছে।সেসব কথা ও নিজের আত্মীকৃত ভাবনাকে মিশিয়ে, বিষয়টি সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছি
:
বেশ কিছুদিন আগে, ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম "EVERY AUTOMATIC SYSTEMS BASED ON CHOOSABLE STATE OF PROBABILITY" এবং এটির শিরোনাম ছিলো : পরবর্তী কবিতাংশের সন্ধান।কথাটির যদি বাংলায় ভাষান্তর করা যায়, তা অনেকটা এরকম হতে পারে "সম্ভাব্য দশাকে বেছে নেবার ওপরেই, প্রতিটি স্বয়ংক্রিয় তন্ত্র নির্ভর করে থাকে"।কথাটিকে, আরেকটু সহজলভ্য করে দেখলে, যেকোনো বিষয়ভিত্তিক কাজের গোটা প্রক্রিয়াটি, যদি সিস্টেম হয় : তাহলে, তার ক্রিয়া করা বা function করাটি নির্ভর করে ~ তার বেছে নেওয়া সম্ভাবতার (probability) দশাটির (state) ওপর।যদিও, বলে রাখি ইংরেজি ভাষাটি থেকে ভাষান্তর ব্যাপারটি সড়গড়তার অভাবে একটু দুর্বল লাগতে পারে।চাইবো, পাঠক আমাকে সাহায্য করুক।এবার, উপরের সিদ্ধান্তটির সাপেক্ষে একটু ছোট্ট উদাহরণ নেওয়া যাক।ধরা যাক "অন্ধকারে থাকলে ভয় পাই", এই সিদ্ধান্তটি।এখানে : 'অন্ধকার' হলো দশা, 'ভয় পাওয়া' এবং থাকা একটি function বা ক্রিয়া, শর্ত হিসেবে রাখতে পারি 'দেখতে না পাওয়া' এবং 'থাকা', system বা তন্ত্র হলো 'বিশ্বাস' বা 'belief', যার ভেতর ভয় পাওয়া functionটি কাজ করছে।অর্থাৎ, দেখতে পাচ্ছি না → অন্ধকার → ভয় পাচ্ছি : এটা যদি ফ্লো-চার্ট (flow chart) হয়, তাহলে ~ সিস্টেমের একটি বা একাধিক দশার কারনে একটি ফাংশন্ কাজ করে, যার কিছু শর্ত থাকতে হবে।অর্থাৎ, শর্ত → দশা → ফাংশন, ব্যাপারটি এরকম।এখোন, এই কাজ করার প্রক্রিয়াটি কিভাবে সম্পন্ন হয়, সে সম্বন্ধিত উপ-বিষয়টি খানিক বুঝে নিলে ভালো।সহজভাবে একে বোঝানোর জন্য, একটি খুব সহজ গাণিতিক উদাহরণ নেওয়া যেতেই পারে।
ধরা যাক, চারটি সংখ্যা নেওয়া হলো : ০,১,২,৩।এখোন ফাংশন হলো, এই সংখ্যাগুলিকে একে অপরের সাথে যুক্ত করে, ৩ ফল আনতে হবে।এখানে শর্ত হলো 'যোগ' বা (+), দশা হলো ধনাত্মক সংখ্যা বা (+০/+১/+২/+৩) এবং ফাংশন হলো '৩' বা f(৩) =∑(?+?....+?)।(∑) চিহ্নটি গণিতের ভাষায় 'মোট যোগফল'।এবার কী কী উপায়ে এটা করা যেতে পারে, দেখা যাক : ০+৩; ৩+০; ০+১+২; ০+২+১; ২+১+০; ১+২+০; ২+০+১; ১+০+২; ০+১+১+১; ১+১+১+০।উক্ত বিন্যাসগুলির মধ্যে প্রতিটি একক্ বিন্যাস, নির্দিষ্ট দশাটিতে অবস্থান করে, নির্দিষ্ট শর্তপূরন করে, ফাংশনাল ক্রিয়াটি সম্পন্ন করছে।একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, মোট বিন্যাস সংখ্যা ১০।সম্ভাব্যতা বা probabilityর সাধারন সূত্র অনুযায়ী : ৪টি সংখ্যা বা digitর জন্য মোট বিন্যাসের সম্ভাব্য রূপসংখ্যা হলো : ৪+৩+২+১+০ = ১০।গোটা প্রক্রিয়ার জন্য ব্যবহৃত সিস্টেমটিকে বলা যেতে পারে mathematical logic system বা গাণিতিক-যুক্তিতন্ত্র।আবার, এটাও খেয়াল করার মতো : আপাতভাবে শর্ত বা দশা, যেকোনো একটির পরিবর্তন হলে ~ সমগ্র ফাংশনটির একেকরকম ফলাফল পাওয়া যাবে।যদিও, উদাহরণগুলি অনেকটাই সরলভাবে নেওয়া হলো।কারন,শর্ত বা দশার একাধিক অন্তর্ভুক্তির ফলে ফাংশনটি কিন্তু অত্যন্ত জটিলতর।এভাবেই বিভিন্ন সিস্টেমের অন্তর্গত বিভিন্ন ফাংশনগুলি, বিভিন্ন দশা এবং শর্তের সংঘবদ্ধতায় রূপায়িত হয়ে থাকে।আরো মজার কথা, সমাধানের ভিন্নভিন্ন ফল তখনই হয়, যখোন শর্ত বা দশার সামান্যতমো হেরফের ঘটে।ঘটে যায় 'কেওস' বা chaos।এবিষয়ে মজাদার স্পষ্ট থিয়োরিও আছে, যার নাম chaos theory (কেওস থিওরি)।উৎসাহী পাঠক, ইন্টারনেট সার্চ করে দেখে নিতে পারেন 'কেওস থিয়োরি ও বাটারফ্লাই এফেক্ট'।কারন, এটিকে এখানে ব্যাখ্যা করার অর্থ : নিশ্চিতভাবে বিষয়ান্তরে পৌঁছানো।যাইহোক, যেকোনো ভাষার ব্যাকরণ বিশ্লেষণ করলেও কিন্ত, এরকমই নির্দিষ্ট কিছু বিন্যাস আমরা পেয়ে যাবো।এভাবেই, মানুষের সৃষ্ট ভাষা / পাখিদের সৃষ্ট ভাষা / গাছেদের সৃষ্ট ভাষা / মাটির সৃষ্ট ভাষা / বিভিন্ন প্রাণীকূল সৃষ্ট ভাষা / যাবতীয় যা কিছু, আর এভাবেই মেশিন সৃষ্ট ভাষা।এবারে আমরা সহজভাবে দেখার চেষ্টা করি, মেশিন এবং মানুষের মধ্যে ক্রিয়ার তুলনামূলক জায়গাটি ঠিক কিরকম
:
খুব সাধারন যুক্তিবোধ থেকে, একথা বলা যেতে পারে : মেশিন একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া বারবার একইভাবে বা সমদক্ষতার সাথে সম্পন্ন করতে পারে, যেটা মানুষ পারবে না।স্বাভাবিকভাবেই, মেশিন কাজটি অনেক কম সময়ে করবে এবং তুলনামূলকভাবে মানুষের দেরি হবে।একটা উদাহরণ নেওয়া যাক : ধরা যাক, 'একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে, একটি নির্দিষ্ট মাপের দড়িকে, কয়েকটি নির্দিষ্ট মাপে কেটে ছোটো করতে হবে'।এখানে, শর্ত হোলো ছোটো দড়িগুলোর মাপের কোনো হেরফের নয়, অর্থাৎ নির্দিষ্ট মাপ।দশা হলো নির্দিষ্ট পরিবেশ।ফাংশনাল প্রক্রিয়াটি হলো কেটে ছোটোছোটো করা।এখোন, মানুষের তুলনায় মেশিনের কাজটি করা ওপরের শর্ত ও দশা'র সাপেক্ষে দ্রুত সহজ এই কারনেই যে : মানুষের অঙ্গ সঞ্চালনা অনির্দিষ্ট (এখানে, তার পেশীর শৈলী, সঞ্চালনার গতিবেগ, ইত্যাদি বহু শর্ত ও দশা।বলা ভালো, তার নিয়ত-জটিল গঠন আরো অনেক শর্ত ও দশার ওপর নির্ভরশীল)।এবারে যদি নির্ভুলতার জায়গাটি আসে, সেখানেও কিন্তু মেশিনটি মানুষের চেয়ে বেশি মাত্রায় নির্ভুল হবে।কারন, মানুষের সবার আগে দরকার আলোর প্রকাশ।সাধারন পরিবেশ, যাকে atmosphere বলে মানুষ জানে, সেখানে কিন্তু আলোর অন্তর্ভূক্তি নেই।বলা ভালো, আলো হোক বা অন্ধকার : মেশিন তার কাজটি করেই যাবে।এবার, দেখা গেলো : দড়িটির ক্ষেত্রফল, তার কোনো এক জায়গায় এতো বেশী যে, যা দিয়ে কাটা হচ্ছে তা কাটতে পারছে না।এখানে মেশিন তার কাজে বাধাপ্রাপ্ত হলেই, সে বলবে performing ERROR, কিন্তু মানুষ সেখানে দড়ি ও কাটারের ভেতর একটি ঘর্ষণবল প্রয়োগ করবে এবং দড়িটি কেটে ফেলবে।এখানে, ঘর্ষনবলের প্রয়োগ হলো সৃজনশীলতা এবং ঘর্ষনবল প্রয়োগ করার প্রয়োজনীয়তা হলো বুদ্ধিমত্তা, যার কারনে সে অনুভব করলো কিভাবে দড়িটিকে কাটা যেতে পারে এবং একটি স্থায়ী সিদ্ধান্ত নিলো।এবার যদি কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করতে হয়, মেশিনের দশাটির মধ্যে ঘর্ষনবল সংক্রান্ত যাবতীয় কিছুর অন্তর্ভূক্তি ঘটাতে হবে।আসলে, এই সমগ্র লজিক সিস্টেমের তফাত কার্যের গতি ও নির্ভুলতার মানোত্তরণ নির্দেশিত করে।যদিও, এই উদাহরণটিকে আরো বিশদ করা যেতো, ফলতঃ হয়তো আরো সহজবোধ্য করা যেতো, তবু মনে হয় এটুকু আলোচনাতেই সম্ভবতো বিষয়টি বোঝা যাবে (কেউ না বুঝলে, আলোচনা চাইতেই পারেন।দরজা সবসময় খোলা)।যাইহোক, একাধিক ফলাফল পেলে, তার ভিতর কোনটি প্রয়োগের সম্ভাবনা বেশী ~ এটি বাস্তবিক্ পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল।অতএব, এটুকু সিদ্ধান্ত নেওয়াই যায় : যে যে ফাংশনগুলি অতীতে সম্পন্ন হয়েছে, সেসবের বিশ্লেষণে প্রাপ্ত দশা ও শর্তগুলিকে নিয়েই মেশিন কার্যসাধন করতে পারে এবং যা হয়নি অর্থাৎ অপরিচিতো পরিবেশে তার কিন্তু এরর্ ঘটানোর সম্ভাবনা বেশী, যেহেতু তার সৃজনশীলতা অসম্পূর্ণ।এছাড়াও, আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে : মেশিনের কার্যকাল একটি নির্দিষ্ট সময়-ফ্রেমের মধ্যে সক্রিয়। অর্থাৎ কোনো বাহ্যিক চালিকাশক্তির যোগান্ ছাড়া, সে সক্রিয়ভাবে ক্রিয়াশীল নয়।অর্থাৎ সে কখনো অনন্তভাবে একনাগাড়ে কোনো কাজ করতে পারে না, যা ব্রহ্মাণ্ডের ভিতর প্রকৃতি পারে।এখান থেকে আরো একটি বিষয় ভাবা যেতে পারে : মেশিনের কার্য-প্রসারতা স্থায়ী ও নির্দিষ্ট (এখানে, মানুষকেও আপাতভাবে মেশিন অন্তর্ভুক্ত করা হোলো), অপরদিকে প্রকৃতির কার্য-প্রসারতা অস্থায়ী ও অনির্দিষ্ট।অর্থাৎ, প্রকৃতিতে আজ কোনো বিষয় ঘটছে না বলে, কালও ঘটবে না : একথা চরম সত্যি নয়।

:
এবার অনেকে প্রশ্ন করতেই পারেন : সাহিত্য বিষয়ক আলোচনায়, এতোসব প্রযুক্তির বিশদতা কেনো।উত্তরে একথা বলবো, বর্তমান সময় হলো তথ্য-প্রযুক্তির যুগ, the era of information & technology, সুতরাং এই সময়ের সাপেক্ষে অতীতকে দেখতে গেলে, সেসময়ের চিন্তাভাবনার প্রযুক্তির দিকেও খেয়াল রাখা উচিৎ বই কী।এতোকাল, সিলেবাস আমাদের শিখিয়েছে : যে অতীতের কবিতা, বর্তমান সময়কে ভুলে সে অতীতে পৌঁছাতে।কিন্তু এখানে বলবো, বর্তমান সময়ের সাপেক্ষে অতীতকে দেখতে।কারন, সাপেক্ষে শব্দটি আনা মানেই তদপূরক সময়ের লক্ষনগুলির দিকেও তাকানো
:
আসলে, যাকিছুই ঘটছে ~ সেসবেরই 'টাইম অ্যান্ড স্পেস' আলাদা আলাদা। আমাদের লজিক্যাল্ সিস্টেম অনুযায়ী 'টাইম' বিষয়টি হলো সময় (মহাবিশ্বের মৌলিক কাঠামোর ভিতরে থাকা, এমন একটি বিশেষ অংশ ~ যেখানে সমস্ত ভৌত বা বাহ্যিক পরিবর্তনের ঘটনাসমূহ, একটি নির্দিষ্ট ক্রমধারায় ঘটে) এবং 'স্পেস' হলো স্থান (মহাবিশ্বে অসীম অভিমুখীন দৈর্ঘ্য / প্রস্থ / উচ্চতা বিশিষ্ট ত্রিমাত্রিক বিস্তৃতি, যেখানে বস্তু ও ঘটনা একসাথে অবস্থান করে।অতএব, যার আপেক্ষিক অবস্থান এবং দিক আছে)।কিন্তু তার সাথে চেতনা / আলো / স্পন্দন ~ এসব কি পৃথক পৃথক মাত্রা হিসেবে গণ্য হতে পারে না? সমস্ত কিছু নিয়েই তো কবিতার ব্রহ্মাণ্ড।ভুল বললে, পাঠকের দায়িত্ব শুধরানোর।যাইহোক, আজ অনেক আলোচনা হলো।আসছে পর্বটির বিষয় থাকুক : মেশিন রচিত কবিতার সাপেক্ষে কবিতার শুরু, কবিতায় প্রযুক্তি


শব্দরূপ : রাহুল গাঙ্গুলী