Tuesday, July 2, 2024


 

স্মৃতির বিদ্যালয় 
              জয়তী ব্যানার্জী 
  
"মুছে যাওয়া দিনগুলি 
       আমায় যে পিছু ডাকে "_____
   জলপাইগুড়ি রাষ্ট্রীয় বালিকা বিদ্যালয়, সেই লাল সাদা, কত কত লাল সেনা চলেছে সমরে ।আজ আমরা পায়ে পায়ে চল্লিশ, পেরিয়ে ৪৫ এ।১৯৭৯; সেই কবেকার কথা ।তোমার কথা লিখতে বসে গভর্মেন্ট গার্লস____ সবকিছুই যে গুলিয়ে যায়। ১৯৭৯--- কোথা থেকে শুরু করব আর কোথায় বা এর শেষ, কোনই যে আদি অন্ত নেই। মাইলের পর মাইল পার হয়ে এসে আজ আমরা লক্ষ্য যোজন দূরে তোমার থেকে ।তবুও কি আমরা ভুলতে পেরেছি। গেট দিয়ে ঢুকেই ঢালাও পিচ রাস্তা, ডানদিকে বকুল গাছ, কিছুটা এগিয়ে বাঁদিকে সাইকেল স্ট্যান্ড আর অপূর্ব সুন্দর পদ্মপুকুর। তুমি আমার জীবনের অনেকটা। কি করে ভুলবো তোমাকে। জীবনের অনেকটা বললেও বোধহয় কম বলা হবে ।তুমি যে আত্মার আত্মীয়, তোমার কাছেই হাতে খড়ি, পথ চলার পাঠ শিক্ষা--- রবীন্দ্রনাথ- নজরুল- জীবনানন্দ। তোমার কাছেই শিখেছি হাসি-ঠাট্টা গান গল্পের জীবনে বড় হয়ে ওঠার চাবিকাঠি। তুমি শিখিয়েছ কত গান, কত নৃত্য নাট্য, বই পোকা হওয়া, শ্রুতি নাটক, পথচলা; সর্বোপরি মানুষ হওয়ার শিক্ষা। মনে পড়ে সেই টিফিন ঘরের বারান্দা, মনে পড়ে কিৎকিত্ খেলার কোর্ট ,আমলকি গাছের তলায় স্লিপ ,আরো কত কিছু।সেই ১৯৭৯ সাল --একরাশ খুদে খুদে লাল পিঁপড়ের দল বকুলতলা পেরিয়ে মায়ের হাত ধরে প্রবেশ করেছিল তৎকালীন সময়ের জলপাইগুড়ি তথা উত্তরবঙ্গের গৌরব জলপাইগুড়ি গভমেন্ট গার্লস স্কুলে ।সেই শুরু তারপর আর থেমে থাকেনি বা পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রোদ্দুর রানীদের।
               হ্যাঁ---- রোদ্দুর; ১৯৮৯ সালে আমরা মাধ্যমিক দিয়েছিলাম ৩০ জন। সেই ৩০ জনকে নিয়েই আমাদের 'রোদ্দুর পরিবার'। প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী আমরা ।বিশাল বিদ্যালয় ,বিশাল তার কলেবর; প্রথম দিকে কেমন যেন একটা ভয়- ভয়, গুরু গুরু ভাব, কিন্তু আস্তে আস্তে সব গেল কেটে ____আকাশের কালো  মেঘের ঘনঘটা সরিয়ে নতুন সূর্যের আলো এসে পড়ল আমাদের গায়ে। 
         লাল ফিতে সাদা মোজা 
                স্কুল স্কুল ইউনিফর্ম 
         ন'টার সাইরেন আর সিলেবাসে মনোযোগ কম ---
        পড়া ফেলে এক ছুট 
       ছুটে রাস্তার মোড়--- 
             ----- সাইকেলের ভিড়ে সব লাল পিঁপড়েরা এভাবেই যে মিশে যায়......
          এভাবেই আস্তে আস্তে এগিয়ে চলে রঙ্গমঞ্চের কুশিলব রা। সে সময় সরকারি বিদ্যালয় এর প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন শ্রীমতি ইন্দিরা ঘটক। অসম্ভব নজর কাড়া ব্যক্তিত্ব। প্রথম শ্রেণীতে 1979 সালে প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য প্রায় ৬০০ ছাত্রী তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তার থেকে সুযোগ পায় মোটে ৩০ জন। তখন অবশ্য এই বিপুল সংখ্যার অনুপাতটা বোঝার মত বয়স বা পরিস্থিতি কিছুই ছিল না। তবে এখন যখন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই বিষয়টা গল্পের আকারে প্রকাশ পায় তা যেন এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় আবার গর্বেরও বটে। কতখানি আধুনিক মনস্ক ছিলেন ওই দিদিমণি সেই সময় ছাত্রীদের পরীক্ষার সাথে সাথে বাবা-মায়েরও ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন। সেটা অবশ্য পরে শুনেছি অনেক সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল কিন্তু একটা কথাই এখন মনে হয় উনি কতখানি তখনকার সমাজ ব্যবস্থা থেকে এগিয়েছিলেন এবং আমাদের জলপাইগুড়ির মতো একটা মফ:স্বল শহরে এই ব্যবস্থা কার্যকরী করেছিলেন।
                 সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে ছিলেন অর্চনা রায়, অর্চনা ভট্টাচার্য অর্চনা সরকার ----কি দারুন নাম! একটু বড় হয়ে বুঝতে পারতাম সবার নামই অর্চনা। যেন নিজেদেরকে অর্চিত করেছেন আমাদের মানুষ গড়ার কাজে। প্রথম শ্রেণীতে এই তিন দিদি আমাদের পড়াতেন। শুধু তো পড়া নয় সারা বছর ধরে চলছে ইন্দিরা দি ওরফে ইন্দিরা সেনগুপ্তর হাত ধরে কত সেনা চলেছে সমরে, একটু বড় হতেই পিংপং বল নিয়ে ইন্দিরা দির তত্ত্বাবধানে এক সম্মিলিত প্রয়াস---- "হাট্টিমাটিম টিম, তারা মাঠে পাড়ে ডিম ,তাদের খাড়া দুটো শিং।"এভাবেই দিন ঘুরে মাস, মাস ঘুরে বছর , আর আমরাও সময়ের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে বড় হতে থাকলাম.. একটু বড় হতেই মনে পড়ে খেলার দিদি চম্পা দির বাঁশি বাজিয়ে সকলকে মাঠে ডেকে নেওয়া। আর আমরাও কোন সময় দোতলার ক্লাস আবার কোন সময় বা তিন তলার ক্লাস থেকে কালো প্যান্ট আর সাদা স্পোর্টস গেঞ্জি পড়ে লাইন করে নেমে আসতাম ,সে এক দেখার মত দৃশ্য ।তখন তো আর এখনকার মত সকলের হাতে মুঠোফোন ছিল না। কিন্তু আজ যখন একলা বসে দিনান্তে চলে স্মৃতি রোমন্থনের পালা ,তখন যেন চলচ্চিত্রের মতোই ছবিগুলো পরপর চলতে থাকে ,ক্যামেরাবন্দি হয় মানষ রিলে । কোনো   SLR বা DSLR, Nokia, Sumsung এর মুঠোফোনে নয়। এই যে সত্যিই আমাদের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। 
                 সবকিছু গুছিয়ে বলতে গেলে হয়তো বা কালি কলম সব ফুরিয়ে যাবে, তবুও গল্প বলা শেষ হবে না। শেষ হবে না স্মৃতি রোমন্থন এর পালা। বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান___ প্রতিবছর বিদ্যালয়ের মাঠেই মার্চের শুরু কি ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু তার প্রস্তুতির পর্ব চলত ২৬ শে জানুয়ারির পর থেকেই। এখন তো আবার সব স্কুলের জিরো পিরিয়ড। সেখানে নাচ-গান শেখানো হয়, অন্য সময় হলে তাতে নাকি পড়াশুনোর ক্ষতি হবে। আমরা কিন্তু এসব জানতাম না। দিনের শেষে দুটি তিন পিরিয়ড ধরে চলতো রিহার্সাল । সেসব দিনের যেকোন ভাগ হয় না ।এখনো বোধহয় বিল্ডিংয়ে কান পাতলে ভেসে আসে সেই মিষ্টি মধুর গলা-----
            "......বেলা বয়ে যায় 
               ছোট্ট মোদের পানসি তরী 
                সঙ্গে কে কে যাবি আয়। "
        শুধু কি নাচ আর গান, সব সময় পড়াশোনাতেও কিন্তু সবার সেরা। এখনো বোধহয় গভর্মেন্ট গার্লস স্কুল আমাদের সেই সময়কার রেকর্ড ভাঙতে পারেনি। আমরা ১৯৮৯ তে ৩০ জন মাধ্যমিক দিয়েছিলাম ,তার মধ্যে ১৭ জন স্টার অর্থাৎ এখনের ভাষায় ৭৫% এর উপরে নাম্বার আর সকলেই ফার্স্ট ডিভিশন অর্থাৎ ৬০% এর ওপরে....এখন হয়তো কালের নিয়মে এটা খুবই নগণ্য কিন্তু সেই সময় এটা বলার মতোই বিষয় ছিল।
        তারপর আবার প্রজাতন্ত্র দিবস---- জানুয়ারি মাসের ১০-১২ তারিখ থেকেই শুরু হয়ে যেত পুলিশ ভ্যানে করে প্যারেড গ্রাউন্ডে প্র্যাকটিসে যাওয়া। অন্যান্য স্কুল থেকেও সব আসতো ....দারুন মজা কিন্তু আমাদের রাগী দিদিমণিদের চোখ এড়িয়ে মাছি পালানোর জো থাকত না। এত কিছুর পাশে সাইন্স এক্সিবিশন, বইমেলা ,সেমিনার কিন্তু চলছে। প্রথম পুরস্কার তো আমাদের স্কুলের বাধা। স্থানীয় ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আমাদের খুদে বিজ্ঞানীদের দল তাদের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নিয়ে মাঝে মাঝেই হানা দিত সেমিনার বা বিভিন্ন ধরনের কর্মশালাতে। 
                 তোমাকে নিয়ে তো গল্পের শেষ নেই গভমেন্ট গার্লস। টিফিন ঘরের বারান্দাটা বড্ড টানে গো। আমরা ৩০ জন একসাথে বসেই টিফিন খাব ,টিফিন বক্স হয়তো সকলের নেই। কারো হাতে ঢাকনা, কারো হাতে বক্সের ভেতরের ছোট বক্স ,এরকম আরো সরঞ্জাম ।শুকনো টিফিন হলে শাড়ির আঁচল। কিন্তু টিফিন ঘরে দিদিমণিদের চোখ রাঙানীর মুখোমুখি তো হওয়া যাবে না ,এমনই ছিল বন্ধুত্ব এর বন্ধন।
                      খুব মনে পড়ে সেই দিনটার কথা ।এখন আর মনে নেই, কোন ক্লাস ।খুব সম্ভব ক্লাস নাইন---- আগের দিন ভূগোল ক্লাস না করে আমরা সবাই মিলে মাঠে খেলছিলাম, আর তাতে নেমে এলো খাঁড়া। পরের দিন স্কুলে ঢোকার সাথে সাথেই শমন। রাগী রাগী চোখে দিদিমণি এসে বললেন, "আজকে সাদা কাগজের মধ্যে ১০৮ বার লিখতে হবে আমরা আর কোনদিন ক্লাস ছেড়ে খেলতে যাব না "--আবার সেটা বড় দিদিমণিকে দিয়ে সই করাতে হবে। এখন এই প্রাপ্ত বয়সে যখন আমাদের পরের প্রজন্ম বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার করে এসেছে, সেই সময় ব্যাপারটা বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করি। কিন্তু সেই সময় এটা ছিল একটা tough job . আমাদের সময় ক্লাস টেনের ইংরেজি বইতে সুধা চন্দ্রের একটা পাঠ্য ছিল। সেই সুবাদে আমাদের ইংরাজি দিদিমণি অনুভা দি আমাদের লাইন করে সিনেমা হলে এই সিনেমাটা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সিনেমাটার নাম এখনো মনে আছে 'নাচে ময়ূরী '-----ওনার আত্মজীবনী নিয়ে তৈরি। সেই সময় তো এখনকার মত সিনেমা বা দূরদর্শন বা মোবাইল এত সরগড় ছিল না, তাই ওটাই ছিল আমাদের কাছে একটা উৎসব।
                     এগুলো তো সবই স্কুলের ঘেরা টোপের কাহিনী, এবার আসি সেই ১৯৭৯ সালে যাদের হাতে হাত রেখে আমাদের সেই ৩০ জনের পথচলা শুরু হয়েছিল। এত বছর পরেও তা কিন্তু অমলিন ।আজ আর আমরা বন্ধু নই, আমরা এখন একটা পরিবার ---'রোদ্দুর পরিবার'। যার ডালপালা সুদূর আমেরিকা থেকে ইউরোপ সর্বত্রই ছড়িয়েছে। আজ হয়তো অনেকের মনে হবে অন্তর্জালের যুগে এটা হয়তো কোন বড় বিষয় নয়, কিন্তু আমরা যে সময় বড় হয়েছি সেই সময় সেটা কিন্তু ভাবনারই বিষয় ছিল। বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদ ___আমরা তো জানি না ----কিভাবে তাকে ধরে রাখতে হয়, তাদের সাথে যোগাযোগ তৈরি করে নিতে হয় , শুধু জানি মা বাবার সঙ্গে যেমন কোন ভদ্রতা নেই, কোন আনুষ্ঠানিকতা নেই, তাদের সাথে যোগাযোগ তৈরি করে নিতে হয় না; আমাদের বন্ধুত্ব ও তাই।
            আমাদের সবচেয়ে বড় পাওনা হলো, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ও জানে ,আমরা হলাম সেই--- যারা শিখেছিল----
        "জীবন যদি জীবন্ত হয় 
             জয়কে তুই আপন কর ,
        স্বর্গ যদি কোথাও থাকে 
             নামাও তাকে মাটির প'র"
                      আজ আমরা সকলেই স্বস্ব ক্ষেত্রে সু প্রতিষ্ঠিত ।তবুও যেন কিসের গন্ধে ,কিসের টানে, বারবার ফিরে ফিরে যাই সেই পদ্মপুকুর, বকুলতলা ,সাইকেল স্ট্যান্ডে ।আজও যখন নিজের কর্ম ক্ষেত্রে যাওয়ার সময় দেখি লাল সাদা ইউনিফর্ম পড়ে ছোট ছোট মেয়েরা যাচ্ছে, মনটা যেন ছুটে চলে যায় সেই স্কুলের মাঠে ।স্পষ্ট দেখতে পাই ইন্দিরা দির হাতে ড্রাম আর আমরা গাইছি: 
          "  শতফুল বিকশিত হোক 
      যত আগাছা নির্মূল হোক,
       মোরা যুবকেরা সকলেরই সূর্য ,
          যেন আট'টা ন'টা 
               পৃথিবীতে আনবোই 
                       নতুন এক বসন্ত"।।


 

স্কুলের সেই ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠার দিন গুলো

                    কবিতা বণিক

শৈশব, কৈশোর থেকে যৌবনে  পদার্পনের  এক সুমধুর স্মৃতি স্কুল জীবন। বাড়িতে বা  বাইরে স্কুল ড্রেসের ছেলেমেয়েদের দেখলে  এখনও নিজেদের সেই সোনালি চঞ্চল  মধুর স্মৃতি, সরণী বেয়ে চলে আসে।  কত না খেলার -ধরণ, খুনসুটি ইত্যাদি। কাগজের টুকরোয়  চোর, ডাকাত, পুলিশ ইত্যাদি লিখে চোর-পুলিশ খেলা, আবার ওই চোর, ডাকাত লেখা কাগজ বন্ধুদের জামার পেছনে  সেফ্টিপিন  দিয়ে আটকে  মজা দেখা। খাতার পেছনে কাটাকুটি খেলা , কুমির ডাঙা খেলা, তেঁতুল, পুতুল দিয়ে বন্ধুত্ব পাকা করা  ইত্যাদি অনেক স্মৃতি ভেসে আসে। গেম টিচারের শেখানো  খেলা আজও  বাচ্চাদের সাথে খেলতে , শেখাতে  ভালো লাগে। খো খো , কাবাডি, দাঁড়িয়াবান্ধা, রুমাল চোর  ইত্যাদি।  টিচারদের বলতে শুনেছি — ছেলেমেয়েরা  কেমন চোখের সামনে বড় হয়ে যায় ! “ তখন এর মানে বুঝিনি । আজ বুঝি  কালিদাস রায়ের সেই  ছাত্রধারা কবিতার লাইন — কৈশোরের কিশলয় / কর্মে পরিনত হয় /  যৌবনের শ্যামল গৌরবে। 

                              আমার  শৈশবে  কোন এক শীতের সকালে  বাবার  হাত ধরে  শিলিগুড়ির  “ বাণীমন্দির রেলওয়ে হায়ার সেকেন্ডারি  স্কুলে” ভর্তি হয়ে এলাম। বাড়ির  খুব কাছেই  সোজা রাস্তার ওপর  স্কুল ।  রাস্তার  মাঝখানে  গোল হয়ে একটা চঞ্চল নদী বয়ে গেছে।  নাম তার পঞ্চানই।  কিছু উঁচু  ক্লাসের বন্ধুদের সাথে  আমার স্কুলে যাওয়া আসা ঠিক করে দিয়েছিলেন  আমার মা ।  স্কুলে  যাওয়ার পথে মাঝে মাঝে   রাস্তার থেকে সামান্য দূরে উঁচু পাড় থেকে নদী দেখতাম।  এদিক থেকে নদীতে নামা সম্ভব নয়। নদীর বয়ে চলা দেখতে ভারি ভাল লাগত।  নদীও যেন আমাদের বন্ধু ছিল।  কিছুদূর গিয়ে নদীটাকে আর দেখা যেত না। এমনি একদিন নদীর সাথে খেলতে খেলতে  স্কুলে পৌঁছতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। আমরা স্কুলের ঘন্টা শুনে  ছুটতে ছুটতে স্কুলে পৌঁছলাম। এদিকে আমি রাস্তায় পড়ে গিয়ে  আমার হাঁটু দুটো ছড়ে গিয়েছিল।  ক্লাস বসে  গিয়েছে। আমি ক্লাসে সোজা ঢুকছি। দিদিমণি দাঁড়াতে বলে বললেন - ক্লাসে ঢোকার আগে পারমিশন নিতে হয়।  বল, দিদিমণি আসব ?  আমি এস বললে তবেই আসবে কেমন? “  সেদিনেই টিফিন  সময়ে  আমাকে এক জায়গায় বসে থাকতে দেখে  দিদিমণি এসে আমাকে কোলে নিয়ে বললেন , “ ব্যথা করছে? টিফিন খেয়েছ ? “ আমি  ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম। আমাকে টিচারস রুমে নিয়ে গিয়ে লাল ওষুধ দিয়ে ব্যণ্ডেজ বেঁধে দিলেন।

                           আমার জীবনের প্রথম পরীক্ষা সেদিন। বাইরে  বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমাদের স্কুলের বাউণ্ডারী ওয়ালটা বেশ ছোট।  রাস্তাটা দেখা যায়।  জানালা দিয়ে দেখি আমার এক বন্ধু  তার ছাতা মাথায় নিয়ে  বলছে— আমার ছাতা আছে। বাড়ি যাবি? না হলে ভিজে যাবি কিন্তু ! “  শোনা মাত্র পরীক্ষার খাতা ব্যাগে ঢুকিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি।  দিদিমণি স্নেহভরে বললেন — কোথায় যাচ্ছ? “ বললাম, বাড়ি। - কেন? বললাম - বৃষ্টি পড়ছে যে !  আমার তো ছাতা নেই তাই ওর ছাতায় যাব। “  দিদিমণি — পরীক্ষা দেবে না?  বললাম— লিখেছি তো!  দিদিমণি — কই? আমায় তো দাওনি !  দাও দেখি খাতাটা। “  খাতা দেখে  বললেন —আরও তো  কোশ্চেন সব বাকি আছে   সব লেখ  তবে তো বাড়ি যাবে!  আমি তোমার বাবাকে বলেছি তিনি  ছাতা নিয়ে আসবেন।  সব লেখা হয়ে গেলে খাতাটা আমাকে দিয়ে যাবে কেমন? বাড়ি নিয়ে যেও না।  আর শোন, ক্লাসে ঢোকার সময় যেমন পারমিশন নিতে হয় তেমনি ক্লাস থেকে বের হওয়ার সময় ও বলবে, দিদিমণি বাইরে যাব ?  যাও নিজের জায়গায় বোস। “  পরীক্ষার  মানেটা হয়তো একটু বুঝেছিলাম। 

                             বছর দুয়েক পর একদিন স্কুল ছুটির পর বন্ধুদের সাথে বাড়ি ফিরছি ।  স্কুলের গেটের কাছেই  দুটো মেয়ে আমাকে খুব মেরে পালিয়ে গেল। আমি কাঁদছি। হঠাৎ আমার ক্লাস টিচার দিদিমণি  আমাকে উঠিয়ে জিজ্ঞেস করলেন - কি হয়েছে? “ বন্ধুরা মেয়েদুটোর নাম বলে বলল ওরা মেরেছে।  কিন্তু কেন মারল তা বুঝলাম না। হয়তো দিদিমণি বুঝেছিলেন।  পরদিন ক্লাসে রোলকল শেষে  ওই দুজন মেয়েকে ব্রেঞ্চের ওপর কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল।  শুধু তাই নয় প্রত্যেক  ক্লাসের টিচারদেরকেও বলে দিয়েছিলেন যেন তারা ব্রেঞ্চ থেকে না নামে।  ছুটির পর তাদের টিচারস রুমে ডাকা হয়েছিল।  আমার সেদিন ওদের জন্য খুব কষ্ট হয়েছিল। তারপর থেকে  ওরা খুব শান্ত হয়েই থাকত। আমার সাথে  আর কোনদিনই ওরা কথা বলেনি। 

                              আমাদের  মেয়েদের  ক্লাস সিক্স থেকে সেলাই  শেখানো হতো। যারা একেবারেই পছন্দ করত না  তারা বেশির ভাগ ক্লাসে থাকত না। দিদিমণির চুলের মুঠি ধরে ট্যানার ভয়ে। আমি মন্দের ভালো, ভয়ে ভয়ে  কোনরকম করতাম।  অথচ আজ সেই দিদিমণির জন্য শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়।  সেদিন যা শিখতে পারিনি ভাল করে , আজ তাই পাকা বুদ্ধিতে অনেক কাজ করতে পারি। 

                             একটা মজার ঘটনা বলি। তখন আমি ক্লাস সেভেন।  আমাদের ক্লাসের বাউণ্ডারী ওয়ালের বাইরে  জানালা  বরাবর একটা ছোট্ট  মন্দির আছে।  আমাদের ইংরেজি ক্লাস নিচ্ছিলেন কমল স্যার। য়্যা বড় বড় চোখ আর হাতে লাঠি।  এমন কোন ছাত্রছাত্রী নেই  যে এনাকে  ভয় পায় না। হঠাৎ দেখি স্যার জানালা দিয়ে ওই মন্দিরটাকে দেখছেন।  আমরাও দেখলাম ক্লাস নাইনের  ছেলেরা মাথা নীচু করে হাতে তালি দিয়ে  “ হরেকৃষ্ণ”  মন্ত্রে  মন্দির প্রদক্ষিণ করছে। জানলাম এর পরের ক্লাসটা ওদের কমল স্যারের ইংরেজি ক্লাস।  পড়া তৈরি না হওয়ায় ঈশ্বরের শরণাপন্ন হয়েছে। 

                             রেলের স্কুল বলে ল্যাবরেটারি  খুব  আনন্দ করে ব্যবহার করতে পারতাম। স্যার , দিদিমণিরা  ফিজিক্স, কেমেস্ট্রি, জিওগ্রাফির সব আ্যপারেটাস ক্লাসে এনে দেখাতেন বোঝাতেন।  ক্লাস নাইন থেকে ল্যাবরেটারিতে গিয়ে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস করতাম।  সেখানেও নানান ঘটনা। কোনটা   খুব মজাদার, কোনটা যন্ত্রণার এমনি অনেক অভিজ্ঞতার  দিন ছিল সেগুলো।  কারও হাতে এ্যাসিড পরে যাওয়া, প্যান্ট  পুড়ে যাওয়া   ইত্যাদি সব  নানান ঘটনা।

                           এবার আসি প্রথম বসন্তে। সরস্বতী পূজো। আমরা ক্লাস নাইন। আমাদের স্কুলের টিচার নিজেই প্রতিমা তৈরি করেছিলেন । শান্তিনিকেতনের ছাত্রী কিনা! স্যার আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছিলেন। যা এখনও আমি সেসব কাজ করে আনন্দ পাই।  মাটির গ্লাসকে খড়িমাটি দিয়ে রঙ করে  তাতে আলপনা,  চালন, কুলোয় আলপনা  নানান কাজে আমাদের গ্রুপ ভাগ করে দিয়েছিলেন। সেই  প্রথম আবীর দিয়ে আলপনা দেওয়া শেখা । পূজোর পরে খিচুড়ি, তরকারি, পায়েস, চাটনি, মিষ্টি খাওয়া হল।  তারপর স্যার আমাদের নিয়ে বসলেন অন্ত্যাক্ষরী খেলায়।  দর্শকাসনে ছিলেন অন্য টিচাররা ও সব স্টুডেন্টসরা ।  এছাড়াও লাইব্রেরিয়ান, ল্যাবরেটারিয়ান, দপ্তরীরা, সবাই উপস্হিত। সেদিন পেয়েছিলাম  অন্য এক বন্ধু মারফত প্রথম বসন্তের রঙীন এক পত্র। কিন্তু ফল হল উল্টো।  আমি ভয়ে লজ্জায় আবীর রাঙা হয়ে উঠেছিলাম।  সেদিন পত্রবাহক আমার সেই শত কুটি করা পত্র তার হাতে  ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিল — অসম্ভব এ অসম্ভব। 



 

স্মৃতির বিদ্যালয়

বেলা দে

দেবালয় শিবালয় আমরা মন্দির বলে জানি। আমার কাছে শিক্ষালয় মানে তেমনি এক মন্দির, মা স্কুল যাবার কালে বলতো চটি খুলে মা সরস্বতীকে প্রনাম করে যা,মায়ের কথামতো প্রনাম মন্ত্র " সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে_বলে রওনা দিতাম।

সেটা ওভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছিল,আমাদের সময় তো কিন্টারগাডেন স্কুল জন্ম নেয়নি, মায়ের কাছে বসে
রান্নাঘরে প্রথম শিশুশিক্ষা পাঠ শুরু সেদিক থেকে  মা আমার প্রথম শিক্ষাগুরু। তখন তিনের শৈশব। 
প্রথাগত বিদ্যার শুরু পাঁচ বছরে ফালাকাটা জুনিয়র গার্লসে, প্রধান শিক্ষক শ্যামলাল ঘোষ, অন্যান্য সব
দিদিমনি বিভা দি,আরতি ঘোষ,গীতাদি। গীতাদি খুব রাগী দিদিমনি আমি ভরে চুপসে থেকেছি সর্বক্ষণ কখন  কি বলে, সবসময় গম্ভীরমুখে থাকতেন, হাসি নেই  আমি একটু ভ্যাবলা গোছের ছোট থেকে, মুখে হাত দিয়ে থাকতাম আর প্রতিদিন বকা শুনতাম। বাবার হাত ধরে প্রাইমারি পর্যন্ত স্কুলে গেছি,বাবা ফাইভ থেকে এইট পর্যন্ত ক্লাশ নিত, আমি ফোরে পড়তে বাবা অবসর নিয়েছেন,পরবর্তীতে প্রতিবেশী বন্ধুদের সাথেই যাতায়াত। ফালাকাটা শহরকে দুভাগে ভাগ  করে বয়ে যাওয়া নদী সাপটানা পেরিয়ে আমাদের  বিদ্যালয়ে যেতে হতো কোনো সাঁকো ছিল না। প্রতি বর্ষায় নদীর রূপ ভয়ংকর হয়ে উঠেছে দুকুল ছাপিয়ে জল উঠে গেছে সেই সাথে উঠে এসেছে হিংস্র  জলজ প্রাণী, একবার পাড়ায় মানিক বোসের বাড়ির কাছে ঘরিয়াল ভেসে এসে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল, লোকে লোকারণ্য ওদিকে আর খেলতে যাইনি কতদিন ভয়ে রাতঘুম গেছে উবে ওই রাস্তাতেই স্কুল মারাত্মক ভয় পেয়েছি। বর্ষাকালে পুরাতন চৌধুরীর  ব্রিজ হয়ে ঘুরপথে স্কুলে গেছি। একটু উঁচু ক্লাশে উঠে স্কুলে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করিয়েছে আরতিদি পপিদি। রবীন্দ্র জয়ন্তী, নজরুল ইসলামের জন্মদিন  সে দিনগুলোর আনন্দ ভোলার নয়। আমার বাবার পর হেড মিস্ট্রেস হয়ে এসেছেন জ্যোতির্ময়ী দিদিমনি, তিনি চলে গেলে এসেছেন মায়া বোস। বড় ভালো বাসতেন আমাকে। যেবার গ্রাজুয়েশন করলাম দেখা করে প্রনাম করার পর বলেন "বেলু চাকরি করবি এই স্কুলে" ভূগোল টিচারের খুব প্রয়োজন " পাশে রত্না ছিল সেই বলে দিয়েছে দিদিমনি আর সাতদিন পরে ওর বিয়ে, বলেন সেকি রে এইটুকু বয়সে। আমার তখন কুড়ি হয়নি। যাক সে কথা আগের কথা বলা হয়নি। আমরা পাঁচ সহপাঠী আমি, অঞ্জলি পাল চৌধুরী, রত্না ব্রহ্ম, বিদ্যাবতী লালা, সাবিত্রী বাজপেয়ী ছিলাম স্কুলে  বরাবর ফ্রাষ্ট ব্রেঞ্চার, মেধাগত দিক থেকেও পরপর আমি ছাড়া। আমি সাত থেকে দশে। বিদ্যাবতীকে ধরেছি ফোরে। তবু্ও বন্ধুত্ব ছিল প্রগাঢ় অটুট সে  আটি ভাঙে কার সাধ্যি। এবার জুনিয়র গার্লস ছেড়ে পাঁচজনা ভর্তি হলাম ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে, কো এড স্কুল, ছেলেদের শ্রেণিকক্ষ আলাদা।নতুন স্কুল নতুন স্কুলের শিক্ষকেরা নতুন অভিজ্ঞতা বেশ লাগছিল। এমনিতেই নওল কিশোরীবেলা সবেতেই  আনন্দ, মূল সড়কের পাশে বিদ্যালয় পরিবেশও
মনোরম  মন ভরে নিয়েছি নতুনত্বর আস্বাদ। প্রত্যুষে পাখিদের সাথে জেগে উঠে প্রচন্ড অনিচ্ছায় রোজ
ঘুমচোখ কচলেই রওনা হওয়া। শীতরাতের ওম বিছানা ছেড়ে শীতবুড়ির কামড় খেতে খেতে স্কুলের
পথ ধরা তার মধ্যে সাপটানার পা ভেজা হিমজল। ক্লাসটিচার হর চক্রবর্তী স্যার আমার এমনিতেই মহাভয়ের তন্মধ্যে ওই দীঘল চেহারার ধারালো উজ্জ্বল দুটি চোখের চাউনি আমাকে এমনিতেই আধমরা করে দিয়েছে ভয়ে আমি নিষ্প্রভ অঙ্কাতঙ্কে প্রথম পিরিয়ড অনাসৃষ্টি অঙ্ক তাকেই নিতে হল। প্রায়শই স্কুলে ঢুকতে দেরি শীতবেলায়, রত্নার থেকে জেনেছে  আমার ঘুম ভাঙতে দেরির কথা ওমনি বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে বলেছে" মহারানী আপনি বাইরে থাকুন" রত্না ভিতরে আয়। হরস্যার আমার প্রতিবেশী ছিল,  জন্ম থেকে দেখেছেন।  ডাকনামেই ডাকতেন,  আমার বড়দার বন্ধু, মৃত্যুর আগে দাদাকে বলেছিল মহারানীকে অনেকদিন দেখিনি ও এলে একবার বলিস, আর দেখা হল না।  বাংলার প্রমথ \ চৌধুরী স্যার আমার খুব প্রিয় মানুষ  ছিলেন কারণ আমি বাংলায় ক্লাশ টপার। আমার লেখা রচনা, ব্যাখ্যা সবাইকে দেখাতেন ক্লাসে।  একবার স্পোর্টস এ হিটে চান্স পাইনি বন্ধুরা পেয়েছে আমি হাঁপুস নয়নে কাঁদছি প্রমথ স্যার  এসে বলেন মেমোরি টেস্ট খেলায় নাম দে তুই পাবিই আমি জানি, পেয়েছিলাম বলে স্যারকে  প্রনাম করতে গেলে বলেন পাগলি একটা। পড়তে 
পড়তে আমার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর স্কুলে সার্টিফিকেট আনতে গেলে স্যার বলেন পাগলি তুই
এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেললি?  সে তো জানেনা আমার কোনোই হাত ছিল না। আমি বোর্ডের পরীক্ষা দেব সেবার এসেছেন প্রধান শিক্ষক নীরোদ বরন রায় সুতরাং তার সম্পর্কে বলার মতো  কিছু না থাকলেও সপরিবারে আমাদের পাড়াতে  ছিলেন প্রথমটায়, তাঁর সম্পর্কে কোনও দিনই কূমন্তব্য শোনা যায়নি ফালাকাটা শহরে অথবা পড়ুয়াদের মুখে।দেবতুল্য মানুষ ছিলেন। আমার সাথে  ব্যক্তিগতভাবে আলাপ ছিল তাঁর,  স্নেহ করতেন খুব গুরুগম্ভীর হৃষিকেশ স্যারের ইংরেজি গ্রামারের পাখিপড়া আজও পোক্ত রেখেছে আমাকে যা আমার সন্তানের লেখাপড়ায় কাজে লাগিয়েছি। পড়া আদায় করে তবেই ছেড়েছেন, ঘন্টা পড়ে  যাচ্ছে যাক,পরবর্তী ক্লাসের শিক্ষক এসে দাঁড়িয়ে থেকেছেন সে হুশ নেই, এমন নি:সার্থ শিক্ষক কোথাও মেলে না যা আমরা পেয়েছি। নেই কোনো  লেনদেন হিসাব নিকাশ সম্পর্ক শুধু গড়েপিটে ভালো ছাত্র করে তোলার অঙ্গীকার। মানবিক চৈতন্য দেওয়ার আদর্শিক টিচার। স্কুল জীবনের  শিক্ষকদের কোনো দিন মোছা যায় না সরস স্মৃতি  থেকে। এইজন্যই বিদ্যালয়যাপন শ্রেষ্ঠ সমস্ত জীবনরেখায়।সেদিন বিদ্যুৎহীন জনপদ ফালাকাটা,  এক ঝড়ের সকালে অন্ধকার নেমে আসে স্কুলে  ক্লাশরূমে, মোমবাতি নিভে যাচ্ছে হরস্যারের ক্লাশ কি করেন স্যার সবাইকে একটা করে কবিতা বলতে বলেন আমরা ফার্স্ট বেঞ্চার পঞ্চনন্দিনী আমার থেকে শুরু হল " গগনে গরজে মেঘ-----আমি একেলা, ব্যাস সব ভুলে গেছি। কান ধরে দাড়ানোর হুকুম হল বিদ্যাবতী গড়্গড়িয়ে বললো সবটা। পিছনের সারিরা হেসে কুটিপাটি হর চক্রবর্তী স্যারের এই অভিনবত্বে, অঙ্কের বদলে কবিতা। এই হল আমার আমাদের মাষ্টার মশাইরা, ফাঁকির জায়গা রাখেনি।  সহপাঠীরা সব আয়নার মতো সেটে আছে চোখের  সামনে, ঝগড়া বিবাদ বিচ্ছেদ সব ছাড়িয়ে অন্তরের টান, আজ স্বামী সংসার নানা পেশায় জড়িত হয়ে কে যে কোথায় ছড়িয়ে খোঁজ রাখা হয়না, 1st ব্রেঞ্চারের একজন সাবিত্রী বাজপেয়ী বিয়ের পরে খুদে দুটি পুত্র কন্যা রেখে কর্কট ব্যাধিতে আমাদের ব্রেঞ্চ ফাঁকা করে দিয়ে লাক্ষ্ণৌতে দেহ রেখে গেছে। সাবিত্রী তোকে খুব মিস করি রে, ফিরে আয়।

বিদ্যালয়ে ঢুকেই প্রেয়ার লাইন "সমুখে তুঙ্গ তুষারে মৌলি`` আজও শান্তি দেব ঘোষের সুর ঝংকার
কর্ণকুহরে বেজে চলে। গানের প্রত্যেকটা কলিতে উত্তুরে ডুয়ার্স প্রকৃতির অনুপম সৌন্দর্য্য ভরা ফালাকাটা শহরের পাজরে ছায়াপুষ্ট আমাদের স্মৃতি ঘেরা বিদ্যালয় " ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয় "
প্রার্থনা সংগীতের মাধুর্যে কার্তিক মুখুটি স্যারও রামধনু রঙ মাখিয়েছিল।


 

স্মৃতির বিদ্যালয়

মিষ্টু সরকার 



স্কুল স্কুল স্কুল 
আমারে মেয়ে বেলা
ভালোবাসার বাড়ি 
রামধনুর মেলা
স্কুল স্কুল স্কুল
আমার সব পাওয়া
হাতবাড়ালেই 
ছোঁয় হাতের মায়া ।

তোমার পথে, ভালবাসার স্রোতে ভাসতে নোঙর বেঁধেছি। নোঙর বেঁধেছি সেই ঘাটে যেখানে প্রকৃতির নিবিড় পাঠের সঙ্গে লাল_সাদায় মোড়া আমাদের আজন্ম লালিত শৈশব মুখরিত হয় স্কুল স্কুল গন্ধের হাতছানিতে ' বাণীদীপ' হয়ে ।পড়ি বন্ধুত্বের প্রথম পাঠ। শরৎ ভোরের শিউলির মতো পদ্ম পাতায় জমা হয় এক একটি লাল_সাদা প্রাণ যা আহ্বান করে এক কর্মযজ্ঞের,  তা 'বিদ্যামৃতম্'  আর তা সম্পৃক্ত হয় এক বহমান জীবন যজ্ঞে।
শৈশবের সেই নিবিড় পাঠই বুঝি নিজেকে 
বোঝার আগেই আমাদের বেঁধে রেখছে। 
    "সেই থেকে রয়ে গেলাম তোমার বাড়ি
     যেখানে শুধুই ভাব, নাইতো আড়ি ।
তাই আজ পর্যন্ত যেখানেই যাই আমাদের একটাই পরিচয় "আমরা লাল সাদা" । নচিকেতা চক্রবর্তী_র সেই গানটা " লাল ফিতে সাদা মোজা স্কুল স্কুল ইউনিফর্ম" যেটা শুনতে শুনতে নস্টালজিক হয়ে ভাবতাম যে গানটা আমাদের স্কুলকে উপলক্ষ করেই লেখা, আর এখনো তা ভাবতে ভালোই লাগে। এক সময় সেই লাল সাদার ওপর আঘাত এলো, শত আঘাত মেনেও এই লাল সাদার সম্মান ক্ষুণ্ন হতে দেয়নি স্কুলের ছাত্রী ও শিক্ষিকা ও অশিক্ষক কর্মচারীরা। হাতে হাত মিলিয়ে ফিরিয়ে এনেছে লাল সাদার গৌরব। আমাদের প্রিয় মাধবী_দি দিয়েছিলেন আমাদের অভয়।
জলপাইগুড়ি পোস্ট অফিস মোড় পার করে ডান হাতে গান্ধী স্ট্যাচু রেখে বাম দিকে কিছুটা গেলেই আমাদের প্রিয় স্কুল বাড়ি। বড়ো সবুজ রঙয়ের রাধাচূড়া ছাওয়া গেটটা পেরোলেই আমাদের সেই বকুলে, মাদারে, কৃষ্ণচূড়ায়, ঝুমকো-জবায় ঘেরা স্কুল বাড়িটি যেখানে আমাদের বাল্যস্মৃতির শৈশব মুখ ঢেকে আছে । শীতকালে মালিভাইয়ের হাতের পরিচর্যায় গাছগুলি ফুলে ফুলে ভরে হেসে উঠতো, কতো নাম না জানা গাছের নাম জেনেছি, কাছ থেকে চিনেছি সব। গোটা স্কুল বাড়িটাই যেনো আমাদের প্রকৃতি শিক্ষার প্রথম পাঠ। আম, লিচু তাল, সবেদা, কামরাঙা, জামরুল, গোলাপজাম, পানিয়াল, আমলকী কি ছিলোনা সেখানে। আর ছিলো তাদের সাথে, তাদের ঘিরে আমাদের প্রতিদিনের নানা খেলা, কত কথা, গল্প , ঘটনার সাক্ষী এরা। যেমন আমাদের মনের কুলুঙ্গিতে পরতে পরতে সাজানো আছে সব ঠিক--ভুল ভালোলাগা -- মন্দলাগা, পাওয়া না-পাওয়ার হিসেব ।
স্কুলে ঢুকতেই নিচু ছাদের সামনের দিকে বড় বড় করে লেখা রাষ্ট্রীয় বালিকা বিদ্যালয়, আমাদের সমস্ত আবেগ যেন ওখানে উছলে পড়ে । বর্ষার দিনের প্রার্থনার লাইনে ভেতরের ওই জায়গাটুকুতে আমাদের ঠিক সংকুলান হয়ে যেত । পতাকা উত্তোলনের নির্দিষ্ট বেদীটি পেরিয়ে সামনের মাঠটিতে আমাদের সবাইকে নিয়েই যে কোনো আয়োজনই সম্পূর্ন হয়ে যেতো। তারপর যবে আমরা বড় হয়ে গেলাম তখন ছোটবেলার জামার মতো সব কেমন যেন আমাদের থেকে ছোটো মনে হতে লাগলো। এবার পা রাখছি হলের ভেতরে, ঢুকতেই মেহগনি রংয়ের ছোটো ছোটো চেয়ার গুলি, লম্বা কাঁচের আলমারিতে রাখা সরস্বতী ঠাকুর তার বাম দিকে প্রার্থনা সভার সামনে দিয়ে উঠে গেছে পালিশ করা কাঠের রেলিং, হাতে হাতে সেটি ধরে উঠে যাও বাম দিকে প্রত্যেক তলার দেয়ালের ওপর টাঙানো ছবি, ওপরে ডানদিকে সারি সারি ঘর, ওগুলো আমাদের পড়ার ঘর। বাম দিকে রইল আমাদের লাইব্রেরী, প্রচুর বই ঠাসা, সুন্দর ভাবে গোছানো। আমরা লাইব্রেরী ক্লাসে সই করে দিদিমণির থেকে হাতে হাতে তুলে নিচ্ছি পছন্দের বই। আরও ওপরে তিনতলায় উঠলে আমাদের প্রিয় হলঘর কতো অনুষ্ঠান, বন্ধুদের সাথে কতো ফাঁকা ক্লাস, কতো অনুশীলনের স্মৃতির পাতা যে খাতা হয়ে জমে উঠেছে সেখানে।
 সেই জানালার বাইরে দিয়ে দেখা যায় শিশুনিকেতনের সবুজ মাঠ, এই শিশুনিকেতন বেসিক স্কুলে ও আমাদের সময়ের জলপাইগুড়ির প্রায় বন্ধুদের শৈশবকাল আটকে আছে। সারি সারি গাছের ছায়া ঘেরা বাড়ি, সবুজমাঠ, রেলগাড়িটি চলুক আর নাই চলুক আমাদের সমস্বরে কু-ঝিক-ঝিক তাকে ব্যস্ত করে তুলতো ।







আমাদের লাল সাদা বাড়িটির চারতলার ছাদে আমাদের যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা ছিলো। আর তিনতলায় আমাদের বড় ক্লাস ঘর গুলোতে সব্বার জন্য আলাদা বসবার জায়গা, সেগুলোকে জোড়া লাগিয়ে জোড়া লাগিয়ে ক্লাসে বসেছি, দুষ্টুমি করবার অভিপ্রায়ে, সামনে উঁচু জলচৌকিতে বসে আছেন আমাদের প্রিয় কোনো দিদিমণি, সবুজ জানালার সাদা পর্দা গুলো তে হওয়ায় আর সেই সাথে আমাদের মন। আমরা হয়তো কিছুই শুনছি না, শুধু শোনার ভান করছি। দিদিদের স্নেহমাখা কপট বকা-ঝকা সেই যুগের আমাদের ভাবাতো না, আমরা জানতাম আমরা যা দুষ্টুমি করছি এটা তার পাওনাগণ্ডা। তখনকার আমাদের কাছে ও আমাদের অভিভাবকের কাছে আমাদের ওভার-সেন্টিমেন্টের চেয়ে শিক্ষকদের অনুশাসন অধিক গুরুত্ব পেতো। এই জন্যই হয়তো আজও আমাদের সাথে শিক্ষকদের সম্পর্ক অটুট। আমাদের সায়েন্স রুমে রাখা কঙ্কাল টাও যেনো মুচকি হেসে আমাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইতো। তার চারপাশে আরও কতো বিষয় ভিত্তিক রুম আর সবশেষে হোস্টেল। আমরা যে সবসময় দুষ্টুমি করতাম তা নয় আমরা পড়াশোনাও করতাম কখনো কখনো গভীর মনোযোগের সাথে। 
পুজোর ছুটি বা গরমের ছুটির আগের অনুষ্ঠানের দ্বায়িত্ব , সরস্বতী পুজোর দ্বায়িত্ব থাকতো নির্দিষ্ট কোনো ক্লাসের ওপর থাকতো, সাথে দিদিমনিরাও সাহায্য করতেন। শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে বড়ো হয়ে ওঠার প্রাগ মুহূর্তে ক্লাস নাইনের ওপর থাকতো সরস্বতী পুজোর দ্বায়িত্ব।আমাদের সব কাজে এগিয়ে আসতে, দ্বায়িত্ব পালন করতে শিখিয়েছে এই স্কুল বাড়ি ও তার বাসিন্দারা।
ছুটির দিনে আমরা নতুন জামা, অপটু হাতে শাড়ি পড়ে যেতাম । সে যে কি এক অনাবিল আনন্দ তার এখন বলে বোঝাতে পারবো না।বাইরের যেকোন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে আমরা সবসময় অগ্রগণ্য। আমি সাধারণ স্টুডেন্ট হলেও আমাদের জলপাইগুড়ি শহরে আমাদের স্কুলের নাম অগ্রগণ্য ছিলো। আমাদের টিফিন ঘরের মাসিদের অবদানও আমাদের জীবনে কম নয় । সেই দাঁড়িয়ে লম্বা লাইন দিয়ে নিচু থেকে উঁচু ক্লাসের টিফিন নেওয়া, আর এই একই সময় সবার সাথে সবার দেখা আর গল্প সবটাই হতো। তাদের হাতের রান্না করা প্রিয় পদগুলি খিচুড়ি, আলুকাবলি আরও কতো কিছুর স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে। আমরা প্রতিটি স্টুডেন্ট খেলাম কিনা সেই ব্যাপারেও খেয়াল রাখতেন আমাদের শিক্ষিকারা।
আমাদের প্রিয় শিক্ষিকাদের, আমাদের টিফিনের মাসিদের, বৌ মাসি যিনি আমাদের হাজারো ঝক্কি ঝামেলা পোহাতেন,অশিক্ষক কর্মচারীদের মধ্যে অনেকেই আজ এই পৃথিবীতে নেই কিন্তু তাদের স্নেহমাখা মুখগুলি আমাদের মনের ভেতর রয়ে গেছে গভীর যত্নে।
     আর স্কুল বলতে যাদের ছাড়া বাকি জীবনটা ভাবাও যায় না, তারা প্রিয় বন্ধুরা। আমরা একে অপরের 
অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত জুড়ে হাসি কান্না মেখে ভালো আছি। আর কোনো সম্পর্ক ও যদি সময়ের স্রোতে ভেসে যায় তবু অর্থ থাকবে আমাদের এই বন্ধুত্ব, যা আমাদের এই স্কুল বাড়ি দিয়েছে। 
অসুখ কেড়ে নিয়েছে আমাদের সদ্য আঠেরোতে পা দেওয়া বন্ধু শ্রীময়ীকে, যে ঘটনা আমরা কখনোই ভুলতে পারিনি।
যতো ভালো কথাই বলিনা কেনো সবার সঙ্গে, মনটা চায় খুনসুটি বন্ধুদের সঙ্গে।
যা কিছু ভালো বলো ভালো করো মনটাই পড়ে থাকে কবে একসাথে হবো, ঝগড়া, হৈ হৈ, বকবকম, চিৎকারের অদ্ভুতসব দাবী দাওয়ায় ভরে উঠবে আসর। এযেন ঘরে পড়ার সেই জামাটির মতো। শত শত দামী পোশাক যার কাছে হার মানে, তার আদর আরামের কাছে। এ আরাম প্রাণের নিভৃতে লুকিয়ে থাকা এক অমোঘ চালিকাশক্তি যা আমাদের নিয়ে যায় এক আনন্দলোকে। যেখানে আছে শুধুই নিরন্তর নিখাদ ভালোবাসার প্রশ্রয়। যা মালা হয়ে দুলতে থাকে গলায় । আর সেই মালার প্রিয় লকেটটি আমাদের প্রিয় লাল সাদা বাড়িটি আমাদের স্কুল, যার পোশাকি নাম রাষ্ট্রীয় বালিকা বিদ্যালয় ।
   শুধু আমাদের না প্রত্যেকটি মানুষের শৈশবে বাঁধা পড়ে আছে এই গভীরে। আজ আমরা যারা শৈশব কাটিয়েছি জলপাইগুড়ি Govt Girls' High school এ কেটেছে যাদের শৈশব তারা হয়তো একটু বেশি নস্টালজিক হয়ে পড়েছি। কারণ আমাদের সেই লাল সাদা বাড়ি যা আমাদের অমলিন শৈশব কৈশোরের একমাত্র সাক্ষী তার ৭৫ বছরের জন্মদিন পার হয়ে গেল। তার ৭৫ বছরের জন্মদিনের সাক্ষী আমরা । এমন দিন তো বারবার আসে না। তাই এটুকু বেশি মানা নেই। এই একটু বিশুদ্ধ অক্সিজেন যা আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস নির্মল করে দেয় আর সেই বন্ধুত্বকে জয়ের মালা পরানোর দিন। 
এই ভালোবাসায় রাখি একটা জীবন , 
পাই যেন ডাক মনে চিরন্তন
ভালোথাক শৈশবের কচি মুখগুলি
ভালোথাক নিখাদ ভালোবাসার প্রাণগুলি
জীবন মাঝে এসে এই ভিক্ষা চাই
বন্ধু আর বন্ধুত্বে চির সবুজ হোক সবাই।


 

স্মৃতির বিদ্যালয়

শুভেন্দু নন্দী 


"কোন্ পুরাতন প্রাণের টানে ছুটছে মন মাটির পানে" । শৈশবের যে শিকড় আমার প্রিয় জন্মভূমির মাটিতে প্রোথিত ছিল-সেই স্মৃতিধন্য
বালুরঘাটের কথাই অনুক্ষণ মনে পড়ে। আকাশ,বাতাস,জল,মাটি -সবাই যেন সবসময়ে অদৃশ্যভাবে হাতছানি দিয়ে ডাকে ।সংস্কৃতির ছোঁয়া এর সর্বত্র। কত জ্ঞানী,গুনীজনের  পদস্পর্শে ধন্য এই আমার আবাল্যের বালুরঘাট। নাচ,গান,নাটকের রীতিমতন চর্চার এই জন্মভূমি।
একাঙ্ক নাটকের স্রষ্টা শ্রদ্ধেয় মন্মথ রায় ছাড়াও অনেক সাহিত্য মনস্কের, সঙ্গীতজ্ঞ,যন্ত্র শিল্পী,কলাকুশলী,স্বাধীনতা সংগ্রামী,নাট্য ব্যক্তিত্ব, কবি,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বনামধন্য শিক্ষক,শিক্ষিকা, অধ্যাপক,গবেষক, কৃতি খেলোয়াড়দের এই জন্ম ভূমি।
স্কুলের গণ্ডি পেরুনো বালুরঘাট হাইস্কুল আমার কাছে এক পবিত্র মন্দির।  শিক্ষার জন্মলগ্ন অর্থাৎ প্রাইমারী স্কুল থেকে আমার অধ্যয়ন শুরু। প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণীর কক্ষগুলো ছিল  bamboo particlesএর বেড়ার দেওয়াল আর খড়ের চালের ছাউনী। প্রত্যেক কক্ষগুলোতে ছিল বিভক্তকারী
বেড়ার দেওয়াল। মাটির মেঝে। বেশ মনে পড়ে বর্ষার দিনগুলোতে ঘরগুলো জলে থইথই করতো। "আয়রে কাগজ-নৌকো ভাসাই,আয়রে মাতি সবে ভরে উঠুক আকাশ,বাতাস মোদের কলরবে" এইরকম একটা ছড়া যেন বেশ মনে পড়ে যায়। হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক মহাশয় ছিলেন
শৃঙ্খলা পরায়ণ  এবং ছাত্রবৎসল। স্কুলে যদিও dress code ছিলো কিন্ত তা  mandatory ছিলোনা। অভাবী ও গরীব ছাত্রদের কথা ভেবেই তাঁর এই সিদ্ধান্ত।  তবে spare the rod, spoil the child-এই ব্যাপারটা তখনও ছিল। ছাত্রদের তিরস্কার করার পরেও শিক্ষকদের মধ্যে অনুশোচনাও ছিল। হাতে লেখা দেওয়াল পত্রিকার প্রকাশের সময় ছাত্রদের মধ্যে দারুন উদ্দীপনা ছিল। বলা বাহুল্য, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহাশয় সে ব্যাপারে দারুন উৎসাহ দিতেন। সাংস্কৃতিক ও বার্ষিক অনুষ্ঠানে ছাত্রদের নিষ্ঠা সহকারে তালিম বা রিহার্সাল দিতেন তাঁরা। খেলাধূলোর প্রতিযোগিতাতেও অনুরূপ উৎসাহ নিয়ে তাঁরা তালিম দিতেন।
এই সময়ে এমন একটা ঘটনা ঘটে- যেটা আমার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তখন আমি বোধ হয় ক্লাস ফাইভে পড়ি। আমার জনৈক সহপাঠীর
অসাবধানতার কারণে ডান হাত fractured হয়ে যায । মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেলো। বেশ ভালো ছাত্র ছিলো। এদিকে half-yearly পরীক্ষা আসন্ন। 
কিন্ত সে ছিলো দারুন জেদী। আর পরীক্ষা দেবার ব্যাপারে অনমনীয় ভাব। ডান হাতে তার plaster.
দিনরাত বাঁ হাতে লেখার practice করতে লাগল।
পরীক্ষাতেও appear করলো। যথারীতি ভাল result করলো।  এই ঘটনায় ধন্য ধন্য পড়ে গেলো স্কুলে। তার এই প্রচেষ্টার প্রশংসা করতে লাগলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহাশয়েরা। সে রাতারাতি রোল মডেল হয়ে গেলো,এরূপ একটা দৃষ্টান্ত স্থানীয় কাজের জন্য। পড়াশোনার প্রতি তার কি যে অনুরাগ আর আগ্রহ ছিলো- এ ঘটনাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।


 

স্কুলে  সরস্বতী পুজোর দিনগুলো আজও মিস করি 
বটু কৃষ্ণ হালদার

সালটা ছিল ১৯৯৯,আমি তখন নবম শ্রেণীতে পড়ি আর তুমি অষ্টম।সেবার স্কুলের পুজোর প্রধান দায়িত্ব ছিল আমার সঙ্গে কয়েক জন সহপাঠী ।কয়েক দিন আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ঠাকুর আনতে যাওয়া, প্যান্ডেল তৈরি,পুরুত মশাইকে নেমন্তন্ন,ফুল  তোলা,মালা গাঁথা,পূজার বাজার,পাশের কলেজ ও স্কুল গুলো তে নিমন্ত্রণ করা থেকে শুরু করে সব কিছু ভাগ করে দায়িত্ব দেওয়ার কাজ ও আমার ছিল।পূজার দিন খুব ভোরে স্নান সেরে বেরিয়ে পড়লাম স্কুলে।সব কিছু দেখে নিতে শুরু করলাম।ধীরে ধীরে বেলা বাড়তে থাকল।ঠাকুর থেকে পুরু ত মশাই সহ সব আয়োজন প্রায় শেষের পথে।বাকি ছিল শুধু প্যান্ডেলের সামনে ফুল মালা সাজানো। খুব মনোযোগ সহকারে সেই কাজ করছিলাম চেয়ারের  ওপরে উঠে।চারিদিক হাঁক ডাক লেগেছিল।দারুণ গ্রাস করেছে সবাইকে।পূজা শুরু হতে কিছুটা সময় বাকি ছিল।তবুও অনেকে আসতে শুরু করেছিল উদ্দেশ্য পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া।অনেকে না বলতেই হাত লাগাতে শুরু করেছিল।আমি মাইক ওয়ালা কে গান চালাতে বললাম।জিজ্ঞেস করল কি গান চালাব।বললাম হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর তুমি এলে অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি এলো এই গান টা চালাও।এই গান টা আমার খুব প্রিয়। যখন মন খারাপ করে তখন একা একা শুনে। মাইকওয়ালা দাদা বললো, খুব শখ দেখছি ছেলের। পূজার দিন বৃষ্টি এলো ভালো লাগবে তো। এই শুনে সবাই হেসে লুটো লুটি।গান চলতে থাকলো আমি কাজে মন দিলাম। কিছুক্ষণ পর একটু আর ঘোরাতেই পিছনের রাস্তা দিয়ে দেখি তুমি এলে। বৃষ্টি না আসুক তুমি কিন্তু সেদিন এসেছিলে  খোলা চুলে হলুদ লাল পেড়ে শাড়ি পড়ে। দুই চোখ জুড়ে ছিল কাজলের ঝলকানি। পা জুড়ে ছিল আলতার সীমারেখা।ইটের রাস্তা দিয়ে মনে হল লাল পরী এসেছিল সেদিন। ঘাড় ঘুরিয়ে নেব তার উপায় ছিল না। আচমকা মাথা ঘুরে চেয়ার থেকে পড়ে যেতেই দাঁত বার করে হি হি করে হাসতে শুরু করলে। আমি লজ্জা পেয়ে উঠে দ্রুত দৌড়ে প্যান্ডেলের সামনে থেকে স্কুলের মধ্যে ঢুকে গেলাম। ইতিমধ্যে মাইকে প্রচার শুরু হল পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া শুরু হবে। আমি ভয়ে ভয়ে ওর পাশে দাঁড়ালাম। সবার মত আমিও হাতে ফুল নিয়ে তৈরি হলাম পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার জন্য। পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া শেষ হলে ওকে বললাম তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে স্কুলের পিছন দিকে যাবে? ও বলল কি কথা এখানেই বল। আমি বললাম ওখানেই বলব বলে চলে গেলাম। স্কুলের পিছনে পেয়ারা গাছে ডাল ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম আর বুকের ভিতর হৃদপিণ্ড টা জোরে জোরে লাফাতে শুরু করল। যদি কিছু বলি ও বলে দেয় এই ভয়টা ভীষণ রকম করছিল। কার মধ্যে ও এসে দাঁড়ালো আমার কাছে বলল কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো? আমি বাবার পরা সাদা পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ ওর হাতে দিলাম। ও বলল এটা কি লেখা আছে,আমি নেব না।আমি বললাম এখানে খুলবে না বাড়িতে গিয়ে খুলবে।ও নিল,সেই কাগজটাকে দুমড়ে মুচড়ে হাতের মধ্যে নিয়ে দৌড় মারলো।চিঠিটা নিয়েছিল বলে আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছিলাম।তুমি এলে অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি হলো গানটা মনে মনে গাইতে গাইতে প্যান্ডেলের সামনে চলে গেলাম। ঐদিন আর বাড়ি ফিরিনি। সারারাত প্যান্ডেলে আমি আর বন্ধুরা খুব হইচই নাচানাচি করলাম। সকালে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় নটা বেজে গেছে। বাড়ির সামনে যেতে বুকটা ধড়া স করে নেচে উঠলো। চোখে ঝমনি ভাবটা পুরোপুরি কেটে গেল। দেখলাম বাবা হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাশে ওর বাবা। ঠাকুমা,মা জেঠিরা, বাবাকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছিল। আমাকে দেখে বাবা ডাকলেন শুয়োর এদিকে আয়। অগত্যা উপায় নেই গুটি গুটি পায়ে বাবার সামনে দাঁড়াতে চুলের মুঠি ধরে বলল চিঠি লেখার শখ হয়েছে। এমনিতে চিঠি লেখাটা শুন্য পেয়েছিস। তাহলে এই চিঠি লিখলে কি করে।সব বানান ভুল মনে হয়। আবার অংকে ফেল করেছিস হিসাব পত্র ঠিকমতো শিখিসনি। চিঠি লিখে ফেললি? বলেই হাতের লাঠিটা দিয়ে কাজ শুরু করে দিল। সবাই কাকুতি মিনতি করেও কোন লাভ নেই দেখে আমিও চুপচাপ মার খেয়ে নিলাম। ওর বাবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল একটা কথাও বলল না। এমন ভাব ভাব করে দাঁড়িয়ে আছে মনে হয় আমি ওনার মেয়েকে বিয়ে করে নিয়েছি। মনে মনে ভাবলাম হয়তো বাধা দেবে। আরে বাবা একটা চিঠি তো লিখেছি।তাতে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে বলি। বাবা লাঠি ফেলে দিয়ে কাঁধে গামছা ফেলে মাঠের দিকে চলে গেল। ওর বাবাও স্থান ত্যাগ করল। দেখে মনে হল অনেক পুরানো রাগ আমার উপর মিটিয়ে নিয়েছে। ওর বাবা চলে যাওয়ার পর আমার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো। ঠাকুমা গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে পুকুরে নিয়ে গেল। আমি স্নান সেরে জামা কাপড় ছেড়ে সোজা বিছানাতে উঠে পড়লাম। কয়েকদিন স্কুলে যায়নি। পরে ওর দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারতাম না। বহু বছর কেটে গেছে ও আর আমি এখন দুই সীমান্তের নাবিক। বহু বছর পর গ্রামের বাড়িতে একবার ওর সঙ্গে মুখোমুখি হতেই আমি  কাটিয়ে পালারে যাচ্ছিলাম। মনে হলো কেউ আমাকে ডাকছে ভীষণ ফিরতে দেখি ও দাঁড়িয়ে আছে। আমি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে বল কেমন আছো? ভালো,জিজ্ঞেস করলাম তুমি কেমন আছো? প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে বলল সেদিনের জন্য আমি খুব দুঃখিত।তখন অতটা বুঝতে পারিনি।ক্ষমা চাইবার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে মনটা আজ খুব হালকা হলো।এত বছর ধরে এই অপরাধ বোধ আমি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি।পারলে ক্ষমা করে দিও। আমি বললাম সে সব তো কবে কার কথা। আমি ভুলে গেছি, তুমিও ভুলে যাও শুধু তুমি ভালো থেকো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,তুমিও ভালো থেকো চললাম, আবার দেখা হবে।


 

স্মৃতির স্কুল 

তন্ময় কবিরাজ 


জীবনের বসন্ত যখন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে তখন কৈশোরের স্কুল জীবন যেন প্রচন্ড দাবদাহে এক পশলা বৃষ্টি। অচেনা পরিবেশের সঙ্গে নিজের অভিযোজন। জীবনের প্রতি উত্তরণে বিবর্তনের হাতছানি।ভালো লাগা মন্দ লাগার মধ্যেও জীবন সেদিন পার করেছে আঠেরোটা বছর।কি পেলাম কি পেলাম না,কি শিখলাম কি শিখলাম না - এসব আজ নেহাতই তুচ্ছ।শুধু নষ্টালজিক অবসরে থেকে যায় আনন্দ। প্রতিযোগিতার পাটিগণিত সেদিন ছিল না। সামাজিক দ্বন্দ্ব, বর্ন, ধর্ম সেদিন মানুষ চিনতে শেখায়নি।ভালোবাসার প্রকটগুনে প্রাধান্য পেয়েছে টিফিন পিরিয়ডে একসঙ্গে ভাগ করে খাওয়া, দৌড়াদৌড়ি, বন্ধুর হাত ধরে বৃষ্টিতে ভেজার ভেজিটেবল রোমান্টিসিজম। তখনও চোখে স্বপ্ন এঁকে দেয়নি কেউ।স্বপ্ন একটাই স্কুল শেষে ক্রিকেট খেলা, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বেড়াতে যাওয়া, বন্ধুর মন খারাপে প্রাইভেট টিউশন ফাঁকি দিয়ে নদীর পাড়ে বসে বন্ধুকে সান্ত্বনা দেওয়া।সবার আগে স্কুলে গিয়ে জানালার ধারে বসার তাগিদ।কিছু হলুদ পাখি আর বাহারি প্রজাপতির সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া নিজের হাজারও অনুভূতি।কতবার মন হারিয়ে ফেলার অপরাধে মাস্টারের কাছে মার খেয়েছি ,তার হিসাব আজ নেই। সেই প্রজাপতি আজও হয়তো ঘুরে বেড়ায় কিন্তু জীবন শুধু বদলে গেছে।আজ স্কুল জীবন নিয়ে ভাবতে গিয়ে ব্রিটিশ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থকে খুব মনে পড়ে,বিশেষ করে তাঁর টিনটার্ন আবি কবিতার কথা।সেদিনের কৈশোর কবিতা লিখতে শেখেনি।আজ বাস্তব হয়তো সেদিনের কথা ভেবেই কবিতা লেখে মনের অন্দরমহলে।একটা অজানা পরিবেশ ক্রমশ চেনাজানা হতে হতে জীবনের গুরুত্বপূর্ন অধ্যায় হয়ে উঠে। মাষ্টারমশাইদের যেমন শ্রদ্ধা করেছি, তেমনই তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ সবই ছিল।মান অভিমানের সর্ম্পক ছিল সেসব দিনের অ্যালবামে,একটা পরিবারের মধ্যে যেমন হয়ে থাকে। অঙ্ক ক্লাসে খুব ভয় হতো। মাথা নিচু করে বসে থাকতাম।কোনোদিন অঙ্কে ভালো নম্বর পাইনি। শুভাশিসবাবু খুব ভালো অংক করাতেন। নিহারবাবুকে আমরা অঙ্কের জাহাজ বলে ডাকতাম। মারতেন না কোনোদিন, ক্লাসের পাশ দিয়ে গেলেও সারা ক্লাস চুপ করে যেত, এমনি ব্যক্তিত্ব ছিল ওনার।আর একজন ছিলেন তড়িৎবাবু। ইংরাজি শেখার জন্য দেবেনবাবুর বিকল্প ছিল না সেদিন,তবে যে মানুষটি ইংরাজির প্রতি আমার ভালবাসা তৈরি করেছিলেন ,তিনি গোঁরাচাঁদবাবু।আমি কোনোদিন ভালো ছাত্র ছিলাম না।বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সখ ছিল।হয়নি। আর্টস পড়তে শুরু করলাম।ইতিহাস, সাহিত্যে ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মত বিষয়ে যাঁরা না থাকলে আমি কোনদিনই কিছু বুঝতাম না, তাঁরা সুপর্ণা ম্যাডাম, অধীরবাবু এবং অশোকবাবু।অনেক অনেক ভালবাসা পেয়েছি ওনাদের কাছ থেকে।তবে যে মানুষটি আমাকে আমার বাবার মত স্নেহ করতেন তিনি দিলীপবাবু। স্কুল জীবনে  ভালো ভালো বন্ধু পেয়েছি চন্দন,সুমন, অপু, বিশ্বজিৎ, সঞ্জয়। স্কুলের কথা ভাবতে বসলে সবাইকে মনে পড়ে যায়।সবাই খুব ভালো থাকুক।যত মান অভিমানের সব ক্ষমা হয়ে যাক।শুধু স্মৃতিটুকু রয়ে যাক।


 

ফিরে দেখা 

 সম্মিলিতা দত্ত


অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ- এর সংমিশ্রণে তৈরী একটি অধ্যায় হলো স্কুলজীবন। আর অতীতকে জীবন্ত করে এনে বর্তমানকে ভুলিয়ে দেওয়ার নামই হলো স্মৃতি।কমবেশি সবারই হয়তো জীবনের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি স্কুলজীবনের সাথেই জড়িয়ে থাকে!

প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে যখন হাইস্কুলে প্রবেশ করলাম তখন আনন্দ যেমন হয়েছিল তার পাশাপাশি একটা ভয়ও কাজ করছিল। নতুন ক্লাস, নতুন বন্ধুবান্ধব , নতুন নতুন মাষ্টারমশাই, দিদিমণি-রা। কী জানি বাবা কেমন হবেন তারা! তারা কি আমার আগের স্কুলের প্রমোদ স্যারের মতো, যিনি পড়া না পারলে মাঠের মধ্যে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখতেন? আর তারপর সেখানে বসেই উনি আমাদের সকল পড়া কণ্ঠস্থ করাতেন। কিন্তু সেই বকাঝকার মধ্যে কোনো রাগ ছিল না, বরং ছিলো আমাদের প্রতি এক গভীর স্নেহ, যা আমি এখন বুঝতে পারি। 

স্কুলের নাম শালকুমারহাট হাই স্কুল। আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র দু'মিনিটের পথ। কিন্তু প্রথম দিন যখন সেই রাস্তা দিয়েই স্কুলের দিকে হাঁটছিলাম, মনে হচ্ছিল যেন যুদ্ধ জয় করতে যাচ্ছি। একটা চাপা উদ্বেগ কী জানি কী হয়! ক্লাসে গিয়ে ফাস্ট বেঞ্চের কোণায় গিয়ে চুপটি করে বসেছিলাম। আমাদের প্রথম ক্লাস নিতে এলেন দীপক স্যার ।দেখেই বোঝা যায় বেশ হাসিখুশি ও ভালোমানুষ তিনি। আমাদের তিনি অঙ্ক পড়াতেন। এছাড়াও ইংরেজি , বাংলার একজন দিদিমনি আর পরিবেশ বিজ্ঞানের জন্য আরো তিনজন মাষ্টারমশাই ছিলেন। প্রত্যেকেই ভীষন ভালো পড়াতেন আর খুব ভালোবাসতেন আমাদের। আমারও ভয় ধীরে ধীরে কেটে গেলো এবং আস্তে আস্তে অনেক বন্ধুবান্ধব হয়ে গেলো। টিফিনটাইমে ছোঁয়াছুঁয়ি, লুকোচুরি খেলা বেশ জমতো আমাদের। স্কুল ছুটি হওয়ার পরও আর ফিরতে ইচ্ছে করতো না বাড়িতে। অপেক্ষায় থাকতাম কালকের দিনটা কখন আসবে! দিন যেন ফুরোতেই চায় না।

একবারের ঘটনা বেশ মনে পড়ে। আমি তখন পড়ি ষষ্ঠ শ্রেণীতে। আমাদের স্কুলে অফিস রুমের সামনে একটা মুক্ত মঞ্চ ছিল। যেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালন করা হতো। যদিও সেটা আমাদের কবাডি খেলার জন্যই বেশি ব্যবহৃত হতো। একদিন সেরকমই খেলছিলাম। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে আমার পিছনে থাকা এক বান্ধবী একটুর জন্য নীচে পড়তে পড়তে ওই মুহূর্তে আমাকে ধরে ফেলে এবং আমিও ওর সাথে নীচে পড়ে যাই। যেহেতু মুক্ত মঞ্চটা অনেকটাই উঁচু ছিল, আমার মনে হয়েছিল আমি যেন বাতাসে ভেসে ভেসে কোথাও গিয়ে পড়ছি। যদিও পরে সেই মেয়েটি স্বীকার করেছিল, সে ইচ্ছে করেই অমন করেছিল। "আমি পড়বো তাহলে তুই পড়বি না কেন? খেলবোও একসাথে আর পড়বো তো তোকে নিয়েই পড়বো।" এই ছিলো তার বক্তব্য।

আমাদের সংস্কৃত পড়াতেন বিউটি দিদিমনি। তিনি পড়ানোর সময় সবসময় আমার দিকে নজর রাখতেন। কারণ আমি প্রচুর গল্প করতাম ক্লাসে বসে। তিনি সেটা খুব ভালো জানতেন। আর সেজন্য তিনি আমার নামই রেখে দিয়েছিলেন 'গল্প '। ক্লাসে এসে বলতেন ' এই যে গল্প আর কত গল্প করবি !' এছাড়াও কথায় কথায় হাসতাম বলে আমার আরেকটা নাম ছিল "হাসুরি"।

সেসময় একটা চল ছিলো শিক্ষক- শিক্ষিকাদের মজার মজার নাম দেওয়া। তাই শুধুমাত্র তিনিই নন, আমাদের ইতিহাস যিনি পড়াতেন অর্থাৎ দীপক দাস স্যার, ওনার নামও আমরা দিয়েছিলাম রাগী স্যার(কারণ তাকে প্রথমবার দেখে মনে হয়েছিল উনি ভীষন রাগী), এছাড়া প্রণয় স্যারের নাম লাঠি স্যার( হাতে তার সবসময় লাঠি থাকতো) ইত্যাদি ইত্যাদি।
প্রণয় স্যারের ক্লাসে বসে আমি গান্ধীজির ছবি আঁকতাম আর কল্পনা করতাম লাঠি হাতে স্যার এবং লাঠি হাতে গান্ধীজি-কে। দুজনে লাঠি নিয়ে একে অপরের সাথে যুদ্ধ করছেন। ওনারা এই কথা পরে অবশ্য জানতে পেরেছিলেন কিনা জানি না, কিন্তু জেনে থাকলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া আমাদের দেখাননি।

পঞ্চম শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সত্যি বলতে আমার সেরকম কোনো বন্ধুবান্ধব ছিলো না। যারা ছিলো তারা ছিলো নামমাত্র বন্ধু। আমরা যেমন ইউজ অ্যান্ড থ্রো বলপেন ব্যবহারের পর সেগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দেই, তারাও সেরকম প্রয়োজনে আমাকে ব্যবহার করতো। কিন্তু তবুও আমি কীসের এক অমোঘ টানে একদিনও স্কুল বাদ দিতে চাইতাম না। সে যতই রোদ - ঝড়-বৃষ্টি যাই থাকুক না কেন! বাড়ি থেকে যেতে না দিলে কান্নাকাটি করতাম। এখন মনে হয় যে আমি ঠিক কাজই করতাম। নাহলে হয়তো স্কুলজীবনের কিছু সুন্দর মুহূর্ত আমার উপভোগ করা হয়ে উঠতো না।

অষ্টম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার ফলপ্রকাশের পর এক বিশেষ কারণে আমার সাথে আমার চারজন বান্ধবীর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। অবশেষে আমি আরো নতুন বন্ধু পেয়ে যাই। তাদের সাথে টিফিন ভাগ করে খাওয়া, টিফিনটাইমে হাইবেঞ্চে বসে গানের লড়াই এইসব চলতো। আমার ভূগোল পড়তে ভালো লাগতো না বলে ওরাও ভূগোল ক্লাস বাদ দিয়ে আমার সাথে মাঠে বসে ভূতের গল্প শুনতো আমার কাছ থেকে।

এছাড়াও আমি ওদের বিনাপয়সায় স্পোকেন ইংলিশ এর তালিম দিতাম। ওরাই ছিলো আমার প্রথম ছাত্রী ।ওদের আমি নিজের সাধ্যের বাইরে শেখানোর চেষ্টা করতাম (যেহেতু নিজেই তখনও ধরাকে সরা জ্ঞান করি)।ওরা সেটাতেই অবাক হয়ে যেতো। আমার নাম ছিলো ' ব্রিটিশ'।

নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন করোনা মহামারির জেরে স্কুল কলেজ অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি কিছুটা ঠিকঠাক হওয়ার পর যখন বিদ্যালয় পুনরায় চালু হয়, ততদিনে আমি দশম শ্রেণীতে উঠে গেছি। আমাদের অঙ্ক করাতেন সুমন্ত দেবনাথ স্যার। তিনি আমার উপরে কড়া নজর রাখতেন বলে আমি তার চোখ এড়িয়ে লাস্ট বেঞ্চে গিয়ে বসে থাকতাম। আমি তার ক্লাসে ভালো অঙ্ক পারতাম বলে উনি আমাকে ডাকতেন ' অঙ্কের ভাগ্যবতী' বলে। 

মাত্র দুইমাস ক্লাস করার পর আবার সব বন্ধের নির্দেশ। বাড়িতে বসে বসে খালি দিন গুনতাম কবে আবার সবকিছু ঠিক হবে, বন্ধুদের সাথে দেখা হবে। এভাবে দেখতে দেখতে চলে এলো টেস্ট, তারপর মাধ্যমিক। পরীক্ষার পর আমি বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার জন্য চলে গেলাম অন্য স্কুলে। এরপর যতদিন ঐ স্কুলে ছিলাম এমন কোনো দিন ছিলো না যখন আমার আগের বিদ্যালয়ের কথা মনে পড়েনি। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও মনে হয়েছিল, আরেকবার যদি সেই ছোট্টবেলাকার সম্মিলিতা হয়ে যেতে পারতাম! তাহলে হয়তো আর কোনোদিন বড়ো হয়ে যাওয়ার কথা ভাবতামই না। স্কুলের পরীক্ষা অনেক অনেক ভালো ছিলো, কারণ জীবনের পরীক্ষায় তো কলমই ছোঁয়ানো যায় না। স্কুলজীবনের মতোই কি আস্তে আস্তে জীবনের বাকি অধ্যায়গুলোও একদিন শেষ হয়ে যাবে এইভাবে?

স্কুলবাড়ির সামনে দিয়ে গেলে এখনও দেখতে পাই ইউনিফর্ম পড়া ছোটো আমি-কে। যে কিনা সুর করে বলে চলেছে, 
"ওপেনটি বায়স্কোপ
রায়টেনে টেলেস্কোপ
চুলটানা বিরিয়ানা 
সাহেববাবুর বৈঠকখানা।"

তমাল গাছের ছায়ায় পড়ে থাকা শুকনো পাতাগুলোও যেন বলে ওঠে,
"বন্ধু চল রোদ্দুরে
মন কেমন মাঠজুড়ে
খেলবো আজ এই ঘাসে
তোর টিমে তোর পাশে।"


 

আমাদের বিদ্যালয়

মজনু মিয়া 


আমাদের বিদ্যালয় খুব পরিপাটি ফিটফাট 
যেই দেখে সেই দেখে বলে বেশ সুন্দর স্মার্ট। 
চারপাশে গাছপালা তার এক পাশে নদী বয়
পাখিদের কলরব শুনি জায়গাটা ছায়াময়।
নদী পাড়ে তরী বাঁধা যেথা পারাপারে কাজ দেয়
ছেলে-মেয়ে যাতায়াতে ওঠে আনন্দে মজা নেয়।
একটু দূরেই একটা দোকান বেচাকেনা রোজ
টিফিন খেতেই ছুটে চলা এটা সেটা হয় খোঁজ। 
মাষ্টার খুব করে বলে ওপারে নয় যাওয়া
বিচার হবে কড়া কিন্তু হলে পরেও হাওয়া!
ভয়ে ভয়েই কাটে সময় কখন যে হয় ছুটি 
ছুটির ঘন্টা বেজে গেলে আনন্দে লুটালুটি। 


 

স্মৃতির বিদ্যালয় 

সুদীপ দাস


বিদ্যালয়ের দ্বার যেদিন হলো বন্ধ,

স্মৃতির দ্বার উন্মোচিত, মনে বড়ই দ্বন্দ্ব।

জীবনের সেরা সময় ছাত্র কালই যেনো,

কত শত অম্ল মধুর স্মৃতি পুরোনো।


ঐ যে শাসন বেত্রাঘাতের, যায় না কভু ভোলা,

শ্রেণি-কক্ষ চক ডাস্টার অংক স্যারের কানমলা।

টিফিন বেলায় স্কুলের গেটে সবাই মিলে ভিড় করি,

মায়ের দেওয়া আটানায় কিনি রঙিন বরফ আর ঝালমুড়ি।


ঢং ঢং ঢং ঘন্টার শব্দ আজও কানে বাজে

আমার প্রাণের বিদ্যালয় আজীবন মন রাজে।

শেষ পিরিয়ডের শেষ বেল আর আমরা ছুট লাগাই,

"সাবধানে যাস বাড়ি তোরা" উচ্চস্বরে বলতেন গুরু মশাই।


বন্ধুরা আজ দেশ বিদেশে কেউ বা ঠিকানা হীন,

বড্ড মনে পড়ে ফেলে আসা বিদ্যালয়ের সেই সব দিন।

একটা একটা স্মৃতিতে আজ একটা মস্ত স্মৃতির সাগর 

তলিয়ে গেলেই পাই যে শুধু হাজার মণি মুক্তার বাহার।


স্মৃতির মণিকোঠায় রয়ে গেছেন শিক্ষকগণ,

চীর শ্রদ্ধেয় তারা, তাঁদের শিক্ষাই করছি বহন।

অনেকেই আজ তারা ইহধাম ছেড়ে দিয়েছেন বহুদূর পাড়ি,

রেখে গেছেন তাঁদের সাধের বিদ্যালয় একটি মানুষ তৈরির বাড়ি।



  

যেখানে দ্বিতীয়বার ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম -----

গৌতমেন্দু নন্দী 



শুরুর শুরু সময়, বলি যেমন "সলতে পাকানো" 
    রূদ্ধ দ্বার ও বাতায়নের নিশ্ছিদ্র বদ্ধ ঘরে----
    দুরু দুরু বক্ষে তখন প্রবেশিকা পরীক্ষা তরে
  যোগ্যতা-নির্ধারনে, ঠিক যেন তার "চোখ রাঙ্গানো"।

    যোগ,বিয়োগ আর অংকের যত প্রশ্নচিহ্ন আঁকা
     ব্ল্যাক বোর্ডের সমতল বুকে উজ্বল সব অক্ষর
     বদ্ধ সেই ঘরে রয়েছি সদ্য হওয়া জ্ঞান-স্বাক্ষর
    খাতায় কচি আঙ্গুলে তখন কলমের স্পর্শ রাখা---

    "পাখি সব করে রব রাতি পোহাইলো
     কাননে কুসুম কলি......"
      অনায়াসে লিখে ফেলি
     খাতার পাতায় যেন অক্ষরে ফুটলো ------।

    পিতৃ-মাতৃ স্নেহ-যুক্ত মুক্ত বিহঙ্গ-মন
    পেয়ে গেল বিদ্যালয়ে প্রবেশের ছাড়পত্র-----
    সারাদিন খুশিতে উড়ল  দিন রাত্র
   খুঁজে পেল বৃক্ষ শাখায় শিক্ষা-অঙ্গন---।

     শুরু হলো বিদ্যালয়ের ছাত্রদলের ভীড়ে
     নিয়মিত দাঁড়িয়ে শিক্ষক শিল্পীর সনে
     জাতীয় সংগীতের সঠিক কথা--উচ্চারনে
     সমবেত কন্ঠে সঠিক বোধ আর সুরে---।

     শুধু নয় লেখা পড়া সৃষ্টি সৃজনেরও চর্চা
     খেলাধুলা, পিকনিক, চলতো ভ্রমণও
     সাথে ছিল এন,সি,সি ক্যাম্পের আনন্দও
     কতো স্মৃতি আসে ভেসে কতো ছবি--কড়চা।

      মনে পড়ে ছাত্র তখন সবে পঞ্চম শ্রেনি
     বিদ্যালয় অঙ্গন মাঝে কৃষ্ণচূড়ার ডালে 
     বসেছিল বাজপাখি জানিনা কী ভুলে
     ছুঁড়েছিলাম লক্ষ্য ক'রে তাকে ঢিল খানি---

      পেয়েছিল আঘাত সে হয়েছিল আক্রান্ত 
      হইচই চারপাশে এলো ছুটে  ছাত্র সব
    আমি তখন "ভ্যাবাচ্যাকা" একদম নীরব
      সেই ঘটনায় আজও, বিষাদ, ভারাক্রান্ত ---।

   হাতে লেখা ম্যাগাজিন,চলত তার প্রতিযোগিতা 
    অষ্টম থেকে একাদশ চারটি শ্রেনির প্রতিযোগী
   "প্রথম"যে হোতেই হবে তাইযে  মনোযোগী 
   সেরার সেই পত্রিকাটি সযত্নে আজও রেখেছি তা---

     মনে পড়ে আর্ট এন্ড ক্র্যাফ্টের সেই বড় কক্ষ
      মুখরিত শব্দ--করাতের ঘর্ষণে 
     ভিজে যায় জামা খানি ঘাম জল বর্ষনে 
     পেয়েছিলাম শিক্ষক,যিনি শিল্পী এক দক্ষ।

     ভীড় করে কতো স্মৃতি বিদ্যালয় ঘিরে
    রেখেছি মনে মণিকোঠায় রেখেছি যতনে 
    আজও ফিরে ফিরে আসে ঘুমের স্বপনে 
    ভাবি শুধু আবার যদি আসতো সে দিন ফিরে
     
        ছিলনা "মিড ডে মিল" ছিল বাদাম ভাজা 
            সাথে ছিল ঘুগনি,আচার 
           সেটাই ছিল আনন্দ, বাঁচার 
 রাগ,অভিমান ছিলনা কিছু যতোই পাই শাস্তি সাজা।

   গ্রীষ্মাবকাশ শুরুর আগে সাজানো শ্রেনি ঘরে
   আসতেন সব শিক্ষকগণ করতাম তাঁদের বরণ
       তাঁদের স্নেহে ধন্য হয়ে পেতাম স্পর্শ-চরণ
    প্লেটে প্লেটে সাজিয়ে দিতাম মিষ্টি  তাঁদের তরে।

     মনে পড়ে তাঁদের যাঁরা ছিলেন অশিক্ষক 
   বেঁধে বেঁধে রেখেছিলেন যাঁরা স্নেহের ডোরে   
থাকবেন তাঁরাও চির বেঁচে মোদের স্মৃতি-ঘোরে
   লেখাপড়ার বাইরে তাঁরাই বিদ্যালয়ের রক্ষক।


       



 

সোনালী দিনগুলো

রবিনা সরকার

স্কুলব্যাগ, ইউনিফর্ম, জ্যামিতির বাক্স
হারিয়েছি সময়ের স্রোতে।
ব্লাকবোর্ড, ডাস্টার, চক, সেই দেওয়াল ঘড়ি,
ইচ্ছে হয় আবার ফিরে পেতে।

জোর করে পাঁচজন এক বেঞ্চে,
জানালার ফাঁকে বৃষ্টিতে চোখ রাখা।
শাসনের মাঝে গভীর স্নেহ,
শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আমাদের সন্তানের চোখে দেখা।

টিফিন ভাগাভাগির সেইসব গল্পগুলো
রয়ে যাবে মনের চিলেকোঠায়।
ক্যান্টিন, স্কুলের মাঠ, দৌড়ের প্রতিযোগিতা
আজন্ম থেকে যাবে স্মৃতির খাতায়।

পেরিয়ে গিয়েছে সময়,
ধূলোতে মেখেছে পুরোনো বই,
হারিয়েছে বন্ধুরা, সঙ্গে
ফুরিয়েছে সোনালী সময়।

শেষপাতায় কাটাকুটি খেলা,
আরো কত নাম রয়ে গেছে,
বিদ্যালয়ের দেওয়ালগুলোই শুধু জানে,
কত স্মৃতি বহন করে আছে।


 

মাথাভাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়
রীতা মোদক


এমন একটা বিদ্যালয় আছে
যেখানে জ্ঞানের  প্রদীপ জ্বলে
পড়াশোনা খেলাধুলার সাথে
সংস্কৃতির ও ঐক্যের কথা বলে।

এমন একটা বিদ্যালয় আছে
যেখানে প্রতিদিন স্বপ্ন বোনা যায়
মুক্ত বিহঙ্গের মত,
আনন্দের পাখা মেলা যায়।

এমন একটা বিদ্যালয় আছে
যেখানে মানুষ তৈরী  হয়
হানাহানির বিভেদ ভুলে
যেখানে ভালবাসা বেচেঁ রয়।

এমন একটা বিদ্যালয় আছে
যেখানে মায়ের মতো আশ্রয় আছে
দিদিমণিদের শাসনের মধ্যে
বাবার মতো স্নেহ আছে।

এমন একটা বিদ্যালয় আছে
যেখানে দেশপ্রেমের কথা হয়
রাজনীতির ছক ভুলে
সেখানে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়।

এমন একটা বিদ্যালয় আছে
যেখানে পঞ্চাশের ইতিহাস ভাসে
নতুন - পুরনোর মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে
হারানো শৈশব ফিরে আসে।