Friday, August 2, 2024


 

`কুচকুচে কালো মসৃণ আরেকটি কানেক্টার`


বন্ধনহীন গ্রন্থি 
মৌসুমী চৌধুরী 

       নাহ্ ... কোন রাজপথ নয়, গ্রাম  ছাড়িয়ে অদূরের কোন রাঙামাটির পথ নয়, সবুজ অন্ধকারে ঢাকা রহস্যময়ী কোন বনপথও নয়। সে পথটিকে খোদ মহানগরী বুকে ধরে আগলে রাখলেও সে নিতান্তই সাদামাটা সরু এক পথ। সে আমার প্রিয় পথ। হেলেদুলে এঁকেবেঁকে পথটি গিয়ে মিশেছে চওড়া কুচকুচে কালো মসৃণ আরেকটি কানেক্টার পথের সঙ্গে। সরু সেই পথটির বুকের ওপর দিয়ে সকাল থেকে চলে ব্যস্ত বাস, অটো, রিক্সা। আজও সে পথে গেলে বুক ঢিপঢিপ করে আমার। পথখানা আমার খুব প্রিয় সেইদিন থেকেই যেদিন সেই পথের বাঁকে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। 
                সেদিন ছিল আগস্টের মাঝামাঝি এক গোমড়ামুখো দিন। সারাটা দিন আকাশ থেকে ঝুঁকে ভ্রুকুটি করছিল কালোজামা পরা বাদল মেঘেদের দল। শেষ বিকেলে মেঘের বুক চিরে সোনারঙা আলো ছড়িয়ে পড়েছিল মহানগরীর বুকে। ঢিপঢিপ বুকে আমি বসটিতে চড়ে বসেছিলাম, যে বাসটা আমাকে পৌঁছে দেবে সেই গলিতে। সময় যেন পাথুরে ওজন ছড়িয়ে চেপে বসেছিল বুকের ওপর। বাসটা সেদিন ইচ্ছে করে বড্ড সিগনাল খাচ্ছিল। মহানগরীর  পথে কি সেদিন অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশি বেশি মানুষজনের ভীড় ছিল? বড্ড বিশ্রী জ্যাম জট পেরিয়ে চলছিল বাসটা। অপেক্ষার আনন্দে আমার বুক কাঁপছিল দুরুদুরু! কিসের জন্য যেন কেবলই চোখ জলে ভরে আসছিল!  বাসের জানালা দিয়ে বেপরোয়া বাতাস এসে ঘেঁটে দিচ্ছিল আমার চুল। বেশ টের পাচ্ছিলাম আমরা দুজনেই সেই একই বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি। খুব কাছাকাছি।  হঠাৎ বাসটা এসে ব্রেক কষে থেমেছিল আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। গলির মুখে বাসস্ট্যান্ডে  দাঁড়িয়েছিল সে। নীল জীন্স-প্যান্ট  আর গাঢ় ধূসররঙা পাঞ্জাবির গাম্ভীর্যের আড়ালে তাঁর মুখে কি ছিল স্মিত হাসির ফুল সম্ভাষণ ? কি জানি! দুরুদুরু  বুকে তো সেসব দেখতে পাওয়া যায় না। তবে আমার সবুজ চুড়িদারে মাখামাখি লাল ওড়নাখানা সেই মুহূর্তে যেন ডানা মেলে দিতে চাইছিল। হঠাৎ ধূসর পাঞ্জাবির গাম্ভীর্য ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ভীড় রাস্তার ব্যস্ত গলির মুখে সে শক্ত করে চেপে ধরেছিল আমার হাত। আমার তখন ধরনী-দ্বিধা-হও অবস্থা। বিড়বিড় করে বলে চলেছি, "ছাড়ো... সবাই দেখছে তো।" এ কথায় আমার হাতের ওপর চাপ আরও বাড়তে লাগল। আর যেন পালকের মতো হলকা হয়ে যেতে লাগলাম আমি। কথা বলতে পারলাম না, কী যেন একটা দলা পাকিয়ে রইল গলার কাছে। "সেই পথ" আর "আমরা" ছাড়া যেন কোত্থাও আর কিচ্ছুটি নেই...তারপর সে পথে সে আর আমি হাত ধরাধরি হেঁটেছি মাত্র একশ মিটার। তখন বিকেল মরে নেমে আসছিল শ্লেটরঙা সন্ধে। জ্বলে উঠছিল পথের আলোগুলো। আর সেই পথে সেই আলোময় হেঁটে চলাটুকু-ই আমার বুকের মাঝে যেন উল্টে দিয়ে গেল আস্ত এক রঙের দোয়াত!
          তারপর ... হেঁটেছি চেনা-অচেনা আলো ঝলমলে কত রকমারি পথে! কত মানুষ — কত নারী-পুরুষ, শিশু- বৃদ্ধার সঙ্গে ভাগভাগি করে নিয়েছি চলার পথ। কিন্তু মনে রয়ে গেছে সেই পথটি — আমার নিজস্ব "কিনু গয়লার গলি", যেখানে আজও  সেই পবীত্র ছোঁয়াটুকু আগলে দাঁড়িয়ে থাকে কোন এক নবীন কিশোর, যার বয়স এ জন্মে আর বাড়ে না! 
      সেদিনের সেই পথ ও সেই ছোঁয়াটুকু আমাদের বেঁধে দিয়ে গেছে আজীবনের "বন্ধনহীন-গ্রন্থি"তে।



`মৃন্ময়ী পথ চিন্ময়ী রূপে....` 


পথ.....তুমি কার?

জয়তী ব্যানার্জী 

     আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ। আনন্দের সরণী বেয়ে আজ আমরা এঁকেবেঁকে চলেছি নানা বাঁক- এর মধ্য দিয়ে। জীবন সায়াহ্নে রএই গলি কখনো বা রাজপথ আবার কখনো বা কিনু গোয়ালার গলি, কখনো বা দুজনার দুটি পথ যায় মিলেমিশে। আর সেই আনন্দে আমাদের মন বলে ওঠে ---আমার মুক্তি আলোয় আলোয় ।তবু যেন কোথাও একটা তাল কেটে যায়, দৈনন্দিন জীবনে চলতে গিয়ে মতবিরোধ হয়, ছন্দ পতন হয় কিন্তু তাহলে তো চলবে না । তুমি যে অনন্ত অসীম--- তোমার কোথায় শুরু ,কোথায় যে শেষ... কেউ তা জানে না ।তুমি যে ধ্রুব সত্য। তুমি তো সাকার- নিরাকার উভয়ই। তাইতো তোমারও অসীমে প্রাণ মন নিয়ে কত দূরেই আমি ধাই-ই -ই। সেখানে যে কোথাও মৃত্যু, কোথাও জড়া আবার কোথাও বা নতুন করে পথ চলার নির্দেশ। চরৈবেতি চরৈবেতি _____তুমি যে অনন্ত অসীমে ধাবমান। আমিও জীবন মধ্যাহ্নে দাঁড়িয়ে হেঁটে চলেছি নি:সীম শুন্যে। হাজার বছর ধরে মনে হয় এই হাঁটা চলছে। পথ--- তোমার কি কোন বাঁধনই নাই, কেউ কি তোমার পথের ঠিকানা জানে না গো, কেউ কি বলতে পারে.... তোমার আদি অন্ত ...সে তো, এই পথ যদি না শেষ হয় ----সেই অনন্ত পথে হেঁটে যাওয়া। বড় সাধ জাগে গো পথ, তোমায় শুধাই ---কোন বাঁধনে বাঁধো তুমি আর যাবেই বা কোন ঠিকানায় ...তবে আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দাতা, আমাদের আশ্রয়স্থল রবি কবি তাঁর শেষের কবিতায় 'অমিত' কে দিয়ে বলিয়েছেন------
        "পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি,
আমরা দুজন চলতি হওয়ার পন্থী"------
           কিন্তু সেই চলমান পথ..... তোমার কোন বাঁধন নেই, তাই তো তুমি ঘর ছাড়া। তোমার কোন ঘড়ি নেই ,তোমার কোন গন্তব্য নেই ,তোমার পৌঁছানোর কোন তাড়া নেই। শুধু ছুটে চলেছ ,চলছো তো চলছোই। তোমার প্রতি যে অনন্ত জিজ্ঞাসা আমার ।তোমার কি অনেক কাজ গো পথ----- মনে হয় ,তোমারও অনেক কাজ তাইতো। তোমার ই ভাষায়, যার ঘর নেই.. তাকে তোমার ধারণ করে রাখতে হয় বুকের মাঝে... আবার তুমি যে সোনার তরীর মতো ভারা ভারা রাশি রাশি ধান ভিড় করে রাখো তোমার ধারে। কিন্তু আবার যার ঘর আছে তাকে যত্ন করে ঘরে পৌঁছে দিতে হয় তোমাকে। আবার তোমার পাশেই তালপাতার পাখা হাতে নিয়ে বসে থাকে বুড়ি মানষির দল, কিশোর মন অকারণ পুলকে ধানক্ষেতের আলপথ ধরে ছুটতে থাকে---- সেই ছোটার ও যে কোন শেষ নেই গো---- তারপর একসময় তোমার বট গাছের ছায়ায় এসে বেদী তলে বসে জিরিয়ে নেয়।
       তুমি যে গরমকালের ঝলমলে রোদের সাথে গা-মাখামাখি করে লুটোপুটি কর আবার বর্ষার মেঘলা মেদু রতাকেও উপভোগ করতে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়নি কখনো তোমার অবয়ব। তাইতো তুমি হয়ে ওঠো পথ ভোলা এক পথিকের ক্ষুদ্র নামান্তর। তোমার সাথে সখ্যতা হতে দ্বিধাবোধ হয় না যেমন বর্ষার আলো আঁধারী মেঘের ,তেমনি আবার কুয়াশা ঘেরা সদ্য রৌদ্র স্নাত আকাশও যেন তোমায় খুব আপন করে নেয় গো। গ্রাম্যপথে তুমি যে কত না বলা কথার আশ্রয়স্থল---- ভরা গ্রীষ্মের দুপুরে কলসী কাখে পোড়া চেহারায় রিক্ত শ্রান্ত গ্রাম্যবধূকে আশ্রয় জোগাও তুমি ,আবার একরাশ বাঁধন ছেড়া কিশোর কিশোরী অবগাহন করে তোমার দূর-দূরান্তের পথের মাঝে ----তৃষ্ণার্ত তোমার ধুলো সিক্ত করে কোন যৌবন ভীরু পল্লীবালা----সেও যেন এসে আশ্রয় চায় তোমার আঁচলে তুমি যে গেয়ে ওঠো----
            "আমার এ পথ তোমারও পথের শেষে"
         আর তুমি শুষে নাও বারিধারার ভালোবাসাটুকু। তুমি যে অমৃত কলস । আচ্ছা সত্যি করে বলতো, আমার মৃন্ময়ী পথ ---তুমি কি কোন সময় চিন্ময়ী রূপে ধরা দেবে তোমার প্রেয়সিকে, সে চকিতে অবগুন্ঠানবতী হয়ে আঁচল গোছাবে বলেই কি বসে আছো তোমার আয়াস লব্ধ মধুরতা নিয়ে ।সেই থেকেই বুঝি তুমি কত ঘর ছাড়া লোকের আপনজন হয়েছ ,আবার নতুন করে ঘর বাঁধবার ঠিকানা জুগিয়েছো।
                   কিন্তু তুমি যে আবার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে নারাজ; তুমি চাও না প্রশ্নের কড়াঘাতে জেরবার হোক তোমার জীবন ।তুমি যে চিরকালই রহস্যময়ী ,তুমি তো অধরা। তুমি নিজেকে মোহময়ী করে তুলতেই সদা ব্যস্ত। চিরকালই রহস্যের হাসি এঁটে তুমি দূরে মিলিয়ে যাও ,দিগ্ বলয়ের প্রান্তে, সেই দিগন্ত প্রসারিত তুমি যে ধুমায়িত বসনাবৃত এক রমণীর কায়া, যা চিরকালই অধরা। তোমার সাথে পাড়ি জমিয়ে ভেবেছিলাম ,এই বুঝি তোমার শেষ ----কিন্তু তুমি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছো ____শেষ বলে কিছু নেই। যার শুরু নেই তার আবার শেষ কোথা থেকে হবে ....তুমি অনন্ত অসীম। মহাবিশ্বে তোমার ছুটে চলা। তুমি যে অপু দুর্গার সংসার, এই পথেই লাবণ্য খুঁজে পেয়েছিল শিলং পাহাড়ের 'অমিত' কে আবার শরৎ বাবুর 'সতীশ' তার 'সাবিত্রী'কে পথ থেকেই তুলে এনে আশ্রয় দিয়েছিল বাসা বাড়িতে।
কোলিয়ারির পথে বিভ্রান্ত পথিক হয়ে ছোট্ট ছেলেকে কাঁধে নিয়ে হেঁটে বেরিয়েছিল অপূর্ব---- শোক স্তব্ধ হয়ে.... তুমি সেই কাল থেকে এসবেরও সাক্ষী পথ। তবুও যে বিস্তর প্রতিবাদ করেছি আমি। যুগের পরিবর্তন হয়েছে। বারবার দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছি---- জীবনের পথ শেষ হয় মৃত্যুর দরজায়, তবুও তো তুমি মানো নি। তুমি বলেছ আত্মার মৃত্যু নেই শুধুই রূপান্তর। তুমি বলেছ মৃত্যু হয় শরীরের, দেহের। কাজের মত কাজ জাজ্বল্যমান হয়ে থাকে--- সে যে অশরীরী আত্মা। তুমি প্রতিমুহূর্তেই নিজেকে আখ্যায়িত করেছ এইভাবে, তুমি অসীম ---তুমি নি:সীম শূন্যে হেঁটে চলো ।
তুমি বলেছ যার ঘর নেই তাকে তোমার ধারণ করে রাখতে হয় বুকের মধ্যে, তুমি যে গৃহহীনদের গৃহ আবার যার ঘর আছে তাকে যত্ন করে ঘরে পৌঁছে দিতে হয় তোমাকেই---- তখন তো তুমি দায়িত্ববান পিতা। আবার প্রেমের জোয়ারে ভাসমান কিশোর কিশোরীর রাসলীলা করবার রঙ্গমঞ্চ ও যে তুমি ।এই ইঁট কাঠ পাথরের দেওয়ালে ভরা জগতলে তারা যে ঠাঁই নেয় তোমারি ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কোন বেদী তলে, কোনো নদীর ধারের সংগোপন আশ্রয়ে ।সেখানেও যে তোমার দুয়ার খোলা। 
              তাইতো তুমি কারো কাছে আটকে পড় না। তুমি কখনো যাও তেপান্তরের মাঠে, আবার কখনো বা নরম নীল ডিঙিয়ে সবুজ পান্নার মত জেগে থাকা কোন দারুচিনি দ্বীপে, আবার কখনো বা জঙ্গলের গহীন অরণ্যে---- যেখানে রৌদ্রছায়ার খুনসুটিতে বেলা কেটে যায়। কোন অচেনা পাখির ডাকে দূরে মিলিয়ে যায় রাখালের মেঠো বাঁশি। সন্ধ্যা নামে ধীরে, জোনাকি জ্বলে ওঠে ইতি উতি। আর তুমিও দিন শেষে অস্তা চলে পাড়ি দিতে নিজেকে প্রলম্বিত করো এক দিশা থেকে অন্য দিশায়।
              তবু আমি জানি আমার এ পথ তার ঠিকানায় কখনো পৌঁছবে না, তোমার সাথে দেওয়া-নেওয়ার পালাও বোধ করি কখনো চুকবে না। এ যে নিত্য কার অভ্যেস। অনিত্যের বেড়াজাল একে বাঁধতে পারবে না কোনদিন ।ভালো থেকো আর ভালো রেখো উত্তরসূরীদের, যারা শ্রান্ত ক্লান্ত জরা- জীর্ণ ,তারা এসে জুড়িয়ে নিক আমার প্রিয় পথের পাশে। তুমি জড়িয়ে ধরো এদেরকে বুকের মাঝে। এসব নিয়ে ভালো থেকো আর ভালো রেখো। কান্না হাসির দোল দোলায় বেঁচে থেকো আর সবুজ সতেজ করে বাঁচিয়ে রেখো। আজ তাহলে চলি, পথ।।


 

`ভাইয়ের সঙ্গে পথে....`


বাড়ি থেকে স্কুল

    লীনা রায়

আমাদের বাড়ি ছিল ডাক বাংলোর পাশে।ভাই আর আমি পড়তে যেতাম আর আর প্রাইমারি স্কুলে।বাড়ি থেকে অনেকটা দূর। স্টিলের বাক্সে বই নিয়ে দু ভাই বোন সকাল সাড়ে ছটায় বাড়ি থেকে বের হতাম।স্কুলের সময় ছিল সকাল সাতটা থেকে দশটা।

       বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমেই যেতাম সুভাষ পল্লী ক্লাবে। ক্লাবের এক পাশে সুরেশ কাকু মূর্তি বানাতেন। বিভিন্ন দেব দেবীর।খানিকক্ষন সেই মূর্তি দেখে তারপর স্কুলের দিকে।প্রতিদিন মূর্তি দেখতাম।ভাল লাগত খুব।

           এরপর দর্জি দিদির বাড়ির সামনের রাস্তা ধরে সোজা টাউন ক্লাবের মাঠে। মাঠের পাশে এস এস বি ক্যাম্প।মাঠের ধারে ক্যাম্পের কাঁটা তারের বেড়া।সেখানে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে মার্চ পাস্ট দেখা।তারপর ক্যাম্পের পাশ দিয়ে খানিকটা হেঁটে কসাই পট্টি।ওখানে রাস্তার ধারে একটা বড় ডেওয়া গাছ। হলুদ রঙের ফল, ভেতরটা অদ্ভুত গোলাপি রঙের।মাটিতে অনেক পড়ে থাকত।কয়েকটা কুড়িয়ে নিতাম।ফলটা ফাটিয়ে স্লেট মুছতাম।

              এরপর ছিল কবরখানা। ডাইনে, বাঁয়ে কবর। মাঝে রাস্তা। সেটা পেরিয়ে সামনে বড় মাঠ।চারদিকে অনেক আমগাছ। আর মাঠ পেরিয়ে নদী– সাপটানা।সেই মাঠেই আমাদের স্কুল।
              ছুটির পর ফেরার রাস্তা এক হলেও কর্ম কান্ড ছিল অন্য রকম। বন্ধুরা ঘুরে ঘুরে কবরখানা দেখতাম। প্রতিটি কবরের আলাদা গল্প। যদিও সেসব বন্ধুদের মুখে শোনা।এরপর ক্যাম্পের ধার ঘেঁষে যে রাস্তা সেটা ধরতাম।

                ক্যাম্পের কাঁটা তারের বেড়ার পাশে টেলিফোনের পোল ছিল। সে সময় সিনেমার পর্দায় টেলিফোন দেখেছি। সচক্ষে দেখি নি।আমি আর ভাই পোলের গায়ে কান লাগিয়ে কথা শোনার আপ্রাণ চেষ্টা করতাম।

                   একবার আমি পোলে কান লাগিয়ে কথা শোনার অপেক্ষায়। ভাই একটু দূরে দাঁড়িয়ে।হঠাৎ একটা গরু আমাকে গুঁতিয়ে  ফেলে দেয়।পড়ে গিয়ে আমার কান্না শুরু।মনে আছে, ভাই আমাকে তুলে পঁচিশ পয়সা দিয়েছিল। আমাকে কাঁদতে মানা করেছিল। আজ ভাই নেই।ছোটবেলায় আমার কান্না সহ্য নি।কিন্তু বড় হয়ে সব ভুলে কাঁদিয়ে চলে গেল।

                   এরপর আবার টাউন ক্লাবের মাঠ। চোর কাঁটায় ভরে থাকত। আমি আর ভাই চোর কাঁটার মাঝে ফড়িং ধরতাম। রাজা ফড়িং,রানী ফড়িং, বাঘা ফড়িং – ফড়িংয়ের কত রকমফের।আমার অবশ্য লাল রঙের রানী ফড়িং খুব পছন্দের ছিল। সারা জামা ভর্তি চোর কাঁটা। এবার মাঠ পেরিয়ে সুভাষপল্লী। সুরেশ কাকুর মূর্তি বানানো দেখে বাড়ি ফেরা।

                    আজও চোখ বন্ধ করলে স্পষ্ট দেখতে পাই সেই রাস্তা, চোর কাঁটা আর ফড়িং ভর্তি মাঠ,  ক্যাম্পে  মার্চ পাস্ট। আমি আর ভাই হাত ধরে স্কুলে চলেছি – স্টিলের বাক্স হাতে।


 

`কতটা পথ পেরোলে পরে....`


অমৃত পথের সন্ধানে

ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য 


হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে...

ঠিক কতটা পথ পেরোলে পরে জীবন চেনা যায়? মানুষ চেনা যায়? নিজেকে চেনা যায়? কতটা?

আমার জীবনটা আমার শিকড়ের হিসেবে দুটো ভাগে বিভক্ত। ছোটবেলা থেকে কৈশোর পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্কতার চৌকাঠ অবধি উত্তরবঙ্গের কোচবিহারে আর তার পরের সময়টা দক্ষিণবঙ্গের হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে। এর মধ্যে আবার অনেকটা সময় কর্মসূত্রে কেটেছে কলকাতার পথে ঘাটে। পথের কাহিনীর বিস্তৃত পরিসর তাই কোচবিহার, শ্রীরামপুর, কলকাতা এই সমস্তটা জুড়েই, এবং, তার বাইরেও।

যখন একাধিক জায়গা ছুঁয়ে বয়ে চলে একটা জীবন, তার স্মৃতির অস্থি মজ্জা রক্তে অসংখ্য ছোট ছোট মুহূর্ত এমন গভীর আশ্লেষে মিশে থাকে যাকে বাদ দিলে তার পুরো অস্তিত্বটাই অর্থহীন। তাই বহু পেছনে ফেলে আসলেও কোচবিহারে সাহিত্যসভা বাই লেনের পরিস্কার সুপ্রশস্ত এবং সবুজে ছাওয়া শান্ত রাস্তা ধরে এগিয়ে এসে ডাইনে ঘুরে চারমাথার ছোট্ট মোড় থেকে আবার বাঁয়ে ঘুরে সোজা এগিয়ে সুন্দর কেয়ারি করা বহুবিচিত্র ফুলের গোলাকৃতি বাগান গোলবাগান ছাড়িয়ে মিনিট দশেক সোজা রাস্তা ধরে হেঁটে বাঁয়ে ঘুরতেই আমার স্কুল সুনীতি একাডেমী, যেখানে যাওয়া আসার এই পথের স্মৃতি আজও ভীষণ জীবন্ত। যদিও স্কুলে যাবার জন্য রোজকার বাঁধা রিকশা ছিল, তাও মাঝেমধ্যেই তাকে ফাঁকি দিয়ে মিনিট পনেরোর এই রাস্তাটা আমি হেঁটেই যেতে পছন্দ করতাম, আর এই সুযোগটা সবচেয়ে বেশি মিলত বর্ষাকালে যখন প্রায়দিনই প্রবল বৃষ্টির কারণে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই ছুটি হয়ে যেত স্কুল। রিমঝিমে বৃষ্টির মধ্যে পথের জল ছাপিয়ে আপনমনে বাড়ি ফেরার সেই নির্মল আনন্দের দিনগুলো এখনও মনের একেবারে গহীনে গেঁথে আছে। সেই সময় শহরের মধ্যে রিকশা, সাইকেল আর হাঁটা এই তিনটিই ছিল সবচেয়ে প্রচলিত চলাচলের মাধ্যম। শহরের সুন্দর সুসজ্জিত পরিচ্ছন্ন রাস্তাগুলো হাঁটার যোগ্যও ছিল। স্কুলে যাওয়া আসার এই রাস্তাটুকু বাদ দিলে ছোটবেলার স্মৃতিতে যে আরও একটা রাস্তা একেবারে অমলিন হয়ে গেঁথে আছে সেটা হল সাহিত্য সভায় আমাদের বাড়ি থেকে ডানদিকে মিনিট পাঁচ সাতেক হাঁটলেই এবড়ো খেবড়ো আঁকাবাঁকা ঈষৎ চড়াই পেরিয়ে উঠে যাওয়া বাঁধের পাড়ের রাস্তা। বর্ষার ভরা তোর্ষার রোষ থেকে বাঁচতে তৈরি এই বাঁধের পাড় এখন পাকা করে বাঁধিয়ে দেওয়া হলেও সেসময় ওটা স্রেফ একটা সাধারণ মাটি বালি পাথর মেশানো গ্রাম্য পথই ছিল। কতদিন সকালে বাঁধের পাড়ের দীর্ঘ মেঠো রাস্তা দিয়ে টিউশন পড়তে গিয়ে অথবা কোনও রোববারের বিকেলে তোর্ষার চরে ভাই বোনেদের সাথে খেলতে গিয়ে শহুরে সাজানো ছবির বাইরের দিগন্তবিস্তৃত মুক্ত প্রকৃতি দেখে মুগ্ধ হয়ে কেবল নির্নিমেষ চেয়ে থেকেছি তার হিসেব নেই। পরবর্তীতে কোচবিহার ছেড়ে এলেও এ পথদুটো আমার স্মৃতিতে আজও অমলিন।

শ্রীরামপুর কলেজে পড়াকালীনও হেঁটে কলেজে আসা যাওয়ার একটা অভ্যেস ছিল আমার। শহর হিসেবে শ্রীরামপুরের সাথে কোচবিহারের একটা গুণগত মিল আছে। দুটো শহরই রাজানুকূল্যে গড়ে ওঠা, শিক্ষা সংস্কৃতি ও রুচিশীল কৌলীন্যে সিক্ত এবং অবস্থানগতভাবে নদীতীরস্থ। শ্রীরামপুর কলেজের পেছনের অংশের পথটি ছিল গঙ্গার ধার ঘেঁষে এবং সেকারণেই প্রায়দিনই ছুটির পর সামনের দিকের সহজ রাস্তা না ধরে বিকেলের নরম আলোয় বড় বড় গাছে ঘেরা সুদীর্ঘ গঙ্গাপাড়ের ছায়াঘন পথ ধরে বাড়ি ফিরতাম আমি। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা, এক নিয়ম। আর এ কারণেই সারা বছর ধরে গঙ্গার কত বিচিত্র রূপের যে সাক্ষী হতে পেরেছিলাম, এখন বুঝি সে আশ্চর্য সৌন্দর্য কেবলমাত্র দর্শনেই উপলব্ধি করা যায়, ভাষায় তার প্রকাশ নেই।

এরপর, কর্মসূত্রে দীর্ঘকাল কলকাতায় যাতায়াত করেছি। তবে কলকাতার বিচিত্র ঘটনাবহুল পথের অনেকটাই বাসের জানালায় বসে অপলক বাইরে চেয়ে দেখা, কিছুটা নিজে হেঁটে হেঁটে অনুভব করা। বড়বাজার, স্ট্রাণ্ড রোড আর মধ্য কলকাতার পথে পথে রোজ কত যে গল্প ভাঙে গড়ে, মহানগরীর অন্তহীন রাজপথের দুইধারে ধুঁকতে ধুঁকতেও কোনমতে বেঁচে থাকা সারি সারি পুরনো ভাঙাচোরা বিশাল বিশাল খড়খড়ি আর টানা বারান্দার অট্টালিকাগুলোতে কত যে কাহিনীর ভিড় জমে রোজ, একটা দীর্ঘ সময় সেই সব রাস্তা দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত না করলে তার আভাস পাওয়া যায় না। আজও তাই কলকাতা গেলে কাজ থাকুক কি না থাকুক, কিছু বিশেষ চিরচেনা পুরনো পথ ধরে হাঁটতে বড় ভালবাসি আমি। এবং সেটা ঠিক কোনও নস্ট্যালজিয়ার ভাসা ভাসা আবেগের জন্যে নয়, পায়ের তলার মাটির সাথে নিজের আত্মিক সংযোগটুকু ধরে রাখার অদম্য বাসনাতেই আমার এই একান্ত পথ চলা। এইসব পথের আশেপাশের জীবনগুলো আমার জীবনের চেয়ে অনেক অনেক আলাদা হলেও নানাস্তরের এইসব মানুষ, তাদের দৈনন্দিনের নির্মম জীবনযুদ্ধ, আর এত পরিশ্রমের পরেও এই সমাজে শেষ অবধি তাদের ঠিক কতটুকুই বা মূল্য, যবে থেকে এদের পথে ঘাটে দেখেছি, এ ভাবনাগুলো ব্যক্তিগতভাবে আমাকে সবসময় ভীষণভাবে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে। পথে পথে হেঁটে মানুষ চিনতে গিয়ে এই মুহুর্তগুলোতে শেষ অবধি তাই অন্য কিছু নয়, যেন নিজেকেই বারবার নতুন করে খুঁজে পেয়েছি আমি। তবে, এখনও অবধি নিজেকে চেনার এই সুদীর্ঘ যাত্রায় যে পথটি আমাকে আসলে পথ দেখিয়েছে সেটা কিন্তু এখানে কোথাও নয়, আমার রাজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে সে পথের হদিশ অনেক অনেক দূরে, আরও এক গঙ্গাপাড়ের নগরী, শিবশক্তির পরম স্থান, সুদূর উত্তরপ্রদেশের বেনারস অর্থাৎ কাশীর ঘিঞ্জি পুরনো গলিপথ থেকে ঘাটের পর ঘাট পেরিয়ে তার বাস। 

বেনারস আমি প্রথম যাই আজ থেকে ঠিক বারো বছর আগে, ২০১২ সালে। এরপর আবার ২০১৭ এর এপ্রিলে এবং ২০১৮ এর পুজোয়। যেকোনও জায়গায় বেড়াতে গেলেই পায়ে হেঁটে সে জায়গা ঘোরা আমার চিরকালের অভ্যেস। বেনারস স্টেশনে নেমে অটোয় করে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ও উন্নত নতুন বেনারসের গতানুগতিক শহুরে আধুনিকতা ছাড়িয়ে মিনিট কুড়ি গেলেই আদি পুরাতন বেনারস। আমরা প্রতিবারই এই পুরনো বেনারসের গোধুলিয়া সংলগ্ন হোটেল নিতাম যাতে বাবা বিশ্বনাথের মন্দির আর দশাশ্বমেধ ঘাটটা কাছে হয়। এর মধ্যে দুবার হোটেলে থাকলেও একবার ছিলাম ঘাটের একেবারে কাছেই দশাশ্বমেধ বোর্ডিং হাউসে। এই বোর্ডিং হাউসটির নাম আগে ছিল ক্যালকাটা লজ এবং সত্যজিৎ রায়ের জয় বাবা ফেলুনাথে ফেলুদা তোপশে আর লালমোহনবাবুর কাশীবাসের ঠিকানা ছিল এটাই। সুলভ মূল্যে দশাশ্বমেধ ঘাটের একেবারে কাছে থাকা ও খাওয়ার পক্ষে এখনও মধ্যবিত্ত বাঙালির এটাই প্রথম পছন্দ। এখান থেকে বেড়িয়ে ডাইনে বেঁকে দশ পা যেতে না যেতেই বাবা বিশ্বনাথের মন্দিরের প্রধান ফটক আর বামে সামান্য হাঁটলেই সকাল সন্ধ্যের গঙ্গা আরতির প্রধান স্থান দশাশ্বমেধ ঘাট। বেনারসে শিবপুজোর আগে কালভৈরবের পুজোর নিদান আছে এবং আমরাও সেই প্রথামতোই প্রতিবার প্রথমে কালভৈরব ও তারপরে বাবা বিশ্বনাথের পুজো দিয়েছি। কালভৈরবের মন্দির বেনারসের বিশ্বেশ্বরগঞ্জ এলাকায়। শেষবার যখন বেনারস যাই ঠিক করেছিলাম এখানে পুজো দিয়ে বেড়িয়ে ডানদিকের অপরিসর গলিপথ ধরে পায়ে হেঁটে বোর্ডিং হাউসে ফিরব। কাশীকে পুরোপুরি জানতে হলে কাশীর প্রবাসী বাঙালি অধ্যুষিত বাঙালিটোলার পাশাপাশি খাঁটি উত্তরপ্রদেশীয় এই সব গলিগুলোতে পায়ে হেঁটে ঘোরার অভিজ্ঞতাও একান্ত জরুরি। অত্যন্ত অপরিসর ঘিঞ্জি সংকীর্ণ পুরনো কাশীর এইসব গলি ভেতরে ভেতরে এঁকে বেঁকে চলে গেছে বহুদূর। বেশিরভাগ গলিতেই সরাসরি সূর্যালোক প্রবেশ করে না। মধ্য ও উত্তর কলকাতার গলির সাথে চেহারায় কিছুটা মিল থাকলেও চরিত্রগতভাবে একেবারেই আলাদা বেনারসের গলি। দু’ফুট মাত্র প্রশস্ত রাস্তার মধ্য দিয়েই নির্বিকারভাবে দ্রুত গতিতে ক্রমাগত যাতায়াত করে চলেছে মানুষ, সাইকেল, অটো, রিকশা, বাইক এবং কাশীর একমেবাদ্বিতীয়ম পরম আরাধ্য প্রকাণ্ড বাঁকানো শিংওলা ষাঁড় ও গরু। এই মনুষ্যেতর প্রাণীদুটির তাদের আশেপাশের সহযাত্রীদের সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই, এমনকি, তাদের জন্যে রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার কোনও তাড়া বা ইচ্ছেও নেই। অনভ্যস্ত আমরা অতি সন্তর্পণে সুকৌশলে এদের থেকে গা বাঁচিয়ে গলিপথ ধরে হাঁটছিলাম ধীরে ধীরে। দু’পাশে আকাশচুম্বী পুরনো সব অট্টালিকার সারি। কোনও কোনও বাড়ির ভেতর থেকে মাঝেমধ্যেই সুরেলা রেওয়াজি কণ্ঠের শাস্ত্রীয় ঘরানার গান কি বাদ্যযন্ত্রের ক্ষীণ সুর ভেসে আসছে। তখন প্রায় দুপুর। তবে আদি বেনারসের ঘরে ঘরে সঙ্গীত তালিমের রেওয়াজ এত পুরনো যে এসব অলিগলিতে হাঁটলে দিনের যেকোনও সময়েই তার নিয়মিত অভ্যাসের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়।

কালভৈরবের মন্দির থেকে বেড়িয়ে প্রায় মিনিট কুড়ি পঁচিশ হাঁটলে বেনারসের রেলব্রীজ পার্শ্ববর্তী গঙ্গাপাড়ের দুর্গা ঘাটে পৌঁছনো যায়, তারপর সেখান থেকে ডাইনে গোটা দশ বারো ঘাট পেরিয়ে দশাশ্বমেধ ঘাট যা থেকে হেঁটে ওপরে উঠে গোটা বিশেক পা চললেই আমাদের আস্তানা। এই গোটা পথের মধ্যে মাঝামাঝি জায়গায় পড়ে কাশীর চিতা সহযোগে দাহকার্যের একমাত্র ঘাট মণিকর্ণিকা। ঘাটে পৌঁছানোর আগেই একপাশে ভীষণরকম অপ্রশস্ত সিঁড়ি ধাপে ধাপে নেমে গেছে গভীর সীতাকুণ্ডে আর উল্টোদিকের গঙ্গার পাড়সংলগ্ন ঘাট জুড়ে বিশাল বিশাল কাঠের ও দাহকাজে জরুরি যাবতীয় সামগ্রীর সার সার দোকান। কাশীতে মৃত্যু পরম পুণ্যের এবং মৃত্যু পরবর্তী আচার সংস্কারও অত্যন্ত শ্রদ্ধাসহকারে নিয়ম মেনে করা হয়। এর মধ্যে হরিশচন্দ্র ঘাটে ইলেকট্রিক চুল্লির ব্যবস্থা থাকলেও সনাতন ধর্মমতে বিশ্বাসী অধিকাংশ কাশীবাসীই মণিকর্ণিকা ঘাটের কাঠের চিতায় অমৃতলোকে গমনকেই শ্রেয় মনে করেন। কাশীর মণিকর্ণিকা ঘাটের চিতার আগুন তাই কখনও নেভে না। দিবারাত্রি জ্বলতেই থাকে। দুই ধারের দোকানী খরিদ্দারের ব্যবসায়িক কোলাহলকে পেছনে ফেলে সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে ক্রমশ ঘাটের যত কাছে যাওয়া যায়, গঙ্গার খোলা হাওয়ার দাপটে জ্বলন্ত চিতার লেলিহান অগ্নিশিখার উত্তপ্ত ঝাপটা আর উড়ন্ত ছাইয়ের গুঁড়ো চোখে মুখে এসে লাগে, আর, মৃত্যুর অমোঘ নিশ্চয়তাকে প্রতিটি রোমকূপে অনুভব করা যায়। যে জীবনের ঠুনকো দম্ভে প্রতি মুহূর্তে দর্পের সাথে বাঁচি আমরা, একটা সময় তা যে স্রেফ ছাই হয়ে জলে বাতাসে মিশে যায়, এর প্রত্যক্ষ সাক্ষী মণিকর্ণিকার প্রতিটি ধূলিকণা। সাংসারিক যাবতীয় আকাঙ্খা লোভ মোহ থেকে মুক্ত সর্বত্যাগী মহাসন্ন্যাসী শিব এবং জীবনের একমাত্র ধ্রুবক নিয়ন্তক মৃত্যুর আরাধনা, এই দুই অত্যাশ্চর্য অনুভবই আমার বেনারসের পথ পরিক্রমার পরম প্রাপ্তি। অসীম আনন্দময় এ জীবনের সমাপ্তিটুকু আত্ম অহঙ্কারের বশে যতই এড়িয়ে যেতে চাই, তাই যে শেষপর্যন্ত একমাত্র ধ্রুবসত্য, এবং সে সত্য স্বীকারেই যে জীবনের আসল পূর্ণতা, বেনারসের এই ভীষণ জরুরি শিক্ষাটাই কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমাকে জীবনকে আরও বেশি করে ভালবাসতে শিখিয়েছে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের অনন্ত সম্ভাবনাময় মূল্যকে সম্মান করতে শিখিয়েছে। তাই যতটা পথ হেঁটে বেনারসের অলি গলি পেরিয়ে অবশেষে মণিকর্ণিকায় পৌঁছেছিলাম আমি, তার সবটুকুর সার্থকতাই আজ আমার প্রতি মুহূর্তের যাপনে, প্রতি মুহুর্তের জীবন উদযাপনে। অমৃতমুক্তির সন্ধান দেওয়া সেই পথই তাই আজও আমার জীবনের একমাত্র অমৃত পথ।


 

`জীবনের পথে গল্প অনেক....`


সেই প্রিয় পথ
 বুলবুল দে


সেই যে সেই সুদূর অতীতে ফেলে আসা, শৈশবেই হারিয়ে যাওয়া,যেন দ্যুতিময় হীরক খন্ডে গাঁথা মালার মত জাজ্বল্যমান সেই রাস্তাটি , স্মৃতির মণিকোঠার ঝাঁপিতে  নয়, পশ্চিম দিগন্তাভিমুখে ধাবমান এই নশ্বর জীবনে এই আমার কণ্ঠেই দোদুল্যমান। যখন তখন মাথা নুয়ে তাকাতেই যেন সে দৃশ্যমান, প্রতিনিয়ত যেন তার স্পর্শে মন তরঙ্গায়িত। সে যে আমার ছোট্ট বেলার জলপাইগুড়ির হাকিম পাড়ার সেই ভারাবাড়ির সামনের রাস্তাটি! যার এক মাথা অল্প দূরেই করলা নদীর পাড়ে গিয়ে সালাম ঠুকেছে আর একটা কাঠের পুলের মধ্যস্থতায় অপর পাড়ের সাথে নিগূঢ় বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। সেই দূরের পাড়টা আমার ছোট্ট মনটাকে রহস্য রোমাঞ্চে ভরিয়ে তুলত। নদীতে কদাচিৎ হঠাৎ নৌকো দেখতে পেলে একেবারে আত্মহারা ! যদিও ওদিকটায় যাওয়া বারণ ছিল তবুও বন্ধুর দলের সাথে খেলার উচ্ছ্বাসে কখন যে ওর কাছাকাছি চলে যেতাম! রাস্তার অপর প্রান্ত সোজা বেশ অনেকটা দূরে জেলা স্কুলের পাশ দিয়ে গিয়ে তিস্তার বাঁধের পাদদেশে ঠেকেছে। এই সেই রাস্তা যা ছয় সাড়ে ছয় বছর বয়সেই হারিয়ে গিয়েছিল আমার জীবন থেকে,যার বিচ্ছেদ সারা জীবন আমার মনটাকে বেদনার্দ্র করে রেখেছে। আসলে এটাই নিয়ম, কোনও প্রিয় জিনিস নাগালের বাইরে চলে গেলে তা প্রিয়তর হয়ে ওঠে আর তার জন্যই মনটা আকুলি বিকুলি করতে থাকে। বাবার ট্রান্সফারের সুবাদে ঐ বয়সে আমাকে কোচবিহারে চলে আসতে হয়েছিল। আর এখানে পাড়ায় একটাও বন্ধু ছিলনা। যদিও তখনও ভাগ না হয়ে যাওয়া একান্নবর্তী পরিবারের ভাই বোনেরা মিলে প্রচুর হুটোপুটি খেলাধুলো হত, কিন্তু তবুও পাকাপাকি ভাবে কোচবিহারে চলে আসার পর যেন বুঝতে পারি কত ভাল, কত বিচিত্র পরিবেশের সম্ভারে পূর্ণ ছিল ঐ রাস্তাটি। ঐটুকু জায়গার মধ্যেই একদিকে বাঁধ একদিকে নদী এমনকি চারদিকে বাড়ি ঘরের ভিড়ে আমাদের বাড়ির উল্টো দিকে রাস্তার ঐ পাড়ে রাস্তা থেকে অনেকটা নীচে একটা ছবির মত ধানক্ষেতও ছিল, লাল ফ্রক পরা জবা দিদিদের ধানক্ষেত। আমাদের ঘরের পাশে যে ঘাসে ভরা মেঠো সরু গলিটা এঁকেবেঁকে ঐ দূরে মিলিয়ে গেছে যার শেষটা কখনও দেখিনি ঐদিক দিয়েই জবা দিদি কাস্তে হাতে আসত। ঐ রাস্তার ধারেও কিছুটা জায়গায় ওরা ধান লাগাত। বন্ধুদের সাথে সেই কচি ধানের শীষ থেকে দুধ খেতে গিয়েই তো আমার আল জিভে ধান আটকে ধুন্ধুমার কাণ্ড! শেষে হাসপাতালে গিয়ে বের করতে হয়েছিল।  কখনও রাস্তার ধারে ক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে জমিতে লাঙ্গল চালানো দেখতে দেখতে ফুরফুর করে বেরিয়ে আসা মাটির মত ফুরফুরে মন নিয়ে সেই লাঙ্গলে চড়ার প্রবল ইচ্ছা জেগে উঠত, কখনও জানলা দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে ওদের ধান চারা বোনা দেখতে দেখতে আনন্দে মনটা আমার ছুট্টে ওদের মাঝে চলে যেত।

       আহা ! ঐ তো ফুটফুটে পুঁচকে দেখতে কার্তিক ঐ রাস্তা দিয়ে এসে আমাদের বাড়িতে ঢুকে ডাকছে---
" বুইবুই বুইবুই খেলতে যাবিনা?"
" দাঁড়া আসছি -ই " বিছানার পাশের আলমারির মাথায় বসে সাজুগুজু করতে করতে আমি সাড়া দিচ্ছি। তারপর একে একে পাপিয়া, নন,মাম্পি, শর্বরী আর ওর ভাই সবাই মিলে সারা পাড়া জুড়ে,কখনও রাস্তায় কখনও এর ওর বাড়ি ঢুকে,  চলত আমাদের আনন্দ উচ্ছ্বাসে ভরা খেলাধুলো। খেলতে খেলতে কখনও করলা নদীর ধার ঘেঁষা কানাই কাকুদের বাড়ির ঝকঝকে লেপা উঠোনের মৌরি গাছ থেকে কাঁচা মৌরি তুলে খাওয়া,কখনও সেই অর্ধেক তৈরি পুরনো বাড়িটায় ভূত ভূত খেলা।কখনও বাঁধের দিকে যেতে প্রথম মোড়টার বাদিকের রাস্তার বাপ্পাদিত্তদের নীচু ডালপালা ছড়ানো কাঁঠালীচাপা গাছে দুদ্দার হুটোপুটি। একদিন আবিষ্কার করলাম ক্ষেতে ধান গাছের ফাঁকে ফাঁকে আমার খুব প্রিয় লাল শাক হয়ে আছে,আমিতো আহ্লাদে আটখানা, বন্ধুদের রাজি করিয়ে সেই প্রথম ক্ষেতে নেমে কেবল তিন চারটে গাছ তুলেছি, হঠাৎ কোত্থেকে জবা দিদি আবির্ভূত হয়ে তাড়া করতেই আমরা চো- চা দৌড়ে সেখান থেকে হাওয়া। সেই ছোট্ট আমি আর একদিন খেলতে খেলতে অবাক বিস্ময়ে পাপিয়াদের বাগানে রঙিন লাল সাদা হলুদ কালো ছিট্ ছিট্ কচুপাতা দেখতে পেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত-- কচু পাতাও এত সুন্দর হয় ! আর ঐ যে দেখতে পাচ্ছি, ছুটির নিশ্চুপ দুপুরে বন্ধুদের দলে দাঁড়িয়ে আছি রাস্তার মোড়ে, হঠাৎ শর্বরীর দুষ্টু ভাইটা আমার পিঠে দুমদুম করে কিল মেরে দৌড়ে পালিয়ে গেল! রাগে দুঃখে বাড়িতে ছুটে এসে ঘুমন্ত বাবাকে নালিশ করে সেরকম কোনও প্রতিক্রিয়া না পেয়ে প্রচণ্ড অভিমানে বারান্দায় এসে একটা কাঠি দিয়ে বারান্দা ও সিঁড়ির কোণার মাটিটাকে খোঁচাচ্ছি, ,তখনই ঘটল আশ্চর্য ঘটনাটা-- মাটির ভেতর থেকে একের পর এক কতগুলো ছোটো ছোটো ব্যাঙ বেরিয়ে এসেই ফুলতে শুরু করল। ফুলে যাচ্ছে তো ফুলেই যাচ্ছে! একেবারে যেন টসটসে স্বচ্ছ গোল ছোট ছোট বেলুন হয়ে গেল।  এক অদ্ভুত জিনিস আবিষ্কার করে বিস্মিত হতবাক আমি দৌড়ে ঘরে ঢুকে জোর করে বাবাকে ঘুম থেকে তুলে এনে দেখাতেই বাবা দেখলাম তেমন আশ্চর্য না হয়ে হেসে ওটার নাম ভায়া ব্যাঙ না কি যেন একটা বললেন ঠিক মনে নেই তবে কয়েকদিন আমি যেন  ঘোরের মধ্যে ছিলাম। আবার দেখার আশায় মাঝে মাঝেই সিঁড়ি কোণার মাটি খুঁড়েও জীবনে আর কোনোদিন কোথাও তাদের দেখা পাইনি। ওমা! ঐযে পুঁচকে আমি নতুন জামা, মায়ের বানানো ফুলের মালা, কপালে চন্দনের টিপ পরে খুশিতে লাফাতে লাফাতে প্রিয়বন্ধু পাপিয়াকে বাড়িতে ডেকে এনে জোর করে নিজের হাতে বড় একটা হাঁড়িতে বানিয়ে রাখা পায়েস দিতে গিয়ে সম্পুর্নটা ওর জামায় ফেলে দিয়ে কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছি! মা ওর জামাটা মুছতে মুছতে বলছেন, "কথা না শুনলে কি হয় দেখলি তো? যা সব বন্ধুদের ডেকে নিয়ে আয় সবাই একসাথে বসে খাবি।" তারপর সবাইকে ডেকে এনে সহজ সরল লুচি পায়েসের অনাড়ম্বর জন্মদিনের অনাবিল আনন্দে ডুবে গেলাম।

         আমার ছোট্ট শিশুমন তখন বিস্মিত চোখে সুন্দর পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ নিত্য নতুন আবিষ্কার করে চলেছে--- আর তার প্রথম পটভূমি সেই প্রিয় রাস্তাটি। এই রাস্তাতেই তো আমার বিবেকানন্দ দর্শন হয়েছিল!! একদিন সকালে বারান্দায় বসে চাবি দেওয়া সবুজ কামানটা নিয়ে খেলছি--  এমন সময়ে রাস্তায় তাকাতেই আমি স্তম্ভিত! একি দেখছি আমি? একেবারে বিবেকানন্দের অনুকরণে গেরুয়া পোশাক পরা একজন দূর থেকে হেঁটে আসছে, ঠিক একইরকম মাথার পাগড়ি, কোমরে একখণ্ড কাপড় বাঁধা, পায়ে খড়ম, হাতদুটো বুকে ভাঁজ করা, মৃদু হাসি মুখে দীপ্ত ভঙ্গিতে ধীর পদক্ষেপে হেঁটে আসছে! আমার সারা শরীরে তখন আনন্দ আর এক অদ্ভুত অনুভূতির শিহরণ! ঘরের ছবির বিবেকানন্দের মতই তো অবিকল মুখ। এ কি করে সম্ভব? ঐ বয়সে বাবার গল্পের সুবাদে আমি জানতাম যে তিনি অনেক আগের মহাপুরুষ এবং এখন বেঁচে নেই। কতক্ষণ স্থানু হয়ে বসে ছিলাম জানিনা, দেখি বিবেকানন্দ আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। কি যে করব বুঝে উঠতে না পেরে এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে রান্নায় ব্যস্ত মাকে সব বলে, দেখার জন্য টেনে নিয়ে যখন বাইরে এলাম তখন তিনি আর নেই। দৌড়ে গেটের কাছে গিয়ে রাস্তার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে তাকিয়ে কোত্থাও তাকে দেখতে পেলেম না । এভাবে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় আমার আরও দৃঢ় প্রত্যয় হল যে আমি বিবেকানন্দকেই দেখেছি।  "পাগল মেয়ে কি দেখতে কি দেখেছিস " বলে মা তো রান্নাঘরে ঢুকে গেল কিন্তু অনেক বড় বয়স অবধি আমার এই বিশ্বাস অটুট থাকল যে আমি বিবেকানন্দ কেই দেখেছি। কোনও দিনও যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করিনি। মাত্র কয়েক বছর আগে এক দুপুরে ঐ ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে এই সহজ যুক্তি দিয়ে তার সমাধান করলাম যে উনি নিশ্চই একই রকম পোশাকে সজ্জিত ও প্রায় একই মুখাবয়বের কোনও সন্ন্যাসী ছিলেন । মাকে ডেকে আনার সময়টুকুর মধ্যেই হয়ত উনি কোনও বাড়িতে ঢুকে গিয়েছিলেন তাই তাঁকে আর দেখতে পাইনি। ঐ সরল বিশ্বাসটায় চির ধরায় মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছিল।
            অঘটনও কিছু ঘটে ছিল। ঐ রাস্ততেই এক দাদার সাথে সাইকেলে দোকান যাওয়ার সময় স্পোকে পা ঢুকে গিয়ে এতটা আঘাত পেয়েছিলাম যে দু তিনদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। সেই রাস্তারই ড্রেনে পড়ে গিয়ে গুটিগুটি পায়ে কেবল হাঁটতে শেখা ভাইয়ের কোনও ক্রমে চোখটা বেঁচে গিয়ে কপালে কাচ ঢুকে গিয়েছিল।

       এখনও চোখে ভাসছে,  মায়ের থেকে দশ পয়সা নিয়ে লম্বা রাস্তা ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে কানু কাকুর দোকানে যাচ্ছি হজমি কিনতে , আসল উদ্দেশ্য ওর সাথে পাওয়া প্লাস্টিকের ঝকঝকে রঙিন সব ঠাকুরের ফটো সংগ্রহ করা। রোজ  একের পর এক ফটো সংগ্রহ করছি আর নিজেকে প্রচুর বৈভবশালী মনে করছি। তখন তো রাস্তায় একটা দুটো সাইকেল ও রিক্সা ছাড়া কোনও গাড়িই থাকত না। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় জেলা স্কুলের গেটে মাঝেমাঝে জলপাই রঙের পোশাক পরা সি.আর পি এফ আর্মিরা দাঁড়িয়ে থাকত। কি কারনে যেন ওরা তখন ঐ স্কুলেই থাকত। আমাকে দেখলেই ওদের একজন ডাকত, "খোঁকি খোঁকি ইধর আও।" প্রথম প্রথম ভয় পেলেও যখন দেখলাম উল্টো দিকের বাড়ির আমার মত ছোট্ট মেয়েটাও ওখানে যায় আর ওর বাবা  বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে তখন আমিও যেতাম। হিন্দী তে আমার নাম, বাবার নাম, কি করেন জিজ্ঞেস করে যখন জানল বাবা ঐ স্কুলেরই শিক্ষক তখন আরও বেশি ভালবাসত। কত কথা বলত হিন্দিতে, বেশিটাই বুঝতাম না। গান করতে বললে, "চল চল চল মেরে সাথী ও মেরে হাতি---" দু লাইন গেয়ে দিলে ওরা যে কি খুশি হত। কিন্তু এই নির্মল খুশিতে বাদ সাধল বাড়িতে নতুন  নিযুক্ত হওয়া এক কাজের মেয়ে। একদিন ওর সাথে ঐ রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় আর্মি কাকুটা ডাকলে ও কিছুতেই আমাকে যেতে দিলনা। ওরা দেখলাম ম্লান মুখে তাকিয়ে আছে। এরপর একদিন সেই আর্মি কাকু আমাদের বাড়িতে এসে বাবার সাথে সামনের ঘরে কি সব কথাবার্তা বলল, আর বাবা আমাকে ডেকে বলল যে আমি কেন ওর ডাকে সারা দেইনি, ওরা অনেক দিন হল বাড়ি ছেড়ে এখানে আছে, বাড়িতে ফেলে আসা ছোট্ট মেয়ের কথা ভেবেই আমাকে স্নেহ করে। আমি কারণটা বলেছিলাম। এরপর ঐ রাস্তা দিয়ে গেলে ওরা আর আমাকে ডাকতনা, দূর থেকেই হাসত। আমার খুব কান্না পেত। একেবারেই ছোট আমি জীবনের জটিলতার সাথে যে তখনও অপরিচিত ছিলাম। বড় হয়ে কাবুলিওয়ালা মিনির গল্পটা পড়ে অবাক হয়ে ভাবি এতো অনেকটা আমার জীবনেরই গল্প!

        এভাবেই একদিন জলপাইগুড়িকে ছেড়ে যাওয়ার দিন এসে গেল। ঐ তো বাড়ির সামনে বড় ট্রাকটা এসে দাঁড়িয়েছে।ঘরের সমস্ত মালপত্র একে একে তোলা হল তাতে, তারপর আমিও এক বুক কষ্ট নিয়ে বাবা মায়ের সাথে চড়ে বসলাম মটরগাড়িতে। আসলে জীবনটাও তো একটা গাড়ি। কখনও টানা মসৃণ ভাবে এগিয়ে যাওয়া তো কখনও ব্রেক কষে ঝাঁকুনি  খাওয়া, আর যেতে যেতে দুপাশের জানলায় পৃথিবীর বিচিত্রতা অবলোকন করা এবং তার জন্য চাই কোনও না কোনও রাস্তা।

      গাড়ি চলতে শুরু করল---- দূরে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে ঐ রাস্তার পাশে মালা দিদির তৈরি করা ছাদনা তলা, আমার মেয়ে পুতুলের সাথে যেখানে নন র ছেলে পুতুলের বিয়ে হয়েছিল কালই। ক্ষেতের পাকা ধানগুলোও হেলেদুলে বিদায় জানাতে জানাতে অদৃশ্য হয়ে গেল, মিলিয়ে গেল সহজ সরল স্নিগ্ধ মায়া মাখানো সেই রাস্তাটি। এগিয়ে চললাম জীবনের আর এক অধ্যায়ের দিকে-- যার পটভূমি আর এক রাস্তা।


 

`চেনা পথেই  বারবার...` 


সেবকের হাতছানি 
অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী 

প্রাত্যহিকতার একঘেয়েমি কাটাতে ভ্রমণপিপাসু মন নতুন নতুন পথের খোঁজে উৎসুক হয়ে বারেবারে ঘরছাড়া করে কত মানুষকে তার ইয়ত্তা নেই। চিকিৎসা, জীবিকা,পড়াশোনার কারণে চেনা গন্ডী ছেড়ে পাড়ি দিতে হয় কতশত মাইল, স্পর্শ করতে হয় অজানা কত পথকে। এছাড়াও আজকের দিনে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর কোনো এক সুদূর প্রান্তে উত্তরসূরীদের স্থায়ী বসবাসের কারণে সমূলে উৎপাটিত হয় বাবা - মায়েদের নিজেদের পথের ঠিকানা।এক জীবনে কত পথকে যে আমরা প্রত্যক্ষ করি,মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে আঁচল ভরে তার সুমধুর স্মৃতির ফুলগুলিকে জড়িয়ে নিই আবার নতুন নতুন পথের দেখাশোনায় পুরোনো যা কিছু ধূসরতার ধূপছায়ায় হারিয়েও যায় হয়তো বা,কিছু চেনা পথ অচেনা হয় বিস্মৃতির অন্তরালে। তবুও মনের কোনো এক নিবিড় কোণে বিজয়ীর হাসি হাসে সেই সোনাঝরা টুকরো টুকরো মুহূর্তেরা যারা সাক্ষী থাকে সেইসব নতুন দেখার, নতুন আলাপের, নতুন পথ প্রণয়ের মায়াবী আলেখ্যের।বিনিসুতোর গ্রন্থিতে অমলিন থাকে পথ ও পথিকের সেই পথচাওয়া ও পথচলা।
                           অপ্রত্যাশিত কোনো দেখা,সে যদি মনোমুগ্ধকর হয় তবে ছক কষে ঘুরতে যাবার আনন্দের চাইতেও তা কয়েকগুণ বেশি আহ্লাদ জোগায় বলাই বাহুল্য। হতে পারে সে দেখা নেহাতই হাতের কাছেই কোথাও। অন্য জায়গায় যাবার পথে সে পথ দিয়ে আগেও বেশ কয়েকবার পার হয়েও তাকে কাছ থেকে সেভাবে প্রত্যক্ষ করা হয়নি,হয়তো বা নির্ধারিত ভ্রমণের জায়গাগুলি নিয়ে ঘিরে থাকা রোমাঞ্চ,আগ্রহ এবং দ্রুত পৌঁছোনো বা ফেরার তাগিদে। 
                 তেমনই এক পথকে স্পর্শ করলাম মাত্র কিছুদিন আগেই শিলিগুড়ি হয়ে বীরপাড়া যাবার সময় যা সকলেরই প্রায় কমবেশি পরিচিত একটি পথ, সেবক। গাঢ় সবুজ বনানীকে দুপাশে রেখে এগোতে এগোতে একসময় পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ শুরু হতেই পাশে চলে এল তিস্তা তার সবটুকু রূপ লাবণ্য নিয়ে। এরপর পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলে যাওয়া মনকাড়া সেই রেলপথ আর তারপর ব্রিটিশ আমলের সেই ঐতিহ্য করোনেশন সেতু সমস্তটুকু আভিজাত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে।পাহাড়ঘেরা সে জনপদ যেন হাতছানি দিল যাত্রায় ক্ষণিকের বিরতি নিয়ে একটু দাঁড়িয়ে যেতে।মন বলল,  'চলো আলাপ করি।'
আকাশ ছুঁয়ে পাহাড় চূড়োর মাথা দিয়ে যেন ধোঁয়া ধোঁয়া এক আবেশ। নজরকাড়া সে দৃশ্যে‌ মোহিত হবেই মন।মেঘেরা দলে দলে সখ্য করে রোদেলা দিন আর ফুরফুরে বাতাসের সঙ্গে সন্ধি করে আকাশের বুক ছেড়ে অনেকটা নীচে তখন। নদীর টলমলে জলে আকাশের গাঢ় নীল, পাহাড়ের সবুজ,পাশ ঘেঁষে দিগন্তের ছায়াময়তা ও অদূরে রমনীয় পাহাড়ের অনির্বচনীয় সৌন্দর্য্য। কোনো এক নামজাদা শিল্পীর হাতে আঁকা নিখুঁত এক ছবি যেন। পাকদন্ডী পথে অজস্র যানবাহনের চলাচল অনবরত জারি। সুন্দরকে দেখার চিরন্তন আকর্ষণে তবুও আমরা ও আমাদের মতো আরো কিছু মানুষ সেই পথেই তখন।অচানক গাড়ি এসে পড়লে ভরসা পাশঘেঁষা পাহাড়ের পিচ্ছিল পাদভূমি। সেতুটির একটি দিকের প্রবেশপথের দুদিকে দুটি নজরকাড়া বাঘের মূর্তি। পথের প্রান্তে অজস্র বাঁদর নিজেদের খেয়ালখুশি মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে।আশমানী নীল আর পাহাড়িয়া সবুজের ঐক্যবদ্ধ ছন্দময়তার রূপে এবং তিস্তার ভরাট লাবণ্যে বর্ষার প্রকৃতি এখানে ভরা যৌবনা। সময় হাতে থাকলে শুধু অপরূপ পাহাড়ের সারি আর আশ্চর্য সুন্দর নীলাভ আকাশকে দেখেই কাটিয়ে দেওয়া যায় বহুক্ষণ।এমন দৃশ্যের কাছে এসে মৌনতা ভালো লাগে। হাতের কাছের প্রকৃতিও তো সেই শিক্ষাই দিয়ে যায়। প্রকৃতির নিজস্ব আওয়াজ গুলিকে পরখ করতে মন চায়।ছবি, ভিডিওতে ধরে রাখতে চাইলেও তো তা নিঃশব্দে করা যায়। কিন্তু কিছু দলবদ্ধ মানুষের উদ্দামতা,উন্মাদনা ও অবিরাম বলে চলায় খেই হারায় নিবিড় করে দেখা ও পাওয়ার মুহূর্তগুলি।পথের দুপ্রান্তে সামান্য ব্যবধানে দুটি ঝর্না দৃষ্টিসুখকে নিজেদের সেরাটুকু উপহার দেবে বলে যেন বদ্ধপরিকর। সেতুর নীচে ধাপকাটা নিম্নগামী পথ ও সবুজ জঙ্গলকে পাশে রেখে ও ওপরের নির্মল আকাশকে সাক্ষী রেখে নিজস্ব ভাষায় কথা বলে ও গান গেয়ে বয়ে চলেছে একটি ঝর্ণা নিজস্ব আবেগে।আর একটি যেন উত্তাল এক প্রবাহ। নিজের অস্তিত্বের ঘোষণা করছে সে চরাচরকে সচেতন করে। উৎসের সুদূর এক ঠিকানা থেকে বেগবতি এক অবিরাম ধারাপ্রপাত হয়ে নয়ন জুড়োনোর দায়ভার নিয়েছে সে যেন। পাহাড়ের রোমশ বুকজুড়ে আদর চুঁইয়ে সরব হয়েছে তার ভালোবাসার বান। উচ্ছল এক পাহাড়ি কন্যা যেন ঝর্ণার রূপ ধরে ধ্যানমগ্ন পাহাড়ের মৌনতায় কড়াঘাত করতে এসেছে, মান ভাঙাতে এসেছে তার। ঠিক কাছেই আর এক আনন্দ কুঠি। ঝর্নার অনতিদূরে সেতুর পিচ্ছিল নোনাধরা দেওয়াল ঘেঁষে পাঁকে পদ্মফুলের মতোই পাঁপড়ি মেলেছে অজস্র প্রজাপতি।দেখে অবাক হতে হয় তারা সবাই রঙে ও চেহারায় অবিকল একই দেখতে। পাখায় তাদের অফুরন্ত প্রাণপ্রাচুর্য। পাশের ওই প্রাণবন্ত বন্ধু ঝর্ণা   প্রজাপতির দলকে প্রাণময়তার পাঠ দেয় নিরালা অবকাশে সুনিশ্চিত। রঙিন পাখায় পাখায় প্রজাপতিরা লেখে জীবনের জয়গান। মন্ত্রমুগ্ধ মন বলে, 'আবার দেখা হবে।' সেবকের পথ ছুঁয়ে যাবতীয় দেখাগুলি অপার আনন্দ হয়ে ঠাঁই নেয় মনের মণিকোঠায়।
                                  অথচ প্রাপ্তির ঘরে এর কানাকড়িও জুটবে এমন কোনোভাবেই নির্ধারিত ছিল না সে দিনটির তালিকায়। আমার মায়ের বাড়াবাড়ি রকমের অসুস্থতার কারণে তার আগে বেশ কিছুদিন ধরে সারাদিনের সমস্ত পথ মায়ের পথে গিয়েই মিশছিল শুধু উদ্বেগে,কর্তব্যে আর ফিরে দেখা স্মৃতির সাম্পানে। বহুদিন ধরে শয্যাশায়ী মাকে নিয়ে সবরকমের মানসিক প্রস্তুতি থাকলেও পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মন তো চরম সেই পথের দিকে চেয়ে কিছুতেই তাকে মেনে নিতে চায়না।খবর পেয়ে কান্নাকাটি করতে করতে অনেক দূরপথ পার হয়ে নিজের চাকরিস্থল থেকে ছুটে এসেছিল আমার মেয়ে। মা আগের তুলনায় অনেকটাই ভালো আছেন দেখে শিলিগুড়িতে এক নিকট আত্মীয়ের শ্রাদ্ধের কাজে যোগদান করে মেয়ের ইচ্ছে অনুযায়ী সেখান থেকেই ওর ঠাকুমাকে দেখতে বীরপাড়ার পথে রওনা দিয়েছিলাম আমরা। এর মাঝে প্রকৃতির এই মনকাড়া মাধুর্য্য অনেকটাই প্রলেপ হয়েছিল আগামীর পথচলার। সেদিনের সেই সেবককে দেখা অপ্রত্যাশিত ছিল বলেই হয়তো সেই পথ আরো বেশি করে মন ছুঁয়ে গিয়েছিল তার উজাড় করা সুন্দরের পসরা নিয়ে। মনের কষ্ট লাঘব হয়েছিল কিছুটা প্রকৃতির এই অনিন্দ্যসুন্দর নিরাময়ের আয়োজনে।
                    তবুও ছুঁয়ে আসা হলোনা সবটুকু। সেবকের অধীশ্বরী আরাধ্য দেবী মা সেবকেশ্বরীর কাছে পৌঁছোনো হলোনা। অধরা ইচ্ছেটুকুই হয়তো বা ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে নিয়ে যাবে আবার কখনো সেবকের পথে।অন্য কোনো এক ঋতুতে অন্যভাবে প্রত্যক্ষ করা হবে সেই একই পথকে তার বৈচিত্র্যের আবেশ নিয়ে।অল্পে খুশি চাওয়া পাওয়ার পথে এভাবেই জুড়ে যাবে রং বেরঙের আলো আর খুশির পালকগুলি।


 


`হৃদয়ের বকুল বিছানো সেইসব পথে.....`


এ পথের অর্ধেকটা গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ

রাজর্ষি দত্ত

একজন আগাগোড়া পথভ্রষ্ট মানুষের পথের কথা বলা দাবীর মধ্যে পড়ে নাতবে পথ চাওয়ার আনন্দেপথহারা তুমি পথিকঅনেক প্যাঁচাল পারতে পারে।অতএব পথে নেমেই পথ হারানো যাক ! তাই বলে যত ‘পথ’ আছে-তত ‘মত’ চালালে কিন্তু কেউ শুনবে না!       

            বিগত অর্ধ শতাব্দীর কাছাকাছি যেসব পথে বেড়িয়েছি তার কিয়দংশও আজ সেইভাবে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ! অবশ্যই সেসব পথ জলপথ, ট্রেন বা বিমানপথ নয়পায়ে হাঁটা, সাইকেল, গরুর গাড়ি, রিকশা, ভ্যান, বাইক কিংবা মোটরগাড়িতে অতিক্রম করা। সেগুলির মধ্যে একটি নয়একাধিক পথ আমার মনকে ছুঁয়ে গেছে (একথা না বললে সত্যের অপলাপ !)। হৃদয়ের বকুল বিছানো সেইসব পথে আবার ফিরে যেতে চায় মন, কিন্তু মনই দেয় বাঁধা। বলে,কি হবে গিয়ে? যা ভেতরে আছে তাই থাক না! বাদলবেলায় এত বদল দেখে বিসন্নকুমার না হয়ে ঘরে বসে জাবড় কাটাই শ্রেয় নয় কি? টাটকা স্মৃতিকে বাসি করার এই অ-কামটি কি না করলেই নয়?         

     তবে ভয়ে বলবো, না নির্ভয়ে–আমার একটি প্রিয় রাস্তা আছে (জাতীয় সড়কের তকমা লাগানো)। আজও তার অনেকখানি খুঁজে পাই। সেবকের রেলসেতু থেকে করোনেশন ব্রিজ পার হয়ে মংপং অবধি পাহাড়ি পথটি। সবাই জানেন এবং গেছেনও সেখানে। আমার খুব ছোটবেলায়(বয়স মনে নেই)মায়ের পিসির বাড়ি মালবাজারে বেড়াতে আসতাম শিলিগুড়ি থেকে বাসে চেপে। তিস্তার সবুজ জল, পাহাড়ি ঝর্না, খাড়া নেমে যাওয়া খাদের গা ছমছমে রোমাঞ্চ, উল্টোদিকে গ্রানাইটের শক্ত প্রাচীর বেয়ে নেমে আসা অগুন্তি নাম-না-জানা লতা-পাতা, ফার্ন আর দৃষ্টিকে আরাম দেওয়া অসংখ্য প্রজাতির গাছ। পাখিদের কলতানের সাথে শোনা যায় বর্ষায় নদীর ডাক আর থেকে থেকে ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা। এককথায় বায়োডাইভার্সিটির সুন্দর প্যাকেজ। তখনও ড্যাং-গ্যাং-ক্যাং (দার্জিলিং-গ্যাংটক-কালিম্পং) যাওয়া হয়নি, তাই পাহাড়ি পথের অমোঘ আকর্ষণ বলতে ছিল এই মিনিট কুড়ির মিষ্টি জার্নিটা। টানা বৃষ্টির পর নামে ধ্বস, তখন চাঙড় চাঙর কাদামাটির সাথে গড়িয়ে পড়ে অজস্র নুড়িপাথর। বন্ধ রাস্তার পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে প্রত্যাশী বাঁদরকুল (ওরা এখানে মানুষের স্তরে উন্নীত-খাদ্যাভাস ও পরজীবীয়তায়)। সেই থেকে অনেকবার আসা যাওয়া এই পথে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কোন সময়ই হয়তো বাকি নেই। সে কাকভোর হোক কিংবা মাঝরাত! নানা সময়ে এর নানা রূপ দেখে মিলিয়ে যায়নি মুগ্ধতার রেশ! তাই আজও বালক বয়সের মত একচুলও কমেনি এর আকর্ষণ।    

     সেবকের দ্বিতীয় সেতু নিয়ে চলছে তোড়জোর। যদি কোনদিন সে কাজ সম্পন্ন হয়, তবে এ রাস্তার গুরুত্ব কমে গিয়ে খুব নির্জন হয়ে যাবে। আমার অন্তরের বাসনাও তাই। তখন ফ্লোরা আর ফনা আরও নিবিড় উল্লাসে আঁকড়ে ধরুক পথটিকে। রাজপথ পরিবর্তিত হোক সংকীর্ণ গলিতে। মহানন্দা অভয়ারণ্য থেকে দু-একটা কেঁদো বাঘ মাঝেমধ্যে তাদের ডোরাকাটা হলকা দেখিয়ে যাক। নেওরা ভ্যালি ফরেস্টের ভালুক নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকুক রাস্তার পাশে। পাখিদের কিচিরমিচিরে কানে লেগে যাক তালা। প্রিয় পথের বিবর্তন হোক...উল্টোদিকে!

     কল্পনার রংপেন্সিলগুলি এবার একটু দূরে সরিয়ে রাখি...  

     এখন শুধু স্বপ্ন দেখি সেই সব সম্পর্কের গলিগুলির। সম্পর্কের বাঁধন  ছিঁড়ে যায় বলে কত প্রিয় পথে মানুষ আর দ্বিতীয়বার পা ফেলে না! কালের আবর্তনে 'তোমার পথ', 'আমার পথের' থেকে যেমন বেঁকেও যায়, তেমন একটা বয়সে এসে 'সাথিহারার গোপন ব্যাথা, বলবো কারে সেজন কোথা' এই মানসিক আবর্তেও হাবুডুবু খেতে হয়।

তাই লিজার টাইমে "Most of my best memories come from some old dirt road"(কে বলেছিল জানিনা বাবা!) –এর চর্বিতচর্বণ আর কাজের টাইমে যুগের/পেটের দাবিতে লিজার্ডের মত 'ধরা যাক দু-একটা পোকা এবার' হয়ে উঠুক আমাদের জীবনের ক্ষণিকের যাপন।                               

 

 

 

 

 

 



 

`শান্তিনিকেতনের পথে....` 


আন্তরিক পথ
অলকানন্দা দে


উদ্বেগ উৎকন্ঠা দুঃশ্চিন্তার জাল কেটে বের হবার জন্যে একটি পথই তো খোঁজে মন। অশান্তির ঘাম ঘরে বসে না ঝরিয়ে বরং সেই পথে যাই যে পথ আমাকে নির্ভুল আশার তীরে পৌঁছে দেয়। তার ডাকেই সাড়া দেওয়া অভ্যেস একরকম। সুস্থির হয়ে যা অনুভব করি, এই অশান্ত শহরটার বিচিত্র শব্দের জ্বালায় জ্বলে ছত্রভঙ্গ শান্তিরা একত্র হতে চায় কবিগুরুর ঠিকানায়। যে নামের আপাদমস্তক শান্তিতে মোড়া সেই শান্তিনিকেতন অভিমুখী পথ আমার যাবতীয় শুভ’র ভিড়ে ঠাসা একথা বিলক্ষণ বুঝি। অনন্যোপায় হয়ে ছুটি, একরকম পালিয়ে যাই সেইদিকে। পেছনে মিলিয়ে যায় হাইরাইজ ফ্লাইওভারের গোলকধাঁধা। পথের দুপাশের আনকোরা সবুজের প্রশান্তি মনে করায় পুরোনো স্মৃতিদের।একনাগাড়ে ভাসে ছবি! এই পাতার ছাউনি দেওয়া পথটা দায়িত্ব নেয় সেই পুরোনোর। বইয়ের পাতা ওল্টানোর মতো কী নরম সেই ফিরে দেখা যা আপ্যায়িত হয় বোধের কাছে। ঝকঝকে ধান-রঙা রোদ্দুরে হাইওয়ে দিয়ে চলতে চলতে দূরে দূরে ছড়ানো-ছিটানো একচালা-দোচালা ঘরবাড়ি স্বপ্নের মতো সাজানো মনে হয়। কৃষিকাজে ব্যস্ত কৃষক দিব্যি একমনে সাজিয়ে চলেছে তার শস্যের সংসার। কুমড়ো ঝিঙে লাউয়ের মাচায় উপচে উঠেছে চেষ্টার ফসল। মনে মনে বলি তোমাদের আরও হোক। ফসলের হুলুস্থুলে ছু-মন্তর হয়ে যাবে এত পরিশ্রমের ক্লান্তি।

হাইওয়ে ধরে যেতে যেতে বর্ধমান শহরকে পাশ কাটিয়ে একটি রাস্তা ডান হাতে বাঁক নেয়। সম্পূর্ণ গ্রামের মধ্যে দিয়ে পৌঁছে দেয় শান্তিনিকেতন। কী যে অপূর্ব সেই পথের শোভা! যেন এক মায়ার মিছিল, চলছে তো চলছেই। সমান্তরালে বয়ে গেছে রেললাইন। দু একটি ট্রেনের হুইসিল বাজিয়ে ধানজমির বুক চিরে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে যাওয়া এক শব্দের সমারোহ। ট্রেনের ছন্দে বিপুল মাদকতা থাকে, আর থাকে ছুটে চলার আশ্বাস! প্রাপ্তির আর কিচ্ছু বাকি থাকে না যেন এত কিছুর পর। চোখভোলানো ক্লান্তিহরা হাজার হাজার দৃশ্যে জিরিয়ে নিচ্ছে মনটা। ওদিকে আকাশে আকাশে আসন্ন শরতের রটনা প্রশ্ন করতে ভালোবাসে “কি প্রস্তুতি নিচ্ছ বলো দেখি।” মেঘের কবল থেকে রেহাই পেলে যে রোদ্দুর ওঠে, ভালোবাসা আচমন সেরে নেয় তাতে। শুভার্থী তালসারি অনুরোধ করে, “একটা কবিতা লিখো না হয় আমাদের নিয়ে!” কাজ হয় সেইমতো। অনুভবে গেঁথে শব্দমালাদের কবিতাকে সাজাতে সাজাতে একসময় ভূমিষ্ঠ হয় সে মনের আঁতুড়ে। তালের হাওয়ায় রটে খুশির খবর। মেহনতের ক্যাঁচর ক্যাঁচর শব্দ তুলে একটি দুটি গরুরগাড়ি যায় কর্মব্যস্ততায়। ভুবন-ভাসানো চোখে দেখতে থাকি ডাগর মেঠো পথটার থইথই গরিমা। কি গান শুনব? ভাটিয়ালি নাকি রবীন্দ্র! জমে ওঠে মজলিশ বুঁদ হওয়া বোধের ঝিমার্ত পরগণায়।

একরাশ বন্ধুবৎসল উন্মাদনার আস্বাদ নিতে নিতে পথ একসময় উপনীত হয় মহামহীয়ান গাছে ঘেরা শান্তিনিকেতনে। বাতানুকুল আবহাওয়ায় আনন্দ সাঁতার কাটে তখন। একটি আন্তরিক পথ বিনম্রতার সাথে পৌঁছে দিল কাঙ্খিত গাছপালা পত্রপল্লবের সুখের কিনারে। সাক্ষী রইলো সে এই তৃপ্তির অতলে ডুব দিয়ে তুলে আনা সর্বৈব শান্তির কথকতার।




`কেডস ভিজেছিল পথে একদিন....`


স্মৃতির পথখানি 
জয়িতা সরকার 

শহরের অলিগলির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কিংবা ওই রাস্তাটা কোথায় শেষ হয়েছে তার হদিশ পেতে বাবা আর আমি নিয়ম করে বেড়িয়ে পড়তাম রোজ বিকেলে। সেই সুবাদে মাত্র তিন বছর বয়সেই কলেজ পাড়ার এ গলি, সে গলি থেকে তিস্তা উদ্যানের রাস্তা সবটাই ছিল মনের গণ্ডির মধ্যে। নতুন নতুন রাস্তা চেনা আমার কাছে কেমন একটা নেশার মত, ছেলেবেলার সেই অভ্যেস আজও বয়ে চলেছি। আসলে রাস্তা তো শুধু গন্তব্যে পৌঁছে দেয় না, প্রতি পদক্ষেপে কতশত গল্প তৈরি হয় জানা-অজানা পথ ধরে। কত ভাঙ্গাগড়া স্মৃতির চিহ্ন ছড়িয়ে থাকে পথের দু-ধারে। পাল্টে যাওয়া সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকে ওই রাস্তা। নতুন পথিকের প্রথম আলাপের আলতো ছোঁয়া বেঁচে থাকে ওই পিচ গলা পথে। রাস্তার সঙ্গে আমার সখ্যতা বরাবরের। বাবার সঙ্গে সাইকেলে চেপে জল শহরের নানা অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানো ছোট্ট মনে যে রাস্তা প্রথম দাগ কাটে, তা ছিল আমার প্রথম স্কুলের পথ খানি। তবে প্রথম প্রিয় রাস্তার আসল নামটা ধরে তাকে সম্বোধন  করা হয়ে ওঠে না আজও, আমার কাছে ওটা শিশু নিকেতনের গলি। 

স্মৃতির সরণী বেয়ে যা খুঁজে পেলাম তাতে স্কুল বাড়ির আকার আকৃতির খুব বেশি পরিবর্তন না হলেও রাস্তার বদল হয়েছে খানিকটা,  আশেপাশে নতুন বিল্ডিং মাথা উঁচিয়ে আছে এখন। মনের সিন্দুকে যত্নে রাখা রাস্তার পাশে চালতা গাছটা আছে কিনা জানা নেই, আসলে ওই পথে পা বাড়ায়নি অনেকদিন। ছুটির পরেই বরফ হাতে মা-কে পেছনে ফেলে ছুটে গিয়ে চালতা খোঁজা ছিল ওই পথের মূল আকর্ষণ। ছোট্ট গলি দিয়ে বেড়িয়ে স্টেট ব্যাঙ্কের সামনে দিয়ে আসতেই চোখে পড়ত শহরের নামজাদা স্কুলের প্রধান গেট।  লাল সাদা বড় বাড়ি পেড়িয়ে যেতে যেতে মন বলত, ভালবাসার এই পথের গণ্ডি বৃহত্তর আর চিরস্থায়ী করতে হলে গেটের ওপারে পৌঁছতে হবে। যদিও শিশু মন তখনও বোঝেনি চিরস্থায়ী বলে আদতে কিছু হয়না।  

রাস্তাকে ভালোবেসে জীবনের বারো বছর ওই পথকেই বেছে নেওয়ার সৌভাগ্য কড়া নেড়েছিল ১৯৯৩ এ। শিশু নিকেতনের গলি ছাড়িয়ে উঠে এলাম ক্লাব রোডের বড় বাড়িটিতে। রাস্তা হল রোজকার গল্পের লেখক। সাদা ফ্রক থেকে শাড়ি, ভাল রেজাল্ট থেকে কেমিষ্ট্রি গুলিয়ে যাওয়া অনুঘটকের অন্যনাম। পেন ফ্রেন্ড-র চিঠি থেকে ভালোলাগার প্রথম অনুভূতি। ফুচকা-আলুকাবলি থেকে কুল মাখা সবটা মিলিয়ে শহরের ওই রাস্তাটা জীবনের প্রতি বাঁকে নতুন করে ভাল থাকার মন্ত্র শিখিয়েছিল। মন খারাপের বর্ষায় কিংবা শরতের প্রথম সাদা মেঘে আজও বেঁচে থাকার রসদ ক্লাব রোডের পড়ন্ত বিকেলে একঝাঁক  কিশোরীবেলার হট্টগোল। 

বাড়ি থেকে স্কুল যাওয়ার পথটা যেকোনো  এক্সপ্রেসওয়ে কে হারিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আজও।  পাহাড়ের পাকদণ্ডীর  প্রতিবাঁকে নতুন কিছু দেখা কিংবা জঙ্গলের শিহরণ জাগানো রোমাঞ্চকর পথ যতই সুন্দর হোক, জীবনের স্মৃতিমধুর এই পথ তাদের হারিয়ে দেবে অনায়াসেই। আসলে বৃহত্তর পৃথিবীর সব পথে পা বাড়াতেই শিখিয়েছিল ক্লাব রোড। খিলখিলিয়ে হেসে ওঠা কিংবা মন খারাপে চোখের জলের সাক্ষ্য যে বয়ে নিয়ে চলেছে তার প্রতি এমন ভালবাসা থাকাটাই স্বাভাবিক। আসলে অনুভূতি, আবেগ , আবদার আর একটা দীর্ঘ গল্পের রূপকার হল জল শহরের ক্লাব রোড। 

রাস্তার এপাড় থেকে ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুর জন্য উদ্দেশ্যহীন চিৎকার, বর্ষায় সামান্য জল জমার হদিশ পেলেই রিকশা কাকুর ওপর চোটপাট দেখিয়ে কেডস ভেজানোর নির্ভেজাল আনন্দগুলো আটকে আছে হেড পোস্ট অফিস,এফ ডি আই স্কুল কিংবা জিলা পরিষদের এধার ওধারে। স্কুল অফিস ঘেরা এই রাস্তাটা ছিল দিনের বেলার সবচেয়ে প্রাণচঞ্চল জায়গা। রাত বাড়তেই তার রূপ পাল্টে যেত অনেকটাই। দিনের কলতান তখন নিস্তব্ধ নিশ্চুপ। নতুন ভোর, স্কুলমুখী কচিকাঁচা আর ব্যস্তবাগীশ অফিস কর্তাদের জন্য অপেক্ষা করত সেই চৌরাস্তা। প্রথম পরিচয়ের থেকে অনেকটা ভোলবদল করেছে এই পথ। আশেপাশের বাড়িগুলিতে আধুনিকতার থাবায় ফ্ল্যাটেদের ছড়াছড়ি। রাস্তাও  যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেজেছে লাল-সবুজ আলোকসজ্জায়। প্রথম পরিচয়ের সময় এসব আলোর সম্মতির প্রয়োজন ছিল না। আসলে হয়ত আমাদের মত রাস্তাও তখন ছোট ছিল। 

চেনা রাস্তার প্রথম পরিবর্তন চোখে পড়েছিল পোস্ট অফিসের সামনের  চৌরাস্তায় যেদিন রানার মূর্তি বসানো হল। তারপরই স্কুলে ঢোকার সামনেই বসল  গান্ধীজির মূর্তি। পরিচিত পথগুলো নিজেদের সাজিয়ে গুছিয়ে পরিবর্তনের পথে পা বাড়াল। হঠাৎ একদিন পাল্টে গেল জিলা পরিষদের পুরনো ভবনের আদল, ঝা চকচকে হয়ে উঠল রাম ঘোষের মিস্টির দোকানটাও। সময়ের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতেই পথ-পথচারী আর চারপাশটা পাল্টে গেলেও স্মৃতিরেখায় আজও উজ্জ্বল ক্লাব রোড ও তার সহযোগীদের উপস্থিতি।