Wednesday, July 2, 2025


 


স্টেশনের আগের স্টেশন 

রুদ্র 

হীরকের চোখে ঘুম নেই আজ রাতেও। ফুটপাতে ত্রিপলের নীচে বৃষ্টি পড়ে টুপটাপ, সেই বৃষ্টির ছাঁটে তার খাতার কাগজগুলো কিছুটা ভিজে যাচ্ছে। তবু সে পড়ে—নিউটনের গতির সূত্র, মানুষের হৃৎপিণ্ডের গঠন, কিংবা আর্কিমিডিসের সূত্র—সব মুখস্থ। না, মুখস্থ নয়, সে বুঝে পড়ে।

তার মা বিড়ি বাঁধেন সকাল থেকে সন্ধে, চোখ জ্বলে, হাত ফেটে যায়। বাবা বিছানায় পড়ে আছেন বছর চারেক—বুকের মধ্যে যেন জমে আছে হাজারটা অসুখ। হীরক সব জানে, তবু কাউকে বলে না কিছু। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, যার সিঁথিতে ফুটো, তবু তাতে আছে অজস্র জেদ।

বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষক শিবেন্দুবাবুই প্রথম বলেছিলেন, “তুই ইঞ্জিনিয়ার হতে পারবি হীরক। শুধু থেমে যাস না।” সেই কথা যেন বুকে পাথরের মতো গেঁথে গেছে ছেলেটার। সন্ধেয় স্কুল ছুটির পর যখন বন্ধুরা গরম সিঙ্গাড়া আর ফুচকা খায়, হীরক রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে পুরোনো বইয়ের দোকান দেখে। না কিনে, না ছুঁয়ে, শুধু পড়ে।

একদিন শিক্ষক তাকে পুরোনো একটা সায়েন্স ম্যাগাজিন এনে দিলেন। ভেতরে ছিল একটা নিবন্ধ—“চাঁদে ভারতের যাত্রা। হীরকের চোখ চকচক করে উঠেছিল সেদিন।

দিন যায়, মাস যায়। হীরক শুধু এগোয়। মাধ্যমিক আসে, হীরক সারা জেলার মধ্যে প্রথম হয়। খবরের কাগজে ছাপা হয় তার ছবি—ত্রিপলের ঘরের ছেলে, যিনি বিজ্ঞান ভালোবাসেন।

সেদিন সন্ধ্যায়, রাস্তার পাশের দোকানে এক কাপ চা খেতে খেতে শিবেন্দুবাবু বলে ওঠেন,
“এই তো, স্টেশনের আগের স্টেশন পার হলি।”

হীরক হেসে বলে, “স্টেশন অনেক দূর স্যার, কিন্তু আমি তো জানি—এই ট্রেনটা থামে না।” 


 

 বন্ধু

লীনা রায় 


রাত আটটায় ডিনার। কাঁটায় কাঁটায় রাত দশটায় ঘুমোতে যায় অমিতেশ। দীর্ঘদিনের অভ্যেস। আজকাল ঘুমানোর আগে প্রতিদিন প্রমিস করেন মর্নিং ওয়াকে যাবার। কিন্তু ভোরে ঘুম ভেঙে গেলেও আলসেমি শরীরে ভর করে। অথচ রণিতা থাকাকালীন দুর্যোগ ছাড়া তার সকালের হাঁটা বাদ যায়নি। আজ দু' মাসের ওপর সকালটা তার বিছানাতেই কাটে। অপরাধবোধ হয়। এত অবহেলা শরীর সইবে তো! কিন্তু তারপরেও বালিশটাকে আরো জোরে আঁকড়ে বিছানাতেই পড়ে থাকে।

সেদিনও সকালে বিছানাতেই ছিল অমিতেশ। হঠাৎ একটা জান্তব শব্দ কানে এলো। গোঙানির মত, খুব বিচ্ছিরি। বাড়ির সামনের দিক থেকে আসছিল শব্দটা। কিছুক্ষন পর বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পরদিন, তার পরদিন সেই এক রকম শব্দ। আর এই শব্দটার জন্যই অমিতেশ সেদিন বিছানা ছেড়ে সামনের বারান্দায় আসে।

শেষ কবে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল ভুলে গেছে অমিতেশ। বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল। তার বাড়ির মুখোমুখি রাধাকৃষ্ণ আবাসন। আর সেই আবাসনের ডানদিকের তিনতলায় প্রীতম শাহুর ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটটি দীর্ঘদিন বন্ধ। ওখানে কেউ থাকত না। সেই ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে একটি বছর ষোলোর ছেলে পাখিদেই বিস্কুট দিচ্ছে। আর মুখ দিয়ে অদ্ভুত শব্দ করছে। ছেলেটি মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী। হাঁটা চলাতেও সমস্যা রয়েছে। ব্যালকনির রেলিংয়ে রাখা বিস্কুট পাখি ঠোঁটে করে তুলে নিলেই ও অদ্ভুত শব্দ করছে। শব্দটা আনন্দের বহিঃপ্রকাশ সেটা বুঝতে পারে।

ওকে অবাক যায় দেখছিল অমিতেশ। ছেলেটিকে দু' হাতে শক্ত করে ধরে আছে একজন পুরুষ। চোখে চোখ পড়তেই ভদ্রলোক একটু হাসলেন। অমিতেশ হেসে হাত নাড়ে। আর এভাবেই শুরু। অমিতেশ সকালে উঠেই বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। বাবা, ছেলের পাখিকে বিস্কুট খাওয়ানো দেখে। মাঝে মাঝে ছেলেটির মা এসে ওদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। সুন্দর মুখশ্রী, বড় বড় দুটো চোখ, ঘাড়ের কাছে আলতো করে ফেলে রাখা খোঁপা। ছেলেটির আনন্দ দেখে ওদের স্বামী স্ত্রীর মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অমিতেশও খুশি হয়। খুশি খুব ছোঁয়াচে। ওরা ঘরে ঢুকে যায়, কিন্তু অমিতেশ বসেই থাকে। রোদের তাত বাড়লে ঘরে ঢোকে।

বারান্দায় বসে বসে সবার ব্যস্ততা দেখে অমিতেশ। রণিতার অবর্তমানে তপুর হাতেই ওর সংসার। রান্না, ঘরের কাজ , বাজার, দোকান অব্দি। সেদিন জলখাবার খেয়ে খবরের কাগজ পড়ছিল অমিতেশ। সে সময় সেই অদ্ভুত শব্দটা শুনতে পায়। শব্দটা বেশ জোরালো। এক নাগাড়ে হয়েই চলেছে। বারান্দায় আসতেই চমকে ওঠে অমিতেশ। ছেলেটি আবাসনের গেটে দাঁড়িয়ে একভাবে চিৎকার করছে। ওর মা প্রাণপনে ওকে টানছে। ঘরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। অমিতেশ তাড়াতাড়ি গায়ে জামা গলিয়ে ওদের কাছে আসে। মায়ের কাছে জানতে পারে ছেলেটি বাইরে ঘুরতে যাবার জন্য বায়না করছে। কিন্তু ওর মা সাহস পাচ্ছে না।

অমিতেশের খুব মায়া হয়। ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলে - তোমার নাম কী?
ছেলেটি মাথা নাড়াতে থাকে একভাবে। ওর মা জবাব দেয় – আমরা ওকে রনি বলে ডাকি।
অমিতেশ এবার বলে - ঘুরতে যাবে রনি?
কথাটা শোনা মাত্র রনি জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাতে থাকে।
অমিতেশ রনির মাকে বলে- সামনেই তো পার্ক। ওকে নিয়ে গেলেই তো পারেন। সারাদিন ঘরে আটকে রাখা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। আমি আপনাদের সঙ্গে যাব। চলুন।

অমিতেশের গলার স্বরে হয়ত আদেশ ছিল। রনির মা গেট খুলে ওকে নিয়ে বাইরে আসে। গেট খুলতেই রনির সে কী আনন্দ। হাততালি দেবার চেষ্টা করছে, মাথা নাড়ছে। অমিতেশ রনির হাত ধরে।

পার্কে কিছুক্ষন কাটিয়ে রনিকে ওদের ঘরে পৌঁছে বাড়ি ফেরে অমিতেশ। রনির মায়ের কাছ থেকে জানতে পারে রনির অসুখের কথা। জেনেটিকে ডিসঅর্ডার। বাবা বেসরকারি অফিসে চাকরি করে। আগে অফিসের কাছেই থাকত। তাই রনিকে নিয়ে সকালে বের হতে অসুবিধে হত না। কিন্তু এখান থেকে অফিসের দূরত্ব অনেকটা। সেজন্য রনির বাইরে বেরোনো বন্ধ।

পরদিন অমিতেশ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। তৈরী হয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। রাধাকৃষ্ণ আবাসনের তিনতলার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে তখন রনি ওর বাবা মায়ের সঙ্গে। অমিতেশ খানিকটা গলা তুলে রনিকে ডাকে। বলে- আমার সঙ্গে পার্কে যাবে রনি? এসো…

খুব দুর্যোগ না হলে আজকাল অমিতেশের সকালের হাঁটা বাদ যায় না। সঙ্গী রনি। একজন অপরিণত কিশোর আর ষাটোর্ধ যুবকের মাতামতিতে সকালের ঝিমিয়ে থাকা পার্কেও ঝলমলে খুশি। আর হ্যাঁ, রনি কিন্তু অমিতেশকে বোন..দু..উ বলেই ডাকে।


 

কালিন্দিপুর
  অর্ণব ঘোষ

_খেজুরি দেবেন একটা।
_ সরি। শেষ বাস মিনিট পাঁচেক আগেই ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। আপনাকে ভোর অবধি অপেক্ষা করতে হবে।
বলেই মুখের ওপর কাউন্টার শাট ডাউন করল লোকটা।

বাইরে ঝম্ ঝম্ করে বৃষ্টি হচ্ছে। একটা কাক-পক্ষীও নেই ওয়েটিংরুমে। কুকুরগুলো মাঝেমধ্যেই ডেকে উঠছে বিচ্ছিরিভাবে। রঞ্জন হাতঘড়ির দিকে তাকাল। সাড়ে দশটা। খুব খিদে পেয়েছে ওর। দোকানপাটগুলোও সব বন্ধ। অগত্যা ক্লান্ত বিধস্ত শরীরটাকে একটু এলিয়ে দিল ও। তন্দ্রার ভাব আসছিল। কিন্তু তাতেও বাধ সাধল বেয়াদপ মশা।

_নাঃ। এভাবে সারারাত কাটানো যায় নাকি! কিছু একটা উপায় বার করতেই হবে। বৃষ্টিও দেখছি ছেড়ে এসেছে।

হঠাৎ মনে পড়ল কামিনী কাকার কথা। বাবার দুঃসম্পর্কের ভাই। বহুবছর অবশ্য যোগাযোগ নেই। তবু, এই দুর্দিনে যদি রাতটুকু আশ্রয় মেলে তাই বা কম কি! ছাতাটা ফোটাল রঞ্জন। ঝিরঝির বৃষ্টি এখনও হয়ে চলেছে।
_ বাড়িটা যেন কোন্ দিকে?
রঞ্জন মনে করার চেষ্টা করল। কৈশোরে বাবার সাথে এসেছিল একবার। কাকা একাই থাকেন, বিয়ে-থা করেননি।

গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে রঞ্জন হাঁটতে শুরু করেছে। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। প্রখর নিস্তব্ধতায় ছেদ টানছে শুধু ঝিঁঝির ডাক। অবশেষে একটা রঙচটা,মলীন, ঈষৎ ভাঙাচোরা বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল রঞ্জন।

 কামিনী কাকা..., কামিনী কাকা..., বাড়িতে আছো?
খাটো, শীর্ণকায় এক বৃদ্ধ দরজা খুললেন। তার চোখদুটো ঘোলাটে, মুখের ভাঁজ যেন অনেককালের সাক্ষ্য বহন করছে।
_ তোমায় তো ঠিক চিনতে পারলাম না।
_ আমি তারিণী ঘোষের ছোটছেলে, খেজুরি থাকি। কালিন্দিপুর এসেছিলাম একটু গবেষণার কাজে।
_ ও..! হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝেছি এবার। ভেতরে এসো বাবা।
_ বোসো। তা তোমার গবেষণা কী নিয়ে?
_ মৃত্যু, আত্মা, পরলোক। আপনি জানেন মৃত্যু আসলে কী?

_মৃত্যু আসলে ঘুমেরই পূর্ণরূপ। প্রতিদিনই আমাদের একপ্রকার মৃত্যু হয়। জেগে উঠতে পারলেই তা ঘুম, না পারলেই তা মৃত্যু। ঘুমের মধ্যে যেমন কোনো নিয়ন্ত্রন থাকেনা, মৃত্যুর ক্ষেত্রেও তা সমানভাবে সত্য। ঘুম সতেজ করে শরীরকে, আর মৃত্যু মনকে।
_ মন তাহলে কী?

_দেখো, মন বলে কোনো প্রাকৃত অঙ্গ নেই। এটা হৃৎপিন্ড নয় আবার মস্তিষ্কও নয়। মন আসলে মস্তিষ্কপ্রসূত এক চিন্তার-আধার।
_ আত্মার সাথে কি এর মিল আছে?

_ বলতে পারো। মারা যাবার পর এই চিন্তা-সমন্বিত আধারের মুক্তি ঘটে। ওটি তখন সর্ববৃহৎ আধারে মিলিত হয়, যেভাবে নদী মিলিত হয় সাগরে।

_ সর্ববৃহৎ আধারই কি তবে পরমাত্মা?

_ হবে হয়তো। তবে তার কোনো ব্যপ্তি নেই। মানবের তুচ্ছজ্ঞান বা কল্পনায় তাকে ধরা যায় না। অনেকটা গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের মতো।

_ বৃদ্ধের জ্ঞান ও বিশ্লেষণে অভিভূত হচ্ছিল রঞ্জন। মনের কৌতূহল জঠরের আগুনকে চাপা দিয়েছে ইতিমধ্যেই। নির্ঘুমেই বেড়ে চলেছে রাত। সারাদিন খেটেখুটে যে তথ্য জোগাড় করতে পারেনি, এক লহমায় দর্শনতত্ত্বের সেই নির্যাসটুকু আত্মস্থ করতে চাইছে ও।

_পরলোক সম্পর্কে কী বলবেন?

_পরলোক আসলে একটা অনুভূতি। সেই চিন্তা-সমন্বিত আধারের কামনা-বাসনা সম্পৃক্ত স্মৃতি-বিজরিত সবাঙ্গীন অনুভূতি। তবে তা নিয়ন্ত্রণহীন। আমার "আমি" সেখানে নিতান্তই অসহায়। এই অসহায়তা ঠিক স্বপ্নের মধ্যেকার অসহায়তার মতোন- জেগে ওঠা তথা জন্মাবধি পর্যন্ত।

এতো অব্ধি ব'লে বৃদ্ধ উঠে গিয়ে কিছু খাবার আর একগ্লাস জল নিয়ে এলেন।
_ খাও। আমি একটু আসছি।

বেশ কিছুক্ষণ পরও বৃদ্ধ আসছেননা দেখে রঞ্জন পাশের ঘরে উঁকি দিল।

 কী সবর্নাশ! বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল রঞ্জনের। বৃদ্ধ তখন তারিনীর সাথে বসে দাবা খেলছেন। কিন্তু রঞ্জনের বাবা তো বছর সাতেক আগেই মারা গেছেন। তাহলে.., তাহলে কামিনীও কি.....???

রঞ্জন চিৎকার করতে চাইল। পারলনা। দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করল। নাঃ, পা নড়ছেনা একচুলও। স্বপ্ন দেখছেনাতো ও? নাকি.., নাকি রঞ্জনও......!!

একি সত্যিই কালিন্দিপুর নাকি এ অন্য এক মৃত্যুপুরী?


 

জীবিত না মৃত?

শুভেন্দু নন্দী 


নিঃশব্দ রাত্রিকে খানখান করে বেজে উঠলো ঘড়িতে এগারোটা। বাড়িতে এই মুহুর্তে অর্ক একা। একটা গোয়েন্দা গল্পে সদ্য মনোনিবেশ করেছে, সেই মুহুর্তে দরজায় খুটখুট আওয়াজ। বাইরে নিম্নচাপের ভ্রুকুটি। অকাল বর্ষনের ধারা। দপ করে সব আলো নিভে গেলো। লোডশেডিং। কলিংবেল সম্ভবতঃ সেই কারণেই অচল। অর্ক ধীরে ধীরে ঘরের সদর দরজার পানে অগ্রসর হোলো। দরজায় লাগানো গোলাকার ছোট্ট লেন্সে চোখ নিবদ্ধ করলো। নাঃ আগন্তুক সম্বন্ধে স্পষ্ট কিছু ধারনা অনুভূত হোলোনা ।মোবাইল-লাইট জ্বালিয়ে সভয়ে ও কিছুটা সন্তর্পনে অর্ক দরজা উন্মুক্ত করলো।
-আরে!  শ্যামল কাকু  তুমি? এই ঝড়,জল,রাতে?
পরনে তাঁর রেইনকোট, হাতে পুরনো আমলের ছাতা আর একটা জীর্ন ঢাউস ব্যাগ।চোখে-মুখে ক্লান্তি ও অনিদ্রার ছাপ স্পষ্ট। গালে দু-তিন দিনের
না-কামানো বাসি দাঁড়ি। একী চেহারা! মিলিটারীতে 
সার্ভিস করা এই শ্যামল কাকুুর ? প্রায়ান্ধকারেও বেশ বুঝতে পারলো। কিছুটা অবাকই হোলো অর্ক।
কিন্তু এত রাতে সে প্রশ্ন করে তাঁকে বিব্রত করলা না অর্ক। 
"দাঁড়াও, মোমবাতি একটা জ্বালাই । কি যে বিড়ম্বনা! কতক্ষণ যে এই অন্ধকারে কাটবে।
এসো এসো । ভিজে গেছো দেখছি। ছাতা,বর্ষাতি ঘরের কোণে রেখে দাও।"
- তা তুই একা? আর সব কোথায়? আগন্তুকের প্রশ্ন। 
- বিয়ে বাড়িতে নেমন্তন্ন রক্ষা করতে গেছে। আমি আজ কলেজের পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরেছি। যেতে ইচ্ছা করলোনা তেমন তাই। যাও, বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। এই নাও পাঞ্জাবী,পাজামা আর তোয়ালা। আমি খাবারের ব্যবস্থা করি।"
- ঠিক আছে। আমি কিন্তু কাল খুব ভোরে.....
কথাটা তাঁকে শেষ করতে না দিয়ে বললো,"ঠিক আছে।" বাবা-মা কিভাবে ব্যাপারটা নেবে ভেবে একটু আশঙ্কিত হয়েই তাঁকে সমর্থন করলো অর্ক।
চারটে রুটি, সব্জি ঢেকে রেখে দিয়েছিলেন মা যাবার সময়। সেটার থেকে আর একটা ডিসে ও বাটিতে খাবার ভাগ করলো। 
খাবার মিটে যাবার পর ডাইনিং হল সংলগ্ন পাশাপাশি দুটো ঘরের একটিতে পরিপাটি করা বিছানায় শয্যা নিলেন শ্যামলবাবু । 
রাতে তেমন কথা হোলোনা। কিন্তু একটা রহস্য রয়ে গেলো। হঠাৎ কি কারণে এ পাড়ায় নিজের বাড়ি থাকা সত্ত্বেও এখানে আশ্রয় নিতে হোলো। এই দুর্যোগের রাতে? বেশী রাতে খাওয়াদাওয়ার শেষে বিছানায় এপাশ ওপাশ করে অবশেষে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়লো অর্ক।
পরের দিনে ঘুম ভাঙতে বেশ দেরী হোলো। সকাল নটার কাছাকাছি। পাশের ঘরে দেখলো ঘর খালি অর্থাৎ কাকু চলে গ্যাছেন ইতিমধ্যে দরজা বাইরে থেকে ভেজিয়ে দিয়ে। দরজাটা বন্ধ করে দিলো অর্ক। 
- কেমন হোলো ব্যাপারটা? অনেক প্রশ্ন মনে ভীড় করেছিলো অর্কর কিন্তু তার তো সদুত্তর মিললোনা।অর্ক দেখলো উপরে টাঙানো একটা এনলার্জড গ্রুপ পারিবারিক ফটো যাতে মধ্যমনি হয়ে রয়েছেন স্বয়ং শ্যামল কাকু। তাদের অত্যাধুনিক ক্যামেরাতে বন্ধু জয়ন্ত শ্যামল কাকুর অনুরোধে তুলেছিলো। আর ইঞ্জিনিয়ারীং কলেজে জয়েন করার পূর্বে অনেক আশীর্বাদ করেছিলন কাকু আর শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা রহস্য সিরিজের বই তাকে দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন "এটা আমার তরফ থেকে উপহার তোর জন্য".....
এমন সময়ে দরজার উপরে কলিংবেল বেজে উঠলো তাকে সচকিত করে। 
-তাহলে  ওরা এসেছে ! আনন্দে আত্মহারা হোয়ে
দরজার ছিটকিনি খুললো।
- কাল খেয়েছিলি তো? তোর জন্য খুব চিন্তা হচ্ছিল? মার প্রশ্ন। রমলা মাসী এখনও আসেনি?
- দাঁড়া, তোকে চা করে দিই, কেমন? গেলেও পারতিস আমাদের সঙ্গে। তোর কথা ওঁরা খুব বলছিলো রে। 
এই সময়ে জুলি বলে ওঠে" দেখো মা, একটা ডিস
ও বাটি উপুড় করা -বেসিনেের পাশে খোলা জায়গায়"
- দেখছি দাঁড়া। দাদাকে চা,জলখাবারটা দিই আগে। 
-ওমা! তাই তো? কেউ এসেছিলো নাকিরে? 
বন্ধুটন্ধু ? জয়ন্ত? আর থালা, বাটি তো বেশ পরিপাটি করে মাজা।" 
-হ্যাঁ মা,রাত এগারোটার পরে। তবে জয়ন্ত নয়। শ্যামলকাকু।" একটু চুপ করে থেকে উত্তর দিলো অর্ক।
- কী বলছিস পাগলের মতো। মা যেন একটু চমকে উঠলেন।
কেন, মা? সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অর্ক ।
-সর্বনাশ হয়ে গ্যাছে রে। চারমাস আগে তো এনকাউন্টারে মারা গেছেন তোর মিলিটারী কাকু !
- আমি তো জানতাম না। তা হোলে, মা কী হবে? একটু কেঁপে উঠলো আর ধপাস করে বসে পড়লো অর্ক। 
- কী রে দাদা. কাকু কী ভূত হয়ে এসেছিলো?বোনের প্রশ্ন। 
- ওরে আমার কী হবেরে ? বিয়ে বাড়িতে তুই গেলে এই কান্ডটা ঘটতো না। কত করে বললাম-তুই তো
রাজীই হোলিনা।  এই ব্যাপারটা কাউকে বলবিনা। এমন কি কাজের মাসিকেও। আমার তো ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছেরে। তুই ঠিক দেখেছিস তো,খোকা ?
-হ্যাঁ মা। বলে দেয়ালে টাঙানো ফটোর দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করলো অর্ক। বাবা বললেন," আরে! নিউজে তো বলেছিলো চারজন স্পট ডেড। শুধু একজন কোমাতে চলে গিয়েছিলো। এখনও হাসপাতালে। lying Inclined in bed ! তাহলে, খোকা কাকে দেখলো ? আমি তো প্রতিদিনই নিউজ চ্যানেল ও পেপার দেখছি। ভদ্রলোকের এখনও তো জ্ঞান ফেরেনি। নিজের বাড়ি থাকতে শ্যামলের এখানে কেনই বা আগমন ঘটলো এই ঝড়- জল রাতে? সবটাই রহস্যের মোড়কে আবৃত।
দেখা যাক, কালকের কী খবর হয়? চ্যানেল আর 
পেপারই তো একমাত্র ভরসা। "
আরও একটা রাত কেটে গেলো । পরের দিন তাঁর বাড়িতে পাড়ার নেপাল প্রতিদিনের মত পেপার দিয়ে গেলো। বাবা মানে রমেনবাবু বলে উঠলেন সকলের উদ্দেশ্যে " এই  দেখো। ভদ্রলোকের sense নাকি ফিরে এসেছে। প্রেস, মিডিয়া সকলকে তিনি বলে যাচ্ছেন তাঁর আচ্ছন্ন অবস্থায়, 
" শ্যামল কোথায়?" সে তো আমার পাশেই ছিলো।
সে তো মারা যায়নি স্পটে। বরং উঁচু পাহাড় থেকে
তার পড়ে যাবার সম্ভাবনা "
প্রেস,মিডিয়া সমস্বরে বলে উঠলো" কিন্তু ডিপার্টমেন্টের কথায় " চারজনই নাকি স্পট-ডেড? আর তাতে স্পষ্ট করে শ্যামলের কথারও উল্লেখ ছিলো।"
- তাহলে শ্যামলের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকেও 
একদম উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছেনা, তাই না? বলে বাবা সবাইকে একটু আশ্বস্ত করলেন।
- "হে ঠাকুর! তাই যেন হয়" - অর্ক মনে মনে বলে উঠলো। "তাছাড়া, ঐ ভদ্রলোকের কথামতন অত উঁচু পাহাড় থেকে পড়েও তিনি যে অক্ষত রয়ে যাবেন, তার গ্যারান্টি কোথায়?"
- তবে কি রাখে হরি মারে কে?
পুরো ব্যাপারটার মধ্যে বেশ রহস্যের গন্ধ পেলো অর্ক। এ রহস্যের উদঘাটন করতে পারেন একমাত্র
শ্যামলকাকু- অবশ্য যদি তিনি সত্যি সত্যিই ফিরে আসেন তবেই। আর তারই অপেক্ষায় থাকতে হবে- ভাবতে ভাবতে সে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। পরশু রাতের ঘটনাটা বারে বারে যেন উসকে দিচ্ছে অর্ককে।


 

মানসকন্যা
ঋতুপর্ণা ধর

সৃজনী জানালার পাশে বসে থাকে। বিকেলের আলো ছুঁয়ে যায় তার কপাল, চোখেমুখে খেলে যায় এক অনুচ্চ বিস্ময়ের রেখা। জানলার ওপারে গলফের মাঠ, সেখানে সাদা পাখির মতো কিছু বাচ্চা দৌড়োচ্ছে। সে ওদের দেখে না, আসলে দেখার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ তার ভেতরে আরেকটা পৃথিবী আছে—ছায়ার মতো, অথচ ঠিক নিজের ছায়া নয়।

সেই ছায়ার নাম "নিশীতা"।

নিশীতা—সৃজনীর গল্পের মানস কন্যা। একবার এক ছোট গল্পে সে তাকে সৃষ্টি করেছিল, ভেবেছিল নিছক একটি চরিত্র, কিছুদিন থাকবে, তারপর অন্য চরিত্র এসে তাকে সরিয়ে দেবে। কিন্তু নিশীতা তেমন নয়।

সে নিজের মতো ভাবতে জানে। কথা বলতে জানে।

প্রথমে সৃজনী অবাক হয়েছিল। একটা চরিত্র যদি প্রশ্ন তোলে—"তুমি কেন আমায় এইভাবে গড়ে তুললে?"—তখন কী উত্তর দেওয়া যায়?

সৃজনী প্রথমে গল্পে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল তাকে। একটি নির্দিষ্ট পরিসরে বাঁধতে চেয়েছিল—নাটকের চরিত্র যেমন, আলোর ভেতরে জন্মায় আর অন্ধকারে গলে যায়। কিন্তু নিশীতা থেকে যায়।

অন্ধকারেও।

রাত্রে যখন সৃজনী তার স্টাডি ডেস্কে বসে লিখছে, হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায়—এই তো, নিশীতা তো রাগ করেছিল গত পর্বে, তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি।

তখন মনে হয়—সে কি ঠিক করেছিল? নাকি লেখিকা নিজেই ভয় পেয়েছিল?

গল্পের মধ্যে দিয়ে বয়ে যায় একধরনের অন্তর্জল। নিশীতা কখনো সৃজনীর মতো কথা বলে, কখনো উল্টো। বলেই ফেলে—
"তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো ভালোবাসা শুধু উপলব্ধি? না কি একটা নিঃসঙ্গ যুদ্ধ?"

সৃজনী তখন আর জানে না কে কার মধ্যে ঢুকে পড়েছে।

লেখালিখি এখন তার কাছে দৈনন্দিন কাজ নয়। সেটা একটা মানসিক অনুসন্ধান, যেন নিজের ছায়ার ভিতর ডুবে গিয়ে কার মুখ দেখতে পাওয়া। নিশীতা এখন শুধু গল্পের চরিত্র নয়, তার আচরণে, ভাবনায়, এমনকি গলার আওয়াজে এসে গিয়েছে তার ছাপ।রোজ রাতে মনের ঘরে আসন পেতে দিনযাপন কেমন হলো তা নিয়ে গভীর আলোচনায় বসে দুজনে। মুখোমুখি হয়... চোখাচোখি হয়... চোখ নামিয়ে কলম ধরে সৃজনী। লিখে চলে বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপট।

একদিন একজন সহকর্মী বলল,
— "তুমি বদলে গিয়েছ সৃজনী, আগের সেই কৌতূহলী চোখের মেয়ে আর নেই। এখন তুমি যেন সব জানো, অথচ কিছু বলো না!"

সে হেসেছিল। কিন্তু উত্তর দেয়নি।

ভেতরে নিশীতা বলেছিল—
"জানা আর বলা এক নয়। আর আমি তো এখন তোমার মুখেই থাকি!"

সৃজনীর মনে পড়ে, তার প্রথম পুরস্কার পাওয়া গল্পে নিশীতা গলায় দড়ি দিয়েছিল। পাঠক কেঁদেছিল, বিচারকেরা বাহবা দিয়েছিল তার মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার জন্য।

কিন্তু সৃজনী জানত—সে গল্প লিখতে গিয়ে তলিয়ে গিয়েছিল। শেষ লাইনটা লেখার পর তার ঠোঁট ফাটছিল, বুক ধড়ফড় করছিল—সে কি নিশীতাকে মেরে ফেলেছে?

না, নিশীতা মরে না।

সে থেকে যায়।

আর এখন, প্রতিটা গল্পেই একটু একটু করে নিজের শরীর তৈরি করছে। যেন একদিন উঠে দাঁড়াবে, সৃজনীর চোখে চোখ রেখে বলবে—
"এখন আমি লিখব। তুমি শুধু কাগজটা ধরো।"


 

নগরপাখি

দেবর্ষি সরকার


ঘামে ভেজা শরীর, রোদে পোড়া পিঠ—
চোখে তবু স্বপ্নের ছায়া,
সেই ছেলেটি—
কোনো মেট্রো সিটির রেললাইনের ধার ঘেঁষে
পাউরুটি চিবোতে চিবোতে
ভাবছে সন্ধ্যার পরের ঘুম।

তার বুকের ওপরে নেমে আসে
একটা কামাতুর কবুতর,
পাখায় ধুলো, চোখে আগুনের ক্ষুধা,
আর ঠোঁটে—
অবিন্যস্ত প্রেম।

ওরা দু’জনেই জানে,
জীবন মানে কেবল রোজগার নয়,
নয় কেবল ফ্ল্যাট কিংবা ছাঁটাইয়ের দুঃখ,
জীবন মানে হয়তো ছুঁয়ে থাকা—
একটা হেঁচকা খাওয়া আলতো মুহূর্তে।

কবুতরটা ওর কাঁধে এসে বসে,
আর ও—
হাতের ঝাঁঝরা কুড়িয়ে
আবার উঠে পড়ে ট্র্যাফিক সিগনালে।

ভিড়ের মধ্যে সে হারিয়ে যায়,
কিন্তু কবুতরটা উড়ে চলে না,
ওর হৃদয় হয়ে থাকে
একটা পাথরের শহরের মাঝখানে
ভালোবাসা শেখা এক নির্জন উঠোন।

জীবন, হ্যাঁ—
কখনও কবিতা হয় না,
তবু জীবনচর্চা—
একটা ঘাম ও ঠোঁটের সংলাপ হতে পারে।

এখানেই হয়তো
যুক্তির নীরবতা ভেঙে
একটা নগরপাখি গান গায়—
কাম আর শ্রমের অনন্ত ব্যালাড।


 

জায়ান্ট স্কুইড
লেখা ও আঁকা: অশোক কুমার ঠাকুর



মেরুদণ্ড না থাকলেও   
শিল্পী সাহিত্যিক কবিরা আছেন
শিল্প সাহিত্য কবিতাও আছে
আর আছে শক্তপোক্ত খুঁটি।
একটা খুঁটি ধরতে পারলেই কেল্লা ফতে!

মেরুদণ্ড ছাড়া কি প্রাণী নেই?
'জায়ান্ট স্কুইড', অমেরুদণ্ডী প্রাণী
যাদের দৈর্ঘ্য ১৩ থেকে ১৪ মিটার।
বড়ো কবি সাহিত্যিক শিল্পী হতে
আপাত মেরুদণ্ডের প্রয়োজন নেই
প্রয়োজন একটা খুঁটির।

অমেরুদণ্ডী প্রাণীরা খুঁটি বেয়ে বেয়ে
উপরে উঠে যেতে পারে অনায়াসে।





 

আষাঢ়ে আসার এলে

মাথুর দাস


আষাঢ়ে আসার এলে

কী আনন্দ চাষার !

আষাঢ় আশার মাস

সুখ-স্বপ্নে ভাসার ॥


আষাঢ়ে আসার এলে

সে বড় সর্বনাশার !

খবরে খবর হয় দেখি

কত যে বানভাসার ॥


আষাঢ়ে আসার এলে

শরীর কোণঠাসার !

নাসার বিরাম নেই

হাঁচা ও কাশার ॥


আষাঢ়ে আসার এলে

দিন খুশিতে হাসার !

ভাষার জোয়ার কবির

প্রেম-ভালোবাসার ॥


 

যেতে পারো......

চন্দন দাশগুপ্ত 


যদি ফিরে যেতে চাও, যেতে পারো,
যেতে পারো অতলান্ত খাদের তলায়,
কিংবা কোনও অন্ধকার গুহাকন্দরে,
যেতে পারো সেই বিষণ্ণ শ্রাবণবেলায়
           অপ্রত্যাশিত প্রত্যাখানের বিমর্ষ সন্ধ্যায়,
কিংবা আনন্দবিহ্বল সেই রোগমুক্তির প্রাতে......

যেতে পারো ঘরছাড়া নাবিকের মতো,
                             কোনও এক অচেনা বন্দরে,
যেতে পারো ভেসে মেঘের ভেলায়,
                                   নির্জন অরণ্যের অন্দরে,
নিশ্চয় পেরিয়ে যেতে পারো উত্তাল মহাসাগর,
হয়ত যেতেও পারো এক বিজন নক্ষত্রলোকে.....

যেতে পারো তুষার ঘেরা সাইবেরিয়ায়,
কিংবা সাহারা মরুর বালি-পাথরের নির্জনতায়,
যেতে পারো দুর্গম আলাস্কায়....রোমে...পিরামিডে,
যেতে পারো ভয়ঙ্কর আমাজনে ভেসে, 
শুধু....... কোনোদিন পারবে না যেতে মিশে......
                  ফিরে যেতে অনাবিল শৈশবের দেশে।


 

কতকাল দেখি নি তোমায়!
                 রাণা চট্টোপাধ্যায় 

কতকাল কাছ থেকে দেখিনি তোমায়,
ভৌগলিক দূরত্বের ব্যবধানে দূরে থাকা অভ্যাসে।
তবু,পাশে থাকার আশ্বাসে ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকি,
আলো আঁধারি ছাদের রাত লুকোচুরি,খোলা আকাশের নিচে তারা গুণে অনুভবের সুখস্পর্শ।

কখনো চিবুক,আঙুল ছুঁয়ে,জ্যামিতিক শরীরী     
       উষ্ণতার উচ্ছ্বাস স্পর্শে আগুন হওয়া,
    পথ হারানো পথিক আমি একাকী পথ হাঁটি।
কখনো মুহূর্তে কেঁপে উঠি এই বুঝি ছুঁয়ে দিলে!ঘাড় ঘুরিয়ে একরাশ শুন্যতা,মন ভাবুক গোত্তা!
কাছে না এসেও অদ্ভুত ছুঁয়ে যাওয়া আলোড়ন।

এক পশলা বৃষ্টি ভিজে উজ্জীবিত  মন-হৃদয়,
   চঞ্চল পাখির মতো ঢাকা দেয় যা কিছু ক্ষত,
তবু হালকা মেঘ পালকে ডানা মেলে ইচ্ছেরা।
দেখা তো হবেই একদিন আক্ষেপ মুছে,
বহু কাল না দেখতে পাওয়ার উপবাস ভঙ্গ।


 

ইছামতী
পার্থপ্রতিম বন্দোপাধ্যায় 

ইছামতী  সুর তুলেছে ভাসিয়ে গানের ভেলা
দুপার জুড়ে সবুজ হাসে সবুজ সবুজ খেলা
আকাশেতে নাচ জুড়েছে শ্বেতপরীদের দল
পরিযায়ী পাখির  ছায়ায়  উঠছে নেচে জল
দুলিয়ে আঁচল সজনে শিমুল বাঁশবনেরই মাঝে
নাইতে আসে  গাঁয়ের বধু  সকাল  দুপুর সাঁঝে
ফুলিয়ে গলা কবুতরের বকম বকম ডাক
কচুরিপানা কলমিলতা বেঁধেছে তার ঝাঁক 
উড়ছে টিঁয়ে গাইছে ফিঙে হরেক রকম ডাক 
কাতর চোখে শুধুই  শোনে  কালচে বরণ কাক
ঝিঙ্গে পটল হরেক ফসল নামবে পারের হাটে
নৌকো  বাঁধা  সারি সারি  মতি-গঞ্জের ঘাটে
দু:খ - কষ্ট  সকল   ভুলি ইচ্ছে নদীর দেশে 
ইছামতী হাত নেড়ে যায় সদাই চলে হেসে।


 

খোঁজ

প্রাণজি বসাক


 তাল তাল খবর রেখে ফিরিয়ে আনি বার্তা 

নিশ্চুপ ভোরে বিভোর ঘুমে তলিয়ে গেছে স্বপ্ন 

স্বাধীন আলোরেখা তোমাকে সুন্দর করে দেয় 

অর্থহীন স্বাধীনতা সংসারে যেমন ঠিক তেমন

সর্বক্ষণ খোঁজো প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ভালোবাসা

অদৃশ্য রেখাগুলো যেন জাল বুনেছে নিজেরাই

শরীর কী শুধুই এই শরীরী বৈভবে হাড় কাঠাম 

এমন পেলব সকালে শিহরণ সূত্র ধরে শেখালে

জীবনের মূল অর্থ আর তার সূক্ষ্ম তন্তুর মহিমা 

উদ্বেল স্নায়ু টানটান শরীর ছুঁয়ে বুঝি মানুষ যথা  



 

গুজুরে ট্যাংরাঃ একটি সাদাসিধে জীবন 

দয়াময় পোদ্দার 


প্রথমেই বলে রাখি- যাদের পিসির বাড়ি নেই 
এই কবিতাটি তাঁরা পড়বেন না।
কেননা, একেতো চৈত্রমাস, জলস্তর কম 
দুপুরে ভাটার শুরু হলে- সর পড়া কাদা জাগে।
কাঁকড়ার গর্তে গুজুরে ট্যাংরার কলোনি,
দুটি কাঁটা উত্তরে দক্ষিণে, বিষ সর্বস্ব পুঁচকে দেহ।
উগ্র হামলায় ওস্তাদ;
কাঁটা আর লেজ ছেঁটে পেট চিরে ধুয়ে নিতে হবে।
 মশলা, শুকনো লঙ্কায় গাঁ-মাখা ঝোল, অথবা 
উচ্ছে-আলুতে ভেজে খাওয়া যায়।
তবে ধরার আগে মনে হতে পারে- শরীরে, পাছায় মাংস নেই,
দল বেঁধে থাকে, বুক ভরা বিষ... ভয় পেলে চলবেনা।
হাতের পাঞ্জায় ভালো করে গামছা পেঁচিয়ে নিয়ে 
গর্তের ভিতরে ঢুকিয়ে দিলেই হবে,
দেখবেন- গামছায় কাঁটা আটকে ফাজিলের জারিজুরি শেষ!
আমার বিধবা পিসি আবার মাছ খায়না। তাই টিনের হাঁড়িতে 
অল্প জল দিয়ে তাদেরকে দূরে রাখি।
রোদে জল খুব তাড়াতাড়ি গরম হয়ে যায়। তারপরে 
গুজুরে ট্যাংরা মরে গেলে তাদের নদীতে ফেলে দিই!


 

চলন
উৎপলেন্দু পাল 

মন্দিরে ঘন্টা বাজলে 
বেঁধে ফেলি উদ্বাস্তু গাঁটরির গিঁট 
হাতরাই হাথরাস পথে অমৃতের মেটে কলস 
উর্বশীর চড়াই উতরাই মন্থনের অদম‍্য আদিম দক্ষতায় 

সিসমোগ্রাফ বিস্তৃত হলে 
নেমে যাই অভ্যস্ত কৃষ্ণ গহ্বরে 
নদিয়া থেকে নীলাচলের পথে পথে ঊর্ধবাহু  
শ্রীরাধার পদযুগল লেহণের অবদমিত উগ্র বাসনায়। 



 

অবক্ষয় 
প্রতিভা পাল 

আমাদের আশপাশ আজ
অবক্ষয় লেখে মনুষ্যত্বহীন।
উঁকি দেয় লোভ, নিক্তির এপাশ-ওপাশ
দোল খায় ধর্ম অথবা রাজনীতি, 
মাঝখানে ক্ষমতার দ্রোহ।
দাহ্য সময়ের হিসাবে বিক্রিত হয়
মান, হুশ, পরিচয়, সাহস।
ব্যাধিগ্রস্ত ভাবনার অতল
ঘুণধরা গাঢ় রাত গভীর আরও। 
ব্যস্ত সমস্ত প্রতিযোগিতার দৌড়,
কখন যেন হারিয়ে যায় মিঠেরোদ !
হারিয়ে যায় প্রকৃতি, মন, মুগ্ধতা, অবাধ্যতায়।

জীবন অথচ অনন্ত চেতনার অভিসারী। 
সারি সিঁড়ি জুড়ে বর্ণাঢ্য আলোর সমাহার।  
বিস্তৃত আকাশ রামধনু আঁকা, বৃষ্টির আষাঢ়।
হারিয়ে যায় অনুভূতি।
হারিয়ে যায় আবেগ সহসা।
ভুলগুলো ভুলে সমাজ আঁকে মানুষ, স্পর্ধায়।
লেখা হয় অবক্ষয় সমাজের ধ্বংসস্তূপে….


 

বৃষ্টি - বিকেল
অমিতাভ কর 


শেষ বিকেলে বৃষ্টি এলো, আমি তখন বাসে , জানলাগুলো তুলে দিলাম, ভিজবো জলে ত্রাসে ।

লাগছিলো বেশ ভালোই আমার, মেজাজটা ফুরফুরে ,
বৃষ্টি নেশায় বিভোর হয়ে, চলছি যেন উড়ে ।

স্টপেজ আসতেই নেমে দাঁড়ালাম, উড়াল পুলের নীচে ,
মুক্তো ধারা ঝরছে তখন, রোদ গলানো পীচে ।

পোলের পাশেই এক ধারেতে, ঝুপড়ি মতো ঘরে ,
ছোট্ট দুটো বাচ্চা আকুল, বাঁচবে কেমন করে !

ওদের  ভাতের গামলা ভেসে, যাচ্ছে স্রোতের মুখে ,
অসহায় চোখ, কেমন করে, দেবে সে গতি রুখে !

জলের ছাঁটে সব বেসামাল, ঘরকন্নার সাধ ,
আমার চোখও ঝাপসা তখন,উপছে জলের বাঁধ ॥


 

তবুও হেঁটে যাব

দীপজয় সরকার 


কাটাকুটি আজ খাতা ছেড়ে 

নেমেছে রাস্তায়।

বিবেকের কাছে হার মেনেছে 

সত্যবাদী হৃদয়।

মরীচিকা সেজেছে সমাজ।

মাকড়শারাও বেঁধেছে ভয়ার্ত মায়াজাল।

তবে, কান্তশ্রী রোদে আজও তৃষ্ণার্ত 

বিমূর্ত সত্যনিষ্ঠ জন।

সত্যের আলপথে আজও 

কালো রক্তের ছাপ।

তবুও হেঁটে যাব সেই পথে,

রাহী পেলেও পাব

বলিষ্ঠ হতে ভয় কী!