Saturday, April 5, 2025


 

হরিমাধবদার সান্নিধ্যে 

   দীপায়ন ভট্টাচার্য 


কিশোর বয়স থেকেই যখন কোচবিহারের বিশিষ্ট নাট্যজন নীরজ বিশ্বাস, কানন মজুমদার, ষষ্ঠী ভৌমিক এঁদের সংস্পর্শে এসেছিলাম, তখনই উত্তরবঙ্গের নাটকের আলোচনার সূত্রে বালুরঘাট ত্রিতীর্থের প্রাণপুরুষ হরিমাধব মুখোপাধ্যায়ের কথা বারবার উঠে আসত। তখনও নাটমঞ্চে তাঁর দেখা পাইনি — সে সুযোগ এসেছিল আরও পরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর পর ১৯৮৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি আয়োজিত `নাট্য প্রশিক্ষণ শিবিরে` সুযোগ পেয়ে গেলাম শিক্ষার্থী হিসেবে। এর আগে আমাদের নাট্যসংস্থা ইন্দ্রায়ুধ-এর নিজস্ব পরিসরে কোনো কোনো বিশিষ্ট নাট্যজনের কাছে নাট্যচর্চার খুঁটিনাটি বোঝবার সুযোগও হয়েছিল, কিন্তু নাট্য আকাদেমির প্রশিক্ষণ শিবিরের অভিজ্ঞতা ছিল আরো বিস্তৃত। কোচবিহার, অবিভক্ত জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, তখনকার পশ্চিম দিনাজপুর এসব জেলার নাট্যশিক্ষার্থীদের নিয়ে সেই শিবির আয়োজিত হয়েছিল শিলিগুড়ির নবনির্মিত দীনবন্ধু মঞ্চে । তখনকার বাংলা থিয়েটারের মহীরুহদের অনেকেই প্রশিক্ষক হিসেবে এসেছিলেন সেই শিবিরে। তাঁদেরই মধ্যে ছিলেন সদাপ্রসন্ন হরিমাধব মুখোপাধ্যায়। 

শুরু থেকেই সব প্রশিক্ষকের সাথে আমাদের গড়ে উঠেছিল দাদা-ভাইয়ের আন্তরিক সম্পর্ক। হরিমাধবদার নাট্যমেধা, নাটকের জটিল বিষয়কে সরল করে পরিবেশন করবার নৈপুণ্যের পরিচয় তখনই পেয়েছিলাম। ওই ভরাট গলায় নাটক পাঠ, তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মর্মবস্তু বিশ্লেষণ তখনই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জাগিয়ে তুলেছিল। সেই নাট্য প্রশিক্ষণ শিবির এবং পশ্চিমবঙ্গের নানা জোনের, সম্ভবত আরও তিনটি প্রশিক্ষণ শিবির থেকে, বাছাই করা শিক্ষার্থীদের নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির কেন্দ্রীয় নাট্য প্রশিক্ষণ শিবির হয়েছিল কোলকাতার গিরিশ মঞ্চে। সেখানে নির্বাচিত হয়ে আবার সুযোগ পেলাম বাংলার নাট্যনক্ষত্রদের কাছে নাটকের তত্ত্ব -তথ্য ও প্রয়োগের গভীরতর পাঠ নেবার। আবারও পেলাম হরিমাধবদাকে, গিরিশ মঞ্চেই দেখলাম বালুরঘাট ত্রিতীর্থ প্রযোজনা (সম্ভবত) "মন্ত্রশক্তি" নাটকে হরিমাধবদার মনোজ্ঞ নির্দেশনা ও অভিনয়। গ্রামীণ জীবনের নানা মিথ ও রিচ্যুয়ালের খুঁটিনাটি নিপুণভাবে উঠে এসেছিল সেই প্রযোজনায়। আর ছিল কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মোক্ষম আঘাত — যা আজকের সমাজেও একটি প্রয়োজনীয় কৃত্য — উত্তরের থিয়েটারের অগ্রপথিক অভিভাবক হিসেবে হরিমাধবদা যে পথের দিকে আমাদের দৃষ্টিপাত করিয়েছিলেন। 

এরপর চলে আসি ১৯৯১ সালের কথায়। সে বছর ২৭শে অক্টোবর থেকে ৪ঠা নভেম্বর কোচবিহার রবীন্দ্রভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলার শিক্ষার্থীদের নিয়ে নাট্য প্রশিক্ষণ শিবির ও কোচবিহার জেলা নাট্যোৎসব। তখনও প্রশিক্ষক হিসেবে এসেছিলেন হরিমাধবদা। আমি ছিলাম আয়োজকের একজন। সেই উপলক্ষে ৩রা নভেম্বর কোচবিহার জেলা পরিষদ হলে “সাম্প্রতিক বাংলা নাটকের গতিপ্রকৃতি” বিষয়ক আলোচনা সভায় সর্বশ্রী অরুণ মুখোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র, বিভাস চক্রবর্তী, হরিমাধব মুখোপাধ্যায়, ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দন সেন, নৃপেন্দ্র সাহা, ড. দিগ্বিজয় দে সরকার প্রমুখের পাশাপাশি আমিও ছিলাম আলোচক হিসেবে। মনে পড়ে, সেই আলোচনায় তিনি এবং আমি মূলত উত্তরবঙ্গের নাট্যচর্চার সমস্যা ও সম্ভাবনা বিষয়ে আলোকপাত করেছিলাম। সেবার এঁদের কারও কারও সাথে হরিমাধবদা আমার বাড়িতেও এসেছিলেন। নিজগুণে অর্জন করেছিলেন আমার বর্ষীয়ান মায়ের স্নেহমিশ্রিত সম্ভ্রম। এরপর হরিমাধবদার সঙ্গে আবার আলোচনার টেবিলে দেখা হল ১৯৯৫ সালে আকাশবাণী শিলিগুড়ি কেন্দ্রে  “বাংলা থিয়েটারের দুই শো বছর” বিষয়ক আলোচনায়। অনুষ্ঠানটি অনেকের ভাল লাগার মূলে হরিমাধবদার বাচনিক নৈপুণ্য।

২০১১ অথবা ২০১২ সালে শিলিগুড়ি সংলগ্ন ফুলবাড়ি দূরদর্শন কেন্দ্রে আনন্দ ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় আমি আর হরিমাধবদা আলোচনায় আবার মগ্ন হলাম বাংলার থিয়েটার নিয়ে। সেই সময় প্রকৃতির সহজতার সঙ্গে থিয়েটারকে মিশিয়ে দেবার এক আগামী ভাবনার সংকেত তাঁর কথায় ধরা পড়েছিল। কিন্তু তার পূর্ণতার ছবি আর আমাদের দেখার সুযোগ হল না। হয় তো বয়সের প্রসারণ আরও  এগিয়ে যাওয়ার পথ আটকে দাঁড়াল। দীর্ঘদিন যাবৎ উত্তরবঙ্গের নাট্যচর্চার তথ্যানুসন্ধানের সূত্রে ২০১২ সালের ২৮শে অক্টোবর আমি নিজেই পৌঁছে গিয়েছিলাম বালুরঘাট ত্রিতীর্থ নাট্যদলের প্রাণকেন্দ্র গোবিন্দ অঙ্গনে। হরিমাধবদা স্বয়ং সস্নেহে মধুর হেসে স্বাগত জানালেন, পরিচয় করিয়ে দিলেন সংস্থার সম্পাদক কমল দাসের সঙ্গে। কাজ শুরুর আগেই ভরপেট জলযোগের আয়োজন করতে ভুললেন না। উৎসাহিত করলেন।  তারপর দীর্ঘ তথ্য সংগ্রহের মুখড়া ধরিয়ে দিয়ে তিনি মগ্ন হলেন নাটকের অন্য কাজে। অনুজ নাট্যযাত্রীকে কীভাবে উদ্দীপ্ত করতে হয় সেই প্রকরণ তিনি জানতেন। 

তাঁর চলে যাবার পর আমরা সেকথা বুকে ধরে রাখব। নাটকের সংগঠন, নির্দেশন, কথন, লিখন সব বিষয়েই সহজাত দক্ষতা ছিল তাঁর। তারই সাক্ষ্য বহন করে তাঁর নির্দেশিত ও বালুরঘাট ত্রিতীর্থ প্রযোজিত বিশে জুন, মন্ত্রশক্তি, দেবাংশী, জল, দেবীগর্জন প্রভৃতি নাটক। তাঁর কলমে নির্মিত আগাথা ক্রিস্টির রচনা অবলম্বনে দশপুতুল, মহাশ্বেতা দেবীর কাহিনি অবলম্বনে জল, এছাড়াও দেবাংশী, মাতৃতান্ত্রিক, পত্রশুদ্ধি, গোধূলি বেলায় প্রভৃতি নাটক সৃজনশীলতায় তাঁর কুশলতার কথা বহুদিন ধরে আমাদের বলবে। শুধু নিজস্ব সংস্থাতেই তো নয়, দুই দিনাজপুরের বা অন্য জেলার আরো কিছু নাট্যসংস্থার সম্পদ ছিল তাঁর রচিত বা নির্দেশিত কিছু নাটক। তিনি আজ আমাদের হাত ছেড়ে দিয়ে অজানা গন্তব্যে গেলেও, আমাদের অন্তর ধরে নেবে যে তিনি আমাদের সঙ্গে আছেন, পাশে আছেন। 

Thursday, April 3, 2025


 

মুনা 

অনলাইন চৈত্র  সংখ্যা ১৪৩১


সম্পাদকের কথা 

কথায় বলে  ``The show must go on` পত্রিকা প্রকাশও সেই show-এর অন্তর্গত। নইলে, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রের এই কালো দিনে পত্রিকা প্রকাশ করবার ইচ্ছে আদৌ ছিল না। কিন্তু মুজনাইয়ের অগণিত  প্রিয় পাঠককূল এবং শ্রদ্ধেয় লেখক-কবিরা অপেক্ষায় রয়েছেন। তাই এই উদ্যোগ ইতিহাসের এক অন্যতম বিরল  দিনে।  এইভাবে এক লহমায় প্রায় ২৬,০০০ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি চলে যাওয়ার নিদর্শন এই বঙ্গে কোনও কালে ছিল না। কিন্তু মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আজ সেই দিনটিও দেখতে হল। এই ঘটনার জন্য কে দায়ি তা নিয়ে যথারীতি শুম্ভ-নিশুম্ভের বাগযুদ্ধ শুরু হয়েছে। আমরা, সাধারণ মানুষরা, মনে করি, কেউই এর দায় এড়াতে পারেন না। তবে ভাল কিছু ঘটলে যেমন তার কৃতিত্ব যায় শাসককূলের দিকে,  তেমনি খারাপ কিছু হলে তার দায় তাদের ওপরেই বর্তায়। নিঃসন্দেহে চাকরি নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে। এই বিষয়ে কোনও বিতর্ক নেই। অন্যায় কাজকে ঠিক করবার উপযুক্ত সময় ও সুযোগও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরেও কিছুই হয়নি। আর তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে যোগ্য প্রার্থীদের। চাকরি খোয়াতে হল তাদেরও। এখানেই সব চাইতে বেশি খারাপ লাগা। মর্মাহত হওয়া। কিন্তু তারপরেও রাজনীতির অলীক কুনাট্য দেখে ঘৃণা হচ্ছে। দেশের কাছেও যেমন রাজ্যের মুখ পুড়েছে, তেমনই আয়নায় নিজেদের দিকে তাকাতে লজ্জা লাগছে। 


 মুনা 

অনলাইন চৈত্র  সংখ্যা ১৪৩১



রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com 

প্রকাশক- রীনা সাহা  

সম্পাদনা, প্রচ্ছদ, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 


    এই সংখ্যায় আছেন যাঁরা


বেলা দে,  শ্যামলী সেনগুপ্ত, অনিতা নাগ, বুলবুল দে, পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়, 

উদয় সাহা, দেবদত্তা বিশ্বাস,  গৌতমেন্দু নন্দী, মনোমিতা চক্রবর্তী, প্রদীপ কুমার দে, 

অন্বেষা মিত্র, শুভেন্দু নন্দী, আকাশলীনা ঢোল, শাশ্বত ভট্টাচার্য, তন্ময় ধর, 

নাহিদ সরদার, বর্ণজিৎ বর্মণ, জয়তী ব্যানার্জী, শ্যামল বিশ্বাস লামশ্যা,

প্রতিভা পাল, মাথুর দাস, অভিজিৎ সেন, উৎপলেন্দু পাল, শ্রাবণী সেনগুপ্ত,

তুহিন  কুমার  চন্দ,  সুপ্রভাত মেট্যা, মোঃ আব্দুল রহমান, প্রাণেশ পাল,

অর্পিতা মুখার্জী, দীপাঞ্জন দত্ত, সুনন্দ মন্ডল, পাঞ্চালী  দে  চক্রবর্তী,

চন্দ্রানী চৌধুরী, পাপড়ি দাস সরকার, মহঃ সানোয়ার, তপন মাইতি,

সৌরভ দত্ত, নবী হোসেন নবীন, মোঃ সৈয়দুল ইসলাম, 

আশীষ  কুমার  বিশ্বাস, প্রানতোশ রায়, মহসিন আলম মুহিন




অনলাইন চৈত্র  সংখ্যা ১৪৩১

 


 


স্মা র ক 

উদয় সাহা


আরো একটা চৈত্র ! শেষ দৃশ্য প্রায়। হাতের কাছেই সংক্রান্তি। অল্প কিছু দিন আর। ঘুলঘুলি দিয়ে নরম রোদ। আজ কেন ২০০১ সালের কথা গান হ'লো। মাধ্যমিকের বাধ্য ছেলে আমি। সামান্যতেই ঠান্ডা লাগার ধাঁচ। টিউশনি যাই বাবার কালো হাফ সোয়েটার পরে। বড়ো মামা একটা হাফ সোয়েটার দিয়েছে। সাদা। উলের। হাতে বোনা। ওটা পরে পরীক্ষা দিতে যাই। খুব শীত পড়লে স্কুলে যাইনা। বাবার সোয়েটার বড়ো হয়। মামার সোয়েটারও তাই। ভাবনাটা এমন ছিল যে, যত বড়ো সোয়েটার তত বেশি উষ্ণতা। আরাম। 

দেরাজে পুরনো পশম। দূরে বন। তারও দূরে বনপথ। যেটুকু আবছায়া, ততটুকু জুড়ে ফেলে আসা স্মারক। সোয়েটার। আরও সরু হয়ে আসা কৌণিক। চৈত্র মাসে রোদের অতিথি ওরা। যে রোদে লাল শাড়ি , যে রোদে খোলা চুলের দীঘল, সে রোদে লালন গান। ঐশ্বর্য। 



 

বেরুবাড়ী ও একটি ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ

দেবদত্তা বিশ্বাস


 স্বাধীনতা পরবর্তী ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় উপমহাদেশের মানচিত্র অঙ্কনে নিঃসন্দেহে জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত বেরুবাড়ী এলাকার ভারতভুক্তির আন্দোলন এক অনন্য জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক ভারতীয় ইতিহাসের পাতায়।

        কোচবিহারের ভারতভুক্তির পর র‍্যাডক্লিফ লাইনের পার্শ্ববর্তী ছিটমহল গুলির অবস্থান ধীরে ধীরে এক জাতীয় সমস্যার আকার ধারণ করে।জলপাইগুড়ি জেলার বৃহত্তম মৌজা বেরুবাড়ীতেও দেখা যায় একই সমস্যা।১০ নং নগর বেরুবাড়ী ও ১১ নং খারিজা বেরুবাড়ী ছাড়া ১২ নং বেরুবাড়ী ইউনিয়নের অবস্থান এমন দাঁড়ায় যে চিলাহাটিকে যদি পূর্ব পাকিস্তান নিজের দখলে নেয় তবে ভারত থেকে ঢোকার একমাত্র পাকা রাস্তাও পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাবে।১২ নং বেরুবাড়ী ইউনিয়নে চারটি ছিট মহল যুক্ত হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের লোলুপ দৃষ্টি এই অঞ্চলে বাড়তে থাকে।এদিকে ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত 'ব্যাগে ট্রাইব্যুনালে' অন্যান্য অঞ্চলের নাম উল্লেখ থাকলেও বেরুবাড়ী অঞ্চলের সীমান্ত সমস্যার উল্লেখ হয়নি।স্বভাবত,পাকিস্তান একসময় 'লড়কে লেঙ্গে বেরুবাড়ী' বলে হুমকি দেয়।এবং ১২ নং বেরুবাড়ী ইউনিয়নকে নিজের বলে দাবি করে।পূর্বতন চার হাজার ও উদ্বাস্তু হয়ে উঠে আসা আট হাজার নাগরিকের নাগরিকত্বের সমস্যা বড় হয়ে দাঁড়ায়।এদিকে ঐতিহাসিক নেহেরু নুন চুক্তিতে বেরুবাড়ী সমস্যার সমাধান হয়েছে বলা হলেও কিছু বিতর্কিত বিষয় সামনে উঠে আসে।যার ফলে সমস্যা সমাধানের চাইতে নাগরিকদের মধ্যে বিভিন্ন মতামতের সৃষ্টি হয়।

            এমত অবস্থায় ১৯৫৮ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর,১২ নং বেরুবাড়ীর মানিকগঞ্জে নেহেরু নুন চুক্তি বাতিলের দাবিতে তৈরি হয় বেরুবাড়ী প্রতিরক্ষা কমিটি।জনমত নির্বিশেষে সবদলের লোক একসাথে মিলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একই মঞ্চ থেকেই নিজেদের দাবিতে সোচ্চার হোন।ঐতিহাসিক বেরুবাড়ী আন্দোলনের প্রথম পর্বে(১৯৫৮ থেকে ১৯৭৪ সাল)ভারতীয় সংবিধানের ব্যাখ্যা,ভারতীয় নাগরিক ও রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা,পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভা ও লোকসভার ভূমিকা,জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বেরুবাড়ী হস্তান্তর স্থগিত হয়ে যায়।

             ১৯৭৪ সালের ১৬ই মে।বেরুবাড়ী আন্দোলনের ইতিহাসে যুক্ত হয়ে এক পালক।ইন্দিরা মুজিব চুক্তির মাধ্যমে বেরুবাড়ীকে ভারতের সাথে রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

             ইন্দিরা মুজিব চুক্তিতে বেরুবাড়ীর প্রতিকূল এলাকাগুলির অবস্থান নির্দিষ্ট করে বলা হলেও বাস্তবে তার রূপায়িত হয়েছিল না।১৯৮৯ সালে দক্ষিণ বেরুবাড়ীস্থিত প্রতিকূল অবস্থান গুলিতে বাংলাদেশ খুঁটি স্থাপনের মাধ্যমে এগুলিকে নিজের এলাকার অন্তর্ভুক্ত করায় দক্ষিণ বেরবাড়ীর নাগরিকবৃন্দ আবার আন্দোলনের প্রস্তুতি নেন।এতে আবার নাগরিকবৃন্দের ভিটে মাটি হারানোর প্রশ্ন দেখা দেয়।তাছাড়াও কিছু সরকারি সম্পত্তির চিহ্নিতকরণ দুই দেশের মধ্যে অনির্দিষ্ট হয়ে যায়।এরপর বছরের পর বছর এই নিয়ে চলতে থাকে নানা আন্দোলন।বেরুবাড়ী আন্দোলনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে।একটি ছিল ভারতীয় ভূখণ্ড পাকিস্তানকে না দেওয়ার প্রসঙ্গ দ্বিতীয়টি ছিল বাংলাদেশের মানচিত্রে দখলিকৃত ভূখণ্ড গুলিকে পুনরায় ভারতে অন্তর্ভুক্তির দাবি।

           এরপর ২০০৫ সাল ,২০০৬ সাল, ও ২০১১ সালে নানা সময় কেন্দ্র থেকে প্রতিনিধি দল ও মন্ত্রীরা আসেন এবং এই অঞ্চল পরিদর্শন করে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন।বেরুবাড়ী প্রতিরক্ষা কমিটির সাথেও আলোচনায় বসেন।

           অবশেষে ২০১১ সালের ছয় সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ডক্টর মনমোহন সিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উভয় দেশের অন্যান্য সমস্যা সহ ছিটমহল বিনিময়, প্রতিকূল অবস্থান এলাকা নিয়ে চুক্তিবদ্ধ হন।ভারতের পক্ষে বিদেশ মন্ত্রী শ্রী সালমান খুরশিদ, বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রী শ্রীমতি দীপু মনি এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।২০১৫ সালের ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতি মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মিলিত হয়ে ভারত বাংলাদেশ স্থল সীমানা বিষয়ে 'মনমোহন হাসিনা' চুক্তিকে অনুমোদন দেন।এর ফলে ভারত বাংলাদেশ ছিটমহল ও প্রতিকূল অবস্থান সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান হয়।জলপাইগুড়ি জেলার প্রশাসনিক মানচিত্রে ঘটে একটি বিরাট পরিবর্তন।

            সার্থক হয় বেরুবাড়ী আন্দোলন।বেরুবাড়ী আন্দোলন দীর্ঘ সময় ধরে ভারতীয় ইতিহাসে চলা সংগ্রামী নাগরিকদের অসাধারণ অবদান।বেরুবাড়ী ইউনিয়ন অধুনা দক্ষিণ বেরুবাড়ীর ভারত অন্তর্ভুক্তির আন্দোলন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বহু যুগ ধরে।


 

ভ্রমে ভরানো ভ্রমণের কথা

             বুলবুল দে
    

বিয়ের দুবছর পর প্রথম মা হয়েছে সীমা, মেয়েকে নিয়ে উৎসাহ উদ্দীপনায় টগবগ করে ফুটছে, চিরকাল নিজের প্রতি চরম উদাসীন আর অযত্নশীল সে, যতদূর পারা যায় নানারকম বাধা বিপত্তির পাশ কাটিয়ে পরম যত্নে মেয়েকে বড় করে তোলার চেষ্টায় তৎপর। নিজের চরম দুঃখ কষ্টের কালো কালো আবর্জনা গুলোকে পুটলি বেঁধে রেখে দিচ্ছে এক কোণে। তার চারপাশে তখন ঝলমলে স্বপ্নগুলো হেসে হেসে ভেসে বেড়াচ্ছে। পৃথিবীর কতকিছু চেনাতে হবে,দেখাতে হবে, শোনাতে হবে,বোঝাতে হবে যে ! তারমধ্যে প্রকৃতি চেনানোর কয়েকটি ধাপ,মানে হল গিয়ে পাহাড়, নদী,জঙ্গল,ক্ষেত খামার ইত্যাদি হয়ে গিয়েছে, এবার বাই উঠল সমুদ্র দেখানোর। অনেক বলে কয়ে বরকে তো রাজি করাল, কিন্তু ভীতুর ডিম বর আবার বরকন্দাজ ছাড়া বৌ-মেয়ে নিয়ে দূরে যেতে সাহস পায়না (পরে অবশ্য ধীরে ধীরে সাহস বেড়েছে)। যাইহোক,কাছাকাছি পুরী যাওয়াই স্থির হল আর বরকন্দাজ হল সীমার ভাই। বিয়ের পর পরও গিয়েছিল একবার সেখানে।বরকন্দাজের ভূমিকা নিয়েছিল তার শাশুড়ি ও নন্দাই। যাইহোক রেলপথে যাত্রা করে পৌঁছনো তো গেল, কিন্তু সে পুরী যে তাকে পুড়িয়ে খাঁক করে দেবে সে যাত্রা কে তা জানত !!
      
                    ------ প্রথম দিন----

   সমুদ্রের ধারে হোটেল ভারা নিয়ে কোনও রকমে প্রাতরাশ সেরে মেয়েকে সমুদ্র দেখানোর উত্তেজনায় সোল্লাসে সবাইকে নিয়ে চলল সমুদ্র তটে। সমুদ্রের ঢেউয়ের চেয়েও বিশাল বিশাল ঢেউ তখন তার বুকে এসে ধাক্কা মারছে, আহা ! কি অবাক টাই না হবে তার মেয়ে। কিন্তু বিরাট সাগর দেখে মেয়ে তো ভয়ে কুঁকড়ে একেবারে কাঁকুড় ফল। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই কাঁকুড়, বাঁদর হয়ে সাগরের বুকে লম্ফ ঝম্ফ শুরু করে দিল । ফুরফুরে মনে সীমার মুখের ঝিনুকের ডালা খুলে যখন মুক্তার হাসি ঝিলিক দিচ্ছে ঠিক তখনই ঘটল অঘটনটা! হঠাৎই এক সুবিশাল উর্মিমালা তাকে পেঁচিয়ে কাত করে টেনে নিল জলের ভেতর। হাঁকুপাঁকু করে নোনতা জল খেতে খেতে প্রথমটায় সাঁতারে অজ্ঞ সীমা মন কে বেশ বুঝ দিল, ভয় কি পাশেই তো বর দাঁড়িয়ে আছে, এখুনি টেনে তুলবে ওকে --- কিন্তু কই, সময় কেটে গিয়ে দম আটকে আসছে তবু তো তুলছেনা! জলের ভেতর খাবি খেতে খেতে কোনোরকমে চোখ খুলে এক পলকে বরের ঠ্যাং দুটো দেখতে পেল। দেখেছ, কেমন ঠায় দাঁড়কাকের মত দাঁড়িয়ে আছে ! পাশের মানুষটাকে যে আশেপাশে দেখা যাচ্ছেনা সেদিকে কোনো হুঁশ নেই ! আর ঐ যে একমাত্র ভাইটারও তো দেখি তার একমাত্র দিদির দিকে কোনও লক্ষ্যেই নেই। কিন্তু --- কিন্তু তার বুকের কলজে, চোখের মণি ? কয়েক হাত দূরেই তো ও মামার সাথে দাঁড়িয়ে ছিল, যে সদাই সীমা কে চোখে হারায়, এই সমুদ্র কি তার মন থেকেও নিজের মা কে কেড়ে নিল? অথচ এদের দিকে তটস্থ নজর রাখতে গিয়েই তো নিজের থেকে নজর সরিয়ে ফেলেছিল সে। তাহলে আর কি, সলিল সমাধি ই বুঝি তার ভবিতব্য। অবলম্বনহীন, হাহাকারের সাথে মন ও শরীরকে হালকা করে দিয়ে ঠাকুরের নাম জপতে জপতে নোনা জল খেয়ে চলছিল সে।কিন্তু তাহলে যে তার মেয়ে অনাথ হয়ে যাবে! কি হবে ওর? মেয়ের ভাবনা আসতেই তার মধ্যে যেন শক্তি সঞ্চার হল। সে প্রাণপনে হাত পা ছোড়ার চেষ্টা করতে করতে ঠাকুরকে ডাকতে লাগল, বাঁচাও ঠাকুর আমাকে বাঁচিয়ে দাও! হঠাৎ --- ঐ তো, ঐ তো মেয়ের গলা, চিৎকার করছে --- " বাবা, মামা, মা কোথায় গেল? মাকে তো দেখছিনা ! আরে ঐ তো মায়ের শাড়ি।" নড়াচড়া করার ফলে সীমার আঁচলটা ওপরে ভেসে উঠেছিল আর সে মাত্র এক বুক জলের নীচে ডুবে ছিল । চেঁচামেচি, হুলুস্থুলু করে ওরা টেনে টুনে তোলার পর সীমা দেখলো থেমে থেমে অনেকটা সময় দম বন্ধ করে থাকার ফলে সে পেট ভর্তি জল খেলেও গলা ভর্তি খায়নি। তার মানে সে খুব বেশিক্ষণ জলের নীচে ছিলো না! কিন্তু সাঁতারে অজ্ঞ তার, যেন মনে হচ্ছিল গভীর জলের ভেতর অনন্তকাল পেরিয়ে যাচ্ছে। কোনোরকমে দৌড়ে হোটেলে এসে অনেকক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল। মেয়েও ছুটে এসেছিলো সাথে। তারপর মনটা হাল্কা হলে অভিমানটা যথারীতি ছুঁড়ে ফেলে দিল। মেয়ের জন্যই বুঝি সে যাত্রা রক্ষা পেল। 

               ------- দ্বিতীয় দিন------
          
      পরের দিন সাইট সিইং এ যাবে, বাসে যাত্রী ভরে গেলে কন্ডাকটর সমস্ত নিয়ম কানুন জানিয়ে মস্ত বক্তৃতা দিয়ে বারবার সাবধান করে বলল, কলকাত্তাইয়াদের ওপর উড়িয়াদের নাকি ভীষণ
রাগ। বাঙালিরা নাকি উড়িয়াদের হেয় করে, শহর নোংরা করে যায়, ইত্যাদি ইত্যাদি, তাই কেউ যেন ভুলেও জানলা দিয়ে থুথু বা কোনোকিছু বাইরে না ফেলে। 
     সূর্য মন্দির, নন্দনকানন, আরও সব দেখেটেখে মেয়েকে নিয়ে খুশি খুশি মনে আবার বাসে ফিরে আসছিল সীমা বারোভাজা খেতেখেতে, আচমকাই পেটটা কেমন গুলিয়ে উঠল। অনেক চেষ্টা করেও আর চেপে রাখতে পারলনা--- বেমক্কা ই বারোভাজার ঠোঙাটা জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে হাতের পলিপ্যাকটার মধ্যে পেটের সবটা ঢেলে তারপর যেন ঠান্ডা হল। এরপর বেশ শান্তিতেই চলছিল, হঠাৎ করে বাসটা মস্ত ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল আর বাসে উঠে এল একজন ষণ্ডামার্কা লোক। হুঙ্কার দিয়ে বাঙালিদের গুষ্টি উদ্ধার করে বলে উঠল------" এত নিষেধ করা সত্ত্বেও, এত নিয়ম বেঁধে দেওয়ার পরেও আপনাদের এত আস্ফালন! আজকে এর বিহিত করেই ছাড়ব। কে ফেলেছেন উঠে দাঁড়ান।" পুরো বাস নিশ্চুপ। কেউ উঠছেনা। উঠবে কি, জানেইতো না ব্যাপরটা কি, ফেলেছেতো সীমা ! কণ্ডাকটর অনেক বোঝালো এই বাস থেকে কিছু ফেলা হয়নি। লোকটি বলছে এই বাস থেকেই ফেলা হয়েছে এমনকি ফেলা হয়েছে একেবারে তার মুখের ওপর!! বাসের নাম্বার সে টুকে নিয়েছে। সীমা তো জানে যে কালপ্রিটটা সে নিজে আর ফেলার সময় এক ঝলক যেন দেখেওছিলো যে একটা বাইক পাস করে গেল। ভয়ে তার মুখ একেবারে কালো। আবার চিৎকার করে উঠল লোকটা--- "স্বীকার করুন, নইলে একজনকে নয়,সবাইকে আটকে রেখে দেব,আমার ক্ষমতা আপনারা জানেন না।" ড্রাইভারকেও হুমকি দিলেন যে গাড়ির লাইসেন্স তিনি বাজেয়াপ্ত করে দেবেন,বাইরে নাকি তার দলবল দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে কেউ স্বীকারও করছেনা ওদিকে লোকটার হুহুঙ্কারও বেড়ে চলছে। সীমা মনে মনে প্রমাদ গুনলো। শেষমেশ মনস্থির করে নিল সত্যিটা বলেই দেবে। তার জন্য এতগুলো লোকের হ্যারাসমেন্ট হতে পারেনা। সে উঠে দাঁড়িয়ে সমস্তটার বিবৃতি দিয়ে নিজের দোষটা স্বীকার করে নিয়ে তার ওপর কি কোপ পড়বে তার জন্য প্রস্তুত হয়ে রইল। কি আশ্চর্য! লোকটা মুহুর্তেই ঠান্ডা হয়ে কেমন যেন লজ্জিত হয়ে পড়ল ! কণ্ডাকটরকে কি যেন বলে বাস থেকে নেমে গেল, বরং তার সহযাত্রীরাই যেন কেমন একটা দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রইল। কেন লোকটা এমন করে চেঞ্জ হয়ে গেল? আসলে লোকটা বোধহয় ভেবেছিল দোষী কোন পুরুষ মানুষ হবে, অমন নরম সরম নিরীহ টাইপের দেখতে মহিলা আশা করেনি। বাস আবার চলতে শুরু করল। এ যাত্রায়ও বিপদ মুক্ত হয়ে জগন্নাথকে শতকোটি প্রণাম জানালো সীমা

          ..........তৃতীয় দিন --------

      আগামীকাল পুরী ছেড়ে চলে যেতে হবে, তাই আজ বিকেলে অনেকক্ষণ সময় তারা সমুদ্রের ধারে কাটাচ্ছে। সন্ধ্যার পর থেকেই যত সময় যাচ্ছে, সমুদ্র ততই স্বঘোষিত দর্পে তীরের আরও ভেতরে ঝাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে আসছে,আর সব মানুষের দল হেরো সৈন্যের মত ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। এই পেছাতে গিয়েই আর এক কাণ্ড করল যত কাণ্ডের ভান্ড সুমী অপগন্ড। আজ সে সমুদ্র থেকে অনেক দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল কিন্তু তার অন্যমনস্কতার ফলে আচমকাই একটা ঢেউ সেই অবধি চলে এল আর
দৌড়াতে গিয়ে টাল সামলাতে না পেরে একপাটি জুতো বালিতে ফেলে রেখে এল, অমনি ঢেউ সেই জুতোকে বুকে করে মাঝ সমুদ্রে দে ছুট! রে রে করে এগিয়ে যেতেই দেখে জুতো মহাশয়া ঢেউয়ের মাথায় চেপে হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে। সবাই ঝাঁপিয়ে পরে যেই তাকে ধরতে গেছে, চোখের নিমেষে অমনি সে মাঝ সমুদ্রে দোলায়মান! এই ভাবে বেশ কিছুক্ষণ জুতো-মানুষের ছোঁয়া ছুঁয়ি খেলা চলার পর হঠাৎই সে এক বিশাল ঢেউয়ের দোলায় চেপে টা টা বাই বাই জানিয়ে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরও তার দেখা না পেয়ে রেগেমেগে দ্বিতীয় জুতো টাকেও জলে জলাঞ্জলী দিয়ে ক্ষুন্ন মনে হোটেলে ফিরে চলল সীমা। উঃ মেয়েকে সাগর দেখানোর মাশুল একেবারে কড়ায় গণ্ডায় উসুল করে নিল পুরী!!



 

বিপুল তরঙ্গ রে

অনিতা নাগ 


বহমান জীবনে তরঙ্গের পর তরঙ্গ কাটিয়ে এগিয়ে চলা। মনে পড়ে ছোটবেলায় পাড়ার এক ডোবায় ছোট ছোট ঢিল ছুঁড়তো সকলে মিলে। এক একটা ঢিল যেই স্পর্শ করতো জলকে অমনি এক তরঙ্গ তৈরী হতো। অনেকগুলো তরঙ্গ মিলিয়ে একটা আবর্ত। খুব মজার খেলা ছিলো। তখন বোঝার বয়সই হয় নি যে জীবন মানেই তরঙ্গের সমাহার। এমন কতো শত তরঙ্গ পেরিয়ে চলতে হবে জীবনে। প্রথম সমুদ্র দর্শন অনেক ছোটবেলায়। অবিরাম ঢেউ এর ভাঙা আর গড়া। সেই প্রথম দর্শনেই প্রেম। তখন সে প্রেম বুঝতে পারিনি। বেশ অনেকটা বড় হয়ে তাকে আবার দেখার সু্যোগ হয়। জীবন এগিয়ে চলে। কতো তরঙ্গ আসে, উথাল পাথাল হয় জীবন। তরঙ্গ থেকে তরঙ্গ হয়। ছোট, বড় অনেক রকমের তরঙ্গ। জীবনে প্রথম মৃত্যু দাদুর। তখন ক্লাস ফোর। মৃত্যুকে সেই প্রথম সামনে থেকে দেখা। বড্ড কষ্ট। একটা হাহাকার। আর তো এই মানুষটা হাত ধরে বেড়াতে নিয়ে যাবে না। ভর দুপুরে মাথায় ভিজে গামছা দিয়ে স্কুলের জানলায় গিয়ে দাঁড়াবে না। দাদুকে দেখেই পেটে ব্যথা শুরু। তারপর দাদুর হাত ধরে গুটিগুটি বাড়ী। ফিরতি পথে মিষ্টির দোকানে দু আনা করে দুটো ভাঁড়ে মিষ্টি দই নিয়ে ফেরা। দোকানী একদিন জিজ্ঞেস করেছিলো দু’ জায়গায় কেনো, এক জায়গায় দেবো? দাদু বললেন তুমি ঠকালেই আমি ঠকবো কেনো। দু’ জায়গায় নিলে আমার এক পয়সা বাঁচলো তো! সেই দাদুকে আর দেখতে পাবো না। বড্ড কষ্ট হচ্ছিলো। তার থেকেও বেশী কষ্ট হয়েছিলো সবাই যখন ঠাকুমাকে জোর করে আলতা পড়াচ্ছিলো, মাছ খাওয়াচ্ছিলো। ঠাম্মা কি অসহায় হয়ে সব করছিলো। মনে হচ্ছিলো চিৎকার করে উঠি। পারিনি। সেই প্রথম তরঙ্গ। তারপর কতো তরঙ্গ। উথাল পাথাল। আবার বয়ে নিয়ে চলা জীবনকে। বাবার চলে যাওয়ায় উত্তাল জীবন। রামকৃষ্ণদেবকে যেখানে দাহ করা হয়েছিলো সেই পূণ্য শ্মশানে বাবা নিঃশেষ হচ্ছেন আগুনে। পঞ্চভূতে মিশে যাচ্ছে তাঁর অস্তিত্ব। অসহায় আমি বহমান গঙ্গার দিকে তাকিয়ে তরঙ্গ গুণছি। এতো গভীর তরঙ্গ তো আমি চাইনি। বাবার শেষ কথা কানে বাজছে। মা'কে দেখো। আর দূরভাষে আমার ছেলে মেয়ের কান্না। মনকে কঠিন শিকলে বাঁধলাম। থামলে হবে না। চলতে হবে। চরৈবতি। সেই তরঙ্গ আজো ভুলিনি। ধীরে ধীরে শীতল হলো তরঙ্গ। পথ এগিয়ে চললো আপন ছন্দে। মা যখন চলে গেলেন নিঃস্ব হয়ে গেলাম। মা'র সময়ে বৈদ্যুতিক চুল্লি। তাতে কি মা'র কষ্ট কম হলো? জানতে পারিনি। আমার জীবন দায়িনী মা তখন আগুনে জীবনের সব তরঙ্গ কেটে বেড়িয়ে পড়েছেন সুদূর কোন পারের দিকে। সেখানে বাবা নিশ্চয় তার অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু আমি যে রিক্ত হয়ে গেলাম। স্রোতস্বীনির সামনে দাঁড়িয়ে একটাই প্রার্থনা আগুনের পরশ মণিতে জুড়োক তোমার সকল ব্যথা। তোমার যে কষ্ট সন্তান হয়ে কমাতে পারিনি, তা থেকে তুমি মুক্ত হও। এই তরঙ্গ আমি আগলে রাখলাম। 





ততোদিনে সমুদ্র শহরে থাকার সুবাদে তাকে অনেক কাছ থেকে দেখা। তার সঙ্গে তখন গভীর সখ্যতা। যখনই জীবনে দুঃখ এসেছে, অন্ধকার গভীর হয়েছে, পায়ে পায়ে তার সামনে গিয়ে বসেছি। তরঙ্গের পর তরঙ্গ গুণেছি। কতো রূপ তার। কতো রস তার। হেসে খলখল, গেয়ে কলকল। ধীরে ধীরে মন শান্ত হয়েছে।জীবনকে নতুন করে চিনতে শেখা তার কাছে। থামতে জানে না। আমরা পিছিয়ে পড়ি জীবনের পথে চলতে চলতে। সে যেনো মৌনী তাপস। আপন ব্যাপ্তি নিয়ে তার নিত্য ভাঙা গড়া। তাকে ঘিরে ব্যাস্ত জীবন প্রবাহ। সকাল থেকে রাত, কতো রূপে তার বয়ে চলা। সকালের আলোয় কখনো সে রক্তিম রাগে সেজে ওঠে, কখনো সুনীল জলরাশির লুটিয়ে পড়া। আবার জ্যোৎস্নায় রূপোলী আলোর আভরণ। সুন্দরী চঞ্চলা কিশোরী যেনো। তাকে ঘিরে কতো আয়োজন। দোকান পাট, কেনাকাটা, ব্যাস্ত মানুষ জন। আনমনা সে। নিজেকে নিয়েই মত্ত সে আপন খেলায়। সীমা দিয়ে এই অসীমকে বাঁধা যায় না। অরিরাম ভাঙা গড়ার খেলা চলছে। বিরামহীন তরঙ্গের দোলায় বয়ে চলা আপন ছন্দে। এই তরঙ্গ জীবনের পরম পাঠ শেখায়। যতোবার এই বিশালের সামনে এসে দাঁড়াই জীবনের সব জীর্ণতা, অবসন্নতা ফিকে হয়ে যায়। সে যেনো কানে কানে বলে ভাসিয়ে দাও যতো অন্ধকার, যতো না পাওয়া। ভরিয়ে নাও নিজেকে আলোয় আর আনন্দে। এই তরঙ্গ শিখিয়েছে যা পড়ে রইলো পিছে তাকে আর ফিরে পাওয়া যায় না। কিন্তু জীবনে থামার অবকাশ নেই। সময় তোমার অপেক্ষা করবে না। পিছিয়ে পড়লে মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। তরঙ্গ যেমন ভাসিয়ে নিয়ে যায় তার সামনে আসা সবকিছুকে। তেমনই জীবন তরঙ্গ আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে চলে অনন্তের পথে। থামার উপায় নেই। চরৈবতি, চরৈবতি
তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে
কুসুম মিলায়ে যায় কুসুম ফোটে।।


 

ইছামতী, আহা ইছামতী 
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

 ছোট্ট মিষ্টি একটা নাম। বহতা জলের ধারাই তো গঙ্গা। আমার তাই বার বার ঘুরে ফিরে আসা ইছামতীর কোলে। 

বনগাঁয় আমার জন্ম। এই দেশ সেইদেশ ঘুরে আবারও যেন ঘরে ফিরে আসা তাই কখনো ডিঙি নৌকা করে, কখনো মানস নেত্রে আমি ঘুরে বেড়াই ইছামতী নদীর পাড় ধরে। 

একটা নদীর সাথে আমার জীবনের এত ঘটনা জড়িয়ে আছে যে ইছামতী নদীর নাম শুনলেই একটা অত্যাশ্চর্য অনুভূতি মনের মধ্যে দোলা দিয়ে যায়।  একটা শক্তি সব কিছুর অগোচরে কাজ করে। 

 লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে দক্ষিণ বঙ্গ ছেড়ে একেবারে উত্তরভারত।  জীবনের টানা সতেরো বছর এই রাজ্য সেই রাজ্য, এই জেলা,  কখনো সেই জেলা কর্মসুত্রে ঘুরে বেড়িয়েছি। ঘুরে বেড়িয়েছি বললে ভুল হবে।  রথ দেখা কলাবেচা সেরেছি। সেই সব দিনগুলোতে যখনই একা হতাম, ইছামতীর টান অনুভব করতাম।  আজও সেই টান বর্তমান। মৈপিঠে সেদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার বের হয়েছে,  তড়িৎ গতিতে সেই খবর পেয়েছি বন্ধু স্বজনের মুখ থেকে। 

যশোর জেলার মধ্যে দিয়ে ইছামতীর যে অংশ প্রবাহিত হয়েছে তাতে ইছামতী নদীকে একটা ছোটো নদী বলেই মনে হবে। যত দক্ষিণে যাওয়া যাবে কুমির, কামোট,হাঙর- সঙ্কুল বিরাট  নোনা গাঙে পরিণত হয়েছে সুন্দরী ইছামতী। উৎস থেকে মোহনায় এই সুদীর্ঘ পথ চলতে চলতে কোথায় কোন সুন্দরবনের সুন্দরী গরান গাছের জঙ্গলের আড়ালে সে বঙ্গোপসাগরে মিশে গেছে সে খবর বনগাঁর গ্রাম্য অঞ্চলের মানুষ জন রাখে না।

আমার নিজের চোখে দেখা এই অতীব সুন্দর নদী  ইছামতীকে  যদি পশ্চিমবঙ্গ টুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন প্রোমোট করতো, তাহলে বহু ভ্রমণ পিপাসু মানুষ ইছামতীর অবর্ণনীয় রূপ উপভোগ করতে পারতো। এই জনপদ পর্যটকদের  স্বর্গ ভূমিতে পরিণত হত।

মড়িঘাটা বা বাজিৎপুরের ঘাট থেকে নৌকো করে চাঁদুড়িয়ার ঘাট অবধি গেলে  দেখা যাবে দুই তীরে পলতে মাদার গাছের লাল ফুল। জলজ বন্যবুড়োর ঝোঁপ ঝাড়  শোভা বর্ধন করে আছে। এখানে সেখানে  টোপো পানার দাম আপন মনের খেয়ালে ঘুরে বেড়াচ্ছে।  বুনো তিপ্পল্লা পাতারা সেজে উঠেছে তাদের  হলদে ফুলের শোভা নিয়ে।  কোথাও আবার  উঁচু পাড়ে প্রাচীণ বট অশ্বত্থের সুনিবিড় ছায়ায় বসে ক্লান্ত চাষি তার ঘোমটা টানা বউয়ের হাত থেকে পান্তাভাত নিয়ে খেতে বসেছে।  উলুটি, বাচড়া, বৈঁচি বনের ঝোপ দুই হাত দিয়ে কাছে ডেকে নিচ্ছে।  নীল সাদা আকাশে মেঘের দল খেলা করছে  আর তার নিচেই কালচে সবুজ বাঁশঝাড়।  

এই বনে সেই বনে গাঙ্গ শালিকের বাসা। নানা রঙের লতানো ফুলের রাশি রাশি   ঝাড়, দুহাত তুলে আহ্বান জানাচ্ছে।

 এই নোনা গাঙ্গের পাড়ে লোক বসতি তেমন একটা নেই।  যে দিকে দুই চোখ যায়,সবুজ দূর্বা ঘাসের চর। কোথাও দু দশটা ডিঙ্গি নৌকা বাঁধা আছে।  বনফুল ভর্তি ঝোঁপ ঝাড়। উঁচু শিমুল গাছের শুকনো ডালের ওপর সমাধিস্থ শকুনি বসে আছে। যেন কোনো ক্যানভাসে আঁকা শিল্পীর ছবি। কোনো ঘাটে গ্রাম্য মেয়ে বউরা স্নান করছে। তীরে  প্রাইমারি স্কুলের মাঠ। জল নিয়ে খেলা করছে  শিশু- কিশোরের দল। লম্বা লম্বা দো - চালাঘর, দরমা বা কঞ্চির বেড়া দিয়ে ঘেরা ফুলকপি, পালং, বেগুন, ধনেপাতা আলো করে সেজে উঠেছে।

এভাবেই সবুজ চরভূমি সেজে ওঠে। ছয় ঋতুতে ইছামতী তার  ছয় রূপ ধারণ করে।  বর্ষায় তার এক রূপ,  শরৎ কালে অন্য রূপ আর শীতে তো কথাই নেই।  উঠোনের ফুলবাগানে ফুল কমে আসলেও ইছামতীর আঙ্গিনায় ফুলের অভাব নেই।  আকন্দ,কুন্দ, রঙ্গন আরও শত শত নাম না জানা ফুল শোভা বর্ধন করে। 

জানি না পরজন্ম বলে কিছু হয় কি না তবে আগামী জন্মে ইছামতীর কোলেই জন্ম নিতে চাই,  বেড়ে উঠতে চাই।


 

ভূ-স্বর্গ---এখানেই

গৌতমেন্দু নন্দী


এখানে মাটিতেই নেমেছে স্বর্গ----

    স্বর্গ মানে তো মৃত্যুর পরে 
      মৃত্যুর যন্ত্রণা পেরিয়ে ---       
   অজানা অদৃষ্ট কোন পরলোকে ----!?

    না, এখানে নেই----
    জীবন-মৃত্যুর কোন আতঙ্কিত সীমারেখা 
    এক জীবনে সব সীমারেখার ঊর্ধে 
    মিশেছে স্বর্গ-মর্ত্য,ভূ-লোক-দ্যুলোক
    এক নতুন ঠিকানায় ----- 
                                          এখানেই ----

    কল্পিত স্বপ্ন-সুখের কোন অলীক সৌন্দর্য নয়
   প্রকৃতির নির্মল ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে 
     মাথা তুলে দাঁড়াতে হয় হিমালয়ের মতো
     আবার এখানেই শয্যা পাততে হয় 
     আদিগন্ত তুষার-শুভ্র চাদরে-----
                                          এখানেই ----

     জীবন-তরীর শিকারায় ভাসতে ভাসতে 
     ঢেউয়ের ছন্দ দোলায় মিশে যায় 
     জীবন স্পন্দনের অনুরণন ---
    এই জীবন-মর্ত্যের নতুন ঠিকানায় ------
                                           এখানেই-----
      


 

শিশুদের বিকাশের ক্ষেত্রে বাবা মায়ের ভূমিকা

মনোমিতা চক্রবর্তী


"ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা 
সব শিশুরই অন্তরে ।"
      
        কবির মতো আমাদেরও ধ্রুব বিশ্বাস যে শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ এবং তাদের মধ্যে নিহিত রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা ।আমাদের প্রত্যেকের প্রত্যাশা যে, আজকের শিশু একদিন আদর্শ নাগরিক হয়ে দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং দেশের সুনাম বৃদ্ধি করবে। 
আমার মনে হয় আজকের ফুলের মত সুন্দর নিষ্পাপ শিশুদের ভবিষ্যত সমাজের কর্ণধার হিসেবে তৈরী করতে গেলে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । আর এ বিষয়ে মূল ভূমিকা পালন করেন শিশুর বাবা ও মা। প্রত্যেক বাবা-মারই উচিত শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ যাতে যথার্থভাবে হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা। 
কিন্তু বেশিরভাগ বাবা-মায়েরা শিশুর শারীরিক বিকাশের দিকে খেয়াল রাখলেও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে অতটাও যত্নশীল হন না।      

বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেশিরভাগ বাবা-মায়েদের সন্তানকে দেওয়ার মতো সময় খুব কম। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে যেমন ভাবের আদান-প্রদান ঠিকমতো হয় না তেমনি একটা দূরত্বও কিন্তু তৈরি হয়। 
আমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখি শিশুরা খেতে না চাইলে বা কোনো কিছু নিয়ে জেদ করলে তাদের বাবা মায়েরা মোবাইল বা টিভির স্ক্রিনের সামনে শিশুকে বসিয়ে দিয়ে কার্টুন দেখিয়ে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করে এবং খাওয়াতে চেষ্টা করে। এভাবেই বাবা মায়েরা সন্তানদের মধ্যে একপ্রকার গ্যাজেটের আসক্তি তৈরি করে। আর এই গ্যাজেটের আসক্তির ফলে শিশুদের অন্য কোন চিন্তাশক্তির সুযোগ তৈরি হয় না। এটা কিন্তু শিশুর মানসিক বিকাশে অনেক বড় বাধা হয়ে যেমন দাঁড়ায় তেমনি শিশু তার ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে এবং এর সাথে সাথে শিশু কিন্তু তার বুদ্ধিমত্তার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে।
এক্ষেত্রে বাবা মায়েদের ধৈর্যশীল হতে হবে ।ধৈর্য ধরে শিশুদের খাওয়াতে হবে ।কারণ একটি শিশুর খিদে পেলে সে স্বাভাবিক নিয়মেই খাবে। তার জন্য শুধু প্রয়োজন বাবা মায়েদেরএকটু ধৈর্য ধরে সময় দেওয়া ।
 শিশুরা কিন্তু বেড়ে ওঠার শিক্ষা পায় তাদের পরিবার থেকেই। কিছু কিছু শিশু তাদের পরিবারে মাকে নির্যাতিত হতে দেখলে, বা বাবা মায়েদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখতে দেখতে বেড়ে উঠলে তারা জীবনে হতাশ, অসামাজিক এবং অসহিষ্ণু যেমন হয় তেমনি নিরাপত্তাহীনতাতেও কিন্তু ভোগে।
 আবার বাবা মায়েদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দেখে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে কিন্তু সুখ ও নিরাপত্তা বোধ জাগ্রত হয়।
শিশুদের সুস্থ জীবনের জন্য বাবা-মাকেই সতর্ক হতে হবে। শিশুদের মধ্যে জাগাতে হবে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা।
 তাই শিশুদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য বাবা মায়েদের শিশুদের প্রতি শাসনসুলভ মনোভাব ছেড়ে, বন্ধুসুলভ মনোভাব রাখতে হবে। শিশুকে বেশি করে সময় দিতে হবে, কথা বলতে হবে, খেলতে হবে শিশুদের সাথে। শিশুকে সুশিক্ষা,নিরাপত্তা, ভালোবাসা, মনোযোগ ,কোয়ালিটি টাইম এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ দিয়েই বড় করতে হবে। তাহলেই কিন্তু শিশুদের বিকাশ সুস্থ ও স্বাভাবিক হবে।


 

বুড়োবয়সের চুলকানি
প্রদীপ কুমার দে

কর্তার কর্তৃত্ব অনেক।
ডাবে গাছ ভরে গেছে। 
বর্তমানে ডাব পেড়ে দেওয়ার লোক পাওয়া বড় দায়। লোক পাওয়া দুস্তর! 
সেটা অন্য কথা।
আসল কথা খরচের দায়।
সেটাই আসল কথা।

তর সইল না উদ্ভবের। তড়িঘড়ি তরতর করে নারিকেল গাছের গা ধরে পা চেপে হাঁটু ঘষে উঠতে  লাগল। দম বেড়িয়ে মুখে লালা ঝরে গেল। গোল-গোল ডাব দেখে হাত দিতেই বুড়োর মন ভরে নিজেকে যুবক ভেবে বসল। 
স্বপ্নজাল ...
আর ধপাস ....
দুম ....
দরাম।

মাথা ফেটে। রক্ত লাল।
মায়াময় পড়শি।
তুলে সোজা হসপিটালে ...

ডাক্তারের জিজ্ঞাস্য,
--  বয়স?

--  নব্বই।

ডাক্তার চুলকানির মলম লিখে দিল।

উদ্ভবের কষ্টের প্রশ্ন,
--  এটা কি মাথায় লাগাবো ?

--  না না। এই বয়সে নারিকেল গাছে উঠলে মাথার চিকিৎসা করলে হবে না। ওই মলম নিজের পিছনেই লাগাতে হবে।
বুড়োবয়সের চুলকানি যে ....



 

ইচ্ছে 

অন্বেষা মিত্র


সৃষ্টি আচ্ছা মা!! জ্ঞান হবার পর থেকেই দেখছি তুমি খালি আমাদের পরিবার এর কথাই ভেবে চলেছো।। কার কোনটা তে ভালো হবে কে কি খেতে ভালোবাসে কার কোন জিনিস টা সবচেয়ে পছন্দের , আমার কি লাগবে দাদা র কবে কি আছে , দাদা র কবে কি লাগবে বাবা র কোন সময় কোন ওষুধ আছে সেই গুলোই দেখে চলেছ, কিন্তু মা  আমি তো দেখিনা তোমাকে নিজের কথা কোনোদিন ভাবতে। পরিবার এর কেউ তো তোমার কথা কোনোদিন ও ভাবেনি তাহলে তুমি সবার কথা এতো ভাব কেন? সবার জন্য এতো কর কেন? বলতে পারবে !! যাইহোক  সবার কথা নাহয়  বাদ ই দিলাম  নিজের ছেলে ও তো কোনোদিন তোমার মুখের দিক এ তাকায়নি , কোনোদিন ও তোমাকে মা বলে ডাকেনি  ,  আর বাবা র কথা তো ছেড়েই দাও।  সৃষ্টি র মুখে এসব কথা শুনে বিন্দু চমকে গিয়ে বলে 


বিন্দু :- চুপ এসব কি কথা বলছিস মা এসব বলতে নেই। আমি না বাড়ির বড় বউ আমাকেই তো সব দেখতে হবে , আর ভুল করেও কারোর কাছে গিয়ে এসব বলিসনা মা নাহলে আবার একটা অশান্তি হবে  , সৃষ্টি দেখে বিন্দু র চোখ এ জল কিন্তু সে যে ওর মা এর জন্য  কিছু করবে সেই উপায় তার ছিল না কারণ সে নিজে কোনো রোজগার করত না। 

এবার আসি বিন্দুর পরিবার তথা তাঁর শ্বশুরবাড়ির কথায়। 


সেন পরিবার : লোক এর কাছে এই পরিবার  বেশ  সম্ভ্রান্ত পরিবার নামে খ্যাত ছিলো , এই বাড়ির কর্তা ছিলেন গুণধর সেন , তিনি মারা যাবার পর এখন কর্তী তার স্ত্রী কমলা সেন। তার দুই ছেলে , ছোটছেলে প্রেম করে বিয়ে করেছিল, তাঁর মা প্রেম জিনিস টা কে ভালো চোখ এ দেখতোনা কিন্তু যখন দেখলো আমার বৌমা বেশ বড়োলোক এর বাড়ির অনেক টাকা পয়সা আছে সেই দেখে তিনি ও ভিজে বিড়াল হয়ে গেলেন বরঞ্চ ছোট বৌমা কে সে আদর এ যত্নে মুড়ে রাখতেন। কিন্তু তাঁর বড়ছেলে ছিল অন্য রকম সে নিজের মত থাকতে পছন্দ করতো জীবন এর মোহো মায়া সব ত্যাগ করে ফেলেছিলো সে তাই বিয়ে তাও  প্রায় জোর করেই দেয়া হয়েছিল,এবার আসি বিন্দু র কথায়,   বিন্দু  রা ছিল খুব গরিব , বিন্দু র মা কমলা দেবী দের বাড়িতে কাজ করতেন গুণধর সেন এর আমল থেকে। কমলা দেবী র ছেলে এরকম আপনভোলা বলে কেউ তাকে বিয়ে করতে রাজি ছিলো  না। এদিক এ ছেলে র বয়স ও বেড়ে যাচ্ছিলো , ঠিক এমন সময় বিন্দু একদিন তাঁর বাড়িতে তাঁর মেয়ে কে নিয়ে এলো যাতে সে কমলা র হাতে হাতে সাহায্য করে দেয় র তাঁর বড়ো ছেলে কে ও দেখে রাখতে পারে, কমলা তখন ই বুদ্ধি করে তাকেই সেন পরিবার এর বড়ো বৌ করে আনলো।   কিন্তু তাকে বাড়ির কেউ মেনে নেয়নি কারণ সে ছিল গরিব, এমনকি কমলা দেবী ও না। বিন্দু র ছেলেটা  ও হয়েছিল  ঠাম্মা র মতো মা কে কারুর সামনে পরিচয় দিতে লজ্জা পেতো সে, এমনকি তাকে মা বলে ডাকত ও না , বিন্দু র মেয়েটাই একমাত্র তাঁর মতো  প্রতিবাদী হয়েছিল। কিন্তু , শুধু তার মা বারণ করত বলেই সে কাউকে কিছু বলতে পারত না । 


কিচ্ছুক্ষন পর ছোটবউ  নিচে নেমে এসে বলে , `কিগো দিদি আমার গরম জল টা হলো গো স্নান এ যাবো তো তারপর আবার শপিং করতে যেতে হবে , ও হ্যা দিদি শোনো আজকে আমার র সমু র বাড়ি ফিরতে রাত হবে আমাদের জন্য খাবার রেখোনা` 

বিন্দু :- বলি ও ছোট কদিন ধরে তো বাইরেই খাচ্ছিস , এবার তো শরীর খারাপ করবে !

প্রমীলা সে কি গো! ভালোই বুলি ফুটেছে দেখছি তো দাড়াও আজ দেখাচ্ছি মজা। 

প্রমীলা ওগো কে কোথায় আছো শুনছো গো দেখো দিদি র কি চ্যাটাং চ্যাটাং কথা হয়েছে ,  

বিন্দু -  না না ছোট ওভাবে তোকে কিছু বলিনি রে আমি শুধু তোর ভালো র জন্যই... 

কথাটা শেষ করতে পারলোনা বিন্দু   ততক্ষন এ বাড়ির সবাই নিচে নেমে এলো, পরক্ষণে এই বিন্দু র ছেলে বলে ওঠে  `তোমাকে এতো বাড়তি কথা বলতে কে বলে বলোতো সবার ভালো করে তুমি কোন মহাভারত শুদ্ধ করবে, যেমন আছো তেমন থাকো প্লিজ।' 


কথক তারপর আর কি সবাই বিন্দু কে  উল্টোপাল্টা কথা শুনিয়ে উপরে চলে যায় , তখন ছোট এসে কানে কানে বলে যাই ,  

প্রমীলা আগে আমার মতো নিজে রোজগার করো তারপর আমাকে এরম টাকোস টাকোস কথা শুনিও ঠিক আছে তো ??


কথক -   বিন্দু আর কি করবে সে ও কাঁদতে কাঁদতে চলে যায় রান্নাঘর এ । তার মেয়ে কিন্তু আড়ালে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনেছিলো এবং সে   ঠিক করেছিল যে সে আর তার মাকে সবার সামনে অপমানিত হতে দেবে না ,তার  মায়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা গুন গুলো সে খুঁজে বার করবে. 

ঠিক এমন ই একদিন ঘর খুঁজতে খুঁজতে  খুঁজে পেলো তার মায়ের নাচের সার্টিফিকেট আর  মেডেল। তারপর সে একদিন তার মা র কাছ থেকে সব কথা চালাকি করে জেনে নিলো , সে জানতে পারলো তার মা নাকি এতো ভালো নাচ করতো সবাই তাকে নাচ নিয়েই এগোতে বলেছিলো কিন্তু তার দারিদ্রতা তাকে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে দেয় নি। সৃষ্টি সেদিন ই ঠিক করে ফেলেছিলো মা এর জীবন এ আবার যেকরে হোক নাচ টা কে  ফিরিয়ে আনবেই , আর সবার মুখ এর উপর যোগ্য জবাব সবাইকে এটাই বুঝিয়ে দেবে যে তাঁর মা অসহায় না, 


পার্ট -২ 

কথক -  অনেক জায়গায় খোঁজ করতে করতে   হঠাৎ করে  সৃষ্টি ভাগ্যবশত  খোঁজ পায় একটা নাচ এর স্কুল এর, সৃষ্টি তার মা কে অনেক বুঝিয়ে বোঝায়, তাঁর মা না ভর্তি হবার জন্য জেদ করলে সে ও তাঁর মা র সাথেই ভর্তি হয় ,   ১বছর প্রায় বাড়ি থেকে নাচ এর স্কুল যেত মা আর মেয়ে মিলে  কিন্তু , ভাগ্য কি সবসময় সাথ দেয়!! সেদিন ও তাদের সাথে তাদের ভাগ্য ছিলোনা , সেদিন বেরোতে গিয়ে ছোটবৌ এর সাথে ধাক্কা লেগে বিন্দু র ব্যাগ থেকে নাচ এর সব জিনিসপত্র পরে গেলো , ব্যাস আবার কি! সবাই সেদিন জেনে গেলো যে সে র তাঁর মেয়ে ২জন এই নাচ এর স্কুল এ ভর্তি হয়েছে , তারপর আর কি প্রত্যেক বার যা হয় এবার ও তার ব্যতিক্রম হয় নি, সবাই যাচ্ছেতাই ভাবে বিন্দু র সৃষ্টি কে অপমান করে তাকে ঘর দিয়ে তাড়িয়ে দিল, বিন্দু চোখ এর কোনায় জল নিয়ে তাঁর বর সাম্য র দিকে তাকালো দেখলো সে তাঁর নিজের খেয়াল এই ব্যস্ত, বাড়ির লোক জন তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলো সাথে তার মেয়ে কে ও। তারা অনেক কষ্ট করে একটা ঘর ভাড়া করে সেখানে থাকতে লাগলো । তারপর থেকে বিন্দু টিউশন করিয়ে মেয়ে কে মানুষ করে সাথে মেয়ে নিজে ও টিউশনি করাতো এভাবেই  নিজেদের এই ছোট্ট সংসার তা কে তারা চালাতো তার সাথে তো নাচ ছিলই ,  ওদের স্বপ্ন ছিল একদিন না একদিন ওরা সফল হবেই আর সবাইকে দেখিয়ে দেবে যে উপায় র ইচ্ছে থাকলেই  সবকিছু করা যায় , এভাবেই তাদের দিন চলতে থাকে ,  হঠাৎ একদিন তাঁদের নাচ এর স্কুল এ খবর এলো যে সেখানে  একটা বড়ো ফাংশন হবে বাইরে দিয়ে অনেক লোক জন ও আসবে তাঁদের নাচ দেখতে, আর সেখানে জিততে পারলে 50,000 টাকা পুরস্কার দেবে, কিন্তু সেই ফাংশন টা ৩দিন পরেই, সৃষ্টি তো খুব খুশি কিন্তু বিন্দুর মুখে হাসি নেই কারণ তার শরীর বা মন কোনোটাই ভাল নেই, সে এখনো ভেবে চলেছিল তাঁর বর কি খাচ্ছে তাঁর ছেলে কি করছে, কিন্তু তার মেয়ে তাকে সাহস দিলো ভরসা দিলো বললো 

সৃষ্টি মা আমরা নিজেদের কে যোগ্য করে তুললে আমাদের বাড়িতে আমাদের সন্মান থাকবে নাহলে না তুমি তোমার জন্য লড়ো, তোমার সন্মান এর জন্য লড়ো, দেখিয়ে দাও সবাইকে যে আমি ও পারি। শেষ ই বিন্দু রাজি হলো এই প্রতিযোগিতায় নাম দেবার জন্য। 


কথক -    অবশেষে সেই দিনটা এলো , সেন পরিবার খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের অনেক নাম ডাক ও আছে তাই সেখানে সেন পরিবার এর ও নিমন্ত্রণ ছিল , কিন্তু তারা এসেছিলো শুধু মজা দেখতে, কারণ তারা জানত যে বিন্দু র সৃষ্টি এই প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছে , তারপর সবার নাচ শেষ হলে  বিন্দু র সৃষ্টি র নাচ শেষ হলো এবং তারা এতো ভালো নাচলো যে  সবাই হয়ে গেলো বিশেষ করে তাঁর পরিবার এর লোক ।  সব শেষ হয়ে যাবার পর তারাই জিতলো প্রতিযোগিতা টা র ৫০, ০০০ টাকা ও জিতলো। শেষ এ বড় বউ এর কাছে নিজের ভুল বুঝতে পেরে সবাই ক্ষমা চাইতে আসলো, তার মেয়ে র কাছে ও ক্ষমা চাইলো , তার ছেলে যে তার মা কে পরিচয় দিতে লজ্জা পেতো মা ডাকতে লজ্জা পেতো সে ও সেদিন  তার বন্ধুদের নিয়ে এসে দেখাচ্ছিল এই দেখ এটা আমার মা আর  বোন, তাঁর গোটা পরিবার তাঁদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবার আপ্রাণ চেষ্টা করলো  কিন্তু তারা আর সেই বাড়িতে ফিরে গেলোনা বিন্দু সবাইকে বিদায় জানিয়ে বললো সে র তাঁর মেয়ে সেন পরিবার এ র থাকবেনা, তারা  অন্যজায়গায় চলে চলে যাবে। 

                               যাবার আগে একটা কথা বলে গেলো যে কথাটা শুনে কারুর আর তাদের আটকানো র ক্ষমতা হলো না , সে বললো আমার যখন তোমাদের দরকার ছিল তোমরা আমার পাশে ছিলে না এমনকি আমার বর আমার ছেলে কেউ ছিলোনা  ছিল শুধু আমার মেয়ে, আমার মেয়ে আজকে আমাকে বুঝিয়েছে শিরদাঁড়া ভেঙে গেলে ও দাঁড়ানো যাই , আর আমি দাঁড়িয়েছি , এখন থেকে আমার মেয়েই আমার সব , আমার মেয়েই আমার পরিবার। ।



 

দুটি সুর

শুভেন্দু নন্দী 


ফাগুন মাসের বিদায় ঘন্টা বাজতে আর যে বেশী দেরী নেই।  ঠান্ডা -গরমের এখনও মিশ্র অনুভূতি। রোদের তেজ তেমন তীব্র নয়। বসন্তে কোকিলের একটানা কুহুরবে চারিদিক আজ সচকিত।.... মৈনাক এইমাত্র বাড়ি ফিরলো- বন্ধুদের সঙ্গে  মজলিসি আড্ডা সেরে। বাঙালী যেমন কর্মবিমুখ; তেমনি আবার আড্ডাপ্রিয়। তবুও মনটা তার আজ ভারী। সকাল-বিকেল-সন্ধ্যা - আড্ডার এই যে মানসিকতা, এটার ছন্দপতনের কথা ভেবে। ব্যাপারটা তবে খুলেই বলা যাক। গতকাল teachership-এর নিয়োগপত্র পেয়েছে মৈনাক।  স্পষ্টতঃই বাড়ির সকলেই উচ্ছ্বসিত।  মা আর ছোট্ট বোন টুমপা। বাবার সরকারী চাকরী। শেষ হবার মেয়াদ আর মাত্র একমাস। পি.এইচ.ডি. করছে ওর বোন। মৈনাকের চাকরীর স্থল বাড়ি থেকে বেশ দূরে। অবশ্য এটার কথা এখনই ভাবছেনা মৈনাক।  বাবা-মার মুখে হাসি ফুটেছে-এটাই ওর কাছে ভীষণ স্বস্তিদায়ক।  আজ সে খবর তার বন্ধুমহলে ছড়িয়ে দেবার জন্য সকাল সকাল তার আড্ডার স্থলে হাজির হয়েছে। বলা বাহুল্য, সকলেই উচ্ছ্বসিত।  "বেকারত্বের জ্বালা তোর এতদিনে ঘুচলো রে- আমাদের যে কি হবে?" সকলেই একথা সমস্বরে ঘোষণা করলো বেদনাহত হয়ে। সকলকে চায়ের দোকানে বসে মিষ্টিমুখে আপ্যায়িত করলো। সঙ্গে অবশ্যই চা। দীর্ঘায়িত হোলো তাদের কথাবার্তা। অবশেষে বাড়ি ফিরলো সাইকেল চালিয়ে ঘর্মাক্ত কলেবরে। সব কিছুই তার আজ নতুন লাগছে। আকাশ,বাতাস- সবুজ, মধুর,রঙীন- সব কিছুই তার এই চাকরী পাবার সুবাদে। শিক্ষকতার চাকরী এই দুর্মুল্যের বাজারে ! সে স্বগতোক্তি করে উঠলো। Salary-তো রীতিমতন lucrative! সব কিছুর প্রাপ্তি S.S.C.-এর বদান্যতায়।  বন্ধুবান্ধবদের সাথে রীতিমতন আড্ডা, গল্পগুজব, রাজনীতি,খেলাধূলো,সাহিত্যচর্চার খোলাখুলি আলোচনা, চায়ের পেয়ালায় ঘন্টার পর ঘন্টা তুফান-এগুলো বন্ধ হবার চিন্তায় তার মন ক্রমশঃ ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। তাদের সাথে আসন্ন বিদায়ের কথা ভেবে রীতিমতন মুষড়ে পড়লো মৈনাক। সাতদিন পরেই তার চাকরিতে যোগদানের কথা ভেবে একই সাথে পুলকিত আবার বিষাদগ্রন্থ হয়ে উঠলো মন। 
-"দাদা- আমাকে কিন্তু একটা অত্যাধুনিক মোবাইল ফোন কিনে দিতে হবে" বোন আবদার করে বলে ওঠে।
-আমাদের কথাও কিছু ভেবেছিস কী?" বলে বাবা-মা রগড় করতে থাকলেন।
-" সব হবে। সব হবে।" হাসতে হাসতে বলে ওঠে মৈনাক। 
- কি গো ? তোমার আবার কি হোলো?" মা শুধালেন বাবাকে।
-" কিছু হয়নি তো" বাবার চটজলদি উত্তর। 
কিন্ত মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে থাকেন-"তোমার হোলো শুরু, আমার হোলো সারা। আর মাত্র তো একটি মাস। তারপরই তো retirement. এতদিনের ছকে বাঁধা routine-এর বিরাট একটা 
ছন্দপতন ঘটবে।"
কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটা গান তাঁর
বিশেষভাবে মনে পড়ে গেলো- "চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়"


 

শিল্পী- আকাশলীনা ঢোল 





 

অ-যোদ্ধা পর্ব
     শ্যামলী সেনগুপ্ত 


সেসব অনেক কালের কথা
বৃষ্টির পর ঝমঝমিয়ে রোদ উঠলে
লোকে বলতো ,শ্যাল-কুকুরের বে'  হচ্ছে।

রামধনুর মতো দিনগুলি 
ছিল বৃত্তাকার 
যার অর্ধেক দেখা যেত
বাকি আধখানা বিপরীত মেরু
জবরদখল করতো।

পাঁচালি শুনতে শুনতে 
আর প্যাচাল পাড়তে পাড়তে 
হরিমতীর নথ ঠিকরানো আলো
দোদুল দুলতো, 

একবার এ আড়ায় 
তো দুই  গুণতেই 
কুটুম বাড়ির চালে
ততক্ষণে মহাজনের লোকজন 
চাল মাপছে...রাম দুই  তিন

রাম শব্দের এত অর্থ!
সেসব শিখতে শিখতে বড়ো বেলায় পৌঁছে গেলে
আরও অর্থহীন অর্থ 
এবং  অনর্থ জমাট বাঁধতে থাকে
মন্দিরের পেছনের চাতালে
অথবা ভূতগ্রস্ত ভিতে...

রামধনুর মাপ আরও বিস্তার 
ছুঁড়ে দেয়
যেন তার চাওয়াটাই হকদার!

আমরা ,যারা রঙিন হয়ে ছিলাম 
ক্রমশ সিঁটিয়ে যাচ্ছি

আর সেইসব পুরাতন আলো
সাদা ফোকাসের আড়ালে 
আরও শাদা, 
শ্বেতিছাপ 
হয়ে উঠছে মুখ ও সর্বাঙ্গ

ধনুক থেকে আলাদা হয়েছে 
রাম
টানটান জ্যা থেকে ছিটকে যাচ্ছে
নামমাত্র অস্তিত্ব