বাড়ি
ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য
“ তাহলে এখানে তুমি থাকবে না?”, ঈষৎ আহত স্বরেই বলল মনু।
সীমাদেবী ছেলের মেঘাচ্ছন্ন মুখের দিকে চেয়ে মনে মনে একটু বিব্রত বোধ করলেন। তাঁর আদরের মনু এত বড় বাড়ি করেছে। দোতলায় বাগানঘেঁষা খোলামেলা বড় ঘরটি তাঁর প্রয়োজনের কথা মনে রেখেই বিশেষভাবে তৈরি। অ্যাটাচ টয়লেট। সাথে সাদা মার্বেলমোড়া ঠাকুরঘর। দক্ষিণে লম্বাটে প্রশস্ত ব্যালকনি। তাঁর অজ পাড়াগাঁয়ের টিনের চালওলা পুরনো ভিটের চেয়ে অনেক আরামের।
সীমাদেবী মনে মনে একটু অসোয়াস্তি বোধ করতে থাকেন। কীভাবে যে বলবেন ওকে কথাটা! কুটোটি নাড়তে হয় না এখানে। বৌমাও যত্ন করে যথেষ্ট। তবু এত সুখে থেকেও মনে কোনও স্বস্তি নেই তাঁর। থেকে থেকেই মন পালাই পালাই করছে।
“ আমার না এখানে মন লাগছে না রে! কেন লাগছে না তাও ঠিক বলতে পারি না। অসুবিধে তো কিছুমাত্র নেই। তবুও মনকেমন করছে বড়। আমাকে বাড়ি দিয়ে আয় বাবা!”, সীমাদেবীর কাতর স্বরে ব্যাকুলতা উথলে ওঠে।
********
কাঠের নড়বড়ে গেট ঠেলে জনশূন্য বাড়িটায় ঢুকলেন সীমাদেবী। থোকা থোকা গোলাপী মাধবীলতায় ছেয়ে আছে বারান্দার গ্রীল। মনটা নিমেষে হালকা হয়ে গেল তাঁর। তৃপ্ত মুখে বাড়ির সামনের একচিলতে মাটিতে সামান্য যত্নে বেড়ে ওঠা জবা টগর দোপাটী নয়নতারায় ঝলমল করতে থাকা সাদামাটা বাড়িখানা দু’চোখ ভরে দেখতে থাকেন সীমাদেবী। নাঃ! কোনও রাজপ্রাসাদে নয়, তাঁর প্রাণভোমরাটি লুকিয়ে রয়েছে এই মাটিতেই। সংসারের একেবারে শুরুর দিকের দুঃখের দিনে একা হাতে গড়া এই বাড়িই তাঁর আত্মা। আত্মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কি কেউ বাঁচতে পারে? এটা মনুকে বোঝাতে পারবেন না তিনি। কিছু উপলব্ধি বড়ই একান্ত। ও ওর মতো সুখে থাক, তাঁর সুখ এখানেই। তাঁর বার্ধক্যের বারাণসী, তাঁর স্বর্গ, তাঁর সাধের বাড়িই।

No comments:
Post a Comment