Friday, September 4, 2026




 





শতবর্ষে ভূপেন হাজারিকা : এক ‘সুধা কণ্ঠে’র অনুধ্যান

আকাশলীনা ঢোল

ভারতীয় সঙ্গীত ঘরানার স্বর্ণ যুগে আবির্ভূত হয়েছিলেন একের পর এক সঙ্গীতশিল্পী। গানের জগতে তাঁরা রেখে গিয়েছেন তাঁদের পদচিহ্ন, উপহার দিয়ে গিয়েছেন অসংখ্য গুণমুগ্ধ শ্রোতাদের একের পর এক সৃষ্টি। সেই স্বর্ণযুগেরই একজন যুগাবতার হিসেবে ভারতবর্ষ পেয়েছিল এক ‘সুধা কণ্ঠ’কে। অবশ্য, শিল্পীকে বোধহয় দেশ, কালের সীমাবদ্ধতার মাপকাঠিতে কখনওই মেলানো যায় না। তাঁরা, সর্বদেশে, সর্বকালে, সর্বভূতে বিরাজমান। সেই যুগ থেকে যুগান্তরের আলোর পথ যাত্রী হিসেবেই সঙ্গীত জগতে আবির্ভূত হয়েছিলেন ড. ভূপেন হাজারিকা। ৮ সেপ্টেম্বর ১৯২৬, আসাম রাজ্যে এই মহামানবের জন্ম হয়। এবছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালে তিনি শতবর্ষে পদার্পণ করেছেন। নশ্বর দেহ বিনষ্ট হলেও, শিল্পীর পরিচয় তো শিল্পেই। তাই, গান যতদিন বেঁচে থাকবে, শিল্পীও বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টি নিয়ে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন, তাই তাঁকে নিয়ে দু-চার কথা লিখব বলেই আজ কলম ধরেছি। নাহ্, এমন এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বেশি কথা বলার কিংবা আলোচনা করার ধৃষ্টতা আমার মতো সামান্য মানুষের নেই। আমি শুধু নিজের অনুভূতি দিয়ে স্মৃতিচারণ করতে পারি, তাঁর গান কবে, কীভাবে নিজের অনুভূতিতে মিশে গিয়েছে তার অনুসন্ধান করতে পারি।

    ভূপেন হাজারিকা, নামটার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল খুব ছোটবেলাতেই মায়ের মুখে শুনে শুনে। দুয়েকটি গানও তখন শুনেছিলাম রেডিও কিংবা টিভিতে। ছোটবেলায় শোনা একটা গানের কথা আজও খুব মনে পড়ে- ‘ডুগডুগ ডুগডুগ ডম্বরু/ মেঘে বাজায় ডম্বরু’। সুরের মধ্যে মজা থাকায় ছোটবেলায় গানটা আনন্দ দিত, বড় হয়ে গানটা যখন শুনলাম তখন গানের ভাষার সারমর্ম বুঝতে শিখেছি। গানটির মধ্যে ঘুণ ধরা সমাজের যে অব্যক্ত যন্ত্রণার দিকটি ব্যক্ত হয়েছে তা কেবল শ্রোতাদের নয়, গোটা সমাজকেই ধাক্কা দিয়ে যায়। লীলা ও যোগেনের জাতপাত না মেলায় ঘুণ ধরা সমাজ বিবাহে অনুমতি না দেওয়ার পরেও তাদের মিলন আসলে সমকালীন সমাজব্যবস্থা ও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দিকটিকেই ইঙ্গিত করে। দাবানলের হোম দেওয়া, বিজুলীর আলো দেওয়া, ঝিঁঝিঁপোকার উলুধ্বনি এবং বাতাসের সানাই বাজানোর ঘটনার মধ্যে দিয়ে রচয়িতা আসলে প্রান্তিক মানুষের জীবন সংগ্রামের কথাই তুলে ধরতে চেয়েছেন। 


    এরপর, সময় যত এগিয়েছে তত বেশি করে জেনেছি ভূপেনবাবুর সম্পর্কে। যত বেশি জেনেছি, তত ভাল করে বুঝতে পেরেছি শুধুমাত্র সঙ্গীতস্রষ্টা, সুরকার প্রভৃতি পরিচয়ের মধ্যে তাঁকে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। তিনি একাধারে কবি, সঙ্গীত রচয়িতা, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা। যা কিছুই বলি না কেন, কোনও পরিচয়ই বোধহয় তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়। সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতি ছিল তাঁর গভীর দৃষ্টি। শুধুমাত্র একটি গানেই নয়, তাঁর প্রায় সব গানেই রয়েছে মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণার কথা, সমকালীন সমাজের কথা, দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার, শাসক শ্রেণির নির্মম শোষণ, দুর্নীতি ও সততার প্রসঙ্গ। তথাকথিত রোম্যান্টিক ভাবধারার বদলে জীবনমুখী গানই বেশি শোনা গিয়েছে ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠে। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করার পর যখন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা করতে যান, তখনই আমেরিকান সঙ্গীতশিল্পী পল রবসনের সান্নিধ্যে আসেন। বর্ণের ভিত্তিতে মানুষের সঙ্গে মানুষের ভেদাভেদ আরও স্পষ্ট হয় তাঁর কাছে। পল রবসনের প্রভাব তাঁর ওপর দীর্ঘস্থায়ী হয়, একে একে সৃষ্টি হয় ‘বিস্তীর্ণ দুপারে’, ‘মোরা যাত্রী একই তরণীর’, ‘আমায় একজন সাদা মানুষ দাও যার রক্ত সাদা’, ‘আমরা করব জয়’- এর মতো কালজয়ী গান। গানের বিষয়বস্তুর জন্যই হোক কিংবা জীবনের প্রতি গভীর অন্তর্দৃষ্টি, বারংবার তাঁকে শ্রোতাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে, আবার শ্রোতাদের ভালবাসাই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বের দরবারে। সেই অনুভূতিই যেন প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ‘আমার গানের হাজার শ্রোতা’ গানে যেখানে শিল্পী বলছেন- ‘আমার গানের হাজার শ্রোতা, তোমায় নমস্কার/ গানের সভায় তুমিই তো প্রধান অলঙ্কার’। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল যে ভূপেন হাজারিকার অধিকাংশ গানই তাঁর নিজের লেখা, তবে তা সম্ভবত অসমীয়া ভাষায়। বাংলায় সেই গানগুলি অনুবাদ করতেন শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। 


    ভূপেন হাজারিকার গানের সঙ্গে আমার খুব বেশি করে পরিচয় হয় ২০১১ সালে তাঁর মৃত্যুর পর। সেইসময় শারীরিক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন আমায় গৃহবন্দী থাকতে হয়েছিল, তখন ভূপেনবাবুর গানগুলি ছিল আমার অবসরযাপনের একমাত্র সম্বল। আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা, হাতে হাতে স্মার্টফোনের এত চল ছিল না, দুনিয়া হয়তো এত স্মার্টও ছিল না, তাই আমাদের হাতে সময় ছিল গান শোনার, বই পড়ার, মানুষকে নিয়ে চিন্তা করার। রিলস দেখে ঝড়ের বেগে সময় কাটিয়ে দেওয়ার যুগ ছিল না সেটা। তাই গান শুনতাম, পরিচয় হল অনেক নতুন গানের সঙ্গে, গানের কথার সঙ্গে, নতুনভাবে চিনলাম ড. ভূপেন হাজারিকাকে। তখন থেকেই জানলাম আমাদের চোখের তারায় হাজার সূর্য আছে বলেই, আমাদের চলার পথ সুগম হয়। সেই পথে চলতে চলতেই রতনপুর বাগিচার জগ্নু আর লছমির সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায়, নতুন জীবনের সন্ধান পাওয়ার জন্যে আমরা মিলেমিশে যাই জনতার মহারণ্যে। তাঁর নতুন করে লেখা ‘মেঘদূতে’র পাতায় পাতায় মেঘ হতে চাওয়ার ব্যাকুল আর্তিই যেন অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ে শরৎবাবুকে লেখা চিঠির গফুর-আমিনা-মহেশের চোখ দিয়ে। এ প্রসঙ্গে, একটা গানের কথা বিশেষভাবে বলতে ইচ্ছে করছে। ‘কেঁদো না কেঁদো না তুমি আমার নতুন কন্যা’ গানটি যখন প্রথমবার শুনি, তখন তা বাবা ও মেয়ের স্বাভাবিক কথোপকথন বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু, সময় যত এগিয়েছে খুঁজে পেয়েছি নতুন নতুন ব্যাখ্যা। গানের প্রথম লাইনে বলা হয়েছে ‘কেঁদো না কেঁদো না তুমি, আমার নতুন কন্যা/ পাহাড় খুঁজে এনে দেবো কথা কওয়া ময়না’ যা শুনলে ছোট মেয়েকে বাবার সান্ত্বনা দেওয়ার দৃশ্যই চোখের সামনে ফুটে ওঠে। কিন্তু, যখন লেখক বলেন- ‘ধানচালের কালোবাজার শিক্ষা গুরু দেয়নি/সর্ষের তেলে ভেজাল দিতে আমায় কেউ শেখায়নি’ তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সমকালীন সমাজের দুর্নীতির দিকগুলি এবং সেই দুর্নীতির সঙ্গে হাত না মেলানোর কারণেই মানুষকে চিরকাল দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে যেতে হয়। আবার অন্য এক ধারণাও শ্রোতাদের নাড়া দিয়ে যায় যখন শোনা যায়- ‘বড়লোকের ঘরে তোমার বিয়ে হলে কন্যা/বাক্সভরা নকশাকাটা পেতে অনেক গয়না/শুধু ভুলতে যদি চাও গো মেয়ে, পেটে ক্ষুধার যাতনা/ শুনিয়ে আমি দিতে পারি কংস বধের গাওনা’ কিংবা ‘শুনতে যদি চাও গো মেয়ে, শোনো গো ও ললনা/ আগাল বাঁশের বাঁশির সুর, এই তো তোমার পাওনা’ প্রভৃতি লাইনগুলো। একদিক থেকে ব্যাখ্যা হতে পারে দরিদ্র পিতার কন্যার মুখে অন্ন তুলে না দিতে পারার ব্যর্থতার কারণেই তিনি কখনও কংস বধের গাওনা শোনাতে চেয়েছেন, কখনও আগাল বাঁশের বাঁশি বাজিয়ে শোনাতে চেয়েছেন। এ যেন সমাজের দরিদ্র মানুষদের চিরকালের কথকতা, যারা সংসারে কেবল দিয়েই যায়, বদলে পায় না কিছুই, যাদের চোখের জলের দাম কেউ কোনওদিন দেয়নি, যাদের মুখ বন্ধ করা হয় সামান্য কিছু ভিক্ষার বদলে, তাদের কথা। কংস বধের গাওনা কিংবা বাঁশের বাঁশির সুর সেই ভিক্ষা বা ভাতারই প্রতীক। অথবা এমনটাও হতে পারে, সমাজ থেকে নারীর প্রাপ্য কেবল সামান্য। তাই, ক্ষুধার যাতনাই হোক বা জীবনের যাতনা, কিংবা তার যতই কামনা-বাসনা থাকুক না কেন জীবন থেকে তার প্রাপ্য কেবল আগাল বাঁশের বাঁশির সুর, এর বেশি কিছু চাওয়ার বা পাওয়ার অধিকার তার নেই। মানুষের জীবনের নিদারুণ কষ্ট অনুভব করেই গায়ক বলেন- ‘মানুষ মানুষের জন্যে/জীবন জীবনের জন্যে/ একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?’ মানুষকে কষ্ট থেকে মুক্তি দিতেই আহ্বান জানিয়েছেন সজাগ জনতাকে, অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছেন ‘রক্তিমে এক উত্তাপ’ হওয়ার, ‘প্রচণ্ড এক প্রতাপ’ হওয়ার, ‘এক নিরাপত্তা’ হওয়ার, ‘এক সুধাকণ্ঠ’ হওয়ার। রাজা-মহারাজার দোলা সযত্নে আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে বয়ে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়েও যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে মানুষের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চলার যন্ত্রণা। ‘ভাঙ ভাঙ ভাঙ ভাঙরে পাথর ভাঙ’ গানেও রয়েছে শ্রমিক শ্রেণির ওপর শোষকের শোষণের দৃশ্য।  

   শুধুমাত্র জীবনসংগ্রাম কিংবা শোষণের দিকটিই নয়, তাঁর গানে রয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর সুরও। ইতিবাচকতার বার্তা শোনা যায় ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি’, ‘জীবনডিঙা বেয়ে চলো’, ‘আমি এক যাযাবর’, ‘এই গান হোক বহু আস্থাহীনতার বিপরীতে এক গভীর আস্থার গান’, ‘এ শহর প্রান্ত’, ‘মোর গাঁয়ের সীমানা’, ‘সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ’, ‘সাগরসংগমে সাঁতার কেটেছি কত’ প্রভৃতি গানে। ‘এ শহর প্রান্ত’ গানে মৃতনগরী কলকাতাকে নতুন উজ্জীবনী মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন তিনি ‘তুমি ইতিহাস সৃষ্টির ইতিকথা’ বলে। কিংবা, ‘এই গান হোক’ গানে যখন বলেন-‘সমসাময়িক সংঘাত/জীবনের জ্যোতিঃপ্রপাত/তার ছোঁয়া পেয়ে হোক ধন্য/ হোক সমবেত কণ্ঠ অগণ্য/ ধ্বংসমুখী দৃষ্টিভঙ্গি, কিংবা মনোমালিন্য/ সে নয় আমার গানের লক্ষ্য/ লক্ষ্য শান্তি অনন্য’, তখন ইতিবাচকতার বাণীই স্পষ্ট হয়। ‘সময়ের অগ্রগতি’ গানের এক লাইনে গায়ক স্পষ্টই বলেছেন- ‘নাই আক্ষেপ কোনও পাওয়া না পাওয়ার/সামনে রয়েছে পথ এগিয়ে যাওয়ার’। এই ইতিবাচকতাই বোধহয় আমার মতো তাঁর অগণিত ভক্তের জীবনের পথে চলার অন্যতম পাথেয়।


    কেবল জীবনমুখী গানই নয়, তাঁর গানে চিরকালীন প্রেমানুভূতি, রোমান্টিকতার ছাপও স্পষ্ট। ‘প্রেম আমার শত শ্রাবণের’, ‘তোমার ছোঁয়ার কোমল কেয়া’, ‘এ কেমন রঙ্গ জাদু’, ‘গঙ্গা আমার মা’, ‘সজনি সজনি’, ‘সহস্র জনে মোরে প্রশ্ন করে’, ‘গোপনে গোপনে কত যে খেলি’, ‘ও পাহাড়ি বন্ধু’, ‘সুউচ্চ পাহাড়ে শৃঙ্গে উঠি আমি’, ‘সাজিয়ে দোপাটি মাথার খোপাটি’, ‘একখানা মেঘ ভেসে এলো আকাশে’, ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ প্রভৃতি গানগুলির মধ্যে কখনও প্রকৃতির প্রতি প্রেম, কখনও নরনারীর প্রেমের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। আবার, এর মধ্যেও কোনও কোনও গানে মানুষের জীবনের দুঃখ ধরা দিয়ে গিয়েছে। ‘সজনি সজনি’ গানে যখন বক্তার মুখে শোনা যায়- ‘সজনি সজনি কলকাতা ঘুরিলাম/সজনি সজনি গৌহাটি ঘুরিলাম/ সজনি গো সজনি কোথাও চাকুরি জুটিল নাই’ কিংবা ‘সজনি সজনি রেল গ্যাস কোম্পানি/ সজনি সজনি রেলগাড়ির কোম্পানি/ সজনি গো সজনি কোথাও দেখি মিঠে বাতাস নাই’ তখনই সমাজের চিরকালীন বেকারত্বের সমস্যা স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। ‘একখানা মেঘ ভেসে এলো আকাশে’ গানে নির্বাসিত যক্ষের অলকানিবাসী প্রিয়ার প্রতি প্রেম নিবেদন করতে না পারার ব্যাকুল বেদনার মধ্যে দিয়ে মানুষে-মানুষে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা ব্যক্ত হয়েছে।

     স্মৃতিচারণ এবং শোকের অনুভূতিও স্পষ্ট কোনও কোনও গানে। ‘ঐ কাজল কাজল দীঘি’ গানে মা হারা মানুষের বেদনা বর্ণিত হয়েছে- ‘ঐ বেণু বনের আড়ে, ঐ কাপাস ক্ষেতের ধারে/ যার রাঙা পাড়ে আঁচল দোলায় হিমেল হিমেল বা/ সেই তো আমার মা, আমার জুঁইয়ের ডালি মা’ কিংবা ‘আজ পৌষ পাবনের রাতে, ঐ মাটির আঙিনাতে/ আজ মনে পড়ে সোনার হাতে রাঙা সোনার শাখা/ সেই তো আমার মা, আমার শ্যাম দুলালী মা’ প্রভৃতি শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে। ‘বেহুলা বাংলা দুঃখিনী বাংলা’ গানে বেহুলাকে উদ্দেশ্য করে শিল্পী যেন আসলে বাংলার ভগ্ন, নগ্ন রূপকেই সকলের সামনে তুলে ধরে সচেতন করতে চেয়েছেন- ‘লক্ষ্মী পেঁচা, চড়ুই পাখি বসে না আর ঘরে/চণ্ডীতলার আটচালা তোর ভেঙে গেছে ঝড়ে/চূর্ণী নদীর ঘূর্ণি জলে ভাসছে তেপান্তর’ বলার মধ্যে দিয়ে বিধ্বস্ত বাংলার, বাংলা মায়ের করুণ রূপের প্রতি সহানুভূতিই প্রকাশ পেয়েছে যেন। 

    কয়েকবছর আগে সৌভাগ্য হয়েছিল আসামের জালুকবাড়িতে ভূপেন হাজারিকার সমাধিক্ষেত্র দেখতে যাওয়ার। সেখানকার চিত্রশালায় দেখেছিলাম তাঁর অসংখ্য ছবি, তাঁর অসংখ্য সৃষ্টির সাক্ষ্য। ভূপেন হাজারিকা শুধু অসম রাজ্যের নন, শুধু বাংলা গানের নন, শুধু ভারতীয় সঙ্গীত ঘরানার নন, তিনি সমগ্র বিশ্বের, তিনি বিশ্বশিল্পী। তাঁর সৃষ্টিই তাঁকে নিয়ে চলেছে যুগ থেকে যুগান্তরে। তাঁর সুরে গান গেয়ছেন লতা মঙ্গেশকর, শ্যামল মিত্র, নির্মলা মিশ্র-এঁর মতো শিল্পীরা। তাঁর সুধাকণ্ঠ কখনও মানুষকে প্রেমের সাগরে জাহাজ ভাসাতে উদ্বেলিত করেছে, কখনও সমাজের বৈরির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে, কখনও শোকসাগরে নিমজ্জিত করে কাঁদিয়েছে। কখনও তিনি শুনিয়েছেন দূরের আর্তনাদের নদীর ক্রন্দন, কখনও বা মানব সাগরের কোলাহল, কখনও বা নতুন দিনের পদধ্বনি। মানুষের জীবনের স্রোত তাঁর গানে ফল্গু নদীর ন্যায় বহমান। তাঁর সম্পর্কে যা কিছুই বলি না কেন, তা-ই অতি অল্প হয়ে দাঁড়াবে। তিনি আমাদের চিন্তায়, আমাদের চেতনায়, আমাদের মননে। সবশেষে তাঁর কথাতেই তাঁকে বলতে হয়- ‘সুরবিন্যাসে মূর্ত হোক অতীত বর্তমান/চির উজ্জ্বল ভবিষ্যতেও যেন সেই সুর করে স্নান/ এই গান হোক বহু বাঁধার প্রাচীরকে ভেঙে ফেলা এক তীব্র গতির গান’, যে গান আমাদের পৌঁছে দেয় সেই সুধাকণ্ঠের কাছে, তাঁর সুর ও সুধা মূর্ত করে আমাদের যুগ যুগ ধরে। শতবর্ষে সেই সুধাকণ্ঠের প্রতি রইল আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও প্রণাম।




No comments:

Post a Comment