Friday, September 4, 2026



 স্বাধীনতা পরবর্তী অধ্যায়ে  

                       অভিজিৎ সেন 

স্বাধীনতা কোন 'সোনার পাথর বাটি নয়' স্বাধীনতা মানবচৈতন্যের গভীর অনুভূতির অন্য নাম। 'স্বাধীন' শব্দের অর্থ 'অন্যের নিয়ন্ত্রণে না থাকা' এবং 'তা' প্রত্যয়টি যুক্ত হয়ে স্বাধীনতার ভাবার্থ দাঁড়ায় নিজের অধীনে থাকার ভাব বা অধিকার । লাতিন শব্দ 'Liber' থেকে ইংরেজি 'Liberty'
এসেছে এর অর্থ 'সম্পূর্ণ মুক্তি' । স্বাধীনতা মানুষের মর্যাদা, অস্তিত্ব ও আত্ম বিকাশের সর্বোৎকৃষ্ট চালিকাশক্তি। পরাধীনতার আঁধার চিরে আলোর বুকে সন্তরণের অন্যনাম ।
মুক্ত পাখির মতো অসীম আকাশে উড়ে যাওয়ার অন্য নাম।
নিজস্ব চিন্তা,মেধা ও চেতনার পূর্ণবিকাশের পটভূমির অন্য নাম । তবে অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা কখনোই কাম্য নয়। যা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অন্যের প্রাপ্য অধিকার কেড়ে নেয়। 

               স্বাধীনতা বিষয়ে বিভিন্ন মনীষী নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি রেখে গেছেন। প্লেটো তাঁর 'The Republic' গ্রন্থে বলেন নিয়ন্ত্রণহীন স্বাধীনতা মানুষকে নিজস্ব বাসনার দাসে পরিণত করে। অ্যারিস্টোটল মনে করেন 'man is by nature a political animal' আবার স্টোইক দর্শন অনুযায়ী 
এপিকটেটাস,মার্কাস অরেলিয়াসের মতো দার্শনিকগণ মনে করেন মানুষের মন ও চিন্তার স্বাধীনতাকে কেউ বন্দী করতে পারে না । রুশো বলেন, 'man is born free but everywhere he is in chains' তিনিও মনে করেন স্বাধীনতা
মানে, যা খুশি তাই করা নয়, বরং যুক্তিসঙ্গত ও নৈতিক আইনের অধীনে থেকে নিজের ও সমষ্টির কল্যাণ সাধন করা। (The social contract) । Thomas Hobbes 'Leviathan' গ্রন্থে বলেন বাহ্যিক বাধার অনুপস্থিতি হলো স্বাধীনতা । উদারনীতিবাদের জনক জন লক বলেন মানুষ কিছু মৌলিক উপাদান নিয়ে জন্মগ্রহণ করে সেগুলি হলো--জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার । ইমানুয়েল কান্টের মতে যা ইচ্ছা তা করার নাম স্বাধীনতা নয়। লালসা বা অন্ধ অনুভূতির দ্বারা চালিত হলে তা স্বাধীনতা নয়। জন স্টুয়ার্ট মিল 'On Liberty' গ্রন্থে ব্যক্তির স্বাতন্ত্রকে ও বাক্ স্বাধীনতা সমর্থন করেন। কালমার্কস বলেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যে আক্রান্ত শ্রমিকের ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা অর্থহীন। উৎপাদনে শ্রমিকের অধিকার ও শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠাই হলো মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা। অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জঁ পল সার্ত্র বলেন মানুষ স্বাধীন হতে বাধ্য। মানুষের কোন পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য থাকে না। মানুষ তার নিজের কাজের মধ্য দিয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করে। তাই মানুষের প্রতিটি পছন্দের পেছনে তার দায়িত্ব কাজ করে। দায়িত্ব থেকে পালানোর অর্থ স্বাধীনতার সাথে প্রতারণা করা। ভারতীয় দর্শনে স্বাধীনতা বাহ্যিক পরাধীনতা থেকে মুক্তি নয়, মনের কাম,ক্রোধ, মায়া ও অহংকারের শেকল থেকে আত্মার মুক্তি। স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, 'freedom is the watchword of the soul' অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ মানুষের আত্মিক উন্মেষ ও সর্বজনীন মানবতা বোধকে 
স্বাধীনতা মনে করতেন। গান্ধীজীর 'স্বরাজ' শুধু ইংরেজদের হাত থেকে ভারতীয়দের মুক্তি নয় স্বরাজ হল 'আত্ম-শাসন' ।

                ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট মধ্যরাতে ব্রিটিশ উপনিবেশের শৃংখল ভেঙে স্বাধীন ভারতের জন্ম হলো। নিজস্ব সংবিধান চালু হলো। নিজস্ব পতাকা উত্তোলিত হলো।
আজ ৮০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। মনে প্রশ্ন জাগে ভারতীয়রা কতটা স্বাধীন হয়েছে ? যেখানে স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত থাকে সাধারণ মানুষের অধিকারে,সুরক্ষায়,সমতায়।
সর্বস্তরে কি সত্যি সেটা লক্ষণীয় ? অভাব, দারিদ্র্য, ক্ষুধা থেকে দেশের কোটি কোটি মানুষ কি মুক্তি পেয়েছে ? শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা,বেকারত্ব দূরীকরণ,যুবক-যুবতীর ভবিষ্যৎ কতটা আশার আলো পেয়েছে ? এ কথা ঠিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার দ্বারা দেশ পরিচালিত হচ্ছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় এশিয়ার বহু দেশ, স্বাধীনতার পরেও সামরিক শাসন বা স্বৈরাচারীর কবলে পড়েছে কিন্তু ভারতবর্ষ আন্তর্জাতিক 'কোল্ড ওয়ারের' মতো সমস্যাকে জোট নিরপেক্ষ নীতির মধ্যদিয়ে দূরে রেখে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে এবং শক্তিশালী করেছে । 'সবুজ বিপ্লবে'র মধ্য দিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও আজও পরিচালক বর্গের একশ্রেণির লোভের কারণে সকল সাধারণ মানুষ পুষ্টিকর খাদ্য পায় না। প্রযুক্তিতে ভারত বিশ্বজুড়ে বিশেষ স্থান দখল করলেও পাল্লা দিয়ে বেকারত্ব বেড়েই চলেছে। তাহলে স্বাধীনতা, পূর্ণতা পেল কী করে ? দেশের বিপুল সম্পদ পুঞ্জিভূত হয়ে আছে মুষ্টিমেয় ধনকুবেরদের হাতে । এদের মর্জির উপরেই সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতিক জগতও পরিচালিত হয়। তাহলে প্রকৃত স্বাধীনতা এলো কোথা থেকে ? 

                ভারতবর্ষে আজও কোটি কোটি মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার উপর বা দানের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয়। অন্নদাতা কৃষক ঋণের দায়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। খেটে খাওয়া মানুষের জীবন বঞ্চিত হতে হতে বুদবুদের মতো মিশে যায়। অথচ ভারতের সংবিধান তো প্রতিটি মানুষকে সসম্মানে বাঁচার অধিকার দিয়েছে। দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা লড়াই করেছিল তাঁরা তো এই আশা নিয়েই দেশ স্বাধীন করেছিল। জাতি ধর্ম-বর্ণ লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলেই কি সমান অধিকার লাভ করে থাকে ? যদি না ! তবে প্রকৃত স্বাধীনতা এলো কী করে ?

                 শিক্ষার ব্যাপকতার অভাবে আজও সমাজ থেকে অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদ প্রথা বিলুপ্ত হয়নি । আদিবাসী ও দলিতদের উপর অত্যাচার, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিরোধ অব্যাহত । স্বাধীন ভারতের সর্ব বিভাগে নারীরা দায়িত্বপূর্ণ কাজ করে চলেছে তবুও এই সমাজ থেকে আজও কন্যাভ্রুণ হত্যা, কন্যা সন্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, বিবাহে পণ গ্রহণ, ডাইনি অপবাদে হত্যা করা, নারী পাচার, যৌন উৎপীড়ন,ধর্ষণ,বাল্যবিবাহ প্রভৃতি চোখের সামনে ঘটে চলেছে । একজন নারীর পোশাক-পরিচ্ছদে, খাদ্যাভাসে, কর্মনির্বাচনে, চলাফেরায় আজও তার নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে নেই পূর্ণভাবে, নিয়ন্ত্রণ করে সমাজব্যবস্থা। তাহলে নারী স্বাধীন হলো কীভাবে ?

         বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ভারতের স্বাধীনতার মূল মন্ত্র। 
সংবিধান সংশোধনের দ্বারা পরবর্তীকালে ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি যুক্ত করা হয়, যাতে এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় 
নিজের ধর্মাচরণ স্বাধীনভাবে করতে পারে। তাহলে সাম্প্রদায়িক সমস্যা ও দাঙ্গা কেন ? সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা বোধের জন্ম হয়ে চলেছে তাতে ভারতের স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি কি গভীর প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়িয়ে নেই ?

                    বাক্ স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন মজবুত হলে দেশের মঙ্গল। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদ মাধ্যম। তারা যদি বাণিজ্যিক স্বার্থে, কর্পোরেটের চাপে, রাজনৈতিক প্রভাবে নিরপেক্ষতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে ভুল তথ্য প্রচার করে যায় তবে সুস্থ জনমত কি করে গড়ে উঠবে ? সংবিধানের 19 নং ধারায় বাক্ স্বাধীনতার কথা বলা আছে তবে তা হতে হবে গঠনমূলক এবং জন হিতকর। তখন সেই প্রতিবাদ কখনোই সংবিধানিক হবে না। কিন্তু সরকার যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে গঠনমূলক সমালোচনাকেও রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে বাধা দান করে তাহলে বাক্ স্বাধীনতা অর্থহীন নয় কি ?

        আধুনিক ভারতে তথা বিশ্বে ২১ শতকে নতুন সমস্যা হলো ডিজিটাল ও পরিবেশগত পরাধীনতা। রাষ্ট্র ও বৃহৎ তথ্য প্রযুক্তির সংস্থাগুলো নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের উপর নজরদারি করছে নানাভাবে, ফলে ব্যক্তিগত তথ্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে। স্বাধীনতা অন্যের হাতে আছে গচ্ছিত !

                 এক ভারতবর্ষে দুটি ভারতবর্ষ আছে। একদিকে যারা অর্থ, শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করছে এবং আধুনিক বিশ্বের সুযোগ সুবিধা উপভোগ করছে। অন্যদিকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী,ভূমিহীন কৃষক,নিরাপত্তাহীন নারী,মত প্রকাশের অপরাধের নিপীড়িত জনগণ যাঁরা থেকে গেল হতাশার আর নিঃস্ফলের দলে । তবে স্বাধীনতার বৃত্ত পূর্ণ হবে কী করে ? 

          ভারতের বাইরে বিশ্বের কয়েকটি দেশের স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাস আমাদের বিস্মিত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৭৭৬ সালে তাদের 'স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে' স্পষ্ট করে বলে সকল মানুষ সমান এবং তাদের জীবন,স্বাধীনতা ও সুখ অনুসন্ধানের অধিকার অলংঘনীয় (all men are created equal) তাহলে সেখানকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের কেন সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হলো ? ১৭৮৭ সালে সংবিধানে কর ও প্রতিনিধি সংখ্যা গণনার সুবিধার্থে বলা হলো কৃষ্ণাঙ্গ দাসেরা তিন পঞ্চমাংশ মানুষ। ১৮৩০ সালে
'Indian removal act' করে কৃষ্ণাঙ্গদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে উগ্র জাতিগত ও ধর্মীয় বিশ্বাসে শ্বেতাঙ্গরা গণহত্যাও চালালো । ১৮৫৭ সালের 'ড্রেড স্কট মামলা' অনুযায়ী কৃষ্ণাঙ্গরা মার্কিন নাগরিক নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অংশে প্রচুর তুলা ও তামাক চাষ হয় যা কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের উপর নির্ভর করে চলতো। চাবুক মেরে, শেকলে বেঁধে অমানবিকভাবে তাদের খাটানো হতো ।১৮৬১ থেকে ৬৫ 'দাস প্রথা' বন্ধ করতে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ হয়। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ারের মতো নেতাদের হাত ধরে দীর্ঘ সংগ্রামের পথে ১৮৬৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করে। তাহলে প্রশ্ন হল 'স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র'টি শুধুমাত্র কি শ্বেতাঙ্গদের জন্য ছিল, কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য নয় ?

              ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের মূল মন্ত্রই ছিল সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা। সাধারণ মানুষ রাজতন্ত্র ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে আত্মত্যাগ করেছিল। সেখানকার মনীষীগণ মুক্তির কথা প্রচার করেছিলেন। গোটা ইউরোপ, পরাধীন এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশেও এই বাণীই বিস্তার লাভ করে। কিন্তু মজার বিষয় হলো ফ্রান্সে বিপ্লব উত্তরকালে রোবসপিয়ারের সময় "reign of terror," নেপোলিয়নের 'একনায়কত্বে'র মনোভাব সেখানকার সাধারণ মানুষকে এক পরাধীনতার জাল থেকে মুক্ত করে অপর একটি স্বর্ণখচিত পরাধীনতার জালে বন্দী করেছিল, ফলে স্বাধীনতার বাণী নীরবে গেছে কেঁদে ।

              ১৯৫০-৬০ এর দশকে আফ্রিকার বহু দেশ যেমন কঙ্গো,নাইজেরিয়া ও ঘানা প্রভৃতি উপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে মুক্ত হলেও দুর্বল অর্থনীতি, স্বৈরাচারী শাসন, গৃহযুদ্ধের ফলে পুনরায় ক্ষমতা পরোক্ষভাবে বিদেশিদের হাতে ও প্রত্যক্ষভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ চক্রান্তকারীদের হাতে চলে যায়। আফ্রিকার ১৪ টি দেশকে স্বাধীনতার পরেও 'CFA france' ব্যবহার করতে বাধ্য করা হতো। IMF থেকে বিপুল ঋণ পরিশোধের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার রাষ্ট্রীয় অনুদান বন্ধ করতে হয়। দুর্বিষহ হয় সাধারণ মানুষের জীবন। আমেরিকা ও রাশিয়ার প্রক্সি যুদ্ধের ময়দান হয়ে ওঠে দেশসমূহ। উপনিবেশিক শাসকগণ আফ্রিকার শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কখনো নজর দেয়নি। ফলে স্বাধীনতা লাভের পর শাসকগণ উপনিবেশিক নীতিকে অনুসরণ করে চলে। দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনা নিত্যনৈমিতিক কাণ্ডে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আফ্রিকা' কবিতাটি স্মরণীয়। ঘানার প্রেসিডেন্ট কোয়ামে
এনক্রুমা এই অবস্থাকে ''Neo-Colonialism'' আখ্যা দিয়েছিলেন ।

        এশিয়া মহাদেশের অন্তর্গত ভারত ভেঙে তৈরি হয় পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালে দুটি দেশের জন্ম হলেও দাঙ্গা ও দেশভাগ লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ নিয়েছে এবং বাস্তুহারা করেছে। সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপকে যেভাবে পাকিস্তান আড়াল করে রাখে, তা সমগ্র মানবতার পক্ষে ভয়ানক। সূচনা লগ্ন থেকেই ভারতবর্ষ গণতান্ত্রিক আদর্শকে ভিত্তি করে এগিয়ে চলেছে। তবুও জাতি, বর্ণ, ধর্ম ও
অর্থনৈতিক বৈষম্য এখনো পূর্ণভাবে দূর হয়নি। যেদিন দূর হবে সেদিন প্রকৃত অর্থে ভারত 'বিশ্বগুরু' হতে পারবে ।

             চীন ও উত্তর কোরিয়ায় মানুষের বাক্ স্বাধীনতা নেই । চীন সরকার তিব্বত, উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষিত শিনজিয়াং বা পূর্ব তুর্কিস্তান,দক্ষিণ মঙ্গোলিয়াকে তাদের স্বায়ত্তশাসন অঞ্চল হিসেবে দেখে। স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তাইওয়ানকে দখল করতে চায়। সেই উদ্দেশ্যে ক্রমাগত সামরিক হুমকি, সীমানায় অবৈধভাবে প্রবেশ চালিয়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার সুবাদে 'ভেটো' ক্ষমতার প্রয়োগের দ্বারা বিশ্বের জন্য অহিতকর বিষয়কেও মান্যতা দিতেও পিছপা হয় না । এ কেমন স্বাধীনতা ?

                 রাশিয়ার দ্বারা সার্বভৌম দেশ ইউক্রেন আক্রান্ত হয়ে চলেছে। তাদের ভূখণ্ডের কিছু অংশ রাশিয়ার দখলে চলে গেছে। রাশিয়ার সংবিধানে মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই অধিকার সংকুচিত ও নিয়ন্ত্রিত। 
রাজনৈতিক স্বাধীনতা, বাক্ স্বাধীনতা, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা নেই বললেই চলে। অর্থনৈতিক সাম্যবাদ সেখানে নেই, আছে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত চরম পুঁজিবাদ । দেশের সম্পদ (যেমন খনি,তেল,গ্যাস,শিল্প কারখানা) পুঞ্জিভূত হয়ে আছে 'ওলিগার্ক' বা ধনকুবেরদের হাতে । রাশিয়ার সংসদে 'কমিউনিস্ট পার্টি অফ দি রাশিয়ান ফেডারেশন' সামাজিক বিপ্লব বা সাম্যবাদের পরিবর্তে ক্রেমলিং ও বর্তমান প্রেসিডেন্টের (পুতিন) নীতিকে সমর্থন করে চলেছে । তাহলে সাম্যবাদী-রাশিয়া একদা সমগ্র বিশ্বের খেটে খাওয়া মানুষদের যে স্বাধীনতা স্বপ্ন দেখিয়েছিল সেই স্বাধীনতা কোথায় ? 

                'সনাতন মার্কসবাদ' যেখানে অর্থনীতি, উৎপাদন ব্যবস্থা ও শ্রেণি সংগ্রামকে কেন্দ্রবিন্দু বিবেচনা করে। অন্যদিকে 'নব্য মার্কসবাদ' সংস্কৃতি,মনস্তত্ত্ব,গণমাধ্যম,শিক্ষা, রাজনীতি,বহুমাত্রিকতা,নমনীয়তা ও আন্তঃবিষয়কে যুক্ত করেছে তাত্ত্বিকভাবে । আন্তোনিও গ্ৰামসি, থিওডোর অ্যাভোরনো,ম্যাক্স হরকহাইমার,মারকিউস আলথুসার প্রভৃতি নব্য মার্কবাদী। উত্তর কোরিয়া সাম্যবাদ থেকে সরে এসেছি । এখানে জনগণের সর্ববিষয়ে স্বাধীনতা নেই। চীনের জনগণ অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন যাপনে কিছু স্বাধীনতা পেলেও সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা 'চীনা কমিউনিস্ট পার্টি'র হাতে। কিউবাতে কমিউনিস্ট পার্টির বাইরে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব নেই। ফলে সরকারি নীতির গঠনমূলক আলোচনার জায়গাও নেই। ভেনেজুয়েলা প্রাতিষ্ঠানিক কমিউনিস্ট রাষ্ট্র না হলেও সমাজতন্ত্র চালুর চেষ্টা হয়। কিন্তু ভুল অর্থনীতি ও দুর্নীতি দেশটিকে চরম সংকটে ফেলেছে । নাগরিকদের স্বাধীনতা,বাক্ স্বাধীনতা এখানে অনুপস্থিত। ভিয়েতনাম ও লাওস একদলীয় কমিউনিস্ট রাষ্ট্র
। পুঁজিবাদী ও মুক্ত বাজার ব্যবস্থা তারাও গ্রহণ করেছে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও বিরোধীদের মত প্রকাশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কমিউনিস্ট শাসনতান্ত্রিক আদর্শে পরিচালিত দেশ গুলির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় সাম্যবাদের ব্যর্থতা ও স্বাধীনতার সংকোচন সাম্যবাদের মৌল নীতিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে। তাহলে স্বাধীনতা কোথায় ?

             ১৭৫৭ সালে পলাশীতে বাংলার স্বাধীনতার সূর্যাস্ত হয় ভাগীরথীর জলে। তিতুমীরের বিদ্রোহ, সিপাহীদের বিদ্রোহ,ক্ষুদিরাম,সূর্যসেন,সুভাষচন্দ্র বসু,গান্ধীজী প্রমুখের আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে ইংরেজ মুক্ত হয় দেশ ।
পার্শ্ববর্তী পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরে ১৯৬৯ সালে জাতি,ধর্ম নির্বিশেষে এখানকার মানুষেরা গণঅভ্যুত্থান করে পাকিস্তানি শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে। ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ হয় শেষ ।ভারতের সাহায্যে নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু লক্ষ লক্ষ অমুসলমান সম্প্রদায়কে দেশ ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়ে আসতে হলো কেন ? তাদেরও স্বপ্ন ছিল সেই দেশে থাকার। তাদের সেই স্বাধীনতা টুকু কেড়ে নেওয়া হলো কেন ?

                   স্বাধীনতা নামক অনুভূতিটির বহুমাত্রিক রূপ আছে। পোশাকে,খাদ্যাভাসে,ধর্মচর্চায়,ব্যক্তিগত জীবন পরিচালনায়,নিরাপদে বসবাসে, চলাফেরায়, সমান আইনি সুবিধায়,ভোটদানে,মতামত প্রকাশে, গঠনমূলক আলোচনায়, দারিদ্র্য-বেকারত্ব দূরীকরণে,সামাজিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক অধিকারে,জীবিকা অর্জনের সমান সুযোগে । এছাড়া রাষ্ট্র যখন বিদেশের সম্পূর্ণ প্রভাব মুক্ত হয়ে নিজস্ব নীতি নির্ধারণে,শাসন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয় তখন অর্জিত স্বাধীনতা সার্থক হয় । তবে স্বাধীনতা কখনো উশৃঙ্খলতা নয়। স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে তাকে রক্ষা করা কঠিনতর কাজ। স্বাধীনতা দীর্ঘস্থায়ী হবে আইনের শাসন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগের দ্বারা, সচেতন ও জাগ্রত নাগরিক সমাজের দ্বারা, সত্য তথ্য প্রকাশে সক্ষম সংবাদ মাধ্যমের দ্বারা এবং গঠনমূলক সমালোচনার দ্বারা। স্বাধীনতা একটি সাময়িক বিষয় নয় এটা ধারাবাহিক চর্চার বিষয় । জর্জ বার্নার শ বলেছিলে, 'Freedom means responsibility' খেয়াল রাখতে হবে নিজের স্বাধীনতা উপভোগ করতে এসে যেন আমরা অন্যের স্বাধীনতাকে সংকুচিত না করি এটাই সু-নাগরিকের পালনীয় কর্তব্য।
 
             একটি রাষ্ট্রের সমস্ত নাগরিকগণ তখনই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হবে যখন ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলে ভয় শূণ্য হয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে, সম্মানের সাথে নিরাপদে বাঁচতে পারবে। সর্বক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ লাভ করবে । তাই বলা হয় স্বাধীনতা একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া, প্রতিদিনের চর্চার মাধ্যমে একে রক্ষা করতে হয় নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং প্রেক্ষিতে। কুসংস্কার,দারিদ্র্য,বৈষম্য,সহিংসতা,অন্যায় ও নিপীড়নের মতো অদৃশ্য বাঁধাগুলি জীবন থেকে মুক্ত হলেই আসবে প্রকৃত স্বাধীনতা । স্বাধীনতা পরবর্তী অধ্যায়টি তখন হয়ে উঠবে অনুকরণীয়,অনুসরণীয় পাথেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লাস্কি বলেছেন,'স্বাধীনতা হলো সেই সামাজিক পরিবেশের সযত্ন সংরক্ষণ, যেখানে মানুষ তার ব্যক্তিত্বকে পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত করার সুযোগ পায় ।'

No comments:

Post a Comment