গুণীজন
অমিতাভ চক্রবর্ত্তী
রাজধানীর বিশাল সভামণ্ডপ আজ আলোয় ঝলমল করছে। প্রবেশপথ থেকে মঞ্চ পর্যন্ত লাল গালিচা পাতা। ঝাড়বাতির আলোয় ঝিকমিক করছে দেয়াল, ছাদের কারুকার্য যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আজ দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান অনুষ্ঠান। দেশের রাষ্ট্রপতি নিজে এই সম্মান তুলে দেবেন নির্বাচিত গুণীজনদের হাতে। মঞ্চে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যরা, উচ্চপদস্থ আমলারা, সেনাবাহিনীর প্রধান থেকে শুরু করে বিচারপতিরাও।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যাঁরা সম্মান পেতে এসেছেন, তাঁদের কাউকেই খুব একটা চেনা যায় না। তাঁরা কেউ সংবাদপত্রের শিরোনাম হননি, টেলিভিশনের টক শো-তে যাননি, বিদেশ সফরের গল্প শোনাননি। তাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই কেউ মাথা নেড়ে বলবে না—“ওহ, উনিই তো!” বরং দর্শকাসনে ফিসফাস,
“এরা কারা?”
“কোন ক্ষেত্রের মানুষ?”
“এরাই কি দেশের সেরা?”
এই গুণীজনেরা এসেছেন প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে, পাহাড়ের কোলে, নদীর চর থেকে, অজ পাড়াগাঁ থেকে। কারও পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, কারও মলিন শাড়ি, কারও মুখে গ্রাম্য টান। কেউ জীবনে কখনও মাইক্রোফোনে কথা বলেননি, কেউ কখনও মঞ্চে ওঠেননি।
ঘোষক একে একে নাম ডাকতে শুরু করলেন।
“গ্রামবাংলায় গত চল্লিশ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষা বিস্তারে অবদানের জন্য—”
তালি পড়ল। একজন বয়স্ক মানুষ উঠে এলেন। মাথার চুল সাদা, হাঁটতে একটু কষ্ট হয়। তিনি কেবল মাথা নুইয়ে পুরস্কার নিলেন।
“নদীভাঙন প্রতিরোধে নিজস্ব পদ্ধতিতে কাজ করে শত শত পরিবারকে রক্ষা করার জন্য—”
আরও একজন এগিয়ে এলেন। তাঁর মুখে কোনো গর্ব নেই, যেন কাজটা করাই স্বাভাবিক ছিল।
এভাবে একে একে সবাই পুরস্কার নিলেন। কেউ চিকিৎসক, কেউ কৃষক, কেউ শিক্ষক, কেউ সমাজকর্মী। ঘোষক তাঁদের কাজের বিবরণ দিচ্ছেন, আর দর্শকরা বিস্ময়ে শুনছেন—এতদিন এঁরা কোথায় ছিলেন?
এরপর প্রধানমন্ত্রী সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন। বললেন, “এই মানুষগুলিই আমাদের দেশের প্রকৃত শক্তি। আলোচনার বাইরে থেকেও যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে গেছেন।”
সবশেষে ঘোষণা এল—এবার গুণীজনদের পক্ষ থেকে দু-একজন কিছু বলবেন।
মুহূর্তে নেমে এল নিস্তব্ধতা। মঞ্চের সামনে বসে থাকা মানুষগুলো অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসলেন। তাঁরা কেউ বক্তা নন, কেউ মঞ্চসুলভ ভাষায় কথা বলতে জানেন না। কার কী বলা উচিত, বুঝে উঠতে পারছেন না।
ঘোষক নাম ডাকলেন প্রথম জনের।
একজন মাঝবয়সি মানুষ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। পরনে সাদামাটা ধুতি-পাঞ্জাবি, পায়ে সাধারণ চটি। হাঁটার ভঙ্গিতে একধরনের সংকোচ। তিনি মাইকের সামনে এসে দাঁড়ালেন। চোখে জমে উঠল জল। কিছুক্ষণ কথা বেরোল না। পুরো সভাঘর নিস্তব্ধ।
তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন—
“আমি… আমি কথা বলতে পারি না ভালো করে…”
মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর হাত কাঁপছে। মঞ্চের আলো যেন তাঁকে আরও অসহায় করে তুলেছে।
“আমি কোনো বড় মানুষ নই,” তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “আমি শুধু কাজ করেছি… যেমনটা মনে হয়েছে করা দরকার।”
কিছুক্ষণ থামলেন। চোখ মুছলেন।
“আমাদের গ্রামে স্কুল ছিল না। ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা ছেড়ে মাঠে কাজ করত। আমি নিজের টাকায় একটা চালাঘর বানিয়েছিলাম। তারপর ধীরে ধীরে… সবাই আসতে লাগল। আমি জানি না এটাকে বড় কাজ বলে কিনা…”
কণ্ঠ ভারী হয়ে এল।
“আজ এখানে এসে ভয় লাগছে। এত বড় মানুষ, এত আলো… আমার মনে হচ্ছে আমি ভুল জায়গায় এসে পড়েছি।”
তিনি একটু থেমে চারপাশে তাকালেন—রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, হাজার মানুষের ভিড়।
তারপর হঠাৎ কাঁপা গলায় বললেন—
“তবু একটা কথা বলতে চাই… বিশ্বাস করুন… বিশ্বাস করুন আমি যোগ্য।”
এই কথাটুকু বলেই তিনি চুপ করে গেলেন।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো হল নিস্তব্ধ হয়ে গেল। যেন সবাই নিঃশ্বাস নেওয়াও ভুলে গেছে। তারপর ধীরে ধীরে হাততালি শুরু হলো। সেই তালি ধীরে ধীরে গর্জনে রূপ নিল। অনেকের চোখে জল।
রাষ্ট্রপতি উঠে দাঁড়ালেন। এগিয়ে এসে সেই মানুষটির কাঁধে হাত রাখলেন। প্রধানমন্ত্রী নত হয়ে তাঁকে প্রণাম করলেন।
সেদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেউ ভাষণের জোরে জয়ী হননি। জয়ী হয়েছিল নীরব পরিশ্রম, বিনয় আর বিশ্বাস।
আর সেই দিন দেশের মানুষ বুঝেছিল—গুণ আসলে প্রচারের মুখাপেক্ষী নয়।
নীরব সাধনাই একদিন সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ হয়ে ওঠে।

No comments:
Post a Comment