Friday, September 4, 2026


 

শৈশবের মহিমা
    অঙ্কিত বিশ্বাস

বীরেন্দ্র মানে বীরেন্দ্র মল্লিকের কথাই আজ বলবো। তার মতো সখের গোয়েন্দা আর দুটো হয়না। অদ্ভুত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও অগণিত বুদ্ধি তাকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। ছেলেবেলা থেকেই তার এই অদ্ভুত ক্ষমতা প্রকাশ পেতে থাকে, বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে। বীরেন্দ্র তখন ক্লাস সিক্সে পড়ে, বারো বৎসর বয়স। স্কুলে পূজোর ছুটি চলছে। আর সেই উপলক্ষ্যেই বীরেন্দ্র বেড়াতে এসেছিল তার পিসির বাড়ি। সাথে এসেছিল তার কাকা সুভোময় মল্লিক। পিসির বাড়ি প্রত্যন্ত গ্রাম্য এলাকায়, জায়গাটার নাম গোকর্নপুর। পিসির বাড়িতে পিসি, পিসেমশাই ছাড়া আছে তাদের দেড় বছরের মেয়ে নয়নতারা, সংক্ষেপে নয়ন। পিসির বাড়িতে বীরেন্দ্র কোনো খেলার বা ঘোরার সঙ্গী ছিলনা। পিসির বাড়ি থেকে একটু দূরে সুজয় নামে একটা ছেলে থাকত। তার বয়স এগারো বছর। তাই পিসির বাড়িতে বীরেন্দ্রর একমাত্র সঙ্গী ও বন্ধু ছিল সুজয়।
সে বার পিসির বাড়ি গিয়েই সামান্য কিছু জলযোগ করেই সুজয়দের বাড়ি চলে গেল। সুজয় তাকে দেখে বেজায় খুশি, বীরেন্দ্রকে জড়িয়ে ধরে বলল, - “আরে কবে এলি?”
বীরেন্দ্র- “এইতো একটু আগে। তোকে না দেখে আর থাকতে পারছিলাম না, তাই তাড়াতাড়ি করে চলে এলাম”
সুজয়- “চল ভেতর চল, তারপর তোকে এদিক ওদিকথেকে একটু ঘুরিয়ে আনবো।”
সুজয়ের মা বীরেন্দ্রকে বাড়ি বানানো সন্দেশ খেতে দিল। বীরেন্দ্র খেয়ে বলল- “কাকিমা তোমার জবাব নেই”
যাওয়ার আগে সুজয়কে বলে গেল “সুজয়, এই গরমের মধ্যে আর বেরাবো না, বিকালে না হয় এসে তোর সাথে ঘুরবো।”
সুজয় - “মনে করে আসিস কিন্তু!”
দুপুরে বীরেন্দ্র খেল শুক্তো, মুড়িঘণ্ট ডাল, কুমড়োর ঘণ্ট, চাটনি, দই এইসব।
খেতে খেতে পিসি বলল - “বীরেন্দ্র তুই নিশ্চয়ই ভাবচিস না; পিসি মাংস খাওয়ালো না কেন? আরে অতো দূর থেকে এই গরমে এসেছিস মাংস খেলে শরীর কড়া হয়ে যাবে, তোর পিসেরও আবার একটু মিটিং ছিল।”
বীরেন্দ্র – "আরে, তোমার হাতের শুক্তোই সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে আমার।"
বিকেলের দিকে বীরেন্দ্র গেল সুজয়দের বাড়ি, কিন্তু আশ্চর্য সকালে যে দেখে গেছে একদম পরিপাটি ঘর কিন্তু এখন ঘরের চেয়ার টেবিল অগোছালো, দু-একটা আবার বাইরে উঠোনে বের করে রাখা। কিছু ক্ষন আগে তে বাদে সুজয় গোমড়া মুখে বেরিয়ে এল। বীরেন্দ্র তাকে বলল-“ব্যাপার কী বলতো?”
সুজয় – “আরে! আর বলিসনা, আমার বাবা চার লাখ টাকা খুঁজে পাচ্ছি না, বহুত চিন্তায় আছি রে, অতো গুলো টাকা কি অদৃশ্য হয়ে যাবে।”
বীরেন্দ্র – “টাকা রাখা ছিল কোথায়?”
সুজয় – “আরে! আজ আমার বাবার একটা জমি কেনার কথা ছিল, তাই চার লাখ টাকা গুছিয়ে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভালো করে মুড়ে আমার ঘরের টেবিলের উপর রেখে দিয়েছিল। তার পর তাড়া হুড়ো করে মিটিং-এ চলে গেল, আমার বাবা আবার একটু রাজনীতি-টাজনীতি করে তো, তাই।”
বীরেন্দ্রঃ - “তোর ঘরে রেখেছিল কেন অতো টাকা, তার পর আবার জানলার সিকগুলো-র ফাঁকা বড়ো বড়ো।”
সুজয়ঃ – “আসলে বাবা অতো গুলো টাকা একসাথে দেখিয়ে আমাকে বলতে চেয়েছিল বাপো কোনো ভালো চাকরি করলে প্রতি মাসে এর থেকে বেশি টাকা ইনকাম করা যায়।”
বীরেন্দ্রঃ “তোর বাবা যে মিটিং-এ গিয়েছিল আমার পিসে ও সেখানে গিয়েছিল-এইতো একটু আগে ফিরলো। তোর বাবা বোধহয় খুব ঘামখেয়ালি ও বন্ধুবৎসল মানুষ - নারে? ”
সুজয়- “আরে হ্যাঁ, সেটাই তো সমস্যা। অতো দিলখোলা মানুষেরই এই সমস্ত হয়। যে জমি বিক্রি করবে, সে ফোন করে জানায় যে ‘আসছি’ তার পর থেকেই বাবা টাকা পাচ্ছে না। আমার আবার আজকে ক্রিকেট প্র্যাকটিস থাকে। আমিও মিটিং এর ওই কয় ঘন্টা বাড়ি ছিলাম না।”
বীরেন্দ্র -“আচ্ছা তুই তোর বাবার কাছে শোন-তো যখন বিক্রিওয়ালা তাকে ফোন করল তখন সে কোথায় ছিল?”
কিছুক্ষণ পর সুজয় ফিরে এল বীরেন্দ্রকে বলল-“স্টেশন থেকেই বাবাকে ফোন করেছিল, ট্রেনের আওয়াজ, মানুষের কথা বার্তা মোবাইলে শোনা যাচ্ছিলো। তাকে অবশ্য ফোন করে, পরে আসতে বলে দেওয়া হয়েছে।”
বীরেন্দ্র- “এই টাকার কথা কে কে জানে?”
সুজয়- “আমি আর মা। বোন তো কিছুই বোঝে না, আর যারা সকালে বাবার সঙ্গে দেখা করল ..., অনুপ কাকা, সঞ্জু কাকা আর পার্থ কাকা এরা জানতে পারে।”
বীরেন্দ্র- “তোর মা তখন বাড়ি ছিল না?”
সুজয় - “মা তো রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিল, কিছুইতো দেখতে পায়নি”
বীরেন্দ্র - “তোর বোন?”
সুজয় - “ও বারান্দায় বসে খেলছিল।”
বীরেন্দ্র - “ আর নয় সন্ধ্যে হয়ে এল, এবার বাড়ি যাই, কাল একটু সকাল সকাল আসবো বুঝলি। তোর বাবা ও তো মনে হয় কাল পুলিশকে খবর দেবে। দেখি পুলিশের আসার আগে কদ্দুর কী করা যায়।”
সুজয় - “তুই কি পারবি অতো গুলো টাকা খুঁজে আনতে?”
বীরেন্দ্র - “দেখি চেষ্টা তো করব। এ সুজয় আজ আসি বড্ড দেরি হয়ে গেল”
এরই মধ্যে বলা হয়নি সুজয়ের একটা ছোটো বোন আছে, নাম স্বর্ণলতা দুই বছর বয়স।
পরদিন বীরেন্দ্র সাড়ে দুটো র সময় সুজয়দের বাড়ি পৌঁছাল। সুজয় মনমরা হয়ে বসেছিল। বীরেন্দ্র বলল - “তোদের বারান্দার থেকে তো তোর ঘর সম্পূর্ণ দেখা যায়, না?”
সুজয় - “হ্যাঁ, সম্পূর্ণই যেখানে টাকা ছিল তাইতো”
বীরেন্দ্র - “আচ্ছা! তোর বোনের সাথে একবার কথা বলব। উঠেছে ঘুম থেকে?”
সুজয় - “দাঁত মাজছে।”
বীরেন্দ্র - “তাহলে আধ ঘন্টা পরে ডাকিস। চল তোর বাড়ি সামনে রাস্তার ওপারে বাগানটা থেকে ঘুরে আসি”
বীরেন্দ্র বাগানে গিয়ে আশ্চর্য জিনিস লক্ষ্য করল, “বাগানে দাঁড়িয়ে যদি কেউ সুজয়ের ঘরের মধ্যে নজর দিতে চায় তবে গাছের আড়ালে থেকে তা অনায়াসেই পারা যাবে। জানলা খোলা থাকলে তো কোনো কথাই নেই।”
বীরেন্দ্র মুচকি হেসে বলল - “বুঝলি?”
সুজয় ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বলল- “এবার ওই জানলা বন্ধ করে রাখবো”
বীরেন্দ্র সুজয়দের বাড়ি গিয়ে সোজা তে স্বর্ণলতাকে ধরল তাকে বলল – “স্বর্ণ ভালো আছো?”
স্বর্ণলতা - “হ্যাঁ”
বীরেন্দ্র- “তুমি আগের দিন বারান্দায় বসে কী খেলছিলে?”
স্বর্ণলতা- “নান্নাবাতি”
বীরেন্দ্র – “তুমি তখন দাদার ঘরের ওই জানলায় কিছু দেখ নি?”
স্বর্ণলতা - “নাতি, নাতি বলো নাতি দেখছি”
সুজয় বলল- “এ বীরেন্দ্র - একী বলে?
বীরেন্দ্র – “ঠিক কথাই বলছে। ও বলতে চাইছে লাঠি বড়ো লাঠি। তোদের বাড়ির পেছনে বড়ো জঙ্গল থেকে একটু ঘুরে আসি চল। হয়তো কিছু পেতে পারি।”
বীরেন্দ্র, সুজয়কে জোর পূর্বক নিয়ে গেল কারন সুজয়ের মতে সেখানে ভূত প্রেত থাকে।
কিছু দূর গিয়ে তারা দেখতে পেল একটা ছোটো বাঁশের লথায় ইঁদুর ধরা আঠা লাগানো একপ্রকার জিনিস। বইয়ের মতো দেখতে। এক পাশে আঠা লাগানো থাকে। বইয়ের মতো আঠা লাগানো পাশটা ওপরের রেখে খুললে, ইঁদুর তার মধ্যে আটকে পড়ে। আনন্দে বীরেন্দ্র লাফিয়ে উঠে বলল – “তোর বাবা গোলাপি ব্যাগে টাকা রেখেছিল না? ওই দেখ গোলাপি প্লাস্টিকের টুকরো লাগানো রয়েছে।”
সুজয় বিস্ময়ের ধাক্কা সামলাতে সামলাতে বলল- “তাইতো ..... কিন্তু পুলিশকে এটা বললে তারা হয়তো খুঁজে বার করতে পারবে কিন্তু তুই পারবি কী করে?”
বীরেন্দ্র- “পুলিশকে অবশ্যই বলবো কিন্তু তার আগে বল তোরা কোন মুদি দোকান থেকে জিনিস পত্র কিনিস?”
সুজয়- “মুদি দোকান আছে বেশ কয়েকটাই কিন্তু তার মধ্যে ভালো আর বড়ো দোকান হচ্ছে হারু কাকার দোকান”
বীরেন্দ্র- “চল সেখানে।”
দোকানে গিয়ে সুজয় দোকানদারকে বলল – “কাকু সকালে কি কেউ তোমার দোকান থেকে ইঁদুর ধরা আঠা নিয়েছে।”
দোকানদার মাথা চুলকে বলল – “হ্যাঁ। কী যেন নাম ছেলেটার ... হ্যাঁ হ্যাঁ অনুপ, অনুপ নিয়েছে।”
দুজনই বাড়ি গিয়ে দেখল ইতিমধ্যে পুলিশ এসেছে তবে বেশি না মাত্র দুই জন। বীরেন্দ্র তখন পুরো ঘটনাটা সুজয়ের বাবাকে বুঝিয়ে দিল ও বলল – “কাকু তুমি একটা পুলিশ নিয়ে অনুপদের বাড়িতে ধাওয়া দেও”
তার পর বীরেন্দ্র বিষন্ন চিত্তে প্রফুল্ল চিত্তে বাড়ি ফিরে এল।
সন্ধ্যের সময় সুজয় বীরেন্দ্র-র পিসির বাড়িতে গেল। বলল - “ওই শয়তান অনুপটাই টাকা নিয়েছিল। বাবা সব টাকা ফেরত পেয়ে গিয়েছে। আজ তুই না থাকলে অনেক হাঙ্গামা হত, তাই বাবা তোকে একটা সামান্য পুরষ্কার দিতে চায় এই নে”
বলে সুজয় তার হাতে থাকা ব্যাগটা বীরেন্দ্রর দিকে এগিয়ে। বীরেন্দ্র খুলে দেখল তার মধ্যে টাইটানের একটা ঘড়ি!

No comments:

Post a Comment