অনেক কিছু দিয়েছে কিন্তু কি পেলেন নজরুল ইসলাম?
বটু কৃষ্ণ হালদার
খুব ছোট থেকে অর্থাৎ অক্ষর জ্ঞান হওয়ার মুহুর্ত থেকে আপামর বাঙালির ধমনীতে মিশে গিয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজীনজরুলইসলাম।গ্রামে কোন সংস্কৃতি অনুষ্ঠান হলে বর্তমান সময়ের মত ধুম ধারাক্কা গান চালানোর রেওয়াজ ছিল না। আমাদের প্রাণের রবি ঠাকুরের গানের সঙ্গে সঙ্গে বাজানো হতো নজরুল ইসলামের গান কবিতা। এসব শুনতে শুনতে কখন শৈশব পেরিয়ে নব যৌবনে পা দিয়ে সময় গুলো ক্লান্ত হয়ে যায় নি। বিরক্তিভাব আসেনি। তখন থেকে উপলব্ধিগুলো হৃদয়ের কোণে জমা হতে শুরু করলো যে রবীন্দ্রনাথকে আমার যেমন চাই, নজরুলকে আরও তীব্রভাবে চাই। যে কবি নিজের সীমাহীন দারিদ্রতাকে কুর্নিশ জানিয়ে লিখে ফেলেন - "হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান/তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীস্টের সম্মান / কন্টক মুকুট শোভা - "
বিশ্বযুদ্ধোত্তর প্রেক্ষাপটে ঝঞ্ঝায় দিগভ্রান্ত না হয়েও অতি অনায়াসে তিনি লিখতে পারেন:_ ‘মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/আমি সেই দিন হব শান্ত/ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল/আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ/ভীম রণ-ভূমে রণিবে না"
'আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় নজরুলের শেষ দুটি ছত্র— ‘প্রার্থনা করো,
যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেন লেখা হয় আমার রক্ত তাদের সর্বনাশ’—
আমাকে ভাবতে বাধ্য করে প্রকৃত কমিউনিজম এছাড়া আর কি? নজরুল যেন ঠিক সেই মুহূর্তে এই ভারতভূখন্ডের সীমান্ত পেরিয়ে তিনি পীড়িত লাঞ্চিত বিশ্ববাসীর কবি হয়ে ওঠেমানুষের মনুষত্বকে জয় জয়াকার করে নজরুল সাম্যবাদী কবিতায় লিখলেন -
শোন রে মানুষ ভাই/এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন মন্দির কাবা নাই।
ব্যাস সেই সময় থেকে কবি নজরুল নিজের স্থান করে নিলেন মানবতার পূজারী রবীন্দ্রনাথের ঠিক পাশের আসনে।
১৯ শতকের কলকাতা। শীতের আমেজে মাখোমাখো এক সকাল ।জোড়াসাঁকোয় ঠাকুর পরিবারের বাস ভবনের ঠিক সামনেটায় অন্যদিন শান্ত সমাহিত একটা পরিবেশ থাকে। সেদিন সেখানে বড্ডো শোরগল।হুলুস্থূল কাণ্ড বাঁধিয়েছে এক তরুণ। শূন্যে হাতপা ছুঁড়ে কাঁধ পর্যন্ত বাবড়ি বাবড়ি চুল ঝাঁকিয়ে বলছে,"গুরুজি বাইরে আসুন, আপনাকে হত্যা করব।" একে দ্রোহকাল, ১৯২২, যদিও বন্দুক ফন্দুক নেই এই যুবকের হাতে । আছে মুঠো করে ধরা ক'খান পত্রিকার মত কিছু ।কাগজের তর্জন গর্জন ।জোড়াসাঁকোয় ঠাকুরদের বাড়ি। শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বরাও সংযত থাকেন কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন হিমালয় পর্বতের মত সমাহিত ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের সামনে এসে দাঁড়িয়ে দুটো কথা কইতে । এই যুবকটি কিনা তাঁকেই প্রকাশ্যে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।ততক্ষনে রবীন্দ্রনাথ দক্ষিণের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন। এই যুবকটিকে তিনি ভালোকরেই চেনেন। এহেন ব্যবহার যুবকটির কাছ থেকে যেন প্রত্যাশিত ছিল। তিনি একটুও বিচলিত হলেন না। একটু অবাকও হলেন না ।শান্ত স্বরে বললেন, ‘কী হয়েছে?সক্কাল সক্কাল ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছ কেন? এসো, উপরে এসে বসো? আমি যে তোমার হাতে মরতেই চাই ।’ উচ্ছাসে লাফাতে লাফাতে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল যুবকটি । রবীন্দ্রনাথকে সামনে বসিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে 'বিদ্রোহী' কবিতাটি আবৃত্তি করে শুনিয়ে দিল- যা আগের দিন ছাপা হয়েছে বিজলী পত্রিকায়।
হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন, যুবকটি আর কেউ নন, তিনি আমাদের ঝড়ের কবি কাজী নজরুল। রবীন্দ্রনাথ এতক্ষন অবাক বিষ্ময়ে অভিভূত হয়ে শুনছিলেন। মুগ্ধতায় স্তব্ধ তখন তিনি। নজরুলের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন । কবিতা শেষ হল। রবীন্দ্রনাথ উঠে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। দু’হাত বাড়িয়ে তরুণ কবিকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, "--সাবাস কবি। সাবাস। হ্যাঁ কাজী, তুমি আমাকে সত্যিই হত্যা করবে। আমি অভিভূত । নিঃসন্দেহে তুমি বিখ্যাত কবি হবে। এ জগৎ তোমাকে এই কবিতার নামে 'বিদ্রোহী কবি' বলে মনে রাখবে।’সেদিনের রবীন্দ্র নজরুলের মিলনের নাটকীয় মুহূর্তটির আগেও ওঁরা দুজনে বার-দুয়েক মুখোমুখি হয়েছেন। ঘুর্ণাবর্তের মত জীবন ছিল কাজী নজরুলের। লেটোর দল থেকে শুরু করে বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক । বিচিত্র অভিজ্ঞতা বোচকায় বেঁধে নজরুল ফিরলেন ১৯২০ সালে কলকাতায়। নবজাগরণের উদ্বেল ঢেউ তখন বঙ্গসাহিত্যতটে আঁচড়ে পড়ছে । ‘প্রবাসী’, ‘ভারতী’, ‘মোসলেম ভারত’, ‘ ‘নবযুগ’ পত্র-পত্রিকা তখন নিয়মিত লিখছেন নজরুল। সাহিত্য আড্ডায় নজরুলের উজ্জ্বল উপস্থিতি । রবন্দ্রীনাথের হাতে এসে পৌঁছয় সেসব পত্রিকা। নজরুলের লেখা পড়েন রবীন্দ্রনাথ । তৎকালীন কবিদের সাথে কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথ নজরুল সম্পর্কে বেশ আগ্রহ প্রকাশ করে ফেললেন । সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মত স্বনামধন্য কবিরা সেই সুসংবাদ নজরুলের কাছে পৌঁছে দিলেন উপযাচক হয়ে । "অধমের" প্রতি বিশ্ববরেন্য কবির আগ্রহের কথা শোনামাত্র ক্ষ্যাপা নজরুল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে অস্থির হয়ে ওঠলেন । পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে সোজা চললেন জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে। দিনটি সম্ভবত ১৯২১ সালের ২০ জুলাই। রবীন্দ্রনাথের শান্তসৌম্য জ্যোতির্ময় মূর্তি দেখে অভিভূত হয়ে পড়লেন নজরুল। বাকরুদ্ধ হয়ে শুধু দেখেই গেলেন নজরুল একরাশ মুগ্ধতায় ।
১৯২৩ সালের ১৭ মে শরৎচন্দ্র বাজে-শিবপুর হাওড়া থেকে লীলারাণী গঙ্গোপাধ্যায়কে লেখা চিঠিতে লিখেছেন:“হুগলী জেলে আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম উপুষ করিয়া মরমর হইয়াছে।বেলা ১টার গাড়ীতে যাইতেছি, দেখি যদি দেখা করিতে দেয় ও দিলে আমার আনুরোধে যদি সে আবার খাইতে রাজি হয়। না হইলে তার কোন আশা দেখি না।একজন সত্যিকার কবি। রবী বাবু ছাড়া আর বোধ হয় এমন কেহ আর এত বড় কবি নাই”। কিন্ত শরৎচন্দ্র দেখা করেত পারেন নি।
জেলের ভিতরে অনশনরত নজরুলের উপর অত্যাচার বেড়ে যায়। ডান্ডাবেড়ী, হ্যান্ডকাপ, সেল কয়েদ, ফোর্সড ফিডিং-এর চেষ্টা চলে, ক্রমশ দূর্বল হয়ে পড়েন নজরুল। মুমূর্ষ কবিকে বাঁচানোর জন্য শিলিং-এ চিঠি লেখা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে, তিনি যেন নজরুলকে অনশন ভঙ্গ করতে অনুরোধ জানিয়ে পত্র লিখেন।
রবীন্দ্রনাথ পএের উত্তরে বিদ্রোহী-বিপ্লবী সৈনিক নজরুলের দৃঢ়তাকে সমর্থন জানিয়ে লিখেন: “আদর্শবাদীকে আদর্শ ত্যাগ করতে বলা তাকে হত্যা করারই সামিল। অনশনে যদি কাজীর মূত্যুঘটে তা হলেও তার অন্তরে সত্য আদর্শ চিরদিন মহিমাময় হয়ে থাকবে।”শেষ পর্যন্ত, স্নেহভাজন নজরুলের অনশনে বিচলিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে টেলিগ্রাম করেন: “Give up hunger strike, our literature claims you”.অত্যন্ত বিস্ময়ের বিষয়, জেল কর্তৃপক্ষ রবীন্দ্রনাথের টেলিগ্রাম নজরুলকে না দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে লিখে পাঠালেন- “Addressee not found.” রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম ফেরত পেয়েই বুঝলেন এটি সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত ও হীনম্মন্যতা। অনশনের চল্লিশ দিনে বিরজাসুন্দরী দেবীর হাতের লেবুর রস পান করে নজরুল অনশন ভঙ্গ করেন।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুল ইসলাম কে প্রায়ই বলতেন,দেখ উন্মাদ তোর জীবন শেলীর মত, জন কিটসের মত খুব বড় একটা ট্রাজেডি আছে।তুই প্রস্তুত হ।গুরুদেবের বাণী এতটুকু মিথ্যা হওয়ার নয়।কারণ তিনি অন্তর থেকে অনুধাবন করে কথা বলতেন।বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তখন "নবযুগ' পত্রিকার সম্পাদক। ঠিক সে সময়ে চলছিল ভারত বিভাজনের প্রক্রিয়া। তৎকালীন সময়ে সমস্ত ক্ষমতা কলকাতার শিক্ষিত শ্রেণীর হাতে।তরুণ মুসলিম লীগ নেতা বদরুদ্দোজা,আলম হোসেন, জুলফিকার হায়দাররা তখন ভারত বিভাজনের জন্য আন্দোলন করছেন। কিন্তু বিদ্রোহী কবি নজরুল বিভাজন আন্দোলনে বাধার সৃষ্টি করলেন। তিনি কখনোই চাইতেন না ভারত বর্ষ দ্বিখণ্ডিত হোক। তিনি বললেন এ টি মেকি,ভুয়া আন্দোলন।পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ নিরক্ষর মুসলমানদের মুখের গ্রাস করে এরা নেতা হতে চান।তাদের পুরো চক্রান্ত তিনি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিলেন।তার সমকালীন বহু বিশিষ্ট সাহিত্যিক রা বুঝেও মুখ খোলেননি।সেটাই কবির জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ালো। নবযুগ' পত্রিকায় কবি তখন স্বাক্ষরযুক্ত সম্পাদকীয় সংখ্যায় তিনি সম্পাদকীয় কলমে লিখলেন_"পাকিস্তান না ফাঁকিস্থান"। ব্যাস এটুকুতেই যেন দাবানল সৃষ্টি হয়ে গেল। ভারত বিভাজনের যে সমস্ত আন্দোলনকারীরা সমর্থন করতেন তারা নজরুলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। একদিন কবি পত্রিকা অফিসের কাজ ছেড়ে অনেক রাতে ফিরছিলেন।কবিকে সামনাসামনি ধরাশায়ী করা যাবে না, তাই আন্দোলনকারীরা কাপুরুষের মত পেছন থেকে আক্রমণ করলেন। এক সময় যাঁরা কবি নজরুল ইসলাম কে নিয়ে কলকাতার বুকে দাপটের সাথে চলতেন তারাই তাঁর জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ালেন।আক্রমণের পর ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি কবি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন।তার পিঠে সেই আঘাতের চিহ্ন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কবি বহন করেছিলেন। বাংলাদেশে কবির ব্যক্তিগত সহকারি শফি চাকলাদার সে কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।তিনি ছবি তুলে রেখেছিলেন কিন্তু প্রকাশ্যে আনেননি।তাঁর চিকিৎসার সুব্যবস্থা করার জন্য তৈরি হল "নজরুল রোগ নিরাময় সমিতি"। কিন্তু সেখানেও ঢুকে গেল দু-একজন পাকিস্তানপন্থী। তারাই কবির চিকিৎসা, দেখাশোনা, অর্থ সংরক্ষন সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলেন।তাঁরা ইচ্ছা করে চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিলম্ব করতে আরম্ভ করলেন। ধীরে ধীরে সেই রোগ নিরাময়ের অযোগ্য হয়ে উঠলো।জুলফিকার লুম্বিনী হাসপাতালে শেকল দিয়ে বেঁধে লোক আড়ালে কবিকে নিঃশেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হল। পঞ্চাশের প্রথমদিকে ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় নজরুল ইসলামের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। রবিউদ্দিনকে সাথে নিয়ে কবিকে ভিয়েনায় পাঠানো হলো। কিন্তু ততদিনে নিভেছে দেউটি। কবি আর ভালো হলেন না,মস্তিষ্কের পিছনের বেশ কিছু শিরা উপশিরা শুকিয়ে মরে গেছে। এভাবে শিক্ষিত সুশীল সমাজ ব্যবস্থার সামনে একজন নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমী জীবনকে শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা সফল হয়ে গেল। না এর প্রতিবাদ কিন্তু হয়নি। এমন এক প্রতিভা দিনে দিনে চোখের সামনে প্রদীপের সলতের মত নিভে যেতে দেখেও তেমনভাবে সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে আসেনি।এটাই হল বিশ্বের বিখ্যাত ট্রাজেডি।
অথচ কাজী নজরুল ইসলামের বয়স তখন ৩০।১৯২৯ সালের কলকাতার অ্যালবার্ট হলে আয়োজন করা হয় কবি-সংবর্ধনা সভা। কলকাতা এ্যালবার্ট হলে ওই অনুষ্ঠানে ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ যখন বজ্রকন্ঠে বিখ্যাত কবিতা দুর্গম গিরি কান্তার মরু আবৃতি করে শোনাচ্ছিলেন, সেসময় মঞ্চে উপস্থিতি ‘নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু’ নজরুলের কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন –ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্যে আমি সারা ভারতবর্ষ ঘুরেছি কিন্তু ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরুর’ মত কোন গান আর একটা আমি খুঁজে পাইনি। এই গানের উপরে ভর করেই আমি ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে আসবো। নজরুলের গান ও কবিতা আমাদের বিপ্লবী চেতনাকে আরো শক্তিশালী করেছে।নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন,যেদিন দেশ স্বাধীন হবে সেদিন বাঙালীর জাতীয়-কবি হবেন কাজী নজরুল ইসলাম।
দ্বিধাহীনভাবে নেতাজির জবাবে কবি বলেন, ‘এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলে, আমি শুধু এই দেশেরই এই সমাজেরই নই। আমি সকল দেশের, সকল মানুষের। যে কুলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই আমি জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব।তাঁকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই আমি কবি।’আফসোস।কবিকে আমরা বাঙালীরা তখনও চিনতে পারিনি।এখনো না।এই দেশের জন্যে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন।কিন্তু পেলো না কিছুই।এই বিশ্বের সব থেকে মানবতার বড় অভাগা হলেন "
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
"কবির চার বছরের শিশু "বুলবুল"যেই রাতে মা/রা গিয়েছিল সেই রাতে কবির পকেটে একটা কানাকড়িও ছিল না।
"অথচ কাফন,দাফন,
গাড়িতে করে দেহ নেওয়া ও গোরস্থানে জমি কেনার জন্য দরকার ১৫০ টাকা, সেই সময়ের ১৫০ টাকা মানে অনেক টাকা।
এত টাকা কোথায় পাবে। বিভিন্ন লাইব্রেরীতে লোক পাঠানো হল।
" না " টাকার তেমন ব্যবস্থা হয়নি। শুধুমাত্র ডি.এম লাইব্রেরি দিয়েছিল ৩৫ টাকা। আরো অনেক টাকা বাকি। টাকা আবশ্যক।
" ঘরে দেহ রেখে কবি গেলেন এক প্রকাশকের কাছে। প্রকাশক শর্ত দিল- এই মুহূর্তে কবিতা লিখে দিতে হবে। তারপর টাকা
" কবির মনের নীরব কান্না,যাতনা লিখে দিলেন এই কবিতা়র মাধ্যমে
ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে
আমার গানের বুলবুলি।
করুণ চোখে চেয়ে আছে
সাঝের ঝরা ফুলগুলি।
"ফুল ফুটিয়ে ভোর বেলা কে গান গেয়ে
নীরব হ’ল কোন নিষাদের বান খেয়ে,
বনের কোলে বিলাপ করে সন্ধ্যারাণী চুল খুলি।।
"কাল হতে আর ফুটবে না হায়,
লতার বুকে মঞ্জরী,
উঠছে পাতায় পাতায় কাহার করুণ নিশাস মর্মরী।
" গানের পাখি গেছে উড়ে শূণ্য নীড়,
কন্ঠে আমার,
নেই যে আগের কথার ভিড়,
আলেয়ার এই আলোতে
আর, আসবে না কেউ কুল ভুলি।।
" একজন সন্তানহারা পিতার কি নিদারুণ কষ্ট। যদিও এই মানুষটাই বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়েছেন....।
" দেশের জন্য অনেক কিছু করেছেন, জেল খেটেছেন স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে দাঁড়িয়ে...।
কিন্তু হঠাৎ করে সেই মানুষটার পিছন থেকে সবাই সরে যায়...,
একেবারে ভুলে যায়.....,
যাদের জন্য তিনি সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে গেছেন।
কাজী নজরুলদের মতো কবিরা প্রতি শতাব্দীতে আসেনা।বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি বিশ্বের সকল শোষিত মানুষের প্রতিবাদের অন্যতম কন্ঠস্বর আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে কয়েক শতাব্দী ধরে শুয়ে থাকবেন।

No comments:
Post a Comment