Friday, September 4, 2026


 

মনসা মঙ্গলকাব্য

বেলা দে


মধ্যযুগে লৌকিক ও পৌরাণিক দেবদেবীর মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য যে কাব্য রচিত হয়েছে তাকে বলা হয় মঙ্গলকাব্য। যেমন -- মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল। মনসামঙ্গল তার মধ্যে অন্যতম। মনসামঙ্গল কাব্যে সর্পদেবী মনসার পূজা প্রচারের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এইএই কাব্যের মূল উপজীব্য হল বণিক চাঁদ সওদাগরের অহংকার  ভঙ্গ। মনসা দেবীর দ্বারা তার সর্বনাশ, এটি একটি জনপ্রিয় লোকসাহিত্য। মনসামঙ্গল কাব্যের রচয়িতা বিজয় গুপ্ত। সর্পদেবীকে কল্পনা করে লেখা। দেবাদিদেব মহাদেবের মানস কন্যা সে, তাই নাম মনসা। তিনি পার্বতীর কন্যা নন, মোটেই পছন্দ করে না পার্বতী তাকে। পার্বতী একদিন রাগবশত অস্ত্র ছুঁড়ে মারায় তাঁর এক চোখ কানা হয়ে যায়। চাঁদ সদাগর ধনী বনিক, সমাজে তার অশেষ প্রতিপত্তি।সে যদি তাঁর পূজা করেব জনসমাজ তাকে মর্যাদা দেবে। তাই সে উঠেপড়ে লেগেছে তার হাতে পূজা নেবার চাঁদের প্রচন্ড ঘৃণা তার উপর, ব্যঙ্গ করে বলে--"
 যেই হস্তে পূজি আমি শঙ্কর- ভবানী "
    সেই হস্তে নাহি দিব ব্যাঙ খেকো কানি।"

কঠোর তপস্বী ব্রহ্মচারী জরৎকারু মুনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন তিনি কোনদিন বিয়ে করবেন না, কিন্তু পূর্ব পুরুষের জেদ এবং বংশরক্ষার অভাবে নরকে ঝুলে থাকায়, শেষে রাজি হন বিবাহে তবে একটা শর্তে 
যদি মনসা কোনদিন  এতটুকুও অমর্যাদা করে তাকে তাহলে সে ছেড়ে চলে যাবে সে মুহূর্তে। অবশেষে সেটাই ঘটে, তাকে ছেড়ে চলে গেল মুনি।

মনসার গর্ভে জন্ম নেয় আস্তিক। এদিকে মনসা কিছুতেই কৌলিন্য অর্জন করতে পারছেন না। চাঁদের জেদ তিনি চ্যাং মুড়ি কানিকে পূজা দেবেন না। সে একবার পূজা দিলেই মর্ত্যলোকে প্রচার হবে, মনসার ভ্রাতা নাগরাজ বাসুকিও দেবাদিদেব মহাদেবকে অনুরোধ করে, কথিত আছে এই জন্মের বেহুলা ও লক্ষ্মীন্দর, পূর্বজন্মের ঊষা ও অনিরুদ্ধ স্বর্গের নর্তক নর্তকী  মনসার চক্রান্তে তাদের নাচের তালভঙ্গ হলে শাপ দেন দেবরাজ ইন্দ্র " তোমরা মর্তলোকে মনুষ্য জন্ম পাবে। মর্তে চাঁদ সদাগরের সপ্তম সন্তান হয়ে জন্ম নেয় লক্ষ্মীন্দর তার স্ত্রীই হলেন বেহুলা। এদিকে মনসার আক্রোশে চাঁদের   ছয় পুত্রের মৃত্যু হয়েছে সর্পদংশনে, ধনসম্পদ  সপ্তডিঙা সহ সমুদ্রে ডুবে যায় বানিজ্যে যাবার সময়। সব হারিয়েও সে প্রতিজ্ঞায় অটল। জন্ম নেয় তার কনিষ্ঠ পুত্র লক্ষিন্দর।  জ্যোতিষী গণনা করে বলেন বিবাহ রাত্রে তাকে সর্প দংশন করবে এবং মৃত্যু ঘটবে বিবাহবাসরে। এই বিপদ থেকে বাঁচতে তার নিশ্চিদ্র অভেদ্য খোদাই "লৌহগড়" নির্মাণ। যেখানে কোনো ছিদ্র রাখেন না। করেন বিশ্বকর্মা।

উজানি নগরের সাহা কন্যা বেহুলার সাথে তার বিয়ে দেন কড়া প্রহরায়। সমস্ত প্রহরীর দৃষ্টি এড়িয়ে মনসার নির্দেশে কালনাগিনী তাকে দংশন করে। গ্রামীণ প্রথা অনুযায়ী সর্পদংশনে মৃতের দেহ কলার মান্দাসে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, পতিব্রতা বেহুলা কঠোর সামাজিক অনুশাসন ভেঙে স্বামীর মৃতদেহ কলার মান্দাসে ভাসিয়ে রওনা হলেন স্বর্গের উদ্দেশ্যে  যেমন করেই হোক তাঁর মৃত স্বামীকে ফিরিয়ে আনবেই। সে দেহ মাসের পর মাস ভেসে পঁচাগলা হয়ে ক্রমে ক্রমে হাড়গোড় বেরিয়ে গেল। অবশেষে মনসাকে করজোড়ে প্রার্থনা করে বেহুলা।  মনসা তার পালক মাতা নেতা ধোপানীর সাহায্যে তাকে  স্বর্গে পৌঁছায়, সেখানে নৃত্য গীতে দেবতাদের সন্তুষ্ট করে লক্ষীন্দর সহ চাঁদের ছয়পুত্রর প্রাণ এবং চাঁদ সদাগরের হারানো সম্পদ, সমুদ্রে ডুবে যাওয়া সপ্তডিঙা সব ফিরিয়ে আনেন। শেষ পর্যন্ত নাছোড়বান্দা চাঁদ বেহুলার ইচ্ছেনুযায়ী বাম হস্তে মনসার উদ্দেশ্যে ফুল ছুঁড়ে পূজা দেয়। মর্তলোকে মনসার পূজা প্রচার হল। ধর্মীয় পরিমন্ডলে তিনি শুধুই ভয়ের প্রতীক নন মনুষ্য জীবন সুরক্ষাও মঙ্গলকাব্যের উপস্থাপনা। মধ্যযুগে দেবী মনসার উদ্ভব কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে। বর্ষাকালে জলা জঞ্জাল অধ্যুষিত অঞ্চলের সাপের উপদ্রব মাথায় রেখে মঙ্গলকাব্য রচিত। এই মঙ্গলকাব্য রচয়িতাদের সৃষ্টিকর্মে অনেক মতভেদ রয়েছে কেউবা বলেন বিপ্রদাস পিপিলাই, আবার কারও মতে নারায়ণ দেব, তবে বিজয় গুপ্ত রূপ পরিবর্তন করে এক বিশেষ মর্যাদায় আনেন সেটাই জানা যায়। কেউবা নিশ্চিত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কবি তাদের মতন করে রচনা করে গেছেন। 

No comments:

Post a Comment