Friday, September 4, 2026


 

শরতের আরোগ্য নিকেতনে 

অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী


ক্যালেন্ডারের হিসেবে প্রকৃতির দরবারে শরতের আসনটি পাতা হয়ে গেলেও এখনও ঠিক পুরোপুরি জমজমাট হয়ে ওঠেনি সেই আড্ডা, পরিপূর্ণ হতে হতেও কোথাও একটু হলেও থমকে রয়েছে সেই মুগ্ধ মঞ্চের মনকাড়া প্রিয় সাজ। প্রিয় ঋতু শরতকে সাজাতে ব্যস্ত যে প্রকৃতির সব কারিগরেরাই! আকাশ যদিও অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছে সাদা মেঘের ভেলায় চেপে। অবুঝ বর্ষা মাঝে মাঝে বিঘ্ন ঘটালেও তুলো তুলো সাদা মেঘের আবদারে আসমানি নীল দিনমান রটিয়েছে শরতের আনাগোনার খবর। আর বাকি সজ্জা টুকু তো প্রতীক্ষার এক সমধুর যাপন, দিন গোনার মধুময় ক্ষণ। 




ইট কাঠ কংক্রিটের বেড়াজাল টপকে শহর ছেড়ে বেশ কিছুটা নিরিবিলি পথ ধরলে এ সময়ে মায়াবী শরতের দেখা মেলে বেশ অনেকটাই। অলস দুপুরের প্রান্তে, সাঁঝবেলার দিকে মুখ করে যে কোমল বিকেলবেলাটি বসে থাকে, তার ফুরোবার তাড়া নেই তেমন। স্নিগ্ধ চাউনিতে সে রয়েসয়ে আস্বাদন করে সবুজ প্রান্তর, আলো- ছায়ার শ্যামল শোভন ধানখেত, আকাশ জোড়া সাদা- নীলের অহংকার, দিঘির স্বচ্ছতা, পাখিদের সমবেত উচ্ছ্বাস। 




কাশেদের গুচ্ছ কবিতারা অল্প সংখ্যায় উঁকিঝুঁকি দিয়ে বলে যায়, " আমাদের কবিতা সমগ্র এলো বলে।" বর্ষার সেগুন ফুল ভাদ্রের নরম বেলায় আরও শুভ্র, আরও উজ্জ্বল। স্নিগ্ধ হাওয়ায় গা ভাসিয়ে মস্ত সারস মাছের খোঁজে জলের গায়ে ঘন ঘন ঠোঁট ডোবাতে মগ্ন। ইতিউতি কিছু গুচ্ছ কাশের ফাঁকফোকরে যে সবুজ মাঠ খেলতে ডাকে, সেখানে কচিকাঁচার দলের হুটোপুটি চলে বিকেলের নরম রোদ গায়ে মেখে। খোপে ঢোকার আগে বিকেলের খোলা হাওয়ায় ঘোরাঘুরির পাট সারে মোরগ মুরগির দল। বৈকালিক চায়ের আসর বসে যায় গ্রামীণ কোনো একচালা দোকানঘরে। পথপ্রান্তের সবুজ এক কোণে আয়েশি সময় খুঁজে নেয় মনোরঞ্জনের মৌতাত। কাঁচা পাকা চুলের অসমবয়সী তাসের আসর জমে ওঠে ধীরে ধীরে। দিনশেষে ঘরে ফেরে নিত্যদিনের কর্মী মানুষটি। মহিলা মজলিস বসে নদীর ধার ঘেঁষে। আর কিছু পরেই মিলিয়ে যাবে যে আকাশ, তালগাছের চূড়োরা সারিগানে তাকে আশ্লেষে শেষ ছোঁয়া ছুঁয়ে নেয় সেদিনের মতো। তরুণ যে গাছটি নব কিশলয়ের সঙ্গে আত্মীয়তার বুননে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে ক্রমাগত, চঞ্চল ফিঙে ঘরে ফেরার আগে দিনের শেষ ঝুলন খেলায় মেতেছে সেই ডালে বসে। বিকেলের সঙ্গে যোগসাজশ করে সূর্যও গড়িমসির মেজাজে অল্প অল্প করে হেলতে থাকে বেলাশেষের দিকে। 




অবশেষে শেষ আলোর খেলাটি খেলে অজানা কোন ঘরের ঠিকানায় মিলিয়ে যায় দিনমণি। মন্দিরে সন্ধ্যাবাতি জ্বলে ওঠে। শূন্য বেদি শারদীয়ার প্রতীক্ষায় দিন গোনে। প্রহর গোনে কাশের বনে আলোড়ন তুলে বাজবে কবে আগমনীর সুরেলা বাঁশিটি। বাঁশ পাতার গাঢ় ছায়া ঘেরা নিঝুম এক টুকরো স্বপ্নপুরও হয়তো বা নিরিবিলি আসন পেতে প্রতীক্ষায় থাকে আমাদেরই মতো হঠাৎ কোনো মুসাফিরের। 





শরত নিজেই কি কম আকুল সালংকারা হয়ে সেজে উঠতে! তার প্রতীক্ষা যে সবচেয়ে বেশি। হিমেল বুদবুদে গা ধুয়ে,শিশির ধোয়া ফুলেল আতর গায়ে মেখে,নীলাম্বরী মসলিনের আঁচল উড়িয়ে, শিউলি দুল আর নথ,মালতীর রতনচূড়, বকুলের চন্দ্রহার আর খোঁপায় দোলনচাঁপা গুঁজে নিসর্গের রাণী হয়ে উঠবে যে সে! হাতপদ্মটিতে লেখা থাকবে বিজয়িনীর মনোলোভা আলেখ্য খানি। অনেকটা পথই এগিয়ে এসেছে সে নিজেকে সাজাতে সাজাতে। বাকি মাত্র আর কদিন। কাশবনের গা ছুঁয়ে, পদ্ম দিঘির জলে কোমল ছায়া ফেলে কাশ- কমলের দুধে আলতায় পা ডুবিয়ে গৃহপ্রবেশ হবে ঘরের মেয়ের। শরত মানেই যে উমা, শরত মানেই যে আগমনী। আমরা সবাই তারই প্রতীক্ষায়। মহা সমারোহে আসুক শরত..সাড়ম্বরে আসুক উমা ঘরে ফেরার স্নিগ্ধ আলো গায়ে মেখে। পরিপূর্ণ হোক শরত ছোট ছোট অজস্র ভালোলাগার ফুলের সম্মিলিত সুঘ্রাণে। শান্তির বাতাবরণে অভিষেক হোক শরতের মঙ্গলময় আলোর তিথির। উৎসবের দিনগুলোতে আপামর মানুষের মুখের নির্মল হাসিই যেন শরতের দেওয়া সেরা উপহার হয়ে রয়ে যায়।




(ছবি- লেখক) 

No comments:

Post a Comment