Friday, September 4, 2026


 

নিমতলার আলো
মনোমিতা চক্রবর্তী

সেদিন ভোর থেকেই আকাশটা ছিল ধোঁয়াটে। শরতের মেঘে সূর্যের আলো যেন কাঁচা দুধের মতো ফিকে হয়ে উঠেছিল। নতুন বাড়ির উঠোনে ধূপের গন্ধ মিশে ছিল ভেজা মাটির গন্ধে। বাড়িটার নাম রাখা হয়েছে “নীড়”। নামটা রেখেছিলেন অরুণোদয় নিজে।

কমলিনী তখন নতুন বউ। সিঁথির সিঁদুর, হাতে শাঁখা-পলা। উঠোনে আলপনা আঁকা হয়েছে। পুরোহিত মন্ত্র পড়ছেন। আর সেই সময়ই অরুণোদয় সবার চোখ এড়িয়ে বাড়ির এক কোণে মাটি খুঁড়ছিলেন।
কমলিনী অবাক হয়ে বলেছিলেন,-- এখন আবার কী করছ?

অরুণোদয় হেসে পকেট থেকে ছোট্ট একটা নিমগাছের চারা বের করে বলেছিলেন -- গৃহপ্রবেশের দিন একটা গাছ লাগানো শুভ। এই গাছটা আমাদের সংসারের সঙ্গে বড় হবে।

কমলিনী হেসে বলেছিলেন,-- তোমার মাথায় সবসময় কী সব অদ্ভুত চিন্তা ঘোরে!
অরুণোদয় মাটিতে চারা লাগাতে লাগাতে উত্তর দিয়েছিলেন-- অদ্ভুত নয় কমল, মানুষ চলে যায়… গাছ রয়ে যায়।

সেই কথাটা তখন হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন কমলিনী।

কিন্তু বহু বছর পরে, জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝলেন— মানুষটা কত বড় সত্যি কথা বলে গিয়েছিল।

বাড়িটা ছিল সীমান্তঘেঁষা এক ছোট্ট শহরে। চারদিকে পুকুর, তালগাছ, কাশফুল আর ভোরবেলার আজানের সুর। অরুণোদয় স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ইতিহাস পড়াতেন। ছেলেমেয়েদের বলতেন-- দেশ মানে শুধু মানচিত্র নয়, দেশ মানে মানুষের স্মৃতি।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে হঠাৎ সব বদলে গেল।

রাতের অন্ধকারে গুলির শব্দ, আগুনের লেলিহান শিখা, মানুষের চিৎকার-- শহরটা যেন এক মুহূর্তে নরকে পরিণত হলো। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিবেশীরা একে একে বাড়ি ছাড়তে শুরু করল।
সেই রাতেই অরুণোদয় অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন নিমগাছটার পাশে। তখনও গাছটা খুব ছোট। পাতাগুলো কচি সবুজ।

কমলিনী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলেছিলেন-- চলো না, আমরা এখান থেকে চলে যাই।
অরুণোদয় বলেছিলেন-- সবাই যদি পালিয়ে যায়, তবে দেশটা থাকবে কার?
কমলিনীর বুকের ভিতরটা হুহু করে উঠেছিল।
-- তুমি কি যুদ্ধে যাবে?
অরুণোদয় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন--যদি না যাই, তবে আদিত্যকে বড় হয়ে কী শেখাব?

সেদিন রাতে আদিত্য ঘুমিয়ে ছিল। মাত্র তিন বছরের শিশু। অরুণোদয় অনেকক্ষণ ছেলের মাথায় হাত রেখে বসেছিলেন। তারপর কমলিনীর দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন-- যদি ফিরতে দেরি হয়, গাছটার যত্ন নিও।
কমলিনী রাগ করে বলেছিলেন-- অমন অশুভ কথা বলবে না!
অরুণোদয় শুধু হেসেছিলেন। সেই হাসির ভিতরে কেমন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ছিল।
তারপর একদিন সত্যিই তিনি আর ফিরলেন না।
কেউ বলল পাকসেনাদের গুলিতে মারা গেছেন। কেউ বলল পাকসেনারা তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরে আর খোঁজ মেলেনি।
কমলিনী কোনওদিন তাঁর মৃতদেহও দেখতে পাননি।
শুধু এক সহযোদ্ধা এসে অরুণোদয়ের পুরোনো হাতঘড়িটা দিয়ে গিয়েছিল।

সেদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টি পড়ছিল। কমলিনী উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ছোট্ট নিমগাছটা বৃষ্টিতে ভিজছিল। হাওয়ায় তার পাতাগুলো কাঁপছিল থরথর করে।
হঠাৎ কমলিনীর মনে হল— এই পৃথিবীতে তাঁর আর কেউ নেই।
তবু তিনি বাড়ি ছাড়েননি।
অনেকেই বলেছিল-- এখানে আর থাকা নিরাপদ নয়। চলে যান ওপারে।
কমলিনী দৃঢ় গলায় উত্তর দিয়েছিলেন-- যে মানুষটা এই মাটির জন্য প্রাণ দিল, তার ভিটে আমি ছেড়ে যাব না।

তারপর শুরু হয় এক দীর্ঘ যুদ্ধ— এক নারীর একার যুদ্ধ।
দিনে সেলাই, রাতে আচার বানানো। কখনো মানুষের বাড়িতে রান্না করা। তবু অভাবের কাছে মাথা নত করেননি তিনি।
আর প্রতিদিন সকালে নিমগাছটার গোড়ায় জল দিয়েছেন।
গাছটা ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল।
আদিত্য সেই গাছের ছায়ায় খেলতে খেলতে বড় হলো। স্কুলে যাওয়ার আগে গাছটাকে জড়িয়ে ধরত। 
ঝড় উঠলে গাছটা কেমন বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত বাড়িটার সামনে।
কমলিনী মাঝে মাঝে মনে মনে বলতেন-- তুমি আছ বলেই এখনও মনে হয় অরুণোদয় আছে।

সময় কারো জন্য থেমে থাকে না।
একদিন আদিত্য চাকরি পেল শহরে। তারপর বিয়ে করল। তার স্ত্রী মেঘলা আধুনিক মেয়ে। বড় শহরে মানুষ।
পুরোনো বাড়িটার প্রতি তার কোনও টান ছিল না।
সে প্রায়ই বলত-- এই ভাঙাচোরা বাড়িতে আর কতদিন? এত বড় জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

আদিত্য প্রথমে প্রতিবাদ করত। কিন্তু সংসারের হিসেব মানুষকে বদলে দেয়।
একদিন সে মাকে বলল--- প্রোমোটাররা খুব ভালো অফার দিয়েছে। এখানে ফ্ল্যাট হলে আমাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে।
কমলিনী চুপচাপ শুনছিলেন।
আদিত্য একটু ইতস্তত করে বলল-- তবে… নিমগাছটা কাটতে হবে।

কথাটা শুনে কমলিনীর বুকের ভিতরটা যেন হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল।
অনেকক্ষণ পরে তিনি শুধু বললেন-- গাছটা কাটবে?
মেঘলা বিরক্ত হয়ে বলল-- ওটা আবার গাছ নাকি? শুধু তো পাতা। না কোনও সুন্দর ফুল, না ফল।

কমলিনী উঠে দাঁড়ালেন। জানলার বাইরে নিমগাছটা দাঁড়িয়ে আছে। বিকেলের আলোয় তার ছায়া লম্বা হয়ে উঠোনে পড়েছে।
তিনি আস্তে আস্তে বললেন-- সব গাছ ফুল,ফল দেয় না মা। কিছু গাছ শুধু ছায়া দেয়।

কেউ উত্তর দিল না।
কয়েকদিন পরে কাঠুরেরা এল।
সকালের বাতাসে কেমন অদ্ভুত গুমোট গন্ধ। নিমপাতাগুলো কাঁপছে। যেন অশনি সংকেত টের পাচ্ছে।
একজন কাঠুরে কুঠার তুলতেই কমলিনী ছুটে এসে গাছটার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন -- কেউ কাটবে না!
আদিত্য বিরক্ত হয়ে বলল -- মা, তুমি বুঝতে চাইছ না কেন?
কমলিনীর চোখদুটো লাল হয়ে গেল। কোনও মতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন -- তুই বুঝবি না আদিত্য। এই গাছটা শুধু গাছ নয়।
— তাহলে কী?
কমলিনী কাঁপা হাতে গাছটার গায়ে হাত রেখে বললেন-- এটা তোর বাবার শেষ স্মৃতি। যুদ্ধের পরে যখন সবাই চলে যাচ্ছিল, আমি এই গাছটার জন্য থেকেছিলাম। কারণ মনে হতো, তোর বাবা এখানেই আছে।
হাওয়ায় পাতাগুলো ঝিরঝির করে উঠল।
কমলিনী বলতেই থাকলেন -- মানুষ যখন খুব একা হয়ে যায়, তখন গাছও আপন হয়ে ওঠে রে। এই গাছটা আমার কান্না শুনেছে, অভাব দেখেছে, তোর বড় হওয়া দেখেছে… তুই আজ যাকে অকেজো বলছিস, সে আমাদের পুরো জীবনটা বয়ে বেড়াচ্ছে।
আদিত্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার হঠাৎ মনে পড়ল— ছোটবেলায় মা নিমপাতা বেটে গায়ে মাখিয়ে দিতেন। মাঝে মাঝে নিমপাতা ভেজে ভাতের সাথে খাইয়ে দিতেন ।বাবা সম্পর্কে যত গল্প, সব এই গাছতলায় বসেই শোনা।
সে কাঠুরেদের দিকে তাকিয়ে বলল -- কাজ বন্ধ করুন।
মেঘলা অবাক হয়ে বলল -- মানে?
আদিত্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল -- বাড়ি ভাঙা হবে… কিন্তু গাছটা থাকবে।

কমলিনীর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
অনেক বছর পরে তিনি যেন আবার অরুণোদয়ের কণ্ঠ শুনতে পেলেন-- মানুষ ভুলে যায়, গাছ ভোলে না।

সেই বছর দুর্গাপুজোর অষ্টমীর সকালে নতুন ফ্ল্যাটবাড়ির কাজ শুরু হলো। কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল পুরোনো নিমগাছটা।
প্রোমোটার অনেক আপত্তি করেছিল। পরে নকশা বদলাতে হয়েছিল।

নতুন এই ফ্ল্যাটটার নাম রাখা হয়েছে , নিমতলার আলো।
ফ্ল্যাটের বাচ্চারা বিকেলে এখন সেই গাছতলায় খেলে। কেউ দোলনা বেঁধেছে, দোল খাওয়ার জন্য। কেউ আবার নিম গাছটার তলায় বসে বই পড়ে।
কমলিনী বারান্দায় বসে চুপচাপ দেখেন।
শরতের বাতাসে নিমপাতা নড়ে ওঠে। রোদ এসে পড়ে তাঁর সাদা চুলে।
মাঝে মাঝে তাঁর মনে হয়-- মানুষের আসলে মৃত্যু হয়না।সে শুধু তার অবয়ব ছেড়ে চলে যায় । কিন্তু সে বেঁচে থাকে কোনও গাছের ছায়ায়, কোনও পুরোনো উঠোনের গন্ধে, কিংবা কারও না বলা ভালোবাসার ভিতরে।

No comments:

Post a Comment