শ্রীমতী রীনা
১
আমি বেড়াতে খুবই কম গিয়েছি। তবুও বেড়ালের ভাগে শিকে ছেঁড়ার মতো। কখনও কখনও বেড়াতে গিয়েছি। আমার প্রথম বেড়ানো কলকাতা থেকে দার্জিলিং। আর সান রাইজ। আর ভোরের জিপে চেপে। আর সালটা ছিল ১৯৮০ সাল। একটা দল গড়ে উঠেছিল হথাতই। আমাকে তারা কেন যে নিয়েছিল আজ আর মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে ওদের কাছে আমি ছিলাম ছোট বোন। তাই আমাকেও নিয়েছিল। আমরা উদ্বাস্তু পরিবার। আমাদের দুবেলা দুমুঠো জোটে না, তাতে আবার বেড়ানো? আমাদের যত বেড়ানো ছিল আমাদের মনে মনে, আর বড় জোর স্বপ্নে। সেইদিনগুলো খুবই খুশিতে কাটত, যেদিন বেড়াতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। ের আসল কারণটা অনেক পরে বুঝেছি। আমাদের ভূগোলের বই, স্কুলের বন্ধুদের গল্পে আমাদের মধ্যে একটা স্বপ্নের শেকড় পুঁতে দিত। তাই, ১৯৮০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে আমাকে প্রথমবার বেড়াতে যেতে।
বছর পরে ভাবলে মনে হয়, সেই বেড়ানোটা আসলে শুধু দার্জিলিং যাওয়া ছিল না। ওটা ছিল আমার নিজের পৃথিবীর প্রথম দরজা খুলে যাওয়া। তার আগে পৃথিবী বলতে আমার কাছে ছিল আমাদের ঘর, পাড়া, স্কুল, স্কুলের মাঠ, বইয়ের পাতা আর মানুষের মুখ। ভূগোলের বইয়ে পাহাড় ছিল—নীলচে, দূরের, ছবির মতো। মানচিত্রে দার্জিলিং ছিল একটা নাম। আর সেই নামের পাশে লেখা থাকত পাহাড়, চা-বাগান, কাঞ্চনজঙ্ঘা,
আমাদের শহরতলিতে তখন শীত মানে কুয়াশা, সকালের ঠান্ডা, গায়ে সোয়েটার, আর রাস্তায় বড়দিনের আলোর রেশ। কিন্তু পাহাড়ে যে শীত কাকে বলে, তখনও জানতাম না। আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম আমার এক দিদির সঙ্গে। দিদির ছেলেমেয়েরা প্রায় আমরাই বয়সী। ওদের আমাদের মতো আর্থিক দুরবস্থা ছিল না তখন। ওদের সঙ্গে বাবা আমাকে পাথিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বেড়াতে যাওয়ায় আর সব ভাইবোনদের স্যাক্রিফাইস ছিল। ওদের ভাগের বেড়ানোটা আমি বেড়াতে বেড়াতে পেয়েছিলাম।
আমার কাছে তখন শীত মানেই শুধু সেই লাল সোয়েটার নয়—অন্যরকম একটা পৃথিবী। পৌঁছনোর পরই যেন অন্য পৃথিবীর শুরু।
২
একটা সপ্তাহ।
আজ ভাবলে অবাক লাগে—মাত্র সাত দিন। কিন্তু সেই সাত দিনের মধ্যে যেন কতগুলো আলাদা আলাদা পৃথিবী ছিল। আর আমার মনে হয়, আমরা যে সময়টায় গিয়েছিলাম, সেটাও দার্জিলিংকে অন্যরকম করে তুলেছিল। শীতের দার্জিলিং।
এখনকার মতো এত হোটেল, এত গাড়ি, এত পর্যটকের ভিড়, এত দোকানের ঝলমলানি তখন ছিল না—অন্তত আমার চোখে পড়েনি। দার্জিলিং এখনও একটা ছোট পাহাড়ি শহরের মতোই ছিল। তার নিজস্ব একটা গতি ছিল। কলকাতার মতো তাড়াহুড়ো ছিল না। পাহাড়ের রাস্তা ধরে মানুষ হাঁটছে, দোকান খুলছে, সন্ধে নামছে—সবকিছু যেন একটু ধীরে ধীরে ঘটছে। চৌরাস্তা বা ম্যাল তখনও শহরের প্রাণকেন্দ্র। চার দিকের রাস্তা এসে সেখানে মিলেছে। পাহাড়ের ওপর একটা খোলা জায়গা, যেখানে দাঁড়িয়ে থাকা যায়, বসে থাকা যায়, মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকা যায়।
আমাদের থাকার হোটেলের নাম আজ আর মনে নেই, কিন্তু হোটেলের মানুষগুলোর ব্যবহার মনে আছে। সেই সময়ের ছোট পাহাড়ি হোটেলগুলোর মধ্যে একটা ঘরোয়া ব্যাপার ছিল। আজকের মতো রিসেপশনের কাচঘেরা কাউন্টার, কার্ড, কম্পিউটার, এত
ওদিকে বড়দের দলের সঙ্গে হোটেলের বসা আরও লোকেদের কথা হচ্ছে। আমরা কলকাতা থেকে এসেছি শুনলেই যেন একটা আলাদা পরিচয় তৈরি হয়ে যেত।
“কাল টাইগার হিল যাবেন?”
“খুব ভোরে বেরোতে হবে।”
“গরম কাপড় নেবেন।”
“বাচ্চাটার জন্য আরও একটা কম্বল লাগবে।”
এইসব কথার মধ্যে একটা আন্তরিকতা ছিল।
হোটেলের ঘরেও সেই সময়ের আলাদা গন্ধ। কাঠের দেওয়াল, মোটা পর্দা, ভারী কম্বল, কোথাও কাঠের মেঝে, কোথাও পুরনো আসবাব। দার্জিলিংয়ের পুরনো হোটেল-সংস্কৃতির মধ্যে অতিথিকে ব্যক্তিগত যত্নে রাখার একটা দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। আমার কাছে অবশ্য হোটেল মানে ছিল আরও সহজ একটা ব্যাপার—বাড়ির বাইরে নিজের বিছানা, জানলার বাইরে পাহাড়, আর সকালে ঘুম ভাঙলেই অন্য একটা আকাশ।
খাওয়া-দাওয়ার কথাও আলাদা করে মনে পড়ে। বেড়াতে গিয়ে খাবারও যেন বেড়ানোরই অংশ হয়ে যায়। বাড়িতে ভাত, ডাল, ডিম, তরকারি—এসবই ছিল আমাদের নিত্যদিনের খাবার। কিন্তু পাহাড়ে বসে সেই একই খাবারও অন্যরকম লাগত। সকালে গরম চা, ঠান্ডার মধ্যে ধোঁয়া ওঠা কাপ হাতে নেওয়া, রুটি বা টোস্ট, ডিম, কখনও গরম গরম পুরি। দুপুরে ভাত, ডাল, তরকারি। রাতে সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া। খাবার খুব রাজকীয় ছিল কি না, আজ আর বলতে পারব না। কিন্তু তখন মনে হত—এর চেয়ে ভালো খাবার আর হয় না। কারণ ক্ষুধার সঙ্গে বেড়ানোর আনন্দ মিশে গিয়েছিল।
আর ছিল চা। দার্জিলিং গিয়ে চা খাওয়ার একটা আলাদা ব্যাপার আছে। কলকাতায় চা খাই—চা হিসেবেই। কিন্তু পাহাড়ে চা খেতে খেতে মনে হয়, এই চা-ই বুঝি পাহাড়ের একটা অংশ। ঠান্ডা হাওয়া, কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে, দূরে পাহাড়—চায়ের স্বাদও যেন বদলে যায়। তাছাড়া আমি বাড়িতে চা খেতাম না। কারণ গুড় দিয়ে চা আমার ভাল লাগত না।
৩
বড়দিনের সময় হওয়ায় শহরের বাজারেও একটা উৎসবের আবহ ছিল। সন্ধে নামলেই আমরা বেরিয়ে পড়তাম। দার্জিলিংয়ের রাত আমার কাছে ছিল একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। কলকাতায় রাত মানে বাড়ি ফেরা, দরজা বন্ধ, খাওয়া, ঘুম। কিন্তু এখানে? রাতেও শহর আছে। টিমটিম আলো জ্বলছে, তারার মতো দূরের ঢালে। রাতেও মানুষ হাঁটে শীতের পোশাকে ঢেকে। দোকানের আলো জ্বলে মৃদু গান বাজে রেডিওতে। কেউ চা খায়, কেউ গরম খাবার বিক্রি করে। কেউ উলের টুপি দেখছে, কেউ মাফলার কিনছে, কেউ শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সব রাস্তাই ঢালের।
আমরাও ঘুরলাম। আমি ছোট বলে হয়তো মাঝে মাঝে কারও হাত ধরে। কখনও ম্যালের দিকে, কখনও বাজারের দিকে, কখনও শুধু পাহাড়ি রাস্তা ধরে। চৌরাস্তা তখন আমার কাছে একটা আশ্চর্য জায়গা। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হত, কত রকম মানুষ! কেউ পর্যটক, কেউ স্থানীয়, কেউ দোকানদার। কোথাও পাহাড়ি মানুষের কথাবার্তা, কোথাও বাংলা, কোথাও হিন্দি, কোথাও অন্য ভাষা। একটা শহরের মধ্যে এতগুলো ভাষা থাকে—সেটাও বোধহয় তখন প্রথম টের পেয়েছিলাম।
দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। সবকিছু কিনতে তো পারব না, জানতাম। কিন্তু দেখতে তো পারতাম। উলের টুপি, মাফলার, দস্তানা, কাঠের ছোটখাটো জিনিস, নানা রকম স্মারক। কখনও কোনও জিনিস হাতে নিয়ে আবার রেখে দিয়েছি। কারণ বেড়াতে এসেছি মানেই যে ইচ্ছেমতো কেনাকাটা করা যায়, তা তো নয়। আমাদের বাড়ির হিসেব তখনও আমাদের সঙ্গে ছিল, পাহাড়ে গিয়েও। তবু কোনও কষ্ট লাগেনি। কারণ তখন আমার মনে হত, আমি জিনিসগুলো না কিনেও নিয়ে যেতে পারি— চোখে করে, স্মৃতিতে করে।
রাতের দার্জিলিংয়ের একটা বিশেষ নীরবতা ছিল। কলকাতার রাত কখনও পুরো চুপ করে না। দূরে কোথাও বাস, ট্রাম, গাড়ি, মানুষের কথা, কোনও না কোনও শব্দ থাকেই। দার্জিলিংয়ে শব্দ ছিল, কিন্তু তার ফাঁকে ফাঁকে অনেক নীরবতা। দূরে একটা গাড়ি চলে গেল—তারপর চুপ। কেউ রাস্তা দিয়ে কথা বলতে বলতে চলে গেল—তারপর আবার চুপ। কোনও দোকানের শাটার নামল—তারপর আবার পাহাড়, অন্ধকার পাহাড়। সেই নীরবতাও যে একটা জিনিস, সেটাই হয়তো প্রথমবার অনুভব করেছিলাম।
আর ছিল ভোর। টাইগার হিল যাওয়ার দিনটা আলাদা। আমাদের বলা হয়েছিল, খুব ভোরে বেরোতে হবে—আসলে ভোরেরও আগে। রাত শেষ হয়নি তখনও। ভ্রমণের মূল আকর্ষণই ছিল ভোররাতে জিপে করে গিয়ে কনকনে ঠান্ডায় সূর্যোদয়ের অপেক্ষা এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখরে সূর্যের প্রথম আলোর সোনালি রঙ দেখা। ঘুমের মধ্যে আমাদের ডেকে তোলা হল। কী ভীষণ ঠান্ডা! মনে হচ্ছিল, বিছানা থেকে বেরোনোই অসম্ভব। শরীরে যা গরম কাপড় ছিল, সব পরানো হল—সোয়েটার, মাফলার, টুপি—তবু ঠান্ডা ঢুকছে। বাইরে বেরিয়ে দেখি, আকাশ এখনও কালো।
৪
আমাদের জন্য জিপ দাঁড়িয়ে। সেই জিপে চেপে আমরা রওনা হলাম। আজও সেই কথা মনে পড়লে মনে হয়, আমরা যেন কোনও গোপন অভিযানে বেরিয়েছি। চারপাশ অন্ধকার। জিপের আলো যতটা যায়, ততটাই রাস্তা দেখা যায়—তারপর শুধু পাহাড়ের অন্ধকার। মাঝে মাঝে অন্য জিপ, কেউ কেউ আমাদের আগেই বেরিয়েছে। সবাই কোথায় যাচ্ছে? সূর্য দেখতে। বিষয়টা এখনও আমার কাছে আশ্চর্য লাগে। সূর্য তো প্রতিদিনই ওঠে—কলকাতায়ও ওঠে, আমাদের বাড়ির ওপরেও ওঠে। কিন্তু সেদিন আমরা সূর্যোদয়কে দেখতে যাচ্ছিলাম।
টাইগার হিলে পৌঁছে অপেক্ষা। সেই অপেক্ষাটাই আজও আমার কাছে সবচেয়ে বেশি মনে আছে। ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকা, লোকজনের গায়ে কম্বল, কেউ গরম চা খাচ্ছে, কেউ হাত ঘষছে, কেউ বলছে, “আজ দেখা যাবে তো?” কারণ পাহাড়ে সূর্যোদয় দেখতে গিয়ে সূর্য দেখা যাবে কি না, তারও নিশ্চয়তা নেই। মেঘ এসে সব ঢেকে দিতে পারে, কুয়াশা থাকতে পারে, আকাশ পরিষ্কার নাও হতে পারে। সেদিন আমরা অপেক্ষা করছিলাম অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে।
তারপর খুব ধীরে ধীরে একটা পরিবর্তন শুরু হল। প্রথমে আকাশ কালো থেকে একটু হালকা। কেউ একজন হয়তো বলল—“ওই দেখুন!” সবাই একদিকে তাকাল। আমি দেখলাম, দূরের অন্ধকার পাহাড়গুলোর মাথার ওপর কোথাও একটা ফিকে আলো ফুটছে। তারপর সেই আলো একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ল। আকাশের রং বদলাতে লাগল—কালো, ধূসর, তারপর ফিকে নীল, তার মধ্যে গোলাপি একটা আভা, তারপর আরও উজ্জ্বল।
আমরা অপেক্ষা করছি কাঞ্চনজঙ্ঘার জন্য। আসলে পাহাড় তখনও পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না, শুধু একটা অন্ধকার বিশালতা। তারপর হঠাৎ করে কোথাও আলো পড়ল—একটা চূড়ায়, তারপর আর একটা। ধীরে ধীরে সাদা বরফের ওপর সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়ল। আমি তখন বুঝতেই পারিনি, ঠিক কী দেখছি। শুধু মনে হচ্ছিল, এতক্ষণ যে পাহাড়টা অন্ধকার ছিল, তার গায়ে কেউ যেন আলো জ্বেলে দিয়েছে।
তারপর সেই আলো আরও ছড়িয়ে গেল। বরফঢাকা শিখরগুলোর রং বদলাতে লাগল—সাদা থেকে সোনালি, আবার কোথাও গোলাপি। আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ও যেন আমাদের সামনে খুলে যেতে লাগল। সেই মুহূর্তে কেউ কথা বলছিল কি না, আজ মনে নেই, কিন্তু আমার মনে হয়, আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। কারণ এত বড় একটা দৃশ্য দেখার জন্য আমার কোনও ভাষা ছিল না—আজ এত বছর পরেও নেই। শুধু মনে আছে—সেদিন প্রথমবার সূর্যোদয়কে দেখেছিলাম। সূর্য ওঠা তো নয়, পৃথিবীর ওপর আলো আসতে দেখেছিলাম।
টাইগার হিল থেকে ফেরার পথেও বেড়ানো শেষ হয়নি। পাহাড়ে বেড়ানোর একটা মজা হল, এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাওয়ার পথটাই আর একটা দর্শনীয় স্থান। কোথাও রাস্তার বাঁক, কোথাও পাইনগাছ, কোথাও নিচে মেঘের মতো কুয়াশা, কোথাও পাহাড়ের গায়ে বাড়ি, কোথাও দূরে চা-বাগানের ঢাল, কোথাও এমন একটা জায়গা, যেখানে গাড়ি একটু থামলেই সবাই নেমে দাঁড়ায়। তারপর ছবি।
তখনকার ছবি তোলা অবশ্য আজকের মতো ছিল না। একটা ছবি তোলার আগে ভাবতে হত—কতগুলো ছবি তোলা যাবে? ফিল্ম নষ্ট করা চলবে না। তাই আজকের মতো হাজার হাজার ছবি নেই, কিন্তু সেই কম ছবিগুলোই হয়তো বেশি করে মনে থেকে গেছে।
৫
আমাদের ঘোরার তালিকায় ছিল বাতাসিয়া লুপ আর দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের সেই টয় ট্রেন। সেটা আমরা চড়েছি। তাতেও বেশ মজা।
১৮৮১ সালে চালু হওয়া ঐতিহ্যবাহী ন্যারোগেজ স্টিম ইঞ্জিন ট্রেনটি যখন পাহাড় ঘুরে যেতো, তা দেখে আমরা মুগ্ধ হতাম। যদিও আমরা প্রথমে ন্যারোগেজ ট্রেনে উঠতে উঠতে বাতাসিয়ার সেই আশ্চর্য বাঁক দেখেছিলাম, পরে আলাদা করে দেখার অভিজ্ঞতাও ছিল। ট্রেন পাহাড়ের ঢালে কী অদ্ভুতভাবে নিজের পথ তৈরি করেছে! সরু রেললাইন, পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলা, তারপর সেই ঘুরে যাওয়া। গাড়িঘোড়াহীন সেই উন্মুক্ত পাহাড়ি চত্বরে বসে বাতাস উপভোগ করা, ঘোড়ায় চড়া আর আড্ডা দেওয়াই ছিল পর্যটক ও স্থানীয়দের মূল আনন্দ। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের এই বাতাসিয়া লুপ আসলে পাহাড়ি ঢালে উচ্চতার পার্থক্য সামলানোর জন্য তৈরি এক অসাধারণ রেল-প্রকৌশল।
ঘুমও ছিল। ঘুম স্টেশন, পাহাড়ি কুয়াশা এবং ঐতিহ্যবাহী ঘুম মনাস্ট্রি (Yiga Choeling Monastery) আর ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত দালি মনাস্ট্রি—সব মিলিয়ে এক মায়াবী আবহ তৈরি হতো। ঘুম নামটা শুনেই আমার কেমন যেন লাগত—মনে হত, নামের মধ্যেই যেন পাহাড়ি কুয়াশা আছে। ছোটবেলায় কোনও জায়গার নামও যে তাকে নিয়ে কল্পনা তৈরি করতে পারে, সেটা তখন বুঝতাম। ঘুমের দিকের পাহাড়ি রাস্তা, রেললাইন, ঠান্ডা—সব মিলিয়ে মনে হত, আমরা কলকাতা থেকে কত দূরে চলে এসেছি!
বেড়ানোর পরবর্তী দিনগুলোতে শহর দেখার আমেজ ছড়িয়ে পড়েছিল আরও অনেক জায়গায়। আমরা গিয়েছিলাম তেনজিং নরগে ও স্যার এডমন্ড হিলারি প্রতিষ্ঠিত হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট (HMI) এবং তার সংগ্রহশালায়। ঠিক পাশেই ছিল পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্ক, যা রেড পান্ডা আর স্নো লেপার্ডের জন্য বিখ্যাত—ছোটদের চোখে সেই পশুপাখিরা যেন রূপকথার জগত খুলে দিত। পাহাড়ের বিভিন্ন প্রজাতির সংরক্ষিত পশুপাখি আর অসংখ্য পোকামাকড় দেখতে বেঙ্গল ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামেও পা রেখেছিলাম।
আবার কখনও গাড়ি থেমেছে পাহাড়ের ঢালে সাজানো সবুজ হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেটে। সেখানে বাতাসজুড়ে ভেসে আসত তাজা চায়ের সুবাস। আবার কখনও তিব্বতি রিফ্যুজি সেলফ হেল্প সেন্টারে গিয়ে দেখেছি কারিগরদের হাতে তৈরি ঐতিহ্যবাহী উলের কার্পেট, কাঠের নিখুঁত খোদাই করা বিভিন্ন স্মারক ও নানারকম হস্তশিল্প।
তারপর আবার শহরের চেনা ছন্দে ফেরা। ম্যাল, চৌরাস্তা, বাজার, চা, রা
আর ৩১ ডিসেম্বরের রাতের কথা আলাদা করে মনে পড়ে। বছরের শেষ রাত। কলকাতায় তখন আমরা কী করতাম, জানি; কিন্তু পাহাড়ে? পাহাড়ে নতুন বছর আসবে—এই ধারণাটাই আলাদা ছিল। রাতের ঠান্ডা আরও বেড়েছে, বাজারে আলো, মানুষজন, কোথাও উৎসবের আবহ, হোটেলেও হয়তো একটু বেশি হৈচৈ। কেউ বলছে, আর একটু পরেই নতুন বছর। আমি তখন বছর বদলানোকে পুরোপুরি বুঝতাম না। কিন্তু একটা কথা বুঝতাম—১৯৮০ শেষ হচ্ছে, আর ১৯৮১ আসছে। আমি পাহাড়ে দাঁড়িয়ে একটা নতুন বছরকে স্বাগত জানাচ্ছি। কী অদ্ভুত! যে মেয়েটা এতদিন বইয়ের পাতায় পাহাড় দেখেছে, সে এখন সত্যি পাহাড়ে। আমার আঁকার খাতায় পাহাড় যেন তারপর থেকে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।
৬
তারপর ১ জানুয়ারি—নতুন বছরের প্রথম দিন। আর আমাদের ফেরার প্রস্তুতি। বেড়াতে যাওয়ার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অংশ বোধহয় ফিরে আসা। যাওয়ার আগে যত উত্তেজনা, ফেরার আগে তত মন খারাপ। সুটকেস গুছিয়ে ফেলা, কাপড় ভাঁজ করা, শেষবার জানলা দিয়ে পাহাড় দেখা, শেষবার সেই রাস্তা, শেষবার ম্যাল, শেষবার দোকানগুলোর দিকে তাকানো। মনে হচ্ছিল, পাহাড়টাকে কি সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া যায় না?
অবশ্য পাহাড় সঙ্গে নেওয়ার উপায় নেই, তাই তাকে রেখে আসতে হয়। কিন্তু সবটা রেখে আসা যায় না, কিছুটা নিজের সঙ্গে চলে আসে।
১৯৮০ সালের সেই দার্জিলিং সফর শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফিরে এসে আবার সেই পুরনো জীবন—সেই ঘর, সেই অভাব, সেই হিসেব, দুবেলা দুমুঠো খাবারের লড়াই। কিন্তু একটা জিনিস আর আগের মতো ছিল না—আমার পৃথিবী।
তার আগে পৃথিবী বলতে আমি জানতাম আমাদের ঘর, আমাদের পাড়া, স্কুল, রাস্তা আর বইয়ের পাতা। দার্জিলিং থেকে ফিরে এসে আমি জানলাম, পৃথিবী আরও অনেক বড়। সেখানে পাহাড় আছে, সেখানে বরফঢাকা শিখরে ভোরের আলো পড়ে, সেখানে একটা ছোট্ট ট্রেন পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে যায়, সেখানে শীতের রাতে দোকানের আলো জ্বলে, সেখানে অচেনা হোটেলের মানুষ ছোট্ট একটা মেয়ের জন্য বাড়তি কম্বলের কথা ভাবতে পারে।
আর সেখানেই হয়তো প্রথমবার বুঝেছিলাম—আমার জন্ম, আমার পরিবার, আমাদের অভাব—এসবের বাইরে একটা পৃথিবী আছে। সেই পৃথিবী আমার জন্য বন্ধ নয়। আরেকটা বাড়তি পাওনা হয়েছিল, একটা লাল সোয়েটার। যেটা দিদি গিফট করেছিল। হ্যাঁ, সেটা গায়ে দিতাম আমরা তিন ভাইবোন-ই। কারণ, ওদের ভাগের ঘোরা আমার, আর আমার ভাগের সোয়েটার ওদেরও।
আর সেই গল্পগুলো দাদা, ভাইকে বলছিলাম যখন, তখন হ্যারিকেনের আলো সেই পাহাড়ের ঘরের আলো হয়ে উঠেছিল। অনেক বছর পর লিখতে লিখতে সেই স্মৃতিতে ফিরলাম, আরেকবার দার্জিলিং ঘুরলাম।

No comments:
Post a Comment