Friday, September 4, 2026


 

বেলজিয়াম এর অটোমিয়াম
রণিতা দত্ত

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ১৯৫৮, বেলজিয়াম।এক্সপো। এই মেলায় প্যাভেলিয়ান আর সিম্বল হিসেবে তৈরী হলো অটোমিয়াম।একটি লৌহের ক্রিস্টালের ১৬৫ বিলিয়ন গুণ বেশি কিন্তু অবিকল ৯টি অটোম দিয়ে লৌহের ক্রিস্টালের স্ট্রাকচার। দৈত্যাকৃতির এই আধুনিক স্থাপত্য ১০২মিটার (৩৩৫ফুট )লম্বা। সে ব্রেসেলসের সর্বোচ্চ নির্মাণ।

দূর থেকে দেখেছিলাম অনেক আলোক মালা। সেন্ট লুক হসপিটালের কাঁচের জানলা দিয়ে। ওটা কি সে জানতে চাইবার সময় সেটা ছিলনা বটে, তবে নীড় ছেড়ে নীল আকাশে উড়তে শিখলে পাখির ছানারা কেমন যেন অকুতভয় হয় বুঝলাম। ওই টেনশন। তারমধ্যে মেয়ে বলল, "অটোমিয়াম ওটা। তোমাকে দেখিয়ে আনবো। " আমি মনে বললাম, "সামলে নে আগে, পরে কি দেখি আর দেখিনা দেখবোক্ষণ। "


একদিন বিকেলে প্যামে নতুন মানুষটাকে নিয়ে গেলাম অটোমিয়াম গ্রাউন্ডে। এতো টুরিস্ট যে গাড়ির পার্কিং পাওয়া মুশকিল। যাইহোক, ঘাড়-মাথা একিয়ে বেঁকিয়ে,এ কাত, ও কাত করে আমি তো দেখতে ব্যস্ত। সে কি যে সে কথা! নয়টি ১৮ মিটার ব্যাসের স্টেনলেস স্টিলের বল পরস্পর সংযুক্ত। এই বল দেখলে বোঝা যায় এগুলো এক একটা এটমকে বোঝাচ্ছে। প্রতিটি বল এর মাঝে আছে মিউজিয়াম। এস্কেলেটরে যাওয়ার ব্যবস্থা। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের ওপর অনেক তথ্য, মডেল ডিসপ্লে আছে। একটি রেস্টুরেন্টও আছে। আছে সুন্দর পার্ক। ওখানে উঠে ব্রেসেলস শহরকে ভারি সুন্দর লাগে। জানলাম "অটো" এটম থেকে আর অ্যালুমিনিয়াম থেকে "মিয়াম" শব্দ দুটো জুড়ে অটোমিয়াম। অ্যালুমিনিয়াম কেন? প্রশ্ন থাকে। অ্যালুমিনিয়াম হলো ভূ পৃষ্টের সিয়াল স্তর সৃষ্টির মূল উপাদান। 

যুদ্ধোত্তর পৃথিবী বিশেষত ইউরোপ। বেলজিয়াম কিন্তু আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল দু দুটি বিশ্বযুদ্ধেই নিরপেক্ষ থাকার। বেচারাকে থাকতে দেওয়া হয়নি। সে অন্য প্রসঙ্গ, অন্য দিন। আজকে বলি অটোমিয়ামের বার্তা। বেলজিয়ামের উপনিবেশ কঙ্গো। সেই কঙ্গো ইউরেনিয়মের প্রাচুর্য্য ভরা। তবু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে বেলজিয়াম। অটোমিয়াম এই ইঙ্গিত দেয় যে বিজ্ঞানের উন্নতি, আবিষ্কার,প্রজ্ঞা আজথেকে মানবজাতির কল্যাণে শুধু হিতসাধনে অনুগামী হবে। পৃথিবী তো আজও হিংসায় মত্ত। বিশ্ব জুড়ে চলমান সংঘাত।



ইউরোপে ইউক্রেন-রাশিয়া,মধ্য প্রাচ্যে ইজরাইল প্যালেস্টাইন, ইরান ইরাক, আফ্রিকার ছোট ছোট দেশে গৃহযুদ্ধ, এশিয়ার মায়ানমার,বাংলাদেশ, ভারত পাকিস্তান সীমান্তে, আফগানিস্তান প্রায় গোটা পৃথিবী রণাঙ্গন। যুক্তরাষ্ট্রের নিজের হাতেই আছে তিন হাজার ৭৫০টি নিউক্লিয়ার বোমা। এ অবস্থায় নিউক্লিয়ার নিরস্ত্রীকরণের কথা শুনতেই পারছে না রাশিয়া, চীন ও ইরান, ভারত।এশিয়ার নিরাপত্তা মানচিত্রে একটা বড় পরিবর্তন আসন্ন বলেই তাদের এত আয়োজন। সংখ্যায় কম হলেও ভারত, পাকিস্তানের হাতেও আছে পরমাণু বোমা। তবে আতঙ্কটা মূলত বোমার সংখ্যা নিয়ে নয়। আতঙ্ক বোমার সুইচ যাদের হাতে, সেই ক্ষমতাবান রাজনীতিকদের নিয়ে।

সব ঘুরে যখন অটোরিয়াম থেকে নেমে আসছি তখন সন্ধ্যে ঘনিয়েছে। আলোয় ঝলমল চারিদিক,সঙ্গে আমার আগামী প্রজন্ম। ওর জন্য অক্ষত পৃথিবী আমি চাই। ঠান্ডা বাতাস বইছে। মনে হলো চিৎকার করে আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বলি, "অটোমিয়াম তুমি শান্তির বার্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাক এই শান্তিপ্ৰিয় দেশটির বুকে। চেষ্টা চলুক বিজ্ঞানকে শান্তির সপক্ষে ব্যবহারের। শান্তি আসুক বিশ্বে।"

(ছবি- লেখক) 

No comments:

Post a Comment