টাকা -কড়ি-মুদ্রা
কবিতা বণিক
টাকা মাটি, মাটি টাকা
লাখপতি রামলাল শুয়ে শুয়ে খাটিয়ায়-
বলে, মাটি মানে টাকা, টাকা মানে মাটি হ্যায়।
টাকার সাথে মাটির সম্পর্ক আছে বৈকি! প্রথম দিকে মাটির ট্যবলেটে লেখা হত হিসেব- নিকেশ। লেন-দেনের অঙ্ক ।
টাকার প্রচলন হওয়ার অনেক আগে সমাজে বিনিময় প্রথার চল ছিল। যেমন কৃষক ধানের বদলে কুমোড়ের থেকে হাঁড়ি, কলসী, কলুর থেকে তেল, তাঁতীর থেকে কাপড় ইত্যাদি কিনত। যার যা প্রয়োজন সে নিজের জিনিসের বদলে তার প্রয়োজনীয় জিনিস কিনত। এই ভাবেই সমাজ জীবন চলত। সমস্যা হল যিনি তার সামগ্রী দেবেন, গ্রহীতার কাছে সে জিনিসের প্রয়োজন না থাকলে দাতার পক্ষে সে জিনিস কেনা সম্ভব হত না। দুজনের পারস্পরিক চাহিদা মিটলে তবে বিনিময় সম্ভব । এর ফলে মানুষ নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসের বিনিময় শুরু করল। যেমন শষ্য, গরু, লবণ, ঝিনুক বা কড়ি , ধাতুর টুকরো ইত্যাদি । তবে দশহাজার বছর আগে অনুসন্ধান ও খননকার্যের মাধ্যমে পাওয়া এক ধরনের মাটির ট্যাবলেট আকৃতির জিনিস পাওয়া যায়, যাতে লেখা থাকত নিজেদের ফসল জমা দেওয়ার পরিমাণ এবং তার বিনিময়ে কি কি কিনতে পারেন। সম্ভবত এই ট্যাবলেটকেই মনে করা হয় বিশ্বের প্রথম মুদ্রা। কড়ির বিনিময় প্রথা ভারত, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকায় অনেক শতাব্দী আগে থেকেই ছিল। ছোট ছোট কেনাবেচায় কড়ির প্রয়োজন ছিল ।
এরপর ধাতব মুদ্রার ব্যবহার শুরু হয় । মুদ্রা হল সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বীকৃত বিনিময়ের একটি সার্বজনীন মাধ্যম । যে কোন জিনিসের দাম মুদ্রার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় । প্রাচীন মুদ্রা শুধু লেনদেনের মাধ্যম ছিল না। প্রাচীন বাংলা ও ভারতের সমৃদ্ধ ইতিহাস,সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক উত্থান পতনের এক জীবন্ত দলিল। এর মধ্যে ইতিহাস তার কথা বলে । সে সময়ের রাজার পরিচয়, রাজ্যের সীমা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রযুক্তি গত উন্নতি , সামাজিক ব্যবস্হা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় । মুদ্রা আবিষ্কারের জায়গা থেকে সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করা যায়। কোন স্হানের মুদ্রা দূরবর্তী স্হানে পাওয় গেলে সেটা আন্তঃরাজ্য বাণিজ্য বা সামরিক বিজয়ের কথা বলে।
২৩০০ বছর আগে মৌর্য্য সাম্রাজ্য ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী রাস্ট্র। এই সময় পাঞ্চমার্ক রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন হয়। চন্দ্র গুপ্ত মৌর্য্য, বিন্দুসার ও সম্রাট অশোকের সময় সবচেয়ে বেশি রৌপ্যমুদ্রার ব্যবহার হয়। এই সময় রৌপ্য মুদ্রাই বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম ছিল। প্রতিটি মুদ্রায় হাত দিয়ে পাঁচ বা তার বেশি প্রতীক পাঞ্চ করা হত। মুদ্রা গুলো তৈরি হত খাঁটি রূপা দিয়ে । প্রতীক গুলোতে থাকত রাজার ছবি, সেই রাজ্যের প্রতীক , দেবদেবী , সূর্য, গাছ, ষাঁড়,ধনুক,হাতি, জ্যামিতিক প্রতীক ইত্যাদি ।
সোনা, রূপা, তামার তৈরি মুদ্রা, সেই সময়কার অর্থনৈতিক অবস্থা ও সমৃদ্ধির কথা বলে। শিল্পকলা ও প্রযুক্তির কথাও বলে , সেই মুদ্রার নক্সা, লিপি, ধাতুর বিশুদ্ধতা দেখে। ধাতুর উপর কাজ ও শিল্পকলায় তাদের দক্ষতার পরিচয় দেয়।
প্রাচীন মুদ্রায় দুই ধরণের ভাষার লিপি ও পাওয়া গেছে। দুইধরণের লিপির ব্যবহার করা হত কারণ দুই দেশের ভাষা লিখলে সেই মুদ্রা দ্বিভাষিকের কাজ করত। যেমন ইন্দো-গ্রীক মুদ্রায় গ্রীক ও খরোষ্ঠী লিপি ছিল। খরোষ্ঠী লিপি প্রাচীন লিপি। এই লিপি ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিম অঞ্চল এবং মধ্য এশিয়ায় ব্যবহৃত হত। উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল ছিল গান্ধার অঞ্চল। এখনকার পাকিস্তান ও আফগান। এই মুদ্রা সেই সময়কার ভাষা ও যোগাযোগের মাধ্যম বোঝায়। প্রাচীন ভারতের গুপ্ত বা মৌর্য যুগ, বাংলার সেন যুগ, পাল যুগ। মুদ্রায় থাকত রাজার পরিচিতি, সেই সময়কাল, শাসকের নাম, উপাধি থাকত। একই জায়গায় বিভিন্ন দেশের মুদ্রা পাওয় গেলে বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার সম্বন্ধে জানা যায়।
যেমন হাম্পির মিউজিয়ামে আমার দেখা হাম্পির বিজয়নগর সাম্রাজ্যের দুটি মুদ্রার একটি স্বর্ণমুদ্রা ও অন্যটি তামার মুদ্রার ছবি দেওয়া হল। হাম্পিতে পাওয়া, স্বর্ণ মুদ্রায় একপিঠে শিবপার্বতীর র্মূর্তি, হামাগুড়ি দেওয়া বালকৃষ্ণের মূর্তি, হাতে মাখনের বল। শঙ্খ, চক্রের প্রতিকৃতি। উল্টোদিকে দেবনাগরী লিপিতে রাজার নাম ও উপাধি লেখা- শ্রী প্রতাপ কৃষ্ণ রায়। এটি ওড়িশার উদয়গিরি বিজয়ের স্মারক হয়েছিল। আরও স্বর্ন মুদ্রা যাকে বরাহ বা প্যগোড়া বলা হত। কারণ বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজকীয় প্রতীক ছিল ভগবান বিষ্ণুর বরাহ অবতার।
বিশুদ্ধ সোনা দিয়ে তৈরি হত। মুদ্রার আকার প্রায় পাঁচ মিলিমিটারের মতো হত। শুধু ব্যবসা বাণিজ্যের জন্যই নয়, ধর্মীয় উৎসবেও দান করত। আরও মুদ্রা পাওয় যায় গজানন গণেশ, লক্ষী-নারায়ণ , দুই মাথা ওয়ালা ঈগল।
গুপ্ত যুগে স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন বেশি ছিল। এগুলোকে দিনার বলা হত। রূপার মুদ্রা কে বলা হত রূপক, তামার মুদ্রাকে বলা হত কার্ষাপণ। সাহিত্যে স্বর্ণ মুদ্রাকে সুবর্ণ বা নিস্ক বলা হত। রূপার মুদ্রাকে ‘পুরাণ’ বা ‘ধরণ’ বলা হত। রূপার ছোট মুদ্রা কে শতরান বলা হত। তামার ছোট মুদ্রা কে বলা হত কাকিণী । ১টি সোনার মুদ্রা সমান ১৬টি রূপার মুদ্রা ।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩ শতকের মৌর্য যুগের রূপার মুদ্রায় চাকা এবং হাতির প্রতীক চিহ্ন আঁকা পাওয়াযায়।
তামার মুদ্রা গুলোকে জিতাল, দুগগানি বা কাসু বলা হত। এগুলোতেও রাজকীয় চিহ্ন হিসেবে বরাহ, সূর্য,চাঁদ, খঞ্জর, গণ্ডবেরুণ্ড - ‘পৌরাণিক দ্বিমুখী পাখি’ যা চরম শক্তির প্রতীক, তার নখ দিয়ে হাতি ধরে আছে এমনও খোদাই থাকত। আর থাকত- শিব-পার্বতী, লক্ষী-নারায়ণ, হনুমান, গরুড়, হাতি, ষাঁড় সিংহ ইত্যাদি ।
পালযুগের বালমৃগাঙ্ক মুদ্রা শিশু চন্দ্র কে বোঝায়। পাল সম্রাট গোপাল চন্দ্রাদেবীর পূজা করতেন। চণ্ডীর মতোই চন্দ্রাদেবী। এই দেবী অষ্টভূজা। এই বাল মৃগাঙ্ক মুদ্রায় ‘গো’ ‘দে’ এবং ‘ জয়’ লেখা মুদ্রা পাওয়া যায়। ‘গো’ লেখা মুদ্রা টি প্রাচীন। তাই পাল সম্রাট গোপালের মুদ্রার কথা বলে। সেই মতো দে’ ও ‘জয় ‘লেখা মুদ্রা গুলো দেবপাল ও জয় পালের মুদ্রা বলা হয়। প্রাচীন বাংলার বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল মহাস্থান গড় বা বগুড়া। খ্রীষ্ট পূর্ব ৩য় শতকে উয়ারী , বটেশ্বর, নরসিংদী। ১ম শতকে তাম্রলিপ্ত বা তমলুক মেদিনীপুর, চন্দ্রকেতুগড় বেড়াচাঁপা ২৪ পরগণা।
প্রাচীন ভারতে সামুদ্রিক যে কড়ি পাওয়া যায় সেই কড়ি ছিল মুদ্রার প্রথম রূপ। বাংলা- ভারত সহ আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন উপকূলীয় দেশে কড়ির ব্যবহার হত। কড়ির গুণাগুণ দেখা হত। আবার ছোট , বড় কড়ি, ফুটো কড়ি ও বেচা কেনার জন্য ব্যবহৃত হত। কড়ি ছোট খাটো কেনাবেচায় ব্যবহার হত। ফুটো কড়ি যৎ সামান্য বেচা কেনায় ব্যবহৃত হত। এছাডা ছিল দামড়ি, আনা, পাই, পয়সা, টাকা । দামড়ি ছিল তামার তৈরি মুদ্রা । শের শাহ সুরি এই দামড়ি মুদ্রার প্রচলন করেন। দামড়ি ভগ্নাংশ হিসেবে ব্যবহৃত হত। যেমন ১ টাকায় ৪০ টি ‘ দাম ‘ হত। ১টি দাম মুদ্রার ১/৮ অংশকে বলা হত দামড়ি। সেই হিসেবে ১ টাকায় ৩২০টি দামড়ি পাওয়া যেত। ১টি দামড়ি ৪০ টি কড়ির সমান ছিল।
ভারী ধাতব মুদ্রার ঝামেলা এড়াতে রসিদ ব্যবহার শুরু হয়েছিল। এর থেকেই চীনের সং সরকার প্রথম কাগজি মুদ্রা ‘ জিয়াওজি’ চালু করেন।
আধুনিক টাকার লেনদেন বা কেনাবেচা মূলত ডিজিটাল মাধ্যমে হয়। মানুষ এখন কাগজ বা মুদ্রার বদলে মোবাইল আ্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং,ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির সাহায্যে খুব তাড়াতাড়ি ও সহজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় টাকা পাঠানো বা কেনাবেচা করতে পারে।
অনলাইন ব্যাঙ্কিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সি—
ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং — ঘরে বসে ল্যাপটপ বা ফোনের মাধ্যমে এক ব্যঙ্কের হিসাব থেকে অন্য ব্যাঙ্কে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা।
ক্রিপ্টোকারেন্সি— বিট কয়েনের মত ভার্চুয়াল মুদ্রা দিয়েও আজকাল আন্তর্জাতিক স্তরে লেনদেন হয়ে থাকে ।



No comments:
Post a Comment