Wednesday, March 15, 2017



আলাদিনের চিরাগ ফিরোজ আখতার




আলাদিনের সেই চিরাগটা যে কোথায় গেলো ? আচ্ছা, চিরাগের সেই জিনটা কি এখনো বেঁচে আছে ? বেঁচে আছে না জিজ্ঞাসা করে টিকে আছে কিনা জিজ্ঞাসা করাই বোধহয় ভালো ছিল । আমরা তো এখন আর বেঁচে নেই... টিকে আছি । যদি পেতাম সেই চিরাগটিকে, বের করে আনতাম জিনটাকে...! আর চাইতাম... অবশ্য কিই বা চাইতাম ? কিই বা দিতে পারবে জিন্‌ আজকের পৃথিবীতে । আমার সেই স্বপ্নটাকে কি এনে দিতে পারবে যেটা হারিয়ে গেছে অনেকদিন আগেই ? আমাকে কি স্বপ্ন দেখাতে পারবে ঠিক আগের মতন... যেটা আমি দেখতে ভুলে গেছি ! আমার ধূসর স্বপ্নগুলিকে কি আবার আগের মতো বেনীয়াসহকলায় রাঙিয়ে দিতে পারবে যেটা আমি দেখতাম ছোটবেলায়... আমার জন্যও কি এক পৃথিবী স্বপ্ন নিয়ে আসতে পারবে ? এখন তো স্বপ্নগুলো সব হাটে বিক্রি হয় - একটু মাখন লাগিয়ে বললে বলতে হয় শপিং মলে বিক্রি হয় । কত ধরণের স্বপ্নের পসরা সাজিয়ে বসে আছে হাটুরেরা...থুরি, শপিং মলের মালিকরা ! শুধু স্বপ্নের রঙ্‌ গুলো যেন কেমন ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে গেছে... তার থেকে ঘুমিয়ে থাকুক সেই জিনটা...! সেও স্বপ্ন দেখুক...! নাকি সেও স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে আমাদের মতো...! কেউ যদি জানো তো জানিয়ো আমায়...।
অব্যক্ত কিছু কথা
আলামিন ইসলাম

আমি সূচের উপর পা দিয়ে হেঁটেছি অনেক সময়,
নোনাজলে কেটেছি সাঁতার ৷
এক-একটা আগুনের পিন্ড ধেঁয়ে এসেছে আমার গ্রহে ৷
আমি নতুনের পথযাত্রি.......
অন্ধকার অমাবস্যার জরায়ু ছিঁড়ে বেরোতে চেয়েছি প্রতিনিয়ত ,
আমার চারপাশে জমাট বেঁধেছে মেঘের শক্তপ্রাচীর !
হাত-পা অসাড় করেছে, বরফ কুচি ৷
দুঃখ  ও আমার সমান্তরালে  অবস্থান৷
অসহায়ত্বের চাদরে এই শরীর ঢেকে গেছে বহুবার ৷
কিন্তুু , বাঁধাদের কারাগার ডিঙিয়ে নির্দোষ পূর্ণিমা আমায় গান শুনিয়েছে ৷
পুষ্পরা ঘ্রাণে ছড়িয়েছে মিষ্টি সুবাস !
শব্দ,  অক্ষর  মগজের ট্যানেলে খঞ্জনার মতো , উম্মাদের বেশে করেছে নৃত্য৷
এ সময় আমার প্রিয় সঙ্গী হয়েছে কাগজের পাতা আর কলমের কালির স্রোত ৷
সভ্যতার মৃগয়া,  বুলেটের ঘায়ে  ক্ষত-বিক্ষত করতে পারেনি ৷
আমি  জয়ী সৈনিকের ছবি এঁকেছি  সারাক্ষণ ,
আমার কল্পনার উজ্জ্বল প্রতিবিম্বে !

Tuesday, March 14, 2017

পুস্তক পর্যালোচনা
পুস্তক- Goআ
লেখক- শৌভিক রায়
প্রকাশক- হাওয়াকল
মূল্য- 80 টাকা
আলোচক- শ্রীনারায়ণ দত্ত (অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক)
শ্রীমান শৌভিক রায়ের লেখা "Goআ" ভ্রমণ পুস্তিকাটি হাতে পেয়ে প্রথমেই যেটা মনে হলো -এ ধরণের ভাবনা অর্থাৎ পুস্তিকাকৃতির ভ্রমণবৃত্তান্ত বেশ অভিনবত্বের দাবী রাখে।কারণ নানা সাপ্তাহিক ,পাক্ষিকও মাসিক পত্রিকায় এধরণের বর্ণনা চোখে পড়লেও ভ্রমণমূলক পুস্তিকা একেবারে নতুন।এ ধরণের পুস্তিকা ভ্রমণ পিপাসু বাঙালিকে যেমন আকর্ষিত করবে তেমনি সংগ্রহ করার পক্ষেও সহজ বটে।পুস্তিকাটির বর্ণনার শুরুই বেশ আকর্ষক।বর্ণনায় লেখকের সাহিত্য রচনার কৌশল,উপলব্ধিবোধ এবংসহজ সাবলীলভাব যেন বেড়িয়ে পড়ার হাতছানি দিচ্ছে।আমার মতো লোকদের দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে সাহায্য করে।ইতিহাস আর স্থাপত্যকীর্তির নানা তথ্য লেখকের গভীর অনুসন্ধিৎসার পরিচায়ক।নৈসর্গিক দৃশ্যের বর্ণনা যেন লেখকের উপভোগ্য মনন এবং শিল্পীসত্তার যুগলবন্দী।Goআ-র পার্বত্য পথের বর্ণনা আমার চাপা পড়া কৈশোরের তীর্থস্থান অনামী 'শিলচরের' বিপদসংকুল ইংরেজ আমলের ৩৭টি টানেল সমৃদ্ধ পার্বত্য পথের স্মৃতি উসকে দিয়েছে।সর্বশেষে সূর্যোদয়ের মণ্ত্রোচ্চারণ এক দারুণ সমাপ্তি যেন কোন এক নতুন আবির্ভাবে অপূর্ব ইঙ্গিত।
।।পুস্তক পর্যালোচনা।।
আলোচক- স্বরূপ গুপ্ত
কাব্যগ্রন্থ- অবরোহণ
কবি- বর্ণালী সেন ভট্টাচার্য্য
তেইশটি কবিতা নিয়ে"বইতরণী ট্রাস্ট" থেকে এই বছরের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে "প্রিয় পঞ্চবিংশতি" সিরিজের "অবরোহণ"। কবি শ্রীমতি বর্ণালী সেন ভট্টাচার্য্য। "অবরোহণ" শব্দটি প্রচ্ছদে যুক্ত হওয়ায় মনে প্রশ্ন জাগে "আরোহণ" বলে কোন পর্ব আছে কি? উত্তর নিশ্চয়ই সময়ে পাওয়া যাবে। তবে প্রশান্ত সরকারের ছিমছাম প্রচ্ছদ এক ঝলকেই বইটিকে ভাল লাগায়।
বাংলা কবিতার বিবর্তনের ইতিহাস যদি অনুসরণ করা যায় তবে আমরা দেখবো কবিতা নিয়ে বহু কথা হয়েছে। কবিতা কি, কবিতা কেন, কবিতা কার জন্য ইত্যাদি নানা কিছু নিয়ে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের আলোচনা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছে। যে কোন লেখারই শ্রেষ্ঠ বিচারক, আমার মতে, কাল বা সময়। সময়ই বলবে আজ যা কবিতা বলছি তা আদৌ কবিতা ছিল কি না। ঠিক এই কথাটি মাথায় রেখেই ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি যে লেখা পাঠকের মনকে নাড়া দেয়, পাঠককে স্পর্শ করে, পাঠকের বোধ ও চেতনাকে জাগিয়ে তোলে, এক অদৃশ্য দর্পণের সামনে পাঠককে দাঁড় করিয়ে নিজের মানস-প্রতিবিম্ব দর্শন করায় তা-ই কবিতা, তা-ই সুলেখা। শ্রীমতি বর্ণালী সেন ভট্টাচার্য্যের কবিতা সেদিক থেকে একশো ভাগ সার্থক। তাঁর কবিতা রচনার সার্থকতা নিয়ে কোন প্রশ্নচিহ্নই তাই আসে না।
বইয়ের উপক্রমণিকায় "অবরোহণ থেমে যাবে একদিন..." দিয়ে যে কথাগুলি কবি বলেছেন তার থেকেই মূর্ত হয়ে ওঠে কবি বর্ণালী সেন ভট্টাচার্য্যের কবিতাগুলি কি হ'তে পারে। এই ভূমিকাটিকেও আমি কবিতা বলেই গণ্য করছি। ভূমিকাটিই বইটির গত বেঁধে দেয় যেন।
কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা "বাবা"। কবি বর্ণালী এখানে উত্তর খোঁজেন আপাতসহজ কিন্তু সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটির- "তবু বাবা ফিরে এলো কই?" উত্তর কি কেউ দিতে পারেন? না পারেন না। মানব জীবন যায় কেবল, ফিরে আসে না। ফেরে নি কেউ আজ অবধি। একটি ব্যক্তিগত অনুভূতিকে এভাবে সামগ্রিকতায় অনায়াসেই পৌঁছে দিয়েছেন কবি তাঁর এই কবিতাটিতে।
কবির সমাজসচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায় "... ইঁটের ভাটায়/ খুন হয়ে যাবে না তো- ধর্ষণের পরে/ একাকী কুমারী কোনও মেয়ে?" (সেদিনও কি), "বিন্দাস আছি আমি গতানুগতিকতায়" (এক নদী ঢেউ), "অমানুষিকতার ক্ষমাহীন লাজ" (ঘুমিও না) ইত্যাদি সাবলীল লাইন বা শব্দবন্ধে। "আদম তুমি এসো" কবিতাটিতে সঙ্গত প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন- "ওরা কারা ইতিহাস লেখে?/ ওরা কারা যাদুঘরে বন্ধ করেছে/ অস্তিত্বের অস্তিত্বহীনতা?" সত্যিই আজ যেন আদমের আবার ফিরে আসার সময় হয়েছে। নাগরিক যন্ত্রণার তরঙ্গাঘাতে আজ যখন ব্যক্তির অস্তিত্বই সংকটের মুখে তখন পুনর্সৃষ্টির কল্পনা কোন বিলাস না। আর আদম তো সবার মধ্যেই বিদ্যমান। আদি থেকেই শুরু হওয়া দরকার আমাদের যাবতীয় সবকিছুই!
"বৃষ্টি সংবাদ", "এক নদী ঢেউ", "তুমি", "দহন যখন" ইত্যাদি কবিতাগুলির লিরিক চরিত্র ভালো লাগে। ভালো লাগে "তখন ষোড়শী", "সেদিনও কি?" কবিতার নস্টালজিয়া। বস্তুতঃ প্রতিটি কবিতাই স্বতন্ত্রতায় আলাদাভাবেই উজ্জ্বল। কিছু মুদ্রণ প্রমাদ ঘটলেও কবিতার গুণে সেগুলিকে অনায়াসেই উপেক্ষা করা যায়।
মুদ্রণ, কাগজ এবং পেপারব্যাকের জন্য কম দাম (চল্লিশ টাকা) বইটির অপর বৈশিষ্ট্য।
সবশেষে, একটি ভাল বই উপহার দেবার জন্য বইতরণীকে ধন্যবাদ ও কবি বর্ণালী সেন ভট্টাচার্য্যকে অভিনন্দন। তাঁর কলমের আরোহণ ও উত্তোরণ কামনা করছি।
।।পুস্তক পর্যালোচনা।।
কাব্যগ্রন্থ- আমার রূপনগরের লাল ওড়না
কবি- সঞ্জয় সোম
প্রকাশক- কর্ণিয়া প্রকাশন
মূল্য- চল্লিশ টাকা
আলোচক- স্বরূপ গুপ্ত
কোচবিহার বইমেলা উপলক্ষে "কর্ণিয়া প্রকাশন" প্রকাশ করেছেন সঞ্জয় সোমের "আমার রূপনগরে লাল ওড়না"।
বহুদিন ধরেই কবিতার জগতে বিচরন কবি সঞ্জয় সোমের। তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। পেপারব্যাক সংস্করণ এই কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে শিরোনামহীন চব্বিশটি কবিতা। তাই ধরে নেওয়া হচ্ছে বইটি কবিতার একটি সিরিজ আর সেই সিরিজের নাম "আমার রূপনগরে লাল ওড়না"। সিরিজের নামই প্রমাণ করে কবির মানস জগতে বিচরণকারী কোন এক নারীর জন্যই কবির নিবেদন এই কবিতাগুলি।
সিরিজের শুরুতেই কবি "কিছু কথা"য় অকপট স্বীকারও করেন তা। কবির নিজের ভাষায় "গৃহস্থ কবির বিরহ, বিদ্রোহ ও বসন্ত পায়" আর তাঁর "বিভাবের" উৎসে থাকে নারীর মুখ যে মুখ দেখে তাঁর প্রেম আসে। এই সহজ কিন্তু অত্যন্ত কঠিন উচ্চারণকে অকপটে স্বীকার করার দুঃসাহস দেখিয়েই কবিতার সিরিজে তাঁর মুনসীয়ানা দেখান, খেলা করেন শব্দের সাথে এবং ছেঁকে আনেন তাঁর মানসজগতে থেকে যাওয়া প্রেমসঞ্জাত শব্দসমূহ এবং কল্পনার মিশেলে প্রেমের এক অদ্ভুত স্বীকারোক্তি। এই সাহস দেখানোটাই কবিকে নতুনভাবে তুলে ধরে পাঠককূলের কাছে।
প্রেমের কবিতা লেখা, ব্যক্তিগত ভাবে, অত্যন্ত কঠিন বলেই মনে করি। কবিতার বিষয় হিসেবে "প্রেম" সবচেয়ে পুরোন বিষয়। প্রেম নিয়ে লেখার সংখ্যাও অনেক। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর হ'ল, এই বিষয়ে লেখেন নি এরকম কবি খুঁজে পাওয়াও যাবে না হয়তো। তাই এই বহুল লিখিত একটি বিষয়কে নিয়ে লেখাটা নিঃসন্দেহে একটা চ্যালেঞ্জের মতোই। কেননা কবিতা এক অর্থে coinage বা শব্দচয়ন। একটু তলিয়ে ভাবলে নিজেরাই বুঝতে পারবো যে বিষয় হিসেবে নতুন কিছু আর লেখার জন্য বাকী নেই। সব বিষয়েই লেখা হয়ে গেছে। বিষয় বলতে অবশ্যই মানবজীবনের চিরন্তন শ্বাশত ব্যাপারগুলিকেই বোঝাতে চাইছি। কেননা মহৎ সৃষ্টি সবসময় শ্বাশত বিষয়কে নিয়েই হয়। তাই প্রেমের মতো একটি অত্যন্ত প্রাচীন একটি বিষয়কে নিয়ে লিখতে গেলে সাবধান থাকতেই হয়। শব্দচয়ন এক্ষেত্রে এমনভাবেই করা দরকার যাতে অনুসরণ বা অনুকরণের তকমা না লেগে যায়। সচেতন পাঠক ধরে ফেলেন সহজেই সেই অনুকৃতি। আবার প্রেম আবেগ সৃষ্ট বলেই অনেক সময়েই কবির অচেতনেই এমন শব্দ ব্যবহার এসে যায় যা পূর্ববর্তী কেউ করে গেছেন। সচেতনভাবে আর যাই হ'ক আবেগ প্রকাশ করা যায় না। সচেতনভাবে লেখা মানেই মস্তিষ্কের প্রয়োগ। তাই বারবার বলছি প্রেম বিষয় হিসেবে অত্যন্ত কঠিন। আবার আধুনিক কবিতায় আবেগের সাথে বৌদ্ধিকতার মেলবন্ধন না ঘটলে পাঠকের কাছে কবিতা কবিতা হয়ে ওঠে না। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে কবি সঞ্জয় সোমের "কাল ছিল চুড়িদার আজ পড়েছিস শাড়ি"( কবিতা সংখ্যা-দুই), "কোমর পর্যন্ত এক বিনুনি দুলিয়ে তুই হাঁটিস/ পাগল হয়ে হাঁটি তোর পেছন পেছন" (কবিতা সংখ্যা- তিন), "তোর মুখ দেখে/ চাঁদ লুটিয়েছে তোর উপর" (কবিতা সংখ্যা- পাঁচ), "তুই শুধু আমাদের জন্য সাজবি/ স্নায়ুতন্ত্রে গেঁথে নেব তোর মুখ" (কবিতা সংখ্যা- নয়), "তোর ডাকনাম দিলাম অন্তঃস্বর" (কবিতা সংখ্যা- আঠারো) ইত্যাদি লাইনগুলি আধুনিকতার সাথে সাথে চিরন্তন বিষয়টিকে অনায়াসে তুলে ধরে।
"প্রত্নপ্রেম", "মুখ গুঁজে থাকি তোর বুকে", "নীল ওড়নার কুমন্ত্র", "ঋতুবাঁক", "গোপন আবির", "শরীর যেমন থাকে", "তোর উষ্ণ উপত্যকা" ইত্যাদি শব্দবন্ধ যথেষ্ট বলিষ্ঠ এবং sensuous এবং কবির মানসিক বলিষ্ঠতার পরিচয় বহন করছে। ভালো লাগে "শাড়ির খোলে সময়ের হাওয়া আঠা হয়ে বসে", "রোহিনী তারা হয়ে ওঠা তোর দুটো চোখ", "প্রণয়পাতায় ফুরিয়ে যায় এক ঋতু", "প্রেম আমাদের শুদ্ধ করে" ইত্যাদি প্রকাশভঙ্গিমা। "বিষ বাতাস লাগছে গায়ে, জল হারিয়েছি গতি", "ভাল কাজ আমাদের বিশেষ নেই", "আমাদের শব্দে রতির গন্ধ যেমন আছে" ইত্যাদি শাণিত প্রকাশে কবি প্রকাশ করেন তাঁর সমাজমনস্কতা। তবে পরের দিকের কবিতাগুলি আমার ধারনায় আগেরগুলির তুলনায় খানিকটা অনুজ্জ্বল। হতে পারে একই বিষয়ে পড়তে পড়তে এবং একই প্রকাশভঙ্গীর পরিচয় নিতে নিতে একটু একঘেয়েমি আসে! তবে এরকম কবিতার সংখ্যা একদমই নগন্য। অন্য কবিতাগুলির তুল্যমূল্য বিচারে অবহেলা করা যায় সহজেই। কিন্তু হঠাৎ করে কিছু কবিতায় শব্দের আকার ছোট হয়ে যাওয়াটা প্রকাশককে লক্ষ্য রাখতে হবে (সাত, এগারো, কুড়ি, বাইশ)। কোন বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই ছোটখাটো বিষয়গুলি। প্রচ্ছদের ক্ষেত্রেও একই কথা বলবো। পুরো পাতা জুড়ে না হ'ক আরও খানিকটা জায়গা ব্যবহার করা যেতে পারতো বলে মনে হচ্ছে। যদিও প্রচ্ছদ ছবিতে অভিনবত্ব আছে খানিকটা। তবে প্রকাশনার জগতে কাজ করতে করতেই অভিজ্ঞতা বাড়ে আর ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুবাদে বলতে পারি এতো কমবয়সে প্রকাশনার গুরু দায়িত্ব তুলে নেওয়াটাও প্রকাশকের সাহসকেই প্রকাশ করছে। বই ছাপলে খরচা হয়। প্রকাশককেই সেটা দিতে হয়। কবে বই বিক্রী হয়ে টাকা উঠবে সেটা ভগবানও জানেন না। বিশেষ ক'রে কবিতার বই। মূল্য মাত্র চল্লিশ টাকা হলেও আমরা বেশীরভাগই বই কিনি না। এটা মাথায় রেখেই প্রকাশনার কাজটা করতে হয়।
সবশেষে, কবি সঞ্জয় সোম লিখে যান আরও। তাঁর লেখায় প্রাণিত হ'ক আগামী প্রজন্ম। তবে আবেদন কেবলমাত্র আত্মরতিতেই যেন আটকে না থাকে তাঁর সৃষ্টি। তিনি নিজেই বলেছেন "ভনিতা ভন্ডামির কোন লেখা লিখি না।" আমরাও তাই চাই। এই কাব্যগ্রন্থের সাহসিকতা তাঁর আগামী লেখাগুলিতে ছড়িয়ে পড়ুক। সমৃদ্ধ হ'ক সাহিত্য।

Monday, March 13, 2017

মেটেলির দিন
শ্যামলী সেনগুপ্ত 

বাঘপুল থেকে ডানদিক ঘুরলেই
মেটেলি-হাট চোখ মটকায়
হাট ঢুকে পড়তো আঙিনায়
ফি-বছর কৃষ্ণচূড়ার অজগরে পা গুটিয়ে
বিগত ও অনাগত-র
ককটেল বানাতো এলানো চুল
এখন অবাক চোখে
ফালাফালা তুলে আনছে
আম-সুপুরির রম্যগান
ছায়াবাড়ি   আর
বুড়ো-মাষ্টারের সারল্য

Saturday, March 11, 2017

আজকের দিনটি প্রশান্ত কুমার ঘোষ আরও একটা দিন পালিত হল।নারী দিবস। বেশ ঘটা করেই বিশ্বব্যপী পালন হল দিনটি।নাচ,গান,বক্তৃতা,মিটিং,ইটিং,ডেটিং আরও অনেক হাল ডিজাইনের ঢেউয়েই পালন হয়ে গেল।কিন্তু প্রশ্ন হল নারী দিবস পালন করলেই কি নারী মর্যাদা পাবে?নাকি প্রতিটি মুহূর্ত সচেতন হতে হবে নারীকে,আমাদের সমাজকে। না হলে এটি একটি প্রতীকী দিন হিসেবেই পালন করা হবে । ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি সুঁঁচ কারখানার নারী শ্রমিকরা দৈনিক শ্রম ১২ ঘন্টা থেকে কমিয়ে ৮ ঘণ্টায় আনা, ন্যায্য মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে সোচ্চার হন।সেই মিছিলে চলে সরকার লেঠেল বাহিনীর দমন-পীড়ন। আন্দোলন করার অপরাধে তাদের অনেককে আটক করা হয়। কারাগারে নির্যাতিত হন অনেক নারী শ্রমিক। তিন বছর পরে ১৮৬০ সালের একই দিনে গঠন করা হয় ‘নারী শ্রমিক ইউনিয়ন’। ১৯০৮ সালে পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের কারখানার প্রায় দেড় হাজার নারী শ্রমিক একই দাবিতে আন্দোলন করেন। অবশেষে আদায় করে নেন দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার অধিকার।১৯১০ সালের এদিনে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে জার্মানির রাজনীতিবিদ এবং জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম স্থপতি ক্লারা জেটকিন ও লুইস জিয়েটস ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয়ঃ ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে লাগল। অতঃপর ১৯৭৫ সালে খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ।আন্তর্জাতিক নারী দিবস যার আদি নাম আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি নারীর সমঅধিকার আদায়, নারীর প্রতি সাধারণ সম্মান ও শ্রদ্ধা উদযাপন,মহিলাদের আর্থিক,রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সমমর্যাদার স্বীকৃতি প্রদানের জন্য। বিভিন্ন দেশে নারীদের প্রতি যে বৈষম্য, নির্যাতন আর অবজ্ঞা-উপেক্ষা চোখে পড়ে তার বিরুদ্ধে গণমানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি ও তাদেরকে প্রতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ করতে এই দিনটি নারী জাগরণের অভয়বাণী বহন করে আনে। তাই এর আবাহন নিয়ত ও আবেদন শাশ্বত। নারীর সমঅধিকার আর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামী পথ পরিক্রমণে আজ বিশ্বের সচেতন নারীরা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আমাদের দেশে একদিকে যেমন সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারীদের গৌরবময় সাফল্য ও অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকতে দেখা যায়, অন্যদিকে তেমনই আবার নারীদের প্রতি বৈষম্য আর নির্যাতন, অবিচার-অত্যাচারের চিত্রও কম চোখে পড়ে না। আমরা শিক্ষা-দীক্ষায়, মেধা-যোগ্যতায়, এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনায়ও নারীদের যে অভাবিত সাফল্যজনক ভূমিকা পালন করতে দেখি, তা এক কথায় বিস্ময়কর। আবার যখন নারী নির্যাতন আর বৈষম্যের কালিমালিপ্ত চেহারাটি ফুটে উঠতে দেখি তখন নারীর এই অগ্রযাত্রা অনেকটাই নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। নারীকে যে সমাজে মানুষরূপে গণ্য করার চেতনা যতবেশি শক্তিশালী, সেই সমাজ তত বেশি সভ্য এবং উন্নত। আমাদের নারী সমাজের সামনে রানী দুর্গাবতী, প্রীতিলতা,সরোজিনী নাইডু,মাতঙ্গিনী হাজরা, মাদার টেরেসা,ইন্দিরা গান্ধি,প্রতিভা পাতিল,বেগম রোকেয়া আঙ্গেলা র্মেকেল,প্রমুখের ন্যায় প্রগতিশীল, আধুনিক, বিদূষী ও সত্সাহসী এক মহীয়সী নারী আদর্শরূপে জ্বলজ্বল করছেন। আমাদের সভ্যতা, কৃষ্টি ও ঐতিহ্য চেতনার সহিত সম্পৃক্ত পথ অতিক্রম করে অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আমাদের নারী সমাজ। কবি নজরুল বলেছেন ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’ এই কথার সারবত্তা আমরা সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে পলে পলে উপলব্ধি করি।নারীর কর্মনিষ্ঠা, সংস্কৃতি চেতনা আর অপত্য স্নেহ-মায়া-মমতা সুধায় জগত্ সংসারে এক অপার্থিব প্রেরণা সঞ্চারিত হয়। মানবজীবনে ও প্রকৃতিতে এই সুধারস সর্বত্রই প্রকটভাবে দৃশ্যমান। আর এই সারসত্যকে হূদয়ঙ্গম করতে কারও কষ্ট হয় না। এখন কর্মজীবনে নারী অনেক অনেক সাফল্যের স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। নারীকে আপন ভাগ্য জয় করবার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখার দিন ফুরিয়ে এসেছে। অবশ্য নারীর উপর হিংসাশ্রয়ী ও পাশবিক নির্যাতন চালাবার মতো পরিস্থিতি যে এখনো সূর্যের মত উজ্জ্বল তা টিভির পর্দায় চোখ রাখলে বা খবরের পাতায় উল্টালেই বুঝা যায়।আজও সমাজের অভ্যন্তরে দগদগে ঘায়ের মতোই নারী নির্যাতন,খুন ইত্যাদি। এই অপশক্তিকে দমন করতে বিদ্রোহী কবি ‘জাগো নারী জাগো বহ্নি শিখা’ বলে তাদেরকে জেগে উঠার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
"বসন্ত এসে গেছে"
--- উদয় সাহা


আমাদের বাড়িতে মাছ দিয়ে যায় রফিকুল ভাই
সেদিন সকালে এসে বলল , "সকাল বেলা ঐ
পাখিটা ভারি মিষ্টি সুরে গায় গো দাদাবাবু ... মনটা উদাস হইয়া যায়!! ! "
আমি বলেছিলাম , "ও যে দূত , বসন্ত এসে গেছে , ভাই "
দুধ দিয়ে যায় যে কাকু
ওনার বাড়ির উঠোনে একটা মস্ত কৃষ্ণচূড়া গাছ
গতকাল আমার মা কে বলতে শুনেছিলাম ,
"দিদি , আপনি কৃষ্ণচূড়া ভালোবাসেন ... লাল কৃষ্ণচূড়া ?
আমার উঠোন জুড়ে এখন লাল ... "
আমি ঘর থেকে বেড়িয়ে বলেছিলাম -
"বসন্ত গো কাকু , ও বসন্তের লাল"
পাতা ঝরা বৃষ্টির দলে দুপুরের ঘূর্ণির ছন্দ
নিঃসঙ্গ নীরবতা সুরেলা হঠাৎ 
কৃষ্ণচূড়ার ত্রাসে নেমে আসে বসন্ত  ...
কিন্তু
আজ বসন্ত এলে আমি জানালার পাশে
দেখি দুর থেকে--
বসন্ত যদি উৎসব হয় , সে উৎসবে তুই কোথায় ?
পলাশের গায়ে যেদিন তোর নাম লিখেছি
সেদিন বিকেলে আমার ঘরে বসন্ত এসেছিল।
আজ বসন্ত এলে , কঙ্কাল বৃক্ষ যখন প্রসারিত হয়
তখনও আমার মন ডুবে থাকে শোকে
হেঁটেছিলাম আমিও এক অজানা পথে-
ভুলতে পারিনি তোকে-
সেদিন হাসিতে আমার বসন্ত এসেছিল।
আজ বসন্ত এলে , পূর্ণিমার রাত
বাতাসের উষ্ণ সোহাগ , পথ ভরা ফুল
কিন্ত গান আসে না
তোর হাতে হাত রেখে যেদিন গেয়েছিলাম
'আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে ... '
সেদিন আমার কবিতাতেও বসন্ত এসেছিল।
এখন ,
চোখ জুড়ে হা-হুতাশ
তুই থাকলে শীতেও বসন্ত
অক্ষর বৃত্তে সঙ্গীত স্রোত
তুই থাকেলেই আসল আনন্দ।
তবু--
শিশুদের খেলা দীর্ঘায়িত , খেলার মাঠ দখল
মঞ্চে বসন্ত , ব্যাকস্টেজে শীতের অলংকার সকল।
তখনও
আমি জানালার পাশে--
এক অনুপ্রবেশকারী , ভীড়ের শরীরে
ছুটোছুটি পথচারী , শব্দদূষণ চারিধারে
'বসন্ত এসে গেছে '...

Thursday, March 2, 2017


প্রমার সাথে দ্বন্দ্ব

রাহুল গঙ্গোপাধ্যায়
--------------------------------------

১ কয়েকটুকরো - মেগাটন্ কবিতা চাইলে অফবিটে তোমার ধারালো খবরের কাগজ। গোপন জাদুটোনা - পিসপিস সাইরেন। জাগলারিতে খেলছে মাদারির খেলা। নিঃসঙ্গ তরলের আবেদন...... দৈহিক খিদে ও ক্ষয়.....সব এলোমেলো। হারিকেনে গলে যায় হাওয়ার ছোবল। ২ গোপন বিউটি-স্পটে ১-আঙ্গুল আলতা ভেজাও। প্রিয় প্রমা - পরিচিতি ঢালো বুকে..... কয়েক আউন্স স্পিরিট। নিকোটিন ঠোঁট : পাচ্ছি না স্বাদের পরমাণু। বাতাবি পার্ফিউম : ফাঁকি মুছছে....... চেনা গাছে ঢলছে - মৌমাছির নিষিদ্ধ ঘুম।

Wednesday, March 1, 2017

সুখ-অসুখ ফিরোজ আখতার

আমরা প্রায়ই বলে থাকি সুখে থাকতে গেলে তোমার উপরে কারা আছে তাদের দেখো না, বরং তোমার নিচে যারা আছে তাদের দেখো ৷ তোমার থেকে সুখে কারা আছে তাদের দেখো না, বরং তোমার থেকে অসুখী কারা তাদের দেখো .... তাহলে তুমি সুখে থাকবে ৷ খুবই ভালো কথা | কিন্তু এর থেকে মানুষের একটি মৌল বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় | আমি নিজেও তার ব্যতিক্রম নই ৷ আমার থেকে সুখী যারা তাদের কথা যদি আমি ভাবি তাহলে আমার মন পর হিংসাতে পূর্ণ হবে... ৷ আমি সুখে থাকতে পারবো না ৷ অর্থাৎ, অন্যের সুখ এখানে আমার অসুখের কারণ হচ্ছে... ৷ অন্যের সুখ আমি সহ্য করতে পারছি না ...
আবার আমি যদি আমার নিচের দিকে তাকাই , তাহলে আমার থেকে অসুখী অনেককে পাবো ৷ সেটা আমার শান্তির কারণ হবে, কারণ আমার থেকেও অসুখে লোকে আছে এটা ভেবে আমি সুখে থাকার চেষ্টা করবো ... ৷ অর্থাৎ, অন্যর অসুখ আমার সুখের কারণ হচ্ছে ৷ অন্যরা আমার থেকে খারাপ আছে ভেবে আমি ভালো থাকার চেষ্টা করছি । অর্থাৎ, কোথায় যেন একটা সুর কেটে যাচ্ছে... তাই না ?
বাঁক
আলামিন ইসলাম

আমার সমুখ হতে চঞ্চল বাড়ি -ঘর সরে যায়,
চঞ্চল আমিও এগিয়ে চলি...
কোনো এক অভিপ্রায়ে,
দ্রুততালে !
আঁকা-বাঁকা পথ আর ধূলি -ধূসর মাঠ আমাকে ডাকে ৷
যেখানে বেঁচে আছে আমার মরে যাওয়া বারোটা বছর৷
অদূরেই চোখে পড়ে নদী বাঁক ,
এঁকে -বেঁকে চলা ভৈরব!
আমাদের জীবনও তবে এমনি ?
এভাবে বক্ররেখায় চলে....
এক বাঁক বুঝি আর এক বাঁকের সাথে মিশে যায়?
এসব জটিল মিশ্রাক্ষর !
কিংবা সাংকেতিক কোনো শিলালিপি ৷
পড়ার শেষেও ভুলের একটা জায়গা থাকে .....
এসব অস্পষ্ট কিংবা ছায়াময়...
গভীর শব্দের  বিশ্লেষীত কোনো এক প্রহসন !
ক্রূর আছে, হাসি আছে আরও আছে নকশীকাঁথা
শিবু

তোমার কাছে গল্প ছিল গাঁদাফুলের মতন
হৃদয়ের ভাষা নিয়ে হাজির হল এ জীবন

ক্রূর ছিল, হাসি ছিল, ছিল মেঘভাঙা কান্না
হেঁটে যাবার রাস্তা ছিল, তবু উপায় ছিল না।
অরণ্য-সপ্তাহ ধরেছিলবৃক্ষরোপণ
হাইফেন দেওয়া তোমার নাভিমূলে
খাদ ছিল,বন ছিল আর ছিল সুপ্তবাসনা।
সিক্ত সম্পর্ক আর রিক্তের মাঝে
তালপাতা হাওয়া আজ গোপনে কথা বলে।

শুকনো ‘ঘা’-এর মতন আজও জেগে আলো-ব্যাথা
ক্রূর আছে, হাসি আছে আর আছে নকশীকাঁথা


কবির ঘর
-উদয় সাহা
কবির ঘরে ঢুকো না--
যেদিন কবির ঘরে ঢুকবে , চার দেওয়ালে চোখ ফুঁটবে
ঘরের মেঝেরা নৃত্যের তালে গা দোলাবে
কবির ঘরে ঢুকো না , তুমি যাদুময় হয়ে যাবে
ঘরভর্তি টুকরো কাগজ
প্রতি কাগজে ঝলসানো মগজ
আসবাবপত্রের কোঠরে কোঠরে ঘুন পোকার গান ;
ছোট্ট একটা শোবার স্থান--
অগোছালো দুটো বালিশ

সাক্ষী কবির অবিন্যস্ত আস্ফালনের শ্বাস
কবির ঘরে ঢুকো না--
টেবিলে প্রেমিকের গল্প কোলাজ তৈরী করেছে
প্রিয় উপন্যাসের পাতায় পাতায় প্রেমের ভাঙাচোরা লাইন সেজেছে
কবিতার খাতায় একটি জীবাশ্মের অবস্থান ;
কবির ঘরে ঢুকো না--
দশক পুরোনো ইতিহাস নরম দুঃখে আল্পনা আঁকে
নিজস্ব জীবনী পেতে পারো অক্ষরের ফাঁকে ফাঁকে। 

Thursday, February 23, 2017

 

গড়
তুষার আহাসান
হাইস্কুলের মাঠে মাইক বাজলেই ছুটে যায় লতাবুনি! কত গান হয়। কত ‘বক্তিমে’ হয়।ঝগড়াঝাঁটিও কম হয় না! খাওয়া-দাওয়া,তা-ও হয় বৈকি।কাগজের ঠোঙায় ‘টিপিন’ বিলি হয়।লতাবুনিও পেয়েছে তা। ভোটের ‘মিটিন’ ।জোটের মিছিল।সব দেখে সে।কাউকে কিছু বলে না।পাঁচবাড়ি চেয়ে খেলে কি ‘টুঁটি-জোর’ করা যায়। তবে হাইস্কুলের মাইকে আজ যারা ‘বক্তিমে’ করছে তারা কেউ চেয়ে খাওয়া লোক নয়।গলার জোর কি গো!মনে হয়,মাইক না হলেই চলতো।ইনাদের ছেলেরাই তো টাউনের ‘ইনজিরি’ স্কুলে পড়ে!’ডেরেস’ কি গো,সব সাহেববাচ্চা!বছরে এক-দুবার আসে,ঝলমল করতে! ‘বক্তিমে’র বাবুদের আজ সবার ধূতি-পানজবি!যেমনটি থাকে পুজোর সময়।ঠাকুর-দেবতা নাই।তবু বেশ পুজো-পুজো ভাব।মনে মনে গড় করে লতাবুনি।কাকে করছে,তা সে নিজেও জানে না! খিচুড়ি-ভোগ খেয়ে পেট আইঢাঁই।এখনও গান বাজছে চারদিকে!এত গান,এত সুর,সবেই কেমন লক্ষীমন্ত ভাব।কেউ তো কোন ‘ইনজিরি’ বললো না!আবার গড় করে লতাবুনি।তবে মনে-মনে!

Monday, February 20, 2017

সারারাত বনবীথি ধরে
শিবু

তুমি যখন আয়না ধরলে আমার সামনে, দেখলাম
অহংকারের বাষ্পে আচ্ছন্ন আমার অবয়ব-
মার্কারির দেওয়াল ভেদ করে সে পালিয়ে গেল
মুখ লুকালো বৈকুণ্ঠপুরের শালবনেবনে ।

ভুল,ভুল, প্রকৃতির সব শিক্ষা ভুল প্রমাণিত করেছে
প্রায়শ্চিত্ত করবে বলে হাজার হাজার মাইল হাঁটে
রেললাইন ধরে- পৌঁছে যায় গজলডোবায়,
দুয়ার খুলে যায় আমারই আমার চক্ষু ভেদ করে।

মনমরা একটা বিকেল মাথায় পেতে পড়ে থাকে যত অবরোধ-
টন টন নুড়ি আর বালি ভরা শরীরে, পাশ ফিরে
শুয়ে থাকা তিস্তার পাট-ভাঙা তাঁতের আঁচলে মুখ ঢাকে

ভারাক্রান্ত সে মুক্তি পেতে হেঁটে বেড়ায় সারারাত বনবীথি ধরে।




:বেঁচে থাক অক্ষরগুলো
রকি মিত্র
   --------------------
অনেককথাই তো বলে ফেলি
'ক' থেকে 'ম' পর্যন্ত বলতে গিয়ে-
মাটি খুঁড়ে বের করে আনি,
হাজার বছরের প্রাচীন শিকড়।
পাহাড়ের বুক চিঁড়ে নদীটাকে নিয়ে এসে
তোমার আঙিনায় বসিয়ে রাখি
কি জানি যদি নদীটা ইশারায় কিছু বুঝিয়ে দেয়,
    এই আশায়!!!!!
একটা আস্ত গোলাপের পাপড়ি ছিঁড়ে,
দেখিয়ে যাই আমার অনাদি বসন্ত।
ঝরঝরে হাত দিয়ে আজকাল প্রেম জমে না
তাই অচিন পাখিটার গায়ে হাত বুলিয়ে,
ওকে বলে উঠি "যা এইবার"।
ডানায় লিখে দেই আমার ঘুমজাগা রাতের কথা।
কিন্তু যদি বৃষ্টি এসে ধুঁয়ে দেয় অক্ষরগুলো,
তাতে পাখিটার কি দোষ বলো?
থাক না নাই বা শুনলে আধমরা তিনটি শব্দ
আমি বরং ওদের দুবেলা জল দিয়ে যাই
ওদের বাঁচিয়ে রাখি,ওরা বেঁচে থাক।
হয়তো একদিন বাতাসের হাতেই ছেড়ে দিব
অপেক্ষার মুক্ত আকাশে ওরাও উঁড়ে বেড়াবে।

Friday, February 17, 2017

শোকরং
 নীপবীথি ভৌমিক

 জলের কথা শুনেছো কি কখনও
 শান্ত জলভেজা দুপুর-পুকুর ঘাটে ?

  এসে বসো পাড়ের কাছে,
    কান পাতো সে রঙে ,
এত, রঙিন আলোর  রঙ সাজাও  কেন আজ !
 বরং জানালা খুলে রাখো ওই পশ্চিমের 
  আসুক শান্ত রঙের বাতাস ;
দেওয়াল  সাজিয়ে নামুক কোনো এক শোক পাখির নিরীহ গান...

   উৎসব কি শুধুই আলোর স্বর রচনা করে ?
  শোক  রঙেও থাকে উৎসব রঙের গভীর ঘুম শয্যা।

   আসলে কি জানো, 
শোক, কোনো স্তব্ধতা নয়,  নিঃশব্দের এক গান
 মুক্ত বৃষ্টির পথে বেজে যায় কেবল বিষাদ রঙিন সেই তান।
#সংজ্ঞা
(উৎসর্গ  :  জীবনানন্দ দাশ)

--উদয় সাহা
পথ ধূলো বন প্রান্তর
বনলতা সুচেতনা পরস্পর
                      হেঁটে চলে যায়
ডোরা কাঁটা স্মৃতি
ভুলে যাওয়া গীতি
                      ঠোঁট ছুঁয়ে যায়।
আজ বিতর্কের আগুণ
চোখজুড়ে পলাশের ফাগুন 
                      সুরভি ছড়ায়
নারী জাগরণের কাহিনী শুধু
ঝাপসা দৃশ্যপটে ফেলে আসা বধূ
                       গল্প শোনায়।
পোশাক- প্রতিবাদে বিদ্রোহ ঘোষণা
মূলধন কেবল নিজস্ব প্রেষণা
                       কলম কথা বলে চলে
কাঁধে কাঁধ স্পষ্ট চোখ
অতিআধুনিকতায় রঙীন অন্তঃলোক
                        যুক্তিতে বরফ গলে।
প্লাস্টিক মোম-তাপ (বিকল্প)
---------------------------------------------
বিকল্প সন্ধানে বেছে নিই - 
বেছে নিই নিরাকার মুখ ও চেটোর ঘাম।।
আসলে বিকৃত আলোয় মুখের চেয়েও মুখোশ।
টোটাল উইন্ডো সিট : সিট বেল্ট ও প্রাক-রতি
ঝাড়াইবাছাইয়ের আগে স্ট্যাটমোডে সম্মোহন।
কিশোরী খুন হয় - নাবালক দেশ ও খবর.....?
বড্ডো ধন্দে আছি : বেশুমার শ্মশান গন্ধে।
বুলেট ইতস্তত : প্লাস্টিক মোম-তাপে ছেঁড়া রাত
কতটা সীমানা ছেঁড়ে?কিশোরীর যোনীজ প্রশ্ন।।
জল দিয়ে নিজের জলবাড়ি বানাই।।

শব্দরূপ : রাহুল

Wednesday, February 15, 2017


"বসন্ত-বাহক"

রীনা সাহা

সত্তর পেরোনো বুড়িটার
বসন্ত নেই, বসন্ত-বিলাপও নেই----
সম্বল বলতে একটা বি.পি.এল কার্ড
আর ঘুণধরা আড়তের
দুটাকা কেজির চাল!
সত্তর পেরোনো বুড়িটারবসন্ত নেই, বসন্ত-বিলাপও নেই----
সম্বল বলতে বহুকালের পুরোনো
একটা কাঁসার থালা,
সকাল-সন্ধ্যে পারশ করে নেওয়া
লাল রঙের ভাত, দুটো আলুসেদ্ধ,
নোনতা স্বাদের একটুখানি রক্ত
পরবশ বসন্ত!

সত্তর পেরোনো বুড়িটার
বসন্ত নেই, বসন্ত-বিলাপও নেই---
সম্বল বলতে বংশের ধারক একটা নাতি,
দিনমান ভিক্ষে শেষে,
নেই রাজ্যের দেশে পাঁচটাকা, দশটাকা,
নাতির জন্য কিনে আনা
একটা বান-পাঁউরুটি বা
মিষ্টি দুখানা।
সত্তর পেরোনো বুড়িটার
বিনি সুতোর বসন্ত
শিমূল তুলোর বল---
সম্বল বলতে,
রাত-বিছানায় নাতিটার সাথে
একটুখানি খুনসুটি,
অনেকখানি জাপটা-জাপটি,হুটোপুটি।

Tuesday, February 14, 2017

অনুভূতিই আনন্দের সাগর 
প্রশান্ত কুমার ঘোষ 

প্রত্যেকের বোধ বিভিন্ন 
আমরা যদি একটি গাছের দিকে তাকাই তাহলে প্রত্যকের পৃথক উপলব্ধি হয় ,
একদিন বৈশাখের পড়ন্ত বিকালে কয়েকজন বন্ধু মিলে প্রকৃতির কোলে বসে আছি।প্রকৃতির বুকে গাছেরা  সৌন্দর্যের হাতছানি দিয়ে চলেছে।একটি সুবৃহৎ আম গাছের পাশে আমরা সকলে গেলাম।আপ্লুত হলাম তার যৌবনের  ইশারায়।আমি রূপের ত্বিষামে হাবুডুবু খেয়ে বললাম,একটা কাব্য লেখা যাক।পাশেই কালু একটা ঢিল কুড়িয়ে বললে রেখে দে তোর কাব্য ,ওর লাল হয়ে পেকে থাকা ফল গুলি আমার রসনেন্দ্রীয়কে বড্ড আকৃষ্ট করছে বলেই ঢিল টি ছুঁড়ে দিল,আম পড়লে শুরু করল তৃপ্তি পেতে।আর এক বন্ধু ঝন্টু বললে সারাদিন গরমের পর এই গাছের ঠান্ডা বাতাসে বসে প্রাণটি জুড়ে গেল ,আমি একটু আরামে বসি।ভোলা বলে এই গাছটা যদি বিক্রি করে তাহলে আমি কিনব,নিজের প্রয়োজনে লাগিয়ে বাকিটা বিক্রি করলে একদিকে কিছু লাভ হবে আবার বাড়ির আসবাবপত্রও হয়ে যাবে।
    আমি বসে বসে ভাবলাম বাস্তবে যা কিছু আছে তার সবই আমাদের অনুভূতির ফসল।এত সুন্দর পৃথিবীরও সুখ আঁকার অধিকার নেই;নিজের অনুভূতিই নিজের সুখ এঁকে দেয়।বাস্তবটা বোধের ফসল।
        তবে আমাদের অনুভূতি আছে বলেই নদীর গতি বুঝি,বাতাসের বহমান বুঝি ,জীবনের প্রবাহ বুঝি ,আকাশের স্নিগ্ধতা বুঝি ,পাহাড়ের সুউচ্চ দৃঢ়তা বুঝি সবই অনুভূতি,অনুভূতিই জীবন;জীবনের সারমর্ম ,জীবনের স্বার্থকতা ।
                আমাদের বোধ শক্তিই বাস্তবকে স্বর্গ বা নরকে পরিণত করে ।গুছিয়ে জীবনটা চালাতে পারলেই সবে সুখ,সুখেই স্বর্গ লাভ ,জীবনের স্বার্থকতা ।
          নেগেটিভ চিন্তা কে মাইনাস করে সকল কিছুতে পজিটিভ মানসিকতা আনলেই আমাদের যত গ্লানি সব মুছে যাবে ,শিশু হয়ে থাকতে হবে মানে কুসংস্কারের জটা জাল ছিন্ন করে সবেই আনন্দের উপাদান খুঁজতে পারলেই আমরা পরম সুখী।প্রকৃতির সকল কিছুতেই নিজের হৃদয় যুক্ত করে তার যথার্থ মর্ম সঠিক ভাবে উপলব্ধি করতে পারলেই আনন্দের সাগরে স্নাত হতে পারবো ।
"বন্ধু"
--উদয় সাহা

পর্ণমোচী পাতা আমার পিঠ ঢেকে আছে
চোখের নীচে অর্ধবৃত্তাকার খাদ
তোর গোলাপ বাগান আজ অনুর্বর
একটা উদ্ধত বাতাসের গন্ধ সমস্ত জুড়ে--
বিষাক্ত সাপের ছোঁবল আজ এক নেশা
অভিজ্ঞতা আমি বুকপকেটে রাখি
আবেগরা এখনও স্বচ্ছ টলমল
বুকের ভেতর একটা দ্বীপ বলেই জানি।
তোমার তপস্যার ফুল আজ ভ্রূণ
কিন্তু সম্ভাবনাময় --আমি বিশ্বাসী
বাঁকা চাঁদ , কালো অবাক রেখা
উত্তুরে বাতাসকে বিদায়ী চিঠি --
আমায় তুমি শ্রাবণ করে নিও।
তুই কি আমার স্বপ্ন হবি? ________________________ ফিরোজ আখতার _________________ তুই কি আমার স্বপ্ন হবি? হোক না তা আকাশ কুসুম... হোক না তা রঙীন ফানুস... তুই কি আমার সুখ হবি? হোক না তা ভ্রান্তি বিলাস... হোক না তা ক্ষনিক হাওয়া... তুই কি আমার নৌকা হবি? হোক না তা পালহীন ডিঙি... হোক না তা ভঙ্গুর তরী... তুই কি আমার সুবাস হবি? হোক না তা তীব্র পুরুষালি... হোক না তা তিক্ত স্বেদময়... তুই কি আমার যৌবন হবি? হোক না তা নষ্ট আবেগময়... হোক না তা বিষন্ন রূপালী... তুই কি আমার গোধূলি হবি? হোক না তা ধুলোয় ধূষরিত... হোক না তা সাঁঝের অন্ধকার... তুই কি আমার দিগন্ত হবি ? হোক না তা অস্পষ্ট রেখাহীন... হোক না তা ধরায় অবনত...
ছুঁয়ে থাকি মন্দিরা ঘোষ তোমাকে ছুঁয়ে থাকার আনন্দে রাত ভোর হয়; সকালবেলা চায়ের কাপে বাষ্পীয় সম্পর্কের লেনদেন চলে। সংসার ছুঁয়ে থাকে পায়ে পায়ে সারাবেলা; ভাবনার টানাপোড়েনে দৃশ্যত গড়ে ওঠে আত্মিক লেনদেন। তীব্র অনাদর ও পথ পাতে অসীমের শূন্যতায়। এস অলৌকিক মেলামেশা শুরু করি অতলান্তিকের গভীরে আরেকবার

Sunday, February 5, 2017

জল ছবি আবীর কান্তি পাল জল ছবি ভেসে চলে ,দু চোখের কোলে ,টুপ টুপ গ'লে ! সেই জলে স্নান করে তুমি চলে গেলে ! আমি এখন ফাঁকা বোতল,,, দড়িতে ঝোলানো প্যান্ট হয়ে দুলি বাতাসে, হাল্কা হয়ে ! জল ঝরা বুক জল ঝরা মুখ ,জল ঝড়া তোমার ওই চিবুক ! চাপকে চলি দু বেলা বুক ,বুকের ভেতর হৃদয় আমার বানভাসি ! বাংলার মুখ ,স্বতন্ত্র প্রহরী ,তবুও প্রবেশ করে চলছে লাখে লাখে আগুন্তক ! ছোট্ট ছোট্ট আগুন লেগেছে দেশলাই কাঠির মুখ ,ভয়ংকর হয়ে ফিরে যাবে একদিন ,পোড়াবে জল ছবির মুখ ! তিলে তিলে অচেনা শহর অচেনা গ্রাম তবুও হেটে চলি সবাই অবিরাম , একটি আয়না দেখায় না পরিচিতের মুখ ,সকলেই যেনো খেলা করে অব্যাক্ত ভাষায় ,অথচ কি ভয়ংকর ওদের মুখ ! প্রতিবাদ চুপ ,জলে ভেসে চলে সকলের জল ছবি ,একে একে একই রূপ !
              ক্ষুধার পদোন্নতি
                   শিবু

আগুনের উল্লাসে লুকিয়ে থাকা উত্তাপ বেরিয়ে আসে
অর্ধদগ্ধ দেহ-যন্ত্রনা মুক্তি খোঁজে অব্যক্ত আওয়াজে
ফেটে পড়ে চারিদিকে
ছাই হতে বাঁধা নেই শুধু উড়ে যেতে মানা বাতাস কণার সাথে।
প্রগতির প্রলেপ মেখে এখনও আদিম রসাস্বাদ রক্তিম জিভে লেগে আছে
আর ম্যারিনেট করা চিকেনের তন্দুরিকরনের মধ্য দিয়ে আমাদের
ক্ষুধার পদমর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে শুধু

মনের উল্লাসে গোপন খেলারা বেরিয়ে আসে

কেউ কাঁদে কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অট্টহাসে ।

Friday, February 3, 2017



শালুক সময় রাহুল গঙ্গোপাধ্যায়

ব্যস্ততা বাড়াচ্ছ।এটাই জীবন ও চাকার মিল। শিশির।ঋতু।বৃষ্টি।জল।জলের চাপ। কারুর কোনো ব্যস্ততা নেই।হচ্ছে না প্রাক-রতি। বিশেষজ্ঞ বলেন - গর্ভনিরোধক পিলের কুসুম। ফুল বলে - পাপড়ি হারিয়ে বড্ড ক্লান্ত প্রিয়। আমাদেরও কোনো ব্যস্ততা নেই।আজ অমাবস্যা। লাল শালুকে সর্বনাশ বাড়ে।।

বুনোহাঁসের ডানা 

শ্যামলী সেনগুপ্ত

বুনো হাঁসের ডানায় ভর করে 'সে'আসে।কর্কশ রুক্ষ কন্ঠে হাঁক পাড়ে-'সময় হয়েগেছে।চলো,চলো।আর একমুহূর্ত দেরি নয়।তোমার কাল ফুরিয়েছে-এবার কালযাত্রা।'প্রাণটি ছটফটকরে,বেরোতেচায়,সাড়া দিতেচায় বুনো হাঁসের ডাকে।আধার হাত জোড়করে-'যাস নি,দোহাই তোর,এখনি যাসনে।ঐ যে তোর আপনজন,তোর ভালবাসার মানুষজন---ওদের চোখে  জল,মুখ বিষণ্ণ,বুকে হাহাকার।বুক চাপড়ে বুনোহাঁস কে ফিরেযেতে বলছে।'
            সম্ভবত,হৃদয় বিদারক হাহাকারকে সামান্য মর্যাদা দিয়ে বুনোহাঁস নিজের ডানা খুলে সরিয়ে রাখে একপাশে,কিছুটা বিরতি---যেতে তো হবেই।
           'জন্মিলে মরিতে হবে
            অমর কে কোথা কবে'
        মধুকবি না বললেও এই সারসত্য সকলে জানতো।তাঁর জন্মের আগেও জানতো।তিনি শুধু আমাদের চেতনাকে জাগিয়ে দিয়েছেন।কিন্তু সেই জানা আর এই জানার মধ্যে অনেক বিষাদ,অনেক চোখেরজল,অনেক আশার বিনাশ।
               তবু কেউকেউ মৃত্যুকে বড় ভালোবাসে।মৃত্যু যেন শ্যামময়   অথবা শ্রীরাধার হাতছানি।পথজুড়ে দাঁড়ানো কালো জটিলতার মুখোমুখি হতে ভয়পায়,আর ভালোবেসে গলায় পরেনেয় ফাঁস,ঠিক যেভাবে কবরীতে জড়ানো থাকে যুঁইএর মালা।মৃত্যুর কাছে সমর্পণ করে নিজেকে।মরেবাঁচতে চায়।
                 আর,যে সত্যিই বাঁচতে চায়,অথচ তিলে তিলে মৃত্যুদূত তাকে নিয়েচলে যমের দুয়ারে!বছর বছর বোনটি তাকে ফোঁটা পরিয়েছে ভ্রাতৃদ্বিতীয়ায়।ফোঁটা দিতে দিতে বিড়বিড় করে আউড়েছে '---যম দুয়ারে দিলাম কাঁটা--'তবু কি ছাড় পেলো যমযাতনা থেকে!সারা শরীরে হেঁটেবেড়াচ্ছে এক অশান্ত বিছে-লেজ উঁচিয়ে দাপটে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর প্রতি মুহূর্তে হুলটি গেঁথে দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছে।কর্কট আক্রান্ত মানুষটি নার্সিংহোমের বিছানায় শুয়ে একইসঙ্গে আত্মীয়জন ও মৃত্যুর অপেক্ষায়---বারেবারে দরজায় চোখ যায়-এই বুঝি এলো!এলো কি কেউ!এক এক করে চেঁছেফেলা হচ্ছে বাড়তি কোষ,ছেঁটে ফেলাহচ্ছে  আক্রান্ত প্রত্যঙ্গ--সাদা অ্যাপ্রনের প্রশান্ত মুখের আড়ালে শমনের বিকট ছায়া।মুখব্যাদানকরা সেই ভয়ংকর রূপ কল্পনা করতে
করতে মনেপড়েযায় প্রিয়,প্রিয়তম মানুষের কথা,বাবা-মা  ভাইবোন  আত্মীয়-বন্ধু  জীবনসঙ্গিনীর চিন্তাভারাক্রান্ত মুখের সাদা-কালো ছবি।কোথাও বুনোহাঁস ডেকেওঠে--তবে কি শীত এসেগেলো!ঝরেযাবে সব পাতা!প্রায় ঠুঁটোগাছটির মাথার ওপর দিয়ে পরিযায়ী হাঁসের কর্কশ ডাক আকাশ চিরে ভেসেআসে,বেডের পাশের জানলার দুধসাদা পর্দা সরিয়ে যেন ঢুকেই পড়বে 'সে'।ক্রমশ এগিয়ে আসে শেষদিন,ততোই পা গেঁথেযায় সংসারের আনাচেকানাচে---প্রিয় খাট,নরম কম্বল,আলো ঝলমলে ব্যালকনি,মেলা থেকে কেনা হলুদ গোলাপ আর ফুলেফুলে ছেয়েথাকা মোতিয়া-বেলীর গাছদুটি পিছু টানে।ক্রমশ ফুরোতে থাকে একটা জীবনের গল্প।

                                                   [২]
                পেরিয়েগেল আরেকটি জন্মদিন।একইসঙ্গে বিজয়া ও জন্মদিনের প্রণাম জানাতেই আমার সেজমামীমা বলে উঠলেন--'আয়ুষ্মতী হও।'আমি মাথা ওঠাই।কী ভাবে!একেকটি জন্মদিন তো আমাদের জীবন রেখাটিকে একবছর ছোট করেদেয়!এগিয়েচলি মৃত্যুর দিকে।তবে এই আশীর্বাদের কী মানে?আসলে জন্মেই তো মৃত্যুর দিকে এগোতেথাকি প্রতি পলে-অনুপলে।পায়েস,কেক,পাঁচভাজা,পোলাউ,মাছ-মাংস  এসব তো ছেলেভোলানো ছড়ার মতো।হাঁউমাউ করে যেন ব্যঙ্গ করে--'খায়্যা লও  খায়্যা লও,দু'দিন বৈ তো নয়!'
                 মৃত্যু নিয়ে এই ভাবনা বেশ বিলাসী।পোলাউ খেতে খেতে ভাবছি,মৃত্যুর দিকে একধাপ এগোলাম।সুস্থ শরীরে আত্মীয়জন পরিবৃত হয়ে এসব ভাবনা ভাবতে বেশ ভালোই লাগে!

                                                   [৩]
                  ভালোবাসার চরম উৎকর্ষে পৌঁছে দয়িতা বলেওঠে'আমাকে মেরেফেলো'---সে ও মরতে চায়।এ বড়ো সুখের মরণ!বুনোহাঁসের ডানায় ভর করেআসে ঐ উদ্দাম মরণ।চরম উৎকর্ষে পৌঁছেদেওয়া সেই মৃত্যুই বুনেদেয় একটি জীবনের বীজ-একটি জন্মের প্রস্তুতি।

                                                    [৪]
                 অসুখ থেকে সুখ---সব মৃত্যুতেই বুনো হাঁসের পৌরুষ প্রকট হয়।তার ডানা ঝাপটানোর শব্দে শেষবারের মতো খুলেযায় চোখের পাতা।উদ্ভাসিত হয় কনীনিকা,কিন্তু কেমন যেন উদাসীন,নিষ্প্রাণ,ঘোলাটে,প্রত্নপ্রাচীন সেই দৃষ্টি।
                  মৃত্যুর দিকে এক পা এগিয়ে ,আশীর্বাদের হাতদুটি মাথায় ছুঁইয়ে জন্মদিনে পাওয়া উপহারের মোড়ক খুলতে থাকি একটি একটি করে  আর আনন্দের সঙ্গে বিষাদও বাসা বুনতেথাকে শরীর ও মনে।আমি কান খাড়া করি-পরিযায়ী বুনো হাঁসের ডানার শব্দ শুনতে-----
                             ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

Thursday, February 2, 2017

দ্বিতীয় আমি শুভ্র ঘুমনোর চেষ্টা করছি। কিন্তু পারছি না। অবচেতন মন থেকে খুব স্ট্রং একটা সিগনাল আসছে। আজ দুপুরে ঘুমানো যাবে না। বড়সড় একটা ক্ষতি হতে পারে। কি ক্ষতি ক্যানো ক্ষতি জানি না। জানলা গলে রোদ আসছে। পায়ে রোদ্দুর। শীতের শেষ বিকেলে বেশ ভালো লাগছে উষ্ণতাটুকু। ঘুম আসছে। যেকোন মুহূর্তে গভীর ঘুমে ডুবে যেতে পারি যদিও আমি চিন্তিত। কিন্তু ক্যানো! যখন ঘুম ভাঙলো ততোক্ষণে সন্ধে হয়ে গ্যাছে। ঘরে অন্ধকার। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমি দুপুরের ঘটনা মনে করার চেষ্টা করছি। গত বুধবার নেত্রকোনা থেকে একটা কাজের মেয়ে নিয়ে আসেন বাড়িওয়ালা। আমার প্রতি ভদ্রলোকের অনেক প্রেম। ব্যাপারটা আমার ভালো লাগে। তার দুটি কন্যাসন্তান আছে। আচ্ছা মেয়েটার কথায় আসা যাক। মেয়েটির নাম কী! মনে পড়ছে না। প্রয়োজনও নেই। রান্নাঘরে ঢুকেই দেখি মেয়েটি কাঁদছে। কান্নার তোড়ে একেকবার শরীর ফুলে ফুলে উঠছে। আমি ডাক দিলাম নেত্রবতী। মনে পড়লো নেত্রকোনা থেকে আসার কারণে ওর নাম রেখেছিলাম নেত্রবতী। তুমি কাঁদছো ক্যানো? মেয়েটি আমায় দেখে কোণার দিকটায় সেঁধিয়ে গ্যালো। অস্পষ্ট ভাবে শুনতে পেলাম, খুব ব্যথা। আমি আর এগোলাম না। চলে এলাম। সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। 'এক কাপ চা দাও' - চেঁচিয়ে বোললাম। মেয়েটির চিন্তা আবার মাথার মধ্যে আসলো। যদিও ডাক্তার বেশি চিন্তাভাবনা করতে নিষেধ কোরেছেন। তাদের মতে আমি নাকি পাগল হয়ে যাচ্ছি। যদিও তারা তা বলেননি। বলেছেন ডুয়েল পার্সোনালিটি। আমার মধ্যে দ্বিতীয় আমি। যা হোক, মেয়েটির সাথে আমি কী করেছি! তার নাম কী! 'এই নেন চা', একটা সরু হাত বেশ কিছু দাগ। লালচে রক্ত জমে আছে। মেয়েটির দিক তাকাতেই ভয় পেয়ে গেলাম। মুখ অসম্ভব ফুলে আছে। চোখের নিচে কালচে হয়ে আছে। মেয়েটি সহজভাবে বললো চাচা, আমি বাড়ি যাবো। বেশ অনেকগুলোবছর পার হয়ে গ্যাছে। নেত্রবতী না কিজানি নাম মেয়েটির। ভুলে গ্যাছি। আজ আবার বাড়িওয়ালা ভদ্রলোক একটা মেয়ে নিয়ে এসেছেন। যদিও খুবি কম বয়স। তবুও আমার খুব খুশী খুশী লাগছে। আজকাল আনন্দটা লুকিয়ে রাখতে পারি না। বাড়িওয়াল হাত কচলে বললো মিয়াভাই, গতবারের টাকাটা দেওয়া হয় নাই। আমি হো হো করে হেসে উঠি। বয়স হয়ে গ্যাছে বুঝলেন। আচ্ছা মেয়েটি কোথাকার? নেত্রকোনা। মেয়েটি উত্তর দেয়। খুব চেনা গলা।