Sunday, February 1, 2026


 

ভৌতিক গল্প 


অলৌকিক 

শুভেন্দু নন্দী 


ক্লান্তিতে অবসন্ন দেহ ও মন। প্রচন্ড ক্ষুধায় কাতর ঐ পরিশ্রান্ত পথিক। সন্ধ্যা নেমেছে। চারিদিক ঘোর কালো ও ঘুপসী আঁধার। অমাবস্যার রাত। কে যেন এদিকেই আসছে ক্ষিপ্র গতিতে। চোখ দুটোও জ্বলছে অন্ধকারে।  যেন শিয়ালের ধূর্ত চোখ এদিক-ওদিক কিছু খুঁজছে। কিছুদূরে একটা জীর্ন,দীর্ন চালাঘর। ঘরের দেওয়াল মাটির। চারিদিক খোলা। ঐ আগন্তুক দাওয়ায় উঠে দরজায় মৃদু টোকা দিতে থাকে। প্রথমটা কোনও সাড়াশব্দ মেলেনা।
- কেউ কী আছেন? পথিক ক্ষীণ স্বরে বলতে থাকে।
কিন্ত কোনও উত্তর মেলেনা।
তারপর হঠাৎ ক্যাঁচ করে একটা আওয়াজ হোলো আর দরজাও খুলে গেলো।
- কে তুমি? একটা নারীকন্ঠের আওয়াজ। 
- এই ঘরে তুমি থাকো? একটু জল খাওয়াতে পারো?
' জল? ঐ যে পুকুর দেখছো- ওখানে যাও- এই নাও
ঘটি।
- ওতো কচুরপানায় ভর্তি-  এঁদো পুকুর!....
- দাঁড়াও । আমি আসছি -
পথিক দেখলো সামনে নারী মূর্তি, সারা দেহ সাদা
কাপড়ে ঢাকা।
-তুমি কে? অন্ধকারে তো মুখ দেখা যাচ্ছেনা। ঘরে প্রদীপ জ্বালাও নি কেন?
- তেল নেই। আমি... কিছুক্ষণ থেমে বললো- অমি রমলা।
- কি হোলো? চিনতে পারলেনা আমাকে? এসো, আমার সঙ্গে।  ঘটিটা আমায় দাও।জল পান করার
পরে পরেই হঠাৎ বাতাসের হাওয়ায় আবরন উন্মোচিত ও 
নারীর রক্তশূণ্য ফ্যাকাসে মুখ আর মাংসহীন কঙ্কাল শরীর দেখে পথিকের মেরুদন্ড দিয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে নামলো। আতঙ্কে মুর্ছা গেলো। অনেকক্ষণ নীচে পড়ে থাকলো। জ্ঞান হতে দেখলো জনা দুই মানুষ তাকে ঘিরে রয়েছে।
- আমি কোথায় ? পথিক ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলো।
ঐ দুজন সমস্বরে বলে উঠলো-" তুমি শ্মশানে পড়েছিলে। আমরা দেহ সৎকার করতে এসেছিলাম এই শ্মশানঘাটে - কিন্তু তুমি আসলে কি করে এখানে?
- আমি অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে একটা ভাঙ্গা চালাঘরের কাছে এসেছিলাম। ওখানে ' রমলা' বলে একজন স্ত্রীলোকের দেখা পেয়েছিলাম। ও আমাকে পুকুর পাড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো।
- পুকুর কোথায় ? ওটাতো একটা শীর্ণকায় নদী- শ্মশানঘাট! আরে! রমলাকে তো আমরাই দাহ করে ফিরছিলাম। আমরা এই দুজন ছাড়া সবাই চলে গ্যাছে। তোমাকে দেখেই তো দাঁড়িয়ে পড়লাম। তা, তুমি কী রমলাকে চিনতে? একজন প্রশ্ন করলো।
- বিলক্ষণ। কিন্তু তোমাদের কথামতো সে তো আর নেই! এ কি করে সম্ভব?  
কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো ঐ আগন্তুক, 
- তাকে তো আমি অন্ধকারে ভয়ংকর অবস্থায় দেখেছি। ভাবতেই পারছিনা
- তুমি কী তাকে আগে থাকতেই চিনতে? তার সাথে কিভাবে তোমার পরিচয় হয়েছিলো ? এই নাও, জল খাও"
জল পান করে পথিক বলতে শুরু করলো।
- সে এক বিরাট কাহিনী। বাবা-মায়ের একমাত্র কন্যা রমলা। ওই গ্রামেই আমি থাকতাম। ওর বাবা দূরারোগ্য ব্যধিতে মারা যান। ওঁর জীবদ্দশায় আমিই তাঁর দেখাশোনা করতাম। সংসারের কাজ সামলাতো মা আর মেয়ে। ফলে রমলার সাথে একটা ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওর বাবা ইতিমধ্যে মারা যান। একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে ওর বাবা কাজ করতেন। বেশ কিছু টাকা কোম্পানী ওদের পরিবারকে সাহায্য করেছিলো, সবটাই আমার উদ্যোগে। যাই হোক, আজ রাজনগর স্টেশন থেকে ফিরতে দেরী হয়ে গেলো। ট্রেনে ট্রেনে ফেরি করি। ট্রেনেই কখন যে আমার পিকপকেট হয়ে গেলো বুঝতে পারিনি। একেবারে কপর্দকশূণ্য হয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়। খিদের জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠি। কোন্ এক অদৃশ্য শক্তি যেন আমাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। আমার বাড়ির কোনও ট্রেস পাচ্ছিলাম না। পাড়াগাঁ থেকে উঠে এসেছিলাম এই আধা-শহর রাজনগরে নতুন বাড়িতে । বাবার ব্যবসায়ে উন্নতির জন্যই তো এখানে আমাদের আগমন। যা বলছিলাম। অদ্ভূত ভাবে একটা চালাঘরের কাছে এসে পড়লাম। পিপাসা পেয়েছিলো প্রচন্ড।  তারপরেই তো সাদা কাপড় পরা একজনের সঙ্গে দেখা, তবে অবগুন্ঠনে ঢাকা। জল চাইতেই তার গলা শুনে ঠাহর হোলো সে একজন নারী। আমাকে চিনতে পেরে বলে উঠলো " আমি তোমার রমলা।" এটুকু ঠিকই ছিলো।  তার দেওয়া ঘটিটা তার কথামতন তাকে দিতেই হাওয়া়য় উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া তার শরীরের সাদা আবরন আর রক্তশূণ্য মাংসহীন কঙ্কাল শরীর দেখেই আমার জ্ঞান হারানো। 

বলে পথিক থামলো। একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলো-
ওর বাবা মারা যাবার পর নিত্য আমার যাওয়া-আসা চলতে লাগলো। আর তার সাথে সাধ্যমত আর্থিক সাহায্য। কিন্তু ওর মা আমাদের এই সম্পর্ককে একদম মেনে নিতে পারেননি। তাই আমিও ও বাড়ি যাওয়া-আসা একসময় ছেড়েও দিলাম। কিন্তু রমলা আমাকে ভালোবাসতো।
- শোনো এবার আমরা তাহলে বাকিটুকু বলি  কেমন। গ্রামের একজন বয়স্ক লোকের সাথে ওর মা বিয়ে ঠিক করেছিলো। টাকা-পয়সাওয়ালা লোক। দেখতে কুৎসিত আর গায়ের রং কালো- সবটাই আমাদের শোনা কথা। এই নিয়ে মা-মেয়ের সাথে প্রচন্ড অশান্তি,ঝগড়াঝাঁটি। তখন মেয়ের বিষপানে আত্মহত্যা। 
- কখন ঘটেছিলো ব্যাপারটা?- আগন্তুকের প্রশ্ন। 
একজন বলে ওঠে, "এই তো আজ ভোরবেলা। আমরাই তো থানায় গিয়ে সব ফর্মালিটি সেরে তার দেহের দাহকার্য সম্পন্ন করে ফিরছি। "
- তা বাবা, তুমিই কী রামদয়াল শর্মা? তোমার নাম ঐ বাড়িতে অহরহ শোনা যেতো। তাই অনুমান করেই বলছি"
- আজ্ঞে হ্যাঁ। আমিই সেই হতভাগ্য রামদয়াল
-তাহলে তার অতৃপ্ত আত্মাই মরণের পরে তোমাকে ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ জল খাওয়াতে নিয়ে গেছিলো।পরিত্যক্ত ভাঙা বাড়ির সন্ধান হয়তো আগেই পেয়েছিলো, একেবারে শ্মশানের নিকটে। হায়রে! কী মর্মান্তিক ঘটনা- একেবারে অলৌকিক।  এখন রাত দশটা। ঐ দোকানটায় বসে চা- বিস্কুট খাওয়া যাক। তারপর না হয় বাড়ি যাবে। সারাদিন তোমার তো খাওয়া হয়নি বাবা।"
- ঠিক আছে। এখানে সারা রাতই দোকান খোলা থাকে, তাই না?
- হ্যাঁ। টোটো রিক্সাও পাবে তুমি। তবে চার্জ একটু
বেশী। এই যা। এই নাও পঞ্চাশটা টাকা। আমি রমলার মামা।"
এর পরে রামদয়াল তাঁকে প্রণাম করলো। তারপর ধীর পায়ে অগ্রসর হোলো।


 

ভয় পাবেনা কেউ

মনোরঞ্জন ঘোষাল


জানালার ধারে আনমনে বসে লিখছি। হটাত কানে ভেসে এল পাতার খসখস শব্দ! কেউ যেন হেঁটে 

চলেছে। ঠিক জানালার পাশ দিয়ে!

জানালা বন্ধ। তাড়াতাড়ি তা খুলে একবার উঁকি মেরে দেখলুম, কেউ কোথাও নেই।

তাজ্জব ব‍্যাপার! দিনের বেলায় এমন ভূতুড়ে কাণ্ড।

ভয় লাগছে না, জাগছে বিস্ময়!

আজকেই পাড়ার একজন মারা গেছে। মাঝে মধ্যে সে এই পথেই বাগানের দিকে যেত। তবে কি……!

ধ্যেত ! কি সব আজে বাজে ভাবছি। ও সব আবার কিছু হয় নাকি?

তা হলে এটা কি? ……

বিজ্ঞান  অপবিজ্ঞান কেমন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। বাস্তব আর অবাস্তব আলাদা করতে পারছি না। দর্শন ইন্দ্রিয় গ্রাহ্যতা কার উপরে আঙুল তুলে প্রশ্ন করব? মনের মধ্যে এমন নানান সতেরো প্রশ্ন এসে হাজির হচ্ছে। কিছুতেই তাদের সমাধান করতে পারছি না।

অনেকটা সময় আমাকে ওই ঘটনা বিচলিত করে রাখল। তার পর আমি ও সব ভুলে আবার নিজের কাজে মনোযোগ দেব ঠিক করেছি।

কানে ভেসে এল ফিসফিসানি আওয়াজ! ভাঙা ভাঙা গলায় কে যেন বলছে-

কি…রে কা…কা লে…খা প…ড়া ক…র…ছি…স?

শব্দ গুলো যেন কোন গভীর গহ্বর থেকে হালকা ঢাকনা খুলে বেরিয়ে এল। যেন বহু কষ্টে সে বেরিয়ে আসছে অন্দর থেকে।

শুনে আমি তো পাথর। হাত পা যেন নড়তে চাইছে না। ভয়ে অস্ফুত স্বরে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা শব্দ- ভূত। ভূত। ভূত।

আমার মনে হল আমি, চিৎকার করে বলছি, কিন্তু কানে কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।

মুখের উপরে কে যেন অদৃশ্য হাত দিয়ে চেপে ধরেছে। শব্দ বের হতে দিচ্ছে না। আমিও প্রাণপণে শব্দ বের করার চেষ্টা করছি। যেন কি অসম্ভব শক্তি , আমি কিছুতেই তার সঙ্গে পেরে উঠতে পারছি না।

দু জনের কি বিশাল ধস্তাধস্তি। তার পরের কিছু আর মনে নেই।

বলল, নাকি লেখার বিছানায় পড়ে গোঁ গোঁ করছিলাম। সবাই ধরে ঘরে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল। ঘণ্টা খানেক পর নাকে গোটা হলুদ পোড়া শোঁকাতে তবে চাঙ্গা হয়ে উঠি।



 

ভ্রমণ 


চরৈবেতি (পর্ব উটি)

রণিতা দত্ত 


উত্তরবঙ্গে থাকি। এমন অভ্যেস নষ্ট করে রেখেছি যে, একটু গরমে হাঁসফাঁস। ঝটপট চলে যাওয়া দার্জিলিং বা কালিংপং বা তৎসংলগ্ন পাহাড়ে। তরতর করে উঠেপড়া স্বস্তি পেতে। একটা উইকএন্ড। ঠান্ডা হওয়া খানিক। আবার এসে কাজে ঝাঁপ। অদম্য এক ইচ্ছে,ভারতের দক্ষিণের পাহাড় দেখার। ইচ্ছেটা মনে মনে পুষে রাখি। বায়না করি পশ্চিমের ঘাটমালা নীলগিরি, আন্নামালাই ঘোরার । আমার সঙ্গীটি বোঝেন না। বলেন, " পাহাড় তো পাহাড়ই! ওর আবার উত্তর দক্ষিণ কি আছে..!" 






আসলে নিজের বিষয় বলে জানি, প্রাচীনতম শিলার কি আদি অকৃত্রিম গঠন,নিরক্ষীয় উষ্ণমন্ডলের স্বাভাবিক উদ্ভিদের ঘন সবুজ বিস্তার, ভিন্ন ধরণের ফল ফলাদির ফলন, মানুষের জীবনযাপনের রস রূপ রঙ সবেতেই কি ভীষণ বণ্য সুগন্ধি। বিচিত্র বৈচিত্র যে আনাচে কানাচে রয়েছে। ওখানে না গেলে ভারি লোকসান হয়ে থাকতো। সত্যি বলতে কি ঘোরা বেড়ানোটা একটা নেশা। ইস্কুলে হলিডে লিস্ট পেয়ে পোগ্রাম করে রেখেছিলাম। হঠাৎ করে দাবদাহ কোথাও একটা বাড়লো। আমার শহরে তখনও হালকা কিছু গায়ে দিতে হয় ভোরের আয়েসী ঘুমে। শিক্ষাবর্ষে নির্দিষ্ট নির্ঘন্টকে নস্যাৎ করে গ্রীষ্মবকাশ ঘোষিত হল। অতয়েব টিকিট কেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়া হলো।

ভোর ভোর বাড়ি ছাড়লাম। বাগডোগরা থেকে। ৭:৪৫ মি এ ফ্লাইট। পৌঁছে গেলাম বেলা ১১:২৫ এ। কেম্পেগৌড়া আন্তৰ্জাতিক বিমানবন্দরে।গাড়ি ঠিক করা ছিল। প্রযুক্তিনগরীকে অতিক্রম করে ছুটে চলল আমাদের "মেক মাই ট্রিপ "সংস্থা থেকে বুক করা চারচাকাটি | মাইসর এক্সপ্রেস হাইওয়ে ধরে চললাম। পথে ইডলি মেদুবড়া খেয়ে জঠরের যজ্ঞাহুতি হলো।আমাদের ক্যাব ড্রাইভার মুরলী এগেলেপ্পা। দক্ষ গাইড, অনর্গল কথা বলতে আলাদা চার্জ করে না।তাই এট্টুও যান্ত্রিক লাগছে না যাত্রা। যেতে হবে কম করে সাত ঘন্টা মত। কিছুটা এগিয়েছি ও আমাদের দেখতে বলল জানলার বাইরে। দেখি পাথুরে ঢালে বড় বড় প্রস্তরচাই ব্যালেন্স করে দাঁড়িয়ে। এগেলেপ্পা বলল, "সাব এয়ে শোলে সিনেমার গব্বরের ডেরা হ্যায় 'রামগড়'হ্যায়।" ভারি ভাল্লাগলো। রোমাঞ্চিত। মনে হচ্ছে এক্ষুনি ভারি গলায় গব্বর সিং বলবে,, "আরে ও.. হঃ শ্যামহা কিতনে আদমি থে...." বলেও ফেললাম সেই ডায়লগ।





একটু এগিয়ে ডানদিকে গেলে সিল্ক সিটি রামাশা। এরপর গাড়ি ঢুকলো বান্দিপুর রিজার্ভ ফরেস্টে। ঢেউ খেলানো টোপগ্রাফির ওপর দিয়ে গাড়িটা ক্রমশ উঠছে, গাছপালার প্রকৃতি বদলে গেছে। কর্নাটকের এই অভয়ারণ্যে বাধ্য ছেলের দলের মত সম্ভর আর চিতল হরিণ দলবেঁধে আমাদের অভ্যার্থনায়। ওদের করুনদিঘল মায়াবী চাউনিতে অদ্ভুত ভালো লাগা। নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ হাতি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ি অবলোকন করে যাচ্ছে।খানিকটা দূরে পাঁচ সাতটি হাতি দলধরে খাওয়ারের খোঁজে। ঝোপে গাছের নাতিউচ্চ ডালে ময়ূর লেজ নামিয়ে বসে। শুনলুম প্রায় দুশোটির মত বাঘ রয়েছে এই জঙ্গলে। ঘন হচ্ছে বনজঙ্গল, সরু হয়ে আসছে রাস্তাঘাট। দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে । আলোছায়ায় মাখামাখি বনানী। ততক্ষনে আমরা বান্দিপুর ছেড়ে তামিলনাড়ুর মধুমালাই জঙ্গলে প্রবেশ করে ফেলেছি। দিনের আলোটুকু নিভে গেছে। ছায়া ঘেরা বিক্ষিপ্ত পশ্চিমঘাটের বিচ্ছিন্ন অংশ একদিকে আর সামনে প্রাগৈতিহাসিক কোন প্রাণীর মতো আধশোয়া অলস নীলগিরি। তারই পিঠবেয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে উঠেছে সরীসৃপের মতো পাকদণ্ডী পথ। এক্কেবারে প্রান্তে কিছু লোকালয়। গ্রাম বুরলিয়রে।এখানে একটু বিরতি।এতক্ষন জঙ্গলে গাড়ি দাঁড়ানোর অনুমতি ছিলনা। তামিলনাড়ুর নীলগিরি জেলার ছোট্ট গ্রাম এটা। সেখান থেকেই শুরু আরও চড়াই শুরু । এরপর ৩৬টি হেয়ার পিন টার্নিং। প্রশ্নাতিত ভাবে চ্যালেঞ্জি।এট্টু পরপর টার্ন, গাড়ি সোজা হওয়ার আগে আবার টার্ন। বাঁক তো নয়,যেন নীলগিরির আদি বাসিন্দা টোডা রমণীর চুলের বিনুনি। এসে পৌঁছানো গেল স্টার্লিং রিসোর্ট। থাকবার জায়গার গাল ভরা নামে আত্মম্ভোরিতার গন্ধ পাবেননা মোটে। গ্যাটের পয়সা দিয়ে থাকিনা সেথায়। আসলে মেয়ে চাকরি পাওয়ার পর এই হসপিটালিটি চেইনের মেম্বারশিপ গিফট করায় বছরে মোটে সাতটা দিন থাকতে দেওয়ার বদন্যতা দেখান এরা। গরম খাওয়ার আর নরম বিছানা, ভোর থেকে লাগাতার ১৪-১৫ঘন্টা জার্নি। তলিয়ে যেতে যেতে কি ভীষণ উত্তেজনা অনুভব করলাম।মন ক্যানভাসে এঁকে নিয়ে ফিরতে হবে হবে পার্বত্য রাজকন্যের রূপের ডালি। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।





পরদিন ঝকঝকে রোদ। কুয়াশা ঘেরা পাহাড়ের মাথায় যেন স্ফটিক মুকুট। পাহাড়ের মাথায় মেঘ লেগে আছে 'তাতা' ফুলের সাদা পাপড়ির মতো। ‘তাতা’ শব্দের অর্থ দাদুর মাথা! শুকিয়ে গেলে গোল তাতা ফুলের পাপড়ি সাদা হয়ে যায়। তাই অমন নামকরণ। চোখ বুঁজে একবুক বাতাস দিয়ে উড়িয়ে দিতে হয় পবিত্র এই ফুলের মিহি পাপড়ি। মনে মনে প্রার্থনা করতে হয় কিছু একটা।   

ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম। পাহাড়ের গায়ে ভেড়ার লোমের মতো ঘন চা বাগান। চা পাতায় নরম রোদ পড়ে চকচক করছে ব্রেজিলিয়ান পান্নার মতো!প্রথম গন্তব্য সিক্সথ মাইল। প্রায় ৩০ মিনিটের পথ। চারিদিকে সবুজ পাহাড় আর নরম ঘাসের গালিচা বেছানো উপত্যকা। বেশ কিছু সময় প্রকৃতির কোলে সময় কাটিয়ে পৌঁছে গেলাম 'নাইনথ মাইল' । প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি এই দুইটি স্থান শুটিং স্পট। 

            এবারে পৌঁছে যাওয়া গেল পয়করা লেক। এক্কেবারে ছবির মত দৃশ্যপট। মনোমুগ্ধকর ।দেখলাম এখানে বোটিং এবং হর্স রাইডিং এর ব্যবস্থা আছে । বয়স বাড়ার সাথে সাথে ওসব হুজ্জুতি মনে হয়। তাই লেককে বা'হাতে রেখে পায়ে পায়ে পঞ্চাশ মিটার মত হেঁটে পৌছালাম পয়করা জলপ্রপাতের সামনে। অদ্ভুত সুন্দর এক চঞ্চল কিশোরীর মত প্রপাতখানা। সুতীব্র জলপ্রপাতের প্রবাহমানতা মনকে জাস্ট ছুঁয়ে গেল। জলধারার সৌন্দর্য্যে বুঁদ হয়ে থাকলাম কিছুক্ষন। তারপর পৌঁছে গেলাম চকলেট ফ্যাক্টরিতে। ঘুরে ফিরে চকলেট ফ্যাক্টরি দেখে সেখান থেকে ভাঙা চোরা ইংরেজিতে হোমমেড চকলেট তৈরীর রেসিপি জেনে নিলাম। এখানকার চকলেটের স্বাদ বাজার চলতি চকলেটগুলির থেকে এক্কেবারে আলাদা । যেহেতু আমি চকলেটপ্রেমী মানুষ। এখান থেকে চকলেট কিনতে তাই ভুললাম না । এবারে খোঁজে ছিল এক 'নো ম্যানস ল্যান্ড' যেখানে পিন পতনের নিঃশব্দতা, একটিও টুরিস্ট সচরাচর নজরে পড়েনা এমন জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার। পায়করা রিজিয়ানে ই আছে এমন কিছু টোডা জনজাতির গ্রাম।প্রাচীন পদ্ধতিতে সেখানে চাষাবাদ হয়। প্রত্যন্ত কৃষি আর পশুপালন আদিবাসীদের জীবিকার ভিত্তি। খ্রিস্ট পূর্বাব্দের টোডে গ্রামে ঘুরে ফিরলাম। 




আজ দ্বিতীয় দিন। সক্কাল সক্কাল উঠে পড়েছি। অনেকটা সময় নিয়ে যেখানে আছি সেই প্রপার্টিটা টহল মারলাম। একটু আউটকার্স হলে নিরিবিলিতে থাকা যায়। এই প্রপার্টিটা নিজেই খুব সুন্দর যে মনেহলো একটু হেঁটে ঘুরে নেওয়া যেতেই পারে। ঘাস জমিতে গাছের গায়ে ঝুলে থাকা আর্কিড মোহিত করে দিচ্ছিলো।ব্যালকনির নীচে ফুটেছে ‘জিমিকি পো’, গ্রামোফোনের মতো দেখতে ‘রেডিও পো’ অর্কিড। এতো স্নিগ্ধ সকাল। ভাল্লাগছিল খুব। বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়। রাস্তার নাম 'রামকৃষ্ণ মার্গ'। দেখি দু পা এগিয়েই এক খন্ড প্রশান্তির আশ্রয়। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ মঠ। আড়ম্বর নেই,ছোট্ট অথচ সমাহিত। মনটা টইটুম্বুর হয়ে গেল। ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম উটির বিখ্যাত দোদাবেত্তা পিক দেখতে। বেস লেভ্যেল থেকে ৮৬৫২ ফিট উচ্চতায় রয়েছে দোদাবেত্তা,নীলগিরি পর্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ । এখানকার টেলিস্কোপ হাউস থেকে দূরের শৃঙ্গকে দেখে মনে হল যেন গিয়ে ছুঁয়ে দিয়ে চলে আসি।! এই স্থানটি থেকে সম্পূর্ণ উটির একটা সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করা গেল ।দোদাবেত্তা থেকে গাড়ি চেপে ১০ মিনিট দূরত্ব অতিক্রম করে পৌঁছে গেলাম টি ফ্যাক্টরি ভিউ পয়েন্ট । এক কথায় বলতে গেলে এটি চা এর মিউজিয়াম । চা বাগানের বিপণি থেকে চা খেয়ে এগিয়ে চললাম বোটানিক্যাল গার্ডেনের দিকে । এই বাগানটি সজ্জিত রং বেরঙের ফুল আর গাছের সমারোহে। এই বাগান দেখার পর মিনিট দশেক দূরত্বে পৌঁছে গেলাম রোজ গার্ডেনে। শোনাগেল এই গোলাপের বাগানে মোট ৪০০০ প্রজাতির গোলাপ গাছ রয়েছে। আমার সিজিন টাইমে এসেছি। নিরাশ করেনি সুন্দরী গোলাপের বাগিচা। যাত্রাপথে চলতি এক রেস্তরাঁতে লাঞ্চটা সেরে ফেললাম ।





'হেরিটেজ টয় ট্রেন'এ ওঠার বায়না করলাম না। দার্জিলিং এর জন্য ওঠা তোলা থাকুক। ট্রেনের ঝিকঝিক এর সাথে ' কস্ত মে লাহি লে লেই মা..'গানটা তো এখানে মিস করতে হবে। খাওয়া দাওয়া সেরে প্রায় আধ ঘন্টার পথ অতিক্রম করে পৌঁছে গেলাম উটি লেকের ধারে। ওখানে অনেকটা সময় কাটিয়ে ফেললাম। এতো মানুষজন দেখেই সময় কেটে যায়। সুভিনিরশপ ঘুরতে কি কম সময় লাগে! এবারে হোটেল ফেরার পালা । শহুরে যানজট বড্ডো বিব্রত করে। উটি দার্জিলিং এগুলো বড্ডো জণাকীর্ণ। একটু আউট কার্স লোকেশন থাকবার জন্য ভালো। ফিরে  তল্পিতল্পা গুটিয়ে রাখলাম। পরদিন একটু আর্লি ব্রেকফাস্ট সেরে রওনা হবো কোদাইকানালের উদ্দেশ্যে। ভোর ভোর চড়ে বসলাম। তখন জেগে ওঠে নি শৈলশহর উটি। শুধু কানঘেঁষে ফিসফিস বাতাসের শুনশান বয়ে যাওয়া। শিরশিরে বাতাস। বয়ে যাওয়া শূন্যতা ধুয়ে দেয় ফেলে আসা কংক্রিট শহর আর তার মলিন ধুলো। ইতিউতি নীল নীল পাহাড়ের সার। আকাশ ছুঁয়ে যাওয়া পাইনের বন। পাইন বনে খোঁজাই যেতে পারে ১২ বছর পর ফুটে ওঠা ফুল নীলাকুরঞ্জি।কি মোহময় মায়া সে একযুগ পর পর ফোঁটা নীলাব্জ ফুলে। কোন দিন দেখা মিললে দেখাবো প্রমিস রইলো।


 

সুনীল সাগরে,  শ্যামল কিনারে

অনিতা নাগ 


সুনীল সাগরকে সামনে থেকে দেখা খুব ছোটবেলায়। বয়স তখন চার। ভুবনেশ্বর ঘুরে পুরী যাওয়া। স্মৃতি বলতে অনন্তধ নীল জল। ঢেউ এর ভাঙা আর গড়া। বালি আর বালি। বালিতে বসে ঘর বানানো আর ঢেউয়ে ঘর ভেঙে যাওয়া। ডেকচিওলা। সিঙারার গন্ধ। নুলিয়া। তারা হাতে একটা বড় কালো টায়ার নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। মা বলতেন, এরা জলের পোকা। জলেই জীবন। সারাদিন এই জল নিয়েই বেঁচে থাকে। দাদারা নুলিয়ার সাথে  ভাসতে ভাসতে সমুদ্রের কতো দূরে চলে যেতো। আমার ভয় করতো। বাবা হাত ধরে আমাকে স্নান করিয়ে দিতেন। সারা গায়ে বালি।  মুখের ভেতর নোনা স্বাদ। এতো সুন্দর দেখতে জল এতো নোনা কেনো! খুব রাগ হতো। তবু ওই ঢেউয়ের ভাঙা গড়া কেমন ভালো লেগে গিয়েছিলো। 

এরপর যাওয়া অনেকটা বড় হয়ে। তখন সমুদ্রকে ভালোবেসে ফেলেছি। নিমেষহারা তাকিয়ে থাকা নীল জলরাশির দিকে। ঢেউয়ের সঙ্গে মন ভাসিয়ে নিজেকে  ভাসিয়ে নিয়ে চলা। ততোদিনে রবিঠাকুরের সাথে নিবিড় সখ্যতা। সুখে, দুখে, আনন্দে তিনিই আশ্রয়। ডিঙি নৌকার মতো ঢেউয়ের সাথে ভেসে চলা,  ‘দূরে কোথায়, দূরে দূরে’। তখন মন বড় অশান্ত। জীবনে নানান টানাপোড়েন চলছে। সব কেমন ফ্যাকাসে, রঙহীন। কিচ্ছু ভালো লাগে না। তবু বয়ে চলতে হয়। সমুদ্রের সামনে এসে দাঁড়ালে এক ম্যাজিকে সব আলো আলো হয়ে যেতো। এই যে অনন্ত জলরাশি বয়ে চলে আপন ছন্দে, কে দেখলো, কে আনন্দ করলো,  তাতে তার বয়েই গেলো। তার  মন খারাপের সময় কোথায়! একদন্ড বিরামের সময় নেই।  চরৈবতি। জীবন  ও তো তেমন। তোমার জন্য সময় অপেক্ষা করবে না। সমুদ্র মানে জীবন, জীবিকা, পর্যটন। দেশের সুরক্ষা।  আরো কতোকিছু। সমুদ্র সৈকতে কতো রূপ, রস, গন্ধ। কেনাবেচা, হৈহৈ। যাকে নিয়ে এতো আয়োজন সে কিন্তু বিরামহীন বয়ে চলেছে। যে’কদিন সমুদ্র শহরে ছিলাম নতুন করে সখ্যতা হলো এই সুনীল জলরাশির সাথে। সে শেখালো মন খারাপ আগলে বসে থাকলে মন ভালো হয় না। দুঃখকে ভাসিয়ে দাও। মনে মনে নত হলাম সেই  সুনীল জলরাশির সামনে। রোজ সকালে সূর্যোদয়ের আলো মেখে হেসে খলখল, গেয়ে কলকল। সকাল থেকেই উৎসব শুরু হতো তাকে ঘিরে। জেলেরা নৌকা বোঝাই করা মাছ নিয়ে বালির চড়ায় এসে দাঁড়াতো। চকচকে রূপোলী মাছ। নিমেষে বিক্রি হয়ে যেতো। খুশীর হাওয়া পালে লাগিয়ে আবার সে নৌকা  ভেসে পড়তো সাগরে।

 তৃতীয় দর্শনে এই সখ্যতা আরো গভীর হলো বিয়ের কয়েক বছর  পর প্রিয় মানুষটির হাত ধরে যখন এসে দাঁড়ালাম এই অনন্ত জলরাশির সামনে তখন অনেকটা পরিণত । মন তখন পূর্ণ। সেই কৃতজ্ঞতা নিয়ে যখন তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম মুহুর্তে এক ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিলো পায়ের পাতা। শিহরিত আমি। এমনও হয়! হয়, হয়। সে সব বোঝে। মনের কথা খানি পড়ে নেয় অনায়াসে। যে'কদিন ছিলাম শুধু  আনন্দ আর আনন্দ। তারপর কতোবার গেলাম। মা বাবা আর মেয়েকে নিয়ে  আনন্দ যাত্রায়।  তখন তার কাছ থেকে  আনন্দ নিয়ে এসেছি দু’ হাত ভরে। ছেলেকে নিয়েও গেছি। সাথে  মা বাবা। মা বাবা’ কে নিয়ে শেষ বেড়ানো সমুদ্র শহরে। সেই  আনন্দ  রাখা আছে স্বযত্নে আপন মনের অলিন্দে। বারবার গেছি তার কাছে। শূন্য ঝুলি পূর্ণ  করে দিয়েছে আপন মাধুরী দিয়ে।

জীবন বয়ে চলে আপন ছন্দে।  সে'দিনের সেই  ছোট্ট মেয়েটা তখন রীতিমতো ঘোর সংসারী। কর্তার কাজের সুবাদে ভারতবর্ষের  বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে ঘুরে  ক্লাম্ত। এক ঘর থেকে অন্য ঘর। চেনা মানুষ  ছেড়ে  অচেনা মানুষ। সংসার, ছেলে মেয়েকে বড় করতে করতে সমুদ্র প্রেম তখন মনের কোন গহীনে কপাট বন্ধ  করেছে কে জানে! হঠাৎ  সুযোগ হলো সমুদ্র শহরে যাওয়ার। যেখানে সে আগে কখনো যায় নি। শরৎচন্দ্রের বইতে পড়া ওয়ালটেয়ার, বর্তমান নাম ভাইজাক। সত্যি বলছো! এটাই ছিলো প্রতিক্রিয়া। সমুদ্র শহরে থাকবো! রোজ তাকে দেখতে পাবো! হ্যাঁ গো হ্যাঁ। রোজ কি,  ইচ্ছে হলেই  দেখতে পাবে। বারান্দায়  বেরুলেই দেখতে পাবে। 

শুধু সমুদ্র  নয়। সেখানে আরেক প্রিয় পাহাড়ও আছে। শুরু হলো অপেক্ষা।  ছেলের ১০ ক্লাসের পরীক্ষা দিয়ে এলাম সমুদ্র শহরে। এ’ তো অবিশ্বাস্য। কি অপূর্ব শহর। সমুদ্র আর পাহাড় প্রহরীর মতো আগলে রেখেছে শহরটাকে। আবার তাদের রূপ, রস, গন্ধ  দিয়ে ঢেলে সাজিয়েছে শহরটাকে। আমার প্রিয় সখীকে সবসময় দেখতে পাওয়া! অবিশ্বাস্য! দীর্ঘ জীবনের সব অপূর্ণতা নিয়ে তার কাছে এলাম। এখানে সে রহস্যময়ী। পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলে। বালুকা বেলা এখানে নেই।  সাজানো শহর।  রাস্তার পাশ ঘেঁষে বাঁধানো জায়গা। সিঁড়ি দিয়ে নামা যায় সমুদ্রের কাছে। তবে পাথর থাকায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। আমার বাড়ী থেকে  বড়জোর ১০০ মিটার। সে তখন জীবনের সাথে  অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে গেছে। সক্কাল হলেই প্রাতঃভ্রমণে বেড়িয়ে পড়া। আঁধার সরিয়ে আলোর পরশে জেগে উঠ। তারপর সুনীল সাগরের অতল হতে সূর্যের আর্বিভাব। নীল সমুদ্রে তখন সোনালী আলোর লুটোপুটি। বীচ রোডে তখন শুধু  প্রাতঃভ্রমণকারীদের চলাফেরা।  সকাল সাড়ে সাতটার পর যানবাহন চলতো। সে’ এক অনির্বচনীয় মুহুর্ত। ঐ মুহুর্তটায় লুকিয়ে থাকতো কতো যে রহস্য। বৃষ্টির দিনে তাই মন খারাপ হতো। তবে তখন তো তার অন্য রূপ। তখন সে উত্তাল। ভয় হতো। অমাবস্যা, পূর্ণিমায় তার রূপ যেতো বদলে। চাঁদের আলোয় সে চির যৌবনা সুন্দরী,  চপলা এক নারী যেনো। তেমনি অমবস্যার নিকষ কালো আঁধারে সে রুদ্ররূপে নৃত্য করতো। 




 বেশ চলছিলো। হঠাৎ  এক অসুস্থতায় হারিয়ে গেলো জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। অনেক ডাক্তার, অনেক ওষুধ।  কিন্তু  কোনো কাজ হয় না। শরীরে জোর নেই।  মনে শক্তি নেই।  কি হবে আমার সংসারের! মেয়ে তখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে।  ছেলে এগারো ক্লাস। আমার জন্য এদের স্বপ্নগুলো যেনো অধরা না থাকে। ঘুরে আমাকে দাঁড়াতেই হবে। বারান্দায়  গিয়ে দাঁড়ালাম।  দূরে ঐ অনন্ত জলরাশি বয়ে চলেছে আপন ছন্দে। তার বয়ে চলাতেই আনন্দ। বাকী সব কিছু থেকে উদাসীন। কর্তাকে বললাম আমাকে তার কাছে নিয়ে চলো। ব্যাস্ত শহরে হাজার কোলাহল। ও'পারে সারি দেওয়া  জাহাজে আলো ঝিকমিক করছে। আমি বসলাম গিয়ে তার কাছে। শক্তি দাও। আলো দাও। তুমি তো হারতে শেখাও নি। পারের কাছে পাথরের বুকে আছড়ে পড়ছে ঢেউ।  আবার নতুন তরঙ্গ তৈরী হচ্ছে।  অনেকক্ষণ বসে রইলাম।  নিজের ভেতরে ডুব দিলাম। নিজেকে ফিরে পাওয়ার যাত্রা শুরু হলো।  এ’ একান্তে আমার লড়াই।  ফিরলাম এক সময়ে। এক নতুন যাত্রা শুরু হলো।  কিন্তু তার কাছে বারবার ছুটে যাওয়ার এই আকূতি বাড়তে লাগলো। কর্তা আর ছেলে বেড়িয়ে গেলে ধীরে ধীরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতাম। সূর্য  তখন মাঝ গগনে। সেই  উজ্জ্বল আলোয় সমুদ্রের জলে মণিমুক্তোর জলকেলি। দূরে দূরে বাণিজ্য জাহাজ চলেছে আপন ছন্দে। ঢেউয়ের মাথায় দোল খেতে খেতে দূর থেকে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে  জেলে নৌকা। কখনো ছাদে গিয়ে দাঁড়াতাম।  একটু একটু করে জোর ফিরে পাচ্ছিলাম। আপন ছন্দে বয়ে চলতে চলতে এমন কতো জনকে সে জীবন শক্তি ফিরিয়ে দিচ্ছে তার হদিস কে রাখে। মাঝে  মাঝে সমুদ্রের সামনে গিয়ে বসতাম। ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যেতো। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যে নামতো। ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠতো। আলোর রোশনাইতে ঝলমলিয়ে উঠতো সমুদ্র শহর। আমি ফিরতাম আপন কুলায়। ততোদিনে তার সাথে  সম্পর্ক আরো গভীর হয়েছে। সে আমার আরো নিবিড় হয়েছে। জীবনযুদ্ধে সে আমার জীবনদাত্রী। এ’ কথা কখনো বলা হয়নি কাউকে। কিন্তু যতোবার কোনো সমুদ্রতটে গেছি  মনে মনে তার কাছে নত হয়েছি। চারদিকের আনন্দ,  হৈচৈ এর মধ্যে  জীবন তাকে অন্য ভাবে চিনতে শিখিয়েছে। সে তখন আমার দৈনন্দিন জীবনের সাথে  আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গেছে। 

কিন্তু এই সুন্দর রূপের যে ভয়াল, মারণ রূপ দেখলাম ২০১৪ তে হুদহুদ সাইক্লোনে তা মনে থাকবে আজীবন। এমন ভয়াল রূপ কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। তিথি অনুযায়ী  সমুদ্র উত্তাল হয়। কিন্তু এমন ভাবে একটা সাজানো শহরকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে ভাবতেই পারিনি। মেয়ে বিদেশে, ছেলে প্রবাসে। একটা সময় এমন হলো আমার দাদা আর বন্ধুকে বললাম আমাদের খবর না পেলে ছেলেমেয়েকে দেখিস। প্রচন্ড গর্জনে সে ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সব। শুধু ঈশ্বরকে স্মরণ। রক্ষা  করো, রক্ষা করো। দু'দিন পর  যখন সে প্রলয় থামলো তখন শহরটা ধ্বংস হয়ে গেছে। যে সমুদ্র  আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিলো, তার এই রুদ্র,  ভয়াল রূপ কল্পনাতীত। কেটে গেছে অনেক বছর। সমুদ্র শহর ভাইজাক আবার নতুন করে সেজে উঠেছে। আমরাও সে শহর ছেড়ে চলে এচেছি। সে’ আসা যন্ত্রণার। মনে হয়েছিলো আমাকে আমার জীবন থেকে উপড়ে নিয়ে এলো। তবু সেটাই সত্যি। আস্তে আস্তে সব সয়ে যায়। আজও যখনই সমুদ্রের সামনে দাঁড়াই তখনই এক অদ্ভুত  ভালোলাগায় মন ভাসিয়ে দিই। আর বলি যতোদিন এ’ জীবন, ততোদিন তুমি আমার সাথেই আছো। চোখের আড়ালে,  তবে মনের আড়ালে নয়।  সম্প্রতি গিয়েছিলাম  ভারতবর্ষের দক্ষিণতম প্রান্তে। সেখানে তিন সাগর এসে মিলেছে। ভারত মহাসাগর,  বঙ্গোপসাগর আর আরব সাগর। তিন ধারাকে তাদের রঙের পার্থক্যে আলাদা করা যায় বটে, কিন্তু  তিন ধারার বিভেদহীন বয়েচলায় সেই   ছন্দ জীবনকে উত্তোরণের পথ দেখায়।  সমাজের চারদিকে যখন নানান বিভেদের বেড়াজাল, সহনশীলতা শূণ্যে গিয়ে ঠেকেছে, আলোর থেকে অন্ধকার যখন সমাজ ব্যবস্থাকে গ্রাস করছে তখন অনন্ত, বিপুল জলরাশি আপন চলার ছন্দে জীবনের চরম পাঠ শিখিয়ে চলেছে।  মনে পড়লো প্রাণের ঠাকুরের কথা ‘দেখেছি পথে যেতে তুলনাহীনারে’। তোমাকে নিয়ে জীবনের এই পথচলা আমার চলবে।  চড়াই- উতরাই,  আলো-আঁধার কাটিয়ে এগিয়ে চলবো।  চরৈবতি চরৈবতি।


 

রাজমহল

বেলা দে

মেয়ের চাকুরীসূত্রে মালদা জেলার সামসী শহরে থেকেছি সাত বছর, প্রতিবেশীরা এতটাই মানবিক যে কয়েক দিনের মধ্যে আমাদের আপনজন হয়ে উঠেছে, বুঝতেই পারিনি ছোট্ট এক শিশুকে নিয়ে আমি ও মেয়ে বাড়িঘর ছেড়ে ৩০০ কি মি দূরে আছি,বিপদে আপদে সবসময় কাছে পেয়েছি। মেয়েকে সে পাড়ায় "নবোদয় সংঘ" নামে এক সাংস্কৃতিক সংস্থার সদস্য হিসেবে নিয়েছে, ওদের ব্যবস্থাপনায় নাটক নাচ সবেতেই অংশগ্রহন করে ছেলে মেয়ে। ওরা যখন মনস্থ করলেন একদিনের ট্যুরে বেরোবে প্রতিবেশিরা মিলে, বেড়াতে কার না ভালো লাগে, রাজি হয়ে গেলাম। বেরিয়ে পড়লাম ১০ই মার্চ। রবিবার উইক এন্ড সবাই যেতে পারবে, টান টান উত্তেজনা নিয়ে রওনা হলাম সর্বমোট ২০ জন। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গাড়ি উঠে পরলাম, যাব বিভাজিত বিহারের ঝাড়খন্ডের রাজমহল, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ছুটে চলেছে গাড়ি খুব ভোরে, আমাদের গাড়ির সাথে সাথে ছুটছে মুকুলায়িত আম্রকানন। জোরকদমে ঘড়ি আটটা ছুঁই ছুঁই যখন পৌঁছে গেল রতুয়া এরপরই খয়েরতলা, দেখতে দেখতে এসে গেল মানিকচক গঙ্গার ঘাট, ওপারে যাবার লঞ্চ তখনও ঘাটে ভেড়েনি। গঙ্গার পরপারে ঐতিহাসিক নগরী রাজমহল, লঞ্চ ছাড়ার নির্দেশিত সময় ১১ টা.

ঘাটপারের এক রেস্তোরাঁয় বসে চা জলখাবার খেয়ে একটু অপেক্ষা করতে না করতে এসে গেছে এসে গেছে বলে রৈ রৈ কান্ড জনতার, সব এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। ওপরে ওঠার খাড়া লোহার লম্বা সিড়ি, উঠতে গিয়ে প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত, পায়েও প্রচন্ডরকম ব্যাথা। আরেকজন প্রবীণ মহিলার একই অবস্থা, কর্তৃপক্ষ আমাদের দুজনকে নিচের তলায় কোনও মতে জায়গা করে দিয়েছে, বাকিরা সবাই ওপরতলায়। আসলে বহু স্থানীয় লোকেরা ওপারে যায় কর্মসংস্থানে। সর্বনিম্নে লোহার পাটাতনে অজস্র বোল্ডার বোঝাই লরী, যাত্রী বোঝাই ছোট গাড়ি, সেইসাথে আমাদের গাড়িটা। 

ভাবছিলাম কিভাবে এত ভার বহন করে লঞ্চ। যদিও আমাদের লঞ্চখানা বিশালাকায়, সে বয়ে নিয়ে চলেছে লোহার মোটা শেকলে বেঁধে আরও দুটি ছোট ছোট যাত্রীবাহী লঞ্চ। এদিকে গঙ্গা তখন উত্তাল ঢেউয়ের সাথে হেলেদুলে ঢেউ কেটে কেটে এগিয়ে চলেছে। যেতে যেতে এক সহযাত্রীর মুখে শুনলাম জাহাজমালিক বাচ্চু সিং। সে নাকি অগাধ সম্পত্তির মালিক, এমন ১০ খানা লঞ্চ ও জাহাজ আছে, বর্তমানে সে প্রবাসী। তার বাড়িটা দেখে নিলাম বিরাট বড় ঠাকুর দালান, অতিথি শালা, রন্ধনশালা পাথরের তৈরি নানা বিগ্রহ। সর্বংসহা গঙ্গা যেন বুকে করে দোল দিতে দিতে আমাদের বয়ে চলেছে মায়ের মতন করে। এ এক অন্য অনুভূতি, অনন্ত ভাললাগা। এই আনন্দে ভেসে ভেসে কাটিয়ে দিতে পারি কয়েক যুগ।এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট মায়ের নরম বুকে ভাসার পর অবশেষে পা রাখলাম রাজমহলের মাটিতে। ওপারে এক হোটেলে নানা ব্যঞ্জনে দিবাহার সেরে সে গাড়িতেই  রওনা হলাম, যেতে যেতেই দেখে নিলাম বৃটিশদের লালরঙা বহু উপনিবেশ, লাল পোস্ট অফিস,স্টেশন, থানা। স্টেশনের পাশেই চিনে মাটির কাপ প্লেট বাদন তৈরির কারখানা, ওদের শাসন কালে সব সামগ্রী কাঁচিয়ে নিয়ে যেত নিজেদের দেশে এমনটাই শোনা গেল স্থানীয় এক জনের কাছে, অথচ এদেশের শ্রমিকরা ঘাম রক্ত জল করে শ্রম দিয়েছে। নিজেদের কোনো পাওয়া ছিল না।সারাক্ষণ গাড়িতে বসে একঘেয়েমি ব্যাপারটা চলে এসেছে, গোধূলি সম্মুখ সমরে। গাড়ি এবার দৌড়ে চলে হিন্দু ধর্মের পবিত্র তীর্থস্থান বারহারওয়া "বিন্দুবাসিনী মন্দির,"যেখানে সতীমায়ের বিন্দু বিন্দু রক্ত পতিত হয়েছে, একান্ন পিঠের এক পিঠ। বার হারোয়া ঝাড়খন্ডের সাহেবগঞ্জ জেলায় অবস্থিত।  গঙ্গার গুরুত্বপূর্ণ স্থান,এখানে ভাগীরথী নাম নিয়েছে। 

ইতিপূর্বে আমার স্বামীর চাকুরী সূত্রে তিন বছর মালদায় ছিলাম ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সেসময় একবার এই মন্দিরে  এসেছিলাম, বর্তমানে অনেক পরিবর্তিত। পাশেই দেখে নিলাম ইস্কন মন্দির-এর পিছনেই গঙ্গায় নামার ১৫০ খানা সিঁড়ি রয়েছে। আমরা পারবো না ভেবে আর যাইনি। মন্দির লাগোয়া পার্কে খানিকটা সময় বসলাম। অস্তগামী সূর্যের লাল আভা গঙ্গায় বুকে, ঢেউয়ের তালে তালে দুলছে উত্তর বাহিনী গঙ্গা। রাজমহল একসময় সুবা বাংলার রাজধানী ছিল। এদিকে পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে। সবাই একবাক্যে স্বীকার, পেটে কিছু দেওয়ার। সুতরাং খাই খাই করে ফারাক্কা ছেড়ে মালদার এক স্বনামধন্য হোটেলে ডিনার সেরে ওয়ান ডে ট্যুরের ইতি।


 

কবিতা 


যেভাবে বাঁচি 

পরাগ মিত্র 


অতঃপর যজ্ঞবেদী চুরমার করে 
জয়দেব বসু দাঁড়াতেই 
হুড়মুড়িয়ে খসে পড়ল শৌখিন বর্ম 
সুডৌল উচ্চারণ, নিপুন অন্ধকারে 
পজিশন নেওয়া অক্ষরমালা 
অবাধ্য কবিতা হয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে 
আছড়ে পড়ছে বিদগ্ধ রুট মার্চে, 
সভাকবি ছুঁড়ে ফেলছেন অঙ্গবস্ত্র, 
চোখে চোখ রেখে 
বিদূষক সটান, “এ রৌরব কোন আমোদ নয় জাহাঁপনা”

শিরার গহিনে তখন রক্ত মাতাল উলুধ্বনি অবিরল দিগন্তের গাঁয়ে 

হেলায় ত্রিকাল কেনা হে বাঁশিওয়ালা 
এই যে আভুমি প্রণতি, সে শুধু ভান, 
বেঁচে আছি সর্বনাশ হাপরে বিছিয়ে 


 

আমাদেরও  জাগতে হবে
অশোক কুমার ঠাকুর



আমাদেরও জাগতে হবে,
জাগো জাগো জাগো রে ভাই
আর কতকাল, কাল কাটাবে
নাচন কোদন ছাড়ো রে ভাই

সংখ্যালঘু আছেন যারা,
কোন দেশে কে কেমন আছে
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখো
আজকে যারা যেমন আছে।

কাব্য চর্চা অনেক হলো
এবার বুকে আগুন জ্বালা
পুড়ছে নাকি বুকটা তোদের
সেই বুকে নেই  আগুন-জ্বালা!

ওপার বঙ্গে সংখ্যা লঘু
ভয়ে পাথর, বুকে চাপেন
এপার বঙ্গে সংখ্যা লঘু
সংখ্যা গুরুর বুকে চাপেন।

কোথায় গেলো বুদ্ধিজীবী
মহাকবি লেখকেরা
'চাঁদ' না ধরে 'কান্না' ধরুন
জাগুক সমাজ দেখুক এরা ।


 

বিন্যস্ত যাপন
রেবা সরকার


একদিন দুদিন তুমি আমায় বসতে দিলে। 
কিছু দিন চলল হাঁটা
জোরে কখনো ধীরে
যখন তাল মিলিয়ে চলি তুমি মুখ ফেরালে
তোমার মুখ কখনো মুখোশ 
আমি তোমার মুখোশ খুলে দিলাম। 

তারপর
বিন্যস্ত দিন যাপন
আমি আমার মতোন 
চোখের ভেতর বিরূপাক্ষ অমরাবতী।


 

কুলুঙ্গি 
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় 

উঠোনের লাল রঙ্গন এর থোকা গুলোর বয়স বাড়ে না
এবার খুব ইচ্ছে করছিল তুলসীতলার একমুঠো মাটি সাথে করে নিয়ে আসি।
দীপান্বিতা অমাবস্যার মহালক্ষীর আলোয় আলোময় হয়ে ওঠে গোটা উঠোন 
সজনে গাছের ছাঁওয়া পড়া কালো পুকুরের জলে 
বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে পুবের রোদ এসে পড়ে
কাঁচা পাকা এলোচুলে মায়ের হাসি ফুটে ওঠে পূর্ণিমা রাতে
এতটুকু ফিকে হয়নি সেই হাসি
আলোর বয়স বাড়ে না। 
মায়েদের হাসিরও  বয়স বাড়ে না
এখন কুলুঙ্গি ভর্তি শুধুই স্মৃতি।

আমাদের টিনের ঘরে একটা কুলুঙ্গি ছিল 
কত কিছু থাকত সেখানে
একটা চৌকি খাটে ছ'জন
নাঁচ,গান,গল্প,ছবি আঁকা কত কি
মাঝে মাঝেই মা বলতেন 
বুকের ওপর উঠিস না, অম্বল হয়েছে
একজন বলে উঠতো, আমি অম্বল খাবো।

শীততাপনিয়ন্ত্রিত লি মেরিডিয়ানের সাত তলায়
বেয়ারা একবাটি কুলের অম্বল রেখে গেল।
এখন কুলুঙ্গি ভর্তি শুধুই স্মৃতি।


 

গুচ্ছকবিতা
শিশির আজম


রেগে যেয়ো না বস


মেঘেরা ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। তাহিতির কুমারী মেয়েটারে ভিজায়ে পাহাড় নদী সাগর ডিঙায়ে ওরা এখন আমাদের উঠানে।

রেগে যেয়ো না বস। মাঝরাতেই বাক দিতেছে মোরগ। ভোর হইতেছে। আহা ভোর হইতেছে!

মাটিতে শীতের পাতা। অথচ গাছের শরীরে উঁকি মারতেছে কুঁড়ি। আর কি বলবো জন্তুজানোয়ারগুলার কথা, স্বামীসন্তানহীন যুবতী লাউডগার কথা -- ওরা এত্তো ভাল, এত্তো ভাল, পুরনো খবরের কাগজগুলারে পর্যন্ত সমীহ করে!

রোদের ভিত্রে ছায়া না ছায়ার ভিত্রে রোদ? অরা ঘুমায়া রইছে। অদের চোখ স্মৃতিতে রাঙা টকটকা। ঢেউগুলি আর বালুকণাগুলি নিজেদের ভিত্রে একটা কথা, কী কথা যেন আজও বইলা উঠতে পারলো না।

আর কুয়াশা। আর কুকুর, যেন অর ল্যাজ নাই, পাক খাইতেছে হুইস্কির খালি বোতলটারে ঘিইরা।





মাটি ছুঁয়ে


পুরো শীতকাল ভল্লুকের সঙ্গে কাটিয়ে
এই প্রথম আমি দেখলাম
শিকড়
মাটির নিচে

মাটির নিচে ছড়ানো
আর মাটির অনেক গভীরে

কতটা ছড়ানো আর কতটা গভীরে
কেউ
ঠিকঠাক বলতে পারবে না

এমন কি গাছও না
হ্যা স্বয়ং মাটিও না

কিন্তু এ তো ঠিক যে মাটি ছুঁয়ে গাছ
কত উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকে
দেখে মানুষ
মানুষের ভেতরকার রক্ত
রক্তের শিকড়
শিকড়
আঁকড়ে ধরে রেখেছে
নিয়ত অস্থির আর ঘুর্ণায়মান
পৃথিবীকে





ইন্দুবালা


তোমরা কি দেখেছো আমার ইন্দুকে
ও তো কিছুই দেখেনি
কিছুই বোঝেনি
ও কেবল গাইতে জানে

আমি দেখেছি ওর অন্ধকার
ওর কালো
তোমরা বিশ্বাস করবে না
ওই কালো কি কমনীয়
কি লাল
রক্তের মতো লাল





রাস্তায় লোকেরা


'রাস্তা ব্যপারটা ঝুঁকিপূর্ণ, বিরক্তিকর আর স্থিতিশীলতার শত্রু।' --
ভালমানুষেরা বলাবলি করে।

রাস্তায় (যেখানে এখন মৃতদের আনাগোনাও আপত্তিকর পর্যায়ে)
লোকেরা কথা বলছে
তাদের
রোদাঁর তৈরি মুখ।

পাখিদের নাড়িভুড়িভরা ঝুড়ি মাথায় লোকেরা চলে যাবে
বিশাল সব মনুমেন্টের গহ্বরে
থেকে যাবে উদবিড়াল
আর ঘাই হরিণীর কলস

বেশ আত্মবিশ্বাস আর গর্বীত ভঙ্গিতে একজন আইন প্রণেতা
সংসদে বললেন,
(বাংলায় গোলমাল হলেও
ইংরেজি উনি ভাল বলেন)
'রাস্তা আর আগের মতো নেই।'

কেন নেই?
কেন আগের মতো থাকবে?
রাস্তা কী করবে?
রাস্তা কী করবে?

আর যারা প্রতিদিন দেখে এ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম মাখা রাস্তাকে
তারা, বিভৎস কাকেরা?





প্রথমেই জানা দরকার বদলটা কীসের


একেকটা রাস্তার নাম তুমি পারো বদলে দিতে
কিন্তু ওরা বদলায় না
আর ওদের খিদেও কমে না

বরং তুমি গিয়ে বসো
ওদের রাতের অ্যান্টিসোশাল ক্যাফেতে
আর ক্যাফের টেবিলগুলোর মাতলামি
সহ্য করো

হ্যা মাতালদের পাল্লায় পড়ে
তুমি আবার গড়াগড়ি খেয়ো না মেঝেয়
মেঝেয়
জাফরান চাঁদের ফোঁটা
বিয়ারের ফোঁটা
রক্তের ফোঁটা
আর জানো তো এই ফোঁটাগুলোর
রকমসকম
কোনদিনই সুবিধের না



 

এক অজ্ঞাত বিকেল

অর্পিতা রায় আসোয়ার 


দ্বার রুদ্ধ করে দিব‍্যি ছিলেম
আপন খেয়ালী সুরে
একাকী মত্ততায়।

কষ্টসাধ্য জেনেও খুঁজে চলেছিলেম 
আলো
দুটো ঘন সন্নিবিষ্ট
পল্লবের মধ্যিখানে।

সহসা, এমন এক অজ্ঞাত বিকেল
এল দ্বারে
যার ক্রমাগত করাঘাতে 
সম্বিত ফেরে 
পর্বতপ্রমাণ জমে থাকা অভিমানকে 
দূরে ঠেলে 
অগ্রসর হই 
মুখোমুখি হই দুজনায়……..


 

মিরজাফর

উৎপলেন্দু পাল  


আপনার ঘরে ক'জন মিরজাফর, খোঁজ রাখেন জাঁহাপনা? 
পৃথিবীর বাতাসে এখন সন্দেহের পোড়া গন্ধ  
মুখ ও মুখোশ মিশে আছে একসাথে বেমালুম  
পোষা কুকুরও কখন 'ঘেউ' করে ওঠে বোঝা দায় 
সতর্কতার কোনও বিশেষ চরম বিন্দু নেই আজকাল  
সাজানো পুতুলগুলোর ভেতরেও মিরজাফরের খোঁজ করুন। 

আপনার ভেতরেও ক'জন মিরজাফর, জানেন কি জাঁহাপনা? 
ধমনীর রক্তস্রোতেও মিশে থাকে বেইমানির বিষ 
মুখের প্রসাধন সরে গেলে দেখা দেয় রক্তমুখ ক্ষত 
বেইমানির রক্তবীজ কখন যে রক্তে মেশে কে জানে 
চিরুণিতল্লাসীর ফাঁক গলে ঢুকে যায় কে কখন কে জানে 
একবার নিজের অন্দরেও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন নিয়োগ করুন। 



 

পথের পথিক
কেতকী বসু



যথেষ্ট বা পর্যাপ্ত বলে ধরে নেওয়া কথা গুলো
চোখের সামনেই কেমন যেনো ফাঁকা আর অলস মনে হয়
দুর্দিনের ঘরে ব্যথা হয়
পড়ে থাকা রাস্তায় রাশি রাশি ধুলো
ইঁট,পাথরের  কংক্রিটে মিশে গিয়ে
পথ হারালে
বেনামি পরিচয়ে  নতুন করে ভাব হয়

 রাস্তার গতিপথ মাপা হয় দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে

আড়ম্বরের চমকে পিচ্ ঢালা হলে রাস্তার
নূন্যতম হিসেব বদলে যায়
বহু সমাগম আর নতুনের সূচনায় পথ তখন
আপন খেয়ালে বুকে নিয়ে বেড়ায় জমানো আনন্দ
দরকারি সমস্ত কাজ খুঁজে নিয়ে হিসাব মেটায়
সরকারি দপ্তরে
তারপর যথেষ্ট নাম নিয়ে তর্ক চলতে থাকলে
মিথ্যা হয় অজুহাত আর সমস্ত পরিকল্পনা
সন্ধ্যার আলো জ্বলে উঠলে রাস্তার উজ্জ্বলতা বেড়ে যায়
মনে পড়ে অন্ধকার পথের সমস্ত অন্ধ কথা গুলো।


 

শ্রমণের পাঠ

অমিত আভা 


কতটা নত হলে
                         অহং ছাড়ে হাত—
এই প্রশ্নেই শুরু,
                        এই প্রশ্নেই শেষ।

বুদ্ধ সামনে,
                  পেছনে ব্রাহ্মণের ছায়া—
পা এগোয়, সংস্কার টানে।

প্রতিদিন বুকের ভেতর
                      একটুখানি আসে আলো,
নাম নেই, অবতারও নেই।

আলো চলে গেলে
                          আমি আবার যাযাবর—
কাঁধে অনেক প্রশ্ন,
                গায়ে রহস্যের পুরোনো চাদর।



 

সমুদ্র জীবন 
প্রতিভা পাল

অনন্ত সমুদ্র। অগাধ জলরাশি। অযুত ঢেউ।

         পার ভাঙা ঢেউগুলো বারবার গড়ে ওঠে অতল ছুঁয়ে ছুঁয়ে। নতুন রূপে। সমুদ্র কি খবর রাখে সেসব ভাঙা-গড়ার?
         পথ ভোলা নাবিক দিক হারিয়ে ভেসে চলে শুধু। একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত। অন্য দিক। ধৈর্যর পরীক্ষা যেন কোনও। নোঙর বাঁধে হয়তো কোনও দ্বীপে। সে কি ফিরে পায় তার গন্তব্য কখনও? 

         জন্মান্তর-বিস্মৃত জন্ম বেখেয়ালি সেই ঢেউয়ের মতো। পথ ভোলা নাবিকের মতো। ভেসে চলা খড়কুটোর মতো। যার উৎস, গন্তব্য নামহীন। তবু এগিয়ে চলা কেবল নিজের খোঁজে। আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন। সমর্পণ প্রয়োজন সমুদ্রর মতো গহীন জীবনের কাছে। অতল ছুঁয়ে আলো হওয়া প্রয়োজন। তবেই এগিয়ে চলা। তবেই গন্তব্য ছোঁয়া। 

         সমুদ্র খবর রাখে না। ঢেউ জানে ভাঙনের ব্যথা। নাবিক জানে পথ হারানোর অসহায়তা। জীবন জানে শুধু প্রবাহ.....


 

মা

নবনীতা (সরকার)


অজস্র মেয়ে জন্ম পেরিয়ে
উঠে আসে মা
মা নামে
ঈশ্বর এসে দাঁড়ায় শিয়রে
প্রশান্তির নিবিড় ছায়া মেখে নেমে আসে
এক টুকরো স্বর্গ ।

শতাধিক নদী জন্ম পেরিয়ে
উঠে আসে মা
মৃত্যু থেমে যায় দুয়ারে
মুছে যায় বিরহ, অনাদর আর..
বেদনার গভীর কালো দাগ ।

অনেক অনেক বৃক্ষ জন্ম পেরিয়ে
উঠে আসে মা
বিশ্বাসের বাসা বোনে পাখি
চোখে ভাঙা ভাঙা স্বপ্ন
বুকে প্রত্যয় ,থেমে যায় ঝড়

অজস্র মানবী জন্ম পেরিয়ে
থেকে যায় মায়েদের সর্বংসহা ,
অপরাজেয় অস্তিত্ব
আতঙ্কের আগুন ছাই চাপা পড়ে
ভাতের মিষ্টি গন্ধে
আলো হয়ে ওঠে 
কতগুলি চোখ,ঘর আর...
এক টুকরো সরল পৃথিবী ।


 

মানুষ পোড়া গন্ধ 

প্রাণেশ পাল 

পূবের হাওয়ায় মানুষ পোড়া গন্ধ 
হিমেল বাতাসে ধর্মীয় দীর্ঘশ্বাস 
আমাদের চেতনা ভারী হয়ে আসছে....

মানুষ পুড়ছে নাকি উগ্র ধর্মান্ধতা
পুড়ে যাওয়া ধর্মে খুঁজে ফিরি
আমাদের বিবেক, মনুষ্যত্ব, সংস্কৃতি....

আগুনের লেলিহান শিখা
লেখা থাকে না ধর্মের নাম
শুধুই পুড়ে যায় আমাদের অস্তিত্ব....


 

তমোহন হিয়াজ্যোতি

সম্রাট দাস 


পৃথিবী গভীর-ক্লান্ত! ব্যাপক ব্যস্ত! অস্থির!
খাদ্য-সংগ্রহরত পিঁপড়েটি যেমন ব্যস্ত!
উদ্দেশ্যহীন অথচ উদ্দেশ্যযুক্ত ব্যস্ততার অলীক মাথাব্যথা!
ভাবহীন জড়বাদী বৃথা কবিতা রচনা, 
অথবা ভাবনাহীন জড়তাগ্রস্ত নিষ্ফল সংগীত সাধনায়
ব্যস্ত কত শত প্রাণ!
চঞ্চল হৃদয়ে সুমিষ্ট রসপূর্ণ ফলের ছিবড়ে খাওয়ার ব্যস্ততা!
তামসিক ব্যস্ততা! 

এহেন ব্যস্ততা মাঝে কতিপয়ের হৃদয়ে নিভৃতে 
ঈশ্বর এসে অভয় দিয়ে যায়;
অমৃত রেখে যায় বুকের ভেতর! 
তারা শিউলি অথবা গার্ডেনিয়ার দৈব সুগন্ধ আস্বাদন করে 
সকরুণ-অমিয়-প্রফুল্লহৃদয় দিয়ে;
ব্যস্ততাতেও তৃপ্ত থাকে ব্যস্ত রবির মতো। 
তখন নির্গুণ কাব্য সাধনা অথবা সংগীত আরাধনায় মেতে ওঠে প্রাণ। 
তখন নিজেকে মনে হয় অনাবিল সূর্যকিরণ 
অথবা অমলিন সাগরকল্লোল।
তখন তমোহন হিয়াজ্যোতি এসে ঈশ্বরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়!