Friday, September 4, 2026


 

নিমতলার আলো
মনোমিতা চক্রবর্তী

সেদিন ভোর থেকেই আকাশটা ছিল ধোঁয়াটে। শরতের মেঘে সূর্যের আলো যেন কাঁচা দুধের মতো ফিকে হয়ে উঠেছিল। নতুন বাড়ির উঠোনে ধূপের গন্ধ মিশে ছিল ভেজা মাটির গন্ধে। বাড়িটার নাম রাখা হয়েছে “নীড়”। নামটা রেখেছিলেন অরুণোদয় নিজে।

কমলিনী তখন নতুন বউ। সিঁথির সিঁদুর, হাতে শাঁখা-পলা। উঠোনে আলপনা আঁকা হয়েছে। পুরোহিত মন্ত্র পড়ছেন। আর সেই সময়ই অরুণোদয় সবার চোখ এড়িয়ে বাড়ির এক কোণে মাটি খুঁড়ছিলেন।
কমলিনী অবাক হয়ে বলেছিলেন,-- এখন আবার কী করছ?

অরুণোদয় হেসে পকেট থেকে ছোট্ট একটা নিমগাছের চারা বের করে বলেছিলেন -- গৃহপ্রবেশের দিন একটা গাছ লাগানো শুভ। এই গাছটা আমাদের সংসারের সঙ্গে বড় হবে।

কমলিনী হেসে বলেছিলেন,-- তোমার মাথায় সবসময় কী সব অদ্ভুত চিন্তা ঘোরে!
অরুণোদয় মাটিতে চারা লাগাতে লাগাতে উত্তর দিয়েছিলেন-- অদ্ভুত নয় কমল, মানুষ চলে যায়… গাছ রয়ে যায়।

সেই কথাটা তখন হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন কমলিনী।

কিন্তু বহু বছর পরে, জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝলেন— মানুষটা কত বড় সত্যি কথা বলে গিয়েছিল।

বাড়িটা ছিল সীমান্তঘেঁষা এক ছোট্ট শহরে। চারদিকে পুকুর, তালগাছ, কাশফুল আর ভোরবেলার আজানের সুর। অরুণোদয় স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ইতিহাস পড়াতেন। ছেলেমেয়েদের বলতেন-- দেশ মানে শুধু মানচিত্র নয়, দেশ মানে মানুষের স্মৃতি।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে হঠাৎ সব বদলে গেল।

রাতের অন্ধকারে গুলির শব্দ, আগুনের লেলিহান শিখা, মানুষের চিৎকার-- শহরটা যেন এক মুহূর্তে নরকে পরিণত হলো। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিবেশীরা একে একে বাড়ি ছাড়তে শুরু করল।
সেই রাতেই অরুণোদয় অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন নিমগাছটার পাশে। তখনও গাছটা খুব ছোট। পাতাগুলো কচি সবুজ।

কমলিনী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলেছিলেন-- চলো না, আমরা এখান থেকে চলে যাই।
অরুণোদয় বলেছিলেন-- সবাই যদি পালিয়ে যায়, তবে দেশটা থাকবে কার?
কমলিনীর বুকের ভিতরটা হুহু করে উঠেছিল।
-- তুমি কি যুদ্ধে যাবে?
অরুণোদয় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন--যদি না যাই, তবে আদিত্যকে বড় হয়ে কী শেখাব?

সেদিন রাতে আদিত্য ঘুমিয়ে ছিল। মাত্র তিন বছরের শিশু। অরুণোদয় অনেকক্ষণ ছেলের মাথায় হাত রেখে বসেছিলেন। তারপর কমলিনীর দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন-- যদি ফিরতে দেরি হয়, গাছটার যত্ন নিও।
কমলিনী রাগ করে বলেছিলেন-- অমন অশুভ কথা বলবে না!
অরুণোদয় শুধু হেসেছিলেন। সেই হাসির ভিতরে কেমন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ছিল।
তারপর একদিন সত্যিই তিনি আর ফিরলেন না।
কেউ বলল পাকসেনাদের গুলিতে মারা গেছেন। কেউ বলল পাকসেনারা তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরে আর খোঁজ মেলেনি।
কমলিনী কোনওদিন তাঁর মৃতদেহও দেখতে পাননি।
শুধু এক সহযোদ্ধা এসে অরুণোদয়ের পুরোনো হাতঘড়িটা দিয়ে গিয়েছিল।

সেদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টি পড়ছিল। কমলিনী উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ছোট্ট নিমগাছটা বৃষ্টিতে ভিজছিল। হাওয়ায় তার পাতাগুলো কাঁপছিল থরথর করে।
হঠাৎ কমলিনীর মনে হল— এই পৃথিবীতে তাঁর আর কেউ নেই।
তবু তিনি বাড়ি ছাড়েননি।
অনেকেই বলেছিল-- এখানে আর থাকা নিরাপদ নয়। চলে যান ওপারে।
কমলিনী দৃঢ় গলায় উত্তর দিয়েছিলেন-- যে মানুষটা এই মাটির জন্য প্রাণ দিল, তার ভিটে আমি ছেড়ে যাব না।

তারপর শুরু হয় এক দীর্ঘ যুদ্ধ— এক নারীর একার যুদ্ধ।
দিনে সেলাই, রাতে আচার বানানো। কখনো মানুষের বাড়িতে রান্না করা। তবু অভাবের কাছে মাথা নত করেননি তিনি।
আর প্রতিদিন সকালে নিমগাছটার গোড়ায় জল দিয়েছেন।
গাছটা ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল।
আদিত্য সেই গাছের ছায়ায় খেলতে খেলতে বড় হলো। স্কুলে যাওয়ার আগে গাছটাকে জড়িয়ে ধরত। 
ঝড় উঠলে গাছটা কেমন বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত বাড়িটার সামনে।
কমলিনী মাঝে মাঝে মনে মনে বলতেন-- তুমি আছ বলেই এখনও মনে হয় অরুণোদয় আছে।

সময় কারো জন্য থেমে থাকে না।
একদিন আদিত্য চাকরি পেল শহরে। তারপর বিয়ে করল। তার স্ত্রী মেঘলা আধুনিক মেয়ে। বড় শহরে মানুষ।
পুরোনো বাড়িটার প্রতি তার কোনও টান ছিল না।
সে প্রায়ই বলত-- এই ভাঙাচোরা বাড়িতে আর কতদিন? এত বড় জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

আদিত্য প্রথমে প্রতিবাদ করত। কিন্তু সংসারের হিসেব মানুষকে বদলে দেয়।
একদিন সে মাকে বলল--- প্রোমোটাররা খুব ভালো অফার দিয়েছে। এখানে ফ্ল্যাট হলে আমাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে।
কমলিনী চুপচাপ শুনছিলেন।
আদিত্য একটু ইতস্তত করে বলল-- তবে… নিমগাছটা কাটতে হবে।

কথাটা শুনে কমলিনীর বুকের ভিতরটা যেন হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল।
অনেকক্ষণ পরে তিনি শুধু বললেন-- গাছটা কাটবে?
মেঘলা বিরক্ত হয়ে বলল-- ওটা আবার গাছ নাকি? শুধু তো পাতা। না কোনও সুন্দর ফুল, না ফল।

কমলিনী উঠে দাঁড়ালেন। জানলার বাইরে নিমগাছটা দাঁড়িয়ে আছে। বিকেলের আলোয় তার ছায়া লম্বা হয়ে উঠোনে পড়েছে।
তিনি আস্তে আস্তে বললেন-- সব গাছ ফুল,ফল দেয় না মা। কিছু গাছ শুধু ছায়া দেয়।

কেউ উত্তর দিল না।
কয়েকদিন পরে কাঠুরেরা এল।
সকালের বাতাসে কেমন অদ্ভুত গুমোট গন্ধ। নিমপাতাগুলো কাঁপছে। যেন অশনি সংকেত টের পাচ্ছে।
একজন কাঠুরে কুঠার তুলতেই কমলিনী ছুটে এসে গাছটার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন -- কেউ কাটবে না!
আদিত্য বিরক্ত হয়ে বলল -- মা, তুমি বুঝতে চাইছ না কেন?
কমলিনীর চোখদুটো লাল হয়ে গেল। কোনও মতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন -- তুই বুঝবি না আদিত্য। এই গাছটা শুধু গাছ নয়।
— তাহলে কী?
কমলিনী কাঁপা হাতে গাছটার গায়ে হাত রেখে বললেন-- এটা তোর বাবার শেষ স্মৃতি। যুদ্ধের পরে যখন সবাই চলে যাচ্ছিল, আমি এই গাছটার জন্য থেকেছিলাম। কারণ মনে হতো, তোর বাবা এখানেই আছে।
হাওয়ায় পাতাগুলো ঝিরঝির করে উঠল।
কমলিনী বলতেই থাকলেন -- মানুষ যখন খুব একা হয়ে যায়, তখন গাছও আপন হয়ে ওঠে রে। এই গাছটা আমার কান্না শুনেছে, অভাব দেখেছে, তোর বড় হওয়া দেখেছে… তুই আজ যাকে অকেজো বলছিস, সে আমাদের পুরো জীবনটা বয়ে বেড়াচ্ছে।
আদিত্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার হঠাৎ মনে পড়ল— ছোটবেলায় মা নিমপাতা বেটে গায়ে মাখিয়ে দিতেন। মাঝে মাঝে নিমপাতা ভেজে ভাতের সাথে খাইয়ে দিতেন ।বাবা সম্পর্কে যত গল্প, সব এই গাছতলায় বসেই শোনা।
সে কাঠুরেদের দিকে তাকিয়ে বলল -- কাজ বন্ধ করুন।
মেঘলা অবাক হয়ে বলল -- মানে?
আদিত্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল -- বাড়ি ভাঙা হবে… কিন্তু গাছটা থাকবে।

কমলিনীর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
অনেক বছর পরে তিনি যেন আবার অরুণোদয়ের কণ্ঠ শুনতে পেলেন-- মানুষ ভুলে যায়, গাছ ভোলে না।

সেই বছর দুর্গাপুজোর অষ্টমীর সকালে নতুন ফ্ল্যাটবাড়ির কাজ শুরু হলো। কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল পুরোনো নিমগাছটা।
প্রোমোটার অনেক আপত্তি করেছিল। পরে নকশা বদলাতে হয়েছিল।

নতুন এই ফ্ল্যাটটার নাম রাখা হয়েছে , নিমতলার আলো।
ফ্ল্যাটের বাচ্চারা বিকেলে এখন সেই গাছতলায় খেলে। কেউ দোলনা বেঁধেছে, দোল খাওয়ার জন্য। কেউ আবার নিম গাছটার তলায় বসে বই পড়ে।
কমলিনী বারান্দায় বসে চুপচাপ দেখেন।
শরতের বাতাসে নিমপাতা নড়ে ওঠে। রোদ এসে পড়ে তাঁর সাদা চুলে।
মাঝে মাঝে তাঁর মনে হয়-- মানুষের আসলে মৃত্যু হয়না।সে শুধু তার অবয়ব ছেড়ে চলে যায় । কিন্তু সে বেঁচে থাকে কোনও গাছের ছায়ায়, কোনও পুরোনো উঠোনের গন্ধে, কিংবা কারও না বলা ভালোবাসার ভিতরে।


 

অনিমেষ
দেবযানী ভট্টাচার্য 

তুমি নিভৃতের মতো স্থির, চেতনার আধার, তোমার আঙুলে শব্দের ভান্ডার
বীজতলা জুড়ে নীরবে ছড়িয়ে দিচ্ছ চেতনার বীজ ,
মস্তিষ্ক সেজে উঠছে নকশী কাঁথার নকশায়,সবুজের নৈবেদ্য, নতুনের আলাপন 
সাজিয়ে দিচ্ছ আমার ভাবনায় ---
হৃদয়, সেও তো কম কিছু নয় !দিয়েছ যা আমায়,
তুমি বসন্তের দেবতা,
যতটা প্রকাশ্য বাঙ্গময়তায়
ততোধিক হিরন্ময় নীরবতায় ।




নাগরিক অহংকার

গৌতমেন্দু নন্দী


 সৌন্দর্যের স্পর্শ সুখে ভুলে যাই প্রশ্রয়ের সীমানা

   উপেক্ষা করি, লঙ্ঘন করি আত্ম সংযম।
   ভুলে যাই-----
   অদৃশ্য সীমানার মধ্যেই ঘুমিয়ে থাকে এক প্রলয়
   সৃষ্টির আদি থেকে যুগ থেকে যুগান্তরে -----

   সুপ্ত সেই আলোড়ন, ভয়াবহতার রোষানলকে    
   ভেবেছি  এক প্রশ্রয় -----
   শীতল স্রোতধারার মতো  
   শুধুই  শীতল ভেবেছি------

    প্রশ্রয়কে ভেবেছি নিজের আধিপত্যের অধিকার--
   ভেবেছি ,ভেবে চলেছি আত্ম দম্ভের উন্মাদনায়----
   আঘাতে আঘাতেও কিন্তু সে ঘুমিয়ে থাকে--- 

   কংক্রিটের দেমাক নিয়ে তবু আঘাত করে চলেছি
    পরিসর  দখলের, গতিপথ বদলের হত্যাকারী হয়ে।
   সৌন্দর্যটুকু নিয়ে তবু যেন পড়ে থাকে অন্ধ স্নেহে
    সমতলে পাদদেশে স্নেহ বন্ধনের কোন মায়ায়-----
    নাগরিক সৌন্দর্য নিয়েই------

   আরও উদ্ধত আরও বেপরোয়া হয়ে উঠি
   প্রতিবাদ হীন সৌন্দর্যের প্রশ্রয়ে-----

  সেই প্রশ্রয় শাসন হয়ে কখন যেন ভেঙ্গে পড়ে 
   ভেঙ্গে পড়ে সব আড়াল আবডাল--- 
    আঘাতে অভিঘাতে ঘুম ভাঙ্গে শান্ত রূপের----
  জেগে ওঠে এক অশান্ত ভয়ংকরী----

  প্রলয়ঙ্করী ধ্বংসের নেশায় তখন উন্মত্ত হয়ে       ভেঙ্গে চলে ঘরবাড়ি, শহর,নগর, গ্রাম
        ভাঙ্গে------ 
   উন্নয়নের মিথ্যে নাগরিক অহংকার......!!



অচলায়তন 

তাপসী লাহা 

তারারন্ধ্র খনিজাত দুরুহ কাটে বিকালের শবছায়ায়
 মৃত্যু দেখি, অতর্কিতে মহামায়ার চন্ডী জাগানো
খড়্গ চলে, ভেসে চলেছে অনাদি রুপ
খুলে গেছে ধ্বংসের নাবালক রুপ।

রক্ষা রক্ষা ধ্বনি বধির হল, বানের উত্তাল 
অপ্রাসঙ্গিক করে বিদায়ের নির্ঘন্ট ,পাতা ছেঁড়া রীতি,কালীচোখ জাগে করাল
 নৃত্য করে মহাদেব,পাপের পৃথিবী পরে, ভেসে যায় ।

নগরাদি স্মৃতি বিলোপের মতন
বধির রাখো অচলায়তন।


 

অসুখ-বিসুখ 

উৎপলেন্দু পাল  


নিরাময়েও লুকিয়ে থাকে অসুখ 
আধুনিক চিকিৎসায় আসলে কোনও ব্যর্থতা নেই  
সবই মেনে নিতে হয় বৃহত্তর স্বার্থে 
ছোটোখাটো কাঁটাগুলো উপেক্ষা করাই দস্তুর 
এই যাপনেও লুকিয়ে থাকে বিসুখ  
নতুন স্রোতের ভেতর আসলে কোনও কাদা নেই  
সবই মেনে চলতে হয় শৃঙ্খলার স্বার্থে 
অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসগুলো উপেক্ষা করাই দস্তুর। 


 

খবরের কাগজে সব খবর থাকে না

     শ্যামল বিশ্বাস লামশ্যা


প্রতিনিয়ত চোখের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে

চোখে চোখ রেখে মুখের দিকে হাত বাড়াও  

তুমি তো এ জীবনে দীর্ঘকাল যাবত বেঁচে নেই

কোন কথাই পুঙ্খানুপুঙ্খ বুঝিয়ে বলতে পারি না  

দু দশক আগে পথের মোড় থেকে বেঁকে গেছি

শুধু স্মৃতি ছাড়া সর্বত্র একে অপরের অপরিচিত

কখনো স্বর ভেঙ্গে তোমার স্বর বেরিয়ে আসে

তখন মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে অন্য কোন পথে যায়

আশেপাশে যারা আছে তারা তোমায় চেনে না

এ তো জান আকাশটা দৈনন্দিন খবরের কাগজ

প্রতিদিন হরেক রকম দুঃখের বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয়

রাত জেগে কাগজটি উল্টো পাল্টা করে খুঁজি


 

দৈববাণী

লীনা রায়

সিঁড়ির ধাপে পা রেখেছি
রোদ ছুঁয়েছি সেই উঠোনে,
মন খুঁড়েছি,
সুখ খুঁজেছি,
দুধ-পুকুরে, অশোক বনে।

তারপরে দিন ব্যস্ত হলে
পসরা সাজে রাস্তা জুড়ে।
ঠিক তখনই
দৈববাণী,
তোমার সাকিন অচিনপুরে।

রোদ ছড়ানো সে সব দিনে
যে যার মতো
সুখ কুড়াবে,
দিব্যি কেটে বলতে পারি
আর ভাবিনে,আর ভাবিনে।


 

গর্ভবতী সময়....

প্রাণেশ পাল 

গর্ভবতী সময়....
কৃষকের উপাসনা প্রহর জুড়ে কিশোরী শ্রাবণ,
জরায়ুর গভীরে অনিসিক্ত ভ্রুণের 
তপ্ত দীর্ঘশ্বাস !

কৃষিজমি-র ফাটলের গভীরে সংসারী বিষাদ 
অস্তিত্বের ধারাপাতে শ্রাবণ ভিজে যায়,
যুবতী শ্রাবণের কাঙ্খিত ভালবাসা জুড়ে
অনাকাঙ্খিত শূন্যতা....
ধুয়ে যায় ইচ্ছে, অনিচ্ছে, চাওয়া, পাওয়া !

যেভাবে উন্মুক্ত প্রান্তর জুড়ে বৃষ্টিস্নাত 
কৃষক বধূর শরীরে লেপ্টে যাওয়া শাড়ি,
খাজুরহোর শ্রাবণ ভাস্কর্য !
সেভাবেই শস্য ভ্রুণের শরীর জুড়ে
হরিৎ প্রান্তরে গর্ভবতী হাওয়ায়
শ্রাবণের বৃষ্টি সঙ্গম !

চৈতন্য প্রেমে কৃষক বধূর শ্রাবণ ভালবাসা
ভ্রুণের অঙ্কুরোদগমে মিশে যায়,
গর্ভবতী সময়....


 

বাড়ি

ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য 

“ তাহলে এখানে তুমি থাকবে না?”, ঈষৎ আহত স্বরেই বলল মনু।

সীমাদেবী ছেলের মেঘাচ্ছন্ন মুখের দিকে চেয়ে মনে মনে একটু বিব্রত বোধ করলেন। তাঁর আদরের মনু এত বড় বাড়ি করেছে। দোতলায় বাগানঘেঁষা খোলামেলা বড় ঘরটি তাঁর প্রয়োজনের কথা মনে রেখেই বিশেষভাবে তৈরি। অ্যাটাচ টয়লেট। সাথে সাদা মার্বেলমোড়া ঠাকুরঘর। দক্ষিণে লম্বাটে প্রশস্ত ব্যালকনি। তাঁর অজ পাড়াগাঁয়ের টিনের চালওলা পুরনো ভিটের চেয়ে অনেক আরামের।

সীমাদেবী মনে মনে একটু অসোয়াস্তি বোধ করতে থাকেন। কীভাবে যে বলবেন ওকে কথাটা! কুটোটি নাড়তে হয় না এখানে। বৌমাও যত্ন করে যথেষ্ট। তবু এত সুখে থেকেও মনে কোনও স্বস্তি নেই তাঁর। থেকে থেকেই মন পালাই পালাই করছে।

“ আমার না এখানে মন লাগছে না রে! কেন লাগছে না তাও ঠিক বলতে পারি না। অসুবিধে তো কিছুমাত্র নেই। তবুও মনকেমন করছে বড়। আমাকে বাড়ি দিয়ে আয় বাবা!”, সীমাদেবীর কাতর স্বরে ব্যাকুলতা উথলে ওঠে। 

********

কাঠের নড়বড়ে গেট ঠেলে জনশূন্য বাড়িটায় ঢুকলেন সীমাদেবী। থোকা থোকা গোলাপী মাধবীলতায় ছেয়ে আছে বারান্দার গ্রীল। মনটা নিমেষে হালকা হয়ে গেল তাঁর। তৃপ্ত মুখে বাড়ির সামনের একচিলতে মাটিতে সামান্য যত্নে বেড়ে ওঠা জবা টগর দোপাটী নয়নতারায় ঝলমল করতে থাকা সাদামাটা বাড়িখানা দু’চোখ ভরে দেখতে থাকেন সীমাদেবী। নাঃ! কোনও রাজপ্রাসাদে নয়, তাঁর প্রাণভোমরাটি লুকিয়ে রয়েছে এই মাটিতেই। সংসারের একেবারে শুরুর দিকের দুঃখের দিনে একা হাতে গড়া এই বাড়িই তাঁর আত্মা। আত্মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কি কেউ বাঁচতে পারে? এটা মনুকে বোঝাতে পারবেন না তিনি। কিছু উপলব্ধি বড়ই একান্ত। ও ওর মতো সুখে থাক, তাঁর সুখ এখানেই। তাঁর বার্ধক্যের বারাণসী, তাঁর স্বর্গ, তাঁর সাধের বাড়িই।  


 


মনের ডাক্তার 

প্রদীপ মুখুটী


একসময় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রচলন অনেক বাড়িতেই ছিল বই পড়ো আর অলিখিত ডাক্তার হয়ে যাও তেমনি আমার বাবুও বই পড়া ডাক্তার ছিলেন ঘরে ঠাকুমা ছাড়া কম-বেশি আমরা সবাই হোমিওপ্যাথিকের মিষ্টি ডানার ওষুধ খেতাম মাঝে মাঝে পাড়ার রোগীরা দরজায় কড়া নাড়ত দু-একটা ওষুধের নাম আমিও জানতামথুজা, আরনিকা

মনে মনে ভাবতাম, হয়তো আমিও পারবো ছোট ডাক্তার হতে

সেদিন স্কুল থেকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরেছি স্কুল ব্যাগ রাখতে গিয়ে দেখি, ঠাম্মা শুয়ে আছে

ঠাম্মা, তোমার আবার কী হলো?

হরিরটা ভালো নাই রে ভাই, জ্বর-জ্বর লাগতাসে

গায়ে হাত দিয়েই বুঝলাম জ্বরটা কতো হাত-পা না ধুয়েই সোজা বাবুর ঘরে গিয়ে কয়েকটা মিষ্টি দানা নিজে মুখে পুরে দিয়ে কয়েকটা দানার পুরিয়া বানিয়ে বললাম

ঠাম্মা, তোমার ওষুধ এনেছি হা করো

হা করতেই সবকটা ঢেলে দিলাম মুখে

চুপ করে শুয়ে থাকো

স্কুলফেরৎ কাজ সেরে আবার গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম

ঠাম্মা, এখন কেমন আছো?

হ্যাঁ ভাই, একটু ভালো বোধ করতাসি

বুঝলাম, আমি মনের ডাক্তার হয়ে গেছি!


 

সম্পূর্ণা
স্মিতা আদক 

এই নিয়ে সম্ভবত বারো জন.... প্রতিবার ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসে সেই পরিচিত উত্তর 'না'; সে সরাসরি হোক বা ইঙ্গিতে। 


সবার হাতেই যেন অদৃশ্য বেড়ি.... ইংরাজীর অধ্যাপিকা তটিনী মৃদু হেসে মনে মনে ভাবে, না এ তার সাগর নয়; তটিনীর একাকী জীবনে দু-দিনের অতিথি হয়ে যারা আসতে চেয়েছে, তাদের অনেকেরই ধারণা- এবারেও মেয়েটিকে তারাই রিজেক্ট করেছে। 


"আজকাল ভালো মেয়ে পাওয়া বড়ই দুষ্কর"- কথাটা মাঝে মাঝে তীরের মতো বিঁধে তটিনীর কানে। সমাজের চোখে আদ্যিকালের 'ভালো মেয়ে'-এর সংজ্ঞাটা আজ সময়ের কষ্টিপাথরে ঘষা লেগে  ক্রমে বদলাতে শুরু করেছে।


শিক্ষিতা, স্বনির্ভর তটিনী মৃদু হেসে স্বগতোক্তি করে, "অন্ধত্বের রঙিন চশমা চোখে এঁটে সমাজ আজও মানতে পারে না, মেয়েরাও হয়ে উঠতে পারে দুষ্প্রাপ্য হীরের মতোই সম্পূর্ণা।"


 

চিরকুট
ড: ঐশিকা চক্রবর্তী

বিয়ের কুড়িবছর পরেও প্রতিদিন সকালে অভিমন্যু অফিস বেরোনোর আগে ফ্রিজের ম্যাগনেটে একটা ছোট্ট চিরকুট রেখে যেত। কখনও তাতে লেখা থাকত, “আজ বৃষ্টি নামতে পারে, ছাতা নিও।”

 -“চায়ে চিনি একটু কম খেও।”
 আবার কখনও, “তোমাকে কাল রাতে খুব সুন্দর লাগছিল, প্রিয়।”

মেখলা চিরকুটগুলো ফেলে না দিয়ে কাঠের একটা হাতবাক্সে যত্ন করে জমিয়ে রাখত। ভালোবাসা যে বিয়ের পরে ফুরোয় না, তারই জলজ্যান্ত প্রমাণ ছিল যেন সেগুলো।

কিন্তু এক বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে এক দুর্ঘটনায় অভিমন্যু চলে গেল। তারপরের কয়েকটা মাস ঘরটা শব্দহীন হয়ে রইল। দিন কেটে যেত, অথচ মেখলার কাছে সময় যেন স্থাণুবৎ হয়ে থাকত।

ঠিক তখনই অদ্ভুত ঘটনা শুরু হলো। প্রতিদিন সকালে আবারও নতুন চিরকুট পাওয়া যেতে লাগল।

“প্রেশারের ওষুধটা খেতে ভুলো না।”

“জানালার গাছগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে জল।দিও।”

“একা একা কাঁদবে না।”

ভয়, বিস্ময় আর ভালোবাসা খেলে গেল মেখলার মনে। অবশেষে একদিন ভোরের আগে উঠে অপেক্ষা করতে লাগল সে।
অন্ধকারের চাদর সরে যেতেই সে দেখল, তাদের সতেরো বছরের ছেলে ঋতম নিঃশব্দে এসে একটা চিরকুট রেখে গেল টেবিলে।

পরে কাগজটা খুলে মেখলা পড়ল,

“বাবার হাতের লেখা নকল করতে পারি না, মা। কিন্তু জানি, মানুষ চলে গেলেও ভালোবাসাটা থেকেই যায়। শুধু যত্ন নেওয়ার দায়িত্বটা সে অন্য কারও হাতে তুলে দিয়ে যায়।”


 

এই তো জীবন !

রাজর্ষি দত্ত

 

ভারত পাকিস্তান সীমান্ত।  

ভূপৃষ্ঠ থেকে কয়েক হাজার ফিট উপরে আপাত সমতল দুটি ভূখণ্ড। দুটি দেশের। মাঝখানে একটি আঠারো ফুট চওড়া পাথুরে স্রোতস্বিনী দিয়ে সদা বহমান তুষারগলা জল।

দু'পাশের জমিতেই রয়েছে আর্মি ক্যাম্প। সৈন্যদের অহরহ ও সতর্ক আনাগোনা। আর দুদিক থেকেই সোজা মেশিনগান তাক করা প্রতিপক্ষের দিকে। হাত ট্রিগারে। ট্রিগারে চাপ পড়বে চি কমান্ডারের অর্ডার এলেই। ততক্ষণ দুটি নল মুখোমুখি উঁচিয়ে।

এইভাবে কেটে যায় ঋতু... দুপক্ষের সৈন্যদের কাঁটার মুকুটে পড়ে বরফ পেছলান রোদ। জংলা রঙের জামার পিঠে ভিজে যায় দৈনিক প্রশিক্ষণ শেষে।   হিমেল হওয়ায় ফেটে যায় গালের চামড়া। বিবি-বাচ্চার কল্পনায় ঠোঁট চওড়া হয় হাসিতে ক্যাম্প থেকে উর্দু গজল, বিরিয়ানির গন্ধ ভেসে আসে কখনও বা লখনউ কাবাবের চলে নামাজ ও শিববন্দনা দুইই। এদিকের নিরাপত্তারক্ষীরা, ওদিকের সাথে মাঝে মাঝে গলা উঁচিয়ে ভালোমন্দ কথা বলেহোক না যতই শত্রুপক্ষসবকিছুই হতে থাকে জীবনের সব স্বাভাবিক নিয়মে      

তার মধ্যে মেশিনগানের কালো নল পরস্পরকে লক্ষ্য করে থাকে অপলক ভাবে। দিন-রাত, ঝড়-বৃষ্টি, তুষারপাতে। এ যেন মৃত্যুর কালদৃষ্টি, শুধু উপরওয়ালার হুকুমের প্রতীক্ষায়

মাঝখানে শীতল স্রোতস্বিনী নির্বিকারভাবে বয়ে যায় জীবনের ছন্দে।


 

স্পর্শ 

অনিতা নাগ

শ্বশুরবাড়ীতে বড়জায়ের খাটে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে ছিলো সদ্য বিয়ে হয়ে আসা এ’ বাড়ীর নতুন বউটি। পরনের শাড়ি সামলে, কান্না চাপতে চাপতে একসময়ে সে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। হঠাৎ এক স্পর্শে সে থরথরিয়ে জেগে উঠলো। অবাক চোখে দেখলো তার স্বামীর হাতখানা তার মাথার উপর। সেই স্পর্শে কি অপূর্ব এক নির্ভরতা, এক ভরসা। মেয়েটির দু’চোখ দিয়ে দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। বহু ঝড় পেরিয়ে তাদের এক হওয়া। কিন্তু বিয়ের ক'দিন আগে থেকেই মনের মধ্যে উথাল পাথাল। তার এতদিনে চেনা জগৎটা ছেড়ে তাকে চলে যেতে হবে। তার এই পৃথিবীটা আর তার থাকবে না। যে বাড়ীতে বধু হয়ে এসেছে আজ, সে বাড়ির প্রত্যেকেই তার পরিচিত। সেই পরিচিত পরিবারে সে এসেছে এক নতুন পরিচয় নিয়ে, এক নতুন দায়িত্ব নিয়ে। সে এ’ বাড়ীর ছোট বৌ। অজানা সেই যাত্রাপথের শুরুতে এই স্পর্শটুকু তাকে নতুন করে ভরসা যোগালো। এক আকাশ তারাদের মাঝে ধ্রুবতারা যেমন স্বতন্ত্র, তেমনি এই স্পর্শটুকু তার জীবনের এক পরম পাওয়া।


 

শৈশবের মহিমা
    অঙ্কিত বিশ্বাস

বীরেন্দ্র মানে বীরেন্দ্র মল্লিকের কথাই আজ বলবো। তার মতো সখের গোয়েন্দা আর দুটো হয়না। অদ্ভুত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও অগণিত বুদ্ধি তাকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। ছেলেবেলা থেকেই তার এই অদ্ভুত ক্ষমতা প্রকাশ পেতে থাকে, বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে। বীরেন্দ্র তখন ক্লাস সিক্সে পড়ে, বারো বৎসর বয়স। স্কুলে পূজোর ছুটি চলছে। আর সেই উপলক্ষ্যেই বীরেন্দ্র বেড়াতে এসেছিল তার পিসির বাড়ি। সাথে এসেছিল তার কাকা সুভোময় মল্লিক। পিসির বাড়ি প্রত্যন্ত গ্রাম্য এলাকায়, জায়গাটার নাম গোকর্নপুর। পিসির বাড়িতে পিসি, পিসেমশাই ছাড়া আছে তাদের দেড় বছরের মেয়ে নয়নতারা, সংক্ষেপে নয়ন। পিসির বাড়িতে বীরেন্দ্র কোনো খেলার বা ঘোরার সঙ্গী ছিলনা। পিসির বাড়ি থেকে একটু দূরে সুজয় নামে একটা ছেলে থাকত। তার বয়স এগারো বছর। তাই পিসির বাড়িতে বীরেন্দ্রর একমাত্র সঙ্গী ও বন্ধু ছিল সুজয়।
সে বার পিসির বাড়ি গিয়েই সামান্য কিছু জলযোগ করেই সুজয়দের বাড়ি চলে গেল। সুজয় তাকে দেখে বেজায় খুশি, বীরেন্দ্রকে জড়িয়ে ধরে বলল, - “আরে কবে এলি?”
বীরেন্দ্র- “এইতো একটু আগে। তোকে না দেখে আর থাকতে পারছিলাম না, তাই তাড়াতাড়ি করে চলে এলাম”
সুজয়- “চল ভেতর চল, তারপর তোকে এদিক ওদিকথেকে একটু ঘুরিয়ে আনবো।”
সুজয়ের মা বীরেন্দ্রকে বাড়ি বানানো সন্দেশ খেতে দিল। বীরেন্দ্র খেয়ে বলল- “কাকিমা তোমার জবাব নেই”
যাওয়ার আগে সুজয়কে বলে গেল “সুজয়, এই গরমের মধ্যে আর বেরাবো না, বিকালে না হয় এসে তোর সাথে ঘুরবো।”
সুজয় - “মনে করে আসিস কিন্তু!”
দুপুরে বীরেন্দ্র খেল শুক্তো, মুড়িঘণ্ট ডাল, কুমড়োর ঘণ্ট, চাটনি, দই এইসব।
খেতে খেতে পিসি বলল - “বীরেন্দ্র তুই নিশ্চয়ই ভাবচিস না; পিসি মাংস খাওয়ালো না কেন? আরে অতো দূর থেকে এই গরমে এসেছিস মাংস খেলে শরীর কড়া হয়ে যাবে, তোর পিসেরও আবার একটু মিটিং ছিল।”
বীরেন্দ্র – "আরে, তোমার হাতের শুক্তোই সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে আমার।"
বিকেলের দিকে বীরেন্দ্র গেল সুজয়দের বাড়ি, কিন্তু আশ্চর্য সকালে যে দেখে গেছে একদম পরিপাটি ঘর কিন্তু এখন ঘরের চেয়ার টেবিল অগোছালো, দু-একটা আবার বাইরে উঠোনে বের করে রাখা। কিছু ক্ষন আগে তে বাদে সুজয় গোমড়া মুখে বেরিয়ে এল। বীরেন্দ্র তাকে বলল-“ব্যাপার কী বলতো?”
সুজয় – “আরে! আর বলিসনা, আমার বাবা চার লাখ টাকা খুঁজে পাচ্ছি না, বহুত চিন্তায় আছি রে, অতো গুলো টাকা কি অদৃশ্য হয়ে যাবে।”
বীরেন্দ্র – “টাকা রাখা ছিল কোথায়?”
সুজয় – “আরে! আজ আমার বাবার একটা জমি কেনার কথা ছিল, তাই চার লাখ টাকা গুছিয়ে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভালো করে মুড়ে আমার ঘরের টেবিলের উপর রেখে দিয়েছিল। তার পর তাড়া হুড়ো করে মিটিং-এ চলে গেল, আমার বাবা আবার একটু রাজনীতি-টাজনীতি করে তো, তাই।”
বীরেন্দ্রঃ - “তোর ঘরে রেখেছিল কেন অতো টাকা, তার পর আবার জানলার সিকগুলো-র ফাঁকা বড়ো বড়ো।”
সুজয়ঃ – “আসলে বাবা অতো গুলো টাকা একসাথে দেখিয়ে আমাকে বলতে চেয়েছিল বাপো কোনো ভালো চাকরি করলে প্রতি মাসে এর থেকে বেশি টাকা ইনকাম করা যায়।”
বীরেন্দ্রঃ “তোর বাবা যে মিটিং-এ গিয়েছিল আমার পিসে ও সেখানে গিয়েছিল-এইতো একটু আগে ফিরলো। তোর বাবা বোধহয় খুব ঘামখেয়ালি ও বন্ধুবৎসল মানুষ - নারে? ”
সুজয়- “আরে হ্যাঁ, সেটাই তো সমস্যা। অতো দিলখোলা মানুষেরই এই সমস্ত হয়। যে জমি বিক্রি করবে, সে ফোন করে জানায় যে ‘আসছি’ তার পর থেকেই বাবা টাকা পাচ্ছে না। আমার আবার আজকে ক্রিকেট প্র্যাকটিস থাকে। আমিও মিটিং এর ওই কয় ঘন্টা বাড়ি ছিলাম না।”
বীরেন্দ্র -“আচ্ছা তুই তোর বাবার কাছে শোন-তো যখন বিক্রিওয়ালা তাকে ফোন করল তখন সে কোথায় ছিল?”
কিছুক্ষণ পর সুজয় ফিরে এল বীরেন্দ্রকে বলল-“স্টেশন থেকেই বাবাকে ফোন করেছিল, ট্রেনের আওয়াজ, মানুষের কথা বার্তা মোবাইলে শোনা যাচ্ছিলো। তাকে অবশ্য ফোন করে, পরে আসতে বলে দেওয়া হয়েছে।”
বীরেন্দ্র- “এই টাকার কথা কে কে জানে?”
সুজয়- “আমি আর মা। বোন তো কিছুই বোঝে না, আর যারা সকালে বাবার সঙ্গে দেখা করল ..., অনুপ কাকা, সঞ্জু কাকা আর পার্থ কাকা এরা জানতে পারে।”
বীরেন্দ্র- “তোর মা তখন বাড়ি ছিল না?”
সুজয় - “মা তো রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিল, কিছুইতো দেখতে পায়নি”
বীরেন্দ্র - “তোর বোন?”
সুজয় - “ও বারান্দায় বসে খেলছিল।”
বীরেন্দ্র - “ আর নয় সন্ধ্যে হয়ে এল, এবার বাড়ি যাই, কাল একটু সকাল সকাল আসবো বুঝলি। তোর বাবা ও তো মনে হয় কাল পুলিশকে খবর দেবে। দেখি পুলিশের আসার আগে কদ্দুর কী করা যায়।”
সুজয় - “তুই কি পারবি অতো গুলো টাকা খুঁজে আনতে?”
বীরেন্দ্র - “দেখি চেষ্টা তো করব। এ সুজয় আজ আসি বড্ড দেরি হয়ে গেল”
এরই মধ্যে বলা হয়নি সুজয়ের একটা ছোটো বোন আছে, নাম স্বর্ণলতা দুই বছর বয়স।
পরদিন বীরেন্দ্র সাড়ে দুটো র সময় সুজয়দের বাড়ি পৌঁছাল। সুজয় মনমরা হয়ে বসেছিল। বীরেন্দ্র বলল - “তোদের বারান্দার থেকে তো তোর ঘর সম্পূর্ণ দেখা যায়, না?”
সুজয় - “হ্যাঁ, সম্পূর্ণই যেখানে টাকা ছিল তাইতো”
বীরেন্দ্র - “আচ্ছা! তোর বোনের সাথে একবার কথা বলব। উঠেছে ঘুম থেকে?”
সুজয় - “দাঁত মাজছে।”
বীরেন্দ্র - “তাহলে আধ ঘন্টা পরে ডাকিস। চল তোর বাড়ি সামনে রাস্তার ওপারে বাগানটা থেকে ঘুরে আসি”
বীরেন্দ্র বাগানে গিয়ে আশ্চর্য জিনিস লক্ষ্য করল, “বাগানে দাঁড়িয়ে যদি কেউ সুজয়ের ঘরের মধ্যে নজর দিতে চায় তবে গাছের আড়ালে থেকে তা অনায়াসেই পারা যাবে। জানলা খোলা থাকলে তো কোনো কথাই নেই।”
বীরেন্দ্র মুচকি হেসে বলল - “বুঝলি?”
সুজয় ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বলল- “এবার ওই জানলা বন্ধ করে রাখবো”
বীরেন্দ্র সুজয়দের বাড়ি গিয়ে সোজা তে স্বর্ণলতাকে ধরল তাকে বলল – “স্বর্ণ ভালো আছো?”
স্বর্ণলতা - “হ্যাঁ”
বীরেন্দ্র- “তুমি আগের দিন বারান্দায় বসে কী খেলছিলে?”
স্বর্ণলতা- “নান্নাবাতি”
বীরেন্দ্র – “তুমি তখন দাদার ঘরের ওই জানলায় কিছু দেখ নি?”
স্বর্ণলতা - “নাতি, নাতি বলো নাতি দেখছি”
সুজয় বলল- “এ বীরেন্দ্র - একী বলে?
বীরেন্দ্র – “ঠিক কথাই বলছে। ও বলতে চাইছে লাঠি বড়ো লাঠি। তোদের বাড়ির পেছনে বড়ো জঙ্গল থেকে একটু ঘুরে আসি চল। হয়তো কিছু পেতে পারি।”
বীরেন্দ্র, সুজয়কে জোর পূর্বক নিয়ে গেল কারন সুজয়ের মতে সেখানে ভূত প্রেত থাকে।
কিছু দূর গিয়ে তারা দেখতে পেল একটা ছোটো বাঁশের লথায় ইঁদুর ধরা আঠা লাগানো একপ্রকার জিনিস। বইয়ের মতো দেখতে। এক পাশে আঠা লাগানো থাকে। বইয়ের মতো আঠা লাগানো পাশটা ওপরের রেখে খুললে, ইঁদুর তার মধ্যে আটকে পড়ে। আনন্দে বীরেন্দ্র লাফিয়ে উঠে বলল – “তোর বাবা গোলাপি ব্যাগে টাকা রেখেছিল না? ওই দেখ গোলাপি প্লাস্টিকের টুকরো লাগানো রয়েছে।”
সুজয় বিস্ময়ের ধাক্কা সামলাতে সামলাতে বলল- “তাইতো ..... কিন্তু পুলিশকে এটা বললে তারা হয়তো খুঁজে বার করতে পারবে কিন্তু তুই পারবি কী করে?”
বীরেন্দ্র- “পুলিশকে অবশ্যই বলবো কিন্তু তার আগে বল তোরা কোন মুদি দোকান থেকে জিনিস পত্র কিনিস?”
সুজয়- “মুদি দোকান আছে বেশ কয়েকটাই কিন্তু তার মধ্যে ভালো আর বড়ো দোকান হচ্ছে হারু কাকার দোকান”
বীরেন্দ্র- “চল সেখানে।”
দোকানে গিয়ে সুজয় দোকানদারকে বলল – “কাকু সকালে কি কেউ তোমার দোকান থেকে ইঁদুর ধরা আঠা নিয়েছে।”
দোকানদার মাথা চুলকে বলল – “হ্যাঁ। কী যেন নাম ছেলেটার ... হ্যাঁ হ্যাঁ অনুপ, অনুপ নিয়েছে।”
দুজনই বাড়ি গিয়ে দেখল ইতিমধ্যে পুলিশ এসেছে তবে বেশি না মাত্র দুই জন। বীরেন্দ্র তখন পুরো ঘটনাটা সুজয়ের বাবাকে বুঝিয়ে দিল ও বলল – “কাকু তুমি একটা পুলিশ নিয়ে অনুপদের বাড়িতে ধাওয়া দেও”
তার পর বীরেন্দ্র বিষন্ন চিত্তে প্রফুল্ল চিত্তে বাড়ি ফিরে এল।
সন্ধ্যের সময় সুজয় বীরেন্দ্র-র পিসির বাড়িতে গেল। বলল - “ওই শয়তান অনুপটাই টাকা নিয়েছিল। বাবা সব টাকা ফেরত পেয়ে গিয়েছে। আজ তুই না থাকলে অনেক হাঙ্গামা হত, তাই বাবা তোকে একটা সামান্য পুরষ্কার দিতে চায় এই নে”
বলে সুজয় তার হাতে থাকা ব্যাগটা বীরেন্দ্রর দিকে এগিয়ে। বীরেন্দ্র খুলে দেখল তার মধ্যে টাইটানের একটা ঘড়ি!


 

বেলজিয়াম এর অটোমিয়াম
রণিতা দত্ত

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ১৯৫৮, বেলজিয়াম।এক্সপো। এই মেলায় প্যাভেলিয়ান আর সিম্বল হিসেবে তৈরী হলো অটোমিয়াম।একটি লৌহের ক্রিস্টালের ১৬৫ বিলিয়ন গুণ বেশি কিন্তু অবিকল ৯টি অটোম দিয়ে লৌহের ক্রিস্টালের স্ট্রাকচার। দৈত্যাকৃতির এই আধুনিক স্থাপত্য ১০২মিটার (৩৩৫ফুট )লম্বা। সে ব্রেসেলসের সর্বোচ্চ নির্মাণ।

দূর থেকে দেখেছিলাম অনেক আলোক মালা। সেন্ট লুক হসপিটালের কাঁচের জানলা দিয়ে। ওটা কি সে জানতে চাইবার সময় সেটা ছিলনা বটে, তবে নীড় ছেড়ে নীল আকাশে উড়তে শিখলে পাখির ছানারা কেমন যেন অকুতভয় হয় বুঝলাম। ওই টেনশন। তারমধ্যে মেয়ে বলল, "অটোমিয়াম ওটা। তোমাকে দেখিয়ে আনবো। " আমি মনে বললাম, "সামলে নে আগে, পরে কি দেখি আর দেখিনা দেখবোক্ষণ। "


একদিন বিকেলে প্যামে নতুন মানুষটাকে নিয়ে গেলাম অটোমিয়াম গ্রাউন্ডে। এতো টুরিস্ট যে গাড়ির পার্কিং পাওয়া মুশকিল। যাইহোক, ঘাড়-মাথা একিয়ে বেঁকিয়ে,এ কাত, ও কাত করে আমি তো দেখতে ব্যস্ত। সে কি যে সে কথা! নয়টি ১৮ মিটার ব্যাসের স্টেনলেস স্টিলের বল পরস্পর সংযুক্ত। এই বল দেখলে বোঝা যায় এগুলো এক একটা এটমকে বোঝাচ্ছে। প্রতিটি বল এর মাঝে আছে মিউজিয়াম। এস্কেলেটরে যাওয়ার ব্যবস্থা। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের ওপর অনেক তথ্য, মডেল ডিসপ্লে আছে। একটি রেস্টুরেন্টও আছে। আছে সুন্দর পার্ক। ওখানে উঠে ব্রেসেলস শহরকে ভারি সুন্দর লাগে। জানলাম "অটো" এটম থেকে আর অ্যালুমিনিয়াম থেকে "মিয়াম" শব্দ দুটো জুড়ে অটোমিয়াম। অ্যালুমিনিয়াম কেন? প্রশ্ন থাকে। অ্যালুমিনিয়াম হলো ভূ পৃষ্টের সিয়াল স্তর সৃষ্টির মূল উপাদান। 

যুদ্ধোত্তর পৃথিবী বিশেষত ইউরোপ। বেলজিয়াম কিন্তু আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল দু দুটি বিশ্বযুদ্ধেই নিরপেক্ষ থাকার। বেচারাকে থাকতে দেওয়া হয়নি। সে অন্য প্রসঙ্গ, অন্য দিন। আজকে বলি অটোমিয়ামের বার্তা। বেলজিয়ামের উপনিবেশ কঙ্গো। সেই কঙ্গো ইউরেনিয়মের প্রাচুর্য্য ভরা। তবু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে বেলজিয়াম। অটোমিয়াম এই ইঙ্গিত দেয় যে বিজ্ঞানের উন্নতি, আবিষ্কার,প্রজ্ঞা আজথেকে মানবজাতির কল্যাণে শুধু হিতসাধনে অনুগামী হবে। পৃথিবী তো আজও হিংসায় মত্ত। বিশ্ব জুড়ে চলমান সংঘাত।



ইউরোপে ইউক্রেন-রাশিয়া,মধ্য প্রাচ্যে ইজরাইল প্যালেস্টাইন, ইরান ইরাক, আফ্রিকার ছোট ছোট দেশে গৃহযুদ্ধ, এশিয়ার মায়ানমার,বাংলাদেশ, ভারত পাকিস্তান সীমান্তে, আফগানিস্তান প্রায় গোটা পৃথিবী রণাঙ্গন। যুক্তরাষ্ট্রের নিজের হাতেই আছে তিন হাজার ৭৫০টি নিউক্লিয়ার বোমা। এ অবস্থায় নিউক্লিয়ার নিরস্ত্রীকরণের কথা শুনতেই পারছে না রাশিয়া, চীন ও ইরান, ভারত।এশিয়ার নিরাপত্তা মানচিত্রে একটা বড় পরিবর্তন আসন্ন বলেই তাদের এত আয়োজন। সংখ্যায় কম হলেও ভারত, পাকিস্তানের হাতেও আছে পরমাণু বোমা। তবে আতঙ্কটা মূলত বোমার সংখ্যা নিয়ে নয়। আতঙ্ক বোমার সুইচ যাদের হাতে, সেই ক্ষমতাবান রাজনীতিকদের নিয়ে।

সব ঘুরে যখন অটোরিয়াম থেকে নেমে আসছি তখন সন্ধ্যে ঘনিয়েছে। আলোয় ঝলমল চারিদিক,সঙ্গে আমার আগামী প্রজন্ম। ওর জন্য অক্ষত পৃথিবী আমি চাই। ঠান্ডা বাতাস বইছে। মনে হলো চিৎকার করে আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বলি, "অটোমিয়াম তুমি শান্তির বার্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাক এই শান্তিপ্ৰিয় দেশটির বুকে। চেষ্টা চলুক বিজ্ঞানকে শান্তির সপক্ষে ব্যবহারের। শান্তি আসুক বিশ্বে।"

(ছবি- লেখক) 


 

লাল সোয়েটার আর প্রথম পাহাড়

শ্রীমতী রীনা


 

আমি বেড়াতে খুবই কম গিয়েছি। তবুও বেড়ালের ভাগে শিকে ছেঁড়ার মতো। কখনও কখনও বেড়াতে গিয়েছি। আমার প্রথম বেড়ানো কলকাতা থেকে দার্জিলিং। আর সান রাইজ। আর ভোরের জিপে চেপে। আর সালটা ছিল ১৯৮০ সাল। একটা দল গড়ে উঠেছিল হথাতই। আমাকে তারা কেন যে নিয়েছিল আজ আর মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে ওদের কাছে আমি ছিলাম ছোট বোন। তাই আমাকেও নিয়েছিল। আমরা উদ্বাস্তু পরিবার। আমাদের দুবেলা দুমুঠো জোটে না, তাতে আবার বেড়ানো? আমাদের যত বেড়ানো ছিল আমাদের মনে মনে, আর বড় জোর স্বপ্নে। সেইদিনগুলো খুবই খুশিতে কাটত, যেদিন বেড়াতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। ের আসল কারণটা অনেক পরে বুঝেছি। আমাদের ভূগোলের বই, স্কুলের বন্ধুদের গল্পে আমাদের মধ্যে একটা স্বপ্নের শেকড় পুঁতে দিত।  তাই, ১৯৮০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে আমাকে প্রথমবার বেড়াতে যেতে।

 

বছর পরে ভাবলে মনে হয়, সেই বেড়ানোটা আসলে শুধু দার্জিলিং যাওয়া ছিল না। ওটা ছিল আমার নিজের পৃথিবীর প্রথম দরজা খুলে যাওয়া। তার আগে পৃথিবী বলতে আমার কাছে ছিল আমাদের ঘর, পাড়া, স্কুল, স্কুলের মাঠ, বইয়ের পাতা আর মানুষের মুখ। ভূগোলের বইয়ে পাহাড় ছিল—নীলচে, দূরের, ছবির মতো। মানচিত্রে দার্জিলিং ছিল একটা নাম। আর সেই নামের পাশে লেখা থাকত পাহাড়, চা-বাগান, কাঞ্চনজঙ্ঘা, টাইগার হিল। সেই সব হঠাৎ সত্যি হয়ে গেল। সেটা ছিল শীতের ছুটি। ২৫ ডিসেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি। বড়দিনের ছুটি।


আমাদের শহরতলিতে তখন শীত মানে কুয়াশা, সকালের ঠান্ডা, গায়ে সোয়েটার, আর রাস্তায় বড়দিনের আলোর রেশ। কিন্তু পাহাড়ে যে শীত কাকে বলে, তখনও জানতাম না। আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম আমার এক দিদির সঙ্গে। দিদির ছেলেমেয়েরা প্রায় আমরাই বয়সী। ওদের আমাদের মতো আর্থিক দুরবস্থা ছিল না তখন। ওদের সঙ্গে বাবা আমাকে পাথিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বেড়াতে যাওয়ায় আর সব ভাইবোনদের স্যাক্রিফাইস ছিল। ওদের ভাগের বেড়ানোটা আমি বেড়াতে বেড়াতে পেয়েছিলাম।

আমার কাছে তখন শীত মানেই শুধু সেই লাল সোয়েটার নয়—অন্যরকম একটা পৃথিবী। পৌঁছনোর পরই যেন অন্য পৃথিবীর শুরু।


 

একটা সপ্তাহ


আজ ভাবলে অবাক লাগে—মাত্র সাত দিন। কিন্তু সেই সাত দিনের মধ্যে যেন কতগুলো আলাদা আলাদা পৃথিবী ছিল। আর আমার মনে হয়, আমরা যে সময়টায় গিয়েছিলাম, সেটাও দার্জিলিংকে অন্যরকম করে তুলেছিল। শীতের দার্জিলিং


এখনকার মতো এত হোটেল, এত গাড়ি, এত পর্যটকের ভিড়, এত দোকানের ঝলমলানি তখন ছিল না—অন্তত আমার চোখে পড়েনি। দার্জিলিং এখনও একটা ছোট পাহাড়ি শহরের মতোই ছিল। তার নিজস্ব একটা গতি ছিল। কলকাতার মতো তাড়াহুড়ো ছিল না। পাহাড়ের রাস্তা ধরে মানুষ হাঁটছে, দোকান খুলছে, সন্ধে নামছে—সবকিছু যেন একটু ধীরে ধীরে ঘটছে। চৌরাস্তা বা ম্যাল তখনও শহরের প্রাণকেন্দ্র। চার দিকের রাস্তা এসে সেখানে মিলেছে। পাহাড়ের ওপর একটা খোলা জায়গা, যেখানে দাঁড়িয়ে থাকা যায়, বসে থাকা যায়, মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকা যায়


আমাদের থাকার হোটেলের নাম আজ আর মনে নেই, কিন্তু হোটেলের মানুষগুলোর ব্যবহার মনে আছে। সেই সময়ের ছোট পাহাড়ি হোটেলগুলোর মধ্যে একটা ঘরোয়া ব্যাপার ছিল। আজকের মতো রিসেপশনের কাচঘেরা কাউন্টার, কার্ড, কম্পিউটার, এতসব আনুষ্ঠানিকতা নয়। অতিথি মানে যেন সত্যিই অতিথি। কে কোথা থেকে এসেছে, কতদিন থাকবে, কার শরীর কেমন, সকালে চা কখন লাগবে—এসব কথা হোটেলের লোকজন জানত। আমাকে গপ্প বলতে চেয়েছিল সেখানের এক দিদা, পাহাড়ি-দিদা। আমি হিন্দি কিছু বুঝি, কিন্তু ওদের মাতৃভাষা অন্য কিছু। তাই বুঝিনি, কিন্তু হাবভাবে বুঝেছি যে ঐ দিদার এক নাতনি আছে। আমারই মতো। সে শহরে পড়া করে। তারপর, মাসে একবার আসে। ছুটিতে সে এসেছে। আমার সঙ্গে তার ইংরেজিতে কথা হবে। সে পড়া শেষ করে নার্স হবে। 

 

ওদিকে বড়দের দলের সঙ্গে হোটেলের বসা আরও লোকেদের কথা হচ্ছে। আমরা কলকাতা থেকে এসেছি শুনলেই যেন একটা আলাদা পরিচয় তৈরি হয়ে যেত

 

কাল টাইগার হিল যাবেন?”

 

খুব ভোরে বেরোতে হবে।”

 

গরম কাপড় নেবেন।”

 

বাচ্চাটার জন্য আরও একটা কম্বল লাগবে।

 

এইসব কথার মধ্যে একটা আন্তরিকতা ছিল

 

হোটেলের ঘরেও সেই সময়ের আলাদা গন্ধ। কাঠের দেওয়াল, মোটা পর্দা, ভারী কম্বল, কোথাও কাঠের মেঝে, কোথাও পুরনো আসবাব। দার্জিলিংয়ের পুরনো হোটেল-সংস্কৃতির মধ্যে অতিথিকে ব্যক্তিগত যত্নে রাখার একটা দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। আমার কাছে অবশ্য হোটেল মানে ছিল আরও সহজ একটা ব্যাপার—বাড়ির বাইরে নিজের বিছানা, জানলার বাইরে পাহাড়, আর সকালে ঘুম ভাঙলেই অন্য একটা আকাশ

 

খাওয়া-দাওয়ার কথাও আলাদা করে মনে পড়ে। বেড়াতে গিয়ে খাবারও যেন বেড়ানোরই অংশ হয়ে যায়। বাড়িতে ভাত, ডাল, ডিম, তরকারি—এসবই ছিল আমাদের নিত্যদিনের খাবার। কিন্তু পাহাড়ে বসে সেই একই খাবারও অন্যরকম লাগত। সকালে গরম চা, ঠান্ডার মধ্যে ধোঁয়া ওঠা কাপ হাতে নেওয়া, রুটি বা টোস্ট, ডিম, কখনও গরম গরম পুরি। দুপুরে ভাত, ডাল, তরকারি। রাতে সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া। খাবার খুব রাজকীয় ছিল কি না, আজ আর বলতে পারব না। কিন্তু তখন মনে হত—এর চেয়ে ভালো খাবার আর হয় না। কারণ ক্ষুধার সঙ্গে বেড়ানোর আনন্দ মিশে গিয়েছিল

 

আর ছিল চা। দার্জিলিং গিয়ে চা খাওয়ার একটা আলাদা ব্যাপার আছে। কলকাতায় চা খাই—চা হিসেবেই। কিন্তু পাহাড়ে চা খেতে খেতে মনে হয়, এই চা-ই বুঝি পাহাড়ের একটা অংশ। ঠান্ডা হাওয়া, কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে, দূরে পাহাড়—চায়ের স্বাদও যেন বদলে যায়। তাছাড়া আমি বাড়িতে চা খেতাম না। কারণ গুড় দিয়ে চা আমার ভাল লাগত না।

 



বড়দিনের সময় হওয়ায় শহরের বাজারেও একটা উৎসবের আবহ ছিল। সন্ধে নামলেই আমরা বেরিয়ে পড়তাম। দার্জিলিংয়ের রাত আমার কাছে ছিল একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। কলকাতায় রাত মানে বাড়ি ফেরা, দরজা বন্ধ, খাওয়া, ঘুম। কিন্তু এখানে? রাতেও শহর আছে। টিমটিম আলো জ্বলছে, তারার মতো দূরের ঢালে। রাতেও মানুষ হাঁটে শীতের পোশাকে ঢেকে। দোকানের আলো জ্বলে মৃদু গান বাজে রেডিওতে। কেউ চা খায়, কেউ গরম খাবার বিক্রি করে। কেউ উলের টুপি দেখছে, কেউ মাফলার কিনছে, কেউ শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সব রাস্তাই ঢালের।

আমরাও ঘুরলাম। আমি ছোট বলে হয়তো মাঝে মাঝে কারও হাত ধরে। কখনও ম্যালের দিকে, কখনও বাজারের দিকে, কখনও শুধু পাহাড়ি রাস্তা ধরে। চৌরাস্তা তখন আমার কাছে একটা আশ্চর্য জায়গা। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হত, কত রকম মানুষ! কেউ পর্যটক, কেউ স্থানীয়, কেউ দোকানদার। কোথাও পাহাড়ি মানুষের কথাবার্তা, কোথাও বাংলা, কোথাও হিন্দি, কোথাও অন্য ভাষা। একটা শহরের মধ্যে এতগুলো ভাষা থাকে—সেটাও বোধহয় তখন প্রথম টের পেয়েছিলাম

দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। সবকিছু কিনতে তো পারব না, জানতাম। কিন্তু দেখতে তো পারতাম। উলের টুপি, মাফলার, দস্তানা, কাঠের ছোটখাটো জিনিস, নানা রকম স্মারক। কখনও কোনও জিনিস হাতে নিয়ে আবার রেখে দিয়েছি। কারণ বেড়াতে এসেছি মানেই যে ইচ্ছেমতো কেনাকাটা করা যায়, তা তো নয়। আমাদের বাড়ির হিসেব তখনও আমাদের সঙ্গে ছিল, পাহাড়ে গিয়েও। তবু কোনও কষ্ট লাগেনি। কারণ তখন আমার মনে হত, আমি জিনিসগুলো না কিনেও নিয়ে যেতে পারি— চোখে করে, স্মৃতিতে করে



রাতের দার্জিলিংয়ের একটা বিশেষ নীরবতা ছিল। কলকাতার রাত কখনও পুরো চুপ করে না। দূরে কোথাও বাস, ট্রাম, গাড়ি, মানুষের কথা, কোনও না কোনও শব্দ থাকেই। দার্জিলিংয়ে শব্দ ছিল, কিন্তু তার ফাঁকে ফাঁকে অনেক নীরবতা। দূরে একটা গাড়ি চলে গেল—তারপর চুপ। কেউ রাস্তা দিয়ে কথা বলতে বলতে চলে গেল—তারপর আবার চুপ। কোনও দোকানের শাটার নামল—তারপর আবার পাহাড়, অন্ধকার পাহাড়। সেই নীরবতাও যে একটা জিনিস, সেটাই হয়তো প্রথমবার অনুভব করেছিলাম

 

আর ছিল ভোর। টাইগার হিল যাওয়ার দিনটা আলাদা। আমাদের বলা হয়েছিল, খুব ভোরে বেরোতে হবে—আসলে ভোরেরও আগে। রাত শেষ হয়নি তখনও। ভ্রমণের মূল আকর্ষণই ছিল ভোররাতে জিপে করে গিয়ে কনকনে ঠান্ডায় সূর্যোদয়ের অপেক্ষা এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখরে সূর্যের প্রথম আলোর সোনালি রঙ দেখা। ঘুমের মধ্যে আমাদের ডেকে তোলা হল। কী ভীষণ ঠান্ডা! মনে হচ্ছিল, বিছানা থেকে বেরোনোই অসম্ভব। শরীরে যা গরম কাপড় ছিল, সব পরানো হল—সোয়েটার, মাফলার, টুপি—তবু ঠান্ডা ঢুকছে। বাইরে বেরিয়ে দেখি, আকাশ এখনও কালো


 ৪

আমাদের জন্য জিপ দাঁড়িয়ে। সেই জিপে চেপে আমরা রওনা হলাম। আজও সেই কথা মনে পড়লে মনে হয়, আমরা যেন কোনও গোপন অভিযানে বেরিয়েছি। চারপাশ অন্ধকার। জিপের আলো যতটা যায়, ততটাই রাস্তা দেখা যায়—তারপর শুধু পাহাড়ের অন্ধকার। মাঝে মাঝে অন্য জিপ, কেউ কেউ আমাদের আগেই বেরিয়েছে। সবাই কোথায় যাচ্ছে? সূর্য দেখতে। বিষয়টা এখনও আমার কাছে আশ্চর্য লাগে। সূর্য তো প্রতিদিনই ওঠে—কলকাতায়ও ওঠে, আমাদের বাড়ির ওপরেও ওঠে। কিন্তু সেদিন আমরা সূর্যোদয়কে দেখতে যাচ্ছিলাম

 

টাইগার হিলে পৌঁছে অপেক্ষা। সেই অপেক্ষাটাই আজও আমার কাছে সবচেয়ে বেশি মনে আছে। ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকা, লোকজনের গায়ে কম্বল, কেউ গরম চা খাচ্ছে, কেউ হাত ঘষছে, কেউ বলছে, “আজ দেখা যাবে তো?” কারণ পাহাড়ে সূর্যোদয় দেখতে গিয়ে সূর্য দেখা যাবে কি না, তারও নিশ্চয়তা নেই। মেঘ এসে সব ঢেকে দিতে পারে, কুয়াশা থাকতে পারে, আকাশ পরিষ্কার নাও হতে পারে। সেদিন আমরা অপেক্ষা করছিলাম অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে

 

তারপর খুব ধীরে ধীরে একটা পরিবর্তন শুরু হল। প্রথমে আকাশ কালো থেকে একটু হালকা। কেউ একজন হয়তো বলল—“ওই দেখুন!” সবাই একদিকে তাকাল। আমি দেখলাম, দূরের অন্ধকার পাহাড়গুলোর মাথার ওপর কোথাও একটা ফিকে আলো ফুটছে। তারপর সেই আলো একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ল। আকাশের রং বদলাতে লাগল—কালো, ধূসর, তারপর ফিকে নীল, তার মধ্যে গোলাপি একটা আভা, তারপর আরও উজ্জ্বল

 

আমরা অপেক্ষা করছি কাঞ্চনজঙ্ঘার জন্য। আসলে পাহাড় তখনও পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না, শুধু একটা অন্ধকার বিশালতা। তারপর হঠাৎ করে কোথাও আলো পড়ল—একটা চূড়ায়, তারপর আর একটা। ধীরে ধীরে সাদা বরফের ওপর সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়ল। আমি তখন বুঝতেই পারিনি, ঠিক কী দেখছি। শুধু মনে হচ্ছিল, এতক্ষণ যে পাহাড়টা অন্ধকার ছিল, তার গায়ে কেউ যেন আলো জ্বেলে দিয়েছে

 

তারপর সেই আলো আরও ছড়িয়ে গেল। বরফঢাকা শিখরগুলোর রং বদলাতে লাগল—সাদা থেকে সোনালি, আবার কোথাও গোলাপি। আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ও যেন আমাদের সামনে খুলে যেতে লাগল। সেই মুহূর্তে কেউ কথা বলছিল কি না, আজ মনে নেই, কিন্তু আমার মনে হয়, আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। কারণ এত বড় একটা দৃশ্য দেখার জন্য আমার কোনও ভাষা ছিল না—আজ এত বছর পরেও নেই। শুধু মনে আছে—সেদিন প্রথমবার সূর্যোদয়কে দেখেছিলাম। সূর্য ওঠা তো নয়, পৃথিবীর ওপর আলো আসতে দেখেছিলাম

 

টাইগার হিল থেকে ফেরার পথেও বেড়ানো শেষ হয়নি। পাহাড়ে বেড়ানোর একটা মজা হল, এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাওয়ার পথটাই আর একটা দর্শনীয় স্থান। কোথাও রাস্তার বাঁক, কোথাও পাইনগাছ, কোথাও নিচে মেঘের মতো কুয়াশা, কোথাও পাহাড়ের গায়ে বাড়ি, কোথাও দূরে চা-বাগানের ঢাল, কোথাও এমন একটা জায়গা, যেখানে গাড়ি একটু থামলেই সবাই নেমে দাঁড়ায়। তারপর ছবি

তখনকার ছবি তোলা অবশ্য আজকের মতো ছিল না। একটা ছবি তোলার আগে ভাবতে হত—কতগুলো ছবি তোলা যাবে? ফিল্ম নষ্ট করা চলবে না। তাই আজকের মতো হাজার হাজার ছবি নেই, কিন্তু সেই কম ছবিগুলোই হয়তো বেশি করে মনে থেকে গেছে

 

 

আমাদের ঘোরার তালিকায় ছিল বাতাসিয়া লুপ আর দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের সেই টয় ট্রেন। সেটা আমরা চড়েছি। তাতেও বেশ মজা।

১৮৮১ সালে চালু হওয়া ঐতিহ্যবাহী ন্যারোগেজ স্টিম ইঞ্জিন ট্রেনটি যখন পাহাড় ঘুরে যেতো, তা দেখে আমরা মুগ্ধ হতাম। যদিও আমরা প্রথমে ন্যারোগেজ ট্রেনে উঠতে উঠতে বাতাসিয়ার সেই আশ্চর্য বাঁক দেখেছিলাম, পরে আলাদা করে দেখার অভিজ্ঞতাও ছিল। ট্রেন পাহাড়ের ঢালে কী অদ্ভুতভাবে নিজের পথ তৈরি করেছে! সরু রেললাইন, পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলা, তারপর সেই ঘুরে যাওয়া। গাড়িঘোড়াহীন সেই উন্মুক্ত পাহাড়ি চত্বরে বসে বাতাস উপভোগ করা, ঘোড়ায় চড়া আর আড্ডা দেওয়াই ছিল পর্যটক ও স্থানীয়দের মূল আনন্দ। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের এই বাতাসিয়া লুপ আসলে পাহাড়ি ঢালে উচ্চতার পার্থক্য সামলানোর জন্য তৈরি এক অসাধারণ রেল-প্রকৌশল

 

ঘুমও ছিল। ঘুম স্টেশন, পাহাড়ি কুয়াশা এবং ঐতিহ্যবাহী ঘুম মনাস্ট্রি (Yiga Choeling Monastery) আর ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত দালি মনাস্ট্রি—সব মিলিয়ে এক মায়াবী আবহ তৈরি হতো। ঘুম নামটা শুনেই আমার কেমন যেন লাগত—মনে হত, নামের মধ্যেই যেন পাহাড়ি কুয়াশা আছে। ছোটবেলায় কোনও জায়গার নামও যে তাকে নিয়ে কল্পনা তৈরি করতে পারে, সেটা তখন বুঝতাম। ঘুমের দিকের পাহাড়ি রাস্তা, রেললাইন, ঠান্ডা—সব মিলিয়ে মনে হত, আমরা কলকাতা থেকে কত দূরে চলে এসেছি!

 

বেড়ানোর পরবর্তী দিনগুলোতে শহর দেখার আমেজ ছড়িয়ে পড়েছিল আরও অনেক জায়গায়। আমরা গিয়েছিলাম তেনজিং নরগে ও স্যার এডমন্ড হিলারি প্রতিষ্ঠিত হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট (HMI) এবং তার সংগ্রহশালায়। ঠিক পাশেই ছিল পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্ক, যা রেড পান্ডা আর স্নো লেপার্ডের জন্য বিখ্যাত—ছোটদের চোখে সেই পশুপাখিরা যেন রূপকথার জগত খুলে দিত। পাহাড়ের বিভিন্ন প্রজাতির সংরক্ষিত পশুপাখি আর অসংখ্য পোকামাকড় দেখতে বেঙ্গল ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামেও পা রেখেছিলাম

 

আবার কখনও গাড়ি থেমেছে পাহাড়ের ঢালে সাজানো সবুজ হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেটে। সেখানে বাতাসজুড়ে ভেসে আসত তাজা চায়ের সুবাস। আবার কখনও তিব্বতি রিফ্যুজি সেলফ হেল্প সেন্টারে গিয়ে দেখেছি কারিগরদের হাতে তৈরি ঐতিহ্যবাহী উলের কার্পেট, কাঠের নিখুঁত খোদাই করা বিভিন্ন স্মারক ও নানারকম হস্তশিল্প

 

তারপর আবার শহরের চেনা ছন্দে ফেরা। ম্যাল, চৌরাস্তা, বাজার, চা, রাতের হাঁটা, কখনও কোথাও বসে থাকা। বেড়াতে যাওয়ার আসল আনন্দ যে সবসময় শুধু “কী কী দেখলাম” তার মধ্যে নেই, সেটা তখন না বুঝেও বুঝেছিলাম। একটা পাহাড়ি রাস্তা ধরে হাঁটাও বেড়ানো, জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখাও বেড়ানো, ঠান্ডায় গরম চায়ের জন্য অপেক্ষা করাও বেড়ানো, হোটেলের ঘরে সবাই মিলে গল্প করাও বেড়ানো, আর রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে পরদিন কোথায় যাব, সেটা নিয়ে আলোচনা করাও বেড়ানো। এই সাত দিনে আমার কাছে দার্জিলিং একটা জায়গা হয়ে ওঠেনি—দার্জিলিং হয়ে উঠেছিল একটা আবিষ্কার

 

আর ৩১ ডিসেম্বরের রাতের কথা আলাদা করে মনে পড়ে। বছরের শেষ রাত। কলকাতায় তখন আমরা কী করতাম, জানি; কিন্তু পাহাড়ে? পাহাড়ে নতুন বছর আসবে—এই ধারণাটাই আলাদা ছিল। রাতের ঠান্ডা আরও বেড়েছে, বাজারে আলো, মানুষজন, কোথাও উৎসবের আবহ, হোটেলেও হয়তো একটু বেশি হৈচৈ। কেউ বলছে, আর একটু পরেই নতুন বছর। আমি তখন বছর বদলানোকে পুরোপুরি বুঝতাম না। কিন্তু একটা কথা বুঝতাম—১৯৮০ শেষ হচ্ছে, আর ১৯৮১ আসছে। আমি পাহাড়ে দাঁড়িয়ে একটা নতুন বছরকে স্বাগত জানাচ্ছি। কী অদ্ভুত! যে মেয়েটা এতদিন বইয়ের পাতায় পাহাড় দেখেছে, সে এখন সত্যি পাহাড়ে। আমার আঁকার খাতায় পাহাড় যেন তারপর থেকে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।

 


তারপর ১ জানুয়ারি—নতুন বছরের প্রথম দিন। আর আমাদের ফেরার প্রস্তুতি। বেড়াতে যাওয়ার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অংশ বোধহয় ফিরে আসা। যাওয়ার আগে যত উত্তেজনা, ফেরার আগে তত মন খারাপ। সুটকেস গুছিয়ে ফেলা, কাপড় ভাঁজ করা, শেষবার জানলা দিয়ে পাহাড় দেখা, শেষবার সেই রাস্তা, শেষবার ম্যাল, শেষবার দোকানগুলোর দিকে তাকানো। মনে হচ্ছিল, পাহাড়টাকে কি সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া যায় না?

 

অবশ্য পাহাড় সঙ্গে নেওয়ার উপায় নেই, তাই তাকে রেখে আসতে হয়। কিন্তু সবটা রেখে আসা যায় না, কিছুটা নিজের সঙ্গে চলে আসে


১৯৮০ সালের সেই দার্জিলিং সফর শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফিরে এসে আবার সেই পুরনো জীবন—সেই ঘর, সেই অভাব, সেই হিসেব, দুবেলা দুমুঠো খাবারের লড়াই। কিন্তু একটা জিনিস আর আগের মতো ছিল না—আমার পৃথিবী


তার আগে পৃথিবী বলতে আমি জানতাম আমাদের ঘর, আমাদের পাড়া, স্কুল, রাস্তা আর বইয়ের পাতা। দার্জিলিং থেকে ফিরে এসে আমি জানলাম, পৃথিবী আরও অনেক বড়। সেখানে পাহাড় আছে, সেখানে বরফঢাকা শিখরে ভোরের আলো পড়ে, সেখানে একটা ছোট্ট ট্রেন পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে যায়, সেখানে শীতের রাতে দোকানের আলো জ্বলে, সেখানে অচেনা হোটেলের মানুষ ছোট্ট একটা মেয়ের জন্য বাড়তি কম্বলের কথা ভাবতে পারে


আর সেখানেই হয়তো প্রথমবার বুঝেছিলাম—আমার জন্ম, আমার পরিবার, আমাদের অভাব—এসবের বাইরে একটা পৃথিবী আছে। সেই পৃথিবী আমার জন্য বন্ধ নয়। আরেকটা বাড়তি পাওনা হয়েছিল, একটা লাল সোয়েটার। যেটা দিদি গিফট করেছিল। হ্যাঁ, সেটা গায়ে দিতাম আমরা তিন ভাইবোন-ই। কারণ, ওদের ভাগের ঘোরা আমার, আর আমার ভাগের সোয়েটার ওদেরও।


আর সেই গল্পগুলো দাদা, ভাইকে বলছিলাম যখন, তখন হ্যারিকেনের আলো সেই পাহাড়ের ঘরের আলো হয়ে উঠেছিল। অনেক বছর পর লিখতে লিখতে সেই স্মৃতিতে ফিরলাম, আরেকবার দার্জিলিং ঘুরলাম।