Thursday, December 4, 2025


 

অক্ষ্যাংশ যখন ৫১°উঃ
রণিতা দত্ত

শীত! উত্তরবঙ্গ। মাগো কি শীত! কলকাতা থেকে কেউ এলে ট্রেন নেমে ই মাফলার মাংকি টুপি পরে নেন। নিজের শহরের এই শীতকে একসময় থোড়াই পরোয়া করতাম। বয়সের সাথে সাথে কাবু হয়েছি ব্যাথায়।তবু শীতকে মন্দ লাগে না। এবারে তো দেখছি উচ্চ অক্ষাংশে অবস্থান করে দিব্যি আছি। অথচ এই শীতে সুমেরু বৃত্তের কাছাকাছি থাকতে হবে ভেবে নেহাত একান্ত ব্যক্তিগত দায়। ছিটকে এলাম ২৭°উঃ থেকে ৫১°উঃ অক্ষাংশে। ক্রান্তীয় উপমহাদেশের উষ্ণতা ছেড়ে এসে পড়লাম উত্তর পশ্চিম ইউরোপিয় শীত প্রধান জলবায়ুর দেশে! তাও শীত এসে প্রকৃতির দরজায় কড়া নাড়ার ঠিক প্রাগ মুহূর্তে। তখন সেপ্টেম্বরের শেষ হপ্তা। সন্ধ্যেয় ফ্রাঙ্কফ্রুট এয়ার পোর্ট থেকে বেড়িয়েছি জ্যাকেট গায়ে টুপি মাথায়। তাও শিরশিরে বেশ ঠান্ডা হাওয়া লাগছিলো। যাগ্গে গাড়িতে বা বাড়িতে উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করা। তাই বিছানা আর ভাত পেয়ে বেশ ঘুমিয়ে নিলাম। সকলে বলল "জেদল্যাক"। নিশ্চিত ঘুম। বিকালে বেরোলাম। 

"Autumn is a second spring
When every leaf is a flower."
                            Albert Camus





এই হেমন্তে চারদিকে দেখি রঙের বিচিত্র খেলা। গাছগাছালির শাখায় পাতায় কত যে রং! লাল, হলুদ, কমলা, তামাটে, বাদামী রংয়ের গাছেরা উঁকি দিচ্ছে! সে এক অপূর্ব দৃশ্য! এতদিন বিদেশের 'ফল' (Fall) এর ছবি দেখেছি নানা জায়গায়, বর্ণনায় পড়েছি । কিন্তু নিজের চোখে এই সাজে প্রকৃতিকে দেখার অনুভূতিটাই যেন আলাদা।এখানে ঘরবাড়ি, অফিস দোকান পসার আর গাছপালা সমানুপাতিক । এতো গাছ মেইন টাউন শিপে না দেখলে বিশ্বাস হত না। ম্যাপল পপলার, অ্যাশ গাছগুলোর পাতায় পাতায় কত রকম যে রং! চুপ করে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখি। চোখ ভরে তো মন ভরে না। সময় পেরিয়ে যায়।হিমেল হাওয়াকে একটু যেন তাচ্ছিল্য ই করি এই রূপের কাছে। শীতের দিন গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। ঝরে পড়ার আগে সেজেছে পর্ণমোচির দল। পাতার সবুজ ক্লোরোফিল জায়গা ছেড়ে দিয়েছে ক্যারোটিনয়েডস,জ্যান্থোফিল, পিগমেন্টকে। তাই এত রংয়ের বাহার। এত রঙিন ভাবেও যে বুড়িয়ে যাওয়া যায়, তা কে জানত?




  
সব সৌন্দর্যই তো ক্ষণস্থায়ী। দেখ্ না দেখ্ করে এই রঙিন সাজ খসিয়ে দেবে গাছেরা। মাটিতে,রাস্তায়, ঘাসে কিছুদিন পড়ে থাকবে । হাওয়ার তালে নেচে নেচে ওড়াউড়ি করবে এদিক ওদিক। তারপর। একেবারে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকবে মাটির বুকে।

অক্টোবর চলছে। শীত এখন বেশ আরামদায়ক। বাইরে দামাল হাওয়া শুকনো ঝরা পাতাগুলো নিয়ে খেলায় মেতে থাকে। ভোরে কুয়াশা, কনকনে ঠান্ডা, তারপর দিব্যি রোদ। কমললেবু পাতা ডাল সহ সুপার মার্কেট ছেয়ে গেছে। এতো ফ্রেস কমলা আমাকে টানছে। 

এখানে দেখলাম কিছু মানুষ বেশ উস্কোখুস্ক, অবিন্যস্ত গোছের। জামাকাপড় ধপদুরস্ত নয়। খাপ ছাড়া আচরণ। ওরা নাকি রিফিউজি। চেনা শব্দ, অচেনা ভূ খন্ড। ভিটে ছাড়া, চলচুলো না থাকায় কিছুটা উৎশৃঙ্খল অপরিনামদর্শী। যত চুরি চামারি ছিনতাই সব নাকি ওদের ই কীর্তি কলাপ। তবু শুধু ওদের জন্য লোকজন তাদের অতিরিক্ত জামাকাপড় শীত আসার আগে ব্যাগে করে রাস্তায় রেখে আসে।একে গিভ অ্যাওয়ে বলে।




 হ্যালোউইনের আগে ই আলো জ্বলা ভূত মুখো কুমড়োই শুধু নয়, কঙ্কাল, ভূত পেত্নী অনেকেই বাড়ির সামনে সাজিয়ে রেখতে শুরু করেছে। কোথাও কঙ্কালরা পার্টি করছে, কোথাও বা ভূতেরা গাছ বসে পা দুলাচ্ছে, আবার কোথাও বা কবরের ভেতর থেকে হাত পা বাড়িয়ে উঠে আসতে চাইছে। ঝিরঝির কুয়াশায় ছায়াছায়া কায়া। বেশ মজাদার ব্যাপার। যেন ভূত তাড়ানোর জন্য ভৌতিক সজ্জা। ধর্মীয় অনুষঙ্গ যাই থেকে থাক না কেন আজকাল এটা বিশুদ্ধ মজার ব্যাপার হয়েই দাঁড়িয়েছে এ' দেশে।

৩১শে অক্টোবর সন্ধের মুখে ছোট বাচ্চারা কিম্ভুত সেজে বেরিয়েছে 'ট্রিক অর ট্রিট' এ। বাড়ি বাড়ি ঘুরে চকলেট সংগ্রহ করতে। বাবা মায়েরাও কম যান না। তারাও ভৌতিক সাজে । ওদের আনন্দ দেখে ভীষণ ভালো লাগছিল। আশেপাশের বাড়ির লোকেরা চকলেট বোল, কুমড়োয় মিষ্টি টর্ট দিয়ে টেবিল সাজিয়ে বসেছিল ছোটদের অপেক্ষায়। চকলেট দিতে পেরে ওরাও শিশুর মত খুশি হয়ে উঠছিল। ছোটরা এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি হুটোপুটি করে দৌড়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল।
 
বহুদিন আগে আমাদের ছোটবেলায় বিজয়া বা লক্ষ্মীপুজোর পরে এভাবেই বাড়ি বাড়ি ঘুরে নাড়ু, মোয়া খেতাম। বড়রাও সাগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতেন। সেকথা খুব মনে পড়ে যাচ্ছিল।
ভূত চতুর্দশী। চোদ্দপুরুষের উদ্দেশ্যে বাতি।অক্টোবরের শেষে বা নভেম্বরের শুরুতেই। ইসলাম ধর্মে সবেবরাত। হয় ওই একই সময়। সেও নাকি মৃত আত্মাদের শ্রদ্ধা জানাতে । অক্টোবর নভেম্বর মাসটাই যে কেন মৃত আত্মাদের এত পছন্দের মাস জানিনা বাপু! দেশ কাল যতই আলাদা হোক না কেন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মানুষের রীতি নীতি, আনন্দ উৎসবের একটা কোথাও ভীষণ মিল থেকেই যায় এ বিশ্বাস আমার বরাবরই ছিল। আজকাল যত দেখছি, সেই বিশ্বাসটাই আরও দৃঢ় হচ্ছ।



দেখতে দেখতে নভেম্বর শুরু হয়েছে।ঠান্ডার প্রকোপ বাড়ছে। পাঁচ নভেম্বর। আমার জীবনের চতুর্থ পুরুষটি (নাতি) এখন আমাকে জাগিয়ে রাখে। মাঝরাতে কখন যে ঘড়ির কাঁটাটা উল্টোবাগে ঘুরে গেছে টের পাইনি।ভোর চারটেয় মোবাইলে অ্যালার্ম। ওনার ফিডিং টাইম। উঠে দেয়াল ঘড়িতে তিনটে দেখে ভাবলাম নিঘাত ব্যাটারিটা গ্যাছে। বদলাতে হবে। বিড়বিড় করছি নিজের মনে, মেয়ে আধো ঘুমে বলল " আজ থেকে 'ডে লাইট সেভিং' অফ হয়ে গেল মা। এখন চারটে ই বাজে। খাওয়াও। তখন খেয়াল হলো। তাই তো! আজ নভেম্বরের ফার্স্ট রোব্বার ! তাকিয়ে দেখি, আমার ফোনের দেখানো সময় আর দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়ির সময়ের ঠিক একঘন্টা ফারাক হয়ে গেছে।

ঠিক রাত দুটোয় প্রায় সব জায়গার ঘড়ি আবার চলে গেছে রাত একটার ঘরে। । প্রায় বললাম এজন্য যে হাওয়াই, অ্যারিজোনার দ্বীপের মত কয়েকটা জায়গা ভৌগলিক অবস্থান কারণে এই সময় আগুপিছুর চক্করে ঢোকে না।

ফোন যেহেতু ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত। তাই ওখানে অটোমেটিক ফোনের সময় বদলে গেছে। দেওয়ালের ঘড়িটার কাছে চেয়ার টেনে কাঁটা ঘুরিয়ে ঠিক করতে হলো। এই একটা দিন হয়ে গেছে চব্বিশ ঘন্টার বদলে পঁচিশ ঘন্টার। একঘন্টা কড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা!



 এদেশে যাকে বলে প্রকৃত শীত, সে আসছে। দিন একটু একটু করে দ্রুত ছোট হচ্ছে। পাশ্চাত্য দেশ 'ডে লাইট সেভিং' অফ করে দেয়।আবার স্ট্যান্ডার্ড টাইমে ফিরে যায়। এই স্ট্যান্ডার্ড টাইম হলো সারা পৃথিবীর যে কোন স্থানের দ্রাঘিমাংশের হিসেবে গ্রীনিচ মিন টাইমের (GMT) পরিপ্রেক্ষিতে যে সময় নির্ধারণ করে, সেটা। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ইলেকট্রিসিটি আর জৈব জ্বালানী বাঁচানোর জন্য ডে লাইট সেভিং চালু হয়েছিল । এর অর্থ আর কিছুই নয়, গ্রীষ্মকালের ১৪ঘন্টা লম্বা দিনগুলোতে ঘড়ির কাঁটা একঘন্টা এগিয়ে দেওয়া । তার মানে হলো সকাল হবে একঘন্টা আগে। সকাল দশটায় অফিস শুরু হলে আসলে স্ট্যান্ডার্ড টাইম অনুযায়ী পৌঁছাতে হবে সকাল ন'টায়। লোকজন বাড়িও ফিরে আসবে দিনের আলো থাকতে থাকতে। সূর্য তো তাঁর চলাচলের সময় বদলাবেন না। তিনি চলবেন তাঁর নিজের নিয়মে। আর পশু পাখিদের বায়োলজিকাল ক্লকও চলবে সূর্যের নিয়মে।  

এখন প্রতি বছর মার্চের দ্বিতীয় রবিবার 'ডে লাইট সেভিং' শুরু হয়। চলে নভেম্বরের প্রথম রবিবার পর্যন্ত। ২০২৬সালের ১০ই মার্চ, রবিবার রাত দুটের সময় সব ঘড়িতে রাত তিনটে বাজবে। ডে লাইট সেভিং অন হবে। সাথে সাথে মানুষের ঘুমের সময় থেকে একঘন্টা চুপচাপ চুরি হয়ে যাবে। সেদিন দিন হবে তেইশ ঘন্টার।

পরশুদিন সকালবেলা হাঁটতে বেরিয়েছিলাম । তখন সকাল ন'টা। তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড । সাড়ে সাতটায় অন্ধকার দেখাচ্ছিল। বাইরে পারদ ছিল জিরো ডিগ্রি। বেরিয়ে দেখলাম কনকনে ঠান্ডা তো আছেই সঙ্গে উত্তুরে বাতাস বইছে। ভালোর মধ্যে এইটুকুই ঝলমলে রোদ্দুর ।ঝকঝকে নীল আকাশ। নভেম্বরের শেষে এই রোদ,ঝকঝকে আকাশ কদাচিৎ দৃশ্য মান। এখানে এখন দেখছি দু'দিন বাদে বাদেই মেঘলা আকাশ। ঝিরঝির বৃষ্টি। ঠান্ডা আরও জাঁকিয়ে পড়ছে। আলো ফোটে দেরিতে। দিনের শুরু আর শেষে ভিজিবেলিটি কম। সন্ধ্যে সাড়ে চারটায়।
ক'দিন আগের রঙ বাহারি গাছপালা আস্তে আস্তে রঙিন বসন খুলছে। যাও বা সামান্য কিছু রঙিন পাতা এখনও লেগে আছে ডাল পালায়, তারাও বাতাসের আঘাতে কেঁপে কেঁপে খসে পড়ছে। ও হেনরীর "লাস্ট লীফ" গল্পটা মনে পড়ে যচ্ছিল। কিছু কিছু গাছ তো ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ নিষ্পত্র। 




 গুটি গুটি পায়ে এসে পড়েছে শীত। রাতে ২/৩•, সূর্য্যর ডিউটি আওয়ার্স কমছে। তাও তেঁনার লেট্ এটেন্ডেন্স, আবার নতুন বউ রেখে আপিস আসার মত যাওয়ার জলদি। শুনেছিলাম ব্রেসেলসে শীতে কয়েকদিন মাত্র তুষারপাত হয়। আজ সকালে সাড়ে পাঁচটায় মেয়ে ঘুম থেকে গুঁতিয়ে তুলল। কাঁচের দরজার ফাঁক দিয়ে দেখি বাইরে ফিন ফিনে তুলোর মত কিছু ঝিরঝিরিয়ে পড়ছে। গাড়ি গুলোর ওপর, মাঠের ঘাসে সাদা আস্তরণ। নভেম্বরের শেষে স্নো দেখে তো সবাই বলাবলি করছে এবারে শীত জাঁকিয়ে পড়বে। ডিসেম্বর জানুয়ারি তো পড়েই রয়েছে পারদস্তম্ভ শূন্য ছাড়িয়ে মাইনাসে নামবার। সূর্য্য মুখ তবে শীতের প্রকৃতির বর্ণহীনতাকে ঢেকে দিতে মানুষের চেষ্টার কোনো খামতি নেই। 

রাস্তা ঘাট দোকান বাজার, শপিং মল সব ইতিমধ্যেই রেন ডিয়ার, ক্রিসমাস ট্রী, সান্তা ক্লজ, আর নানারকম আলোকসজ্জায় সেজে উঠছে। দোকানে দোকানে সাজানো ক্রিসমাসের হরেক রঙিন পসরা। গাড়িতে যেতে যেতে, মর্নিং ওয়াক করতে করতে চোখে পড়ে হ্যালোইনের সাজসজ্জা খুলে ফেলে লোকজন বাড়ির সামনে সাজাচ্ছে ক্রিস মাস থিমে।ঋতু আসবে যাবে বাঁচতে হবে আনন্দে।

No comments:

Post a Comment