নিসর্গের কবিতা/ স্বপ্নপূরণের অক্ষর: সঞ্জয় সোম
প্রকাশক: চালচিত্র
কবি সঞ্জয় সোমের কবিতা নিয়ে নতুন করে কিছু বলা বাতুলতা। দীর্ঘদিন থেকে তিনি কবিতা চর্চা করছেন। তাঁর যাপনেও কবিসত্ত্বা প্রতীয়মান। সম্প্রতি তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ পড়বার সুযোগ হল। দুটি গ্রন্থ থেকে কিছু উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে যে, কবি হিসেবে তাঁর চর্চা কতটা সার্থক- `তুমি আমাদের প্রকৃত আয়না/ হিসেবে নিই প্রতিবিম্ব দেখে,/ শেখ হয়নি জল মাপা/ তুলাপাত্ররএকদিকে আমি/ অন্যদিকে বঞ্চনা`, `কবি হতে চাই না, আমাদের অনুবাদ করতে/ হবে অশ্রুর ভাষা`, `যখন কবিতা আসে না, বৃষ্টি পড়া দেখি/ ভেজা গাছের গা বেয়ে নেমে যায় আনন্দ-গান`, `সময়টা ভালো নয়/ শুনতে চাই সূর্যপ্রতিম কবিতা/ শুনতে হয় ফেসওয়াস করা মুখের উচ্চারণ` এরকম অজস্র উদাহরণের মধ্যে দিয়ে কবি সঞ্জয় সোম যে যাত্রা করেছেন কাব্যগ্রন্থ দুটিতে, তাতে বারবার ফিরে এসেছে অতীত-বাড়ি, মা, বৃষ্টিদিন, বদলে যাওয়া নির্মম সময় আর নিজস্ব যন্ত্রণা। তবে যন্ত্রণা-ক্লিষ্ট কবি কিন্তু শেষ অবধি তৈরি করে নিতে পেরেছেন উত্তরণের নিজস্ব অভিমুখ। সেজন্যই অনায়াসে বলে যেতে পারছেন নিজের দেখা ও উপলব্ধি। তাঁর সৃষ্টির সব চাইতে বড় বৈশিষ্ট্য হল, এই দেখা ও উপলব্ধি সঞ্জাত এক নমনীয় প্রকাশ। তিনি উচ্চকিত নন, ভাঙার তাগিদে তছনছ করে দেওয়ার বাসনাও তাঁর নেই। বরং পেলব উচ্চারণে, নিজস্বতা বজায় রেখে, এক ধীর পরিবর্তনে বিশ্বাসী তিনি। তিনি মনে করেন অন্তর থেকে যদি বদলানো না যায়, তবে হাজার চেষ্টা করেও লাভ নেই। কাব্যগ্রন্থ দুটিতে কবি যেন সেরকমই আভাস দেন কবিতার রহস্যময় ভাষায়। কবি সঞ্জয় সোম আরও লিখবেন এই আশা রাখি। গ্রন্থদুটির প্রচ্ছদ করেছেন ঈর্ষিতা সোম। কবিতার বিষয় ভাবনার সঙ্গে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ এই প্রচ্ছদ। চালচিত্রের কাগজ ও মুদ্রণ মনোগ্রাহী। কাব্যগ্রন্থ দুটি পাঠে ব্যক্তিগতভাবে ঋদ্ধ হয়েছি।
প্রত্যাশার রঙ নীল: অঞ্জনা দে ভৌমিক
প্রকাশনা: অঙ্কুরোদ্গম প্রকাশনী
গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের শেষদিকে অঙ্কুরোদ্গম প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে কবি অঞ্জনা দে ভৌমিকের `প্রত্যাশার রঙ নীল` কাব্যগ্রন্থটি। মোট ৬৬টি কবিতা মলাটবন্দি হয়েছে গ্রন্থটিতে। অঞ্জনা দে ভৌমিকের নিয়মিত পাঠক হিসেবে লক্ষ্য করছি, এই গ্রন্থে কবি কিছুটা হলেও, নিজেকে ভাঙবার চেষ্টা করেছেন। তাই `অনুভবে বহন করি/ বিচিত্র খেয়ালে হাইটেক পদ্ধতিতে রাত্রির যবনিকা টানে`, `চিলমন হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় কিঙ্গিনার মিথ্যে সুর/ ঝলকে ঝলকে ভেসে আসে কাওয়ালীর কলি`, `ল্যাম্পপোস্টের আলো কৃত্রিম হলেও বিশ্বাসগুলি উর্দ্ধমুখি` জাতীয় ব্যবহার অনায়াসে এসেছে এই গ্রন্থে। এই জাতীয় শব্দবন্ধ ও তাকে ঘিরে কবিতার উদযাপন এর আগে তাঁর লেখায় দেখিনি। সেদিক থেকে এই গ্রন্থে নিজেকে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে গেছেন কবি। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, একজন কবির যাত্রায় ঠিক এটাই হওয়া উচিত। কেননা যা অতীতে লেখা হয়ে গেছে, যদি সেটারই পুনরাবৃত্তি হয়, তবে কবির সৃষ্টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এখন ঘটনা হল, নতুন করে কিছু তো বলবার নেই আর। কেননা সর্বদেশে সর্বকালে মানুষের অনুভূতি এক। তার বদল হয় না। তাহলে কবিকে আলাদা করব কীভাবে? অবশ্যই তাঁর নিজস্ব পরিভাষা থেকে। নিজস্ব পরিভাষা সৃষ্টি হয় না বলেই, বহু লিখেও অনেকে কবি হতে পারেন না। কেউ আবার খুব সহজেই সেই আকাশ স্পর্শ করেন। অঞ্জনা দে ভৌমিকের যাত্রায় এই বদল থেকেই প্রমাণিত যে তিনি চেষ্টা করছেন নিজের মতো এবং বহু অংশে যথেষ্ট সফল হয়েছেন। গ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় নিজের মতো করে আলাদা উল্লেখের দাবি রাখে। যদিও এই ছোট্ট পরিসরে সবগুলির কথা বলা সম্ভব নয়। হয়ত উচিতও নয়। ভাল লেগেছে বেশ কিছু ব্যবহার- `কেউ কি কখনও জানতে পারে ভিতর ঘরে ভাঙন এলে/ সত্যিগুলোও মিথ্যে বলে!`, `ফুরিয়ে গেলে নতুন কিছু কুড়িয়ে নিও, দরজা খুলে বাইরে এসো`, `হঠাৎ আসুক একটু হাওয়া পাল্টে ফেলুক সব নিশানা` ইত্যাদি। তবে `প্রজ্জ্বলন` `নীলাম্বর`, `শঙ্খচিল`, `সখ্যতা`, `মহানভ`, `প্রসারিত` ইত্যাদি কিছু শব্দের ব্যবহার একটু সেকেলে ও ক্লিশে মনে হয়েছে। দেবাশিস সাহার প্রচ্ছদ গ্রন্থটির মান বৃদ্ধি করেছে। প্রকাশনী হিসেবে অঙ্কুরোদগমের উজ্জ্বল আগামী বোঝা যাচ্ছে গ্রন্থের মুদ্রণ ও কাগজ ব্যবহারে। কিন্তু সব মিলে `প্রত্যাশার রঙ নীল` পাঠ এক মধুর অভিজ্ঞতা।
অনুভূতির এপিটাফ থেকে: ডাঃ সৈকত দাম
প্রকাশনা: কলতান
সম্প্রতি নবীন কবি ডাঃ সৈকত দামের `অনুভূতির এপিটাফ` থেকে কাব্যগ্রন্থটি পড়বার সুযোগ হল। মোট পঞ্চাশটি প্রতিটিতেই কবির নিজস্ব অনুভূতি কবিতার আকারে প্রকাশ পেয়েছে। প্রথাগত ব্যাকরণ মেনে কবিতাগুলিকে বিচার করলে ভুল করা হবে। কেননা ডাঃ সৈকত দাম তাঁর অনুভূতিগুলি `কবিতা` হয়ে উঠল কিনা ভাবনাকে গুরুত্ব না দিয়ে, নিজের মতো নিজের কথা বলে গেছেন। আর এখানেই কাব্যগ্রন্থটি আলাদা হয়েছে। নিজের কথা বলতে গিয়ে সহজাত ভঙ্গিতেই কবি বাংলার পাশেই ইংরেজি শব্দের ব্যবহার করেছেন। এই ব্যবহার কখনই আরোপিত মনে হয় না। বরং বলার প্রয়োজনে কবি যেভাবে ভেবেছেন, সেভাবেই প্রয়োগ করেছেন- `একটা কালাশনিকভ পাবি আমার মাথার ভেতর হাত ঢোকালে,/ আর পাবি কিছু অসাড় চেতনা/ যেদিন join করি সংগঠন,/ বিশ্বাস কর,/ আমার আর খিদে পেলো না....` ঠিক এই মুহূর্তের নানা বিষয়, মূর্ত বা বিমূর্ত, নানাভাবে কবির লেখায় ফুটে উঠেছে, যা প্রমাণ করে কোনও রোমান্টিক ইলিউশন নয়, কবির পা বাস্তবে এবং সেই বাস্তবকে নিজস্ব চিন্তার পরিধিতে ফুটিয়ে তোলাই তাঁর কাজ। তাই সহজেই বলতে পেরেছেন, `সান্তা আসবে শৈশবের শেষ রাতে,/ একটা রক্তাক্ত পুতুল রেখে যাবে.../শয়তানের শেষ পাতে...` কখনও ব্যর্থ অসহায় আধুনিক নাগরিক সভ্যতায় বিপন্ন হয়ে তিনি লিখেছেন, `গাঁয়ের সব নদী এঁকে বেঁকে ঢুকে যায় বুকে,/ কবি সব দেখে...` এভাবেই বিপন্নতা, একাকীত্ব, যন্ত্রণা ও অন্বেষণে ডুবে থাকা কবি নিজের ভেতরেই খুঁড়ে চলেন নিজস্ব যাপন। আকাশ চক্রবর্তীর প্রচ্ছদ অন্যরকম হলে কাব্যগ্রন্থের মান আরও বৃদ্ধি পেত বলে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। কবিতার শীর্ষকগুলিও এত মোটা হরফে না থাকলে দৃষ্টিনন্দন হত। তবে এসবই বাহ্য। আসল হল কবিতা। সেক্ষেত্রে শুধু এটুকুই বলবার যে, আরও পরিণত হয়ে উঠুন কবি। তাঁর আগামীর যাত্রা ঋদ্ধ হোক।
আলোচক: শৌভিক রায়



No comments:
Post a Comment