Tuesday, June 2, 2026


 

যেখানে কৃষ্ণচূড়া এখনও ফোটে


দেবাশীষ বক্সী

 

এবারে, বসন্তটা ভারি রুক্ষ। শীতের পরে বসন্তকে ল্যাং মেরে বুঝি গ্রীষ্মের আগমন ঘটেছে। সকাল সকাল কাঠফাঁটা রোদ। জামা কাপড় ভিজে একসার হয়ে পরছে। প্রখর তপন তাপে বসন্তের দখিনা বাতাস বুঝি অন্তর্জলী যাত্রায়। কোকিল ডাকলেও মনে সুঁড়সুড়ি দিতে পারছে কই?

একটা সময় ছিল। বসন্তের এক অন্যরকম গন্ধ ছিল। শীতের শেষে, দখিনা বাতাস চুপি চুপি এসে আমার অন্তর ডাকবাক্সে পত্র ফেলে জানিয়ে দিত আমি এসে গেছি। যেন কোন কিশোরীর প্রেমপত্র। রঙীন হয়ে, চঞ্চল হয়ে উঠতো মন। শুধু প্রকৃতিতে নয়, শিমুল পলাশের রঙ লাগতো মনেও। উদাস মন প্রেমের জোয়ারে ভেসে যেত। রাস্তায় দেখা কোন মুখ কোন হাসি বা চোখের চাউনি সারাদিনের জন্যে আছন্ন করে তুলত। কল্পনার তো কোন লক্ষণরেখা নেই, বসন্ত বাতাস গায়ে জড়িয়ে সে আরও লাগামছাড়া হয়ে উঠতো।

আজ অফিস থেকে ফেরার পথে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হলো—মানুষ আসলে বয়সে নয়, স্মৃতিতে বুড়ো হয়। মোবাইলের স্ক্রিনে একের পর এক নোটিফিকেশন উঠছে। মিটিং, বিল, EMI, বাজারের তালিকা। মেয়েটাকে টিউশনি থেকে নিয়ে যেতে হবে। কাল মঙ্গলবার। বজরাঙ্গবলির জন্য লাড্ডু কিনতে হবে। আজকালকার মেয়েরা মায়েদের মত লক্ষীপুজো, মঙ্গলচন্ডীর ব্রত ইত্যাদির আর করে না। নজরে পড়ল রাস্তার ডানদিকে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ আগুনে রঙে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক পলকে খিদে যেন মিটলো না, পুনরায় চোখ আটকে রইলো কৃষ্ণচুড়ায়। বুঝতে অসুবিধে হল না, অতিরিক্ত অ্যাড্রনালিন নিঃসরণে মন অন্য জগতে প্রবেশের চেষ্টা করছে। হলোও তাই। মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠলো বহু পুরনো এক বিকেলে বেলা।

 গ্রাম্য পরিবেশ। আবছা নীল আকাশে শরতের সাদা মেঘ হয়ে বকেরা বাড়ি ফিরছে। সারাদিনের পরিশ্রমে দিনমণি বেশ ক্লান্ত। চণ্ডীতলার পাশে ঝাঁকড়া এক কৃষ্ণচূড়া। আগুনরাঙা ফুলগুলোর অন্তরালে ঝিরিঝিরি সবুজ পাতা বুঝি হারিয়ে গেছে। দিনান্তে দিনমণির স্নিগ্ধ হাসির পরশে তারা অনাবিল আনন্দে আরও মোহময়ী হয়ে উঠেছে। পরনে হালকা হলুদ জামা। দুই ঘাড়ে পুষ্ট দুই বেনুনী। পায়ে রুপার পায়েল। তর্জনীতে কোমরবন্ধনী জামার ফিতে আঙুলে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে আমার অপেক্ষায় সে চঞ্চল হয়ে উঠেছে। কাছে যেতেই অভিমানী গলায় তাঁর প্রশ্ন, “বিকেল গড়িয়ে গেল, কি বলবি, তাড়াতাড়ি বল?”

আসার আগে বহু পুরনো পায়ে কেটে যাওয়া ক্ষতকে ঘষে ঘষে জীবন্ত করে তুলেছি। একটু লেংচে পায়ের ক্ষতর দিকে নির্দেশ করে বলি, “আসতে গিয়ে সাইকেল থেকে পড়ে কী অবস্থা হয়েছে দেখ।”

 সে আঁতকে উঠে, দুই হাতে মুখটি ঢেকে বলে, “ভারি লেগেছে, তাই না রে।”

 আমি হেসে বলি, “ছাড়তো আমার কথা। তোকে কিন্তু আজ রূপবতী রাজকন্যার মত লাগছে।”

 আমি ওর বাঁধা উপেক্ষা করে গাছে উঠে কৃষ্ণচূড়া পেরে বেনুনীর গোড়ায় গুজে দিই। এবং চোখে চোখ রেখে বলি, “চোখ ফেরানো যাচ্ছে না।”

 ও ছলছল চোখে বলে, “তোর কি প্রানের মায়া নেই। ব্যথা পা নিয়ে গাছে উঠলি?”

 - খুব ইচ্ছে হল, তোকে বসন্তের রঙে রাঙাতে।
- যদি পরে যেতিস?
- কী হোত, হাত বা পা-ই তো ভাঙত।
- আমি বারণ করলাম, তাও শুনলি না?
- তোর কথা শুনলে, মন যে ভাঙত। 

 এমন সময় চন্ডীতলার মন্ডপে সন্ধ্যা আরতি শুরু হয়েছে। শঙ্খ, কাঁসর ঘন্টার শব্দ আর ধূপের গন্ধে পরিবেশ প্রবিত্র হয়ে উঠেছে।

 আমার চোখে চোখ রেখে ইশারায় সে বলে, “চল মন্দিরে গিয়ে একটু বসি।”

 আমি বাধো বাধো কাঁপা গলায় বলি, “কিন্তু তোকে যে আমার কিছু বলার ………”

 আমার কথা থামিয়ে সে মিষ্টি হেসে, কোমল হাতে আমার হাতটি ধরে বলে, “কিছু কিছু কথার প্রয়োজন পড়ে না, হৃদয় আছে বলেই তোর সুর আমার বুকেও বাজে।”

সিগন্যাল সবুজ হলো। পিছন থেকে হর্ন বেজে উঠল। আমি চমকে বর্তমানে ফিরে এলাম। সামনে গাড়ির সারি এগোচ্ছে।

আমি গাড়ি চালালাম, কিন্তু মনে হচ্ছিল—কোথাও একটা চণ্ডীতলা এখনও রয়ে গেছে, কৃষ্ণচূড়া এখনও ফুটে আছে, আর হলুদ জামা পরা মেয়েটি ……! জানিনা, জানিনা সে কোথায়, কেমন আছে।

 

No comments:

Post a Comment