উৎস থেকে ধারাবাহিক বিবর্তনে বাংলা সংগীত
গৌতমেন্দু নন্দী
সংগীতের ঝর্না ধারায় বাঙালির স্নাত হওয়ার ইতিহাসের ব্যাপ্তি প্রায় সীমাহীন। কীভাবে আমাদের জীবনযাপনে সুর এলো তারও এক সুদূর অতীত আছে। সেই অতীতের সন্ধান চলছে এবং চলবে।
বাংলা গান শিল্প-সংস্কৃতির পরিসরেই শুধু সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের জীবন-সংস্কৃতির চর্চারও ধারক ও বাহক। আমাদের চারপাশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, ভৌগলিক বৈচিত্র্য এবং আমাদের যাপন বৈচিত্র্যও প্রভাবিত করেছে, বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে সংগীতের কথা,ভাব এবং সুরকে বিভিন্ন ভাবে। প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপাদান, ঋতু বৈচিত্র্য, পাখির কূজন আমাদের চিন্তা চেতনার মনোভূমিকে নিরন্তর কর্ষিত করে করে তৈরি করেছে এক সাংগীতিক উর্বর ক্ষেত্র। সেখানেই জন্ম নিয়েছে কথা,সুর আর বোধ-ভাবনা। এইভাবেই বাংলার সংগীত জগৎ হয়েছে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। সুখ, দুঃখ, হর্ষ-বিষাদের মুহূর্তগুলোর অনুরণন বাংলার সংগীতে এনেছে গভীর দ্যোতনা, মূর্ছনা।এইভাবেই যেন বাংলা সাহিত্য ও সংগীত মিলে মিশে একাকার হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে এই সাহিত্য-সংগীত সংস্কৃতি। সেই ধারা আজকেও প্রবহমান।
এই ধারার প্রধান ধারক ও বাহক আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যাঁর সংগীত অতীত থেকে বর্তমান চির প্রাসঙ্গিক। কবিতায়,কাব্যে, প্রেমে, উৎসবে, উদযাপনে ,শোকে, আনন্দে,বিষাদে আমাদের অব্যক্ত অনুভূতি,বোধ, ভাবনা ---কথা ও সুর হয়ে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
শুধু ব্যক্তিগত যাপনচিত্রে নয়, আমাদের চারপাশের বিশাল প্রাকৃতিক পরিবেশের ঋতুগত আবহাওয়া পরিবর্তনও "কথা" ও "সুর" হয়ে বিভিন্ন ঋতুতে "ঋতুপর্যায়"এর গান হয়ে আজ আমাদের এক মহার্ঘ সম্পদ। বাংলা গানের এই অন্যতম সম্রাটই এই বিশ্বকে তাইতো বলেছেন "সুধাসাগর"। সত্যি তাই।
এই "সুধাসাগর"এ অবগাহন চিরকালীন। তবুও "চূড়ান্ত" সুরটির সন্ধান যেন এখনও অধরা। ঠিক সেইজন্যই বোধহয় ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খানের মত একজন কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব উচ্চারণ করতে পারেন, " সারাটা জীবন সংগীত সাধনা করেও সরস্বতীর মন্দিরে ঢুকতে পারলাম না, মন্দিরের চারপাশে শুধু ঘুরে বেড়ালাম..."
সাংগীতিক শিক্ষার কোন শেষ নেই। তবুও আজ বলতেই হয় আমরা বাংলা গানের সেই অতীত ঐতিহ্য কি ধরে রাখতে পারছি? সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন স্বাভাবিক কিন্তু তা অবশ্যই হতে হবে ঐতিহ্য অনুসারী। উপযুক্ত শিক্ষার পাঠ নিয়ে সঠিক সাংগীতিক কাঠামো কে ঘিরে আবর্তিত হওয়া প্রয়োজন এই অনুশীলন। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল গীতির পর অতীতে "স্বর্ণযুগ"এর গান ছিল আমাদের সম্পদ ও অহংকার। আশির দশকে যখন বাংলা গানের ঘোর দুর্দিন, যখন কথা,সুর ও গায়নে চলছে এক ভাটা সেই সময় স্বর্ণযুগের বেশ কিছু জনপ্রিয় গানকে আধুনিক যন্ত্রায়োজন ও প্রযুক্তিগত ডিজিটাল ব্যবহারের মাধ্যমে "রিমেক" এর রূপ দিয়ে সেই গানগুলোকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করে তুললেন কিছু নতুন শিল্পী। এর প্রায় সমান্তরালে সময় ও সমাজের বিভিন্ন সমস্যার কথা সুরের মাধ্যমে গান হয়ে গেলদুই চারজন শিল্পীর কন্ঠে। যাঁদের মধ্যে অগ্রগন্য সুমন চট্টোপাধ্যায় বা কবীর সুমন।যিনি নিজের কথা,সুর আর নিজেরই যন্ত্রানুষঙ্গে "তোমাকে চাই..."এর মত কথা -সুরের সার্থক মেলবন্ধন এবং পুরুষোচিত দরাজ কন্ঠে বাজিমাত করলেন। সেই গান পেয়ে গেল "জীবনমুখী" তকমা। এইভাবেই যুবসমাজের ক্রাইসিসকে কথা ও সুরে বেঁধে রেওয়াজী কন্ঠ নিয়ে দাপটের সঙ্গে আবির্ভূত হলেন নচিকেতা চক্রবর্তী। যুবসমাজের কাছে জনপ্রিয় "নচিকেতা"হয়ে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিশিষ্ট অভিনেতা অঞ্জন দত্তও এলেন "জীবনমুখী" সংগীত শিল্পী হয়ে।
এরপর এর "বাংলা ব্যান্ড"। যেখানে প্রাধান্য পেতে লাগলো সম্মিলিত যন্ত্রানুষঙ্গ। একাধিক ব্যান্ডের গান জনপ্রিয় হলেও এইসময় থেকেই আবার অধঃপতন শুরু হলো বাংলা গানের। গান না শিখে, বেসুরো কন্ঠ নিয়ে এবং যন্ত্রের অযথা দাপাদাপিতে গান নয় মুখ্য হয়ে উঠল বিকৃত অঙ্গভঙ্গি। বর্তমানেও বাংলা সংগীত জগতে অসংখ্য বেসুরোদের দাপাদাপি। যারা রাজনৈতিক আনুগত্যে দিনের পর দিন মঞ্চ পেয়ে আসছেন। বিশেষকরে পূর্বতন শাসকদলের আমলে, অনুগ্রহের বাড়বাড়ন্তে যথার্থ যোগ্য শিল্পীদের বঞ্চিত করে অযোগ্যদের প্রাধান্য দেওয়া বাংলা গানের সর্বনাশের অন্যতম কারণ। সঠিক নির্বাচন কে গুরুত্ব না দিয়ে আনুগত্যের রমরমার প্রতিফলন এখনও মাঝে মাঝে দেখি দূরদর্শনের এক রাষ্ট্রীয় চ্যানেলে। কীভাবে এরা শিল্পীর মর্যাদা পান ভাবতে অবাক লাগে। ইদানিং এই বাংলা গানের আরও ক্ষতি করছে "হ্যান্ডসেট" উৎসারিত "ট্র্যাক মিউজিক" সিস্টেম। বাড়িতে হারমোনিয়াম থাকলেও অনেকের বাড়িতে
সেই হারমোনিয়াম এখন ধুলোয় ঢাকা পড়েছে। সস্তায় জনপ্রিয়তা হয়তো পাওয়া যায় কিন্তু প্রকৃত,
প্রশিক্ষিত শিল্পী হওয়া যায়না।
একসময় দেখেছি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, পিন্টু ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতী মুখোপাধ্যায়, বনশ্রী সেনগুপ্তদের হারমোনিয়াম নিয়ে বসে বসেই আসরের পর আসর মাতিয়ে রাখতে। আমাদের বাংলার সবচেয়ে সম্পদ সুরের রাগ- রাগিনী। যার উৎসও কিন্তু সেই প্রকৃতি। তাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। অথচ সংগীতের রাগ-রাগিনীকে আমরা অধিকাংশ বাঙালি অকারণ জটিলতার তকমা দিয়ে অজান্তেই উপেক্ষা করি। আমাদের চারপাশের লোক সংগীত, বাউল গান সব কিন্তু এই রাগ রাগীনির প্রচ্ছন্ন মোড়কে প্রকৃতি থেকে উৎসারিত। তাকে উপেক্ষা করার সাধ্য কার?
ঠিক যেভাবে রবীন্দ্রনাথের গানেও আমরা খুঁজে পাই বিভিন্ন রাগ-এর মুর্ছনা। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি গানের কথা মনে পড়ছে। গানটিতে রয়েছে প্রকৃতির একটি ভয়াল রূপ। মল্লার জাতীয় সারং রাগাশ্রিত গানটি হল-----
"গহন ঘন ছাইল গগন ঘনাইয়া
স্তিমিত দশ দিশি স্তম্ভিত কানন
সব চরাচর আকুল
কী হবে কে জানে......"
এমন অসংখ্য, অজস্র কত গান গ্রীষ্ম, বর্ষা,শরৎ বিভিন্ন ঋতুতে। সবই প্রকৃতি উৎসারিত।
এর সঠিক অন্বেষণের জন্য, অনুধাবনের জন্য প্রয়োজন অনুশীলন ও চর্চা। যা আমাদের, বাঙালিদের চিরকালীন সম্পদ। তাকে অস্বীকার ক'রে প্রকৃত সংগীত শিল্পী হওয়া কখনো সম্ভব নয়। এই ধারা, ঐতিহ্য নিয়েই বাংলা গানের প্রবাহ ঝর্নার মতোই চিরন্তন, চিরকালীন।

No comments:
Post a Comment