Tuesday, June 2, 2026


 

তিস্তারানী 
মিষ্টু সরকার

যত জীবনবোধ, চিন্তা, চেতনা তিস্তায় ফেলে রেখেছি। যত ছুটি ছুটি ঘোষণা ওর পাড়েই। রোদঢলা বন্ধুত্বে মোড়া আনন্দ বিকেলগুলি ওর কাছেই গোপন ঘুচিয়েছে। এই গোপন দরজার চাবির মতো একটা করে অবাধ ঢেউ আসে, হাসে; আবার মিলিয়ে যায়। নিত্যকর্ম সারতে সারতে দুঃখ সুখের পুঁটুলি বেঁধে সে পালাই পালাই করতে করতে এ মাথা কে খর করে ও মাথায় গিয়ে বসত গড়ে। আমাদের ভালোমন্দের যত খুঁটিনাটি সব যেন ওর অন্তরনির্মিত প্রকল্পের বাঁধা হিস্সা। সে চড়ুইভাতি হোক বা পড়ন্ত বিকেলের ঘোরাঘুরি বা ফুচকার পেট গলানো অম্লমধুর জলে তৃপ্তির ঢেঁকুর ।

ওকে ঘিরেই এই মরশুমে মাঝি পরিবার গুলি প্রাণপণে প্রাণে ভরে ওঠে। সারা বছরের শুষ্ক বালিয়াড়ির হিসেব'কে তোয়াক্কা না করেই বৃষ্টি পেয়ে হেসে ওঠে।  এইসময়ে গুটিগুটি পায়ে আবার চলে আসে ওর দোসর শ্রাবণ। আহ্লাদে আমোদে অবাধ যৌবনের ঢলোঢলো ভঙ্গিমায় আবার সেজে উঠেছে ওদের প্রণয়পাশা । খেলা জমে উঠলে তারা এক-অচ্ছেদ্য, আর তখন আমরা তার খেলার দোসর। হালের মাঝি আধছেঁড়া ফতুয়ায় ঘাম শুকিয়ে ফের বুকের পালে হাওয়া ভরে। আশায় বেঁধে তোড়জোড় শুরু করে তার ডিঙ্গি নৌকাটির। সদ্য ঘরে আনা নতুন পটেরবিবির মতো খেয়াল রাখে যত্ন করে। গাবের আঠা ঘষে চেকনাই বাড়ায়, জলের তোড়েও সে চেকনাই গায়েব হবার জো নেই। টিকিয়ে রাখতে সক্ষম তার কাঠের শরীর। মখমলে চোলির নতুন আবরণে, ঠেস তাকিয়ায়, কাগুজে ফুলের সাজে সাজিয়ে তোলে তার সর্বাঙ্গ। সামান্য সঞ্চয়ের আভরণের পরিমিতি ব্যাপ্তি ছাড়িয়ে যায় যখন রঙিন উজ্জ্বল ফুলকারী পাল তার নাকফুল হয়ে প্রতি নিঃশ্বাসে আভাময় দ্যুতি ছড়িয়ে দেয় অস্তগামী বিকেলের আভায়; ফাঁপানীল আর সবুজে বোনা ধনেখালির আঁচলের পটভূমিতে। সে দ্যুতি হয়ে ওঠে পথচারী ও যাত্রীদের হৃদয়হরণ। কখনো যাত্রী গান ধরে ভাবাবেগে, কখনো মাঝি হয় সুখ-দুঃখের কথক। জলভেঙ্গে চলার এই খেলায় সাথে পায় জলা ও তীরবর্তী ধানিজমি, ঘাস, শন, বড়ো কোনো গাছ। জল বাড়লে আনন্দ উপচায়। কখনো ঝিরঝিরে বৃষ্টি কখনও বা বড়োদানার বৃষ্টিছাট সিগ্ধ হাওয়ার ঝাপটায় চোখেমুখে পড়ে মনকে চনমনে করে তোলে। মুহূর্ত থমকে যায় জলজীবনে, ভালোবাসার বৈতরণী পারাপারের অন্নদামঙ্গল গায় মাঝি। জলজীবনের আহ্বানে তখন পৃথিবীর সব সুখ ফিকে হলুদ ।

সন্ধ্যে ঘনানোর আগমুহূর্তে দিগন্তের ক্যানভাস তীব্র নৈসর্গিক। পশ্চিম আকাশি রঙের সাথে ছোপানো হলদে ও গৈরিকের জলরঙের প্যালেট ছড়িয়ে পড়ে আর আদরের চাদরে মুড়ে নেয় নৈঋত কোণটিকে। ধ্রুবতারা'র সাথে অমাবস্যার পরের সন্ধ্যার কুমড়োফালির মতো নতুন চাঁদ পশ্চিম আকাশে যখন স্বল্প সময়ের জন্য আসে, তখন তা দেখে পথ চিনে নেয় সজাগ মাঝি। শেষসন্ধ্যায়  গৃহপন্থী বকের দলও স্বাক্ষী হয়ে থাকে এই অহেতুকি হাসিরাশি গানপ্রাণের। মাঝ দরিয়ায় পালকির মতো দুলকি চালে চলে কনেবউয়ের নৌকো। যাত্রী হেলে পড়ে খলখল হাসে যেনো এমন হাসি সে কতকাল হাসতে পায়নি। মুহূর্তের সুখকে উপচার করে অনাগত দিনের ঝোলার আধারে ভরে। পারাপার বিনিময় মূল্যের চেয়ে হাসির মূল্য ছাপিয়ে ওঠে, দু-হাতের পাতায় গুঁজে আনন্দধন স্বরূপ কিছু বেশি দিতে পিছপা হননা যাত্রীরা। মাঝি অন্তরীক্ষকে স্বাক্ষী রেখে সযতনে সেই বর্ষালক্ষ্মী কপালে ঠেকায়। নদী পাড়ে দাঁড়িয়ে তখন অন্যরা ভাসমান দর্শনার্থী। বরাত ফেরে কেউ ঠাঁই পায় কেউ পায় না। 

বেলাশেষের খেলাটি উপভোগ করতে নৌকো তীরের গায়ে লাগার আগেই গুটিগুটি পায়ে চলে যায় কেউ কেউ পরবর্তী যাত্রী হয়ে। যারা এযাত্রায় সোনার তরীর ঠাঁই পেলেনা, মাঝি মুখচিনে আগামীর ঠাঁই নিশ্চিত করে হাত নেড়ে। 

এ যাত্রার টুপটাপ বৃষ্টির রেশ বয়ে আলো আঁধারিতে বাড়ি ফেরে। 

No comments:

Post a Comment