রাজকীয় ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও হৃদয় বিদারক ইতিহাসের সাক্ষী নম পেন শহর
ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়
কম্বোডিয়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ইন্দোচীন উপদ্বীপের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত একটি দেশ।দেশটি টোনলে সাপ হ্রদ ও মেকং বদ্বীপের চারপাশে একটি কেন্দ্রীয় প্লাবনভূমি নিয়ে গঠিত।এটি পাহাড়ি অঞ্চল দ্বারা বেষ্টিত একটি ঐতিহ্যবাহী দেশ। এই দেশের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর হল নমপেন। নমপেনের সমৃদ্ধ রাজকীয় ঐতিহ্য, খেমার সংস্কৃতি ও খেমার রুজ শাসন আমলের হৃদয়বিদারক ইতিহাস পড়ার পর থেকে শহরটিকে দেখার খুব ইচ্ছে ছিল।২০২৫ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর সেই ইচ্ছা পূরণ হল। এটি ছিল আমাদের পারিবারিক আন্তর্জাতিক ভ্রমণ। আমার মেয়ে চার মাস আগেই অনলাইনে ই.ভিসা ফ্লাইটের টিকিট হোটেল সব বুক করে রেখেছিল। এগারো তারিখ রাত সাড়ে বারোটার ফ্লাইটে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। ভোরে কুয়ালালামপুর পৌঁছে ফ্লাইট পরিবর্তন করে কম্বোডিয়ার ফ্লাইট ধরলাম। সকাল দশটায় নম পেন পৌঁছে দেখলাম এয়ারপোর্টের বাইরে আমাদের নাম লেখা ব্যানার নিয়ে হোটেলের গাড়ির ড্রাইভার দাঁড়িয়ে আছে। পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে শহরের মাঝখানে রাজবাড়ির কাছাকাছি কিং গ্র্যান্ড হোটেলে পৌঁছালাম। ফ্রেশ হয়ে ঐ গাড়িতেই শহর পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়লাম।
ওখানে টুকটুক ভাড়া করেও শহরের সব ট্যুরিস্ট স্পট ঘোরা যায় তবে সেদিন প্রচন্ড গরম ছিল আর আমরা সারারাত জার্নি করে একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম তাই গাড়িতে ঘোরাই স্থির করলাম। দুপুর বারোটায় নমপেন শহরে জীবনযাত্রা আধুনিক ও গতিময়। জানলা দিয়ে দেখছিলাম দ্রুতগতিতে ছুটে চলা মোটরবাইক, ব্যস্ত স্থানীয় বাজার এবং হকাররা তাজা নুডলস থেকে শুরু করে ঝলসানো কলা ও ব্যাঙের পা পর্যন্ত সবকিছু বিক্রি করছে।
আমাদের ড্রাইভার ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে শহর সম্পর্কে অনেক কিছু ইনফরমেশন দিচ্ছিলেন। আজকের যাত্রায় তিনিই আমাদের ট্যুর গাইড। তাঁর নাম চান লিম। কম্বোডিয়ায় নিয়ম হল আগে টাইটেল পরে নাম।আমার মেয়েকে তিনি বললেন তাঁকে পউ বলে ডাকতে,কম্বোডিয় পউ শব্দের অর্থ কাকা।তাঁর কাছ থেকে জানলাম, এখানে একটি গল্প প্রচলিত আছে পেন নামের এক বৃদ্ধা প্রাচীন কালে মেকং নদীর তীরে ভেসে আসা চারটি বুদ্ধ মূর্তি আবিষ্কার করেন, তারপর তিনি সেগুলোকে একটি পাহাড়ে স্থাপন করেন, যা পরবর্তীকালে নমপেন বা পেনের পাহাড় নামে পরিচিতি লাভ করে। সেই থেকে এই শহরের নাম নমপেন।মেকং, টনলে সাপ এবং বাসাক নদীর সঙ্গমস্থলে এর কৌশলগত অবস্থানের কারণে, নমপেন ধীরে ধীরে একটি বড় শহরে পরিণত হয়। ১৮০০-এর দশকের শেষের দিকে ফরাসি শাসন আমলে শহরটি 'এশিয়ার মুক্তা' নামে খ্যাতি পেয়েছিল।
নমপেন শহরের আধ্যাত্মিক দিকটি মূলত থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম। প্রাত্যহিক জীবনের পাশাপাশি এখানকার সংস্কৃতি ও স্থাপত্যে আধ্যাত্মিকতার গভীর ছাপ রয়েছে। তাই গাইড প্রথমে আমাদের নিয়ে গেলেন এখানকার বিখ্যাত আধ্যাত্মিক বৌদ্ধ মঠ ওয়াট নম (Wat Phnom),শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি কৃত্রিম পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। এটি ১৩৭৩ সালে দাউন পেন নামে এক ধনী বিধবা নির্মাণ করেছিলেন, ৪৬ মিটার উঁচু এই মন্দিরটি নম পেন শহরের প্রধান মঠ ও শহরের নামের উৎস।স্থানীয় মানুষ এখানে সুখ, সমৃদ্ধি এবং ভালো ভাগ্যের জন্য প্রার্থনা করতে আসেন। কিন্তু মন্দিরটি বিশেষ প্রার্থনার কারণে এক ঘন্টার জন্য বন্ধ থাকায় আমরা সিঁড়ি ভেঙে উঁচুতে আর উঠিনি।তবে তোরণের দু পাশে দুটি ইন্টারেস্টিং ব্যাপার নজরে এল। দেখলাম একজন কম্বোডিয় গণক ঠাকুর, তিনি অনেকগুলি ধূপ জ্বালিয়ে রেখে বসে আছেন, পাশেই দান পাত্র, তাঁর সামনে একজন লোক ধূপগুলি হাতে তুলে মাথায় খানিকটা কাছে নিয়ে মনে মনে কি যেন প্রার্থনা করলো তারপর একটি ধূপ সেখান থেকে তুলে নিল।তখন গণক ঠাকুর সেই ধূপটি নিজের হাতে নিয়ে তার ভাগ্যে কি আছে নিজের ভাষায় বলতে লাগলেন। অবশ্য সেই ভাষা ও তার অর্থ আমি কিছুই বুঝিনি।
দ্বিতীয় ব্যাপারটি আমার বেশ ভালো লেগেছে। গেটের পাশে অনেক পাখি বিক্রেতা ছোট ছোট পাখিতে ভরা ছোট খাঁচা বিক্রি করছিলেন।এই খাঁচাগুলোর দাম ১০ ডলার আর প্রতিটিতে রয়েছে ১৫-২৫টি ছোট চড়ুই পাখি।সেখানে এই পাখি কিনে অনেকেই ছেড়ে দিচ্ছে।এই চড়ুই পাখিগুলোকে ছেড়ে দেওয়ার প্রথাটি হল নতুন আশীর্বাদকে স্বাগত জানানো আর অতীতের যেকোনো দুর্ভাগ্যকে বিদায় জানানোর প্রতীক।আমি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছিলাম কিন্তু ড্রাইভার এমন তাড়া দিলেন যে তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে পড়তে বাধ্য হলাম।
এখন আমরা চললাম অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মঠে, এটির নাম ওয়াট উনালম (Wat Ounalom Monastery), এটি কম্বোডিয়ার বৌদ্ধধর্মের প্রধান কেন্দ্র এবং সর্বোচ্চ ধর্মগুরুর বাসস্থান। প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো এই মঠটিতে বুদ্ধের একটি ভ্রুর চুল সংরক্ষিত আছে।১০০০-এরও বেশি সন্ন্যাসীর আবাসস্থল এবং ৩০,০০০ বইয়ের বিশাল লাইব্রেরি সম্বলিত এই মঠটি খেমার রুজ আমলে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরবর্তীতে সুন্দরভাবে পুনরায় নির্মান করা হয়। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ ও বৌদ্ধ মন্ত্র উচ্চারণে মন শান্ত হয়ে গেল। খুব ভালো লাগলো।
পথে যেতে যেতে ভাবছিলাম এদেশের ইতিহাস, সত্যি এখানকার ইতিহাস বহুস্তরীয় ও জটিল। প্রাচীন রাজ্যসমূহ ও আঙ্কোরের উত্থান থেকে শুরু করে ফরাসি শাসন এবং পল পটের অধীনে নৃশংস খেমার রুজ যুগ পর্যন্ত, এর ইতিহাসে জয় ও পরাজয়ের সংমিশ্রণ ঘটেছে।
উনিশ শতকে এদেশে ফরাসিরা আসে, এখানকার প্রশস্ত রাজপথ ও ঔপনিবেশিক ভিলাগুলোতে এখনও তাদের প্রভাব দেখা যায়। কিন্তু কম্বোডিয়ার ও বিশেষ ভাবে নমপেনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়টি আসে ১৯৭০-এর দশকে খেমার রুজের শাসনামলে।১৯৭৫ সালে খেমার রুজ কম্বোডিয়ায় ক্ষমতায় এলে তারা নমপেন শহরের সমস্ত বাসিন্দাদের গ্রামাঞ্চলে তাড়িয়ে দেয়।১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামী বাহিনী কম্বোডিয়ায় আক্রমণ করে খেমার রুজকে উৎখাত না করা পর্যন্ত শহরটি কার্যত জনশূন্য ছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে নমপেন শহরে ধীরে ধীরে পুনরায় জনবসতি গড়ে ওঠে। খেমার রুজরা কম্বোডিয়ার শিক্ষিত শ্রেণীর কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল তাই শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি দীর্ঘ ও কঠিন পুনরুদ্ধার পর্বের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এই সব নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল গাইড কাম ড্রাইভার মিস্টার লিমের সঙ্গে, তিনি এবার নিয়ে চললেন এই দেশের করুণ অথচ মূক ইতিহাসের নিদর্শন স্থল দেখানোর জন্য।
আমরা পৌছালাম টুল স্লেং গণহত্যা জাদুঘর (এস-২১)।একসময় এটি ছিল মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরে এই ভবনটি খেমার রুজ শাসনামলে এক কুখ্যাত কারাগারে পরিণত হয়েছিল।রুজ কারাগারের সংরক্ষিত কক্ষগুলো এবং প্রতিদিনের অত্যাচারের কাহিনীগুলো দেশটির অন্ধকারতম অধ্যায়ের এক মর্মস্পর্শী চিত্র তুলে ধরে। এস ২১এ খেমার রুজের বাহিনীর অত্যাচারের বেশিরভাগ ভুক্তভোগী ছিলেন নমপেন শহরের নিরীহ বাসিন্দারা, সৈন্য, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, ডাক্তার, শিক্ষক, ছাত্র, কারখানার শ্রমিক, ভিক্ষু, প্রকৌশলী সকলেই। পরবর্তী সময়ে, দলের নেতৃত্বের সন্দেহবাতিকতা তাদের নিজেদের দলের দিকেই ঘুরে যায় এবং দেশজুড়ে চালানো শুদ্ধি অভিযানের ফলে হাজার হাজার দলীয় কর্মী এবং তাদের পরিবারকে টুল স্লেং-এ নিয়ে আসা হয়, যেখানে তাদের হত্যা করা হয়।
এখানে অডিও সহ জনপ্রতি টিকিটের মূল্য দশ ডলার বা ৮৪৫ টাকা। আমরা টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। মিউজিয়ামে চারটি প্রধান ভবন রয়েছে, যেগুলো বিল্ডিং এ, বি, সি এবং ডি নামে পরিচিত। বিল্ডিং এ-তে সেই বড় সেলগুলো রয়েছে, যেখান থেকে সর্বশেষ নিরীহ মানুষদের মৃতদেহগুলো আবিষ্কৃত হয়েছিল। বিল্ডিং বি-তে রয়েছে ছবির গ্যালারি। বিল্ডিং সি-তে বন্দীদের জন্য ছোট ছোট সেলে বিভক্ত কক্ষগুলো রয়েছে। বিল্ডিং ডি-তে নির্যাতনের সরঞ্জামসহ অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন রাখা আছে।অন্যান্য কক্ষগুলোতে কেবল একটি মরিচা ধরা লোহার খাটের কাঠামো রয়েছে, যার উপরে একটি সাদা-কালো ছবি টাঙানো আছে। অবশিষ্ট কক্ষগুলোতে পায়ের বেড়ি এবং নির্যাতনের সরঞ্জাম সংরক্ষিত আছে।এগুলোর সাথে রয়েছে প্রাক্তন বন্দী ভান নাথের আঁকা কিছু ছবি তার মধ্যে নির্যাতিত মানুষের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে।দেখেছি ঘুরে ঘুরে তবে এই সব দৃশ্য বেশিক্ষণ সহ্য করা যায়না, ভিতরে ভিতরে খুব কষ্ট হচ্ছিল।অডিও সিস্টেমটি সঙ্গে থাকায় পুরো ঘটনা শুনতে পেলাম,মর্মান্তিক সেইসব ঘটনা।
বিল্ডিং এর বাইরে বাগানে একটি শান্তির প্রতীকী মূর্তি আছে।সেখানে বসে শান্তি প্রার্থনা করলাম। এর কিছু দূরে রয়েছে চোয়েং এক কিলিং ফিল্ড,বর্তমানে এটি একটি শান্তিপূর্ণ স্থান,এখানে একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। ১৯৮৮ সালে নির্মিত স্মৃতিস্তূপটির স্বচ্ছ কাঁচের প্যানেলগুলোর পেছনে খেমার রুজ আমলে নিহত মানুষের ৮০০০-এরও বেশি মাথার খুলি সংরক্ষিত আছে। তবে আমাদের সেখানে যাওয়া সম্ভব হয় নি কারণ সেখানে নতুন সংস্কারের কাজ চলছিল।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য এখানকার সব থেকে বিখ্যাত পর্যটক প্রিয় জায়গা রয়্যাল প্যালেস বা রাজবাড়ি।১৮৬৬ সালে রাজা নরোদমের আমলে রাজধানী উদং থেকে নম পেনে স্থানান্তরিত হওয়ার পর বর্তমান রাজপ্রাসাদটি নির্মিত হয়। এটি আজও কম্বোডিয়ার রাজাদের সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।১৯৭০-এর দশকে খেমার রুজ শাসনামলে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয় এবং রাজপরিবারের অনেক সদস্যকে হত্যা বা নির্বাসিত হতে হয়।দীর্ঘ সংঘাতের পর ১৯৯৩ সালে সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাজতন্ত্র ফিরে আসে। বর্তমান রাজা নরোদম সিহামোনি এখান থেকেই রাজকার্য পরিচালনা করেন।রাজপ্রাসাদটি বর্তমানে কম্বোডিয়ার ঐশ্বর্য, ঐতিহ্য এবং সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের প্রধান প্রতীক।
দূর থেকে দেখছিলাম শহরের আকাশরেখার বিপরীতে এর সোনালি চূড়াগুলো রৌদ্রের আলোতে ঝলমল করছিল, খুব সুন্দর সেই দৃশ্য। শুনলাম রাজা সবসময় এখানে থাকেন না যখন আসেন তখন নীল পতাকা উড়তে দেখা যায়।বিভিন্ন ভবনগুলোতে ঐতিহ্যবাহী খেমার নকশার পাশাপাশি ফরাসি ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের মিশ্রণ লক্ষ্যণীয়।
পর্যটকদের শুধুমাত্র সিংহাসন কক্ষ এবং এর আশেপাশের কয়েকটি ভবন পরিদর্শনের অনুমতি রয়েছে। সকল দর্শনার্থীকে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা শর্টস এবং কনুই পর্যন্ত লম্বা টি-শার্ট বা ব্লাউজ পরতে হবে অন্যথায় টিকিট কাউন্টার থেকে শরীর ঢাকার জন্য একটি উপযুক্ত লুঙ্গি কিনতে হবে।
জনপ্রতি ৮৩৫ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে আমরা বিশাল তোরণ দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম।প্রাচীর দিয়ে এই চত্বরটি চারটি প্রধান প্রাঙ্গণে বিভক্ত। দক্ষিণ দিকে রয়েছে রৌপ্য প্যাগোডা, উত্তর দিকে খেমারিন প্রাসাদ, কেন্দ্রীয় প্রাঙ্গণে রয়েছে সিংহাসন কক্ষ এবং পশ্চিমে রয়েছে ব্যক্তিগত এলাকা বা অন্তঃপুর। প্রাসাদের ভবনগুলো সময়ের সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে নির্মিত হয়েছিল এবং ১৯৬০-এর দশকেও কিছু ভবন ভেঙে পুনরায় নির্মাণ করা হয়েছিল। কিছু পুরোনো ভবন ঊনবিংশ শতাব্দীর।
আমরা পায়ে পায়ে এগিয়ে চললাম, প্রথমে দেখলাম খেমারিন প্রাসাদ। এই প্রাসাদ কম্বোডিয়ার বর্তমান রাজা নরোদম সিহামোনির সরকারি বাসভবন। প্রাসাদের ভেতরের অংশে পর্যটকদের প্রবেশ নিষেধ, তবে বাইরের স্থাপত্যের সৌন্দর্য চমৎকার। ক্যামেরায় সেই সৌন্দর্য ধরে রাখলাম।
এরপরে চোখে পড়ল রাজবাড়ির বড় সম্পদ সিলভার প্যাগোডা।অসাধারণ এই কক্ষের সৌন্দর্য।এটি পান্না বুদ্ধের মন্দির নামেও পরিচিত। এর মেঝে ৫ টন ঝকঝকে রুপো দিয়ে ঢাকা থাকায় এর এমন নামকরণ হয়েছে রৌপ্য প্যাগোডা। প্রবেশপথের কাছে থাকা ৫০০০ টালির কয়েকটি মাত্র উঁকি দিয়ে দেখতে পেলাম, সুরক্ষার জন্য বেশিরভাগই ঢাকা ছিল। ভেতরে মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি সারি সারি জমকালো বুদ্ধ মূর্তি রয়েছে।সিলভার প্যাগোডায় যাওয়ার সিঁড়িটি ইতালীয় মার্বেল পাথরে তৈরি। রুপালি মেঝের সাথে পাল্লা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পান্না বুদ্ধ, যা একটি চিত্তাকর্ষক সোনালি বেদীর উপর স্থাপিত এক অসাধারণ ব্যাকারাট-ক্রিস্টালের ভাস্কর্য। এখানে রয়েছে ২০৮৬টি হীরা দিয়ে সজ্জিত আরো কয়েকটি সোনার বুদ্ধ মূর্তি, সেগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড়টির ওজন ২৫ ক্যারেট।এছাড়া সিলভার প্যাগোডা ভবনের দেওয়ালে এবং এর ভিতরের ছোট জাদুঘরে রাজপরিবারের পোশাক, গয়না এবং ঐতিহ্যবাহী অস্ত্রশস্ত্র সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত আছে। আমরা খুব মনোযোগ দিয়ে সেগুলি দেখলাম।
এরপরে চলে গেলাম আমরা সিংহাসন হলে,রাজপ্রাসাদ চত্বরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো সিংহাসন কক্ষ , কক্ষটির শীর্ষে আংকর-এর বায়ন শৈলীর সমতুল ৫৯ মিটার উঁচু একটি মিনার রয়েছে। এর ছাদের সূক্ষ্ম খোদাই কাজ এবং ভেতরের রাজকীয় সিংহাসন দেখার মতো।এই কক্ষটি রাজ্যাভিষেক এবং কূটনীতিকদের পরিচয়পত্র পেশের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হয়। একসময় এখানে প্রদর্শিত অনেক জিনিসপত্র খেমার রুজ ধ্বংস করে দিয়েছিল।
এরপরে নজরে পড়ল মুনলিট হল বা চাঁদনি প্যাভিলিয়ন,এটি একটি উন্মুক্ত প্যাভিলিয়ন এখানে অতীতে ও বর্তমানে সিয়াম শাস্ত্রীয় নৃত্যের মঞ্চ হিসেবে সজ্জিত আছে। এটি প্রাসাদের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ভবন, কারণ প্রাসাদের প্রাচীরের একটি অংশের পাশেই নির্মিত হওয়ায় বাইরে থেকে সহজেই দেখা যায়। এটি এমন একটি প্যাভিলিয়ন যেখানে জনতার উদ্দেশে রাজার ভাষণ দেওয়ার মঞ্চ এবং রাষ্ট্রীয় ও রাজকীয় ভোজসভা আয়োজনের জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২০০৪ সালে রাজা নরোদম সিহামোনির রাজ্যাভিষেকের সময় প্যাভিলিয়নটি একটি ভোজসভা এবং নতুন রাজার জন্য মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ।
মূল ভবনের বাইরে আরও অন্যান্য অসাধারণ স্থাপত্যও রয়েছে। পূর্বদিকে সাদা ঘোড়ার উপর উপবিষ্ট রাজা নরোদমের মূর্তি ও সেটির উত্তরে গ্রন্থাগার। উত্তর-পশ্চিম কোণে ঘণ্টাঘর আর দক্ষিণে চারটি সুন্দর স্থাপত্য রয়েছে।পশ্চিম থেকে পূর্বে মহামান্য রাজা নরোদম সুরামরিত এবং রানী সিসোওয়াত কোসামাকের চেদি (স্তূপ), ধর্মশালা, রাজকুমারী কান্থা বুফার চেদি এবং পাহাড় মন্ডপের চমৎকার কারুকাজ এক কথায় বিস্ময়কর। স্থাপত্যগুলোকে ঘিরে থাকা দেয়ালটি রিয়ামকারের চমৎকার মহাকাব্যের চিত্র দিয়ে আবৃত, কিন্তু অযত্নের কারণে বছরের পর বছর ধরে চিত্রকর্মের নিচের অর্ধেক বিবর্ণ হয়ে গেছে।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম তবু ও এখানকার স্থাপত্য শৈলী দেখে বার বার মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম ।
রাজবাড়ির অভ্যন্তরে সিলভার প্যাগোডা বা রৌপ্য মন্দিরের ঠিক সামনের বাগানে আঙ্করভাট মন্দিরের একটি চমৎকার ক্ষুদ্র সংস্করণ বা মডেল প্রদর্শনীর জন্য রাখা আছে। এটি দেখে খুবই ভালো লাগলো ।
প্রাসাদের চারপাশের বাগানগুলো অত্যন্ত পরিপাটি ও সুন্দর। দুপাশে নানা ধরণের প্রদর্শনী, সোনার গাছ, পালকি ইত্যাদি দেখতে দেখতে তোরণ পার হয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
কাছেই কম্বোডিয়া জাতীয় জাদুঘর, আমরা পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম। শীততাপনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় ক্লান্তি দূর হল আর খেমার স্থাপত্য ও নকশার নিদর্শন দেখতে বেশ ভালই লাগছিল। জনপ্রতি ৮৪০ টাকার টিকিট কেটে নিয়মানুসারে বাম দিক থেকে দেখা শুরু করলাম। প্রথমে দেখলাম ব্রোঞ্জের শায়িত বিষ্ণু মূর্তির একটি বড় খণ্ডাংশ, যার মধ্যে তুলনামূলকভাবে অক্ষত মাথা, কাঁধ এবং দুটি বাহু রয়েছে,এটি ১৯৩৬ সালে আংকর ওয়াটের নিকটবর্তী পশ্চিম মেবন মন্দির থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। এরপর গেলাম দক্ষিণ প্যাভিলিয়নে সেখানে রয়েছে প্রাক-আংকরীয় সংগ্রহ আর বিশেষ ভাবে দেখলাম ৬ষ্ঠ শতাব্দীর একটি চিত্তাকর্ষক আট-বাহুবিশিষ্ট বিষ্ণু মূর্তি এবং কম্পং থম প্রদেশের প্রাসাত আন্দেত থেকে প্রাপ্ত শিব ও বিষ্ণুর গুণাবলী সমন্বিত একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা হরিহর মূর্তি। শিবের বেশ কয়েকটি আকর্ষণীয় মূর্তি ও কুস্তিরত একজোড়া বিশাল বানরের মূর্তি দেখে বিস্ময়ের সীমা রইল না। এছাড়া মৃৎপাত্র ও ব্রোঞ্জের নিদর্শনের সঙ্গে একটি সুন্দর কাঠের রাজকীয় নৌকার মতো অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক শিল্পকর্মও সেখানে রয়েছে।
জাদুঘর ভ্রমণ শেষে আমরা চা পান করলাম ও হাল্কা টিফিন করে চললাম পরবর্তী গন্তব্যের দিকে। এরপরে আমরা গেলাম সোনালি নৌকা মন্দির বা ওয়াট সম্পভ ট্রেইলাক মন্দির। এটিও একটি ঐতিহ্যবাহী থেরবাদী বৌদ্ধ মন্দির, এটি টোনলে স্যাপ এবং মেকং নদীর মিলনস্থলের কাছে চ্রোয় চ্যাংভার উপদ্বীপে অবস্থিত। মন্দিরটির মূল গঠন একটি সোনালী নৌকার আকৃতিতে তৈরি। এর ব্যাতিক্রমী আকৃতি, শান্ত পরিবেশ ও সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকরা পছন্দ করেন।এর দু দিকের দুটি তোরণের কারুকার্য খুব সুন্দর।নৌকার ওপর মন্দিরের মূল উপাসনালয় বা প্যাগোডাটি অবস্থিত। এতে ঐতিহ্যবাহী খেমের স্থাপত্যের ছোঁয়া এবং সোনালী রঙের চমৎকার কারুকার্য দেখে প্রশংসা করতেই হবে।মূল মন্দিরটির দরজা বন্ধ থাকায় ভিতরে যেতে পারি নি।এর পিছনে অনেক বছরের পুরোনো বিশাল বট গাছ।পাশে আরেকটি মন্দির তার মাথায় বড় নাগের ফণা। শুধু যে এই মন্দিরেই তা নয় রাজবাড়িতেও কয়েকটি প্যাভিলিয়নে সিঁড়ির দুপাশে নাগের ফনার ভাস্কর্য দেখেছি। নাগের ফণার ভাস্কর্যর কোন গুরুত্ব আছে কি না গাইডের কাছে জানতে চাইলাম, তাঁর আধভাঙা ইংরেজি শুনে মোটামুটি বুঝলাম যে নাগ হল বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ ধর্মের পবিত্র রক্ষক।খেমার স্থাপত্যশৈলীতে মন্দিরের প্রবেশদ্বার, সিঁড়ি এবং সীমানা প্রাচীরের রেলিংগুলো নাগের শরীর ও মাথার ভাস্কর্য দিয়ে সাজানো হয়।এটি বিশ্বাস করা হয় নাগ হল মর্ত্যলোক থেকে দেবলোকে যাওয়ার প্রতীকী সেতু।মন্দিরে প্রবেশ করার সময় এই নাগের মূর্তিগুলো যে কোনো অপশক্তি বা অশুভ বাতাসকেও ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়।এছাড়া এখানকার লোককথা ও সংস্কৃতিতে নাগ বা সাপ হলো জল, বৃষ্টি এবং উর্বরতার প্রতীক। যেহেতু এই সোনালি নৌকা মন্দিরটি নদীর অববাহিকায় একটি নৌকার আকৃতিতে নির্মিত, তাই নদীমাতৃক জীবনের সুরক্ষা ও বৃষ্টির দেবতার আশীর্বাদ কামনায় এখানে নাগের ভাস্কর্য বেশি মাত্রায় গুরুত্ব পেয়েছে। এরকম বিস্ময়কর মন্দির আগে কখনো দেখিনি তাই দু চোখ ভরে দেখে নিলাম।
এবার মেকং নদীর ব্রিজের উপর দিয়ে শহরের দিকে গাড়ি ফিরছে। নদীর জলে শেষ বেলার সূর্যের আলো বড় মায়াময়। হোটেলের কাছে সেন্ট্রাল মার্কেটে নামিয়ে দিয়ে আমাদের গাইড গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন। একটি বিশাল আর্ট ডেকো গম্বুজের ভেতরে এই সেন্ট্রাল মার্কেট নমপেনের একটি জমজমাট জায়গা। এখানে সোনার গয়না থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক্স, ফুল এবং স্যুভেনিয়ার পর্যন্ত সবকিছুরই দোকান রয়েছে। এছাড়াও, শহরের অন্যান্য অনেক বাজারের তুলনায় এটি বেশি খোলামেলা এবং এর ভেতরে ঘোরাঘুরি করাও সহজ।বাজারে ঘুরতে ভালোই লাগছিল,বেশ কিছু শপিং ও করলাম।
তারপর পায়ে হেঁটে চললাম হোটেলের দিকে, ফেরার পথে আলোয় ঝলমলে রাতের নম পেন ও প্রাণবন্ত জনজীবন দেখে মনের বিষন্নতা একেবারেই চলে গেল। এখানকার বাসিন্দারা নিশ্চয়ই পূর্ব পুরুষের ব্যাথা বেদনাকে ভুলে গতিময় আলোকিত জীবনকে উদযাপন করার চেষ্টা করছেন। হৃতসর্বস্ব মানুষদের মুখে হাসি ফুটেছে এটাই বড় আনন্দের। শুধু তাই নয় শিক্ষার ক্ষেত্রে এই শহরের দ্রুত উন্নয়ন প্রশংসনীয় কারণ এখানে এখন আধুনিক প্রযুক্তি সহ ৩৮টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ৬০টির বেশি উচ্চশিক্ষা বিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রী পড়াশোনা করছে আর শিক্ষার মান ও যথেষ্ট ভালো।
হোটেলে ফিরে গ্র্যাব থেকে খাবার আনিয়ে নিলাম। ক্লান্ত শরীরের এবার বিশ্রাম নেবার সময়। পরদিন খুব ভোরে উঠে রেডি হয়ে নিলাম। গাড়ি প্রস্তুত। এখন আমরা চললাম আঙ্করভাটের পথে। ভ্রমণের আনন্দ অনুভূতি নিলাম স্মৃতির ঝুলিতে আর বিদায় জানালাম নম পেন শহরকে ....






No comments:
Post a Comment