জমিদারবাড়ির গোপন কুঠরী
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
অবশেষে আমরা চার বন্ধু এসে পৌছলাম নবগ্রাম জমিদারবাড়ির সিংহদুয়ারের সামনে। ট্রেন, বাস, ভ্যান রিক্সায় সারাটা দিন পার হয়ে গেল। সন্ধ্যার আগেই আমরা পৌছে গেলাম জমিদার বাড়ির পুরনো বৃদ্ধ নায়েব মশাই ধরনীমোহন বাবুর অফিসে। ধরনীমোহনবাবু তাদের পুরনো গাইড, নিশিকান্ত কে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিলেন পুরনো জমিদার বাড়ির তিনতলায়।
বাপী,বাবুয়া,ক্ষীরোদ ছোটবেলা থেকে একই স্কুলে পড়তাম। স্কুল থেকে ফেরবার পথে আমরা চারজনই পড়তাম ইংরেজি মাস্টার মশাই তারাপদ ঘোষের কাছে। ইংরেজি ছাড়াও বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতে ছিল তারাবাবুর অগাধ পান্ডিত্য।
মাথায় কাঁচা পাকা চুল,সারামুখে শ্বেতীর দাগ ছিল তারাবাবুর। পানের নেশা ছিল বলে তার ঠোঁট দুটো ছিল লাল। কথা বলার সময় জর্দার একটা মিষ্টি গন্ধ ঘরে ছড়িয়ে পড়ত। পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে শোনাতেন নানা ধরনের রহস্য রোমাঞ্চকর কাহিনি। তিনি নিজেও পড়তেন নানারকম দেশী বিদেশি বই।
" তোরা চলে গেলে পান খাব, পান খেয়ে পড়তে বসব। "এই ছিল তাঁর মুখের কথা। রোজ তাঁর এই কথা বারবার শুনতে শুনতে, আমরাও তাঁকে নকল করে বলতাম, " তুই চলে গেলেই পান খাব, পান খেয়ে পড়তে বসব।"
তিন তলার একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে নিয়ে আমাদের নিয়ে আসলেন আমাদের গাইড, নিশিকান্ত বাবু । গাইডের চোখ দুটো খুবই চেনা কোনো মানুষের মত লাগছিলো। কিন্তু কিছুতেই মনে আসছিল না , যে সে ঠিক কার মতো দেখতে। আমরা চারজন একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলাম। মানুষটা যে বেশ রহস্যময়, এবিষয়ে কোন সন্দেহই রইল না। আমরা চারজন তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম। সে আমাদের সব ঘর গুলো ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলো।
হঠাৎই আমরা লক্ষ করলাম নিশিকান্ত বাবু পান চিবোচ্ছেন। অন্ধকারে তার চোখ দুটো কেমন যেন আলাদা রকম জ্বলজ্বল করছে। সব ঘর গুলোই বেশ পুরনো, এখানে একমাত্র টুরিস্টরা এবং নানান গবেষকরা এখানে ঘুরতে আসেন, গবেষণার সুত্র সন্ধানে। সব ঘরেগুলোতেই ঠিক মিউজিয়ামের মতো বহু প্রাচীন জিনিসপত্র সাজানো। বাঘ, হরিণ, গন্ডারের মাথা সাজানো রয়েছে। আসবাবপত্রগুলোও একটু অন্য একটু বিশেষ ধরনের। একটা ঘরের চার দেওয়ালে পর পর চোদ্দ জন জমিদারের (চোদ্দপুরুষের) ছবি টাঙানো রয়েছে । সব ঘরেই চারিদিকে মাকড়সার জালের আঠা আমাদের চোখে মুখে আটকে যাচ্ছে। ঘরময় একটা পুরনো ভ্যাপসা গন্ধ। কয়েকটা জোনাকি ইতস্তত ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছবি দেখে বেশ বোঝা গেল, শেষ জমিদারই ছিলেন সূবর্ণকান্তি মুখোপাধ্যায়।
নবগ্রাম জমিদার বাড়ির চুন সুরকি ওঠা বিশাল বাড়িটা নিয়ে কতই না রহস্য, কত না কাহিনি। এই জমিদার বাড়ির ঘিরে নানা রকম কাহিনি, আজও লোকমুখে শোনা যায়। তারাবাবুর মুখে শোনা সেই সব রহস্যময় কাহিনির মুখোমুখি আমরা আজ। তাই রহস্য রোমাঞ্চের আর শেষ নেই। এর মাঝেই একটা হোতকা কালো বিড়াল আমাকে গুতো দিয়ে দৌড়ে চলে গেল।
জমিদার বাড়িতে সোনার চালের একটা বাক্স ছিল। তার মধ্যে সব জমিদারদের নাম লেখা একটা সোনার পদ্মফুল ছিল। হঠাৎই একদিন সেই চালের বাক্স থেকে সোনার পদ্মটি উধাও হয়ে যায়। এই ঘটনায় বহু মানুষকে চোর সন্দেহ করে হেনস্তা করা হয়। চুরি যাওয়া পদ্মফুল নিয়ে শুরু হয় নানারকম অশান্তি।
জমিদার সূবর্ণকান্তি মুখোপাধ্যায় জমিদারির প্রায় সব ধন নিঃশেষ করে ফেলেছিলেন, সেই সোনার পদ্মফুলের চোরকে খুঁজতে। অবশেষে অনেক সিপাহি, পেয়াদা, গোয়েন্দা লাগিয়ে সেই সোনার পদ্মফুলসহ বাক্স উদ্ধার করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু এই কাজে তাঁর ধনবল, লোকবল, যৌবন সব শেষ হয়ে গিয়েছিল।
তারাবাবুর কথায়, জেনেছিলাম "ওই সেকেলে মেজতরফের দোতালায় একটা ঘরেই ছিল গোপন একটা কুঠরী। সেই কুঠরী ঘর থেকে ধড় এবং মুন্ডু আলাদা করে ফেলে দেওয়া হতো অপরাধীদের। খুব অহংকারী ছিলেন এই শেষ জমিদার। তাঁর পর পরই নাকি জমিদারী প্রথার বিলুপ্তি ঘটে।
শোনা যায় দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী জমিদার সূবর্ণকান্তি ছিলেন অহংকারী ও দাম্ভিক প্রকৃতির মানুষ । এই জমিদারবাড়ির সামনে দিয়ে কোন প্রজা ছাতি মাথায় চলাচল করতে পারতেন না। জমিদারীর খাজনা বাকী পড়লে কোন অন্যায় করলে, লঘু পাপে গুরু দন্ড দেওয়া হত। প্রজাদের কঠিন শাস্তি দেওয়া হতো। তাই জমিদারকে খুশি করবার জন্য সব প্রজারা তাদের জমির ফলানো ফসল, শাক- সবজি, পুকুরের মাছ, কচি পাঁঠা জমিদার মশাইয়ের জন্য সদর সিংহদুয়ারের পাশে রেখে দিয়ে যেত।
তিনতলার একটা ঘরে অপরাধীদের বন্দী করে রাখা হত। রাতেরবেলা সবার অজান্তে, দু'জন জল্লাদ অপরাধীদের হত্যা করে, ফেলে দিত গোপন কুঠরীতে। সেই মৃতদেহ গিয়ে পড়তো সরাসরি যমুনা নদীর জলে। জোয়ার ভাটার টানে সেই সব মৃতদেহ চলে যেত বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীতে।
সব ঘরগুলো ঘুরে অবশেষে আমরা এলাম সেই অন্ধকার কালো কুঠুরিতে। সেখানে পা রাখতেই আমাদের এক অজানা আশংকায় রক্ত হীম হয়ে এল। দূরে কতগুলো শিয়ালের ডাক শোনা গেল।
হঠাৎ ভাঙা জানালার কপাট দিয়ে আবছা চাঁদের আলোয় আমরা যা দেখলাম, তাতে আমাদের চারজনেরই আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার জোগাড় হল। আমরা লক্ষ্য করলাম, গাইডের মুখে শ্বেতীর দাগ এবং পান খাওয়া লাল ঠোঁট। ঠিক যেন আমাদের ইংরেজি মাষ্টার মশাই তারাবাবু বসানো । আমাদের সাথে কথা বলতে বলতে ধীরে ধীরে অন্ধকার নিকষকালো কুঠুরির সিঁড়ি ধরে নেমে গেলেন, এবং অদৃশ্য হয়ে গেলেন। মুহূর্তের মধ্যে আমরা কুয়োর জলে একটা ভারী বস্তা পড়বার মতো শব্দ শুনতে পেলাম। আমরা পাড়ি কি মরি চারজন, জীবন মরণ পন করে দৌড়ে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে চলে এলাম জমিদার বাড়ির সিংহদুয়ারে। নায়েব মশাই এর অফিসে তখন তালা ঝুলছে।
পরদিন সকালে আমরা চার বন্ধু মিলে চললাম গড় পাড়ায়, ইংরেজি মাস্টার মশাই তারা বাবুর বাড়ির উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে মাস্টারমশাই এর খোঁজ করতেই পাশের বাড়ির এক মহিলা নিচুস্বরে বললেন, " তারা মাস্টার কাল রেললাইন পার হতে গিয়ে ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ে মারা গেছেন।

No comments:
Post a Comment