Tuesday, June 2, 2026


 


   বৈজয়ন্তীমালা

    চিত্রা পাল 


একটা সিনেমা পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছিলাম সেদিন। আজকাল সিনেমা পত্রিকা খুব একটা দেখি না। নাতনী কোথা থেকে নিয়ে এসেছে, বোধ হয় ফেরার পথে কোন স্টল থেকে বা ওর অফিসের কোন কলিগে কাছ থেকে,বাড়িতে ফিরে আমার হাতে দিয়ে বললো,এটা দেখতে পারো, ভালো লাগবে। ইংরেজি সিনেমা পত্রিকা, সবই উঠতি তারকাদের কাহিনী আর ছবি দিয়ে ভরা, আমি এদের সিনেমা দেখিনি,ওদের কার্যকলাপের সাথেও আমি পরিচিত নয়,কাজেই ওই ছবি দেখাটুকুই সার আর কিছু নয়।পত্রিকার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একটা পাতায় চোখ আটকে গেলো,দেখি, বৈজয়ন্তীমালা আর আমাদের অজিতেশ বন্ধোপাধ্যায় এর ছবি, খুব চেনা চেনা মনে হতে ভালো করে পড়তে চেষ্টা করে দেখলুম ওটা আমাদের সময়কার হাটেবাজারে সিনেমার ছবি। তখনকার সিনেমা, যেমন কাহিনীকার তেমন পরিচালক তেমন অভিনেতা অভিনেত্রী সবই উচ্চমানের।আর সব উৎকর্ষের সমাধানে ছবিও হতো চমৎকার। আমি আমার মেয়েকে বললাম এই ছবিটা দেখিয়ে, দ্যাখ, তখন বম্বে থেকে সব বাংলায় সিনেমা করতে আসতো। এখন তো উলটো দিকে যেতে চায় সবাই। আমার মেয়ে ছবি দেখে বললো, `মা, এতো বৈজয়ন্তীমালা। কোলকাতায় গিয়ে বাংলা সিনেমা করেছে?` হ্যাঁ,শুনে বলে, `তুমি একবার বলেছিলে না, তোমরা কার যেন নাম দিয়েছিলে বৈজয়ন্তীমালা?` আমি বললাম, `হ্যাঁ, তোর মনে আছে?আমার তো মনে আছে, সে তো কবেকার কথা।`

তখন সবে এসেছি উত্তরবঙ্গের এই জেলা শহরে নতুন সংসার গড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে।একেবারে পাকাপাকিভাবে থাকার জন্যে। থাকতাম এক কলেজ ক্যাম্পাসে। কলেজ ক্যাম্পাসের আবাসিকরা প্রায় সকলেই এখানে নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়া তরুণ বা যুবক।দু এক মাস অন্তর অন্তরই দক্ষিণ বঙ্গ থেকেকেউ না কেউ এখানে আসছে তখন কাজে যোগ দিতে। সে সময়টায় আবার  বাংলা দেশ থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে বেশ কিছু জন এ দেশে চলে আসছে। এসে নীচু জমি, জলা জায়গা এমন সব জায়গা কিনে,সেটাও আবার  যাদের সঙ্গতি আছে এমন জন সব ঘর বাড়ি বানিয়ে থাকতেও শুরু  করেছে।এমনই অঞ্চল থেকে আমার বাড়িতে কাজ করতে এলো একটি বউ।তাকে নিয়ে এলো এখানকারই এক বাড়িতে কাজ করে সে।তাকে আমি বলেছিলাম বলে।বৌটিকে আমি চিনিনা,জানি না।তার কথাবার্তা সবই ওদের জায়গার ধরণের। ঘরের কাজ যে কতটা জানে, তা জানি না, কিন্তু আমার খুব প্রয়োজন তাই তাকেই আমার ঘরের কাজে বহাল করলাম। কারণ, এক আমার মেয়ে তখন খুবই ছোট, কয়েক মাসের আর আমার স্বামীর একজন পরিচিত,কলকাতা থেকে আসছেন  এখানে কাজে যোগ দিতে্।তিনি প্রথমে আমাদের বাড়িতে থাকবেন। এখন দুজন নতুন মানুষই এলো আমার সংসারে  এক সঙ্গে। 

প্রায় মাসখানেক পরে ও একবার দুদিনের ছুটি চাইলো। আমি বললাম,দুদিন আমার খুব অসুবিধে হবে গো, তুমি একদিন নাও,আমি কোন রকমে চালিয়ে নেবো।  বলে ঠিক আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি আসবে না ক্যানো গো? বলে আমার সোয়ামী আসবে যে বাংলা দেশ থেকে তাই। ওর যে আবার আসলেই সেবা নাগে। সব হাতে হাতে দিতে হয় তাই। 

ও কিন্তু দুদিনই এলো না। এসেই অবশ্য বললো,কিছু কইওনা বৌদি,ওরে ফেলায়ে আসতে পারি নাই।আমি বললাম,দ্যাখোতো,বাচ্ছা নিয়ে আমিযে পেরে উঠতে পারি না। তারপরে নিজেই বলছে,এই যে  আমি তোমার বাসায় কাম কাজ করি,দুইডা পয়সার জন্যি তো। তাও কতো কথা। আমারে কইসে, যে বাবুডা আইসে না, একা থাহে,ওর লগে এক্কেরে কথা কইয়ো না। আমি বললাম,ক্যানো?ও  বলে, কি জান, ভালা না খারাপ কে কইতে পারে, তার ওপরে ওরে বাঁধ দেবার কেউ নাই,তাই কুনো কথাই কওনের দরকার নাই। আমি বললাম, ঠিক আছে, তোমার কাজ করো। 

রাতে খাবার টেবিলে বসে আমরা তিন জনে ওর এই সব কথা নিয়ে খুব হাসাহাসি করলাম। উনি শুনে  বললেন, বাব্বা, কে একেবারে বৈজয়ন্তীমালা নাকি? সেই থেকেই আমরা ওর নাম দিয়েছিলাম বৈজয়ন্তীমালা। এটা ও নিজেও বুঝতো না, আর বাইরের কাউকেও বলিওনি।

বৈজয়ন্তী মালার আসল নাম কি জানি না। ওর পাঁচ ছেলেমেয়ে,লক্ষী মালতী দুই মেয়ে, তবে আমি ওকে লক্ষীর মা বলেই ডাকতাম।আর তিন ছেলে বড়টা মাধব সে সবার বড় আর ছেলে দুটো যমজ, নাম গৌর নিতাই।

বড় কষ্ট করে এখানে বসত করেছিলো ও। আমি বললাম, তুমি এইখানে এসে নিজে জমি কিনেছো?বলে, হ্যাঁ ।আমি কোনরকমে খোঁপার মধ্যি করে, মেয়ে দুডার চুলের মধ্যেকরে কিছুডা সোনাদানা আনছিলাম, সে সব বেচায়ে দিলাম। এমনকি ছেলে মেয়ের রুপার যা কিছু ছিলো, যা দুই চারটা পয়সা পাওয়া যায়, সব।বড় ছেলেটাকে আমাদের ওখানের চেনাজানা সে এখানে ছোট সোনা রুপার দোকান দিসে, ওর দোকানে বছর ভিতে কাজে দিসি।ওই যে মাধপের বাপ আইলো না, ত্যাখন এই জলা জমিটাই কিনসি। আমি  বললাম সব বেচলেও তোমার জমির দাম হোলো? না সব হয় নাই। মাধপের বাপ কইছিলো, ছাড়ান দে। অত টা জমি লাগবোনা। কিন্তু আমি বলি, তুই বুঝিস না, জমি থেকে সব হবে,তাই মাধপের মালিকের কাছ থেকে অতি কষ্টে সুদে টাকা ধার নিয়ে ওর বাপটারে দিয়া  কেনা করাইলাম। 

মাস দুএক পরে ও আমার থেকে কিছু আগাম টাকা প্রায় জোর করেই নিলো। শুনলুম ও গরু কিনেছে। আমি বললাম, তুমি কখন দেখবে? বলে, চারটা ছেলেমেয়ে তো বাড়িতেই আছে,ওরা সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। ইস্কুলে দিলাম, প্রায়ই ওরা যায় না। বরং গরু চরাক। আমি  ভাবলাম,ওর যাই হোক এই বুদ্ধিটা ভালই, ছেলেমেয়েকে ও ওদের মতো করেকাজে ভিড়িয়ে দিয়েছে।এবারে ও করলো  কি আমি ওকে যে জলখাবারটা দিতাম, সেটা ও বাড়ীতে নিয়ে যেতে শুরু করলো আমারথেকে একটা পুরনো দুধের কৌটো চেয়ে নিয়ে। আমি বললাম, তুমি কাজ করো, তোমার কিছু খাওয়া দরকার তো।  ও বলে আমি বাড়ি থেকে দু গা পান্তা খ্যায়া আসি। ওইতেই হয়া যায় এইখানে আসিয়া চাটুক খাই, ওইতে বেশ চলে যায়। 

কদিন পরে লক্ষীর মা  এসে বললো, `বৌদি, তুমার দেওয়া খাবারটা খুব কাজে দিসে। আমি বলি কি করে? আমি গৌর নিতাইরে কইসি, তুরা গরুগুলা দেখভাল কর, আমি তোদের জন্যি দেখবি, কি সব আনবো। ওরা, না বউদি, গরুগুলাকে দেখে চরায়,কার ক্ষেতে জানি  মুখ না দেয়,এইডা করে,আর আমি বাড়িতে ফিরত্‌ যাবার আগ দিয়ে বড় আস্তায় আসিয়া বসে থাকে। যেই গলিটুকু পার হয়ে বড় আস্তার উঁচাটায় উঠি, আমারে দেখতে পাইয়া,দুইজনে দৌড় পেড়ে আসিয়া এই কৌটা টা ছোঁ মারিয়া লইয়া যায়। তারপরে দুই ভায়ে মারপিট, কে আগে ডিবাটা নিবে।` আমি বলি তুমি তো ভালো ফন্দি করেছো।

বছরখানেক পরের থেকে ওর আসা-যাওয়া বড়ই এলোমেলো হতে থাকে। তিন চারদিন আসেনা, খোঁজও নেই। আমি ভাবছি ওকে বাদ দিয়ে দেবো,তখন হঠাৎ ওর উদয়। এসেই একেবারে মুখ কাঁচুমাচু করে খুব বিনীতভাবে দোষ স্বীকার করে বলে, `আমি আসতে চাইছিলাম। কিন্তু ওই মাধপের বাপে কইল ঘর করসি, এবার, একবার কেত্তন দিই।ওই সব কাজেতো কয়দিন গেলো,ও বৌদি একডা ভালা খবর আসে। এবার থেকে মাধপকে কিছু হাতে, দেবে ওরা। তয় একটা কথা কই,একদিন আমার ঘরটা কেমুন হইল একবার দেখবার আসেন। আমি বললাম,ঠিক আছে, সে হবেখন, তুমি এখন তোমার কাজ করো।` 

প্রায়ই ওর ঘর বাড়ি দেখতে যাবার কথা বলে,আমার আর হয়ে ওঠে না। এক হেমন্তের দিনে আমার পাশের কোয়ার্টারের ছবিদিকে নিয়ে ওর বাড়ি দেখতে গেলাম। টিনের চালার দুখানা ঘর,তবে ভিতটা উঁচু করেছে বর্ষায় জল ওঠে বলে।ঘরের লাগোয়া রান্নাঘর আর তার দাওয়ায় জ্বালানি কাঠকুটো ডাঁই করা।একখানা ধান কোটা চিঁড়ে কোটা ছামও রয়েছে। বলে, `বৌদি এবার চিঁড়া  কুটলে তোমারে  দিবো। খায়া দেখো কি মিষ্ট সোয়াদ।` বেশ গোবর লেপা পরিষ্কার উঠোন, ওদিকে গোয়াল ঘর। আমার সবচেয়ে ভালো লাগলো ওদের বাড়ির গেটের দুধারে, অপরাজিতা আর মাধবীলতা লাগানো। গাছ দুটো গেটটাকে আলো করে আছে।  গায়ের অলংকার চলে গেলেও ও আজ প্রতিষ্ঠার এক নতুন অলংকারে ভূষিত, সেটাই আজ ওকে আলোকিত করেছে   এ বড় কম কথা নয়। এ যেন পুজোর পরে দেবতার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা। সংগ্রাম এর পরে অস্তিত্ব রক্ষা।

এবারে বড় জব্বর  শীত পড়েছে,তার ওপরে রোজ সকালে ঘন কুয়াশায় চারদিক লেপেপুঁছে  একাকার। তার মধ্যে আবার শুরু হলো ওর না আসা। এতদিন ও বিরক্ত হতো, এবার আমি  বিরক্ত।আমি ঠিক করলাম, লক্ষীর মা কে বিদায় জানাবো, আর পারা যাচ্ছে না। তিন দিন পরে ওর  উদয় যেন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিজের রুটের বাস পাবার মতো। শুকনো মুখ, কোটোরগত চোখ জানান দিচ্ছে অনিয়ম আর ক্লান্তির কথা। যে জীবনটা সেজে উঠতে যাচ্ছিলো,সেখানে প্রতিবাদী মেঘের ছায়া।আমি সব রাগ জল দিয়ে স্লেট মোছার মতো মুছে ফেলে অত্যন্ত নরম গলায় বললাম, `কি হয়েছে তোমার?` কাঁদতে কাঁদতে বলে, `বউদি আমার লক্ষীরে আমি হারায়ে ফেলসিলাম।` আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বলি,` কি করে?` বলে, `এই তো তিন চার মাস হলো মেয়েটা ফুল পাইসে,এই কয়দিন কুথায় যে গেল।` পরে ওর কথায় যা শুনলাম, ওর মেয়েকে দু তিন দিন কোথাও খুঁজে পায়নি। ময়নাগুড়ি থানা থেকে খবর পেয়ে মাধব ওকে উদ্ধার করে এখানে নিয়ে এসেছে। এখানে আসার পরে বাড়িতে খুব মার খেয়েছে ওর কাছে। এতো কাঁদছে এখন সেটা মেয়েকে মেরেছে বলে না ফিরে পেয়েছে বলে বুঝতে পারিনি। কিন্তু চোখের জলের তোড়ে নদীর পাড় ভেঙ্গে যাবে মনে হয়। 

এরপর ট্রান্সফার হবার খবরে আমি যারপরনাই খুশী পুলকিত। আমি তখন নিজের ঘরের জিনিস গোছাতে ব্যাস্ত। দুমাসের মাথায় চলেও এলাম এদিকে,ভেসে গেলাম আপন্ ধারায়। বহু বছর বাদে আবার সুযোগ হলো ওই টাউনে আসার। এই শহরে এখন পুরনো ছবি মুছে ফেলার পালা।অনেকখানি খুঁজে পেতে যখন আন্দাজে ওর বাড়ির কাছে পৌঁছলাম তখন ভর দুপুর। লক্ষীর মা বলে খুঁজে না পেলেও গৌর নিতাই এর দেখা  পাওয়া গেলো। তারা এখন ভরপুর যুবক। তাদের আমাকে  চেনার কথাও নয়। আমি বললাম, `লক্ষীর মায়ের  এই বাড়ি না?` আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। ওরা ঠিক চিনতে পারলো না। শুধু বলে, `ও এখানে না থাকে।`  অবাক হয়ে বললাম, `কোথায় থাকে?` `ওই শশ্মানকালী মন্দির চত্বরে`,বলে উলটো দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিলো। 

ওখানে গিয়ে খুঁজে পেতে যখন ওর কাছে পৌঁছলাম, তখন বেলা দুপুর গড়িয়েছে। দেখলুম, ও ঠাকুরের পট, সিঁদুর এসব বিক্রি করে।ওকে দেখে চিনতে পারিনি। ওর চেয়ে ওর গলার স্বর আমাকে চিনিয়ে দিলো। আমি বললুম, `তোমার লক্ষীর খবর কি,তোমার গৌর নিতাই`? ও এককথা বলে, `সবাই ভালো আছে, মা নেওনা মা ঠাকুরের ছবিখান, এক খান সিদুর, তোমার ভালো হবে মা, তুমি খুব ভালো থাকবে।..` বুঝলাম,ওর অতীত এখন পর্দার পেছনের মতো,যেখানে কোন আলো নেই।  

আমি হতাশ হয়ে ফিরে এসেছিলাম। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। সিনেমা ম্যাগাজিনের রঙচঙে ছবি্র আড়ালের আঁধারের মতো কিছু একটা গ্রাস করলো আমাকে।  যে কষ্ট করে বাড়ীর ভিত পত্তন করলো,তারই সব চলে গেলো বিস্মৃতি অতলে । তবু একদিন জলা জমি ওর হাতে যে আবাদি হয়েছিলো সেই ছবিটাই রেখে দিলাম যত্ন করে, তার সঙ্গে ওর নামটাও।।

  

No comments:

Post a Comment