Tuesday, June 2, 2026


 কুর্গ- মেঘ পাহাড়ের দেশে

জয়িতা সরকার




দূরের নীল পাহাড়ে মেঘেদের নিঃশর্ত বন্ধুত্ব, আরব সাগরের নোনা বাতাসের খবর আনে সাদা-কালো মেঘের দল। হঠাৎ ছুটি কিংবা টানা তিনদিনের লং উইকেন্ড,  দেশের  আই টি রাজধানীর ট্রেন্ড ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া। কংক্রিটের শহর থেকে পালিয়ে ভিড় জমানো পশ্চিমঘাটের কোন এক নির্জনতায় কিংবা আরব-বঙ্গোপসাগরের বালুকাবেলায়। তবে সত্যি নিস্তব্ধতা খুঁজে পাওয়া অসাধ্য সাধন, চলতি হাওয়ায় গা না ভাসানো আমরাও মাঝেমাঝে ওই ভিড়ে পা মেলাই। লং উইকেন্ড ট্রেন্ডের সঙ্গে যতটা সম্ভব দূরত্ব রেখেই চলি। যা হোক অনেক ভূমিকা করেছি, এবার ফিরি মূল আখ্যানে। বহুদিন বন্ধুরা কোথাও যাইনি, অগত্যা সবার ছুটির কথা মাথায় রেখে ১ লা মে-র ছুটিতে প্ল্যান করা হল। ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাড়ে ছ'টা, ব্যাঙ্গালোর শহর থেকে মাইসোর যাওয়ার রাস্তায় বিখ্যাত নাইস রোডে তখন প্রায় দেড় কিলোমিটার লম্বা গাড়ির লাইন। বুঝলাম সকলেই ছুটছি আমরা। নাইস রোড ছেড়ে ব্যাঙ্গালোর মাইসোর এক্সপ্রেসে ওয়েতে  উঠতেই গাড়ির সংখ্যা বলছে আমাদের সকলের গন্তব্য প্রায় এক।




এবারের গন্তব্যে ব্যাঙ্গালোরবাসীর আনাগোনা অহরহ। আমাদেরও দ্বিতীয়বার, বন্ধুদের যে কতবার তা ওদেরও মনে নেই। শুরুতেই বলেছি এই জায়গার প্রধান বৈশিষ্ট্য মেঘের খেলা, হালকা বৃষ্টি, তবে বর্ষার ভয়াবহতা খবরের শীর্ষে থাকে ফি বছর। কোথাও যেতে হলে এই ভিড়ের মাঝে একটু আড়াল খোঁজার চেষ্টা চলে আমাদের। নিরাশ হয়েছি খুব কম, শান্ত প্রকৃতি ঠিক খুঁজে নেয় আমাদের। কফির রাজ্যের সেরার তালিকায় কুর্গ ছিল এবারে আমাদের গন্তব্য। তবে কফির উষ্ণতার থেকেও কুর্গের বাতাসে মিশে থাকে কালো মরিচ আর এলাচের গন্ধ। প্রকৃতি জুড়ে মশলার সুগন্ধি, শহর ছেড়ে একটু দূরে গেলেই গন্ধের নিবিড়তা আরও গাঢ় হয়। কফি থেকেও কুর্গের এই মশলা মেশানো বাতাস আমার ভীষণ প্রিয়। পশ্চিমঘাটের নিজস্ব একটা রং আছে, কুর্গও তার ব্যতিক্রমী নয়, পুরো পাহাড় যেন নীলচে সবুজে স্নাত। দূরের পাহাড় দেখলে মনে হয় কেউ যেন নীল রং ঢেলে দিয়েছে, নীল পাহাড়ের দেশ বললে অত্যুক্তি নয়।



ভ্রমণপ্রিয় মানুষের কাছে কুর্গের পরিচয় 'স্কটল্যান্ড অফ ইন্ডিয়া' হিসেবে। তুলনা না রূপের বিশেষণ তা নিয়ে তর্কে জড়ানো বৃথা, বরং বর্ষার কুর্গের একটা মোহময়ী রূপ আছে। বর্ষার কুর্গ রবি ঠাকুরের গানকে টক্কর কেটে বলতে পারে, 'আমি রূপে তোমায় ভোলাবো'। এক নীলচে সবুজ চাদরে নিজেকে মুড়ে ছোট বড় জলধারায় ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ উঠিয়ে নীচে নেমে আসা, পাহাড়ের গা জুড়ে বনফুলের বাহারি সৌন্দর্যে কুর্গ তখন অপার্থিব সুন্দরী। এবার খানিকটা গরম বাতাস থাকলেও কুর্গের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ভরা বর্ষায়। রাজা সিটের সিঁড়িতে দূরের মেঘ কাছে এল বৃষ্টি হয়ে, এমন অকৃত্রিম প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা অবর্ণনীয়৷ রাজা সিট- কুর্গের অন্যতম দ্রষ্টব্য, সারা বছর মেঘ রোদকে সঙ্গী করে ভিড় সামলে চলেছে নিয়ম মেনে। সূর্যোদয় সূর্যাস্ত দেখার জন্য এটাই কুর্গের সবচেয়ে পরিচিত জায়গা। কোদাগু রাজারা এখানে বসেই নাকি প্রকৃতির রূপ উপভোগ করতেন। এমনকি মাইসোরের রাজাদেরও গ্রীষ্মাবকাশের অন্যতম স্থান ছিল কুর্গ।



কুর্গ মানেই ছোট বড় ঝরনার সাদা ফেনিল জলরাশি। শহর লাগোয়া বিখ্যাত জলরাশি আব্বে ফলস। কফি বাগানের মাঝ বরাবর সিঁড়ি নেমে গিয়েছে, বর্ষায় বেশ উচ্ছল, তবে সারাবছর এর ধারা বহমান। ভিড় এড়িয়ে যাওয়াই যেহেতু আমাদের লক্ষ্য, তাই লং উইকেন্ডে ওইমুখো আমরা হয়নি। দু'দিনের ঠিকানা যেখানে ছিল, ঠিক তার থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে কুর্গের অফবিট বলতে যা বোঝায় সেই কোটে আব্বে ফলস ছিল আমাদের দর্শনীয় স্থানের তালিকায়। কিন্তু এই ভিড় পৃথিবীতে অফবিট শব্দটাই থাকা উচিত কি না তা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। কারণটা খুবই পরিষ্কার, লোক সমাগম এখানেও কম ছিল না। খানিকটা সময় এখানে কাটিয়ে আমরা চললাম মান্দালপাট্টির দিকে। কুর্গের অফরোডিং রুট, এই মান্দালপাট্টিও সূর্যোদয় দেখার আর্দশ স্থান। ভোরবেলা স্থানীয় জিপ ভাড়া করে পৌঁছাতে হয় এখানে। সবুজ পাহাড়ের মাঝে প্রথম আলোকরেখা যা মনে থেকে যাবে অনেকদিন, সঙ্গে মনে থাকবে রাস্তার বীভৎসতা। শেষের পাঁচ কিলোমিটারের পর অপার সৌন্দর্য থাকলেও রাস্তা পরীক্ষা করবে আপনি কতটা স্ট্রং। এবার আমরা সে পথেও পা বাড়ায়নি। খানিকটা পথ গিয়ে ফিরে এলাম মাদিকেরী ফোর্টের সামনে। প্রথমবার ফোর্ট বন্ধ থাকায়, আর এবার শহরের ভিড় দেখে জানার চেষ্টাও করিনি ফোর্ট বন্ধ নাকি খোলা? যা হোক এক চক্কর শহর ঘুরে আমরা ফিরে এলাম হোম স্টে তে। বিকেলে আমাদের নতুন একটি জায়গায় সূর্যাস্ত দেখার পরিকল্পনা। হোম স্টে-এর মালিক তার জিপেই আমাদের নিয়ে রওনা হল স্বল্প পরিচিত কোটে বেট্টা-র পথে।


রাস্তা বলতে পাথুরে মাটির খাড়াই পথ। দক্ষ হাতে পাকদণ্ডীর গতিবিধি বুঝে জিপ গিয়ে থামল সানসেট পয়েন্টে। স্থানীয় লোকেদের আনাগোনার চিহ্ন স্পষ্ট হলেও ট্যুরিস্ট যে খুব বেশি আসেন না তা বোঝা গেল, আমরা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন দলের দেখা পেলাম না। আসলে কুর্গ শহর থেকে খানিকটা দূরে এই জায়গা। দূরে পাহাড়ের সারি, হালকা বাতাসে বুনো গন্ধ ভেসে আসছে, সামনে ঘন জঙ্গল, বেশ খানিকটা পথ হাঁটলাম, সামার লিলি ফুটে রয়েছে যত্রতত্র, নাম জানা আরও কিছু ফুলের রংয়ে মুগ্ধ হতে বাধ্য। পশ্চিমঘাট পর্বতে এলে এরকম নানা অজানা ফুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। জঙ্গল ঘুরে অপেক্ষা করছি সূর্যাস্তের, কিন্তু আকাশের দখল নিয়েছে মেঘের দল, অগত্যা ফেরার পালা। হোম স্টে তে পৌঁছাতে সন্ধ্যে নেমে এলো। বন্ধুরা মিলে যাওয়া মানে আড্ডা, হৈ-হুল্লোড়, আমরাও ব্যতিক্রমী নই, কখন যে ঘড়ির কাঁটায় ১১ টা বেজে গেল, রাতের খাবার খেয়ে যে যার মত বিছানার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম।



এই তো হলো কিছুটা চেনা, খানিকটা অচেনা কুর্গ ভ্রমণের গল্প, তবে এখানেই শেষ নয়। কুর্গ মানে তালাকাবেরী, দক্ষিণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী কাবেরীর উৎপত্তিস্থল, দর্শনীয় স্থানের তালিকায় প্রথম সারিতে। কুর্গ আর দুবারে এলিফ্যান্ট ক্যাম্প সমনাম, হাতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি আর্কষণের শীর্ষে। কুর্গ যেতে পেয়ে যাবেন নামড্রোলিং মনেস্ট্রি। দেশের অন্যতম টিবেটিয়ান শিক্ষাকেন্দ্র। বিরাট মনেস্ট্রি চত্বরে প্রতিদিন পর্যটকের ভিড়। কুর্গ বর্ষা সঙ্গে জলপ্রপাত একাসনে সমাসীন। বর্ষার কুর্গ যেমন মহোময়ী অপরূপা, তেমন অননুমেয়। কখন রুপের বীভৎসতা গ্রাস করবে পাহাড়ে ঘেরা এই ছোট শহরকে তা প্রকৃতিই জানে। তবে বর্ষা এলে কুর্গের তুলনা শুধু কুর্গ। শহর থেকে খানিকটা দূরে মাল্লালি ফলস এর সৌন্দর্য এককথায় নৈসর্গিক। অনেকটা পথ নীচে নেমে তবে পৌঁছতে হবে এই বর্ষা সুন্দরীর কাছে, যার রুপে মোহিত হয়ে সময়ের খেয়াল রাখা হবে না। ফিরতে হবে বর্ষাভেজা স্মৃতি নিয়ে। ঠিক তেমনি ইরুপ্পু ফলসের মোহময়ী রূপেও রয়েছে সেই এক মোহমায়া। জঙ্গলের মাঝে বয়ে চলা জলধারা বর্ষায় প্রাণবন্ত। শীত থেকে বর্ষা যে কোন ঋতুতেই কুর্গ অতুলনীয়।


শুধু প্রকৃতির রূপের আধিক্যে কুর্গের এই প্রতিপত্তি নয়, স্থানীয় মানুষের নিজস্বতায় কর্ণাটকের এই পাহাড়ি শহর স্বমহিমায় প্রকাশিত। স্থানীয় মানুষ যারা কুর্গী (কোদাভাস) নামেই পরিচিত, তারা একসময় মাইসোর রাজাদের সৈন্যদলের সদস্য ছিলেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতেও কুর্গ রেজিমেন্ট তৈরি হয়েছিল, কিন্তু কোদাভু জনজাতির লোকসংখ্যা কম থাকায় পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। তবে সেই শৌর্য বীরত্বের ধারক বাহক তারা আজও। তাইত বিশেষ কিছু আর্মস নিজেদের কাছে রাখার জন্য লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না এই জনজাতির মানুষদের, শক্তিশালী ঐতিহ্যের অধিকারী হওয়াতেই তাদের এই বিশেষ অনুমতি। কুর্গের আরেকটি বৈশিষ্ট্য যা তাদের নিজস্বতা, সেটি কুর্গের প্রতীক। তিনটি অস্ত্র নিয়ে তৈরি এই প্রতীক কিছু বছর আগে ট্রেড মার্কও পেয়েছে। প্রতীকটির মধ্যে রয়েছে ওডিকাথি- এটি একটি বড় ফলার তলোয়ার, কোদাভু জনজাতির বীরত্বের চিহ্ন। পিচে কাথি- ছোট ছুরি, কোমরে গোঁজা যায়, রয়েছে রাইফেল। এই তিন অস্ত্রের মিলিত রূপ কুর্গের প্রতীক। প্রকৃতি থেকে নিজস্ব সংস্কৃতি সবেতেই কুর্গ অনন্য। দক্ষিণের অন্যতম আকর্ষণ কুর্গ আসতে হলে ব্যাঙ্গালোর কিংবা ম্যাঙ্গালোর হয়ে পৌঁছে, বাসে অথবা ভাড়া গাড়িতে পৌঁছে যেতে হবে। গোটা কুর্গ জুড়ে সাধারণ থেকে লাক্সারি সব বাজেটের হোটেল, হোম স্টে রয়েছে। আগে থেকে বুকিং করে এই মশলার সুগন্ধী শহরে দু-রাত কাটিয়ে সমুদ্র দর্শনেও যেতে পারেন অথবা রাজার শহর মাইসোর হয়ে উটির পথেও পা বাড়াতে পারেন। বর্ষা কিংবা শীত কর্ণাটকের এই পাহাড়ি শহর মন কাড়বে সব ঋতুতেই।

ছবি- কিংশুক সরকার


No comments:

Post a Comment