Tuesday, June 2, 2026


প্রখর দারুণ অতি দীর্ঘ দগ্ধ দিন

অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী

দহনবেলা আসন্ন প্রায়। তবুও প্রথমার্ধে অগ্নিভর আগুনে রঙা কড়া চোখের শাসন থেকে বেশ কিছুটা ছাড়পত্র মিলেছে এবারে বহ্নিশিখার বছর'পরের দেখায়। রূঢ় স্বভাবী সে প্রশ্রয়ের দুহাত দিয়ে কঠোর বেলাকে আড়াল করে কুসুম কুসুম আদুরে আলোয় বহ্নির নয়নতারায় ফুটিয়েছে সূর্যমুখীর হাসি,গায়ে ছুঁইয়ে দিয়েছে জুঁই-বেলির আতর, হাতে দিয়েছে সেই পদ্মটিকে,যার জন্য বহুদিনের প্রতীক্ষা ছিল। খোপায় কাঠ গোলাপ গুঁজে অপরাজিতা বহ্নি বেরিয়েছে জারুল, কৃষ্ণচূড়া সোনালু আর মধুমঞ্জরীর একটা গোটা সাম্রাজ্যে বিচরণ করতে। 

প্রতিবারের মতোই সে অভিলাষী স্নিগ্ধ, কোমল এই ফুলগুলিকে স্নেহের পরশ দিয়ে জিয়ন কাঠির ছোঁয়ায় আরও আরও প্রাণময় করবে বলে। সে জানে, আসছে দিনগুলোতে  প্রবল পরাক্রমী অগ্নিভর নিজের ফোটানো এ কুসুম গুলি তারই নিক্ষিপ্ত বাণে জর্জরিত হতে পারে হয়তো বা। ভালোবাসার অমৃত সঞ্জীবনী গায়ে মাখিয়ে ফুলের দলকে উজ্জীবিত করতে তাই বহ্নি বদ্ধপরিকর। অগ্নিভর নির্দেশনামায় নিসর্গের নানান রঙের রেশমি সুতোয় বোনা ফুল লতাপাতার অনবদ্য সূচিশিল্পের  এ বাগানঘর শূন্য হয়ে পড়বে যে নাহলে। নিজের যাবতীয় সহ্যশক্তি প্রাণের ফুলসভার আনাচেকানাচে উজাড় করে  তীব্র দহনেও তাদের সমুজ্জ্বল থাকার, বর্ণময় থাকার মৃত্যুঞ্জয়ী মন্ত্র জপ করে বহ্নি একাগ্র চিত্তে। 

এরই মাঝে সুঘ্রাণে আমোদিত ফলের বাগান থেকেও তৃপ্তির ঝুলিতে টুপটাপ ঝরে পড়ে ঋতুর কিছু আশীষ। সে ভাঁড়ারঘরের চাবিটিও অগ্নিভর হাতে। ঋতুমাতা এবার উত্তরের বৈশাখী বাতায়নে সেভাবে কায়েম হতে দেননি তীব্র দাবদাহকে। অগ্নিভর দরাজ হাতের সঙ্গে মনের পেলবতায় গাছে গাছে ধরেছে অফুরন্ত ফলপাকুড়। তারই আমন্ত্রণে বহ্নিশিখা ফুলের গায়ের অবশিষ্ট জপমালা গুলি জড়িয়ে দেয় মধুময় ফলের বাগিচায়। 

                                 সুখী সুখী এ দিন দীর্ঘ হবে না আর বহ্নি জানে। প্রতি বছরের মতোই বাকি দিনরাত গুলো অগ্নিভর প্রবল রোষানলে জ্বলে পুড়ে দগ্ধ হতে হবে সময়কে। বহ্নিও তো ছাড় পাবে না। আগুন নিয়ে খেলার আঁচ অবধারিত এসে লাগবে তার গায়েও। এছাড়াও রয়েছে যখন তখন চারিদিক আঁধার করে, কালো পাগড়ি জড়িয়ে, যুদ্ধের পতাকা উড়িয়ে কালবৈশাখী ঝোড়ো দস্যুর আনাগোনার ভয়ঙ্কর গল্পেরা। কত চালচুলো, সহায় সম্বল, কত প্রাণ এক নিমেষে লুটেপুটে নিয়ে প্রবল গতিতে অদৃশ্য হবে এ লুটেরা তার ইয়ত্তা নেই। একটু স্বস্তি যদি কেউ দিতে পারে, সে শুধু ওই বৃষ্টি মেয়েটি। উঠোনখানি জুড়ে জলতরঙ্গের জলসা বসিয়ে শ্রান্ত মনকে ভিজিয়ে দেবে সে অপার ভালো লাগায়। সেই বৃষ্টির ছাট এসে লাগবে বহ্নির চিলেকোঠার ঘরে। অগ্নিভর অলিন্দেও বৃষ্টিমেয়ের মিতালীর  টুপটাপ কিছু হীরক কুচি পড়বে ঝরে। সে ঔজ্জ্বল্যে অগ্নিভর প্রখরতার আড়ালে শান্ত সৌম্য রূপটি  দুচোখ ভরে দেখবে বহ্নি নিজেকে লুকিয়ে রেখে। 

চিলেকোঠার জানালায় দিঘির লাল শাপলাটিকে সাক্ষী রেখে  উৎসুক থাকবে আবারও কোনো এক আষাঢ়ে গল্প যা আবার বছর'পরে অগ্নিভ আর বহ্নিশিখার অভিষেকের চিরায়ত হয়েও নতুন কাহিনী বলবে কোনো এক মুক্ত গদ্যের পাতায়। 


No comments:

Post a Comment